তখন ছোট ছিলাম
তখন ছোট ছিলাম (প্রথম পর্ব)
বাল্যকালের কিছু কিছু ঘটনা মনে পড়লে স্মৃতিমেদুর হয়ে পড়ি। ষাটের দশকে অধুনা জেলা শহর ঝাড়গ্রাম তখন এক আদিবাসী ও লোকাল মাহাতো সম্প্রদায় আর শালগাছে ভরা সবুজ ছোট্ট শহর। গঙ্গার বদ্বীপ অংশ নয়, এটেল মাটি নেই। লাল মাটি, বৃষ্টির জল দাঁড়ায় না, কাদা হয় না। পঞ্চাশ/ষাটের দশক থেকে কিছু মানুষ ওপার বাংলা থেকে এলেন।
ঝাড়গ্রামের মল্লদেব রাজবংশ বহুদিন ধরে। মূলত রাজার দান করা জমিতে নানা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্কুল, কলেজ, বিটি কলেজ, পলিটেকনিক গড়ে উঠল। অনেকে এলেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চাকরি করতে। বাজারে গেলে মধ্যবয়স্ক সবাই মাষ্টার মশাই।
বাছুরডোবায় ক্লাস সিক্স অব্দি যে বাড়ীতে থাকতাম তার সামনে রাস্তার ওপারে কয়েকটা তালগাছ ছিল।
ধুপ করে তাল পড়ার শব্দ পেলে দৌড়াতাম কুড়াতে। পিঁপড়েরা বৃষ্টির আগে দেখতাম সারি দিয়ে বারান্দায় চলছে মুখে খাবার সহ বাসস্থানে।কি ডিসিপ্লিন্ড তাদের চলাতে, একদম লাইন ধরে। দুষ্টুমি করে লাইন ভেঙে দিতাম। ওরা ভয় পেয়ে দ্রুত এদিক ওদিক করত। একটু পরে আবার লাইন ঠিক হয়ে যেত। দুধ দিত যে তার বর বিপিনদা একটা তীর -ধনুক বানিয়ে দিয়েছিল।তীরে লোহার ফলা লাগান ছিল, আর ধনুকে দড়ির বদলে বাঁশের ছিলকা। ওটা দিয়ে বাড়ীর আমগাছ তাক করে টিপ অভ্যাস করতাম। নিজেকে রামচন্দ্র বা অর্জুন কল্পনা করে তীর চালাতাম। কখনো পশুপাত কখনো ব্রহ্মাস্ত্র। লাট্টু ভাল ঘোরাতে পারতাম। লেত্তি দিয়ে ঘুরিয়ে অনেক সময় হাতে ঘোরাতে পারতাম। আরেকটা ছিল ইয়ো ইয়ো। প্রথমদিকে কাঁচের গুলি বেশী ছিল না।গুলি দিয়ে টিপ খেলতে তেঁতুল বিচি এক্সচেন্জ হত। সেভেন-এইটে পড়ার সময় পিলমার খেলতে হাত পাকিয়েছিলাম। অনেক কাঞ্চা জিতেছি।
সাইকেলে হাফ প্যাডেল চালাতে শিখে গেলাম ক্লাস টুতে। তার আগে কাজ ছিল বাবা বাজারে যাবার আগে সাইকেলটা ঘর থেকে বার করে ব্রেক চিপে সিড়ি দিয়ে নামানো আর কলেজ থেকে ফিরলে সিঁড়ি দিয়ে তোলা। সেভেনে উঠে তো হাত ছেড়ে চালানোতে সিদ্ধহস্ত হয়ে গেলাম। পরে স্কুল কেটে ঘুরতে যেতাম জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে কাঁকড়ের রাস্তা ধরে প্রকৃতির কোলে বা কোন গ্রামে। পিছনের ক্যারিয়ারে বন্ধু বসে দুইজনে মিলে ডবল প্যাডেল করতাম। হ্যাট আর হাফপ্যান্ট পরে এক বয়স্ক গোরা সাহেব সাইকেল চালিয়ে বাজারে আসতেন। আমরা স্কুল যাওয়ার পথে ওকে দেখলে সাহেব, গুড মর্নিং বলতাম। উনিও উত্তর দিতেন। এরা আমাদের দেশ শাসন করেছেন, তাই সাহেব মানে আলাদা সম্ভ্রম। তবে আমাদের মত সাইকেল চড়ছেন এটাই যা দুঃখ।
বাড়ীর মধ্যে ছিল কুয়ো।শীতকালের মিঠে কড়া রোদে চাতালে বসে সর্ষের তেল মেখে লোহার বালতিতে তুলে রাখা রোদে গরম ঈষদুষ্ণ জলে স্নান করতাম। মজা লাগত গরমে কুয়োর জল ঠান্ডা থাকত আর শীতে সকালে ব্রাশ করার সময় সদ্য তোলা জল থেকে ভাপ বেরোত। কখনো দড়ি ফসকে বালতি পড়ত কুয়োর ভিতর। লোহার আকশি দড়ি দিয়ে নামিয়ে বেশ কিছুক্ষণের প্রচেষ্টায় বালতি উঠত।বর্ষাকালে জল এত উঁচুতে উঠত যে খালি হাত বাড়িয়ে জল তোলা যেত।
কয়লাওয়ালা ভূষণ সকালে হরিনাম করতে করতে বাড়ির সামনে দিয়ে গরুরগাড়ী নিয়ে যেত। দুপুরে মাতাল হয়ে ফিরত। সর্বাঙ্গে কয়লার কালি। তখন চীৎকার করে হাত-পা নেড়ে সবাইকে শাপশাপান্ত করত।রাস্তায় ওর সামনে পড়লে সবাই গাছের আড়ালে লুকাতো। আমি ভয়ে ভয়ে জানালা দিয়ে উঁকি মারতাম। সকালে সে আবার ভালমানুষ!
