কর্নাটক কলিং-১
কর্নাটক কলিং-১
এবারের ভ্রমন ভারতের শিল্পসংস্কৃতির ঐতিহ্য যাকে হিন্দিতে ‘ধরোহর’ বলে, তাকে চাক্ষুষ করার উদ্দেশ্য নিয়ে। কর্নাটকে তিনটি ইউনেস্কো স্বীকৃতিপ্রাপ্ত দর্শনীয় স্থান রয়েছে। হাম্পি ও পাট্টাডাকাল মন্দির সমূহ এই স্বীকৃতি পেয়েছে যথাক্রমে ১৯৮৬ ও ১৯৮৭ সালে। ২০২৪ সালে বেলুড়-হালেবিডুকে এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
সফরসঙ্গী কলেজের চারবন্ধু এবং এক বন্ধুপত্নী।সব মিলিয়ে ছয়জনের গ্রুপ। পুরানো বন্ধুদের সঙ্গে ঘোরার মজাই আলাদা। থাক-থাক কিংবা কিন্তু-কিন্তু ভাব থাকে না, সুখ-দুঃখের গল্প আর স্মৃতির গহনে ডুব দিয়ে জমাটি আড্ডা রোজ সন্ধ্যের পরে।
২০ই অগাস্ট হুবলি তে সবাই একত্রিত হব, কারণ এটাই নিকটস্থ এয়ারপোর্ট। খবর নিয়ে দেখলাম এই সময়টাতে বর্ষার শেষের দিকে এই অঞ্চলের ওয়েদার কম্ফার্টেবল। বরঞ্চ ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে গরম বেশী। হাম্পির চারিদিকে আবার বড় বড় পাথরের টিলা। সূর্যতাপে পাথর গরম হয়ে পারিপার্শ্বিক আবহাওয়া গরম থাকে।
আমাদের যাত্রাপথের সার্কিট হল হুবলি থেকে বাদামী। এটি চালুক্য বংশীয় রাজাদের (ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শতাব্দী) রাজধানী ছিল। পরেরদিন পট্টাডাকাল ও আইহোল মন্দির দেখে আমরা যাব বিজাপুর। বিজাপুর ছিল বহামনি সম্রাজ্য ও পরে আদিল শাহীর রাজধানী। চতুর্থদিন বিকালে আলমাট্টি ড্যাম। পরের দিন গন্তব্য হাম্পি, যেখানে পাঁচশত বছর আগে তুঙ্গভদ্রার তীরে গড়ে উঠেছিল এক বর্ধিষ্ণু নগরী, নাম তার হাম্পি যে শহরে ঐ সময় ছয় লক্ষ লোকের বাস ছিল। হিন্দু পৌরাণিক ধারাভাষ্যে আবার এরই নাম কিষ্কিন্ধ্যা নগরী, যা ছিল বানর সেনাদের রাজ্য। হাম্পিতে দুইরাত কাটিয়ে হুবলি থেকে বাড়ী ফেরা।
পার্থ আসবে বম্বে থেকে ট্রেনে। ১৯ তারিখ রাতে ট্রেনে উঠবে। তার তিনদিন আগে থেকে ধারাবাহিক বৃষ্টিতে মুম্বাইর বেহাল অবস্থা। লোকাল ট্রেন বন্ধ। ১৯ তারিখ চিন্তিত হয়ে সকালে ফোন করি। পার্থ অবশ্য মোটেই চিন্তিত নয় - ব্যাবস্থা একটু কিছু হবে এরকমই জানাল। শেষমেশ রাত আটটার ট্রেন সকাল পাঁচটায় ছাড়ল। পার্থ কল্যাণ স্টেশনে হোটেল ভাড়া নিয়ে একরাত কাটাল। হোটেলে যাওয়ার আগে একটা কোয়ার্টার নিতে ভুলল না। টেনশন ফ্রি লাইফ। ইদানীং দেখছি যেখানেই যায় কিছু অঘটন ঘটে। পহেলগাম কান্ডের দিন পার্থ সেখানে পৌঁছাল।
