কর্নাটক কলিং-২
Pattadakal Birupaksha Temple
কর্নাটক কলিং-২
আজকে আমরা যাব বিজাপুর। রাস্তায় পড়বে পট্টাডাকাল আর আইহোল। বাদামী থেকে পট্টাডাকাল ১৪কিমি দূরে। এএসআই মন্দির কমপ্লেক্সটাকে ফেন্সিং করে ভিতরে সুন্দর বাগান করেছে।
Me in front of Pattadakal Temple complexপট্টাডাকাল মন্দিরসমূহ ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট। একজন গাইড পেলাম। ৬০০/- লাগবে। বল্লেন ৪৫মিনিট থেকে একঘন্টায় লাগবে। কিন্তু আমাদের উৎসাহ দেখে প্রায় দুইঘন্টা ঘুরিয়ে দেখালেন। গাইডের নাম পঞ্চাইয়া ফোন 9008901212.
পট্টদকাল ভ্রমণ মানে শুধু স্থাপত্য দেখা নয়—এটি হলো ইতিহাসের পাতায় হাঁটা,
Name of temples one must visit at Pattadakalযেখানে প্রতিটি স্তম্ভ আর প্রতিটি ভাস্কর্য ভারতের গৌরবময় অতীতের গল্প বলে। Inside Birupaksha Temple, the art work in pillars
এই মন্দিরসমূহের পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে মল্লপ্রভা নদী। আর্লি চালুক্য পিরিয়ড থেকে শুরু করে শেষ জৈন মন্দিরটি রাস্ট্রকূটদের আমলে নবম শতকে নির্মিত হয়েছিল। গাইড বল্লেন বাদামী ছিল চালুক্যদের রাজধানী, আর পট্টাডাকালের মন্দির হল রাজ্যাভিষেকের জন্য।
The inscription containing dt and year of coronation৯৮ জন রাজার করোনেশন হয়েছিল। ‘পট্টা’ হল অঙ্গবস্ত্র, যা ব্যবহৃত হয় করোনেশনের সময় আর কানাড়া ভাষায় ‘কাল’ হল পাথর। বেশ ইন্টারেস্টিং মানে। গাইড একটা শিলালিপি দেখালেন মন্দিরের পাশে যাতে রাজাদের নাম ও রাজ্যাভিষেক সালের উল্লেখ আছে। এখান থেকে আমাদের Aihole complex drone shot (10km from Pattadakal)
যাওয়ার কথা আইহোলের মন্দির সমগ্রী দেখতে। আইহোলের কম বেশী ১২০টি মন্দির হল আর্লি চালুক্য পিরিয়ডের এক্সপেরিমেন্টাল মন্দির, The iconic Durga Temple at Aihole in a semicircular shape of Buddhist chaitya
আদতে এখানে স্থপতিদের ট্রেনিং দেওয়া হত আর পট্টাডাকাল হল এই সূতিকাগারের পরীক্ষার অভিজ্ঞতার ফলশ্রুতিজনিত অষ্টম শতকে নির্মিত - ফাইনেস্ট এক্সাম্পল অফ টেম্পল আর্কিটেকচার যা প্রতিফলিত হয়েছে পট্টাডাকালের ১০টি মন্দিরের মধ্যে। Guide explaining history of Pattadakal
গাইড আমাদের বোঝালেন কিভাবে মন্দির নির্মান শৈলীতে উত্তর ভারতের “নাগারা” স্টাইল আর্কিটেকচার ও দক্ষিণের ‘শিখর’ স্টাইল আর্কিটেকচারের মেলবন্ধন ঘটেছে। আমরা উত্তর কর্নাটকের যেখানে আছি এটা ডেকান রিজিয়ন। টেকন্যিকালি উত্তর বা মধ্য ভারতের মন্দির
ও দাক্ষিণাত্যের তামিলনাড়ুর মাঝামাঝি অঞ্চল, তাই স্থাপত্যেও সেই মিশেলের ছাপ পড়েছে।
প্রথমে আমরা দেখলাম কদাসিদ্ধেশ্বর মন্দিরে। অপেক্ষাকৃত ছোট সাইজের এই মন্দির শিবের, নর্থ ইন্ডিয়ান নাগারা স্টাইলে।
Kadasiddheswar temple (early Chalukya period) in Nagara styleএই স্টাইলে মন্দিরের গর্ভগৃহের উপরিভাগ বক্রভাবে নির্মিত (কেদারনাথের মন্দির কল্পনা করুন)। শিখরের উপরে একটি কলস আকৃতির, বা আমলা ফলের শেপের পাথর।
