বাবার ধামে ( পার্ট ১)
বেনারসে শেষ এসেছিলাম ৯৮ সালে। শীতের সকালে সংকীর্ণ গলির মধ্যে দিয়ে বিশ্বনাথদর্শন করে মাথায় হাত, নূতন জুতো জোড়া গায়েব। কি আর করি, খালি পায়ে দশাশ্বমেধ ঘাটে এসে নৌকা ভাড়া নিয়ে বেনারসের বিখ্যাত ঘাটগুলি পরিদর্শন শেষ করে, সদ্য খোলা দোকান থেকে জুতো কিনে গেস্ট হাউসে ফিরছিলাম। সেইদিন চারটে নাগাদ দুন এক্সপ্রেসে বুকিং ছিল। তখন ল্যান্ড লাইনের যুগ। ফোনে বল্ল দুইঘন্টা লেট। হিসাব করে স্টেশনে গিয়ে শুনলাম ট্রেন টাইম মেক আপ করে অলরেডি চলে গিয়েছে। স্টেশনের কুলিরা বুদ্ধি দিল ট্যাক্সি করে মুঘলসরাই চলে যান, ভাগ্য ভাল থাকলে পেয়ে যাবেন। দুই ছোট বাচ্চা সমেত ইস্ট নাম জপতে জপতে ট্যাক্সি করে যখন মুঘলসরাই পৌঁছালাম, ট্রেন তখনও প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে। সে এক অনন্য অভিজ্ঞতা ছিল।
দীর্ঘ ২৭ বছরে গঙ্গা দিয়ে অনেক জল বয়ে গিয়েছে। বিশ্বনাথ মন্দিরের নূতন প্রশস্ত করিডোর হয়েছে। অননলাইনে সুগম দর্শনের টিকিট কাটা যাচ্ছে। এবারে আমার সফরসঙ্গী কলেজের ক্লাসমেট ও পরবর্তী জীবনে একই কোম্পানিতে চাকরির সুবাদে ঘনিষ্ঠ বন্ধুবর শিব প্রসাদ দত্ত ওরেফে শিবু।
ও আসবে কলকাতা থেকে। প্ল্যান ও পোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর আমি।শিবু আবার হোটেলের ব্যাপারে খুতখুঁতে। আজকাল ফ্লিপকার্ট থেকেও হোটেল বুকিং হচ্ছে। তুলনা করে দেখলাম অন্যান্য সাইটের থেকে শস্তা। দশাশ্বমেধ ঘাট বা বিশ্বনাথ মন্দিরের কাছাকাছি জায়গাগুলি ঘিন্জি। দক্ষিণে অন্য নামকরা ঘাট হল অসি ঘাট। উপরোক্ত দুটি ঘাটেই গঙ্গা আরতি হয়।
অসি ঘাটে ভোর ও সন্ধ্যায় দুইবেলাই আরতি হয়। কিছুদিন আগে বেনারসের উপর একটা সিনেমা দেখেছিলাম। নাম মহল্লা অসি। নাম ভূমিকায় সানি দেওলের চরিত্রটি ছিল এক কট্টর হিন্দু পন্ডিতের। হোটেলের নাম ‘বেনারস হাভেলি’, দুইশ মিটারের মধ্যে ঘাট, সামনের রাস্তাও প্রশস্ত, স্বচ্ছন্দে গাড়ি চলে আসে।
রুফটপ রেস্টুরেন্ট থেকে গঙ্গার সুন্দর ভিউ।
নিউ দিল্লি থেকে আমার ট্রেন স্বতন্ত্র সেনানী নির্ধারিত সময়ের বিশ মিনিট আগে সকাল পৌনে আটটাতে বেনারস পৌঁছে দিল। ট্রেন আরো আগে যাবে। পাশের সিটে ছিল এক দ্বারভাঙ্গার মধ্যবয়সী লোক। একাই ছয়টা লাগেজ।
তারমধ্যে এক অতিকায় গিজার। দুই সীটের মাঝে সব ডাঁই করে রাখা। লোকটি তুখোড়। বলি গিজার তো সব জায়গায় পাওয়া যায়। এখান থেকে কেন নিলে। জানাল যে কোম্পানির কাজে এসেছিল তারা গিজার বানায়, ওকে একটা গিজার গিফ্ট করেছে। ওকে বলি ৪০ কেজি পার প্যাসেন্জার এল্যাওড, চলাফেরা করা যাচ্ছে না। বিনয়ে গলে গিয়ে বল্ল- না স্যার ওজন অত হবেই না, আর রাত মে তো শুনা-ই হ্যায়, থোড়া এডজাস্ট কর লিজিয়ে প্লিস। বুঝলাম এ বেশ ম্যানেজদার পার্টি।
