ত্রিবেনী তীর্থপথে ও আরো টিটবিট
ত্রিবেনী তীর্থপথে ও আরো টিটবিট
এবারের কুম্ভমেলা নাকি মহাকুম্ভ। ১৪৪ বছর পর হচ্ছে। হিসাব করে দেখলাম আমার ঠাকুর্দার তখনও জন্ম হয় নি।এরকম একটা মাহেন্দ্রক্ষণে মোক্ষলাভের আশা ত্যাগ করা যায় না। মাসখানেক আগে ট্রেনের টিকিট কাটা হয়েছে। ১১ই ফেব্রুয়ারি যাত্রা আর ১৪ তারিখ ফেরা। তবে দিনক্ষণ যত এগিয়ে আসছে, উৎসাহে ততই ভাটা পড়ছে। কয়েকদিন আগে মৌনী অমাবস্যাতে স্টাম্পেড হল। তীর্থে পুণ্যলাভের আশার ছলনে ভুলি কিছু শ্রদ্ধালু অমৃতকুম্ভের স্নানের বদলে অমৃতলোকে যাত্রা করলেন। কয়েকদিন ধরে টিভিতে দেখলাম ভীড় আগের থেকে বেশী, গাড়ীর জ্যাম রাস্তায় একশ কিমি ছাড়িয়েছে। রোড জ্যামের নূতন প্রতিশব্দ বেরিয়েছে, সেটা হল রোড এ্যরেস্ট। সব শুনে দোলাচলে আছি। টুবি অর নট টুবি। কুম্ভস্নানে পাপ ধুয়ে যাবে, মোক্ষলাভ হবে-এরকম একটা আশ্বাসবাণী শুনে আসছি। বিপক্ষে যুক্তি খাড়া করতে থাকি- পাপের বোঝা পিঠের দিকে থাকে, দেখা যায় না, তাই মনে প্রভাব পড়ে না, সুতরাং ধোলাইটা মাস্ট নয়। আর মোক্ষলাভ করতে যাব কেন, কবি তো বলেই গিয়েছেন “মরিতে চাহি না আমি এই সুন্দর ভুবনে”। আরো কিছু মানুষ্য জন্ম হলে ক্ষতি কি? এর আগে আমাদের পাশের সোসাইটির কাবেরীদি স্নান করে এসে ভাল ফিডব্যাক দিয়েছেন। আমাদের টিকিট মেলার শেষের দিকে। “আগে গেলে বাঘে খায়, পরে গেলে সোনা পায়”, এই প্রবাদবাক্য এযাত্রায় ফলল না। আমার সফরসঙ্গী অতীশদা বরাভয় দিলেন।
ইনি পুজো কমিটির প্রেসিডেন্ট হওয়ার সুবাদে সুপরিচিত, সবাই সম্ভ্রমও করে। কথায় কথায় জানালেন উনি উবেরের লয়াল কাস্টমার, তাই দুদিন আগে কি কারণে উবের বেশী টাকা কেটে নিয়েছিল, উনাকে খাতির করে তাই এককলমের খোঁচায় পুরো টাকা ফেরত দিয়েছে। আনোয়ার আমাদের সেক্টরে থাকে, সে গিয়েছে সস্ত্রীক। আনোয়ার রোজাও যেমন নিষ্ঠা ভরে পালন করে, দুর্গাপুজোতেও তার সমান উৎসাহ। দুই ধর্মের পুণ্যের যোগফলে ডাবল ধামাকা! ও গিয়েছে একদিন আগে আর আরেক পরিচিত দিনদুয়েক আগে গিয়েছে। তাদের আঁখো দেখা হাল শুনে মনে হল একটু টাফ কল হলেও, কুম্ভের অমোঘ আকর্ষণ উপেক্ষা করা উচিত নয়। যাওয়ার ট্রেন হল ভুবনেশ্বর রাজধানী। ট্রেন নিউ দিল্লি থেকে আড়াই ঘন্টা লেটে ছাড়ল।তীর্থযাত্রায় কষ্ট করার যে পরম্পরা হিন্দুধর্মে চলে আসছে, শুরুতেই তা টের পেলাম। এক সহযাত্রিনী, তার দুই ছেলে সহ। চলেছেন মহাকুম্ভে। এলেম আছে। একটি ছেলে কলেজে অন্যটি ক্লাস ফাইভে। ছোটটির দুই চোখে আবার মাইনাস সেভেন পয়েন্ট পাওয়ার। গাবলু-গোবলু ফর্সা মহিলা, মিষ্টি মুখে কথার ফুলঝুরি।
আলাপ জমে ওঠে।নবোদয় বিদ্যালয়ে ম্যাথস পড়াতেন শুনে বলি-“আপনাকে দেখে ম্যাথসের টিচার লাগে না, মনে হয় ইতিহাস কি হিন্দি পড়ান।” উনিশ বছর বয়েসে বিয়ে হয়েছিল। পড়াশুনায় উৎসাহ ও সহযোগিতার জন্য বরের থেকে শাশুড়ির ক্রেডিট দিলেন বেশী। সেন্ট্রাল স্কুল আর নবোদয়ের মধ্যে পার্থক্য জিজ্ঞাসা করায় বল্লেন, নবোদয় স্কুল তৈরী হয়েছিল গরীব পিছিয়ে পড়া ছাত্রদের জন্য, প্রত্যেক জেলাতে একটা করে আছে। দুইদিন আগে ঠিক করে তৎকালে টিকিট নিয়েছেন, তাও কানপুর পর্যন্ত। পরে আবার এই ট্রেনেই অন্য কোচে টিকিট নিয়েছেন কানপুর টু প্রয়াগরাজ। কানপুর আসবে বারটাতে, আর প্রয়াগরাজ সাড়ে তিনটেতে। উনার ফেরার টিকিট আগামীকাল গভীররাতে। দুদিন সারারাত জেগে, শাহী স্নানের জন্য কমসে কম দশ কিমি হেঁটে কি করে ম্যানেজ করবেন এই ভেবে আমি শংকিত। মনে মনে সুপার মমকে কুর্নিশ না জানিয়ে পারলাম না। মাঝরাস্তায় ফোন এল বসের কাছ থেকে। স্যার, স্যার করে বিগলিত হয়ে কথা বল্লেন। ফোন রেখে একগাল হাসি সঙ্গে স্বস্তির নিঃশ্বাসও।পরে শুনলাম কল্পনা ম্যাম স্কুলের চাকরী ছেড়ে এখন এক অয়েল ড্রিলিং কোম্পানির মালিকের পিএ। মাইনে বেশী, তাই স্কুলের চাকরী ছেড়েছেন। টিকিট কেটে বসের পারমিশন নিতে গিয়ে বকুনি খেয়েছেন, যখন বস যখন শুনেছেন, উনি দুই ছেলেকে নিয়ে একা যাওয়ার প্ল্যান করেছেন।
বস নিজে কয়েকদিন আগে একসপ্তাহ টেন্টে ছিলেন। ভিআইপি খাতিরদারি। স্টেশন থেকে টেন্ট আসার সময় গাড়ির সামনের সীটে কোন আখড়ার এক মোহান্তকে নিয়ে নিয়েছিলেন।তীর্থক্ষেত্রে গেরুয়ার মাহাত্ব্যই আলাদা। কোথাও পুলিশ আটকায় নি। এসব ব্যাপারে ভারতীয়দের “যোগাড়ু টেকনিক”এর জবাব নেই। আমাদের সেক্টরের এক চেনা জুনিয়ার ছেলে বাসে করে কিছু পরিচিতকে নিয়ে গিয়েছিল। ফিডব্যাকে জানা গেল শহরের ভিতরে বাস ঢোকাতে অসুবিধা হয় নি। কারণ সঙ্গে ছিল মোক্ষম দাওয়াই-“বিয়ের কার্ড”। একটা কার্ড ছাপিয়ে নিয়েছিল। সেটাই ভিআইপি পাশের কাজ করেছে। জেনেশুনে কে আর বিয়ের কনেকে লগ্নভ্রষ্টা হতে দেয়।
কল্পনা ম্যাডামের বস, যিনি মাঝারি সাইজের কোম্পানির মালিক, কল্পনার কাছে ফাদার ফিগার। তিনি মানা করেছেন, তাই দ্বিধায় মন দোদুল্যমান। এরকম ক্ষেত্রে কল্পনার ছোটবেলা থেকে অভ্যাস “রামশলাকা প্রশ্নাবলী”র সাহায্য নেওয়া। ব্যাপারটা আমার কাছে বেশ ইন্টারেস্টিং লাগল। কল্পনা তুলসীদাস লিখিত রামচরিতমানসের ভক্ত। রোজই কিছুটা করে পাঠ করেন। তাতে সারাদিনের ক্লান্তি দূর হয়। আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন পড়েছি কিনা। ছোটবেলায় খালি ছবিতে রামায়ণ পড়েছি। দুঃখের সঙ্গে জানাতে বাধ্য হই যে রামায়ণ সম্বন্ধে আমার জ্ঞান সীমিত। খালি ট্রাভেল ভ্লগের কল্যাণে জানি তুলসীদাস জন্মস্থান মন্দির আছে বেনারসের তুলসীদাস ঘাটে। সেখানে পাঁচশ বছর আগে রচিত এই বিখ্যাত গ্রন্থের অরিজিনাল পান্ডুলিপি রাখা আছে। কল্পনা জানালেন যে তিনি অবশ্য বসের মানা শোনেন নি। ছোটবেলা থেকে সঙ্কটকালে দিশাহীনের দিশারী এই রামশলাকার সাহায্য নিয়েছেন। ১০০ পারসেন্ট সাকসেস। বসের নারাজির সমস্যার হাল করতে রামশলাকা করেছিলেন। উত্তরটা আসে রামচরিতমানসে লেখা “চৌপাই”এর মাধ্যমে। চৌপাই কি সেটাও জিজ্ঞাসা করতে হল, যদিও একটু লজ্জা লাগছিল। কুম্ভস্নানে আসছি অথচ বেসিক ধর্মজ্ঞানে অজ্ঞ, লজ্জা পাওয়ার কথা। কল্পনার কাছে জানলাম রামচরিতমানস লেখা হয়েছে চারটি করে লাইনে ছন্দ সহকারে লেখার সমষ্টি নিয়ে। এই দুই লাইন হল চৌপাই। এরপর রামশলাকার পদ্ধতি ডিটেলে জানলাম। আজকাল মোবাইলের সাহায্যেই করা যায়। একটা পয়েন্টার নিয়ে রামশলাকার যে ১৫X১৫র ছক কাটা আছে, সেটার উপর বুলাতে বুলাতে রামশরনং বলতে বলতে যেখানে পয়েন্টার স্থির হবে, সেই অক্ষর ও প্রতি নয় ছক পরপর অক্ষর সাজিয়ে উত্তর পাওয়া যাবে কোন একটি চৌপাইের চার লাইন। এই উত্তরে পাশের যুবক সহযাত্রীটির বয়স ২৬। সে খুব উৎসাহিত হয়ে পড়ল। জাহাজে চাকরী করছে চার বছর। নয়মাস ট্রেনিংএর পর এখন ফার্স্টমেটের সিলেকশন হয়ে দিল্লিতে মেডিক্যাল টেস্ট করিয়ে কানপুরে বাড়ী ফিরছে।