শুনসান রাতের বেলা হিসি করতে উঠে সামনের চত্বর থেকে কখনো কখনো দূরের শ্মশানে চিতার আলো জ্বলতে দেখতাম।এক ভৌতিক পরিবেশ, যদিও ভূতের ভয় ছিল না। ফাইভ-সিক্সে স্কুলে হেঁটে যেতাম।রেল লাইন ক্রস করার সময় অনেকবার থার্ড লাইনে মালগাড়ি দাঁড়িয়ে থাকত।
বাবা-মায়ের বারণ সত্বেও ঘুরে না গিয়ে ট্রেনের তলা দিয়ে প্ল্যাটফর্মে উঠতাম, যদিও ভয় থাকত এই বুঝি চাকা নড়ে উঠল। অনেকসময় স্টেশনে থাকা বিম-ব্যালেন্স ওজনমাপার যন্ত্রটাতে ওজন নিতাম।
এটা একরকম খেলা ছিল। স্টেশন ক্রস করে কোর্টের পাশ দিয়ে যেতে একবার দেখলাম অনেক অদিবাসী বসে আছে। পরে জানলাম সাঁওতালরা লোধাদের গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়েছে। বাণীভবনে প্রাইমারিতে পড়ার সময় বর্ষাকালে মাঠে খুঁজতাম ভেলভেট পোকা। লাল রংএর পোকা ধরে দেশলাই বাক্সে জমাতাম।একবার পাড়ায় আস্ত ইট কে কতদূর ছুড়তে পারে তার প্রতিযোগিতা হচ্ছিল। ফেমাস বেকারির ছোট ছেলে আশিসের হাত ফস্কে সোজা আমার মাথায়। হসপিটালে গিয়ে ঘোড়ার লেজের লোম দিয়ে স্টিচ পড়ল। মোটা সূঁচে খুব লেগেছিল।তখন এন্যাসথেসিয়ার ব্যাপার ছিল না। একটাই সিনেমাহল ছিল রূপছায়া। ব্ল্যাকারদের রমরমা। প্রতি শুক্রবার রিক্সায় মাইকিং হত “রূপছায়ার রূপালী পর্দায় দেখুন ইস্ট্যমান কালারে রঞ্জিত রঙীন হিন্দি ছায়াছবি….. সুর লক্ষীকান্ত প্যারেলাল, নাম ভূমিকায়…. ম্যাটিনি ৩টে, ইভিনিং ছয়টা, নাইট নয়টা।… এরপর মিউজিক বাজাতে বাজাতে হ্যান্ডবিল। রথের মেলা থেকে ছোট ছোট নৌকা, গাড়ি কিনতাম, উদ্দেশ্য ঝুলন সাজাব।
কোদাল দিয়ে ঘাসের চাপড়া কেটে পাহাড় হত সামনের বারান্দায়। লেভেল ক্রসিং এর পাশের স-মিল থেকে কাঠ চেরাইয়ের গুঁড়ো এনে আবির মিশিয়ে রাস্তা, এঁটেল মাটি দিয়ে রেল লাইন তৈরী হত। তখন বর্ষাকাল। স্কুল থেকে ফেরার সময় চিন্তা থাকত এই বুঝি বৃষ্টির ছাঁটে ধুয়ে গেল। একটা শরীরচর্চার কেন্দ্র ছিল, নাম স্বাস্থ্যসংসদ। দূর থেকে দেখতাম ছেলেপুলেরা কুস্তি করছে ডাম্বেল ভাজছে। আমি এসব থেকে শতহস্ত দূরে। স্বাস্থ্যসংসদের দুর্গাপুজোর নাম ছিল। পুজোর সময় ঘুরে ঘুরে ঠাকুর দেখে আলোচনা হত কোন ঠাকুর সবচেয়ে ভাল। তখন থিম প্যান্ডালের চল ছিল না। দুর্গাপুজোয় প্রত্যেকদিন নূতন জামা-প্যান্ট। দুর্গাপুজোয় একটা পিস্তল সঙ্গে রোল করা ক্যাপ। পাঁচ পয়সা দাম ছিল, কালীপূজোতে চরকি, রংমশাল, কালীপটকা, দোদমা আর এক প্যাকেট হাউই। প্রথমে বাশের ডান্ডার মাথায় লাগিয়ে ফাটাতাম, পরে হাতে ধরে সলতেতে আগুন ধরলে ছুড়ে ফাটাতে শিখে গেলাম। স্কুলে যাওয়ার রাস্তায় বাসস্ট্যান্ডের পাশে বইএর দোকানে স্বপনকুমারের রহস্যরোমাঞ্চ পাওয়া যেত। মলাটে হেলিকপ্টার থেকে দীপক নামছে দড়ির মই দিয়ে। বাজারের কোণায় মাস্টারমশাইয়ের বইএর দোকান। পুজোর সময় ছোটদের পূজাবার্ষিকী “বেণুবীণা, শুকসারী, নীহারিকা… “ প্রতিবছর নানা নাম। কিনে প্রথমে ময়ূখ চৌধুরীর ছবিতে গল্প পড়তাম। ডিসেম্বরে লাস্ট