অটো নিয়ে হোটেলে যখন পৌঁছালাম
তখন সবে সাড়ে আটটা। হোটেলের চেক ইন দুপুর দুটোতে। শিবুর এয়ারপোর্ট থেকে আসতে আসতে দুপুর হবে। লাগেজ হোটেলে রেখে বেরিয়ে পড়লাম।
প্রথম গন্তব্য একদম পাশে অস্সিঘাটে। বরুণা আর অসী নদীর সঙ্গম হল বেনারস। স্কন্দ পুরাণ অনুযায়ী অসী ঘাটে শিব ঠাকুর দানবদের পরাজিত করে বিশ্রাম গ্রহন করেছিলেন।
শীতের সকালের কুয়াশা মোড়া নদীতীর। অন্য পাড় অদৃশ্য।
সকালে গঙ্গাআরতির ভীড় পাতলা হয়ে গিয়েছে। সকালের চা বাদ পড়ে গিয়েছে। ভাঁড়ে করে ঘন দুধের গরম চা খেয়ে শক্তি সঞ্চয় করি। দোকানদার জানাল ভোর তিনটে থেকে সকাল দশটা আর সন্ধ্যাবেলা দোকান খোলে। দিনে তিন হাজার টাকা প্রফিট। বেশ লুক্রাটিভ বিজনেস। চা খেয়ে ঘাটে পুণ্যার্থীদের চলাচল দেখি।
এক জায়গাতে পুরুতমশাই একদল মুন্ডিতমস্তককে পারলৌকিক কর্ম করাচ্ছেন। অনেকেই গঙ্গাস্নান করছেন। ঠান্ডার ভয়ে পুণ্যার্জন থেকে বিরত থাকি।
পাশের ঘাট হল বিখ্যাত তুলসী ঘাট। এখানেই বসে আজ থেকে সোয়া চারশ বছর আগে তুলসীদাস অওধি হিন্দিতে রচনা করেছিলেন রামচরিতমানস। এর আগে রামায়ণের স্ক্রিপ্ট ছিল সংস্কৃততে, সাধারণ মানুষের কাছে রামায়ণ পাঠের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায় রামচরিতমানস লেখার পর। নয়ডায় আমাদের সোসাইটিতে প্রতি সপ্তাহে সুন্দরকান্ড পাঠ হয়। তুলসীদাস ছিলেন হনুমানভক্ত, হনুমানের অন্যনাম সংকটমোচন তাঁরই দেওয়া। এই সেই ঘাট যেখানের প্রাচীন হনুমান মন্দিরে প্রাত্যহিক পূজাপাঠের পর চলত রামচরিতমানস লেখা। ঘাটে একজনকে হনুমান মন্দিরের কথা জিজ্ঞাসা করায়
সে দেখিয়ে দিল ঘাটের পাশে হলুদরংএর বিল্ডিংটি, যার পাশ দিয়ে এক খাড়া সিঁড়ি উঠেছে মন্দির অব্দি। ঘাট থেকে দেখলে বোঝার উপায় নেই যে খাড়া এই ইমারতের মধ্যে কোন মন্দির আছে। ঘাটে কোথাও লেখাও নেই যে এখানে সেই ঐতিহাসিক হনুমান মন্দির, যার পদতলে বসে তুলসীদাস রামচরিতমানস লিখেছিলেন। ফলে মন্দিরটি ট্যুরিস্টশূন্য।
খালি কিছু লোকাল ভক্তের আনাগোনা। সিঁড়ি দিয়ে উঠে জুতো খুলে উঠতেই ডানদিকে এই প্রাচীন মন্দিরটি। ভিতরে হলুদরংএর প্রোথিত হনুমান মূর্তি।
বাইরের দেওয়ালে হনুমানচল্লিশা লেখা। কয়েকজন ভক্ত হনুমানচল্লিশা পাঠ করছে। ভিতরে স্বল্পপরিসর জায়গা। খুব ছোট্ট মন্দির। পূজারী পাশে রাখা খড়ম দেখিয়ে বল্লেন এটা তুলসীদাস ব্যবহার করতেন। ওর তলায় রামচরিতমানসের অরিজিনাল স্ক্রিপ্ট রাখা আছে শুনে পুলকিত হই। তবে আমার অনুরোধ সত্বেও পুরোহিত সেটা দেখালেন না, বুঝেছেন বোধহয়, এ-এক অর্বাচীনের আব্দার যে কোনদিন রামচরিতমানস পড়ে নি। কুড়ি টাকা দিয়েছিলাম প্রণামীতে, সেটা ফেরত নিয়ে নিই। তেল যখন মাখলাম না, কড়ি কেন ফেলব! মন্দিরের উপর আরো দুটো তলা। একটি স্থানীয় ছেলের সঙ্গে উঁচু সিঁড়ি বেয়ে উঠি।