নেক্সট ভয়েজ ছয় মাসের কেমন যাবে সেটা তাকে জানতে হবে। কল্পনার সাহায্যে গননা করে জান গেল “বহুত বড়িয়া”। ছেলেটি খুশ হয়ে কল্পনাকে ঢিপ করে একটা প্রনাম ঠুকে দিল। ছেলেটির নাম বিজয়। তার সঙ্গেও গল্প হল। এর আগের জাহাজ যাত্রা ছিল তেলের ট্যাংকারে। খুব বড় তেলবাহী জাহাজ হল সুপারম্যাক্স। সৌদি আরবিয়া থেকে তেল ভরে এটল্যান্টিক পাড়ি দিয়েছিল। সৌদি আরবের পোর্টে সারি দিয়ে জাহাজ দাঁড়িয়ে। জাহাজের খোলে তেল ভরার তিনটে ইনলেট। বিনয় বল্ল এতবড় ট্যাঙ্কারকে কোন রেয়াত করে না সৌদিতে। তিনটে ইনলেট দিয়ে একসঙ্গে তেল ভরে যখন তখন জাহাজে তুমুল ভাইব্রেশন হতে থাকে। তেল ভরেই তাড়াতাড়ি বেরোতে হয়, কারন জাহাজের সারি তেল ভরার জন্য। সাধে কি আর সৌদি রয়াল ফ্যামিলি এত রিচ।বিনয়ের কাজ হল নেভিগেশন প্ল্যান বানানো। ছোটবেলায় ভূগোলে পড়েছি প্যাসিফিক ওশেন শান্ত, সেই থেকে নাম প্যাসিফিক।বিনয় বল্ল এ্যটলান্টিকের থেকে প্রশান্ত মহাসাগরে জাহাজ চালানো বেশী চ্যালেঞ্জিং।
কানপুর স্টেশনে দেখলাম লোকে লোকারণ্য।
প্রয়াগরাজ স্টেশনে কি অবস্থা হবে তাই ভেবে শঙ্কিত আছি। ট্রেন পৌঁছাল সাড়ে তিনটেতে।
বেশ ভীড়। আমাদের পরের কম্পার্টমেন্টে হই হই করে জনতা উঠছে। তাঁদের দেখে এসি ক্লাসের টিকিট আছে বলে মনে হয় না।
পুলিশের উপস্থিতি লক্ষণীয়। আগত যাত্রীদের জন্য নানারকম ঘোষনা চলছে মাইকে। আগেকার সময় আমাদের তীর্থযাত্রী বলা হত, প্রয়াগরাজে বলা হচ্ছে শ্রদ্ধালু। শ্রদ্ধার সঙ্গে আলুর মিশ্রণ। বাঙ্গালী যাত্রীরা খুশী হবেন। আলুর সঙ্গে আমাদের সুসম্পর্ক। বিরিয়ানিতেও আমরা আলু খেয়ে থাকি।স্টেশন থেকে বেরিয়ে হন্টন।
গাড়ী পার্কিংএর বিশাল চত্বরে অসংখ্যযাত্রী গভীরঘুমে আচ্ছন্ন। আগেই শুনেছিলাম স্টেশনের ধারেকাছে কোন ভেহিকলের এন্ট্রি নেই। জনস্রোতে গা ভাসিয়ে দিলাম।ওয়েদার একদম এয়ারকনডিশনড। চাকা লাগানো সুটকেস বইতেও অসুবিধা নেই।
আধা কিলোমিটার হাঁটার পর একটা টার্নে লেখা সঙ্গমের রাস্তা। এত রাতেও অনেক পুলিশ। আমাদের যেতে হবে সোজা। গুগল ম্যাপে দেখেছি স্টেশন থেকে সাত কিমি দূরে ঝালোয়া নামক মহল্লাতে আমাদের তেল কোম্পানির গেস্টহাউস, যেটা আমাদের পরবর্তী তিনদিনের ঠিকানা। প্রয়াগরাজে পদার্পনের পর থেকে বুঝতে পারছি পদযুগলের উপর সামনের তিনদিন ভালই চাপ পড়বে। এত রাতে গাড়ী-ঘোড়ার টিকি দেখছি না। আরো কিছুটা যেতেই এক বাইকওয়ালা হাজির। কাবেরীদির মুখে শুনেছিলাম কুম্ভের এই সময়টাতে লোকাল বাইক যাতায়তের বড় সাধন। বাইকওয়ালা ছেলেটির হিম্মত আছে। সে হাজারটাকায় আমাদের দুইজনকে নিয়ে যাবে। সুটকেস নিয়ে কি করে যে দুইজন বসব ভেবে পাচ্ছি না। এর আগে নয়ডা থেকে এক গাড়ির ড্রাইভারের সঙ্গে কথা হয়েছিল। সে বলেছিল সাড়ে তিনহাজার টাকা নেবে। নূতন জায়গা, তার উপর কয়েকদিন টিভির নিউজে নানা রকম কনফ্লিকটিং নিউজ-কেউ বলছেন রাস্তায় একশ কিলোমিটার জ্যাম , কাউর কথা অনুযায়ী ঘন্টার পর ঘন্টা হাঁটাতে হচ্ছে, কেউ বলছেন মহাদেবের আশীর্বাদে কুম্ভস্নান বিশেষ ঝামেলা ছাড়াই সুচারুভাবে হয়েছে। হাজার টাকা শুনে ঠেলে ঠুলে উঠে পড়ি। তীর্থস্থানে এসেছি, কষ্ট সহ্য করা বিধিলিপি। বাইকওয়ালার হ্যান্ডেল টলটলয়মান। হাজার টাকার লোভে না এ্যকসিডেন্ট করে। বেচারা নিজেও কনফিডেন্স লুজ করছে। বেশ কিছুটা এগিয়ে দেখি কয়েকটা টুকটুক ব্যাটারি গাড়ী। তাদেরই একটাকে পাকড়াও করি। সে আমাদের সুন্দরভাবে মাত্র চারশ টাকায় পৌঁছে দিল। সাড়ে তিন হাজার থেকে চারশতে অধঃগমন। মনটা বেশ প্রসন্ন। “টাকা মাটি - মাটি টাকায়” আমি বিশ্বাসী নই।
টাউনশিপটা বেশ ছিমছাম, পরিচ্ছন্ন। জনা পঞ্চাশ কোয়ার্টার পাঁচিল দিয়ে ঘেরা।পাঁচিলেতেল কোম্পানির নানা বিজ্ঞাপন।
একটা কোয়ার্টারকে গেস্টহাউস বানান হয়েছে। দুই বেডরুমের একটাতে আমাদের ঠিকানা। নো ফ্রিল এরেঞ্জমেন্ট। দুটো ক্যাম্পকটে এক ইঞ্চির গদ্দা, টেবিল-চেয়ার নেই, তবে এ্যটাচড বাথ আছে। পাশের কোয়ার্টারে কিচেন ও খাওয়ার ব্যবস্থা।
অতীশদার অবশ্য এরকম অনাড়ম্বর আয়োজন নাপসন্দ। চিরকাল কোম্পানির ফাইভস্টার ক্যাটাগরির গেস্ট হাউসে থেকেছেন। উনাকে বোঝাতে থাকি - আমরা এখন পিলগ্রিম ক্যাটাগরির লোক, গ্রিম রিয়েলিটিকে মেনে নিয় কষ্ট করার জন্য তৈরী থাকুন। উনি অবশ্য দমে যাওয়ার পাত্র নন, সব রকম “সোর্স”কে ট্যাপ করতে লাগলেন যাতে নিদেন পক্ষে দুটো আলাদা রুম পাওয়া যায় নতুবা এদের অরিজিনাল গেস্টহাউস যেটা এদের অফিসের পাশে (দুই কিমি দূরে) সেখানে রুম পাওয়া যায়। ব্রেকফাস্ট করে সেই গেস্টহাউস দেখতে যাওয়া হল। কুম্ভস্নানের থেকে রাজসিক উপায়ে থাকার উপর জোর বেশী। আমি অবশ্য এসব জায়গায় “ভোজনং যত্রতত্র-শয়নং হট্টমন্দির“এ পন্থায় বিশ্বাসী। লঙ্গরে খাওয়ার ইচ্ছে ছিল, তবে মৌনী অমাবস্যা ও তারপর বসন্ত পঞ্চমীর শাহী স্নানের পর অনেক আখড়া বন্ধ হয়ে গিয়েছে, তাই আমার সে সাধ পূর্ণ হয় নি।
আজ হল মাঘী পূর্ণিমার শাহী স্নান। মক্কা-মদিনাতে হজ করে এলে যেরকম সন্মান এখানে কুম্ভস্নান, তাও আবার বিশেষ তিথিতে শাহী স্নান করলে বন্ধু বা আত্মীয় মহলে বেশ সমাদৃত হওয়া যায়। আমি ও অতীশদা যে বিশাল ঈশ্বরবিশ্বাসী তা মোটেই নয়। আসার আগে দুইজনে ডিসকাস করছিলাম বার তারিখ মাঘী পূর্ণিমার শাহী স্নানে যাব না, ১৩ তারিখ ভীড় অপেক্ষাকৃত কম হলে তখন যাব। প্রয়াগরাজে আশা ইস্তক আজ বার তারিখে যাবার ইচ্ছে প্রবলতর হচ্ছে, অদৃশ্য শক্তির হাত না এ্যডভেঞ্চারের নেশা সেটা বুঝছি না।
সকালে যাত্রা শুরুর আগে টাউনশিপের ওপেন জিমে একটু এক্সারসাইজ করে নিলাম। হাতে পায়ে জং ধরে গিয়েছে। জয়েন্টগুলোকে সচল করে অতীশদার সঙ্গে আমার জয়েন্ট ভেঞ্চারের শুরুবাত। এখান থেকে গুগল ম্যাপে ১৩ কিমি দেখাচ্ছে। কি ভাবে যেতে হবে জানা নেই। লোকজন জানাল শেয়ার টোটোতে জংশন স্টেশন, অর্থাৎ যেখান থেকে কাল এসেছিলাম, সেখানে যেতে, ওখান থেকে অন্যকিছু পাওয়া যাবে। শেয়ার টোটোতে নেমে আবার সেই হাঁটা পথ, বিশাল উঁচু এক পাথরের পাঁচিলের পাশ দিয়ে যাচ্ছি,
হঠাৎই একটা গেট চোখে পড়ল লেখা খুসরু বাগ। সুমিতা আসার সময় বলে দিয়েছিল সময় করে যেন খুশরু বাগ অতি অবশ্যই দেখি। এ তো মেঘ না চাইতেই জল! কালবিলম্ব না করে ঢুকে পড়ি। অতীশদা গাইগুই করছিলেন, সঙ্গমের বদলে এসব জায়গাতে সময় নষ্ট করছি দেখে। এইসব সময় দুই কান খোলা রাখি!