এবারে অমরনাথ যাত্রায় নাম লিখিয়েছিল। সিজনড সোলো ট্রাভেলার। জম্মু পৌঁছে দেখা গেল অমরনাথের রাস্তা বন্ধ। পুন্ছ সেক্টরে শিবকোরিতে ‘বুড়ো অমরনাথ’ আছে। সেখানে চলে গেল। এরপর গিয়েছিল বৈষ্ণোদেবী। কিছুদিন পরে ল্যান্ডস্লাইডে অনেক তীর্থালু প্রাণ হারাল।
আমার অবশ্য সেরকম কিছুই ঘটল না। বিকালে দিল্লি-হুবলির ডাইরেক্ট ফ্লাইট। টি-ওয়ান টার্মিনাল রিনোভেশনের পর এই প্রথম এলাম।
লাউঞ্জটা বেশ বড়সড়। ইন্ডিগোর সব ফ্লাইট আজকাল এখান থেকেই ছাড়ে। লাউঞ্জে বসেছি কফি নিয়ে। সামনে বসা এক মধ্যবয়স্ক লোকটি ল্যাপটপ ছেড়ে আমায় জিজ্ঞাসা করলেন - ‘আমি খাবার আনতে যাচ্ছি, আপনার জন্য কিছু আনব কি?’ বল্লাম-থ্যাঙ্কস, কফি খাচ্ছি, পরে নেব। এরকম ব্যবহার আমাদের দেশে খুব প্রচলিত নয়। ফিরে আসতে আলাপ জমালাম। নাম হল মনোজ মিশ্রা। ইউপির মির্জাপুরের কাছে ভাদোই এ অরিজিনাল বাড়ী। ইউপির বিথ্যাত কার্পেট এখানেই তৈরী হয়।এখন পুণেতে থাকেন। তবে ব্যবসাসূত্রে বছরের অর্ধেক সময় থাকেন সার্বিয়াতে। ২০১৩ অব্দি সিঙ্গাপুরে ব্যাঙ্কে চাকরী করেছেন। পরে ওখানেই কনসালটেন্সি ফার্ম খোলেন। ২০২০তে ইন্ডিয়া আসার পর শুরু হয় লকডাউন। সিঙ্গাপুরের পাততাড়ি গুটিয়ে, লকডাউনের পর ভারতীয়দের জন্য ইউরোপের প্রথম ভিসা ফ্রি কান্ট্রি হল সার্বিয়া, জর্জিয়া। বিজনেস অপারচুনিটি খুঁজতে বছর চারেক আগে চলে আসেন সার্বিয়াতে। মাত্র পঞ্চাশ লক্ষ লোকের বাস এই দেশে। এখন ম্যান পাওয়ার সাপ্লাইয়ের বিজনেস। ওখানে রেসিডেন্সি কার্ডও আছে। কিছুদিন আগে যুগেস্লাভিয়া ডিসইনট্রিগ্রেশনের উপর ইউটিউবে বেশ কিছু ভিডিও দেখেছি। নবলব্ধ জ্ঞানের ঝাপি খুলতেই ভদ্রলোক বেশ ইমপ্রেস হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন -আপনি বুঝি হিস্টোরিয়ান? বল্লাম-না, না অন্য প্রফেশনে ছিলাম। অবসরের পর এইসব করে এক আধটু টাইম পাস। এই আর কি! বল্লাম ইউরোপের এই বালকান দেশগুলো দেখার ইচ্ছে আছে। মনোজ জানালেন ‘অবশ্যই আসুন, খুব সুন্দর দেশ, এলে অবশ্যই বি মাই গেস্ট’। ওখানে বাড়ীর দাম শস্তা। বেলগ্রেডের সাবার্বে পাঁচ হাজার ইউরোতে ছোট ফ্ল্যাট পাওয়া যায়।
