কর্নাটক কলিং ৪ (শেষভাগ)
কর্নাটক কলিং ৪ (শেষভাগ)
আজ ২৪শে অগাস্ট। আলমাট্টি থেকে যাব হাম্পি, এটাই পুরো ট্রিপের স্টার এট্রাকশন। আলমাট্টি থেকে NH 50 ধরে গেলে, হসপেট থেকে ছোট রাস্তা নিয়ে পৌঁছাতে হবে। আড়াই ঘন্টা লাগবে। আমাদের টার্গেট হল লাঞ্চের আগে পৌঁছান, তাই সকালে লেট করে উঠে ব্রেকফাস্ট করে বেরোলাম। আলমাট্টিতে আমাদের রুমের
সব জানালা দিয়েও ড্যামের ভিউ পাওয়া যাচ্ছিল। গ্রুপ ফটোও তোলা হল।
আমরা হাম্পিতে উঠেছি কর্নাটক টু্যরিসিমের হোটেল ময়ূরী ভুবনেশ্বরীতে।
একতলা ছড়ানো, পাথরের দেওয়াল দেওয়া হোটেলে এসে ফেলুদার যোধপুরের হোটেলটার কথা মনে পড়ল। টানা দুইদিক খোলা করিডোরের মধ্যে দিয়ে একটু পরপর রুম। করিডোরটা এদিক ওদিক করে ভুলভুলাইয়া টাইপের। প্রথমবার বেরোতে গিয়ে রাস্তাই হারিয়ে গেল। দেখতে যাব চৌদ্দশ শতকের সমৃদ্ধ নগরীর ধ্বংসাবশেষ, তারই সঙ্গে সাযুজ্য রেখে আমাদের খোলামেলা, প্রকৃতির কাছাকাছি (অনেকটা জায়গা জুড়ে সবুজ লন
আর গাছগাছালি আছে) ষাট/সত্তর দশকে নির্মিত এই হোটেল আমার বেশ পছন্দ হল।
তিনটে নাগাদ বেরোলাম। আমরা চারজন বেরিয়েছি। শিবু আর সোমনাথ রেস্ট নিচ্ছে। হোটেলের কাছাকাছি হাম্পি শহরের মেন দ্রষ্টব্যগুলি। একদিকে হল ভিটালা টেম্পল কমপ্লেক্স, সেখান থেকে চারকিমি দূরে বিরূপাক্ষ মন্দির হাম্পি বাজার, কৃষ্ণা বাজার, নরসীমা স্ট্যাচু এবং আরেকটা সাইডে হল রাজা-রাণীর মহল। যদিও এটাকে বিজয়নগর এম্পায়ার বলা হচ্ছে, চারটি পৃথক রাজবংশ (সঙ্গমা, সুলাভা, তুলাভা, আরেভিদু) এখানে শাসন করেছেন।
টাইমফ্রেম ও নাম উপরের ছবি দেখলে পরিষ্কার হবে। হরিহর আর বুক্কা দুই ভাই এই সম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন (১৩৩৬ সালে। তবে বিজয়নগর সম্রাজ্যের গোল্ডেন পিরিয়ড হল তুলাভা ডাইনাস্টির কৃষ্ণ দেবরায় (১৫০৯-২৯) এর রাজত্বকালে। শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিখ্যাত ঐতিহাসিক উপন্যাস ‘তুঙ্গভদ্রার তীরে’ ঐ সময়ের পটভূমিকায় লেখা। সমসাময়িক তুঙ্গভদ্রার উত্তরে ডেকান প্লেটোতে ছিল বাহমনি সুলতানেট (১৩৪৭-১৫২৭)। এদের সঙ্গে বিজয়নগরের হিন্দুরাজাদের যুদ্ধবিগ্রহ লেগেই থাকত। কৃষ্ণা নদী ও এর শাখানদী তুঙ্গভদ্রার মাঝের অংশটি হল রায়চূড় দোয়াব, ফার্টাইল ল্যান্ড।
এই জমির দখল নিয়ে মূলত যুদ্ধ লাগত। চোদ্দশ শতকের প্রথমদিকে দিল্লি সুলতানেটের দাপটে কর্নাটকের হয়শালা, অন্ধ্রপ্রদেশের কাকাতীয় আর তামিলনাড়ুর পান্ডিয়া রাজ্যের পূর্ব গৌরব অস্তমিত হওয়াতে এক বড় শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছিল।
এই সময়ে বিজয়নগর সম্রাজ্যের সূত্রপাত। চারিদিকে পাথরের পাহাড়, উত্তরে তুঙ্গভদ্রা, ফার্টাইল জমি যা ছিল শত্রুপক্ষের জন্য ন্যাচারাল ব্যারিয়ার ও লোকাল জনবসতি ছিল মূলত হিন্দু শিবাইটস থাকায় হাম্পি বা পম্পাক্ষেত্র বিজয়নগরের রাজধানী হয়, যা কালক্রমে এক বর্ধিষ্ণু জনপদে পরিণত হয় এবং স্বর্ণযুগে এখানে ছয় লক্ষ লোকের বাস ছিল। বাহমনি সম্রাজ্য ১৫২৭ এরপর ভেঙে দিয়ে পাঁচটি পৃথক সুলতানেট তৈরী হয় - বিজাপুর, বিদার, বেরার, আহমেদনগর ও গোলকুন্ডা। ১৫৬৫ সালে এদের মিলিত শক্তি বিজয়নগরকে হারিয়ে দেয় তালিকোটার যুদ্ধে।