জানালা দিয়ে সুন্দর গঙ্গার ভিউ পাওয়া যাচ্ছে। তিনতলায় একটি ছোট ঘরে তুলসীদাসের ছবি ও আসন, যে আসনে বসে উনি রামচরিতমানস লিখেছিলেন এই ঘরে বসে। তবে এরকমই শোনা যায়, তৎকালীন ব্রাহ্মণ পন্ডিতরা তাঁদের একধিপত্য খর্ব হবে ভেবে রামচরিতমানস লেখার সময় বাধা দিয়েছিলেন, তাই তুলসীদাসকে মসজিদ বসে লিখতে হয়েছিল। তুলসীদাস ছিলেন আকবরের সমসাময়িক। আকবর তাঁকে দেখে পাঠালেও তুলসীদাস যান নি, তখন নাকি আকবর পেয়াদা দিয়ে ধরে নিয়ে যান এবং জেলে রেখে দেন। এরপর বানরের দল তুলসীদাসকে অলৌকিক ভাবে উদ্ধার করে। এসব গল্পকথা। তথ্যভিত্তিক সত্য হল আকবর তুলসীদাসকে রামচরিতমানস লিখতে উৎসাহিত করেছিলেন, যাতে পরবর্তীতে ফারসিতে রামায়ণ অনুবাদ করা যায়। আকবরের সভায় ও রাজকার্যে ফারসি বেশী ব্যবহৃত হত, তাদের সুবিধার্থে আকবর এই পদক্ষেপ নিয়েছিলেন এবং এরজন্য অর্থসাহায্যও করেছিলেন।
মন্দির পরিসর থেকে বেরিয়ে পাশে আরো কয়েকটি সাদা মন্দির।
শুনলাম এইসব মন্দিরও তুলসীদাসের সমসাময়িক। পাশে এক আখড়া। সকাল সকাল একপাশে চলেছে কুস্তির মহড়া অন্যদিকে গদা ঘোরাচ্ছেন দুইজন। নীচে ঘাটের কোলাহল থেকে এই শান্ত পরিবেশে মন্দিরবেষ্টিত জায়গায় কুস্তির প্যাঁচ আর গদার আস্ফালন যেন এক প্রাচীন ভারতের পরম্পরার জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।
গেটের কাছে দাঁড়িয়ে দেখছি ভিতরের কর্মকান্ড। ওদের মধ্যে মধ্যবয়স্ক ব্যক্তিটি সহাস্যে বল্লেন-আইয়ে আইয়ে… আপ ভি কোশিস করিয়ে। জুতো খুলে ভয়ে ভয়ে এগোই। রামায়ণ-মহাভারতের যুগের অস্ত্র, এর আঘাতেই দুর্যোধনের উরুভঙ্গ হয়েছিল। উনারা ঘোরাচ্ছিলেন এক হাতে কব্জির মোচড়ে। শুনলাম গদার ওজন দশকেজি।
জয়দুর্গা বলে দুইহাত দিয়ে লেগে পড়লাম। প্রথম প্রচেষ্টায় মন্দ হল না। খালি একবার টুপিটা খুলে যায় যায় অবস্থা! উনি একজনকে দিয়ে আমার গদা ঘোরানোর ভিডিও ও ছবি তুলে দিলেন।
অসাধারন অভিজ্ঞতার সঙ্গে ফটো শেসন! বেনারস ভ্রমনের শুরুর অভিজ্ঞতা অতুলনীয়। তুলসী ঘাটের কাছেই হল লোলার্ক কুন্ড। হাজার বছরের এই প্রাচীন কুন্ডের কথা স্কন্দ পুরাণেও আছে। গলিঘুজির মধ্যে দিয়ে দুই মিনিটের হাঁটা পথ। কুন্ডের পাশের লাল রংএর মন্দিরটি হল লোলার্ক আদিত্য মন্দির।
কুন্ডের জলে সূর্যের কম্পনরত প্রতিচ্ছবির অন্যনাম হল লোলার্ক। চারিদিকে এত বাড়ী যে প্রাচীনত্বের ফিলটা আসে না।