বিশাল পরিধি নিয়ে এই বাগান। পাঠক-পাঠিকা, ক্ষমা করবেন কুম্ভে ডুবকির বদলে ইতিহাসে ডুবকির জন্য। মুঘল সম্রাজ্যের এক করুণ অধ্যায়ের সাক্ষী এই খুসরু বাগ।
সম্রাট আকবরের হাতেই এলাহাবাদ বা অধুনা প্রয়াগরাজের গোড়াপত্তন। প্রাচীন নগরীর ত্রিবেণী সঙ্গমস্থলেই রয়েছে মুঘল সম্রাট আকবর নির্মিত কেল্লা, যা পরিচিত আকবর ফোর্ট নামে।
আকবরের নাতি, জাহাঙ্গীর ও তার প্রথম পত্নী শাহ বেগমের প্রথম সন্তান খুসরু মির্জার জন্ম লাহোরে ১৫৮৭ সালে। তিনি ছিলেন আকবরের আদরের নাতি। সহজাত যুদ্ধবিদ্যার সঙ্গে যুক্ত ছিল তার বিদ্যার প্রতিভা-আরবী, ফারসী, টার্কিশ, উর্দু, হিন্দি সহ অনেক ভাষা জানতেন। বেশ কয়েকটি কবিতার বই সহ গিয়াসউদ্দিন তুঘলকের জীবনী লিখেছেন। কিন্তু পিতা জাহাঙ্গীররের সঙ্গে সুসম্পর্ক ছিল না। বাবা-ছেলের এই সম্পর্কের টানাপোড়েনের জেরে মা শাহ বেগম ১৬০৫ সালে আত্মহত্যা করেন। তারও সমাধি আছে এই খুসরু বাগে। ১৬০৫ সালে জাহাঙ্গীর মোঘল সম্রাট হন আর এক বছরের মধ্যে ১৬০৬ সালে সিংহাসনের দাবীদার হয়ে পিতা জাহাঙ্গীরের সঙ্গে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন খুসরু। ইতিহাসবিদরা বলেন এই ষড়যন্ত্রের মূল কান্ডারীরা ছিলেন জাহাঙ্গীরের সভাসদ, যারা খুসরুকে নেতা বানিয়ে এই রেবেলিয়ানের সূত্রপাত করেন। বিদ্রোহীদের নিয়ে খুসরু আগ্রা থেকে পালিয়ে যান। পানিপথের যুদ্ধে হেরে গেলে তাকে বন্দী করে আগ্রা নিয়ে আসা হয়। মাত্র উনিশ বছর বয়সে জাহাঙ্গীরের নির্দেশে তাকে অন্ধ করে দেওয়া হয়, যাতে আর কখনো সিংহাসনের দাবীদার না হতে পারেন। এই ঘটনা প্রমাণ করে গদীর লড়াইয়ে শাহি খানদানের ভিতরের কত তীব্র প্রতিযোগিতা চলত। এরপর ১৬২২ সালে তার মৃত্যু পর্যন্ত খুসরুর জীবন কাটে এলাহাবাদের এই খুসরু বাগে। খুসরুর কবরও এখানে আছে। এর পাশে আছে জাহাঙ্গীররের কন্যা নিঠার বেগমের সমাধি।
খুসরু বাগের সুবিশাল গেটের মধ্যে দিয়ে ভিতরে ঢুকি। রাস্তায় পুণ্যার্থীর ঢল ছেড়ে ভিতরের সবুজ গাছ-গাছালির মধ্যে যেন এক অন্য জগত। বিশাল বাগানের শুরুতে বড় করে টেন্ট বানানো, যাতে শ্রদ্ধালুরা বিশ্রাম নিতে পারেন। ভীড় নেই, ছড়িয়ে ছিটিয়ে কিছু লোক। বাগান ছাড়িয়ে কবরের মর্মরসৌধের কাছে পৌঁছাই।
মাঝের তিনতল বিশিষ্ট কবরটি হল শাহ বেগমের।লক্ষ্য করি দূরের দুটি সমাধির উপরিভাগ মুঘল স্থাপত্যের রীতি অনুযায়ী গম্বুজাকৃত, কিন্তু শাহ বেগমের সমাধির মাথায় ছত্রী আছে। শাহ বেগমের আসল নাম মান বাঈ, তখনকার দিনে মুঘল-রাজপুত বিয়ে, সম্রাজ্য কনসোলিডেশনের অঙ্গ ছিল। সেইজন্য সৌধটির উপরিভাগ রাজস্থানী ছত্রি স্টাইলে তৈরী। তিনটি টুম্বের মধ্যে স্থাপত্যের দিক দিয়ে সবচেয়ে সুন্দর হল নিঠার বেগমের সমাধি।
মুঘল আমলের অন্য স্থাপত্যের মত এখানেও চারবাগ স্টাইলে গার্ডেন আছে। দিল্লি বা আগ্রার মুঘল স্থাপত্যও রেড স্যান্ডস্টোনের, যা আসত রাজস্থান থেকে। এলাহবাদ থেকে রাজস্থান বহ দূর। এই প্রশ্নের উত্তর পেতে কোপাইলট-এর হেল্প নিলাম। জানা গেল এই পাথর খাজুরাহোর কাছে বিন্ধ্যপর্বতেও আছে এবং সেখান থেকেই এসেছে।
ফিরে আসি বর্তমানে। বেশ কিছু সঙ্গমযাত্রী উল্টোদিকের রাস্তা দিয়ে ফিরছে। তারা জানাল আমরা যেদিক দিয়ে প্রবেশ করেছি, তার উল্টোদিকে আরেকটা এনট্রেন্স রয়েছে।
সেটাই খুসরু বাগের প্রধান ফটক। সেখান দিয়ে বেরিয়ে একটু গেলে খুল্লাবাদ পড়বে। ওখান থেকে টোটো পাওয়া যাবে রামবাগ অব্দি। সেখানে আবার পুলিশের ব্যারিয়ার। সেখানে কিছুটা পায়ে হেঁটে আবার বাইক বা টোটো পাওয়া যাবে। টোটো চালকের বাড়ী রামবাগে। সে বাড়ী যাচ্ছে খেতে। বড় রাস্তার মাঝে বেশ কিছু ক্রসিংএ পুলিশের ব্যারিয়ার।
কাতারে কাতারে লোক চলেছে সঙ্গমে। বেশীরভাগ মহিলার মাথায় ছোট বোঁচকা। টোটোচালক পুলিশের ব্যারিয়ারে বাধা পেয়ে এই গলি সেই গলি পেরিয়ে নিয়ে এল রামবাগ স্টেশনের কাছে। সেখান থেকে আরেকটা টোটো পেলাম। আশেপাশের ভূগোল সম্বন্ধে অজ্ঞ। গুগল ম্যাপও যে খুটিয়ে দেখে স্থির করব ঠিক কোথায় নামব, তাও বুঝছি না। সঙ্গমে যাব এটাই বলছি। মোটামুটি যা বোঝা গেল, পুলিশ তাদের উপরিওয়ালাদের নির্দেশে জায়গায় জায়গায় ব্যারিয়ার করে গাড়ী চলাচলের আইল্যান্ড তৈরী করেছে। পায়ে হেঁটে যাওয়াতে বিশেষ রেস্ট্রিকশন নেই। তবে তারা যাতে একই রাস্তায় চলে সেরকম আইডিয়াতে কিছু রাস্তাই খোলা। সঙ্গম বলে দুই-এক জায়গাতে এ্যরো লাগানো ছাড়া জায়গাটা বোঝানোর কোন ম্যাপ নেই। সাইন্সে যেমন কিছু কিছু assumption থাকে, এখানেও সরকার বাই ডিফল্ট ধরে নিয়েছে, যারা আসছেন, সবাই ফিজ্যিকালি প্রচন্ড রকম ফিট, সবাই আনপড়, ভেড়ার পালের মত সবাই যেদিকে চলেছে, সেও সেদিকে মুখ বুজে চলবে সঙ্গমে স্নান করে তৃপ্ত হয়ে ফিরে যাবে। অন্য একটা শ্রেনী হল ভিআইপি তকমাধারী, একজন্য ভিআইপি হতে হবে না, চেনা কোন উচ্চপদস্থ কর্মচারী হলে তার থ্রু দিয়ে পাশ যোগাড় করলে কেল্লা ফতে, একদম গাড়ী নিয়ে ভিআইপি ঘাটে গিয়ে নৌকা করে মাঝগঙ্গাতে গিয়ে কুম্ভস্নানের সৌভাগ্য।
রামবাগ থেকে যে টোটো আমাদের নিয়ে এল সে যেখানে ছাড়ল সেখানে থেকে হেঁটে একটু এগোতেই এক বাইকওয়ালা বল্ল ওদিকের রাস্তা বন্ধ, উল্টোদিকে যেতে হবে। সে আমাদের কিছুটা নিয়ে এসে যেখানে ছাড়ল,
তার পাশ দিয়ে দলে দলে লোক চলেছে। বাইকওয়ালা জানাল, একটু এগোলেই বড় রাস্তা আসবে, সেখান থেকে একটু এগোলেই সঙ্গমে যাওয়ার রাস্তা। পায়ে চলা কাঁচা রাস্তায় ধুলো উড়ছে। বেশ এ্যডভেঞ্চার লাগছে। দুইশ মিটার গিয়ে হাইওয়ে দেখলাম, এটা রেওয়া বাইপাস, কিন্তু পুরো রাস্তার ধারে জালি দেওয়া লোহার বেড়া। সহযাত্রীরা সবাই দেহাতী। আমরা কাকের দলে ময়ূর।
দশ ফিট উঁচু লোহার বেড়াতে হাচোর-পাচোর করে উঠে লাফ মেরে নামছে। ষাটোর্ধ বয়েসে আমার দ্বারা সম্ভব নয়।
গঙ্গা ক্রস করেছে। যেখানে আছি তার কিছুটা দক্ষিণে হল ত্রিবেণী সঙ্গম। রাস্তাটা উত্তরদিকে গিয়েছে। আজ দুপুরে বেশ গরম। জনসমুদ্রে তাল মিলিয়ে চলি। এগারটায় বেরিয়েছি গেস্ট হাউস থেকে। দেড়টা নাগাদ পৌঁছলাম একটা গেটের কাছে। দিক নির্দেশের কোন ব্যবস্থা নেই। সঙ্গম কোন দিকে বুঝতে পারছি না।