আমরা যাচ্ছি নদী পেরিয়ে হাম্পির নর্দান দিকে। চারিদিকে পাথরের টিলা আর সদ্য বর্ষাস্নাত সবুজ বনানী। এরকম ল্যান্ডস্কেপ উত্তর ভারতে কোথাও দেখি নি।
কালকে সারাদিন ধরে সাদার্ন সাইডের আকর্ষণীয় জায়গাগুলি দেখব। আধা ঘন্টা ড্রাইভের পর তুঙ্গভদ্রার উপরে একটা ব্রীজ পেরিয়ে যেখানে পৌঁছালাম সেটা হল অন্জনাদ্রি হিল। এটাই হল রামায়ণে বর্ণিত বানর সেনার রাজত্ব কিষ্কিন্ধ্যা। চারিদিকে সত্যিই অনেক বাঁদর। হাম্পি হল বেলারী জেলার হসপেট তালুকে। এখানে অনেক কলা হয়। আসার সময় কলাগাছ আর পাথুরে টিলা দেখতে দেখতে এলাম। কলাক্ষেত্রের আধিক্যে বাঁদরের শ্রীবৃদ্ধি হয়েছে বলে মনে হয়! পাথুরে পাহাড়ের উপরে হনুমান মন্দির।
নীচে থেকে দেখা যাচ্ছে না। ছয়শ স্টেপ উপর অব্দি উঠতে হবে।আধাঘন্টা লাগল দুইতিনবার রেস্ট নিয়ে। পুণ্যার্থীর সংখ্যা ভালই।আর একটু পরে সূর্যাস্ত হবে।সেটা দেখার জন্য সবাই অপেক্ষা করছে। এখানে সবাইকে দেখি গলায় গেরুয়া গামছা ঝোলান।
একটি ছেলেকে বল্লাম ফটো তুলে দাও। সে তার গেরুয়া স্কার্ফ আমার গলায় জড়িয়ে দিয়ে ফটো তুলে দিল। হনুমান মন্দিরে ঢোকার বদলে নীচের নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখছি। পশ্চিমের অস্তমিত সূর্যের সোনালী আলোয় সবুজের সমারোহ।
নীচে তুঙ্গভদ্রার জল চিকচিক করছে। তারও ওপারে দক্ষিণ দিকে ভিটালা টেম্পল কমপ্লেক্স দেখা যাচ্ছে। বিরূপাক্ষ আর রয়াল প্যালেস মনে হয় টিলার আড়ালে ঢাকা পড়ে গিয়েছে। সন্ধ্যে হয়ে গেল যখন বাকীরা নীচে নামল। আমি কিছুটা আগেই নেমেছি। অন্ধকারে পম্পা সরোবর দেখার কোন মানে নেই। তাই ফিরে এলাম হোটেলে। হোটেলে এক বাঙালী গ্রুপ আছেন। তাঁরা বয়স্ক, তবে সবাই বেড়াতে এসে বিন্দাস। রবি ঠাকুরের গানের সংঙ্গে নাচ হল ডিনারের আগে। পরের দিন রিসেপশনের মেয়েটি আমায় জিজ্ঞাসা করল - আপনারা ডান্স করছিলেন। বল্লাম- আমরা না, তবে আমাদের দেশোয়ালি ভাইরা করেছেন। আমাদের অন্য আসর ছিল-চালাও ফোয়ারা, জিন, শেরী, শ্যাম্পেন!
পরের দিন পঁচিশে অগাস্ট। আগেই হোটেলের মারফত গাইডের সঙ্গে কথা হয়ে গিয়েছিল। ব্রেকফাস্ট করে বেরিয়ে পড়া গেল। প্রথম এলাম ভিটালা টেম্পল কমপ্লেক্সে। এখানে ঢুকতে টিকিট লাগে।
টিকিট কেটে ব্যাটারি গাড়ীর লাইনে দাঁড়াতে হল, তবে খুবই অল্প সময়। কালকে ডিনার টেবিলে এক বাঙ্গালী কাপল, যারা ব্যাঙ্গালোর থেকে এসেছেন, বলেছিলেন কাল রবিবার বলে খুব ভীড় ছিল। ওরা হেঁটেই গিয়েছিলেন। আমাদের গাইডের নাম গুলিগাপ্পা।
ব্যবহার ঠিক আছে কিন্তু গাইড হিসাবে দশে চারের বেশী দিতে পারলাম না। একদম নিষ্প্রাণ কথাবার্তা।গাইড যদি দর্শকের মনে কিউরিওসিটি না জন্মাতে পারে তাহালে অর্ধেক নম্বর ওখানেই বাদ।আমার মনে হয় গাইডের একটা এ্যপস থাকা, যাতে ভারতের সব দর্শনীয় জায়গার গাইডের নাম থাকবে ইউজার রেটিং সহ। বিশেষত তাৎপর্য বুঝতে ঐতিহাসিক স্থানে গাইড নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।
হাম্পির ভগ্নাবশেষকে যে কোন রোমান সিটি (আমার দেখা তুরস্কের ইফেসাস,
Merida, SpainEffesus, Turkey