এই মন্দির অষ্টম শতাব্দীর প্রথমদিকে তৈরী। কিন্তু দ্রাবিড়িয়ান স্টাইলে মন্দিরের চূড়ার শেপ পিরামিডাকৃত হয়। আর সবার উপরে সিলিন্ড্রিকাল বা ডোমশেপড পাথর বসান হয়। তার উপরে থাকে কলসাকৃতি পাথর যাকে finial বলে।
হিন্দুধর্মে কলসের এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান, মন্দিরে বা দৈনন্দিন পূজাপাঠের মধ্যেও। আমরা পুজো করতে জলভর্তি ঘট বসাই, মন্দিরের শিখরেও থাকে ঘট। পুরাকালে ঘট ব্যবহৃত হত জলাধার হিসাবে। জল জীবনের প্রতীক আবার উর্বরতার ও প্রতীক। সৃস্টির আদিতে আছে নবজীবনের স্পন্দন। প্রাণময় জগৎ। প্রাণের আদি হল গর্ভ। তাই মন্দিরের গর্ভগৃহ হল দেবতার স্থান, যার স্পর্শে পৃথিবীতে জীবনের অনুরণন। তাই মন্দিরের সর্বোপরি ভাগে ঘটের অবস্থান।
গাইড দেখালেন পাশাপাশি দুইটি মন্দির।
Left side Dravidian style and right side Nagara styleগাইড দেখালেন মূল মন্দিরের পাশে মন্দিরের ছোট সংস্করন।
Right side prototypes were made before main templeপ্রথমে মন্দিরের নকশা থেকে ছোট মন্দির তৈরী হত, যেটাকে আমরা প্রটোটাইপ বলি। স্থপতিরা এরই বেসিসে বড় স্কেলে মূল মন্দির বানাতেন। গাইড বল্লেন মন্দির নির্মান করার সময় মল্লপ্রভা নদীর বালি এনে ফাউন্ডেশনের উপর ফেলা হত। তারপর পাথর মাপ অনুযায়ী কেটে বালির উপর দিয়ে একটার উপর একটা তোলা হত। শিখর তৈরী হয়ে আমালাকা ও কলস বসিয়ে মন্দির নির্মান সম্পূর্ন হলে ভিতর থেকে বালি সরিয়ে ফেলা হত।
এরপর এলাম জম্বুলিঙ্গেশ্বর মন্দিরে।
এটি পাট্টাডাকালে প্রথম দিকে তৈরী (সাতশ শতক)মন্দিরের মধ্যে একটি। উত্তর ভারতের মন্দিরের মধ্যে শিল্পকাজ কম, তারই ছায়া এখানে। উপরের ডোম মিসিং।
এরপর দুইটি আরো শিব মন্দির গলগনাথ, সঙ্গমেশ্বর মন্দির দেখলাম।
Shikhara of Galaganath templeএইগুলি সব শিব মন্দির। আর্লি চালুক্য রাজারা বৈষ্ণব ছিলেন, পরবর্তীতে এরা শাক্ত ধর্মের প্রভাবে আসেন। তবে চালুক্য রাজারা সর্ব ধর্ম সহিষ্ণু ছিলেন। চালুক্যরা বাস্তু শাস্ত্রে বিশ্বাস করতেন, তাই সব মন্দির পূর্বমুখী, মল্লপ্রভা নদীর দিকে মুখ করে। Drone shot of Pattadakal temple complex with Mallaprava river
মল্লপ্রভা নদী এই স্ট্রেচে উত্তরবাহিনী, যা সাধারণভাবে দাক্ষিনাত্যের নদীপ্রবাহে দেখা যায় না। লক্ষণীয় হল উত্তর ভারতে গঙ্গানদীও বেনারসে উত্তরবাহিনী এবং তীর্থস্থান। হতে পারে এখানেও সেই রীতি মেনে পট্টাডাকাল গড়ে উঠেছে। উত্তরভারতীয় রীতি অনুযায়ী মন্দিরের বহির্গাত্রে নানা কারুকার্য ও গর্ভগৃহে প্রবেশ-দ্বারের দুইপাশে
দ্বাররক্ষী হিসাবে ভদ্র ও বীরভদ্রের মূর্তি (কদাসিদ্ধেশ্বর মন্দির)। গলগনাথ মন্দিরে উত্তর ও দক্ষিণ মন্দিরশৈলীর কিছু মিশ্রন দেখলাম। Galaganath temple having corridor for ‘Pradakshin’
এখানে এখনও গর্ভগৃহ ও পাথরের করিডোরের অস্তিত্ব আছে পরিক্রমার জন্য। নন্দীমন্ডপের প্ল্যাটফর্মটা আছে নন্দীসহ, মূল গর্ভগৃহ ও নন্দীদ্বারের মাঝে সভামন্ডপের অস্তিত্ব নেই।
এরপর ৭৩৪ সালে নির্মিত সঙ্গমেশ্বর মন্দিরটি পুরোপুরি দ্রাবিড়িয়ান স্টাইলে নির্মিত।