এ্যনুয়াল পরীক্ষা প্রথম কাজ ছিল ঘুড়ি, লাটাই কেনা। ঘুড়ি অনেক উপরে উঠে গেলে সূতোটা ধনুকের জ্যাএর মত বেঁকে যেত। পাড়াতে ছেলের সংখ্যা বেশী। ডাংগুলি, ফুটবল, ক্রিকেট খুব খেলা হত। প্রথমে খালিপায়ে ফুটবল, পরে ম্যাচ হলে এঙ্কলেট পরতাম পায়ে। ম্যাচের সময় পাওয়া যেত হাফটাইমে অর্ধেক কাগজিলেবু আর জল। কখনো চুইংগাম। সকালে উঠে একটা কাজ ছিল ঘড়িতে দম দেওয়া। বাবা একবার একটা জাপানি ঘড়ি কিনল, সেমি অটোমেটিক। হাতে পরে থাকলে মোশনে স্প্রিং চার্জ হবে।দামি ঘড়ি বলে বাবা কম পড়ত। প্রায় সকালে দেখতাম ঘড়িটা হাতে ধরে নাড়িয়ে যাচ্ছে। আধাঘন্টা নাড়িয়ে দম দেওয়ার প্রচেষ্টা। দেবেন্দ্র মেমোরিয়াল হলে নাটক বা স্কুলের ফাংশান হত। বাণীভবনে পড়তে একবার ইঁদুর , আরেকবার কাশীরাজপুত্র অভিনয় করেছিলাম।
পুরাতন ঝাড়গ্রামে টুসু মেলা হত। কেচেন্দার বাঁধে অদিবাসী মেয়েরা মাথায় টুসু ঠাকুর নিয়ে গান করতে করতে বিসর্জন দিত। শীতকালে শালগাছের ঝরাপাতা জড়ো করে লম্বা লাইন বানিয়ে আগুন লাগাতাম। ধীরে ধীরে সর্পিল গতিতে পাতা পুড়তে পুড়তে এগোত। শালফুল পড়ত ঘুরতে ঘুরতে, হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে অনেকদূর চলে যেত।
বাজারে যেতাম ক্লাস সিক্স থেকে। মাংসের দোকান ছিল গোটা তিনেক একটা টিনের চাল দেওয়া ঘরের ভিতর। কাছে গেলে “খোকাবাবু আস আস” বলে প্রচন্ড ডাকাডাকি। তখন পমফ্রেট খুব শস্তা ছিল। এখন উল্টো। কাটা মাছ ছয়টাকা কিলো ছিল। ক্লাস ফাইভে উঠে একটা চাইনিজ পেন পেলাম। পেনে ড্রপারের এরেন্জমেন্ট। কালি ভরতে হয় না। নিব ঢুকিয়ে টানলে কালি ভরে পেনে। স্কুলে একদিন খেলার সময় ঢাকনা জামায় লাগানো, পেন পড়ে গিয়েছে কোথায়। খুঁজে পেলাম না। কি দুঃখ। প্রথম টেরিকটের ফুলপ্যান্ট পুজোর সময় বানিয়ে দিল টেলর বাবলুদা। ট্রায়ালের ডেটই পাওয়া যায় না। কানে পেন্সিল, গলায় ফিতে দিয়ে বাবলুদা নীল একটা টুকরো দিয়ে কাটপিসে লাইন লাগাতে ব্যস্ত। হোলির আগে ন্যাড়াপোড়া। গুলি ছুড়তাম আগুনে। চাঁদনী রাতে সেদিন ফুটবল খেলা হত।
কোন কোন ছুটিতে কলকাতার বেহালায় দাদু ঠাকুমার বাড়ি যেতাম। খুব ছোট থাকতে সেফটিপিন দিয়ে কাগজে নাম-এ্যড্রেস লিখে বাবা জামায় লাগিয় দিত। বলা ছিল হারিয়ে গেলে সোজা ট্র্যাফিক পুলিশের কাছে যেতে হবে। স্টেশনে বম্বে এক্সপ্রেস আসত কালো ধূয়া উড়িয়ে ক্যানাডিয়ান স্টীম ইঞ্জিনে টানা ট্রেন। প্ল্যাটফর্ম কাঁপতে থাকত।
গিধনি স্টেশন ছাড়লে স্টেশনে ঝোলান একটা রেলের লোহার লাইনের ছোট্ট অংশে ঢং ঢং করে ফার্স্ট বেল আরে লেভেল ক্রসিং ছাড়িয়ে বাঁকের মুখে ট্রেনের আওয়াজ পেলে জোরে জোরে ঘন্টা বেজে উঠত। থার্ড বেলের রীদমটা আরো ঘন ঘন। স্টেশন জুড়ে সাজো সাজো রব। একাত্তর সালে নক্সাল আমলে দাদু-ঠাকুমা এল ঝাড়গ্রামে। শহরে সেফ নয় বলে পূর্ববঙ্গ থেকে আনা দোনলা বন্দুকটা নিয়ে এল।আমি রোমাঞ্চিত। মাসে একবার ওটা খুলে ব্যারেল ও মাছি পরিষ্কার করে তেল মাখানোর দায়িত্ব পেলাম। বাবা একবার বন্দুক চালিয়ে আমাগাছে বসে থাকা পাখি মারল ছররা গুলি দিয়ে।