হেয়ারোপলিস বা স্পেনের মেরিডার) সঙ্গে তুলনীয়, যদিও রোমান সিটিগুলি আরো আগে তৈরী হয়েছিল। রোমান সময়ে রোমে বসবাসকারী দশলক্ষ জনসাধারনের জন্য, আজ থেকে দুইহাজার বছর আগে রোমে গ্রেনস আসত ইজিপ্ট, সিসিলি, নর্দান আফ্রিকা থেকে মেডিটেরেনিয়ান সি রুটে। আনইন্টারাপ্টেড গ্রেন সাপ্লাই বজায় রাখা রোমান সম্রাটের প্রধান কাজ ছিল। প্ল্যানড রেবেলিয়ান এ্যক্টিভিটি হলে শস্যর সরবরাহ বাধাপ্রাপ্ত করা হত, যাতে শহরে জনরোষ তৈরী হয়। হাম্পিতেও সুরক্ষার জন্য সাতটি কনসেনট্রিক পাঁচিল ছিল। আউটার পাঁচিলের ভিতরে ছিল চাষবাসের জমি। এরকারণ ছিল শত্রুপক্ষ হাম্পি সিজ করলে যাতে খাবারের অভাব না হয়।
এককিমি মত গাড়িতে আসতে আসতে দুইদিকে খাড়া পিলারগুলি দেখিয়ে গাইড বল্ল এসব হাম্পি বাজারের অংশ।
গাড়ি থেকেই একটা মন্ডপ দেখে ফটো নিলাম। পরে জুম করে দেখলাম এর নাম হল কুডরুগম্বে মন্ডপম।
এই নামের আরেকটি মন্ডপম আছে বিরুপাক্ষ বাজারে। এর পিলারগুলিতে অশ্বারোহী সৈনিক। অনুমান করা হয় এখান থেকে বিশেষ তিথিতে প্রসেশন বেরোত। ভিটালা মন্দিরের গোপুরম পর্যন্ত টানা বাজারের ধ্বংসস্তূপ দেখে বোঝা
যায় বিজয়নগর একসময় কতটা সমৃদ্ধ ছিল। ষোলশ শতকের প্রথমদিকে মহারাজ কৃষ্ণ দেবরায়এর সময় এর প্রধান নির্মানকার্য সম্পন্ন হয়। গোপুরম পেরিয়ে মন্দির কমপ্লেক্সে ঢুকলাম। গোপুরমের কিছু অংশে গেরুয়া রং। এএসআই গোপুরমের স্কাল্পচারগুলিকে কালো হওয়ার হাত থেকে বাঁচাতে কোন কেমিক্যাল ট্রিটমেন্ট করেছিলেন, যেটা কার্যকরী রেজাল্ট দেয় নি।
ভিতরের চত্বরে প্রথমেই চোখে এল বিখ্যাত চ্যারিয়টের।
পাথরে তৈরী অসাধারন শিল্পকর্ম। পঞ্চাশ টাকার নোটে এরই ছবি আছে। এরকম পাথরের রথ আছে আর দুটো জায়গাতে, মহাবলীপুরম আর কোনার্ক সান টেম্পলে।কাঠের ব্যারিয়ার দেওয়া। গাইড বল্ল এই পাথরের চাকা নাকি ঘোরান যেত। গরুড় হল বিষ্ণুর বাহন। এই রথে আগে গরুড় মূর্তি ছিল। তাই এই রথ গরুড় রথ নামে পরিচিত। রথের সামনে হল মহামন্ডপ, বামদিকে কল্যাণ মন্ডপ আর ডানদিকে হল বিজয় ভিটালা মন্দির। মহামন্ডপের সামনের দিকটা হল বিখ্যাত মিউজিক পিলার।
৫৬টা পিলার আছে। মেন পিলারকে ঘিরে কয়েকটা সাব-পিলার। এ সব মার্বেলের। প্রত্যেকটাতে ট্যাপ করলে ডিফারেন্ট নোট বেরোয়। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমরা সেটা চাক্ষুষ করতে পারলাম না। এএসআই এখন ভিজিটরদের উপরে উঠতে দিচ্ছেন না। গাইড মোবাইলে বাদ্যযন্ত্রের নোট শোনালেন। বল্লাম এটা তো বাড়ীতে বসেই শুনতে পারতাম! এখানে কেন এলাম? Tourist ফ্রেন্ডলি করতে সরকারের বড় অনীহা। মহামন্ডপের উপরে যাওয়া গেল না। দূর থেকে ভিতরের পিলারগুলিতে খোদাই করা কারুকাজ দেখা গেল। কমপ্লেক্সের মাঝখানে মহামন্ডপ। ডানদিকে ভিটালা টেম্পলে ঢুকলাম।পিলারগুলিতে সূক্ষ খোদাই করা ঠাকুর-দেবতার মূর্তি।
ভিটালা টেম্পল কমপ্লেক্সের সবগুলি মন্ডপই ভারতীয় মন্দির শিল্পের চরম উৎকর্ষতার পরিচয় বহন করছে। এই মন্দিরে পূজা হয় না কারণ ডেকান সুলতানেটের কাছে পরাজয়ের পর হাম্পি বিজেতাদের হাতে লুন্ঠিত হয়, মূর্তি ভাঙা পড়ে। হিন্দু ধর্মের নিয়ম অনুযায়ী খুঁতওয়ালা দেব-দেবীর পুজো হয় না। এরপরে এলাম কল্যাণ মন্ডপে। গাইডের কাছে শুনলাম এখানে প্রধানত বিবাহের মত শুভকাজ ও বিশেষ তিথিতে মন্দিরের সেরিমোনিয়াল রিচ্যুয়ালস বা ফাংশন হত। এর অনেকগুলি আউটার পিলারে অশ্বারোহী ঘোড়ার স্কল্পচার আছে।