৭২০ শতকে এটি নির্মান করেন চালুক্য রাজা বিজয়াদিত্য। পুরোপুরি দ্রাবিড়িয়ান স্টাইলে নির্মিত।সাউথ ইন্ডিয়ান ট্র্যাডিশন অনুযায়ী নদীতে স্নান করে মন্দিরে সন্মুখভাগে ‘মহাদ্বার’ দিয়ে প্রবেশ করতে হয়। এরপর হল নন্দীমন্ডপ, যেখানে নন্দীবুল থাকেন। তারপর যথাক্রমে হল ‘মুখমন্ডপম’ ও ‘সভামন্ডপম’। এরপর মূল গর্ভগৃহ ও তাকে ঘিরে প্রদক্ষিণের প্যাসেজ।
আশেপাশে অনেক ছোট মন্দিরের ফাউন্ডেশন আছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে।
কিছুর উপর নন্দীবুলও আছে। গাইড বল্লেন মল্লপ্রভা নদীতে বন্যা হলে গ্রাম থেকে লোকে এখানে আশ্রয় নিত। গ্রামের লোকেরা অনেকে বাড়ী বানানোর জন্য মন্দিরের পাথর এমনকি গর্ভগৃহের মূর্তি চুরি করে নিয়েছে। ১৯১২ সালে আর্কিওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া পট্টাডাকাল অধিগ্রহন করে। তার আগে এই ভগ্ন মন্দির স্তুপ থেকে ভারতের অন্য সব জায়গার মত এখানেও শিল্পকর্মমন্ডিত পাথর ও মূর্তি চুরি হয়েছে। পাশাপাশি গ্রামের লোকাল মন্দিরে এঁদের পুজো করা হয় বর্তমানে।
সঙ্গমেশ্বর মন্দির থেকে বেরিয়ে ডানদিকে ঘুরে দেখা গেল পট্টাডাকালের স্টার আকর্ষণ বিরূপাক্ষ ও মল্লিকার্জুন মন্দির দুটি। প্রথমে গাইড দেখালেন একটি বিজয়স্তম্ভ,
যেখানে চালুক্য রাজা বিক্রমাদিত্য ২ (৭৩৩-৭৪৪) এর পল্লব বংশীয় কাঞ্চীপুরমের রাজাকে তিনবার (৭৪০ থেকে ৭৪৪ এর মধ্যে) পরাজিত করে কাঞ্চীপুরম দখলের কথা আছে। শহর লুঠ করলেও বিক্রমাদিত্য কোন মন্দির ধ্বংস করেন নি।King Vikramaditya II (not the one of Ujjain who was born before Christ )
তিনি শিবভক্ত ও মন্দির নির্মানে তাঁর দান এবং এক বিচক্ষণ রাজা হিসাবে রাজ্যে তাঁর অবদানের উল্লেখ আছে বিজয়স্তম্ভে। শিলালিপি দেবনাগরী ও আর্লি কন্নড় ভাষায় লেখা। গাইড বল্লেন সাধারন ভাবে দেবনাগরী ছিল উচ্চবর্ণের ভাষা আর কন্নড় ভাষা ছিল সাধারণ লোকের। মন্দির তৈরী করেন বিক্রমাদিত্যের প্রধানা মহিষী লোকপ্রভাদেবী অষ্টম শতকে। এই দুই মন্দিরে দুইজন প্রধান স্থপতির নাম লেখা আছে, যা চালুক্য সময়ের অন্য কোন মন্দিরে নেই। গাইড নাম বল্লেন গুন্ডা অনিভর্তিচারী ও সর্বসিদ্ধি আচারি।
শিবের ত্রিনেত্র রূপের অপর নাম বিরূপাক্ষ। পট্টাডাকালের মন্দির সমূহের মধ্যে সবচেয়ে বৃহৎ ও সূক্ষ কারুকার্য মন্ডিত মন্দির প্রাচীন ভারতীয় শিল্পকলার এক প্রধান নমুনা। এই মন্দিরে লিভিং ডেয়িটি। পুজো হয়। মন্দিরের তিনটি দ্বার। মূল দ্বারটি পূর্বদিকে মল্লপ্রভা নদী ফেসিং অন্য দুইটি দ্বার উত্তর ওদক্ষিণে সভামন্ডপের দুইদিকে।
পূর্বদিকের মূল দ্বার দিয়ে উঠে সিঁড়ির পাশের
চাতালে বসে গাইডের বিবরণ শুনছি। সামনের নন্দীমন্ডপে বিশালাকার বুল গ্রানাইটের। তবে এত সুন্দর নন্দীবুলকে কাপড় দিয়ে ঢেকে সৌন্দর্য নষ্ট করে দিয়েছে। বুলের সামনে দাঁড়িয়ে করজোড়ে নমস্কার করছি।
পার্থকে বল্লাম ফটো তুলে দে।
গ্রানাইটের সারফেস তাক লাগান মসৃন।
সামনে দুইদিকের দুই স্তম্ভে দ্বারপাল বসে গদা হাতে।
মতান্তরে আবার এই ভুঁড়িওয়ালাকে অনেকে বলেন কুবের। পরের পিলারটিতে দন্ডায়মান দ্বারপাল।
লক্ষ্যকরার মত যে তাদের শরীরে অঙ্গবস্ত্র ছাড়াও নানা ধরণের রত্ন ভূষণ, বাজুবন্ধ, লম্বা হার, গোলাকার হার গলায়। ওই সময়ে বোঝা যাচ্ছে পুরুষরাও সাজুগুজু করত!