বর্ষার সময় লোলার্ক ছট বলে এক প্রথা চলে আসছে বহু যুগ ধরে, যে দিনটিতে সন্তানকামনাতে এই পবিত্র কুন্ডের জলে স্নান করে পার্শ্ববর্তী আদিত্য মন্দিরে পুজো দিতে হয়। স্থানীয় একজন জানালেন স্নানের জন্য এককিমি লম্বা লাইন পড়ে, প্রশাসন থেকে ব্যারিকেডিং করে পুন্যার্থীদের লাইন এগোয়। এই দর্শনীয় স্থানটি বেনারসের প্রাচীনত্বের এক নিদর্শন, যদিও সাধারণভাবে ভ্রমনার্থীদের চেনা সার্কিটের মধ্যে পড়ে না। এবারে গলির মধ্যে দিয়ে এসে অসি ঘাটের মেন রাস্তায় পড়ি। রাস্তায় ডাঁশা পেয়াড়া বিক্রি হচ্ছে দেদার। ছোটবেলায় কাশীর পেয়ারার নাম খুব শুনতাম। ভিতরটা লালচে। একটা কিনে খেলাম। ভিতরটা লালই বটে। তবে শুনলাম এটা হাইব্রিড। টেস্ট কিন্তু ভাল। বেনারসের পুরি-কচুরির খুব নামডাক। সকালে সবাই এই দিয়ে নাস্তা করে। কাছাকাছি একটি দোকানে
দুটো পুরি আর চা খেয়ে রওয়ানা দিই বাঙ্গালীটোলার দিকে। রিক্সা নিলাম। রাস্তাটা যাচ্ছে গোধূলিয়া মোড়ের দিকে।
রিক্সা আমায় নামিয়ে দিল বেঙ্গলি ইন্টার কলেজের সামনে।
এখান থেকে গোধূলিয়া মোড় (যেখান থেকে বিশ্বনাথ মন্দির আর দশাশ্বমেধ ঘাটে যাওয়ার রাস্তা) আরো পাঁচশ মিটার।রিক্সা সব এই পর্যন্তই আসে। রিক্সাওয়ালা আমাকে ডানদিকের সরু গলিটা দেখিয়ে বল্ল এটাই বাঙ্গালীটোলা যাওয়ার রাস্তা। বাংলার সঙ্গে বেনারসের। সম্বন্ধ বহু পুরানো। আঠারশ শতক থেকে বহু বাঙ্গালী বিশেষত প্রৌঢ় বা বিধবাদের সাধনোচিত ধাম ছিল কাশী। এককালে সংস্কৃত শেখার জন্য বহু বাঙালি পাড়ি দিতেন কাশী। একটা সময় ছিল যখন কাশীতে রীতিমতো শাসন করতেন বাঙালি সংস্কৃতি পণ্ডিতরা।
ছোট গলি দিয়ে দুর্গাবাড়ীর অবস্থান জিজ্ঞাসা করতে করতে এগোই। শুনেছি আড়াইশ বছর আগে নাটোরের রাণী ভবানী অকালবৈধব্যের পর স্বামীর পিন্ডদান করতে বারানসী
এসেছিলেন। কথিত আছে তিনি এক হাজার বাঙালী ব্রাহ্মণকে এখানে জমি ও বসতভিটা দান করেছিলেন, তারপর থেকে এই জায়গার নাম হয় বাঙালিটোলা।
মাথায় মাফলার আর শাল জড়িয়ে বসেছিলেন এক বৃদ্ধ। মাফলার বাঁধার ধরন দেখে বুঝি বাঙালী। আলাপ জমাই। ইনার নাম দীপক চ্যাটার্জি,
আমার থেকে বছর পাঁচেক বড়। ইনার বাড়ি ছিল বর্ধমানে। স্কুলিং ও কলেজ এখানেই। কলেজে পড়ার সাথে ছাত্ররাজনীতি করতেন। ঐ সময় এক অবাঙালির সঙ্গে প্রেম ও বিবাহ। শ্বশুরবাড়ির আপত্তি ছিল, কিন্তু নেতা হওয়ার সুবাদে বুলডোজা করে দিয়েছিলেন সব আপত্তি। জিজ্ঞাসা করি বাড়িতে কোন ভাষা চলে-বাংলা না হিন্দি। দীপকবাবু জানালেন, অবশ্যই বাংলা, বৌকে বাংলা শিখিয়েছেন। তিন মেয়ে, সবারই বিয়ে দিয়েছেন আশেপাশে। দুঃখ করছিলেন এখন নামেই বাঙালি টোলা। অনেকেই বাড়ি বিক্রি করে এই ঘিঞ্জি জায়গা ছেড়ে চলে গিয়েছেন। আগে বেনারসে আট-দশলাখ বাঙালি ছিল, এখন মেরেকেটে আড়াই লাখ।