পরে যে বিরুপাক্ষ টেম্পলে গেলাম, আয়তনে বড় হলেও এত সূক্ষ্ম কাজ নেই।
বছরখানেক আগে চাণক্যপুরীতে হাম্পির উপর একটা লেকচার শুনতে গিয়েছিলাম।বসুন্ধরা কাভালি ফিলোজট ও তার ফ্রেঞ্চ বাজব্যান্ড, যিনি একজন সংস্কৃত পন্ডিত। বয়সের ভারে নুব্জ্য। ১৯৬০ সালে কলেজে পড়ার সময় হাম্পি গিয়েছিলেন, সেই থেকে হাম্পির ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করছেন।
এদের জুটিকে হাম্পির এনসাইক্লোপিডিয়া বলা হয়। ইনি বলছিলেন ইতিহাসের প্রামাণ্য তথ্য হল সমসাময়িক শিলালিপি। হাম্পিতে এরকম চারহাজার শিলালিপি আছে। এর ভিত্তিতে উনি বেশ কিছু বই লিখেছেন। বসুন্ধরা জানালেন বিজয়নগরের পরিবর্তে এর নাম হওয়া উচিত কর্নাটক সম্রাজ্য। কারণ সব শিলালিপিকে সেই নাম উল্লেখ আছে। গাইড গুলিগাপ্পাকে জিজ্ঞাসা করলাম এদের কথা। গুলিগাপ্পা জানাল কয়েক বছর আগে ওরা এসেছিলেন হাম্পিতে। কিছু লোকাল গাইড ওদের সাহায্যর জন্য ছিল। তার মধ্যে গুলিগাপ্পাও ছিল।
ব্যাটারি গাড়ীতে ফিরে এসে আমরা এলাম চার কিমি দূরে বিরূপাক্ষ মন্দিরে।
গাড়ী থেকে নেমে কিছুটা হাঁটতে হল মন্দিরের গেটে পৌঁছানর জন্য। অবশ্য কিছু ভিআইপি গাড়ী এল একেবারে গেটের সামনে। এটা আমাদের দেশীয় কালচার। সামনে বিশাল গোপুরম। আসার রাস্তায় দুইদিকে সারি দেওয়া বাজারের ধ্বংসাবশেষ দেখা গেল।
গাইড বল্ল যখন ১৯৮৭ সালে হাম্পি ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের তকমা পায়, তখন অনেক ফরেন টুরিস্ট আসতে শুরু করে। তারা গোয়া ঘুরে সোজা এখানে আসত। তখন হাম্পিতে এত হোটেল ছিল না। এইসব পুরানো দোকানগুলোকে লোকজন হোটেল বানিয়ে ফেলে। পরে এএসআই আবার পুনরুদ্ধার করে রেস্টোরেশন করেছে ২০২০-২১ সালে। কিছু দোকানঘর আবার দোতলা। বাজারের কাছাকাছি কিছু সৌধ দেখলাম, তবে যাওয়ার উপায় নেই। এত নামী হেরিটেজ সাইটের ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট বেশ পুওর বলে মনে হল। প্রথম গোপুরম পেরিয়ে আরেকটা গোপুরম, তার ভিতরে আসল মন্দিরের উপরঅংশ দেখা যাচ্ছে।
গাইড জানালেন হাম্পিতে বিজয়নগর সম্রাজ্য শুরু হওয়ার আগে এখানে ছোট শিব মন্দির ছিল। সপ্তম শতকে চালুক্যদের সময়ের শিলালিপিতে এর উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে আসল এক্সপানসন হয় কৃষ্ণদেবরায়ের সময়ে।গোপুরমের উচ্চতা হল পঞ্চাশ মিটার। তালিকোটার যুদ্ধে (১৫৬৫) হেরে যাবার পর মুসলিমরা ধনসম্পত্তি লুট করলেও বিরুপাক্ষ টেম্পলের কোন ক্ষতি করে নি। এর কারণ মনে করা হয় লোকাল হিন্দুসম্প্রদায়ের বিশ্বাস অর্জন। সেই কারণে এই মন্দিরে আনইন্টারাপ্টেড ভাবে পূজা চলে আসছে। গোপুরমের গেটের পাশে পাথরে খোদাই একটি তলোয়ার সহিত বরাহ
দেখিয়ে গুলিগাপ্পা জানাল এটা হল বিজয়নগরের রাজকীয় সিল। মন্দির চত্বরের বামদিক দিয়ে মূল মন্দিরে প্রবেশের আগে লম্বা করিডোর। সেখানে এক জীবন্ত হাতি দর্শকদের আকর্ষনের কেন্দ্রবিন্দু।
কেউ কয়েন দিলে, সে সেটাকে শুড় দিয়ে তুলে মাহুতকে দিচ্ছে। তারপর শুঁড় তুলে সেলাম করছে। হাম্পির মন্দিরের সব পিলারই লক্ষণীয় ভাবে শিল্পকর্মে সমৃদ্ধ।
একটা ছোট পাথরের ঘরে নেমে গাইড দেখালেন দেওয়ালে গোপুরমের ইনভার্টেড ছায়া পড়েছে একটা পিনহোল ক্যামেরার টেকনিকে।