মূল মন্দিরের সভাগৃহে প্রবেশ করলাম। দ্বারের আগে ছাদে একটি স্কাল্পচারের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন গাইড।
এটা হল সমুদ্রমন্থনের দৃশ্য। মাঝখানে বিষ্ণু সৃষ্টিকর্তা হিসাবে ইভেন্ট মডারেটর। নীচে বাসুকি নাগ। দুইদিকে দেবতা আর অসুর। সমুদ্র মন্থনে শুধু অমৃত নয় তার সঙ্গে উঠেছিল কামধেনু, ঐরাবত, লক্ষী। উপরের দিকে অপ্সরাদের নৃত্য ভঙ্গিমা। ভিতরের পিলারগুলিতে অসাধারণ সব সূক্ষ মিনিয়েচার মূর্তি। গাইড না থাকলে পিলারের খোদাই করা মুর্তি সমূহ যে ভারতীয় প্রাচীন গাঁথা ও রামায়ণ-মহাভারতে কাহিনী অনুসরনে তৈরী হয়েছে তা বোঝা দুষ্কর এবং সাথে সাথে অনুধাবন করে তা এপ্রিসিয়েট করার উপায় থাকে। মন্দিরের ভিতরের পিলারের এই অসাধারণ মর্মরচিত্রগুলি ভারতীয় সভ্যতার এক অতি মূল্যবান কলাকৃতি। এরপরে ভিতরের একটি পিলারে Parvati taking rest after giving birth to Kartikeya
খোদিত পার্বতী কার্তিকের জন্মের পরে বিশ্রামরতা। নীচে ক্র্যডেলে কার্তিক। পার্বতীর সেবায় নিযুক্ত দাসীবৃন্দ। গাইড না বল্লে বুঝতাম না। বিষ্ময়ভাবটাও জাগত না, কি ভাবে অত আগে শিল্পীবৃন্দ কি অসাধারণ দক্ষতায় এক ছোট পাথরে এই অসাধারণ সিন খোদাই করেছেন। একটাতে দেখলাম ভীষ্মের শরশয্যা।
পায়ের কাছে রথে অর্জুন। অন্যটাতে বনবাসে রাম মারীচরূপী হরিণ শিকার করছেন, শূর্পনাখার নাক কাটা যাওয়াতে
রাবনের কাছে নালিশ করছেন। একজন শিল্পীকে
দেখলাম ভিতরে বসে পেন্সিল স্কেচ করছেন। অনেকগুলো আঁকা দেখালেন, সবই টুরিস্টদের বিক্রি করার জন্য।
মন্দিরের বাইরের দেওয়ালেও অসাধারণ সব মর্মরমূর্তি। তার ডেসক্রিপশনে না গিয়ে ছবির মাধ্যমে পাঠকের কাছে তুলে ধরছি।
এই প্যানেলে সবার উপরে ঘোড়ায় চড়ে শিকারের দৃশ্য।
মধ্যভাগে শিব-পার্বতী। আশেপাশে নৃত্যরত অপ্সরা অপ্সরী। নীচে ঋষিরা ডিভাইন ইভেন্ট দেখছেন।
একটা প্যানেলে সমুদ্র থেকে অমৃত মন্থনের গল্প।
Samudra monthan
বিরূপাক্ষ মন্দিরের ডানদিকে একটু পিছনে মল্লিকার্জুন মন্দির। এই মন্দির নির্মানের উদ্যোগ নিয়েছিলেন বিক্রমাদিত্যের দ্বিতীয় স্ত্রী ত্রিলোক্যমহাদেবী।
বিক্রমাদিত্য২ এর প্রথমা পত্নী ও ইনি দুই বোন। গাইড বল্লেন বিরুপাক্ষ মন্দির নির্মানের কিছু পরে এই মন্দির নির্মান শুরু হয়, তবে নির্মানকালে বিক্রমাদিত্যের মৃত্যু হলে মন্দিরের ফান্ড ফ্লো কমে আসে। Mallikarjun temple built around 744
ফলে এর কারুকাজ বিরূপাক্ষের তুলনায় কিছু কম, তবে যা আছে তাও ভারতীয় পরম্পরার রত্নভান্ডার।
মন্দিরের ফাউন্ডেশনের সাইডওয়ালে সারিবদ্ধ হাতি। সিম্বলিক মনে হয়। হাতি। অনেক ভার বইতে পারে, তাই ঐরাবত ফাউন্ডেশনের ভার নিয়ে দাঁড়িয়ে! ভিতরের পিলারে রামায়ণ-মহাভারতের নানা কাহিনী চিত্রবদ্ধ।