ফিরে এসে টিভি কভারেজ দেখে বুঝলাম, মৌনী অমবস্যার স্টাম্পেডের পর মূল সঙ্গম ছাড়াও উত্তর দিকে গঙ্গার দুইপাড়ে ঘাট বানিয়ে সঙ্গম লিখে দেওয়া হয়েছে, যাতে লোকে এক জায়গাতে ভীড় না করে। পিলপিল করে লোক চলেছে।
এদের সঙ্গেই এগোই।এখন অব্দি নদীর দেখা পাই নি। জলের ফ্রি ভেন্ডিং মেশিন থেকে বোতলে জল ভরি। একবার বোতাম টিপলে এক লিটার বেরোয়। মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে শশা দিয়ে ফলাহার। মনকে প্রবোধ দিই, তীর্থযাত্রার ফললাভ করতে ফলপ্রসাদ বিধেয়। কৃচ্ছসাধনের চূড়ান্ত। টিভিতে দেখেছি অনেক জায়গাতে লঙ্গর আছে, পাবলিক খুব খাচ্ছে। আমাদের কপালে সেরকম কিছু জুটল না। রাস্তাটা সরু হয়ে কিছুটা স্লোপ ধরে উপরে উঠেছে। পুরো জনসমুদ্র। ওখানে পৌঁছে গঙ্গা মাইএর দর্শন পাওয়া গেল।
রব উঠেছে- হর হর মহাদেব। আমিও গলা মেলাই। ঠিক বামদিকে জিটি রোডের পিলার। কুম্ভমেলা উপলক্ষে পিলারের গায়ে নানা দেবদেবীর মূর্তির ছবি। ডানদিকে হল দক্ষিণ, তিন কিমি গেলে একদম সঙ্গমের কোর এরিয়া, যেখানে পশ্চিমদিক থেকে যমুনা এসে মিশেছে। সামনে গঙ্গার উপর সারি দিয়ে পন্টুন ব্রীজ। এদের হিন্দি নাম হল পিপা পুল। নদীর দুই পারেই বালির ব্যাগ ফেলে ঘাটের ব্যবস্থা। পাড়ের থেকে কিছুটা নদীর অংশ বাদ দিয়ে ব্যারিয়ার করা। সতর্কতামূলক ব্যবস্থা। ওইটুকু অংশের মধ্যে স্নানের ব্যবস্থা। টিভিতে সবাই দেখে থাকবেন আমরা ঠিক করলাম পন্টুন ব্রীজ দিয়ে ওপারে গিয়ে শাহি স্নান করব। আজ বার তারিখ। মাঘী পূর্ণিমার শাহি স্নান। ১৩ই জানুয়ারি মহাকুম্ভ শুরু আর শেষ হবে ছাব্বিশ ফেব্রুয়ারি। এর মধ্যে পাঁচটি দিন বিশেষ স্নানের ডেট, মাঘী পূর্ণিমা তার একটি। পন্টুন পেরিয়ে বায়ে ঘুরতেই দেখি জটলা। উটের উপর এক নাগা সাধুবাবা। হাতে ময়ূরপুচ্ছের গোছা। মহিলার ভক্তিভরে প্রণাম করে হাতে গুঁজে দিচ্ছে প্রণামী। ইউনিক দৃশ্য।
সেলফি তো বনতা হ্যায়। এক জায়গায় আবার ক্ষৌরকর্ম চলছে। সনাতন পদ্ধতিতে ভক্তরা স্নানের আগে এটা করেন। বিদেশী ফটোগ্রাফার তার ফটো নিতে ব্যস্ত।
ঘাটের সামনের দিকটাতে বেশ কিছুটা অংশ খড় পাতা, যাতে জলে ভেজা বালিতে অসুবিধা না হয়। আসার সময় স্নানটা মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল না, সব পাপ ধুয়ে সঞ্চিত পুণ্যের ভান্ডাব বাড়িয়ে মোক্ষলাভের আশা করি নি, এসেছি এই মহা আয়োজনের অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের উদ্দেশে, প্রতিটি প্রদেশ থেকে অসংখ্য উদ্বেলিত ভক্তের সমাগমে মুখরিত প্রাঙ্গণকে চাক্ষুষ করতে, সুবিশাল জনসমুদ্রের জোয়ারে নিজেকে ভাসিয়ে দিতে। স্নানটা আমার কাছে বাইপ্রোডাক্ট। মানুষ যে কারণে ভগবানের দুয়ারে যায়, সেটা মুখ্যত পরিবারের সুখ-সমৃদ্ধি ও সন্তানের রক্ষা ও শ্রীবৃদ্ধির জন্য। কুম্ভস্নানের চাওয়াটা নিজেকে ঘিরে, সর্বপাপহরণ করে নিজের মোক্ষলাভ। তবে আড়াই ঘন্টা হেঁটে ক্লান্ত শরীরে মনে হল এই স্নান যেন অলক্ষ্যে মনের কোণে টার্গেট হয়ে ছিল, যা হয়ত আমার জাগতিক মননে এতক্ষণ প্রতিভাত হয় নি।
ঠান্ডা জলে বেশ কিছুক্ষণ স্নান করে শরীর তো জুড়াল, মনেও এক প্রশান্তি এল যে এই মহাযজ্ঞে ক্ষুদ্র আমিও আংশীদার হয়েছি। নিজের অভিজ্ঞতা তো হলই, সঙ্গে এটাও মনে এল যে আমার পরবর্তী প্রজন্ম মনে রাখবে আমার এই পুণ্যকর্ম। স্নান করে উঠে দেখি এক খালি চৌকি। কপালে টিকা লাগিয়ে ক্লান্ত শরীরকে বিশ্রাম দিই। দূরে ব্রীজের উপর দিয়ে মাঝে মাঝে শব্দ করে ট্রেন যাচ্ছে। আধাঘন্টা পরে উঠে এগিয়ে যাই। আমাদের একদিন আগে পাড়ার আনোয়ার এসেছে সস্ত্রীক। ওরা উঠেছে টেন্টে। নাগা সন্নাসীর ফটো পাঠিয়েছিল। আমার থেকে আমার সফরসঙ্গীর নাগা সন্নাসীর উপর বেশী কৌতূহল। কপাল সুপ্রসন্ন। রাস্তার দুইদিকে ছোট ছোট তাঁবুতে আছেন তারা।
একজন চারটে ইটের উপর একপায়ে খাড়া। তাঁর পাশে আরেক নাগা সন্ন্যাসী ধুনি জ্বেলে বসেছেন। তবে ভক্তরা সবাই দন্ডায়মান নাগাবাবার প্রতি আকর্ষিত হচ্ছে। সব ভক্ত প্রণাম করে টাকা দিয়ে সেলফি তুলছে। আমিও দশটা টাকা দিয়ে প্রণামের পোস দিই। ফটো তুলতে সঙ্গী একটু সময় নিয়ে গোটা কয়েক ফটো বিভিন্ন এ্যঙ্গেলে নিচ্ছিল। নাগাবাবা চেঁচিয়ে ওঠেন- বেটা শরূপিয়া দেনা পড়েগা। ঝাড়ুর বাড়িটা পিঠে জোরেই পড়ে। তাড়াতাড়ি পিঠটান দিই।
কাছাকাছি দুই একটা রাস্তা ধরে ঘুরি। বিভিন্ন আখড়ার সাধুদের আস্তানা। তবে শুনলাম আখড়াগুলো আছে, মৌনী অমাবস্যা ও বসন্ত পঞ্চমীর শাহি স্নানের পর অনেক সাধু চলে গিয়েছেন। পাঁচটা বাজে। অন্য আরেকটা পন্টুন ব্রীজ দিয়ে ফেরত এসে দক্ষিণে সঙ্গমের দিকে যাই।
হনুমান মন্দিরের বাইরে মূল গর্ভগৃহের ছবি স্ক্রিনে ডিসপ্লে হচ্ছে। দুইজন মহিলা রাস্তাতেই শুয়ে পড়ে প্রণাম করে নিলেন।
হিন্দুধর্মে গরুও পবিত্র মানা হয়। এক বকনা বাছুরকে মালা পরিয়ে সামনের প্রণামীর থালা রাখা।
হনুমান মন্দিরে বিশাল লাইন। শুনলাম তিন-চার ঘন্টা লাগছে দর্শন করতে। ফেরত যাওয়ার ব্যাপারটা ধাতস্ত হতে সময় লাগল। চুঙ্গী বলে একটি জায়গায় গেলে ট্রান্সপোর্ট পাওয়া যাবে। এখানে কিছু বাইক চলছে। তারা একশ টাকা করে নিয়ে দেড় কিমি দূরে পৌঁছে দিচ্ছে। সেখান থেকে কিলোমিটার খানেক হেঁটে ফ্লাইওভারের তলা দিয়ে চুঙ্গীর মোড়। ওখান থেকে বাইক পাওয়া গেল। ওখান থেকে ঝালোয়াতে আমাদের গেষ্ট হাউস ১১/১২ কিমি। চারশ টাকা করে দিয়ে বাইকে করে ফিরলাম। জংশন স্টেশনের দিকে কাতারে কাতারে লোক চলেছে। অনেক রাস্তায় ব্যারিয়ার করে আটকানো।
এতে যে কি ম্যানেন্জমেন্ট হচ্ছে কে জানে, মিসম্যানেজমেন্ট বলেই মনে হল। স্টেশনে যাওয়ার দুটো রাস্তা বন্ধ করে খালি খুল্লাবাদের রাস্তা দিয়ে লোক চলেছে। এক্সপার্ট বাইকওয়ালা তার মধ্যে দিয়ে নিয়ে এল। গেস্টহাউস যখন পৌঁছালাম, ঘড়িতে বাজে আটটা। হিসাব করে দেখি সর্বমোট দশঘন্টার মধ্যে অর্ধেক সময় ব্যায় হয়েছে যাতায়তে। খাতায় কলমে যাত্রীস্বাচ্ছন্দের কথা বলা হলেও বাস্তবে চিত্রটা মোটেই সুবিধার নয়।খাওয়ার ব্যবস্থা কিছু কনসেনট্রেটেড জায়গায়। খাওয়ার জল একটা জায়গাতেই পেয়েছি। তবে আমরা ভারতীয়রা তীর্থস্থানে কষ্ট করতেই অভ্যস্ত। ভগবানের দরবার মসৃন খালি ভিআইপি তকমাধারীদের জন্য। যেটা সবচেয়ে ফিল হল, সেটা হল সিনিয়ার সিটিজেন যাদের পক্ষে আট-দশ কিলোমিটার হাঁটা কঠিন, তাদের জন্য কোন ব্যবস্থা নেই। তবুও মানুষ আসছে, স্নান করছে, খুশী মনে ফিরে যাচ্ছে। সাধারণ ভারতবাসী, অভিযোগ করে না, সব কষ্টকে অদৃষ্টের দোহাই দিয়ে ভগবানের কাছে আশিস ভিক্ষা করে।