মনোজ বল্লেন আমার মত অনেক বয়স্ক ইন্ডিয়ান নাকি ওখানে বাড়ী কিনে থাকছেন। যাওয়ার আগে সেল্ফি নিলাম।
GoZo cab থেকে বুক করা গাড়ী ২১ তারিখ সকাল সকাল এসে হাজির। কমপ্লিমেন্টারি ব্রেকফাস্ট সেরে আমরাও রেডি। দুটো সেডান কার। আমরা মোট ছয়জন। হাত-পা খেলিয়ে যাওয়া যাবে। আমাদের গাড়ীতে আমি, পার্থ আর শিবু। শিবু ক্লাসমেট তো বটেই আবার চাকরি ও একই কোম্পানিতে। অন্য গাড়িতে
অতীশ, সোমনাথ ও সোমনাথের স্ত্রী মহুয়া। অতীশ, সোমনাথ ও আমার ক্লাসমেট এবং চাকুরিজীবনেও একই অফিসে। ঘন্টা দুয়েকের ড্রাইভের পর আমরা পৌঁছালাম বাদামীতে। দূরে পাহাড় দেখা যাচ্ছে। পাথরের টিলা। বাদামী রকের পাহাড় দেখা যাচ্ছে সামনে।
ওখানেই আছে বাদামী কেভস। গাড়ী টি জয়েন্ট থেকে ডানদিকে ঘুরে এগিয়ে চল্ল। প্রথমে দেবস্থান দিয়ে যাত্রা শুরু করাই মঙ্গল। মন্দিরের নাম বনশঙ্করী দেবীর নামে।
সপ্তম শতকে তৈরী অতি প্রাচীন মন্দির। এটা জানা গিয়েছে শিলালিপি থেকে। আমাদের জ্ঞানের খনি গুগল। মন্দিরের সামনের রাস্তার দুইপাশে দোকান। সাদা সাবানের কেকের মত একটা জিনিষ বিক্রি হচ্ছে। এটা হল বিভূতি, ভক্তরা কপালে টিকা লাগিয়ে মন্দিরে যান। হাম্পিতে হনুমান মন্দিরে দেখেছি সাদার বদলে কপালে হলুদ টিকা। সাউথ ইন্ডিয়াতে হিন্দুদের মধ্যে প্রধানত দুটো ভাগ একদল শিবের ভক্ত, অন্যদল বিষ্ণুর। সাদা তিলক শিবাইটসদের আর হলুদ হল বৈষ্ণবাইটসদের।
মন্দিরের সামনে বিশাল পুষ্করিনী, উঁচু পাঁচিলে ঘেরা। ভীড় কম। অনেকে দেখলাম কলের জলে স্নান করে
নিয়ে দন্ডী কেটে মন্দির প্রদক্ষিণ করছেন। মূল মন্দিরে ঢোকার আগে
চত্বরের মধ্যে পুজোর থালি থেকে নারকেল ভেঙে জলটাকে ফেলে নারকেলে লাল টিকা লাগিয়ে দিচ্ছেন মন্দিরের পুরোহিত। নারকেল ও কলা, এই দুই ফল দেখলাম পুজোর প্রধান প্রসাদ। শিকের বেড়া লাগান লাইন দিয়ে দেবী দর্শন হল। ফটো তোলা মানা।গ্রানাইটের থামওয়ালা সভাগৃহ পেরিয়ে গর্ভগৃহ। এই নূতন মন্দির তৈরী হয়েছে ১৭শ শতকে। এখানে দেবী অষ্টভূজা, সিংহবাহিনী। আমাদের বংশের কুলদেবী জগদ্ধাত্রীও অষ্টভূজা, সিংহবাহিনী, পায়ের কাছে মৃত গজরূপী রাক্ষস। বেরিয়ে এসে মন্দির প্রদক্ষিণ করি।