Women killing wild bore who entered house 👇
একটাতে দেখা
গেল বরাহ ঘরে ঢুকেছে, তাকে মুগুর হাতে এক রমনী আঘাত করছে।
পট্টাডাকাল দেখা শেষ হল। গাইডকে অনেক ধন্যবাদ জানালাম কারণ যতসময় লাগবে বলেছিলেন তার ডাবল সময় নিয়ে ধৈর্যসহকারে সব বোঝানোর জন্য। সব দেখার পর অনুধাবন করলাম কেন অত আগে পাট্টাডাকালকে ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের তকমা দেওয়া হয়েছিল।
এবার গন্তব্য আইহোল। পট্টাডাকাল থেকে দূরত্ব দশ কিমি। পট্টাডাকাল যদি মন্দির শিল্পের কলেজ হয় তবে আইহোল হল স্কুল। পট্টাডাকালে আরো পরিশীলিত ও উচ্চমানের শিল্পকর্ম। পথে জায়গায় জায়গায় আরো ক্লাস্টার অফ টেম্পল দেখলাম।
Aerial view of Aihole temple complexএসবও লেসার নোন টেম্পল। এ সবও এএসআই দ্বারা সংরক্ষিত। তবে ঢুকতে টিকিট লাগে না। পুরো জায়গাটাই হল প্রাচীন ভারতে মন্দির নির্মানকর্মের আঁতুড়ঘর। সব মিলিয়ে কমবেশী ১২০টি মন্দির আছে। এসে পড়লাম আইহোলে। ইনসক্রিপশন থেকে জানা যায় আইহোলের অস্তিত্ব তৃতীয় শতক থেকে।কথিত আছে আরো আগে পরশুরাম এখানে মল্লপ্রভা নদীতে রক্তমাখা কুঠার ধুয়েছিলেন। নদীর জলে রক্তের লাল রং দেখে গ্রামের কোন রমনী ‘অইয়ো -হোলে’ বলে স্বগোক্তি করেন। ‘হোলে’ মানে রক্ত। সেই থেকে আইহোল নাম। চতুর্থ থেকে তেরশ শতাব্দী পর্যন্ত এখানে মন্দির তৈরী হয়েছে।
গেটের বাইরে থেকে দেখা যাচ্ছে আইহোলের বিখ্যাত দুর্গামন্দির। বাইরে একটা বিশাল বটগাছ।
তারই ছায়ায় বসেছি। দইএর খুরি নিয়ে এক স্থানীয় মহিলা বিক্রেতা হাজির। বাঙালিরা অত দইভক্ত নয়।
জোরাজুরিতে সোমনাথ একটা খুরি কিনল।
হর্স-শু শেপের এই দুর্গা মন্দির গঠনের দিক থেকে অন্য যে কোন মন্দিরশৈলীর ব্যতিক্রমী।
এর নির্মান অনুমানিক ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শতাব্দীর মধ্যে। আইহোল ছিল আর্লি চালুক্য পিরিয়ডে রাজধানী। এটি একটি সূর্য মন্দির।লোকমুখে দুর্গামন্দির নাম হলেও আদপে ‘দুর্গ’ ছিল আসল নাম। ১৩শতক থেকে আইহোল ছিল মুসলিম শাসনাধীন, পরে মারাঠাদের হাতে যায়, তারাই এখানে ফোর্ট বানিয়েছিলেন। মন্দিরের গর্ভগৃহ ঘিরে প্রদক্ষিণকক্ষ আছে।
Entry gate pillar statues at Durga temple
প্রদক্ষিণ কক্ষে তিনটি অসাধারণ মূর্তি খোদিত গর্ভগৃহের আউটার দেওয়ালে। Vishnu in standing
Mahishasur mardini killing demon
Baraha Avtar of Vishnu
মন্দিরে ঢোকার গেটের উপর খোদিত মূর্তির মুখ দৃষ্টি আকর্ষণ করল।
হিন্দু মন্দিরে গেট তৈরী হত পাথরের স্ল্যাব রেখে। সাধারন ভাবে এইজন্য গর্ভগৃহে ঢোকার দরজা ছোট হত। ওয়েজ শেপ পাথরের আর্চ বানিয়ে গেট তৈরী করার কারিগরী কুশলতা মুসলিমরা নিয়ে আসেন পারস্য