অতীশদা মাঝে মাঝেই অনুযোগ করছেন গেস্টহাউসের সীমিত ব্যবস্থাবলী নিয়ে। এই সময়ে আমার ফিলজফি সাধারণ ভারতীয়র মত। তীর্থস্থানে রাতের শয়নের জন্য গদীওয়ালা পালঙ্কের জন্য মন আকুলি-বিকুলি করে না। ক্যাম্পকটই সই। তবে বয়েসের সঙ্গে সঙ্গে একদম হার্ড সারফেসে অসুবিধা হয়, এক ইঞ্চির গদি এনাফ। আসল কাজটা আজকেই সারা হয়ে গিয়েছে। কালকের প্ল্যান হল জওহরলালের পৈতৃক বাসস্থান, আনন্দভবন যাবার।
রাতে ডিমের কারি ও শব্জি দিয়ে ডিনার করে মহাআনন্দে নিদ্রা যাই।
শহরের অভিজাত এলাকা হল সিভিল লাইনস। এইটি প্রয়াগরাজের পুরানো জায়গা। আমাদের গেস্টহাউস থেকে ১১ কিমি। ওখান থেকে সঙ্গম তিন/চার কিমি। সকালে আলুর শব্জি ও পুরি সহকারে ব্রেকফাস্ট করে বেরিয়েছি। টোটোতে আধ ঘন্টার মধ্যে পৌঁছান গেল। এপথে সঙ্গম যাত্রীদের ভীড় কম।
রাস্তায় বেশ কিছু কলোনিয়াল স্থাপত্যের নিদর্শন দেখলাম।বেশীরভাগই এখন সরকারী অফিস।
১৭৬৪ সালে বক্সারের যুদ্ধে বাংলার নবাব মীর কাশিম, অওধের নবাব সুজা উদ দ্দৌলা ও মুঘল সম্রাট শাহ আলম টু এর সম্মিলিত শক্তি, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ফৌজের কাছে পরাজিত হলে পর এখানেই এলাহাবাদ ট্রিটি স্বাক্ষর হয়, যার পর থেকে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার রেভিনিউ কালেকশন (দেওয়ানী সনদ) ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে আসে। প্রায় একশ বছর পর ১৮৫৮ সালে লর্ড ক্যানিং এলাহাবাদ থেকে ‘Proclamation of transfer of power’ ঘোষনার পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাত থেকে কুইন ভিক্টোরিয়ার হাতে ভারতের শাসনব্যবস্থা স্থানান্তরিত হয়।
ভারতের স্বাধীনতা ইতিহাসের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত এই নেহেরু পরিবারের পৈতৃক বাসভবন।
শুরুতেই সবুজ ঘাসের লন ও মরশুমী ফুলের বাগান পেরিয়ে ভারতীয় ও পশ্চিমী শিল্পকলার মিশ্রনে তৈরী হেরিটেজ বিল্ডিংএ আসি। দোতলা বাড়ির ছাদে বড়সড় ডোম।
ঘরগুলির সামনে চওড়া ব্যালকনি, সারিবদ্ধ করিন্থিয়ান স্টাইলের কলাম বাড়িটিকে এক অনবদ্য নান্দনিক মাত্রা দিয়েছে। রুমগুলির সিলিং খুব উঁচু। এতে গরমকালে এয়ার সার্কুলেশন ভাল হয়। সিঁড়ি দিয়ে উঠে প্রথমের দুইটি ঘরে ঐ সময়ে ব্যবহৃত নানা সামগ্রী রাখা।
মতিলাল নেহেরু ছিলেন এলাহাবাদের এক বিশিষ্ট ল-ইয়ার। ১৯১১তে ইউনাইটেড প্রভিন্স থেকে ২২জন আমন্তনপত্র পেয়েছিলেন দিল্লি দরবারে যাওয়ার জন্য, তার মধ্যে মতিলালও ছিলেন।
তখনকার দিনে ব্যবহৃত নানা জিনিষের মধ্যে ব্লটিং রোলার দেখলাম। ছোটবেলায় আমরাও ব্লটিং পেপার ইউজ করেছি। জওহরলালের সংগৃহীত জালিওয়ানাবাগ থেকে আনা বুলেট ও বুলেটের খোল রাখা আছে।
শিশু ইন্দিরাকে লেখা জওহরলালের চিঠিও আছে।জেলে থাকার সময় জওহরলাল অবসর সময়ে নানা শেপের পাথর সংগ্রহ করতেন, সেটাও ডিসপ্লেতে আছে।
একটা কয়েদীর ট্যাগ রাখা আছে। জওহরলাল ২০/২৫টি বই লিখেছিলেন, তাও রাখা আছে।
এরপর যে ঘরে জওহরলাল থাকতেন, তারপর ইন্দিরা ও মতিলাল থাকতেন, সেগুলো আসবাবপত্র সহ তেমন করে রাখা আছে। জওহরলালের ঘরে আলমারী ভর্তি বই।
একটা ফুল সাইজ ছবি যাতে দেখা যাচ্ছে জওহরলাল শীর্ষাসন করছেন। যেটা জানা ছিল না সেটা হল জওহরলাল স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য বিভিন্ন দফায় দীর্ঘ দশ বছর জেল খেটেছেন। এর মধ্যে দীর্ঘতম হল ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় প্রায় তিন বছর আহমেদনগর জেলে ছিলেন।
প্রত্যেকটি ঘরে দরজা দিয়ে ঢোকার পর কাঁচ দিয়ে ঢাকা। দূর থেকে দেখতে হয়। একটা ঘর দেখলাম, যেখানে গান্ধীজি এসে থাকতেন।
একটা ঘরে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির মিটিং হত।
দোতলা থেকে আনন্দভবনের পিছনে আরেকটি একতলা বাড়ী দেখা গেল। গার্ডকে জিজ্ঞাসা করে জানলাম ওটাই অরিজিনাল আনন্দ ভবন ছিল। ১৯০০ সালে মতিলাল এক ধনী মুসলিমের কাছ কেনেন। ১৯২৭ সালে এই নূতন বাড়ীটা তৈরী করে উঠে আসেন। পুরানো বাড়িটি ১৯৩০ সালে কংগ্রেসকে দান করে দেন। পরে ওই বাড়ীর নাম হয় স্বরাজ ভবন।
এরপর গেলাম স্বরাজ ভবনে। পুরানো স্টাইলের চৌকোনা বাড়ীর মাঝখানে খোলা আকাশের নীচে প্রশস্ত উঠোন।
সারি দিয়ে ঘর। বেশীরভাগ ঘরে নেহেরু পরিবারের ছবি। সালের হিসাবে ক্রমানুমিকভাবে ফ্রেম করে দেওয়ালে লাগানো। ছবি নিজেই কথা বলে। তাই বর্ননা না দিয়ে অসংখ্য ছবির কিছু দিলাম।
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে কংগ্রেস ও আনন্দ ভবনের নিবিড় যোগাযোগ ছিল। ১৯২০ থেকে ১৯৩০ অব্দি কংগ্রেসের সদর দপ্তর ছিল এই স্বরাজ ভবনে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি থেকে
১৯২০তে অসহযোগ আন্দোলন, ১৯৩০শে সিভিল ডিসওবিডিয়েন্স মুভমেন্ট, ১৯৪২শে
ভারত ছাড়ে আন্দোলনের মত গুরুত্বপূর্ণ ডিসিশন নেওয়া হয়েছিল। আনন্দ ভবনে
দেখেছিলাম ১২ সিটার ডাইনিং টেবিল, স্বরাজ ভবনের খাবার জায়গাতে মাটিতে গদীতে বসে, জলচৌকির উপর থালা-গ্লাস রাখা। ইউরোপীয় ইনফ্লুএন্সে এলিট ভারতীয় পরিবারে কি ভাবে ধীরে ধীরে প্রবেশ করল, সেটা অনুভব করলাম। দুটো ভবনের মিউজিয়াম ঘুরে দেখতে দুই ঘন্টা লাগল। শুধু নেহেরু পরিবারের বাসস্থান হিসাবে নয়, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও তার পরের ঘটনাবলীর এক প্রতিচ্ছবি লাগল এই ঐতিহ্যবাহী ভবন দুটিকে।
পুরো কমপ্লেক্সে তিরিশ একর জমি। খুব সুন্দর লন আর বাগান।
স্বরাজ ভবনের পাশে আরেকটি দোতলা বাড়ী। গার্ডের কাছে শুনলাম ওটা নেহেরু পরিবারের আন্ডারে একটি অরফানেজ , যা শুরু করেছিলেন জওহরলাল ১৯৪৭ সালে, পাকিস্তান থেকে আগত পিতৃ-মাতৃহীন শিশুদের জন্য।