চত্বর ঘিরে অনেক বসার জায়গা। সামনের একটা সিঁড়ি দিয়ে একতলায় উঠেছি মন্দিরের ফটো নেব বলে। অন্যদিক দিয়ে নেমে আসব এরকমই ইচ্ছে। দেখি সেই রাস্তা নেমে এসে আবার মন্দির দর্শনের খাঁচার মধ্যে ঢুকেছে। দ্বিতীয়বার দর্শন হল, ডাবল পুণ্য।
এরপর গাড়ী এল বাদামী কেভসএ। দুই দিকের রেড স্যান্ডস্টোন পাহাড়ের মধ্যবর্তী জায়গায় এক সুবিশাল জলাশয়, ডানদিকের পাহাড়ের মধ্যে মনুষ্য নির্মিত গুহা। বাদামী ছিল পুলকেশী ১ দ্বারা প্রতিষ্ঠিত বাদামী চালুক্য রাজবংশ (৫৩৮ AD - ৭৫৩ AD)।
এই বংশের শেষ রাজা কীর্তিবর্মন ২ রাস্ট্রকূটদের কাছে হেরে গেলে বাদামী চালুক্য রাজত্ব শেষ হয়। আবার রাষ্ট্রকূটদের হারিয়ে দশম থেকে দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত কল্যাণী চালুক্য বংশের রাজত্বকাল ছিল। তবে এদের রাজধানী ছিল বাসবকল্যাণ বলে কর্নাটকের বিদার-এ। বাদামী চালুক্যরা বংশানুক্রমে শিব, বিষ্ণু ও জৈন ধর্মে বিশ্বাসী ছিলেন।
সাউথ ইন্ডিয়াতে রককাট কেসের জন্য বাদামী বিখ্যাত। টিকিট কেটে গাইড নিলাম। উঁচু উঁচু খাড়া সিঁড়ি বেয়ে উঠে এলাম প্রথম গুহাতে। এখানে চারটি গুহা আছে। প্রথম গুহাটি শিবের, দ্বিতীয় ও তৃতীয়টি বিষ্ণুর এবং চতুর্থটি জৈন সম্প্রদায়ের।
গুহাগাত্রে নানা পৌরাণিক চরিত্র খোদিত। প্রথম কেভে ঢোকার মুখে ডানদিকে আঠার হাতযুক্ত বিশাল নটরাজ মূর্তি।
এটি দাক্ষিণাত্যের earliest নটরাজ মূর্তির উদাহরণ। গাইড বল্লেন মোট আঠারটি নৃত্যভঙ্গিমার মুদ্রা আছে, যা প্রমাণ করে সাউথ ইন্ডিয়ার টেম্পল ড্যান্সের প্রাচীন ঐতিহ্য। গাইড নিজেও বিভিন্ন মুদ্রা (কয়েকটা মনে পড়ছে- ডমরু, ত্রিশূল, পটাকা হস্ত, গজা হস্ত, দোলা হস্ত, চতুরহস্ত, আনন্দ তান্ডব) করে দেখালেন। নটরাজের ডানদিকের তলায় গনেশ ও তাঁর পাশে নন্দী মৃদঙ্গ বাজাচ্ছেন।এই বিভিন্ন মুদ্রার উত্তরসূরী হল দক্ষিণী নৃত্যশৈলী ভারতনাট্যম ও কুচিপুড়ি। গুহার অন্যদিকে দেওয়ালে খোদিত বিশালাকার শিব পার্বতীর যুগলমূর্তি, পাশে নন্দীবুল।
শিবের পাশে এক স্কেলিটন। গাইড বল্লেন ইনি হলেন ভিরিঙ্গি। ভিরিঙ্গি খালি শিবভক্ত ছিলেন। পার্বতী তাই ক্রুদ্ধ হয়ে অভিশাপ দেওয়ার ফলে এই অবস্থা। দেবতারাও তাহালে মানুষের উর্ধে নন।জেলাসি তাঁদের মধ্যেও আছে।