ছোটবেলার কথা (দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব)
বর্ষাকালে সবুজ ঘাসে উড়ে বেড়াত গঙ্গাফড়িং। তক্কে তক্কে থাকতাম। ঘাসের উপর বসলেই দুই আঙ্গুলে ডানাগুলো চেপে ধরতাম। মিনিট দুয়েক চেপে রাখলে ফড়িং উড়তে পারত না। তখন ফড়িংকে হাতে বসিয়ে রাখতাম। একরকম খেলা ছিল। তখনও বাড়ীতে লাইট আসে নি। প্রচন্ড গরমে খাটে শুয়ে আছি। মা হাতপাখার বাতাস করছে। আধো ঘুমে মায়ের হাতের পাখা বন্ধ হচ্ছে, আবার দেখছি সেই ঘুমন্ত অবস্থাতে পাখা নড়ে উঠছে। অবাক চোখে চেয়ে থাকি। যেন পক্ষীছানাকে আগলে আছে মা। ১৯৬৫তে মা গেল বিটি পড়তে বর্ধমানে। বাবা বাইরে থেকে তালা মেরে কলেজ গিয়েছে। মায়ের স্কুলের দিদিমনি ঝর্ণা পিসি, সুস্মিতা পিসি আর মা একসঙ্গে স্কুল শেষ হলে ফিরত। মা তখন বর্ধমানে।
জানালার শিকের ভিতর দিয়ে বাইরের রাস্তায় চোখ। ঝর্ণা পিসি ফিরছিল। জিজ্ঞাসা করল “কিরে মিঠু, মায়ের জন্য মন কেমন করছে?” আমার ঝটিতি উত্তর “না, তা কেন হবে, রামচন্দ্র মাকে ছেড়ে চৌদ্দ হছর বনবাসে ছিল, আমার মা তো এক বছর হলেই ফিরে আসবে।” গল্পের বই ছিল ভীষণ প্রিয়। খুব ছোটতে উপহার পেলাম ‘ঠাকুরদার থলে” আর ‘ঠাকুমার ঝুলি’। প্রথম পাতায় দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদারের ছবি, তার নীচে উনার সই। কল্পনার চোখে আমি রাজপুত্র। ক্ষীরের পাহাড় পেরিয়ে চলেছি দুধ সাগরে। সুয়োরাণী দুয়োরাণী আর বুদ্ধু-ভূতুম। শনিবার আমার প্রাইমারি স্কুল ছুটি। পালা করে এক শনিবার বাবার সঙ্গে কলেজে আর পরের শনিবার মায়ের স্কুলে। বাবার সাইকেলের সামনের রডে ছোট্ট সিট। সিটে বসে ছোট্ট পা দুটো সামনের মাডগার্ডের উপর দিয়ে ক্রশলেগ করে বসতাম। সামনে কেউ থাকলে বেল বাজাতাম আমি। ভাবতাম কবে আমি সাইকেল চালানো শিখব। খুব প্রিয় ছিল নিজের ট্রাইসাইকেল।
সামনের কাঁকড়ের রাস্তায় চালাতাম। বাবার পলিটেকনিকের এক ছাত্র সেই ট্রাইসাইকেল সহ একটা ফটো তুলে অল ইন্ডিয়া কম্পিটিশনে থার্ড প্রাইজ পেল। ছবিতে পরে ওঁর নাম দেখলাম শান্তিময়। সেই থেকে থার্ডের তকমা স্কুল জীবনের রাবার স্ট্যাম্প হয়ে গেল। নার্সারির পরীক্ষার ফল বেরোল। দিদিমনি বলেছেন আমি থার্ড হয়েছি। নাচতে নাচতে বাড়িতে ফিরেছি। জানা গেল তিনজনের মধ্যে থার্ড। লিকপিকে ছিলাম। প্রাইমারি স্কুলে স্পোর্টস।ধারণা ছিল ফার্স্ট আসব। কিন্তু সেখানেও থার্ড।
একদিকে মন্দ নয়। ভিকট্রি স্ট্যান্ডে ওঠা যায়, সঙ্গে প্রাইজও থাকে। গরমকালে একটা কুঁজো কেনা হত। কুয়োর জল ফুটিয়ে কুঁজোয় ঢালা হত। সকালে স্কুল থেকে ফেরার পর আমার কাজ ছিল কুঁজোর ঠান্ডা জলে চিনি গুলে অরেঞ্জ স্কোয়াশ বানান। বড় স্কুলে পড়ার সময় বর্ষাকালে ছাতা নিতাম। অল্প বৃষ্টিতে খুলতাম, জোরে বৃষ্টি হলে বন্ধ করে দিতাম। বেশী সংখ্যক ছাত্রর জামা প্যান্ট ভিজে গেলে রেনি ডে হত। স্কুল ছুটি। কি মজা!