ও সেন্ট্রাল এশিয়ার দেশ থেকে।
অনেক মন্দির, যা ভেঙে গিয়েছিল,
প্রত্নতাত্ত্বিকরা সংগ্রহ করে কমপ্লেক্সের মধ্যে ডিসপ্লে করে রেখেছেন।
ক্রমে ক্রমে দেখলাম লাড খান মন্দির, গউদারগুদি মন্দির। লাড খান ছিলেন আদিল শাহী আমলের সেনাপতি। এই মন্দির তার রেসিডেন্স ছিল।
এখান থেকে তিনি সরকারী কর্ম করতেন। তাই মন্দিরের অরিজিনাল নাম হারিয়ে গিয়েছে। এটা নর্থ ইন্ডিয়ান স্টাইলে তৈরী। মন্দিরের ভিতরে সেরকম ভাবে শৈল্পিক কাজ অনুপস্থিত, যদিও আয়তনে বড় ও আউটার ওয়াল ও পিলারে বেশ কাজ আছে। উল্লেখযোগ্য ভাবে এই মন্দিরে কোন শিখর নেই।
মন্দিরের দ্বারের দুই পাশে গঙ্গা-যমুনা।গঙ্গার মাহাত্ম্য দাক্ষিণাত্যেও ছিল। হতে পারে পাঁচশ শতকে তৈরী এই মন্দিরের স্থপতিরা এসেছিলেন উত্তর ভারত থেকে।
গউদারগুদি মন্দিরের চারিপাশে বৃষ্টির জল জমে আছে।
তাই ভিতরে যাওয়া গেল না। এটি দেবী পার্বতীর মন্দির। আরো কিছু ফটো তোলা হল। মন্দির দেখতে দেখতে স্যাচুরেটেড হয়ে গিয়েছি।
দাক্ষিণাত্যের চালুক্য পিরিয়ডের হিন্দু মন্দির সম্বন্ধে কিছুটা হলেও সম্যক ধারণা পেলাম। এবার সময় এসেছে আরো উত্তরে, অবশ্যই কর্নাটকের মধ্যে বিজাপুরে মুসলিম আর্কিটেকচার দেখার। ভারতবর্ষ হল “বিবিধের মাঝে দেখ মিলন মহান”। দুই ধর্মের ফিলজফিতে বিস্তর ফারাক। তাই হিন্দু মন্দিরে দেবদেবীর মর্মরমূর্তির ভান্ডার, সেখানে মুসলিম ধর্মে মূর্তিপূজা মানা, তাদের মসজিদ কি টুম্ এ ক্যালিগ্রাফি ও সেমিপ্রেশাস স্টোনের নকশা। হিন্দুদের শিখর, মুসলিমদের ডোম।
যাওয়ার সময় তুঙ্গভদ্রা নদী পেরোলাম। দূরে দেখা যাচ্ছে আলমাট্টি ড্যাম। আগমীকাল রাতে আমরা ওখানে থাকব।দূরে দেখা যাচ্ছে এনটিপিসির কুদগি পাওয়ার স্টেশন। চাকরি জীবনে এখানেই লাইফের শ্রেষ্ঠ সময় চলে গিয়েছে।
800hundred kv transmission lineNTPN Kudgi 3X800mw
মধ্যাহ্ন ভোজন সেরে যখন আমরা বিজাপুরে পৌঁছালাম, সন্ধ্যে হতে ঘন্টা দেড়েক বাকী। শহরে ঢোকার মুখে গেটের মধ্যে দিয়ে ঢুকলাম।
দুইদিকে উঁচু দেওয়াল। বোঝা যায় আদিল শাহীর সময়ে ফোর্টিফায়েড সিটি ছিল।নর্থ ইন্ডিয়াতে থাকার সুবাদে ডেকান রিজিয়নে মুসলিম শাসন সম্বন্ধে আইডিয়া ছিল না। মুসলিম শাসন বলতে ১১৯২ সালে তোমার রাজপুতদের হারিয়ে দিল্লিতে সুলতানেট পিরিয়ডের স্থাপন ও ১৫২৬ সালে ইব্রাহিম লোদিকে হারিয়ে মুঘল সম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা অব্দি জানা ছিল। ঔরংজেব দাক্ষিনাত্যে ঔরঙ্গাবাদে অনেক বছর কাটিয়েছিলেন। ১৩৪৭ সালে দিল্লি সুলতানেটের বিরুদ্ধে রিভোল্ট করে সুলতান আলাউদ্দিন