আনন্দ ভবনের পাশে জওহর প্ল্যানেটোরিয়াম। ওখানে আধা ঘন্টার শো দেখলাম পঞ্চাশ টাকার টিকিট কেটে। কুম্ভমেলার এই সময়টাতে রেগুলার শো বাদ দিয়ে দেখান হচ্ছে কোন প্রকার সেলেস্টিয়াল কম্বিনেশনে কুম্ভমেলার স্থান ও দিনক্ষণ ঠিক করা হয়। জ্যোতিষ শাস্ত্রের বারটি রাশিচক্রে সূর্য, চন্দ্র ও জুপিটারের অবস্থানের ভিত্তিতে কি ভাবে দিনক্ষণ ঠিক হচ্ছে সেটা বোঝান হল।
বেরিয়ে এসে লাঞ্চ করে ঠিক করলাম All saints cathedral দেখতে যাব। স্থানীয় লোকেরা এটাকে পাথ্থর গীর্জা বলে। তখন জানতাম না যে এই cathedral খালি বড়দিনের সময় খোলে। একটা চৌমাথার মোড়ের মধ্যিখানে এই চার্চ।
অটো দাঁড় করিয়ে ফটো তোলা ছাড়া আর কিছু করার ছিল না।
তিনটে বাজে। ঠিক করলাম আমরা আবার সঙ্গমের দিকে যাব। কালকে আকবর ফোর্টের উঁচু পাঁচিলটা দেখেছিলাম। কিছু লোকজন ঘোরাঘুরি করছিল। উপর থেকে সঙ্গমের ভাল ভিউ পাওয়া যাবে আবার ফোর্টটাও দেখা যাবে। টোটো বল্ল আমাদের চুঙ্গী মোড়ের কাছে ছেড়ে দেবে। বাস্তবে দেখলাম চুঙ্গী মোড়ের আগের চৌমাথাতে ব্যারিয়ার করে রাস্তা বন্ধ। মানে চুঙ্গী অব্দি এক কিমি হাঁটতে।
কখন কোন রাস্তা বন্ধ হচ্ছে, কোনটা খুলছে, কেউ জানে না। ভোগান্তি আম জনতার। রাস্তায় ভীড় থাকলেও হাঁটতে অসুবিধা নেই। চুঙ্গীর মোড়ে এসে দেখি খুব সাইরেন বাজছে।
ব্যারিয়ারে অল্প খোলা জায়গাটার দুইদিকে দুই ভিআইপির গাড়ীর কাফিলা। দুই তরফেই হুটার বাজছে। কেউ কাউকে এক ইঞ্চি জমি ছাড়বে না। ট্রাফিক পুলিশরা এবার মোবাইল প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে কর্মব্যস্ত হয়ে পড়ল। আমি আর রগড় দেখার জন্য থামলাম না। আধঘন্টা পরে যেখানে এলাম,
উপরের বোর্ডে লেখা ফোর্ট এক কিমি। মনটা বেশ খুশী খুশী। রাস্তার পাশে দোকানের লোকও বল্ল- সিধা চলা যাইয়ে, ফোর্ট মিল জায়গা। চোখে পড়ল রাস্তার ধারে এক বাবাজীর নূতন নিদান। ডিম খাওয়া নৈব নৈব চ। এগিটারিয়ান হলে নরকের দ্বার খোলা। আন্ডার এ ধরণের ফান্ডা বাঙালীর কাছে পশ্চাদ্দেশে ডান্ডা বই কিছু না!
একটু এগিয়ে দেখি সিধা রাস্তা এমনভাবে বন্ধ যে ছুঁচ ও গলতে পারবে না। অগত্যা বাঁদিকে ঘাটের রাস্তা ধরে এগোই। দুইদিকে তাঁবু। কোনটা হোম গার্ড, কোনটা পুলিশ, কোনটা দমকল, মাঝে মাঝে মোহান্তদের আখড়া। এক কিমি হেঁটে আবার ডানদিকে ঘুরে সরু গলি দিয়ে আরেকটা রাস্তায় পৌঁছাই।চক্কর কাটতে কাটতে একটা গেট দেখে মনে হল ফোর্টের এন্ট্রি হবে। মিলিটারি পাহারা। সে জানাল কোই রিস্তেদার চেনা আছে কিনা। তবেই পাশ নিয়ে ঢোকা যাবে।
ভাবছি হনুমান মন্দিরের কাছ থেকে কেল্লার পাঁচিলের উপর লোক দেখেছিলাম গতকাল। ওইখান দিয়ে হয়ত যাওয়া যাবে। আরো মিনিট বিশেক হেঁটে মন্দিরের পাশ দিয় এগোই। কেল্লার পাঁচিলের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় পুলিশ বল্ল এখান দিয়ে ফোর্টে ঢোকা যাবে। মনে ভাবলাম কষ্ট সার্থক হল। প্রবেশ দ্বারের আগে বাঁশ দিয়ে জিগজ্যাগ ওয়েতে সরু রাস্তা। সরকার থেকে তীর্থদর্শনে যতটা পরিমাণ বাঁশ দেওয়া যায়, তার কোন কসুর রাখে নি। লাইনে আমার পাশে ঝাড়খন্ড থেকে আগত এক পরিবার। সেও চলতে চলতে তিতিবিরক্ত। মোদী-যোগী যোগফলের শাপান্ত করতে লাগল। রেড স্যান্ড স্টোনের রাস্তা বানান হয়েছে ফোর্টের পাঁচিল ঘেঁষে।
মন্দির স্টাইলের আর্কিটেকচারে তৈরী এই রাস্তা ফোর্টের প্রাচীনত্বের সঙ্গে খাপ খাচ্ছে না। অনেক শ্রদ্ধালু সামনে। মনে সন্দেহ হয়- সবাই কি ফোর্ট দেখতে যাচ্ছে। জিজ্ঞাসা করি এক মহিলা পুলিশকে। শুনলাম সবাই যাচ্ছে অক্ষয় বট দেখতে।
এই বটগাছের তলায় রামচন্দ্র পিন্ডদান করেছিলেন। বনবাসে যাওয়ার সময় রাম, সীতা লক্ষণ এখানে বিশ্রাম নিয়েছিলেন বলে লেখা দেখলাম। যা বুঝলাম, পুরো ফোর্টটাই আর্মির দখলে। ২০১৯শে কুম্ভমেলার আগে এখানে সাধারণের প্রবেশাধিকার ছিল না। পরে সরকারী উদ্যোগে ফোর্টের গা ঘেঁষে এই রাস্তা তৈরী করে ভক্তদের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।একটা মন্দির আছে ফোর্টের ভিতর। তার নাম পাতাল মন্দির। সেটা যেতে পাস লাগবে। রাস্তাটা আরো ঘুরে গিয়েছে সরস্বতী কূপের দিকে। ত্রিবেণী সঙ্গমের অন্যতম অন্তঃসলিলা নদী হল সরস্বতী। জুতো খুলে ঢুকতে হল।
একটা বিশাল কুয়ো। তলায় যে জলটা দেখা যাচ্ছে সেটাই হল সরস্বতী নদী। পাশে সরস্বতী মাতার মূর্তি। শিবঠাকুরও আছেন।
শিবের মাথাতেও জল ঢালা হচ্ছে। এক্সিটের পর একটা খোলা চত্বর। সেখান থেকে দূরে সঙ্গম ঘাটের আলো দেখা যাচ্ছে।
নীচে হনুমান মন্দিরের বিশাল সার্পেন্টাইন লাইন। শুনলাম দর্শন করতে চার-পাঁচ ঘন্টা লাগছে। গতকাল দেখছিলাম মন্দিরের বাইরে বড় এলইডি ডিসপ্লেতে হনুমানের গর্ভগৃহ দেখাচ্ছে। কয়েকজন মহিলা সেটার সামনে রাস্তাতেই শুয়ে ভক্তিভরে প্রণাম সারছেন। ভীড়ের কমতি নেই। যেদিকে তাকাই সেদিকেই খালি মানুষ আর মানুষ। কিছুটা বিজ্ঞাপনের মাহাত্ম্য। “মহাকুম্ভ মে হিস্যা লিজিয়ে” বলে খুব ঢাক পেটানো হয়েছে। ৪৫ কোটি লোক নাকি স্নান করবেন এরকমটাই নিউজে দেখেছি।
হেঁটে ফিরলাম চুঙ্গীর মোড়ে। দুটো বাইক যোগাড় করা গেল। সাড়ে চারশ টাকা করে নেবে। ইয়াং দুটি ছেলে। বাইকে যেতে যেতে অনেক কথা হল। ২০১০ সালে স্কুল পাশ করে, গ্রাজুয়েশন, পোস্ট গ্রাজুয়েশন করে এখনো সরকারী চাকরির পরীক্ষা দিয়ে চলছে। ওর দিদি ইস্কুলে পড়ায়, দাদা ডীপ টিউবয়েলের বোরিংএর ঠিকাদারি করে। চাকরির আশা এখনো ছাড়ে নি।বাইক চালিয়ে যা রোজগার, তাতে নিজের খরচা উঠে যায়। ছেলেটির বয়েস পয়ত্রিশ। বলি - বিয়ে কবে করবে। জানাল সব মেয়ের বাবা-মা সরকারি চাকরি করা পাত্র খোঁজে। অন্য ছেলেটির কথা শুনলাম। সেও UPSCর তৈয়ারী করছে। দিল্লির মুখার্জি নগরে কোচিং নিয়েছে দুই বছর। চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে প্রতি বছর। এরকম আনসার্টেনিটির মধ্যেও দুইজনে হাসিমুখ। ভারতীয়রা বোধহয় জন্ম থেকেই কষ্টসহিষ্ণু হয়। দুইজনকে বেস্ট উইশ দিই। এর থেকে আর বেশী কি করতে পারি।
আজ এলাহাবাদে আমাদের তৃতীয় দিন। ট্রেন হল বন্দেভারত, ছাড়বে বিকাল পাঁচটায়। সকালটা খালি। মোবাইলে ট্র্যাক করে দেখি দিল্লি থেকে ট্রেনটা যেটা আসছে সেটা দেড়ঘন্টা লেট। বেনারস থেকে নির্ঘাত লেট করে প্রয়াগরাজ ঢুকবে।