মন্দির থেকে বেরিয়ে একটা বড় পুষ্করিনী দেখা গেল। দক্ষিণের সব বড় মন্দিরেই সংলগ্ন পুকুর চোখে পড়ে।
নিয়ম হল স্নান করে শুদ্ধচিত্তে পুজো দেওয়া। তুঙ্গভদ্রার এক ছোট ধারা এখানে এসেছে। পুরাকালে তুঙ্গভদ্রা পম্পা নামেও পরিচিত ছিল। পম্পা ছিলেন শিবের স্ত্রী। এই জায়গার পম্পানগরী নামেও খ্যাত।যে গোপুরম দিয়ে ঢুকেছিলাম, বেরোতে হল অন্যদিক দিয়ে।
মন্দিরের দেওয়ালের পাশ দিয়ে কাঁকড়ের মধ্যে দিয়ে হাঁটতে হল। বন্ধুরা সব গাড়ীর দিকে এগোল। আমি একাই নাক বরাবর সোজা চলতে লাগলাম।
নির্জন পথ। দুইদিকে সারিবদ্ধ বাজার। অনেকটা দূরে সিঁড়ি উঠে গিয়েছে। সেই অব্দি যাওয়ার আগে গাড়ি ব্যাক করে আমাকে তুলে নিল। হাম্পি- কমলাপুর লিঙ্ক রোড ধরে কিছুটা এসে নামলাম যেখানে তার একদিকে কৃষ্ণা বাজার,
অন্যদিকে এক চট্টানের উপর কৃষ্ণা টেম্পল। বাজারের পাশে যে সরোবর দেখা যাচ্ছে সেটা হল কৃষ্ণা সরোবর। বিরুপাক্ষ আর ভিটালা বাজার ছিল ঘোড়া, জেমস, সিল্ক, মশলাপাতি ইত্যাদি মহার্ঘ জিনিষের বাজার। এখানে বিদেশী বণিকরা ভীড় করত। কৃষ্ণা বাজার হল দৈনন্দিন জিনিষপত্র বিক্রির জন্য মূলত লোকাল পপুলেশনের বাজার। সময় বেশী নেই। হাম্পি অনেকটা ছড়িয়ে ছিটিয়ে। ভাল করে দেখতে তিনদিন লাগে। আমরা পেয়েছি মাত্র দেড়দিন। তাই দূর থেকে বাজারের ফটো নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হল।
এরপর এলাম কৃষ্ণা টেম্পলে। ১৫১৩ সালে কলিঙ্গ বিজয়ের পর কৃষ্ণদেবরায় এই মন্দির তৈরী করেন।
পাশে হল হেমকূটা হিল। এখান থেকে সূর্যাস্ত দেখা যায় আর বিরুপাক্ষ টেম্পলের সুন্দর ভিউ পাওয়া যায়। আজ বিকালে আমরা যাব তুঙ্গভদ্রা নদীতে কোরাকল রাইডে। সুতরাং হেমকূট হিল এযাত্রায় হবে না। মন্দিরে গোপুরম দ্বার দিয়ে প্রবেশ করলাম। মূল মন্দিরে ওঠার আগে দুই দিকে গয়নাগাটি সহ হাতির স্কাল্পচার।আউটার পিলারে ঘোড়সওয়ার। এরকমটা দেখেছিলাম ভিটালার কল্যাণমন্ডপে। ভিতরে কোন মূর্তি নেই। যে বালকৃষ্ণের অরিজিনাল মূর্তি ছিল সেটা রাখা আছে চেন্নাই স্টেট মিউজিয়ামে। মন্দির প্রাঙ্গণটি বেশ বড় এবং অনেক অর্নেটেড পিলার।
মন্দিরের কাছেই উগ্র নরসীমা মূর্তি। ৬.৭ মিটার উচ্চতার এই বিশাল মনোলিথিক স্ট্যাচুর দিকে তাকালে ভয় লাগে।
চোখ দুটো যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসছে। এরকম জীবন্ত মূর্তির জন্য আর্টিস্টকে কুর্নিশ জানাতে হয়। রিপাবলিক ডে প্যারেডে কর্নাটক স্টেটের ট্যাবলোতে এর রেপ্লিকা দেখেছি। গাইড দেখাল মুসলিম আক্রমনে নরসীমার পা ভেঙে গিয়েছিল। ১৯৮০ সালে পা জোড়া লাগিয়ে পাথরের বেল্ট দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছ। নরসীমা স্ট্যাচুর পাশেই রয়েছে বটাভিলিঙ্গ মন্দির। এর মধ্যের শিবলিঙ্গ হাম্পির সবচেয়ে বৃহদাকার শিবলিঙ্গ।
শিবলিঙ্গ আছে জলের উপর। কোন এক গরীব রমণী এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা। কন্নড় ভাষায় বটাভি মানে গরীব। সেই থেকে মন্দিরের নামকরণ। মধ্যাহ্নের সূর্যর প্রখর দীপ্তির মাঝে দূরে তালগাছের ফাঁক দিয়ে পাথরের টিলা দৃশ্যমান। ঠিক হল আমরা কমলাপুরে হোটেলের কাছে যে হাম্পি মিউজিয়াম আছে সেটা দেখে হোটেলে লাঞ্চ করব। তারপর একটু বিশ্রাম নিয়ে বেরোব। মিউজিয়াম নির্মানে স্পন্সর করেছে JSW steel.
