রবিঠাকুর ও কিছু হাসি মশকরা
রবিঠাকুর ও কিছু হাসি মশকরা
সরস্বতী পুজোর পর সামনের দুর্গাপুজো পর্যন্ত লম্বা গ্যাপ। সংস্কৃতিপ্রিয় বাঙালির জন্য খাবি খাওয়া অবস্থা। একটু খোলসা করলে ‘খা’ হল খাবার, মাছে-ভাতে বাঙালির রসনাতৃপ্তি আর ‘বি’ হল বিশ্বকবির বন্দনা। তিনি আছেন আমাদের চেতনা জুড়ে। বাঙালীয়ানার বহিঃপ্রকাশের এক উজ্জ্বলতর দিক হল বৈশাখের তপ্ত প্রহরে তাঁরই গানে তাঁকে আবাহন। আমরা অবশ্য এসি হলের ঠান্ডা হাওয়ায় “দারুণ অগ্নিবাণে রে” শুনব।
অনেকদিন ধরে অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি চলছে। মাস দেড়েক আগে থেকে নাম রেজিস্ট্রেশনের অনুরোধ আসছে। মাস খানেক পরে দেখা গেল জনা তিরিশেক সম্মতি দিয়েছেন।মূল কো-অর্ডিনেটর বাসব।কালচারাল কমিটির পিয়ালীর ফোন চলে এল - “দাদা নাম নেই কেন?” মহিলাদের অনুরোধ ঠেলতে পারি না। নিজের নামটা দিয়ে দিই লিস্টে। তবে পিয়ালী আমার গিন্নিকে কাবু করতে পারল না। আমি এদিকে মুখে বলি - আরে যাবে না কেন, তবে নিজেকে খুঁটি ছেড়া বকনা বাছুর ভেবে পুলকিত হই।
১০ তারিখ সকালে হোয়াটস্ এ্যপ গ্রুপে এল যুদ্ধের দামামার মধ্যে অনুষ্ঠান আপাতত স্থগিত। দিল্লির নটোরিয়াস গরম পশ্চিমি ঝঞ্ঝার প্রভাবে স্তিমিত, কিন্তু পড়শী দেশের প্রোভকেশনে দেশের হাওয়া গরম। সকালে পার্কে গেলে রিটায়ার্ড আঙ্কিলের দল জটলা করে পড়শী দেশকে কতটা “প্রহারেণ ধনঞ্জয়” করা হচ্ছে, তারই বিবরনএ বআত্মপ্রসাদে তৃপ্ত। বিকালের দিকে সিজফায়ারের খবর ফায়ারের মত ছড়িয়ে পড়ল। এই দশকের হাইলাইট হল, দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের কবলে ইউক্রেন ও রাশিয়া, আর সংক্ষিপ্ততম যুদ্ধের তালিকায় ভারত-পাকিস্তান। সাধারণ নাগরিক হিসাবে উৎসাহের সঙ্গে অপেক্ষায় ছিলাম যে বেশ সাইরেন-টাইরেন বাজবে, ব্ল্যাক-আউট হবে, ঘরে বসে যুদ্ধের প্রত্যক্ষ না হোক একটা পরোক্ষ টাচ পাব, সে গুড়ে বালি। নয়ডাতে অবশ্য সাইরেন আছে বলে মনে হয় না। ছোটবেলায় কালি ফটকা জ্বালিয়ে ছুড়তাম। কয়েকটা ফুস হয়ে থেমে যেত। এবারের যুদ্ধও তাই। কিছু সিভিলিয়ান ক্যাসুয়ালিটি. কিছু বেকার খরচা হল দেশের।ট্রাম্প সাহেব ট্রাম্প-কার্ড খেলে যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলার পরিসমাপ্তি ঘটালেন। উনার নাম নেক্সট নোবেল পিস প্রাইজের জন্য মনোনীত হবে আশা করছি। নিন্দুকেরা অবশ্য বলছেন, আইপিএল আবার শুরু করার জন্য এই সিজফায়ার।