একটা টোটো ভাড়া নিয়ে বেরিয়ে পড়ি একাই। গন্তব্য সিভিল লাইনস এরিয়াতে চন্দ্রশেখর আজাদ পার্ক। গেস্ট হাউস থেকে ১১কিমি। টোটোওয়ালাকে ডাইরেকশন দিয়ে যখন পৌঁছলাম, চালক বল্ল ‘এটার নাম তো আমরা জানি কোম্পানি বাগ’।
পাঁচটাকার টিকিট কেটে ভিতরে ঢুকি। বেশ বড় পার্ক। ঢুকতেই বাঁমদিকে এক যুদ্ধবিমান রাখা। সবার মত আমিও সেল্ফি নিই।
উদ্দেশ্য স্বাধীনতা সেনানী চন্দ্র শেখর আজাদ যে গাছের তলায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন, সেখানটা দেখব। ১৯৩১ সালের ফেব্রুয়ারির কোন একদিন ইংরেজ বাহিনী খবর পায় আজাদ এসেছেন আলফ্রেড পার্কে। পুলিশের সঙ্গে গুলি বিনিময়ের পর, শেষ গুলিটি নিজের মাথায় লাগিয়ে আত্মঘাতী হন। প্রতিজ্ঞা ছিল কোনদিন পুলিশের হাতে ধরা দেবেন না। যে গেট দিয়ে পার্কে ঢুকলাম, তার অপোজিট গেট হল তিননম্বর গেট তার কাছেই যে গাছটির তলায় আজাদ মারা যান সেখানে তার মর্মর মূর্তি স্থাপিত আছে।
পনের মিনিট লাগল হেঁটে যেতে। ফেরার সময় দেখলাম লাল রংএর একটা কলোনিয়াল স্টাইলের বিল্ডিং।
এটা হল এলাহাবাদ আর্কিওলজিকাল মিউজিয়াম। এসেই যখন পড়েছি, পঞ্চাশ টাকা দিয়ে টিকিট কেটে ঢুকলাম। দোতলা ভবনের একতলায় প্রত্নতত্ত্ব সামগ্রী। গুপ্ত, কুশান পিরিয়ডের নানা দেবদেবীর মূর্তি।
একটা অনুমানিক ৩০ হাজার বছরের হাতির জ-বোনের ফসিল দেখলাম।
আরেকজন দর্শকের সঙ্গে আলাপ হল। বেনারসের লোক।
দাদু ফ্রিডম ফাইটার ছিলেন। নিজেকে মোদিজীকা এক সমান্য সৈনিক বলে পরিচয় দিলেন। ফোন নম্বর নিলাম। পরে কাল্টিভেট করতে হবে।
পার্কে বেরোবার মুখে মোদী-যোগীর কাটআউট। কুম্ভমেলাতে আসার আহ্বান।
ট্রেন দেড়ঘন্টা লেট দেখাচ্ছে। তার মানে পাঁচটার জায়গায় সাড়ে ছয়টা বাজবে। গেস্ট হাউস থেকে বেড়িয়ে পরি আড়াইটাতে। প্রয়াগরাজ জংশন স্টেশনে এ্যরেন্জমেন্ট ভালো। প্ল্যাটফর্ম যাতে ওভারক্রাউডেড না হয় তার জন্য অনেক আগেই মেন রাস্তায় আলাদা গেট। একটাতে সংরক্ষিত টিকিটধারী যাত্রীদের অন্যটা আনরিজার্ভড লোকেদের। দুই মিনিটের স্টপেজ। বন্দে ভারতের গেট অট্যোমেটিক খোলে ও বন্ধ হয়। আগে খুব বিশৃঙ্খলা চলছিল। এখন প্রতি কোচে পুলিশ দাঁড়িয়ে। আগে থেকে এনাউন্সমেন্ট হল যে সব যাত্রী উঠলে তবেই গেট বন্ধ হবে।
ঠিকঠাক করেই উঠলাম। সিটের সামনে লেগ স্পেস অনেকটা । সামনে সীটে এ্যড চোখে পড়ল- কুম্ভস্নান করে অমুক জায়গা থেকে লোন নিয়ে “বেওসা” শুরু করুন।
লাভের মুখ পাকা। খাবারও ভাল ছিল। নিউ দিল্লির ১৪ নম্বর প্ল্যাটফর্মে পৌঁছালাম তখন ঘড়িতে রাত সাড়ে বারটা। পরের দিন রাত নয়টাতে ওইখানেই ঘটে গেল স্টাম্পেড।
১৮ জন মারা গেল। ওভারক্রাউডেড স্টেশন। কুম্ভে যাওয়া উন্মাদনার পর্যায়ে পৌঁছেছে।
পরের দিন সকালে ক্লাসমেট বিজনের ফোন। উৎফুল্ল হয়ে উঠি। কুম্ভস্নানের খবর ফলাও করে জানাতে হবে। এর মধ্যে কোন বন্ধুকেই ফোন করি নি। আমার সহযাত্রী অতীশদা প্রয়াগরাজে থাকাকালীন সব বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়দের ফোন করে জানিয়েছেন তাঁর স্নানযাত্রার কথা, তাও আবার মাঘী পূর্ণিমায়। সবাই ধন্য ধন্য করেছে। দুই একজনের হোয়াটস্ এ্যপ মেসেজ শোনালেন। তারা লিখেছেন - “আমাদের মত পাপী-তাপীদের যাওয়া হল না, পুণ্যের কিছুটা অংশ আমাদের বিতরণ করিস।” এরকমটা শুনলে কার না কলার উঁচু হয়। বিজন ফোনে চিরকালই প্রথম প্রশ্নটা করে - তুই কোথায়? বলি বাড়ীতে। দ্বিতীয় প্রশ্ন হল -কেন? আমতা আমতা করি- সত্যিই তো কেন বাড়ীত আছি! পাল্টা জবাবে জানাই-জানিস তো কুম্ভস্নান করে এলাম। বিজন ছক্কা হাঁকায়-এত কষ্ট করে গেলি কেন, আমি তো সোসাইটিতেই করে নিলাম। ঘনাদা টাইপের জবাব। খেই হারিয়ে বলি-ধ্যেৎ, সে আবার হয় নাকি! বিজন বল্ল কেন কাল রভিশ কুমারের শো দেখলি না। উনিও তো বল্লেন ইন্দিরা পুরমের সানরাইজ গ্রিন সোসাইটিতে প্রয়াগের সঙ্গমের জল এনে ঢালা হয়েছে। সুইমিং পুলে সেই জলে মহানন্দে লোকে কুম্ভস্নান করছে। ভক্ত কেন ভগবানের কাছে যাবে, আধুনিক যুগে ভগবান আসছেন ভক্তর দোড়গোড়ায়।
এবার ধরি কেশবদাকে। আমার থেকে কলেজে তিন বছরের সিনিয়ার, হোস্টেলে ও চাকরীকালীন অনেক সময় কাটিয়েছি। যুবা বয়েসে রাম-এ (Rum) আসক্তি ছিল, আজকাল কালী-ভক্ত। তারাপীঠ কি দক্ষিণেশ্বরে খুব আনাগোনা। এহেন ভক্ত নিশ্চয়ই আমার স্নানযাত্রা এপ্রিসিয়েট করবে। ফোন লাগিয়ে জিজ্ঞাসা করি “কি খবর?” ওপাশ থেকে জবাব আসে “খবর আর কি-নিজে কবে খবর হয়ে যাব, সেই চিন্তায় আছি!” কেশবদা বরাবরই উইটি। নিজের কুম্ভস্নান ফলাও করে বলতে শুরু করি। কেশবদা বল্ল-‘তুই ওয়েটিং লিস্টে আছিস’। বলি না-না, ট্রেনে আসা যাওয়ার টিকিট কনফার্ম ছিল। কেশবদা জানাল-“আরে তুই গেছিস পরের দিকে, অলরেডি চল্লিশ কোটি ডুব দিয়েছে,স্বর্গে রাস্তা জ্যাম, তুই ওয়েটিংএ গাদাগাদির মধ্যে আছিস! আমি বুদ্ধি করে নরক বেছে নিয়েছি, বেশ খালি খালি, টুবেড রুম, ডিসকাউন্টে পেলাম!”
নিজের মনকে প্রবোধ দিই। বিশ কিলোমিটারের হাঁটার কষ্ট কি বিফলে যাবে। কষ্ট করলে তবেই কেষ্ট মেলে। তার সঙ্গে ভ্রমনের অভিজ্ঞতাটাও তো যুক্ত।
আরো আছে। সোসাইটির প্রেসওয়ালা হল মুকেশ। সেদিন প্রেস করাতে গিয়ে প্রেসারে পড়ে গেলাম। দুই দিন ধরে গাড়ীর ধোলাইও বন্ধ। ওটাও মুকেশ করে। ধোলাই দেব বলে ফোন করেছি। বল্ল… সাব নাহানে যানা হ্যায়। ঘরমে আভি পূজাপাঠ চল রহা হ্যায়। বলি ব্যাটা… তুইও এই পয়ষট্টি কোটির মধ্যে ঢুকছিস? মুকেশ বলে- সাব, হাম তো নাহেঙ্গে, লেকিন পুরা ফল নেহি মিলেগা। স্বর্গ কা পাশ যাকে খাড়া হোঙ্গে। জিজ্ঞাসা করি- তোর এই পয়েন্ট ফাইভ পুণ্য ব্যাপারটা কি? মুকেশ জানাল ২৬ তারিখ গড় গঙ্গা যাচ্ছে স্নান করতে। প্রয়াগরাজ যাওয়ার মত টাকা বা টাইম নেই। পুণ্যের এক্সপ্রেস সার্ভিস! আমি এক্সপ্রেসনলেস। মুকেশ জানাল পেপারে পড়েছে কুম্ভের জলে অনেক জীবাণু, তাই আপস্ট্রীমে এখান থেকে আশি কিমি দূরে গঙ্গায় স্নান করে আধা পুণ্য নিয়ে ফিরবে।
দেবদত্ত
১৭/০২/২৫



























































































































Excellent description. Feeling thrilled.