হাম্পি হল বেলারী জেলার মধ্যে। খনিজ সম্পদ প্রধান জায়গা। তাই অনেক বড় কোম্পানির অফিস আছে কাছাকাছি। বাইরের লনেও হাম্পির রুইনস থেকে উদ্ধার করা নানা আর্টিফেক্টস।
১৮০০ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একজন প্রথম এই হাম্পি রুইনসের সন্ধান পান। পরে সার্ভেয়ার জেনারেল কলিন ম্যাকেন্জি এর সিস্টেমেটিক ডকুমেন্টেশন করা হয়। অনেক শিলালিপি উদ্ধার হয়, যা ইতিহাসের মূল্যবান দলিল। ১৮৫৬ সালে আলেকজান্ডার গ্রিনল নাম এক ফটোগ্রাফার যে ফটোগুলি তুলেছিলেন সেগুলি হল সবচেয়ে পুরানো ফটো হাম্পির।
২৬ স্কোয়ার কিলোমিটার জুড়ে হাম্পি ধ্বংসাবশেষের খনন শুরু হয়েছিল ১৯৩০ থেকে ৫০ শের মধ্যে, পরে ১৯৮৬তে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ ডিক্লেয়ার হওয়ার পর এএসআই বড় আকারে রেস্টোরেশন শুরু করে।
১৪শ ও পনেরশ শতকে পার্সিয়ান আর্টিসানরা বাহমনি সুলতানেটের রাজত্বকালে বিদার-এ একধরণের মেটাল ক্রাফটের প্রচলন করেন- যা বিদারি মেটাল আর্টওয়ার্ক নামে পরিচিত।
দিল্লির প্রগতি ময়দানে ওয়ার্ল্ড ট্রেড ফেয়ারে কর্নাটক প্যাভিলিয়ানে বিদারি ছুরি-কাঁচি খুব বিক্রি হয়। ডেকান রিজিয়নের ব্ল্যাক সয়েলের সঙ্গে জিঙ্ক আর কপারের এ্যলয় মিশিয়ে একরকম ট্রিটমেন্ট করা হয়, যাতে মেটাল সারফেস ব্ল্যাক থাকে। তারপর ঐ সারফেসে সিলভার দিয়ে নানা প্যাটার্ন তৈরী হয়। মিউজিয়ামে বিদারি আর্টের তরোয়াল, ঢাল, ছুরি ডিসপ্লে করা আছে।
বিজয়নগরের শুরুর দিকে শৈবধর্মের প্রভাব বেশী ছিল, তবে পনেরশ শতক থেকে বৈষ্ণবধর্মের প্রভাব বেশী দেখা যায়।
মিউজিয়ামে রক্ষিত আর্টিফাক্টসের মধ্যে বিষ্ণুর মূর্তি বেশী,অনন্তশয্যায় বিষ্ণু (রঙ্গনাথ), বিষ্ণুর নরসীমা অবতার, শঙ্খ, চক্র, গদা, পদ্ম ধারী ট্র্যাডিশনাল বিষ্ণু-সবরকম ডিসপ্লে আছে।
ভারতের উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিম, সব জায়গার জনগনের মধ্যে ভৌগলিক ও জলবায়ুর তারতম্য- ভাষা, পরিধানে কত রকমভেদ, কিন্তু সমগ্র দেশকে একই শৃঙ্খলে বেঁধে রেখেছে হিন্দু ধর্মের ব্যাপ্তি। সারা দেশে সমানভাবে পূজিত ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর, কৃষ্ণ, রাম, সীতা হনুমান। ঐ রবিঠাকুরের কথায় ‘বিবিধের মাঝে দেখ মিলন মহান’।
দেশের মিলনবন্ধনের রজ্জুতে ধর্মের বন্ধন আগাগোড়া, যদিও তার অতিকথনে নেমে আসে সামাজিক বিভেদ।
মিউজিয়াম দেখে ফিরে এলাম হোটেলে। লাঞ্চ ও অল্প বিশ্রামের পর আবার শুরু হল সাইট-সিইং। এবার আমাদের গন্তব্য মূল রাজপ্রাসাদ (Royal enclosure) ও তার সংল্গ্ন দর্শনীয় স্থানসমূহ।
প্রথমেই বলে রাখি বিজয়নগর হল গ্রীষ্ম প্রধান জায়গা। তাই রাজার মহল ও পরিবারবর্গের রাজপ্রাসাদ স্টোন ফাউন্ডেশনের উপর কাঠের তৈরী ঘর ছিল। শোনা যায় রাজপ্রাসাদের ঘরের ভিতর ছিল সোনায় মোড়া। ১৫৬৫ সালের ২৬শে জানুয়ারি তে কৃষ্ণা নদীতীরবর্তী তালিকোটার রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে বিজয়নগর পরাজিত হয় ডেকান সুলতানেটের সম্মিলিত (গোলকুণ্ডা, বিদার, বেরার, বিজাপুর, আহমেদনগর) শক্তির কাছে। সুলতানেটের সৈন্যরা রাজপ্রাসাদ জ্বালিয়ে দিয়ে সোনা দানা লুট করে নিয়ে যায়।
১৫একর জায়গার রাজপ্রাসাদের চারিদিকে পাথরের পাঁচিল ও সব কোণে ওয়াচটাওয়ার।
গেট পেরিয়ে ভগ্নস্তুপের চারিধারে ঘাসের গালিচা।
প্রথমে চোখে পড়ল রাণীর প্যালেসের ফাউন্ডেশন। এরপর বামদিকে একটা ইন্দো-ইশ্লামিক আর্কিটেকচারের বিল্ডিং।