গুহার ছাদেও নাগপঞ্চমীর আচ্ছাদনে শিবের মাথা। গাইড একজন পেশাদার ফটোগ্রাফারের মত নানা এ্যঙ্গেল থেকে আমাদের ফটো তুলে দিচ্ছেন। কেভ-এর ভিতর বিশাল শিবলিঙ্গ। গর্ভগৃহে কোন পাথরের কাজ দেখা গেল না।
গাইডের কাছে শুনলাম গুহার ভিতর অন্ধকার বলে শিল্পীরা অভ্যন্তরে কোন স্কাল্পচার বানাতেন না।
আবার প্রাণান্তকর সিঁড়ি চড়া।
উঁচু ধাপ। রেলিং নেই।বয়স্কদের জন্য অসুবিধা। আমাদের দেশে ‘টুরিস্ট ফ্রেন্ডলি’ কনসেপ্টটা নেই। তবে মেঘলা আকাশ, হাওয়া দিচ্ছে। তাই অসুবিধা হচ্ছে না। উপরের চাতাল থেকে সামনে যে বিশাল পুষ্করিণী দেখা যাচ্ছে তার নাম অগস্ত্য লেক।
কথিত আছে পুরাকালে অগস্ত্য মুনি বিন্ধ্যপর্বত পেরিয়ে দক্ষিণাত্যে আসেন। এই পুকুরের জলকে তিনি পবিত্র করেছিলেন। লেকের পাড়ে এরকমই রেড স্যান্ডস্টোনের টিলা। এইদিক থেকে গাইড চিনিয়ে দিলেন সামনের পাহাড়ের টপে আপার শিবালয় আর তার কিছু নীচে লোয়ার শিবালয় টেম্পল।
অগস্ত্য লেকের দূরপ্রান্তে ভূতনাথ টেম্পল, উল্টোদিকে জনপদের মাঝে এক মকবরা।
বিজাপুরের আদিল শাহির অধীনে বাদামীর সুবেদার আব্দুল আজিজ তাঁর বেগমের জন্য নির্মান করেন ১৭শ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে।
দুই নম্বর গুহার অন্যতম আকর্ষণ বিষ্ণুর বামন অবতার।
Cave no 2অসুর রাজা বলি ব্রাহ্মণ রূপী বিষ্ণুকে জমি দিতে চাইলে, বিষ্ণু দুই স্টেপে স্বর্গ, মর্ত্য অধিগ্রহন করে তৃতীয় স্টেপ বলির মাথায় রাখেন। গুহার উল্টোদিকে বিষ্ণুর বরাহ অবতার, ছাদে লোটাসের মোটিফ।
তিন নম্বর গুহার দিকে সিঁড়ি দিয়ে উঠছি, গাইড লোহার গেট লাগান সিঁড়ি দেখালেন।
সবচেয়ে উপরে নাকি কামান রাখা আছে।আগে দর্শকদের যেতে দেওয়া হত। কিছু আত্মহত্যার ঘটনার পর এখন উপরে যাওয়া মানা। তিন নম্বর গুহাও বিষ্ণুর উদ্দেশ্যে নির্মিত।
৫৭৮ সালে চালুক্য নরেশ মঙ্গলেশের সময় নির্মিত হয়। এক ও দুই নম্বর গুহাতে চারটি করে পিলার, তিননম্বরে ছয়টি। এখানেও গুহাগাত্রে বিষ্ণুর বামণ অবতার। নীচে ডানদিকে করজোড়ে বলি ও তার পত্নী। অন্যদিকের প্যানেলে শঙ্খ, চক্র, গদা পদ্মধারী দন্ডায়মান বিষ্ণু, তার পাশে পদ্মাসনে বিষ্ণুমূর্তি।
গাইড জানালেন রেড স্যান্ডস্টোনে স্কাল্পচার বানানো, মার্বেলের তুলনায় অপেক্ষাকৃতভাবে সহজ, ফিনিশিংও ভাল হয়, আর লুকটাও ম্যাজেস্টিক আসে লালচে হলুদ কালারের জন্য।