গলিতে এগোতে এগোতে কিছু দোকানে দেখলাম কাঠের খেলনা।
এটা বেনারসের ট্রাডিশনাল হ্যান্ডিক্রাফট। ১৯৮৩ সালে যখন প্রথমবার বেনারস আসি, তখন কাঠের একটা ব্যান্ডপার্টি কিনে নিয়ে গিয়েছিলাম। এখন দেখলাম স্কুটার, অটো, দেবদেবীর মূর্তি। যুগের সঙ্গে সঙ্গে পট পরিবর্তন।
অলিগলি পেরিয়ে দুর্গাবাড়ি বলে যেখান পৌঁছালাম, ধারণা ছিল সেটি রাণী ভবানীর তৈরী।
বন্ধ কোলাপসিবল গেট খুলে ভিতরে ঢুকলাম। মন্দির এখন বন্ধ,তবে কোলাপসিবল গেটের ফাঁক দিয়ে বিগ্রহ দেখা যাচ্ছে।
এক মহিলা পুজোর বাসনপত্র ধুচ্ছিলেন। তার কাছে শুনলাম এই দুর্গাবাড়ি হল “জনাই”এর মুখার্জি পরিবারের। এই দুর্গামূর্তি ২৫৮ বছরের পুরানো। এখনো রোজ পুজো হয়। প্রাচীন এই মূর্তি আগ্রহ নিয়ে দেখি। সিংহের কেশরের ফাঁক দিয়ে কালো-হলুদ ডোরাকাটা বাঘের পা। কারণটা জিজ্ঞাসা করতে যা জানলাম সেটা বেশ ইন্টারেস্টিং। আজ থেকে আড়াইশ/তিনশ বছর আগে বাংলার সাধারণ মানুষ সিংহের চেহারা সম্বন্ধে অবগত ছিল না, কারণ বঙ্গদেশে সিংহ ছিল না, ছিল বাঘ। তাই দুর্গামায়ের বাহন নামে সিংহ হলেও অবয়ব ছিল বাঘের। মনে পড়ল বাংলাদেশেও চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষে বাসন্তী পুজো নামে দুর্গাপুজো হত, সেখানেও দেখেছি বাহন হল বাঘ। মন্দিরের বাইরে বোর্ডে লেখা দেখলাম এই পুজোর ইতিহাস।
১৭৬৭ সালে শারদীয়া নবরাত্রির ষষ্ঠীর দিন নিজের বাড়িতে দুর্গাপুজো শুরু করেন কালীপ্রসন্ন মুখোপাধ্যায়। বিসর্জনের দিন মূর্তিকে একচুলও নড়ান যায় নি। সেই থেকে একই বিগ্রহের পুজো হয়ে আসছে।
পুরাতন দুর্গাবাড়ি থেকে বেরিয়ে খোঁজ করতে থাকি রাণী ভবানী মন্দিরের। একজন দেখিয়ে দিলেন একটি মন্দির। সিঁড়িতে বসেছিলেন দুইজন লোকাল বাঙালি। এটা হল বিদ্যাময়ী মন্দির।
এই মন্দিরও বহু প্রাচীন ভিতরে কালী মূর্তি। প্রণাম করে বেরিয়ে আসি।
এরপর একজন রাণী ভবানী মন্দির শুনে বল্লেন-বুঝেছি, ‘আপনি যেটা খুঁজছেন সেটা হল তারা মন্দির। এই কাছেই।’ দুই কদম হেঁটে পৌঁছান গেল অভীষ্ট লক্ষ্যে। চৌকাঠ ডিঙিয়ে চত্বরে ঢুকে বুঝলাম ঠিক জায়গায় এসেছি, কারন অনিন্দ্যর ভিডিও ব্লগে উঠোনওয়ালা এই পাটকিলে রংএর বাড়ি দেখেছি।
দর্শকশূন্যমন্দিরে কি দেখব ভাবছি, এমন সময় নিস্তব্ধতা ভেঙে তিনজনের কথোপকথনের আওয়াজ পেলাম। একজন গুম্ফশশ্রুমন্ডিত দীর্ঘদেহী সাহেব, অন্য দুইজন কাপল, এরা বাঙ্গালী।