এর নাম দেখলাম জেনানা মহল। গাইড জানাল এর দেওয়ালের মধ্যে জলের চ্যানেল আছে, যাতে রুম ঠান্ডা থাকে। এএসআই এর বোর্ডে লেখা রাণীর মহল, জেনানা মহল বা হাতীশাল সবই অনুমানিক, ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই।
তালিকোটার যুদ্ধে হেরে যাওয়ার পর বিজয়নগর সম্রাজ্য অনেক ছোট ছোট অংশে বিভক্ত হয়ে যায়। এরকমই এক রাজা হলেন মাইসোরের ওয়াদিয়ার ফ্যামিলি। বিজয়নগরে সবচেয়ে বড় ফেস্টিভ্যাল ছিল আশ্বিনের নবরাত্রিতে দশেরা ফেস্টিভ্যাল। সোনার হাওদা মোড়া হাতির জৌলুষ বেরত। সঙ্গে সৈন্যসামন্ত ঘোড়সওয়ারের প্যারেড হত, রাজার উপস্থিতিতে। সেই লিগ্যাসি এখনও বহন করে চলেছে মাইসোরের রাজপরিবার।
তখনকার দিনে যুদ্ধের প্রধান হাতিয়ার ছিল ঘোড়া। এই ঘোড়া আসত প্রধানত সেন্ট্রাল এশিয়ার দেশগুলি থেকে। ঐসব অঞ্চলে বিস্তীর্ণ স্তেপ ছিল ঘোড়ার চারণভূমি, জন্মভূমি তো বটেই। মঙ্গোলিয়া ও বাকী মধ্য এশিয়ার দেশগুলির বাচ্চাদের ছোট থেকেই ছিল ঘোড়ার সঙ্গে ওঠাবসা। খুব ছোট থেকেই তারা অশ্বচালনায় সুনিপুণ হত যা যুদ্ধবিদ্যার এক প্রধান শিক্ষা ছিল। স্বভাবিকভাবে ভারতীয় উপমহাদেশে সৈন্যবাহিনী সুসজ্জিত ও ব্যাটেলরেডি করতে অশ্বের চাহিদা ছিল বিপুল। ঘোড়া কিন্তু স্থলপথে আসত না। সমুদ্রপথে আরব, পারস্য দিয়ে ভারত মহাসাগর হয়ে কালিকট বা গোয়া বা কোস্টাল কর্নাটকের বন্দর হয়ে জাহাজে আসত। এই দীর্ঘ জার্নিতে শতকরা ৪০/৫০ ভাগ ঘোড়া মারা পরত। ঐ সময়ে বেশীরভাগ পশ্চিম উপকূলের বন্দর ছিল পর্তুগীজদের দখলে। ফলে অনেক ট্যাক্স দিতে হত ঘোড়া আমদানির জন্য। একটা গ্রামের দুই/তিন বছরের শস্যের জন্য যতটা কর দিতে হত, ততটাকা লেগে যেত খালি একটা ঘোড়া আমদানির জন্য।ভারতের নিজস্ব হল হাতি। শিক্ষিত হাতি যুদ্ধে ব্যবহৃত হত। ঘোড়া ছিল দ্রুতগামী, ওপেন ফিল্ডে শত্রুপক্ষকে ঘেরাও ও ঘোড়ার পিঠ থেকে পদাতিক বাহিনীকে আক্রমণ সুবিধাজনক ছিল। হাতি ছিল যুদ্ধের জীবন্ত দুর্গ, রাজশক্তির প্রতীক ছিল হাতি। তবে আহত হলে হাতি উন্মত্ত হয়ে নিজের সেনানীদের আক্রমণ করত, যে রকমটা হয়েছিল তালিকোটের যুদ্ধে।
জেনানা মহল পেরিয়ে এলাম এক লনে, যার অন্যপ্রান্তে হল হাতিশালা।
ছাদের ক্যানপিগুলি শিল্পসমৃদ্ধ। বামদিকে রাইটসএ্যঙ্গেলে একটি আয়তাকার বিল্ডিং, যার নাম হল গার্ডস হাউস। ভিতরে একটি ছোট মিউজিয়াম।
বাইরে লেখা দেখলাম নামে গার্ড হাউস হলেও এটি ব্যবহৃত হত ট্রেজারি ও কনসার্ট হল হিসাবে।
রয়াল প্যালেস থেকে বেরিয়ে হাজারা টেম্পলে যাওয়ার পথে বামদিকে একটা খোলা প্রান্তর দেখিয়ে গাইড জানাল এখানে পান-সুপারি বাজার ছিল।
এটি ছিল রাজপরিবার ও অভিজাতদের বাজার, যেখানে দামি পণ্য, গয়না ও উপহার সামগ্রীও বিক্রি হত। পান-সুপারি নাম কেন হল বুঝলাম না। এরকমটা হতে পারে পাশের হাজারা রাম টেম্পলের পূজাসামগ্রী হিসাবে পান-সুপারি বিক্রি হত, তাই থেকে এই নাম।এটি মূলত রাজপরিবারের জন্য বানানো হয়েছিল, তাই এখানে সাধারণ মানুষের প্রবেশ একসময় সীমিত ছিল। এর আউটার ওয়ালে রামায়ণের নানা দৃশ্য খোদিত আছে।
ভিতরে পিলারের মধ্যবর্তী ভাগে কালো পাথরে খোদিত শিল্পকর্ম। প্রতিটি স্তম্ভে পৌরাণিক প্রাণী ও দেবদেবীর চিত্রে ভরপুর শৈল্পিক অলঙ্করণ দেখলাম। বেশ সূক্ষ কাজ।
একটু এগিয়ে বিস্তীর্ণ প্রান্তরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বেশ কিছু ভগ্নাবশেষ।
একটা আন্ডারগ্রাউন্ড বিল্ডিং দেখলাম, ছোট্ট সিঁড়ি বেয়ে নীচে নামলাম।