আবার একপ্রস্থ সিঁড়ি ভেঙে সর্বশেষ চতুর্থ গুহাতে পৌঁছান গেল। রাজা কীর্তিবর্মন ও তারপর রাজা মঙ্গলেশের সময়ে ১৫৬৬-৯৭) নির্মিত গুহাতে
জৈন তীর্থঙ্করদের মধ্যে মহাবীর আর পার্শনাথ এর বাহুবলীর পদ্মাসনে ধ্যানমূর্তি। এই গুহাতে অপেক্ষাকৃত সিম্পল কাজ। ভিতরে গর্ভগৃহে মহাবীরের মূর্তি।
হিন্দুধর্ম, জৈনধর্ম কি বৌদ্ধধর্মে ঠাকুরদেবতা, তীর্থঙ্কর বা বুদ্ধের মূর্তি থাকে পদ্মাসনে।পদ্মকে সবধর্মে শুদ্ধতা ও আদ্ধ্যাতিকতার প্রতীক বলে মানা হয়। পঙ্কে জন্ম বলে পদ্মের আরেক নাম পঙ্কজ। চারিপাশের নোংরার মধ্যে থেকেও পদ্ম শুদ্ধতার প্রতীক। তাই ভগবানের শুদ্ধরূপ বোঝাতে পদ্মের ব্যবহার।
উপর থেকে অগস্ত্য লেক আর
তার পাশে ভূতনাথ মন্দিরকে লাগছে যেন পটে আঁকা ছবি।
আগে থেকে বুক করা ছিল কর্নাটক ট্যুরিসমের হোটেল মৌরিয়া চালুক্য।
রুমগুলি বেশ বড়। ব্যবস্থা আহামরি না হলেও ভালই বলা যায়। মধ্যাহ্নভোজন ওখানেই সেরে বেরিয়ে পড়লাম অগস্ত্য লেকের অপর সীমানায় পাহাড় (সাউথ হিল, যেখানে লোয়ার আর আপার শিবালয় আছে তার উদ্দেশে। এপ্রোচ রাস্তাটা বাজার ও সরুগলির মধ্যে দিয়ে। প্রাইভেট গাড়ি নেই, সব অটো চলছে। আমাদের গাড়ি কোনমতে ঢুকে পার্ক করল। বেশ ভীড়। কোন একটা মুসলিম ফেস্টিভ্যাল চলছে।
ঢোকার মুখে রাস্তায় ছোটখাট মেলা। বেলুন, চুড়ির স্টল। পাহাড়ের নীচে হল বাদামী আর্কিওলজ্যিকাল মিউজিয়াম।
টিকিট কেটে ঢুকলাম। বাদামীর কাছাকাছি আছে আইহোল আর পট্টাডাকাল মন্দির কমপ্লেক্স। ৫৪০ এডিতে চালুক্য রাজবংশের প্রতিষ্ঠার সময় আইহোল ছিল রাজধানী, ৫৬৭ তে রাজধানী আসে বাদামীতে।
এই অঞ্চলের প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্যে প্রাপ্ত নানা artefacts এই মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে। লেখা পড়ে জানা গেল এখানে অনেক শিলালিপি পাওয়া গিয়েছে-ষষ্ঠ শতক থেকে আঠারশ শতক অব্দি।
এরপর সাউথ হিলে সিঁড়ি ধরে ওঠা শুরু। রকের উপর অনেক বাঁদর বেশ কিছুটা উঠে দ্রাবিড়িয়ান স্টাইলে তৈরী লোয়ার শিবালয়ে পৌঁছালাম।
এখন কোন মূর্তিপূজা হয় না।
দূরে একই লেভেলে অন্য একটা চট্টানে দেখা যাচ্ছে পাথরে তৈরী চারিদিক খোলা দোতলা স্ট্রাকচার।
গাইড জানিয়েছিল এর নাম মনতপা, রাজবংশীয়রা এখানে সূর্যাস্ত উপভোগ করতে আসতেন।