সাহেবের মুখে পরিষ্কার হিন্দি শুনে একটু অবাক হলাম। আরো অবাক হওয়ার পালা যখন শুনলাম উনি বেনারসের একজন গাইড, পঁচিশ বছর ধরে বেনারসে আছেন, হিন্দু ধর্মের প্রতি প্রবল আকর্ষণ জেরোমে (উনার নাম) কে সুদূর আমেরিকা থেকে টেনে এনেছে বেনারসে। অপরজন এক ইয়াং বাঙালি, কলকাতায় থাকেন, ইনিও হেরিটেজ ওয়াক করান। নাম বল্লেন রামানুজ । বলি “বেশ প্রাচীন ধরনের নাম তো! বাবা-মা জন্মের সময় বুঝে গিয়েছিলেন আপনার ভবিষ্যত, এপ্রোপ্রিয়েট নাম রেখেছিলেন। দুজনের কাছেই মোবাইল নম্বর নিই জেরোমের হল +91 97937 14111 আর রামানুজের +91 98305 79800. দুজনেই পন্ডিত লোক। শুনলাম ১৭৫২ সালে রাণী ভবানী দ্বারা নির্মিত এই মন্দির বেনারসে তন্ত্র সাধনার পীঠ হিসাবে পরিচিত। নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছিলেন দশমহাবিদ্যার একরূপ হল কালি ঠাকুর। এই রাণী ভবানী তৈরী মন্দিরে দুইটি কালীমূর্তি। ঘনকৃষ্ণবর্ন হলেন কালীমাতা অন্য নীলবর্ণা হলেন তারা মা।
বৌদ্ধধর্মেও তারা মা পূজিত হন। জেরোমে দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন একটি মূর্তিতে শিবঠাকুর পায়ের তলায় লম্বালম্বি রূপে শুয়ে, অন্যটিতে আড়াআড়ি। এরও নাকি শাস্ত্রমতে কিছু ইন্টারপ্রিটেশন আছে। আজকাল দেখছি কালীঠাকুর শাড়িপরিহিতা, আমাদের ছোটবেলায় সব কালী ঠাকুর মূর্তি নগ্নিকারূপে দেখতে অভ্যস্ত ছিলাম। তিনটি ব্লকে মাঝখানে চত্বরওয়ালা জায়গার চারটি দিকে উঠোনে ঘেরা ঘর। একটি ব্লকে মহিষাসুরমর্দিনীর অষ্টধাতুর মূর্তি দেখলাম।
পৌনে তিনশ বছর আগে এই মহল্লাকে কেন্দ্র করে সংস্কৃত পন্ডিতদের এক মহল্লা গড়ে উঠেছিল। সামনের বাঙালী দোকানদার দুঃখ করছিলেন, বেশীরভাগ বাঙালি বাড়ি বিক্রি হয়ে গিয়েছে। হোটেলে ফিরতে হবে। উনিই বুদ্ধি দিলেন ‘মেন রাস্তায় গিয়ে রিক্সা নেওয়ার থেকে, পাশের রাস্তা দিয়ে কিছুটা গেলেই পান্ডে ঘাট পড়বে। সেখান থেকে গঙ্গাকে বাঁহাতে রেখে বিভিন্ন ঘাট দেখতে দেখতে অসি ঘাটা পৌঁছান যাবে। মিনিট কুড়ির পথ। অভিজ্ঞতাটাও অন্যরকম হবে।
আজকাল গঙ্গার ঘাটগুলির ফেসলিফ্ট হয়েছে। সারাক্ষণ কর্মচারীরা ঝাড়ু লাগাচ্ছে,
এক ঘাট থেকে অন্য ঘাটে একই লেভেলে হেঁটে যাওয়া যায়, সিঁড়ি ভাঙতে হয় না। হরিশ্চন্দ্র ঘাটে দেখলাম মৃতদেহ সৎকার হচ্ছে।
দশাশ্বমেধ ঘাটের উত্তরে মনিকর্ণিকা ঘাটেও সৎকার হয়। গঙ্গার দীর্ঘ গতিপথে যে জায়গায় নদী উত্তরমুখী সেখানে মৃতদেহ সৎকার করলে স্বর্গপ্রাপ্তি হয়, এরকমটাই হিন্দুধর্মে উল্লেখ আছে। বিহারের কাহেলগাও এরকমই আরেকটি জায়গা। একটি ঘাটে দেখলাম ইয়াং ছেলে মেয়েরা ঘাটের ছবি আঁকছে।
এরা কাশী বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্ট ডিপার্টমেন্টের ছাত্র। অসিঘাট হয়ে হোটেলে পৌঁছাবার কিছু পরেই শিবু এসে হাজির। মালপত্র রূমে রেখে স্নান করে বেরিয়ে পড়া গেল। বেনারসে বিশ্বনাথ মন্দির দেখাটা অবশ্য কর্তব্য। সুগম দর্শনের অনলাইন টিকিট কাটা আছে। চারটের সময় ঢুকতে হবে।পদ্ধতি সব ভিডিও ব্লগে দেখে নিয়েছি।