বাহমন শা বাহমনী সুলতানেটের প্রতিষ্ঠা করেন। প্রায় দেড়শ বছরের বাহমনী সম্রাজ্যে ডেকান রিজিয়নের বিজাপুর, গোলকুণ্ডা, আহমেদনগর, বিদার ও বেরার এই পাঁচটি জায়গা জুড়ে ছিল। সমসাময়িক ছিল তুঙ্গভদ্রার তীরে হিন্দু বিজয়নগর সম্রাজ্য (১৩৩৬-১৫৬৫)। বিজয় নগরের সঙ্গে বাহমনিদের যুদ্ধ লেগে থাকত। পরের দিকে বাহমনি সম্রাজ্য ভেঙে পাঁচ টুকরো হয়। শিয়া ধর্মাবলম্বী পারস্যের ইউসুফ আদিল শা ১৪৯০ সালে আদিলশাহী বিজাপুরের মসনদ দখল করেন। পরবর্তীতে ইব্রাহিম আদিল শা (১৫৮০-১৬২৭) সুন্নি মুসলিমে দীক্ষিত হন। ইব্রাহিম আদিল শাহের সময়টাকে গোল্ডেন পিরিয়ড বলা হয়। স্ত্রী শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে আদিল শাহীর সঙ্গে তখনকার উঠতি মারাঠাশক্তির সঙ্গে সংঘর্ষ হতে থাকে ও আদল শাহি ডাইনাস্টির পাওয়ার কমতে থাকে। ১৫৮৬ সালে আওরংজেব বিজাপুর দখল করেন। তবে আমাদের গাড়ীর ড্রাইভার মুথ্থুর বাড়ি বিজাপুরে। ওর কাছে শুনলাম এখানে হিন্দু মুসলিমের সম্প্রীতি চিরকাল ধরে বজায় আছে। এখানে মুসলিম পপুলেশন ৭০ ভাগ। সারা বিজাপুর জুড়ে মুসলিম স্থাপত্যশিল্পের নিদর্শন ছড়িয়ে আছে। এর মধ্যে গোলগম্বুজের নাম স্কুলে ইতিহাস বইতে লেখা ছিল। এটি ছাড়া আরেকটি সৌধ ইউসুফ রৌজা, এই দুটি টিকিট কেটে ঢুকতে হয়।
প্রথমে এলাম বাসবেশ্বর সার্কেলের পাশে ‘বড়া কামান’ দেখতে।
এর সঙ্গে আমাদের পরিচিত কামানের কোন সম্পর্ক নেই। ‘কামান’ হল আর্চ। সার্কেলের পাশে গাড়ী রেখে তিনশ মিটার মত হেঁটে পৌঁছলাম গন্তব্যে।
স্টিপ সিঁড়ি বেয়ে উঠে এলাম বেশ উঁচুতে প্ল্যাটফর্মে। একেবারে অন্যরকম দর্শনীয়এই সৌধ, কারণ এটি অর্ধসমাপ্ত। এই সৌধের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য এক গার্ড বসে আছেন। আমরা ছয়জন একমাত্র দর্শক। উনি মোটামুটি গার্ড কাম গাইড।
উনাকেই পাকড়াও করলাম সমান্য দক্ষিণার বিনিময়ে ইতিহাস জানার জন্য। আলি আদিল শা ২ (১৬৫৬-১৬৭২),
গ্র্যান্ড স্কেলে তার মুসোলিয়াম তৈরীর নকশা করেন। প্ল্যাটফর্মের মধ্যভাগে আলি আদিল শা, তাঁর ওয়াইফ চাঁদবিবি ও অন্যান্য মিসট্রেস দের সমাধি আছে।
১৬৭২ সালে নির্মান কার্য শুরু হয়েছিল। ১২ করে আর্চ তৈরী হওয়ার পর, নির্মানকার্য বন্ধ হয়ে যায় এক অজানা কারণে। কেউ বলেন এই টুম্ কমপ্লিট হলে এর ছায়া গিয়ে পড়ত গোল গম্বুজে, তাই নির্মান স্থগিত করা হয়। বাদামী থেকে এখানে আসার পর স্থাপত্যের পার্থক্যে যেটা বেশী চোখে পড়ে সেটা হল এখানের নির্মানকার্যে কালো পাথর ব্যবহৃত হয়েছে, বাদামীতে সব লালচে বাদামী পাথর। জিওলজ্যিকাল এক্সপ্লানেশন হল,
ডেকান রিজিয়ন ৬৫ মিলিয়ন আগে ভলকানিক ইরাপশনে তৈরী হয়েছিল, তাই লাভা থেকে তৈরী এই ইগনিয়াস রক হল কালো।