“টু বি অর নট টু বি” দোলাচলে দোদুল্যমান থাকার পর রাতের দিকে জানা গেল প্রোগ্রাম ইজ অন।
ভ্যেনু হচ্ছে এসেনশিয়াল অয়েল অডিটোরিয়াম।
টেলিকম সিটি থেকে মাত্র নয়শ মিটার দেখাচ্ছে। পাঁচশ টাকা চাঁদার খাতিরে পাঁচটার সময় পৌঁছে যাই। আজকের অন্যতম শিল্পী মৌমিতা ঐসময়েই হাজির। আগ বাড়িয়ে গিয়ে বলি আপনার গান আগেও শুনেছি। দারুণ। আজকেও বেশ ফাটাফাটি অনুষ্ঠান হবে নিশ্চয়ই। এটা একধরণের মরাল বুস্টিং উঠতি গায়িকাদের জন্য, জনান্তিকে যদিও জানাই ওনাকে এই প্রথম চোখে দেখলাম। উনি এসেছেন গুরগাঁও থেকে। গাড়ী থেকে যন্ত্রপাতি নামাতে সাহায্য করি।ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভাঙে। চাকরিজীবনে যন্ত্র মেরামতির কারবার করতে হয়েছে অনেকদিন। ব্যাকস্টেজের লোক হিসাবে ব্যাকফুটে থেকে লটবহর নিয়ে স্টেজের দিকে ধাবিত হই।
অডিটোরিয়ামটা বেশ সুন্দর। সিটে বসে বোঝা গেল সরকারি দপ্তরের স্পেশাল ফরমাশে তৈরী। পিছনে হেলান দিলে, ট্রেনের চেয়ারকারের মত ৬০ ডিগ্রি হেলে যাচ্ছে।
এইসব হলে সাধারণত সরকারী সেমিনার হয়ে থাকে। নিজস্ব অভিজ্ঞতায় জানি দ্বিপ্রাহরিক ভুরিভোজের পর ডেলিগেটরা একটু দিবানিদ্রায় মগ্ন হন। সেমিনারের বক্তাও একটু নিশ্চিন্ত বোধ করেন, কারণ প্রশ্নবানে বিদ্ধ করার অবস্থায় কেউ থাকেন না। এইক্ষেত্রে এরকম চেয়ার হল আইডিয়াল। এইপ্রসঙ্গে গতকাল দূরদর্শনে স্বনামধন্য ফিজিসিস্ট ডাঃ পার্থ ঘোষের ইন্টারভিউতে বলা একটা ঘটনা উল্লেখ করার লোভ সামলাতে পারলাম না। সময়টা ১৯৬০। নোবেলজয়ী ফিজিসিস্ট নীলস বোর কলকাতায় এসেছেন ভাষণ দিতে।সেমিনার কমিটির চেয়ারম্যান প্রফেসার সত্যেন বোস।
নীলস বোরের ভাষণের সময়, অনেকেই লক্ষ্য করলেন, সামনের সারিতে বসে সত্যেন বোস আধো ঘুমে। লেকচারের মাঝে বোর সাহেব একটু ইতস্তত করে কোন একটি ব্যাপারে বল্লেন - পারহাপ্স প্রফেসর বোস ক্যান থ্রো সাম লাইট অন ইট। ঝটিতি উঠে প্রফেসর বোস প্রাঞ্জল ব্যাখ্যা শেষে আবার ঝিমোতে লাগলেন। এটা নাকি সত্যেন বোসের ট্রেট ছিল। কোন দূরূহ লেকচার শোনা বা পেপার পড়ার সময় এমন কনসেনট্রেট করতেন যে সবাই ভাবত উনি ঘুমিয়ে পড়েছেন।