এই কক্ষটি মাটির নিচে নির্মিত, গ্রানাইট পাথরের পুরু দেওয়াল ও ছোট প্রবেশদ্বার বিশিষ্ট।ভেতরে দু’টি সংযুক্ত ঘর আছে, ছাদটি ভারী পাথরের স্ল্যাব দিয়ে তৈরী।সম্ভাব্য ব্যবহার যা বাইরের বোর্ডে লেখা আছে, রাজা ও মন্ত্রিসভার গোপন বৈঠকের ঘর অথবা দামী সামগ্রী বা দলিল রাখার কক্ষ অথবা জরুরী পরিস্থিতিতে রাজপরিবারের আশ্রয়স্থল, আজকালকার বাঙ্কারের মত।
একটা সোপ স্যান্ডস্টোনের পুষ্করিনী দেখলাম। গাইডের কাছে শুনলাম ১৯৮৮ সালে আইএসআই এখানে এক্সকাভেট করে ভিতর থেকে ডেকোরেটিভ পট পাওয়া গিয়েছিল, যা থেকে মনে হয় পূজার কাজকর্মে এই পুকুরের জল ব্যবহৃত হত।
পুকুরে এখনও টলটল করছে জল। পাথরের জলবাহি ওপেন চ্যানেল দেখলাম, যা ঐ সময়ে তৈরী হয়েছিল। দূরে কমলাপুর লেক থেকে এখানে এই চ্যানেল দিয়ে জল আসে।
কাছেই একটা বেশ উঁচু ফাউন্ডেশন দেখলাম। এর নাম মহানবমী ডিব্বা বা দশেরা ডিব্বা। দশেরা উৎসব পালনের সময় রাজা ও পরিবারবর্গ এখান থেকেই প্যারেড উপভোগ করতেন। তিনটি ধাপে নির্মিত এই ফাউন্ডেশনের দেওয়ালে সৈন্যসামন্ত, নৃত্যশিল্পী, গায়ক, বাদ্যযন্ত্র শিল্পী, প্যারেডের দৃশ্য খোদিত আছে।
সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে চারিধারের খুব সুন্দর ভিউ পেলাম। ঘাসের সবুজ গালিচা ছাড়িয়ে চতুর্দিকে পাথরের টিলা। এটাই এই অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য।
এই পুরো জায়গাটা হল রয়াল এনক্লোজার, যেটা পাঁচিল দ্বারা সুরক্ষিত ছিল। দেওয়ালের বাইরে একটা পাথরের গায়ে
ছোট ছোট গর্ত দেখিয়ে গাইড গুলিগাপ্পা জানাল লোহা বাকানোর জন্য ব্যবহৃত হত।
একটা বাঁধানো জায়গার মধ্যে পাথরের দরজা রাখা।
এরপর এলাম আমরা কুইনস বাথে। ইন্দো-ইশ্লামিক আর্কিটেকচার।খুবই দৃষ্টিনন্দন।
মধ্যে চতুষ্কোণী বাঁধানো পুকুর। বেশ কয়েকটা প্রোজেক্টেড ব্যালকনি ভিতরের দিকে। পুরোটাই ভালভাবে সংরক্ষিত।
বেশ কিছু পরিব্রাজকের লেখা থেকে তৎকালীন বিজয়নগর সম্রাজ্যের ব্যাপ্তি ও শহরের বৈভব সম্বন্ধে একটি স্বচ্ছ ছবি পাওয়া যায়। নিকোলো দে কন্তি (ইতালি, ১৪২০-৩০ খ্রি.) – লিখেছিলেন, বিজয়নগর ছিল “রোমের মতো বিশাল ও ধনী শহর।” এই শহরে ছয়লক্ষ লোক বাস করত। আব্দুর রাজ্জাক (পারস্য, ১৪৪৩-৪৪ খ্রি.) – তিমুরিদ দূত; তিনি রাজসভা, প্রাসাদ ও ধর্মীয় সহনশীলতার প্রশংসা করেছেন।দোমিঙ্গো পাইস (পর্তুগাল, ১৫২০-২২ খ্রি.) – কৃষ্ণদেবরায়ের আমলে আসেন; রাজসভা, নবরাত্রি উৎসব ও বাজারের ঐশ্বর্যের বিস্তারিত বর্ণনা দেন।
আমাদের হাম্পি দর্শন শেষ পর্যায়ে। ‘আইসিং ওভার দ্য কেক’ হল পড়ন্ত বিকালে তুঙ্গভদ্রা নদীতে কোরাকল রাইডিং।
বাঁশ ও পাতা দিয়ে তৈরী গোলাকার ভাসমান এই নৌকাতে চারজন করে বসতে পারে। মাঝি একটা লগির সাহায্যে ঠেলে ঠেলে নিয়ে যায়। বর্ষাতে নদীতে জলবৃদ্ধির কারণে কয়েকদিন বন্ধ থাকার পর আজ আবার খুলেছে। একটা কোরাকলের ভাড়া পাঁচশ টাকা। আধাঘন্টার রাইড। নদীতে কোরাকল রাইড করতে করতে অস্তগামী সূর্য ও রক্তিম আকাশে পুঞ্জীভূত মেঘমালার অনির্বচনীয় দৃষ্টিসুখের ভরপুর আনন্দ লাভ হল।
মাঝে মাঝে নৌকার মাঝি লগির সাহায্যে কোরাকলটা গোল গোল করে ঘোরাচ্ছিল। সব মিলিয়ে এক দারুন অনুভূতি। পরের দিন আমরা ফিরলাম হুবলিতে । আসার সময় হসপেট হয়ে তুঙ্গভদ্রা ড্যামের পাশ হয়ে এলাম। আমারফ্লাইট ছিল মুম্বাই হয়ে দিল্লি। যাওয়ার সময় ডাইরেক্ট ফ্লাইট ছিল হুবলি, কিন্তু ফেরার সময় ডাইরেক্ট ফ্লাইট নেই।
সমাপ্ত

















Comments
Post a Comment