এক ছেলে। তাই ছোট থেকে একা থাকার অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল। ক্লাস সিক্স অব্দি যে বাড়ীটাতে ছিলাম, সেটা এল শেপের, সাইডের দিকে ইটের পাঁচিল বাড়ীটাকে ঘিরে। পাঁচিল ধরে একটা বড় পঞ্চজবাগাছ। লাল জবাফুল থোকা হয়ে ফুটে থাকত। ভোরবেলা অনেকে আসত ফুল চুরি করতে। পরে স্কুলে পড়ান হল আদর্শ ফুল হল পঞ্চজবা। পাপড়ি, বৃন্ত, পুংকেশর, গর্ভদন্ড, বৃত্যাংশ ইত্যাদি। বইতে পড়া জিনিষ জবাফুল দেখে মিলিয়ে নিলাম। এটাই প্রথম প্র্যাকটিকাল ক্লাস বলা যায়।
ফাইভ সিক্সে দশটায় স্কুল গিয়ে চারটেতে ফিরে খিদে পেত। পিঠের ব্যাগটাকে পাঁচিলের উপর দিয়ে ছুড়ে নিজে ইটের গর্তে পা রেখে উঠতাম, ভিতরদিকে জবা গাছের কান্ডে পা দিয়ে নামতাম। পকেটে থাকত রান্নাঘরের চাবি। তালা খুলে শিকল নামিয়ে সেকেন্ড টাইম মাছ-ভাত খাওয়ার পালা। বাথরুম ছিল বাড়ির বাইরে, পাঁচিলের ভিতর। ওর পাশ দিয়ে পাঁচিলে উঠে ইট ধরে ছাদে ওঠা যেত। একদিন স্কুল থেকে ফিরে ন্যাড়া ছাদে উঠেছি সতু পাগলার সাথে। কি কথায় ঘুষোঘুষি হচ্ছে দুজনে। মা ফিরছিল স্কুল থেকে। বেশ বকুনি খেলাম। ন্যাড়া ছাদ, যদি পড়ে যেতাম।
সেই সতু পাগলা খড়্গপুরে সিনেমা দেখে ফেরার সময় ট্রেন থেকে পড়ে একটা পা কেটে গেল। অনেক পরে সদ্য পরিণীতা স্ত্রীকে নিয়ে ঝাড়গ্রাম স্টেশনে দাঁড়িয়ে আছি, স্টিল এক্সপ্রেস ধরব। হঠাৎ শুনি কেউ ডাকছে “কিরে মিঠু কেমন আছিস”? তাকিয়ে দেখি সতু পাগলা কাঠের ছোট চাকা লাগান তক্তা র উপর বসে ভিক্ষা করছে। বল্লাম- তুই সেই ছোটবেলার সতু না? সতু মাথা হেলিয়ে বল্ল -বিয়ে করেছিস? নতুন বউ? বউদি নমস্কার। আমি মিঠুর ছোটবেলার বন্ধু। বউ দেখি অবিশ্বাসের চোখে তাকিয়ে। জীবনের ক্যানভাসে বিচিত্র সব রং।
এক বর্ষার রাত। তখনও বাড়ীতে লাইট আসে নি। বাড়ীর এন্ট্রি দিয়ে ঢুকলে প্রথমে একটা বড় ঘর, তারপর একটা ছোট ঘর, সেটা পেরোলে লম্বা উঠান পাশে পরপর তিনটে ঘর। দ্বিতীয়টা রান্নাঘর। ওখানেই পিঁড়ি পেতে রান্না ও খাওয়া দাওয়া দুটোই হয়। এক বর্ষার রাতে হ্যারিকেনের আলোয় আমি আর বাবা ডিনার করছি। মা গিয়েছে বড় ঘরে মশারী টানাতে, আলো ছাড়াই। হঠাৎ মায়ের প্রচন্ড চিৎকার। খাওয়া ছেড়ে দৌড়ে গেলাম। বাবা সব সময় টর্চ নিয়ে বসত। টর্চের আলোয় দেখছি মা বিছানার উপরে উঠে গিয়েছে। ভয়ার্ত গলায় বল্ল- পায়ের উপর দিয়ে কি একটা ঠান্ডা জিনিস সরসর করে চলে গেল। নির্ঘাত সাপ ঢুকেছে। খাটের তলায় চালের বস্তা, সামনে মিটসেফ আর বড় স্টীলের আলমারি। খালি মেঝেতে টর্চ মেরে কিছু দেখা গেল না। আমি উঠে পড়লাম খাটে। বাবা গেল সামনের মেস থেকে নেপালী দারোয়ানকে ডাকতে। দারোয়ান এল একটা লাঠি নিয়ে গামবুট পায়ে দিয়ে। সত্যি একটা সাপ। মিটসেফের তলায় চ্যাচামেচিতে কুন্ডলী পাকিয়ে। বাহাদুর (তখনকার দিনের সব নেপালিকে আমরা বাহাদুর বলতাম) লাঠি দিয়ে সাপটাকে বার করে মারল। আমরাও নামলাম খাট থেকে। তখনকার সময় জানলা খোলাই থাকত। সাপ আসা কিছু অস্বভাবিক নয়।