“এসেনশিয়াল অয়েল” এর উৎস সন্ধানে লেগে পড়ি। জনৈক বংস মেম্বার জানালেন - অয়েল যখন তখন ইন্ডিয়ান অয়েল কোম্পানির কিছু হবে। পুজো কমিটিতে তেল কোম্পানির প্রাধান্য, ট্যাঁকের সিংহভাগ তারাই ট্যাক্টফুলি ম্যানেজ করেন, এই হল বুকিংও সেই লিগ্যাসির হাত ধরে বোধহয়। আরও খোলসা করার জন্য খোদ গার্ড সাহেবের শরণাপন্ন হই। জানা গেল, এ সেই পেট্রোল, ডিজেলের কারবার নয়, এটা ফিমেল ভার্সান অফ প্রচলিত অয়েল বলা যায়। যাদের সৌরভ, সান্নিন্ধ ও সৌন্দর্যের ছটায় পুরুষজীবন ধন্য সেই নারীদের মত পুষ্পনিয্যাসিত পারফিউম অয়েল কে বলা হচ্ছে এসেনশিয়াল অয়েল। এই কনসেনট্রেটেড অয়েলকে ডাইলিউট করে নানা সুগন্ধীযুক্ত প্রোডাক্ট পাওয়া যায়।
আরো জানা গেল দেশী পারফিউম হল আতর, যার আঁতুড়ঘর হল আমাদের উত্তর প্রদেশের কনৌজ। এই অফিসে রিসার্চ হয়, হাজারের উপর মেম্বার যারা ওই এসেনশিয়াল অয়েল ম্যানুফ্যাকচারিং-এর সাথে যুক্ত।
রিসেপশন কমিটির পাশে চেয়ার টেনে বসে পড়ি।
কুপন দেওয়া হচ্ছে, তবে সেটা মেন কোর্সের জন্য নয়, রসগোল্লা ও আইসক্রিমের জন্য। ওই দুটোর প্রতি সাধারণ ভাবে সবারই দুর্বলতা থাকে। কমিটির লোকেরা স্বাস্থ্যসচেতন মনে হচ্ছে, সুগার লেভেল কন্ট্রোলে রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। সঙ্গে চলেছে বিসিএ (বেঙ্গলি কালচারাল এ্যসোশিয়েশন) এর সদ্যসপদের ফর্ম ফিলাপ। আমি যদিও পুজোর জন্মলগ্ন থেকে জড়িত, কিন্তু মেম্বার ছিলাম কিনা জানি না। শোনা গেল মেম্বার হলে ভোটিং রাইট থাকবে। ভোট মানেই জোট! সুতরাং আপাতত বিসিএ থেকে বিসিএ (বেটার স্টে এ্যওয়ে) থাকাই মনস্থ করি। হলের ভিতরটা একবার ঘুরে আসি। ঠান্ডা মেশিন ভালই চলছে। দ্বিতীয় আর্টিস্ট রাজর্ষিও এসে গিয়েছেন। সাউন্ড চেকিং চলছে।
উনার বেটারহাফ চিন্তিত মুখে বসে, শো কিরকম উতরোবে, তারই চিন্তা করছেন বোধহয়। তার সামনে মৌমিতা দেবী, মোবাইলে গান ঝালিয়ে নিচ্ছেন মনে হল। প্রেসিডেন্ট সাহেব ব্যস্ত লোক। অনেকদিকে তার টেন্টাকেলস ছড়ান। নিজের সোসাইটির প্রেসিডেন্ট, পুজো কমিটির প্রেসিডেন্ট, নয়ডা কালিবাড়ীতেও প্রেসেন্ট প্লিস থাকেন, দিল্লির সংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেও পরিচিত মুখ, আবার নিজের নিউটাউনের সোসাইটিতে পদচিহ্ন রেখে আসেন সুযোগ বুঝে। এতসব ম্যানেজ চাট্টিখানি কথা নয়। এতসব ঝক্কি সামলানো মানে টেনশন অবধারিত। তাই পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী পড়শি দেশ ভুটানে গিয়ে কয়েকদিন “ওম মনিপদ্মে হুম” বলে শান্তিলাভের আশায় গিয়েছিলেন।কয়েকদিন আগে পোস্ট দিয়েছিলেন,