রিক্সা করে গোধূলিয়া চলে এলাম। লাঞ্চ এখানেই কোথাও করব। ডালফ্রাই, পালকপনির দিয়ে ভালই খাওয়া হল।
কোয়ান্টিটি অনেকটা, পরে মনে হল একটা ডিশ নিলেই ভাল হত। মন্দিরের আশেপাশে সব ভেজ দোকান।
আমাদের মন্দিরের এন্ট্রি হবে চার নম্বর গেট দিয়ে। তার আগে অনলাইনের কাগজ আর আধার কার্ড দেখিয়ে এন্ট্রি পাশ নিলাম। একজন পুরোহিত এলেন আমাদের সঙ্গে।
দোকান থেকে আড়াইশ টাকা দিয়ে পুজোর ডালি নিলাম। ডালির মধ্যে ফুল-মালা, ভষ্ম, প্রসাদ ও কমন্ডলে দুধ, শিবের মাথায় ঢালার জন্য। পরে ডালি আর কমন্ডুল ফেরৎ দিতে হবে। মোবাইল ও জুতো রাখার জন্য মন্দির পরিসরে বন্দোবস্তো আছে। চার নম্বর গেট দিয়ে যে করিডোর তার পাশে জ্ঞানবাপী মসজিদ। মসজিদের অপরপ্রান্তে বিশ্বনাথ মন্দির।
বোঝার জন্য নেট থেকে নেওয়া একটা দ্রোনশট দিলাম। জ্ঞানবাপীর দেওয়াল ঘেঁষে সারি দিয়ে পুলিশ। সতর্ক দৃষ্টি কেউ যেন ফটো না নেয়। করিডোরের উল্টোদিকে কাশীর দর্শনীয় স্থানের লিস্ট। সেটার ফটো কেন নেওয়া যাবে না,বুঝলাম না। নেট খুললে যে হাজার ফটো আছে, সে আর কে বোঝাবে! রিনোভেশনের পর ভিতরের চত্বরটা বেশ বড়। ভক্তদের লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। সাধারন দর্শনার্থীদের আলাদা লাইন। পাশে একটা গলতা লাইন। এটা ভিআইপি লাইন। পুলিশ মাঝে মাঝে লোক ঢুকিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে আরেকটা লাইন। শুনলাম চারটে থেকে পাঁচটা স্থানীয়রা আধার কার্ড দেখিয়ে ঢুকতে পারেন। লাইন অল্পস্বল্প এগোচ্ছে। ডালি নিয়ে হাতে ব্যাথা হয়ে গেল। মন্দিরের তিনটি চুড়ো। বিশ্বনাথ মন্দির বেনারস
তার মধ্যে দুইটি সোনার পাতে মোড়া। এটা দান করেছিলেন মহারাজ রঞ্জিত সিং। আর মূল মন্দির তৈরী হয়েছিল ১৭৮০ সালে রাণী অহল্যাবাঈ হোলকার দ্বারা। মন্দির অবশ্য আরো প্রাচীন। মন্দির পরিসরে বাঁদর অনেক। তাদের খেলা দেখে সময় কাটাই। রামচন্দ্রের ভক্ত হওয়া সত্বেও এদের বাঁদরামি সামলায় কে। মাঝে মাঝেই লাফ মেরে বিধর্মীদের মসজিদে চলে যাচ্ছে। একটা বাঁদর একটি মেয়ের চুন্নি ছিনিয়ে নিয়ে গেল। দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণে ইনসপায়ার্ড মনে হল! এরপর লম্বা লাইনে সবাইকে ছেড়ে আমি বাঁদরের নেকনজরে পড়লাম। কিছু বোঝার আগেই ডালি থেকে কি একটা নিয়ে হাওয়া। হুটোপুটিতে দুধ কিছুটা গায়ে ছলকে পড়ল। দেখি সে যোগাড় করেছে ভষ্মের প্যাকেট। মন দিয়ে সেটাকে ছিঁড়ে ভষ্মটা মাটিতে ফেলল, কিছুটা গায়ে মাখল। মনে হল প্রভু রাম থেকে শিবঠাকুরে লয়ালিটি শিফ্ট করবে! পাঁচটার পর মূল মন্দিরে ঢোকা যাবে না, ঝাঁকি