এর কারণ ছিল কন্টিনেন্টাল ড্রিফ্ট। ইউরেশিয়া প্লেটের ধাক্কা লেগেছিল এই অঞ্চলে। কিন্তু বাদামী বা হাম্পি ডেকান ট্রাপের বাইরে। এখানে সেডিমেন্টারি রক, এটা এক ধরনের স্যান্ডস্টোন যাতে সহজেই চিজেল করে ডিজাইন করা যায়।
আমরা বেশ কিছু ফটো তুলে নেমে এলাম। এখনো সন্ধ্যা হতে কিছু দেরী। এখনি হোটেলে না গিয়ে আরেকটু ঘোরা যায়।গুগল ম্যাপ খুলে কাছাকাছি কোন গন্তব্যের সন্ধান করলাম। এক কিমির মধ্যে আছে আসার মহল বা আসার-ই-শরিফ।
এটা তৈরী হয়েছিল ১৬৪৬ সালে মহম্মদ আদিল শাহের আমলে। মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল বাদশাহী ন্যায়ালয়। চারজন চলে এলাম অটো ধরে। পার্থ আর শিবু এল পয়দলে। ঢোকার পর কিছুটা খালি জায়গা ছাড়িয়ে সামনে আসার মহল
আসার মহলকে এখন মসজিদ হিসাবে ব্যবহার করা হয়। পরে গাইডের কাছে শুনেছিলাম আদিল শাহী আমলে নদীর জল এ্যকোয়া ডাক্ট দিয়ে বিভিন্ন জায়গাতে স্টোর করা হত।
সামনে এক বিশাল জলাশয়। একটু আগে ফজরের নামাজ শেষ হয়েছে। একজন লোকালের সঙ্গে আলাপ হল।
ইনি বংশপরম্পরায় আসার মহলের দেখভাল করেন। ভিতরে প্রবেশ করে দেখলাম সামনের উঠোনের ছাদটা বেশ উঁচুতে। The dilapidated fortifications
Elevated walkway for Sultan’s entrance
পিলারগুলি সব কাঠের।দেখলে বোঝা যায় না। এএস আই থেকে কিছুদিন আগে সংরক্ষণের কাজ করা হয়েছে। উনি আমাদের দেখালেন যে রাস্তা দিয়ে আমরা এসেছি, সেখানে পিলার দেওয়া উঁচু করিডোর। সুলতানের প্রাসাদ ছিল রাস্তার ওপারে। এখন সেখানে ডিসি-র রেসিডেন্স। প্রাসাদ থেকে করিডোর ধরে সুলতান আসতেন বিচারশালায়।
সামনের উঠোনে থেকে বোঝা যায় না পিছনের দেওয়ালে যেখানে মেহরাব আছে, তার পিছনে সিঁড়ি দিয়ে দোতলার প্রশস্ত ঘরে যাওয়া যায়। কেয়ারটেকার জানালেন এখানে হজরতের মাথার পবিত্র কেশ রাখা আছে।
বড়া কামানের গাইড বলেছিলেন গোলগম্বুজ সকাল ছয়টায় খোলে। সকাল বেলায় ভীড় থাকে না। তখন হুইশপারিং চেম্বারে ইকো ভাল বোঝা যায়। ড্রাইভার থেকে লোকাল কিছু লোককে জিজ্ঞাসা করে আরো কনফিউজড হলাম। সবচেয়ে ভাল উপায় একদম গোলগম্বুজের গেটে চলে গিয়ে খবর নেওয়া।
Gol Gumbaj from entry gateসেইমত গাড়িতে চড়ে পৌঁছে গিয়ে জানা গেল সত্যিই গোলগুম্বজ সকাল ছয়টাতে খোলে। ওখান থেকে সোজা পৌঁছালাম হোটেলে মূল শহর থেকে ছয় সাত কিমি। নূতন ঝকঝকে হোটেল।
পাশেই উদিপি রেস্টুরেন্ট। দারুন খাবারের টেস্ট। পরের দিন সকালে উঠতে হবে।
ক্রমশঃ





























































































Comments
Post a Comment