ভুটানের সাড়ে দশহাজার ফিটে উঁচুতে পুনাখার লামা দর্শনের চক্করে মালাইচাকির অবস্থা করুণ। লেগের করুণ অবস্থায় যাতে রম্যরচনাতে লেগপুলিং না হয়, সে রকমই একটা সনির্বন্ধ অনুরোধ এল। গান শুরু হল। হল পুরো আলোকিত। এটা মনে হচ্ছে মডার্ন ফান্ডা। সংগীতশিল্পীদের সঙ্গে দর্শকবৃন্দের ইনটেন্স ইন্টার্যাকশনের যোগসূত্র। রাজীববাবু এবং মৌমিতাদেবী দুজনেই জানালেন তারা ‘হরেকরেকমবা’ (হরেকরকম) গানের ডালি নিয়ে হাজির। হল খচাখচ ভর্তি।প্রথমে কাস্টমারি কন্ঠ ও যন্ত্রশিল্পীদের পরিচয় ও উত্তরীয় প্রদান।
আজকাল বেশীরভাগ অনুষ্ঠানে এই অসমীয়া সাদার উপর লাল ডিজাইনের গামছার বেশ চল। উদ্যোক্তারা আরো উদার হলে গামছার বদলে উত্তরীয় দিয়ে থাকেন। দুই গায়ক গায়িকা এনসিআরে সুপরিচিত মুখ এরকমটাই জানা গেল। মৌমিতাদেবী কিরানা ঘরানার গায়িকা। কূলকিনারা না করতে পেরে গুগলের শরণাপন্ন হই। উত্তর প্রদেশের কইরানা (kairana) গ্রামে এই খেয়াল গানের উৎপত্তি। বিশেষত্ব হিসাবে জানা গেল - কিরানা ঘরানার মূল বৈশিষ্ট্য হল প্রতিটি স্বর বা সুরের নিখুঁত উচ্চারণ ও সৌন্দর্যের প্রতি মনোযোগ।এখানে মীড় (সুরের মধ্যে মসৃণ গ্লাইড), গমক (স্বরের দোল) এবং শ্রুতি (অতিসূক্ষ্ম সুরভেদ) ব্যবহারে বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হয়। গানের কচকচি মাথায় ঢুকবে না। তার থেকে ম্যাপে কইরানা জায়গাটা খুঁজে বার করা গেল। মুজাফফরনগরের কাছে। জেনারেল নলেজের ঝুলি বাড়ল
“আলোকেরই ঝর্ণাধারায় ধুইয়ে দাও”, গানের মাঝামাঝিতে দুম-ফটাসের মাঝে অমাবস্যার উদয়। ঘুটঘুটে অন্ধকারে মোবাইলের টর্চ জ্বলে উঠল। এরপর “প্রাণ চায়, চক্ষু না চায়” শুরু হল। আমার প্রাণ যেটা চাইছিল সেটাতেই মনোনিবেশ করি, চক্ষু মোবাইলে সেটে গেল। জানি না শুভর ক্যামেরায় সেই ছবি উঠেছে কিনা। আজকাল অনেক গানের অনুষ্ঠানে শিল্পীরা শ্রোতাদের এনগেজ রাখতে মোবাইলের টর্চ জ্বেলে হাত নাড়াতে বলেন। এখানে অবশ্য দুই শিল্পী মাঝে মাঝে পরিচিত গানের দুই-এক কলি শ্রোতাদের গাইতে বলছিলেন। এরকম অবস্থায় আমার টেনশন হয়। স্কুলে একবার কোরাসের লাইন থেকে দিদিমনি বার করে দিয়েছিলেন, তাই থেকে স্থির