ReplyDeleteThank you
DeleteVery nice. Felt a bit lengthy
ReplyDeleteThanks… actually I covered other than Kumbha. The rich colonial flavour in Civil Lines area fascinated me.
Deleteসুন্দর লিখেছেন দাদা
ReplyDeleteThank you so much
Deleteমিঠু, তোর ব্লগ পোস্টটা অসাধারণ! খুব সুন্দরভাবে তুই তোর যাত্রার অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছিস। পড়তে পড়তে মনে হল, আমি নিজেই সেই মুহূর্তগুলোতে ছিলাম। তোর লেখায় যে মজা আর গভীরতা আছে, তা সহজেই মন ছুঁয়ে যায়। কুম্ভ মেলার অভিজ্ঞতা খুবই সুন্দরভাবে তুলে ধরেছিস। ধন্যবাদ, এমন এক অভিজ্ঞতা আমাদের সাথে শেয়ার করার জন্য।
ReplyDeleteThanks পুলক।
Deleteদেবুদা তোমার লেখাটি আজ পুরো পড়লাম। আসলে কোটি জনতার সমাগম,
ReplyDeleteএত বৈচিত্র্যময় পথ (জায়গা) ও মতের বর্ণনা একটু দীর্ঘ তো হবেই। আমি যেহেতু নিজে ওখান থেকে ঘুরে এসেছি তাই এর যথার্থতা খুব ভালো ভাবে অনুধাবন করতে পেরেছি। তাছাড়া তুমি তো আমাদের পরিচিত আজকের যুগের শামস্-আল-দ্বীন ওরফে ইবনে বতুতা। তোমার কলমে আঁকা পটচিত্র সে তো জীবন্ত না হয়ে পারে না।
এই যে এত পুণ্যার্থীর আগমন তাঁদের বেশিরভাগই অতি দরিদ্র থেকে সাধারণ মানুষ। কত মানুষকে দেখলাম একদম খোলা আকাশের নীচে গঙ্গার বালির উপর লোহার পাত দিয়ে বানানো অস্থায়ী রাস্তার দুপাশে শুয়ে রাত কাটাতে। শুধু বিশ্বাস আর ভক্তি সম্বল করে তাঁরা সব কষ্টকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে একবার কুম্ভ স্নান করে জীবন ধন্য করতে চান।
আসলে এই যে প্রাণভরা, সর্বজয়ী স্বতঃস্ফূর্ততা তার খুব সামান্যই যদি আমরা সবাই সমাজের অন্যান্য ক্ষেত্রে দেখাতে পারতাম তাহলে আজকের ভারতবর্ষের হুলিয়াই পাল্টে যেত।
যাইহোক, ভবিষ্যতে তোমার এরকম আরো লেখার আশা রাখছি- আনোয়ার
Thanks a lot. বিবেকানন্দের লেখার অংশ বিশেষ মনে পড়ে গেল:
ReplyDeleteভুলিও না— নীচজাতি, মুখ, দরিদ্র, অজ্ঞ, মুচি, মেথর তোমার রক্ত, তোমার ভাই ! হে বীর, সাহস অবলম্বন কর ; সদৰ্পে বল—আমি ভারতবাসী, ভারতবাসী আমার ভাই । বল—মূখ ভারতবাসী, দরিদ্র ভারতবাসী, ব্রাহ্মণ ভারতবাসী, চণ্ডাল ভারতবাসী আমার ভাই ; তুমিও কটিমাত্ৰ-বস্ত্রাবৃত হইয়া, সদৰ্পে ডাকিয়া বল—ভারতবাসী আমার ভাই, ভারতবাসী আমার প্রাণ, ভারতের দেবদেবী আমার ঈশ্বর, ভারতের সমাজ আমার শিশুশয্যা, আমার যৌবনের উপবন, আমার বার্ধক্যের বারাণসী ; বল ভাই—ভারতের মৃত্তিকা আমার স্বৰ্গ, ভারতের কল্যাণ আমার কল্যাণ ; আর বল দিন-রাত, ‘হে গৌরীনাথ, হে জগদম্বে, আমায় মচুন্যত্ব দাও ; মা, আমার দুর্বলতা কাপুরুষতা দূর কর, আমায় মানুষ কর।’
এককথায় অপূর্ব! কুম্ভ স্নান না হোক মানস দর্শন তো হযে গেল।
ReplyDeleteotyonto bhalo likhechhis bandhu amar khub dukkho chhilo je jaoya holo na..........se dukkho onektai kome gelo. Upori o kichhu pelam
ReplyDeleteপ্রয়াগরাজ covering । সুন্দর ভ্রমন ও পরিবেশনা ।
ReplyDeleteKhub saral bhashay darun likhechhen
ReplyDeleteতোর লেখা এত চমৎকার আর বৈচিত্রপূর্ণ হয় যে দারুন লাগে আমার। মনেহয় তোর সঙ্গে আমিও বেড়াচ্ছি। আমার স্বভাব খানিকটা তোর মত, যেকোন জায়গায় যখন তখন ঘুড়ে বেড়াতে ভাল লাগে সে যতই নগণ্য বা বিখ্যাত জায়গা হোক। আর বেশ উপভোগও করি। তবে তোর মত তো ছাড় একেবারেই লেখার লেখার ক্ষমতা নেই। তাই লিখে কারো সঙ্গে শেয়ার কখনই হয়ে উঠেনি। সমস্তটাই নিজের সুন্দর স্মৃতিতেই খালি থাকে।
ReplyDeleteতুই যখন লেখাটা শুরু করলি , মনেহল একেবারে দ্বিতীয় সমরেশ বসুর অমৃত কুম্ভের সন্ধানে হতে চলেছে। তারপর তোর সরল সুন্দর লেখা যেন বহতি গঙ্গার মত তরতরিয়ে, আবার কখনও কলকল ছলছল সশব্দে তরঙ্গায়িত হয়ে বয়ে চলেছে। এরই মধ্যে যখন তখন ইতিহাসের নানান অংশে ঢুকে অনায়াস বিচরণ করছিস তা সত্যি অনবদ্য। তবে ভেবেছিলাম হয়তো খানিকটা শরদিন্দুর মতো রহস্যের সৃষ্টি হবে। তোর ছবি গুলোও একদম তোর লেখার সঙ্গে সামঞ্জস্য পূর্ণ। সে গুলো তোর লেখাকে আরো সম্বৃদ্ধ করছে। তোর পুরো যাত্রাপথ একেবারে যেন জীবন্ত তাই মনের চোখে দেখতে এত দৃষ্টি নন্দন যে ভাষায় অনূদিত করা বেশ কষ্টসাধ্য। সাবাস মিঠু, এইভাবেই বেড়াতে থাক আর লিখতে থাক আমাদের ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য।💞
আমার কথা :
ReplyDeleteএই অতি সুন্দর একটা অনবদ্য লেখার পেছনে আমারও অল্পস্বল্প অবদান ছিলো..🤪..
ছোটোবেলায় কালকূটের যুগান্তকারী লেখা “অমৃত কুম্ভের সন্ধানে”এবং শঙ্কু মহারাজের অসামান্য সৃজন “কুম্ভ মেলায়“ পড়ে আমারও ইচ্ছা হয়েছিল কোনো একবার কুম্ভ মেলা দর্শন করার ।
হঠাৎ একদিন আমার কোলকাতা থাকাকালীন আনোয়ারের ফোন পেলাম এবং ও আমাকে পরিবারসহ কুম্ভ মেলায় যাবার একটা পরিকল্পনায় সামিল হোতে বললো। ওর প্ল্যান ছিলো একটা ট্র্যাভেল প্যাকেজের সৌজন্যে একটা সেমি বিলাসবহুল টেন্টে থাকবার খাওয়া দাওয়া শুদ্ধ। আমার তৎক্ষণাৎ মনে পড়লো আমাদের সখের লেখক দেবদত্তকে যদি নিয়ে যাওয়া যায় এই মহাযজ্ঞে তাহলে বেশ হয় এবং কালকূটের মতো একটা বেশ সুপাঠ্য রচনার সৃষ্টি হবার সম্ভাবনা থাকে। ব্যাস , তারপর আর কি, কোনো এক শাহী স্নানের দিন পছন্দ করা, ট্রেনের টিকিট কাটা , গেস্ট হাউস বুক করা ইত্যাদি ইত্যাদি।
তারই সুমিষ্ট ফল হিসাবে পাওয়া আমাদের আধুনিক কালকূটের কলম বা মোবাইলে আঙুল থেকে নিঃসৃত পরিশীলিত কৌতুকময় লেখাটা।
তবে কালকূটের সঙ্গে এই লেখাটার কয়েকটা পার্থক্য নজরে এলো ।
প্রথমতঃ কালকূটের লেখাটা ছিলো একটা উপন্যাস। আর এই লেখাটা একটা ছোটো অনুগল্প গোছের।
কালকূটের রচনায় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিলো তার বিভিন্ন ভ্রমণসঙ্গী এবং মেলায় উপস্থিত বিভিন্ন মানুষের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ এবং মেলার দৃষ্টিভঙ্গিতে তাদের বিশ্লেষণ।
কিন্তু দেবদত্তের লেখায় যে মসৃণ কৌতুক লুকিয়ে আছে তা লেখাটাতে একটা অন্য মাত্রা যোগ করেছে যা অতীব সুখপাঠ্য ।
বেরিয়ে ছিলাম জানার মাঝে কিছু অজানাকে খুঁজতে, নিশ্চয়তার মধ্যেই কিছু অনিশ্চয়তাকে জানতে, একটা ধার্মিক মহাযজ্ঞের আঙিনায় জনতার জোয়ারে গা ভাসিয়ে দিতে, মনের ব্যাকুলতাকে প্রশান্তির প্রলেপ লাগাতে ।
কি পেলাম আর কি পেলাম না তার হিসাবের কড়ি আর নাই বা মেলালাম।
যে টুকু পেয়েছি তাই সযতনে মনের সিন্দুকে রেখে দিলাম ভালোবেসে॥
“একে একে নিভেছে শেষ বেলা এসে,
নিত্য তবু তরী বায় জীবনকে ভালোবেসে ॥”