ঝাড়গ্রাম ষাটের দশকে চুরির জন্য বিখ্যাত। রাতের তিন প্রহরের সময় আসত, যখন লোকজনের ঘুম গাঢ় হয়। শুনতাম চোর নাকি ফিল্ডে নামার আগে কড়া খটখটাত। আওয়াজ না পেলে দরজা ভাঙত। শুনতাম চোরেরা কাজে নামার আগে খালি গায়ে তেল মেখে বেরোয়, যাতে ধরতে এলে পিছলে পালাতে পারে। আমি আর মা রাতে শুয়ে পড়লে বাবা টর্চ মেরে খাটের তলায় দেখত চোর লুকিয়ে আছে কিনা। টর্চ মারার মূহুর্ত অব্দি প্রচন্ড টেনশনে থাকতাম এই বুঝি চোর বা ভূত এসে ঘাড় মটকে দিল। ইলেকট্রিসিটি আসার পর বাবার কাজ ছিল বেয়ার তার সামনের কড়ায় লাগিয়ে প্লাগে তার গুঁজে সুইচ অন করে চার্জ করে রাখা। চোর এলে শক খাবে।
স্কুলে আসা-যাওয়ার পথে লেভেল ক্রসিং পরত। রেল লাইনের একটু পর থেকে সব দোকানঘর। সাইডের দেওয়ালে বড় করে লেখা “মৃত সঞ্জীবনী-অবর্থ মহাঔষোধি”। ছবিতে রামায়ণে পড়েছি, হনুমান ঘাড়ে করে গন্ধমাদন পাহাড় এনেছিলেন যাতে সঞ্জীবনী বটি ছিল। মাথায় ঘুরত লোকে ডাক্তারের কাছে কষ্ট করে যায় কেন। এই ঔষুধ খেলেই তো চাঙ্গা হয়ে উঠবে।
তখন বাড়িতে আসত সোভিয়েট দেশ, সোভিয়ট ইউনিয়ান ম্যাগাজিন।
সুন্দর সব ছবি আর ভাল কোয়ালিটির কাগজ। সেই পড়ে প্রথম জানলাম রাশিয়ার গ্রামে সব যৌথ খামার। জমি সরকারের। গ্রামের সবাই সেখানে কাজ করে। বিক্রির টাকা সবার মধ্যে ভাগ হয়। সবার সমান রোজগার। প্রতিবেশীর হেঁসেল দেখে হিংসা করার উপায় নেই। তখনকার মত ব্যাপারটা বেশ পছন্দ হল। বাবা অবশ্য ম্যাগাজিনগুলো কিনত শস্তা দামের জন্য। রদ্দি কাগজ হিসাবে বিক্রি করলে বেশী টাকা পাওয়া যেত। এখন বুঝি সরকার ভর্তুকি দিত কম্যিউনিজিমের প্রচারের জন্য। তবে স্কুলের নূতন বইতে মলাট দিতে সোভিয়েট দেশের পাতা খুব কাজে লাগত। স্কুলের নূতন বই-খাতার একটা আলাদা গন্ধ থাকত। প্রথমদিকে পড়ার আগে বই নাকের কাছে। নিয়ে শুকতাম। তখন দোকানে কিনতে পাওয়া যেত জলছবি। জলে লাগিয়ে, বইএর পাতার উপর লাগালে অবিকল ছবিটা প্রিন্ট হয়ে যেত।
একবার ১৯৭১ সালে ৩/৪ কিমি দূরে দুধকুন্ডীর মাঠে ইন্দিরা গান্ধী এলেন নির্বাচন প্রচারে। মা ছিল ভলিন্টিয়ার। তাই ইন্দিরা গান্ধী যেখান দিয়ে হেঁটে মঞ্চে যাবেন, সেই রাস্তার পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ পেয়েছিল। আমরা অনেক দূরে জনতার মধ্যে। মা পরে বল্ল ইন্দিরা গান্ধী মঞ্চে ওঠার আগে হেঁটে যেতে যেতে গলার ফুলের মালাগুলো একটা একটা করে ছুড়ে দিচ্ছিলেন জনতার উদ্দেশে। দুধকুন্ডীর মাঠটা পড়ত দহিজুড়ি যাওয়ার রাস্তায়। ওই জায়গাটা ছিল রসগোল্লার জন্য ফেমাস। যাবার পথে মাঝামাঝি জায়গায় মাঠটা পড়ত। অতবড় মাঠ কোথাও দেখি নি। দিকচক্রবালে দিগন্তকে চুম্বন করত মাঠের শেষ অংশ। গল্পের বইতে পড়েছিলাম “ভুবনডাঙার মাঠ”, যা বিখ্যাত বিশালতার জন্য। দুধকুন্ডীর মাঠকে সেরকমই মনে হত। তখন জানতাম না, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আমেরিকানরা অনেকগুলো এয়ার স্ট্রীপ বানিয়েছিল বেঙ্গল, বিহারে। যেমন চাকুলিয়া, অশোকনগর, দুধকুন্ডী, কলাইকুন্ডা, পানাগড়। দেশভাগের সময় অনেক রিফিউজি এই সব এয়ারস্ট্রিপে অস্থায়ী ক্যাম্পে ছিলেন। চাকুলিয়ার রিফিউজি ক্যাম্পের উপর ‘রূপান্তর’ নামে নারায়ণ সান্যালের লেখা একটি উপন্যাস আছে।