বিশ্বাস গর্ধভ রাগিনী পর্যন্ত আমার দৌড়! ঘন্টা দুয়েক ধরে অনেক গান হল। স্বর্ণযুগের গান বলে কিছু ষাট-সত্তর দশকের আধুনিক গান শোনা গেল। জানতে ইচ্ছে হল বর্তমানে বাংলা গানের কোন যুগ চলছে, তাম্র না রৌপ্য। ঘোর কলিও হতে পারে, কারণ নূতন গানের দুই এক কলিও শোনা গেল না। শ্রোতারা অবশ্য সবই পাকা চুল মাথা, সুতরাং পুরানো বাংলা গানের ভক্ত। তার সঙ্গে চির পরিচিত রবীন্দ্রসঙ্গীত আছে। সেন্টু ঘেঁষা গানও শোনা গেল “ঘুমিয়ে ছিলাম মায়ের কোলে কখন যে মা গেল চলে… ও তোতা পাখি রে, শিকল খুলে এনে দে আমার মাকে…”। গায়ক-গায়িকা দুইজন টানা দুই ঘন্টা দাঁড়িয়ে গান করলেন। বেশ কষ্টসাধ্য ব্যাপার বলেই মনে হল।
খাওয়ার ব্যবস্থাপনায় রাজদীপ একাই একশো। সিটে বসেই গরম গরম পকোড়া আর তরমুজের রস এসে গেল।
একেবারে মেহফিল। রক্তকরবী মার্কা তরমুজের রসকে ব্লাডিমেরি ককটেল ভাবতে আপত্তি কি। শুভ আবার ক্যামেরা হাতে ফটো তুলে বেড়াচ্ছে। ৬২ বঙ্গস এর অফিসিয়াল ফটোগ্রাফার।
মাঝামাঝি সময়ে বাসব এনাউন্স করল টি কাম বায়ো ব্রেকের। “ছোট বাইরে”র সুন্দর পোষাকি নাম। বাসবের ঝুলিতে নানা চমক থাকে। কাঁধে ঝোলান হ্যান্ড মাইক ও স্পিকার নিয়ে বাসব সব সামলাচ্ছে।
প্রভূত হাততালির মাঝে গান শেষ হল। মঞ্চে স্ক্রিনে খাওয়ার ব্যবস্থাপনা সম্বন্ধিত করণীয় নিয়মাবলী। নিয়মাবলীর নামাবলিতে জড়াতে চাই না। কব্জি গুটিয়ে সুরুৎ করে দক্ষিণ হস্তের জন্য লাইন লাগাই। এ ব্যাপারে ভারতীয় মাত্রেরই সহজাত স্কিলসেট। জনভারে নুব্জ্য দেশের নাগরিক হওয়ার সুবাদে লাইনভাঙার আইনে সিদ্ধহস্ত। সুপার সিনিয়ার সিটিজেনদের লাইন আগে। এরকমটা করতে হয়েছে, কারণ দীর্ঘ পঁচিশ বছর পেরিয়ে ৬২ বংসের মধ্যবয়সীরা আজ সবাই ষাটোর্ধ্ব । গত পুজোর দুপুরের ভোগের লাইনে সিনিয়ার সিটিজেনের লাইন নরমাল লাইনের থেকে দীর্ঘতর ছিল। তাই এবার ষাটের কোটার লোকেদের “বালাই ষাট” বলে নরমাল ক্যাটাগরিতে ফেলা হয়েছে। দুটো কাউন্টারে আগেই হোয়াটস্ এ্যপে স্টেপ বাই স্টেপ খাবার ডিস্ট্রিবিউশনের দায়িত্বে থাকা কুশীলবদের নাম এসে গিয়েছে। আট থেকে আশি, অনেকেরই নাম। আমার নামও জ্বলজ্বল করছে সেকেন্ড ব্যাচে চাটনি নামক বস্তুটি দেওয়ার জন্য।