দর্শন করতে হবে, মানে গেটের বাইরে থেকে দেখা যাবে। আমাদের পুরুত করিতকর্মা, পাশে লোকাল লোকের লাইনে ঢুকিয়ে দিল, সেই লাইন কিছু ছোট। অবশেষে মহাদেবের সন্ধান মিলল। দুধ ঢেলে মালা চড়িয়ে দিলাম। দাঁড়ানোর অবকাশ নেই। মন্দিরের এক পূজারী একটা মালা তুলে গলায় পরিয়ে দিলেন। পরে শুনলাম কাউর কাউর ভাগ্য সুপ্রসন্ন থাকলে এরকমটা হয়ে থাকে। দেখা যাক ভবিষ্যতই বলবে কতটা কৃপাদৃষ্টি পেয়েছি। শুনেছিলাম আজকাল বাইরে পাইপে দুধ ঢালতে হয়, সেটা এসে শিবের মাথায় পড়ে। Photo - courtesy internet
আমরা কিন্তু সরাসরি শিবলিঙ্গের মাথায় দুধ ঢাললাম। বেরিয়ে এসে লকার থেকে মোবাইল ও জুতো নিয়ে একটু ফটো শেসন করলাম।
সুগম টিকিটে দর্শনের পর, অফিসে এসে টিকিট দেখিয়ে চারটে লাড্ডুওয়ালা প্রসাদ পাওয়া যায়। ওটা সুগমদর্শনের টিকিটের মধ্যে ইনক্লুডেড। অনেকেই এটা জানেন না। আমি ভিডিওতে দেখেছি বলে জানতাম।
এরপরের গন্তব্য দশাশ্বমেধ ঘাটের বিখ্যাত সান্ধ্যআরতি দর্শন। বিশ্বনাথ গলি থেকে আবার গোধূলিয়াতে এসে ঘাটের গলি ধরি।
রাস্তা আগের থেকে বেটার হলেও ভক্তসংখ্যা পাল্লা দিয়ে বর্ধিত। ফলে জনসমুদ্রের মধ্যে দিয়ে এগোই। আশেপাশের সব দোকানই হল শাড়ির। বেনারসি শাড়ি জগতবিখ্যাত। আরতিস্থল লোকে লোকারণ্য। ঘাটের সিঁড়ি ও গঙ্গাবক্ষে নৌকা, তার পিছনে বড় বোট, সবেতেই পিলপিল করছে লোক।
পিছনে মন্দিরের উপর ব্যালকনিতে চেয়ার পেতে বসার সুবন্দোবস্তো, অবশ্যই দক্ষিণাসহ। দেড়শ টাকা গচ্ছা দিয়ে ওখানেই আরাম করে বসি। গঙ্গা আরতি প্রথম হরিদ্বারে শুরু হয়েছিল। বেনারসে অনেক পরে।
সংস্কৃত মন্ত্র পাঠ কাসর ঘন্টা ও চামর দুলিয়ে আবাহনের পর আরতি হল। আধাঘন্টার প্রসেস।প্রাচীন ভারতের এক ভাইভ। তবে এত grandiose ও কোলাহল মন্ডিত অনুষ্ঠানের থেকে বাড়ির তুলসীমঞ্চে প্রদীপের নরম আলোয় শঙ্খ ও ঘন্টাধ্বনি আমাকে বেশী টানে চামর দুলিয়ে গঙ্গাদেবীকে ঘুম পাড়ান হল।আরতি শেষ দিকে সমাপ্ত হল জয় শ্রীরাম শ্লোগান ও অন্যান্য দেবদেবীর নামের মধ্যে দিয়ে । বেনোজলে শিব ঠাকুরের সঙ্গে সত্য সাঁইবাবাওর নামও ঢুকে পড়েছে!
উপর থেকে চেয়ারে বসে সুন্দর দেখতে পেলাম আরতি। নীচে নেমে দেখি ঘাটের চাতালে বসে ছাইভস্ম মাখা এক সাধুবাবা।
দক্ষিণা দিয়ে ঝাটার বাড়ির আশীর্বাদ নিই। আশীর্বাদ গৌন, ফটো তোলাটাই আসল!
একটা অটো ধরে ফিরে আসি হোটেলে।
মোবাইল দেখাচ্ছে ১৩ কিমি হেঁটে ফেলেছি। রাতে রুফটপ রেস্টুরেন্টে খিচুড়ি-জিরাআলু খেয়ে প্রথমদিনের বেনারস ভ্রমনের সমাপ্তি।






















































































অপূর্ব লিখিস তুই। অনেক কিছু জানলাম।
ReplyDelete