পাশের বাড়ীটার নাম ছিল ফেমাস বেকারী,কারণ ওদের ঝাড়গ্রাম বাজারে ওই নামে বেকারি ছিল। ভদ্রলোক চাইবাসা থেকে রিটায়ার করে বাড়িটা কিনেছিলেন, থিতু হয়ে বেকারি শুরু করেন। ওরা ছিল অনেক ভাই-বোন। ছেলেদের নাম মনে আছে। খোকন, তপন, রতন, আশিস। আশিস ছিল আমার বয়সী। ওদের বাবা বেকারি থেকে সন্ধ্যাবেলা এসে হুকো টানতেন, জানালা দিয়ে দেখা যেত। উনি আসার ভাইরা খেলাধূলা ছেড়ে গুডবয় হয়ে প্রার্থনা করত ঠাকুরঘরে, শুনতে পেতাম সমবেত গলায় “গুরু দেব দয়া কর দীনজনে…,সঙ্গে শাঁখের আওয়াজ, তারপর জোরে জোরে পড়ার আওয়াজ কানে আসত। ওদের বাড়ির এক দেওয়ালে ক্রসটিচের কাজ করা বাঁধানো লেখা ছিল “পিতা ধর্ম, পিতা স্বর্গ, পিতহি পরমং তপঃ, প্রিতরি প্রীতিমাপন্নে প্রিয়ন্তি সর্বদেবতা”।
তখন ফাইভে পড়ি। টাইফয়েডে ভুগে উঠেছি। শরীর দুর্বল। মাকে কেউ বুদ্ধি দিল, মুরগীর মাংস খাওয়ান। তখনও পোলট্রির মুরগী বাজারে আসে নি। খালি দেশী মুরগী। বাড়ীর সামনের রাস্তা দিয়ে সকালে গ্রাম থেকে ঝাঁকাতে করে শব্জি আসত। মুরগী, ডিম এসবও আসত। কেচেন্দা বাঁধ থেকে শীতকালে পদ্মফুল আসত, পাঁচ পয়সা করে। একটা মুরগী কেনা হল তিনটাকা দিয়ে। জ্যান্ত মুরগী। বিপিনদা এসে কেটে দেবে, তাই মুরগীটাকে ব্রিটানিয়ার বড় বিস্কুটের টিনের মধ্যে খড় বিছিয়ে রাখলাম। তার সঙ্গে দুইদিনে বেশ ভাব হল। গম খেত খুঁটে খুঁটে। এরপর বাড়ির পাঁচিল ঘেরা জায়গাটাতে ছেড়ে দিতাম। সারাদিন ঘুরে টুরে সন্ধ্যার আগে টুকটুক করে নিজের খাঁচাতে ঢুকে যেত। খুব অবাক হয়ে ভাবতাম, কি করে ও চিনে বাসায় ফেরে। সকালে উঠে ঘুম ঘুম চোখে ওর কাছে গিয়ে দেখতাম, চোখ বন্ধ করে বসে ঘুমাচ্ছে। হঠাৎ একদিন সকালে দেখলাম হাঁটু মুড়ে বসে আছে। ও মা দেখি সে ডিম পেড়েছে। তখন ছোট ছিলাম, তাই মুরগী আগে না আন্ডা আগে তার ফান্ডা নিয়ে কনফিউশনের অবকাশ ছিল না। মুরগী বেশ কয়েকদিন ডিম দিল। এর কয়েকদিন পর দাদু-ঠাকুমার আসার কথা ঝাড়গ্রামে। বাবা বল্ল- আগেকার সময় হিন্দু বাড়ীতে মুরগি খাওয়া হত না, কখনো যদি ছেলেপুলেরা খেত, তখন বাড়ির বাইরে রান্না হত। দাদু-ঠাকুমা আসবে বম্বে এক্সপ্রেসে দুপুর তিনটে নাগাদ, বিপিনদা সকালে এসে মুরগী কেটে দিয়ে গেল। দুপুরের মধ্যে মুরগীর গল্প শেষ।
ঝাড়গ্রামে বিটি কলেজ ছিল। তাদের কারিকুলামে প্রাকটিক্যাল হল স্কুলে ক্লাস নেওয়া। নীচু ক্লাসে তাঁরা কয়েকদিন পড়াতে আসতেন। তাঁরা খুব যত্ন নিয়ে পড়াতেন। আমরা বলতাম বিটি স্যার। একজনের সঙ্গে আমাদের বেশ সখ্যতা হল। তিনি যাওয়ার আগে রাস্তার উল্টোদিকে নূতন খোলা দোকান ‘ছিমছাম’ থেকে সিঙ্গাড়া আর জিলিপি কিনে খাওয়ালেন। ক্লাসের সবাই মিলে চার আনা করে দিয়ে স্যারের জন্য গিফ্ট কিনলাম টেবিলল্যাম্প। স্যারের ক্লাস নেওয়া শেষ হয়ে গিয়েছিল। একদিন তিন কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে সেবায়তনে গিয়ে দেখি স্যার চলে গিয়েছেন। সেই টেবিলল্যাম্প শেষে ঠাঁই পেল আমার পড়ার জায়গায়।
আমাদের বাড়ির কাছে ছিল ‘রজনী কুটির’। বাসস্থান ছিল পিছনে, সামনে ছোট মাঠের পাশে ঠাকুর দালান। তার উপরে লেখা রজনী কুটির। এদের বাড়িতে পারিবারিক দুর্গাপুজো হত। অষ্টমীর দিন ছাগবলি হত। খুব উৎসাহ নিয়ে দেখতাম।হাঁড়িকাঠে চড়ানোর আগে যখন আসন্ন মৃত্যুর দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে সে ম্যা-ম্যা করে ডাক ছাড়ত, সে ডাক চাপা পড়ে যেত ঢক্কানিনাদে।