একদিকে ভাল, মাছে ভাতে বাঙালি মাছের সাইজে স্পর্শকাতর, তারপর আবার গাদা-পেটি নির্বাচনের ব্যাপার আছে। আমার মত অল্পই আছেন যারা ল্যাজা পেলেও “ল্যাজে গোবরে” হন না। চাটনি কমবেশীতে চটাচটির কারণ নেই। তবে চাটনি দেওয়াটা স্কিলফুল জব বলে মনে হল। পরিমাণটা অপ্টিমাম রাখতে হবে। ভর্তি প্লেটের মধ্যে খালি জায়গা খুঁজে চাটনি দিতে হবে। চাটনির আক্ষরিক অর্থ হল চেটে খেতে হবে।অন্য কিছুর সঙ্গে মিশে গেলে কেলো। এ ব্যাপারে বলি, কালিপূজার রাতের মাটন কারি ডিস্ট্রিবিউশনে দুই একজন এক্সপার্ট আছেন যাদের হাতে বা হাতায় দুই পিসের বেশী ওঠে না। তবে ঝোলের ব্যাপারে এরা দাতাকর্ণ। এরা “মাছে-ভাতে বাঙালি”র পরিবর্তে “ঝালে-ঝোলে বাঙালি” তে আস্থা রাখেন, অম্বলটা বাই প্রোডাক্ট। এরা যে কাউন্টার আলোকিত করে দাঁড়ান, আমি সেখান থেকে শত হস্ত দূরে থাকি। চাটনির জন্য এরাই পারফেক্ট চয়েস। যাই হোক সেকেন্ড ব্যাচে যার খেলেন, তারা মুষ্টিমেয়, বেশীরভাগ ফার্স্ট ব্যাচে পরিবেশন করছিলেন। তাঁরা সেল্ফহেল্প করে নিলেন, আমিও রক্ষে পেলাম গুরুদায়িত্ব থেকে। রসগোল্লার কাউন্টারে কুপনের বিনিময়ে পাওয়া যাচ্ছে। এখানেও বাসবের মিডাস টাচ।
বেরসিক লোক হলে ট্রাডিশনাল ওয়েতে লিখে রাখত “ একটির বেশী চাহিয়া লজ্জা দিবেন না”! বাসব ময়রার ছবি দিয়ে লিখেছে “একটির বেশী দিমু না!” থালাটার সাইজ পূর্ণশশীর মত এবং শক্তপোক্ত। একবারে লুচি, বেগুনি, বাসন্তী পোলাও মাছ, চিকেন নিয়ে নিশ্চিন্ত। খাওয়ার মাঝে গেট ক্রাশ করে রিপিট ফিলিং করার দরকার পড়ল না। ক্যাটারারের কর্ণধার অনিরুদ্ধের থেকে জানলাম, ইনি সুইগি-জমেটোতেও আছেন। “ডাকঘর” নামটাতেও বেশ বাঙালিয়ানার প্রভাব। সেই ফাঁদে পা দিয়ে গতকাল দুপুরে খাবার আনিয়ে হতাশ হতে হল। বেশ নিম্নমানের। ওয়ান রেটিং দিয়ে শান্তি পাওয়া গেল।
ফ্যাশান আইকন দেবলীনা রিসেপশন কমিটিতে বিসিএর মেম্বারশিপের ফর্ম নিয়ে ব্যস্ত ছিল। কলেজ লাইফ থেকে সুন্দরীললনাদের খুঁটিয়ে দেখার অভ্যাস। গত পুজোতে কাউকে একটা “চুল তার কবেকার বিদিশার নিশা” বলাতে সেই বনলতা সেন খুশী হয়েছিলেন বলেই মনে হয়েছিল। ইনার হাতে লক্ষ করেছি কি একটা ঝুমকো গোছের ঝুলছে। “বেরিলি কা বাজার মে ঝুমকা গিরা”, কান থেকেই হয়েছিল বলে জানি। কার্নিক মেরে দেবলীনাকে জিজ্ঞাসা করি “এটা মনে হচ্ছে নূতন ফ্যাশান? চুড়ি থেকে ঝুমকো দুলছে। “বোল কঙ্গনা-বোল চুড়িয়া” গানের সাথে হাত নাড়ালে দ্বিগুন জোরে বাজবে।