নর্থ হিলে কেভ টু আর থ্রি-র মাঝে একটা
ন্যাচারাল কেভ আছে, যেটা সাউথ হিল থেকে ভাল বোঝা যাচ্ছে।
আপার শিবালয়ে আর গেলাম না, কারণ একই টাইপের মন্দির। এই পাহাড়ে আগে ফোর্ট ছিল। অন্যদিকে টিলার উপর পাথরে তৈরী তারই উঁচু পাঁচিল।
সেখানে গিয়ে কিছু ফটো তুললাম। টাইম কম। তাড়াতাড়ি নেমে এলাম। এবার আমরা যাব ১৪কিমি দূরে মহাকূটেশ্বর মন্দিরে। বাদামী ছাড়িয়ে গাড়ি চল্ল হাইওয়ে ধরে।দশ কিমি ছাড়িয়ে
ছোট রাস্তায় বর্ষার জলে পুষ্ট সবুজ বনানীর মধ্যে দিয়ে মহাকূটেশ্বর মন্দির সমূহের বিশাল কার পার্কিংএ পৌঁছালাম। চত্বরের দুইপাশে পূজাসামগ্রী আর চানাচুরের দোকান। এরকম চানাচুর সকালে বনশংকরী মন্দিরের দেখেছি।
মন্দিরের পাশে এত চানাচুরের দোকান কর্নাটকেই দেখছি। এই কমপ্লেক্সে মূল শিবমন্দির সহ ছোট বড় কুড়িটি মন্দির রয়েছে। মহাকূটেশ্বরে প্রাপ্ত শিলালিপি থেকে জানা যায় এর প্রাচীনত্ব।
চালুক্য বংশের প্রথম রাজা পুলকেশী ১ ও পরে তাঁর ছেলে কীর্তিবর্মন ১৪০০ বছর আগে এই শিব মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। শিবরাত্রির দিন এখানে বিশাল ভক্ত সমাগম হয়। আমরা এসেছি সন্ধ্যার মুখে। ভক্তদের ভীড় সেরকম নেই। অল্প লাইন বিগ্রহ দর্শনের। গর্ভগৃহে শিবলিঙ্গ। পাথরের গেটে খোদিত মর্মরমূর্তি দেখে বোঝা যায় এর প্রাচীনত্ব।গাছ গাছালীর মধ্যে দিয়ে ভিতরটা ঘুরে দেখি। আরো অনেকগুলি মন্দির, যার সামনে নন্দীবুল রাখা।
পরিবেশ শান্ত ও নির্জন। এখানে একটা ন্যাচারাল স্প্রিং আছে। ভক্তরা সেই ঝর্ণার জলে স্নান করে এখানে পূজা দেন।
পরদিন সকাল। আমি আর পার্থ এক রুমে। বাকীরা ঘুমাচ্ছে। দুইজনে বেরোই। ভূতনাথ মন্দিরটা দেখা হয় নি। গুগল ম্যাপে দেড় কিমি দেখাচ্ছে। ম্যাপ দেখে কালকের সেই বিকালের সরু গলি দিয়ে আর্কিওলজিকাল মিউজিয়ামের পাশ দিয়ে অগস্ত্য লেকের ধারে এলাম।
সকাল সাড়ে ছয়টা। সবে ভোরের আলো ফুটছে। দিঘীর জল অসম্ভব শান্ত। দূরে বেলে পাহাড়ের ব্যাকড্রপে ছবির মত সুন্দর মন্দির। পুরো জায়গাটা পাথর দিয়ে বাঁধান। দূর থেকে মন্দিরের সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য সিঁড়িতে বসি। ঘন্টার শব্দে নয়, নির্জনতায় দেবতার অপার্থিব উপস্থিতির অস্তিত্ব উপলব্ধি করি। দূর থেকেই বেশী ভাল লাগছে, নিকটে যাওয়ার তাগিদ অন্তর থেকে পেলাম না। পার্থ আবার কিছুই ছাড়ে না, সবসময় “ফিয়ার অফ মিসিং আউট” ভাব, ও তড়বড় করে মন্দির দেখতে গেল।