রজনী কুটিরের উল্টোদিকে ছোট কুঁড়েঘরে এক সাধু থাকতেন।উর্ধাঙ্গ অনাবৃত। আশ্রমে একটা গরুও ছিল। যাওয়ার পথে দেখতাম স্নানের পর তাঁর কৌপিনটি দড়িতে মেলা। একদিন বাবার সাথে হাত ধরে যাচ্ছি, বাবা “কৌপিন কি ওয়াস্তে” গল্পটা শোনাল। কি ভাবে এক সাধুর কৌপিন ইঁদুরে কেটে দিচ্ছিল। গ্রামবাসীদের বুদ্ধিতে একটা বিড়াল পুষলেন। কালক্রমে বিড়ালের দুধের জন্য একটি বাছুর সহ দুধেল গাই এক গ্রামবাসী দিল। গরুর জন্য একটি রাখাল রাখলেন।সে পিছনের জমিতে চাষ শুরু করল, গরুর খড়ের যোগান। কালক্রমে সাধু হয়ে গেলেন সংসারী। পরে এই গল্প ক্লাস সিক্সের রামকৃষ্ণের গল্পের র্যাপিড রিডারে পড়ছি।
এক জিওলজিস্ট জেঠু কলকাতা থেকে বছরে এক-দুবার আসতেন জীপে করে শীতকালে।টাটা কোম্পানির হয়ে ছোটনাগপুরে আকরিকের সন্ধানে যেতেন।উনি আসার আগে খবর দিতেন। তখন ঝাড়গ্রামে টাটকা শব্জীর খুব নাম।বেগুন, ফুলকপি, বাঁধাকপি কিনে রাখা হত জেঠুর জন্য। ক্যাম্প সাইটে লাগবে। সেই বেগুন ভাজলে তেল বেরোত। কলকাতায় সেই জেঠুর বাড়ি একবার গেলাম। সেখানে প্রথম দেখলাম ফ্রিজ। শুনলাম ওর ভিতরে বরফ জমে। খুলে দেখি ভিতরে এক নীলাভ আলো, সাদা ধূয়ার মত ঠান্ডা বাতাস বেরিয়ে আসছে।
দুই হাতে ঝোলা নিয়ে ধুতি পরিহিত, শ্বেতশুভ্র দাড়িসহ একজন মাসে একবার আসতেন গল্পের বইএর ভান্ডার নিয়ে। এখন ভাবি, উনার কি পরিমাণ পরিশ্রম হত ওই দুটো বই ভর্তি ভারী বোঝা নিয়ে এত বয়েসে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বেড়াতে। আমি উৎসুক থাকতাম মাসিক শুকতারা বা কিশোর ভারতীর জন্য।শুকতারায় প্রথমেই থাকত চিত্রগল্প ‘বাঁটুল দি গ্রেট’। কয়েক পাতা পরে আরেকটা ছবিতে গল্প ‘নন্টে ফন্টে’।
বাড়ীতে এক মাসী আসত মুড়ি বিক্রি করতে। ব্রিটানিয়া বিস্কুটের বড় কৌটাতে মুড়ি নেওয়া হত। একটা কাঠের বারকোশে করে মেপে ঢালত।একদিন ওর মেয়ে এল মুড়ি দিতে। বয়স বছর পনের ষোল। লীলাবতী লীলাবতী, ভর যুবতী কন্যা। তখন আমি ক্লাস ফোর কি ফাইভে পড়ি। শাড়ীর ফাঁক দিয়ে তার পুরুষ্ট বুক দেখে নিষিদ্ধ ফলভক্ষণের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা হল।
ফাইভ-সিক্সে উল্টোরথ আর নবকল্লোলের শারদীয়া সংখ্যায় রঙীন আর্টপ্লেটে সুন্দরী নায়িকাদের ছবি দেখতাম খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে।
যদি কখনো আমার স্কুল ছুটি থাকত আর বাবা-মা কলেজ-স্কুল গিয়েছে, তখন আমার প্রিয় পাস্ট টাইম ছিল একটু বিট নুনে লংকার গুঁড়ো মিশিয়ে নুনঝাল তৈরী করে গল্পের বই নিয়ে আধশোয়া হয়ে বই পড়তে পড়তে নুনঝাল খাওয়া।।খুব শস্তার এনটারটেনমেন্ট বলা যায়।
আমার বন্ধু ছিল অসংখ্য। কিন্তু এক থাকতেও ভালবাসতাম। আনন্দের উপকরণ কিছু না কিছু খুঁজে নিতাম। ক্যারাম বোর্ড ছিল আর একটা কাঠের বিল্ডার্স ব্লক ছিল। বাবার দাঁড়ি কাটার রেজারের পিছনের পাইপটা খুলে সাবানজল বানিয়ে বাবল ছাড়তাম। শুক্র, শনি আর রবিবারে রেডিওতে শুনতাম নাটক। শুক্রবার বিকালটা তাই পড়াশুনা বাদ।
জীবনে সেই স্বপ্নময় দিনগুলি আর ফিরে আসবে না। দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর মত স্মৃতির অলিন্দ হাতড়ে যে কিছু মনে পড়ল, ক্ষণিকের আনন্দ সহকারে লিখলাম।
শেষ




























Comments
Post a Comment