দুটো আইসক্রিম পরিবৃত কোনকে কোনাকুনি করে ঝুমকোর ফটো নিই।
বুদ্ধিমান লোক। ডিনারটা কব্জি ডুবিয়ে কষে করবেন, এরকমই ইচ্ছে মনে হল। পরিশিষ্ট পকোড়া আগামীকাল প্রভাতী চায়ের স্ন্যকস। এনার মুখে মাস্ক। পলিউশন নয় পোলেন গ্রেনে এল্যার্জি বলে জানালেন। ইনি আমার লেখার একনিষ্ঠ পাঠক, তাই আলাদা খাতিরদারি। এ্যমেচার গায়িকাদের মত এ্যমেচার লেখকদের ফ্যান ফলোয়ার, সিন্ধুতে বিন্দুর মত খুঁজে বার করে নারচার করতে হয়, নইলে “পাখি কখন উড়ে যায়।” নিজের স্বল্পলব্ধ জ্ঞানে জানাই -এ্যলার্জি টেস্ট কর আর রোজ একটা করে মনটেয়ার এফ-এক্স খা। এটা ও অলরেডি খাচ্ছে বলে জানাল। গৌতম ৬২ বংসের আরেক উজ্জল নক্ষত্র।
ওর পাঞ্জাবির ডিজাইন দেখে লিসবনে দেখা পর্তুগিজ কোবেলস্টোন ডিজাইনের ফুটপাথ মনে পড়ল।রাস্তায় তাকালে ভ্রম হত যে ফুটপাথ উঁচুনীচু, একরকম অপটিকাল ইলিউশন আর কি। দুটো ছবিই দিচ্ছি। মিলিয়ে নেবেন। খাওয়া পর্বের শেষে গল্পগাছার পর্ব। সেখানে টিন সেনসেশন কৌরভকে ধরে সবাই গান শুনছে।
কৌরভ স্টেজ ফ্রি। দর্শকের অনুরোধে কফিহাইসের সেই আড্ডাটা চমৎকার সুরে গেয়ে দিল। এগারটা বাজল। হল ফাঁকা হয়ে আসছে। আমাদের স্যুভেনির সেক্রেটারি সুশোভন নকশী ডিজাইনের পায়জামা পাঞ্জাবিতে সুশোভিত হয়ে মঞ্চ মাইক হাতে ফাঁকা হলে দাঁড়িয়ে।
মনে হচ্ছে সামনের ফাংশানে সঞ্চালকের ভূমিকার প্র্যাকটিশ করে নিচ্ছে। এবার বেরোনর পালা। মোটামুটি ফিলো সিস্টেমে চলেছি। “ফার্স্ট ইন, লাস্ট আউট”। পাঁচশ টাকা কড়ায় গন্ডায় উসুল হল মনে হচ্ছে!
দেবদত্ত
১৭/০৫/২৫


























খুব ভালো লাগলো পড়ে । আমি তো function এ ছিলাম না, পড়ে পুরো জানলাম ।
ReplyDeleteThank you so much 😊
Deleteপড়ে বেশ মজ লাগল।
ReplyDeleteDarun hoyechhe Dada. La jawaab. Expect more in future.
ReplyDelete👍
DeletePratibarer moto ebareo darun lekha porlam....saririk asusthotar jonyo anusthanti upobhog parini,kintu apnar kalomer jore puro anusthanti amar chokher samne bhese uthlo...apnake asesh dhonyobad
ReplyDeleteখুব আনন্দ পেলাম পড়ে
ReplyDeleteখুব সুন্দর লিখেছ। তোমার অন্য সব লেখার মতই এই লেখাও হাস্যরসে ,সাহিত্য রসে পূর্ণ।
ReplyDeleteHa Ha, দারুণ ভালো লাগলো তোর লেখাটা।চালিয়ে যা।
ReplyDeleteNicely written, as usual
ReplyDelete