তবে সেটা হল না, কারণ মন্দির খোলে সকাল আটটাতে। আমরা ছাড়া আরেকটি তরুণ ছেলে বসে আছে জলের ধারে। আলাপ হল। বিহারে বাড়ি। ব্যাঙ্গালোরে চাকরী করে।
সকালে পৌঁছে এখানে সোজা এসেছে। বল্ল অনেকএখান থেকে একটু পরে বিজাপুর যাবে। ট্রেন পাওয়া যাবে কিনা জানতে চাইল। বল্লাম তুমি বাদামী কেভ না দেখে চলে যাবে? উল্টোদিকে পাহাড়ে কেভ দেখালাম। বুঝলাম একদমই হোমওয়ার্ক করে নি। আজ শনিবার সকাল। দুইদিনের ছুটিতে বেরিয়ে পরেছে। সোলো ঘুরতেই তার ভাল লাগে। ঘোরাটাই মুখ্য উদ্দেশ্য, জায়গাটার ঐতিহ্য ও ঐতিহাসিক মূল্য তার কাছে গৌণ। ফিরে গিয়ে বন্ধুদের জানাবে বাদামী আর বিজাপুর উইকএন্ডে দেখে এলাম। ভাবি শুধু চোখের দেখাই কি সব।
আসার সময় দেখেছিলাম একটা এ্যরো লাগান ফলক পাহাড়ের দিকে দেখাচ্ছে। সেখানে লেখা ‘Kappe Arabhatta inscription’. কালকে গাইড বলছিলেন এদিকের পাহাড়ে অনেক শিলালিপি আছে, যা থেকে অনেক ইতিহাস, বিশেষত যুদ্ধজয়ের বিবরণ পাওয়া যায়। ফেরার সময় শিলালিপি দেখতে গেলাম।
পরে গুগল করে জানলাম লেখাটা (অনুমানিক ৭০০ শতাব্দীর) আর্লি কানাড়া ভাষায় কাপ্পে আর্যভট্ট নামে কোন শহীদ সেনাপতির নামে কবিতার ছন্দে লেখা বীরগাথা। আর্কিওলজি ডিপার্টমেন্টের উচিত পাশে ফলকে ইংরাজিতে অনুবাদ করে লেখা।
ফিরে ব্রেকফাস্ট ও স্নান করে প্যান্ট পরতে গিয়ে দেখি পার্স মিসিং। কেলোর কীর্তি। হাফপ্যান্টের পিছনের পকেটে ছিল। নিশ্চয়ই কোথাও ঘোরার সময় পড়েছে। এক জায়গায় বসে ছিলাম। পিকপকেট হবে না। কারণ কোন ভীড় জায়গায় যাই নি। বাকীরা সব ব্রেকফাস্ট টেবিলে। শিবু আর আমি ঠিক করলাম গাড়ি নিয়ে সকালের জায়গাটা ঘুরে আসি। গাড়িতে উঠতে যাব, তখন মহুয়ার ফোন। পার্থর পশ্চাতদেশ থেকে উদ্ধার হয়েছে আমার পার্স। ক্রেডিট গোজ টু মহুয়া। আমি ওই চেয়ারে বসে ব্রেকফাস্ট করেছি। পার্থ বোঝে নি যে সে পার্সের পাশে বসে আছে। যাইহোক হারানিধি খুঁজে পেয়ে বেশ আনন্দ হল।
ক্রমশঃ


































































Comments
Post a Comment