পুজো ২৪


 পুজো শুরু হবে” - শুনলে ষষ্ঠী থেকে দশমীর কথা ভাবতাম। ষষ্ঠীর ব্যাপারটা বোধন ইত্যাদির মধ্যে দিয়ে শুরু হয়ে সপ্তমী থেকে ফুল-ফ্লেজড ফেস্টিভ আবহাওয়া থাকত। আমাদের বাষট্টি বংস এর পুজো প্রথমদিকে শুরু হত পঞ্চমীর দিন আনন্দমেলা দিয়ে। বছর দুয়েক আগে থেকে শুরু হয়েছে মহালয়া শোনা। ভদ্রলোকের মত উষালগ্নে বিছানা ত্যাগ করে বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্র-কে শুনতে যাওয়া বীরের কাজ বলেই মনে করি। তবে দক্ষিণহস্তের হাতছানিটাও আরেকটা আকর্ষণ। ২০২৪শে ব্যাপারটা আরেকটু এগিয়ে এসেছে। এবারের নূতন সংজোযন হল খুঁটি পুজো। পেপারে মাঝে মাঝে পড়েছি এই খুঁটি পুজোর কথা।

খুঁটি শব্দটাকে গরুকে বেঁধে রাখার জন্য বহুল ব্যাবহৃত বলে জানতাম। দেশের সর্বোচ্চ পদাসীন ব্যক্তির ঘরে একটি বকনা বাছুর এসেছে,

হতে পারে তারই বন্দনায় এই খুঁটি পুজো। নয়ডা দূর নয় দিল্লি থেকে! একটু ভিতরে ঢোকা দরকার। ব্যাপারটা কিছুটা ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মত। অনেক আগে ঠাকুরদালানে প্রতিমার কাঠামো শুরুর আগে খুঁটি পুজো হত। এখন প্যান্ডালে বাঁশ পড়ার আগে এই পুজো হচ্ছে। বংশদন্ডটিকে সাজিয়ে গুজিয়ে দন্ডবত প্রণাম মন্ত্র সহকারে। বাঁশ শুনলেই বিপদের বাঁশী বাজে। কর্মজীবনেবস বাঁশ দিয়েছেনশুনে অভ্যস্ত ছিলাম, কারণ বসের কাজই হল বাঁশ দেওয়া। এই রবিবার থেকে প্যান্ডালে মিটিং। আমার ব্যলকনি থেকে মিটিংস্থল দেখা যাচ্ছে। অভ্যাস অনুযায়ী শেষ মূহুর্তে পৌঁছেছি। চারিদিকে বাঁশের রাজত্ব।

তারই তলা দিয়ে গলে, একটাকে টপকে অকুস্থলে পৌঁছান গেল। 


বাঁশের গভীরে প্রবেশ করার জন্য প্যান্ডাল বাঁধার একজনকে ধরি। তার নাম তাপসসবংএ বাড়ী।তাপস বল্ল, ওরা সারা বছর এই কাজই করে বেড়ায়।

এই নিয়ে তিনবার এখানে এসেছে প্যান্ডাল বাঁধতে। অন্যান্য সময়ে উড়িষ্যা, ছত্তিশগড় এইসব রাজ্যে যায় প্যান্ডালের কাজে। বাঁশ যায় সব মেদিনীপুর থেকে। আমাদের প্যান্ডালের বাঁশ অবশ্য ওখান থেকে আসে নি। ট্রান্সপোর্টেশন  খরচাতে বাঁশ হয়ে যাবে। একটি বাঁশের দাম দেড়শটাকা মত। ভেবেছিলাম বাঁশ রিইউজেবল হবে। আদপে সেরকম না। একটা বাঁশের স্থায়িত্ব বছরখানেক বলেই জানাল তাপস। একটু আশ্বস্ত হলাম। পশ্চাতদেশে ঢুকলে মাত্র বছরখানেকের পেইন! সমস্যা হল, লেটে আসার জন্য সমোশা-চা কাটা গেল। এটাও একরকম বাঁশ। যাইহোক খুঁটি পুজোর মিষ্টির প্যাকেট টেবিলে ঢাকা অবস্থায় আছে। আজ বাঁশকে ভয় নেই, কারণ আজ তো তারই পুজো হল। বাঁশবাবাজীকে স্মরণ করে বলি-‘রেখো মা দাসেরে মনে….’ প্যাকেট যেন পুরো খালি না থাকে। মিটিং শেষে প্যাকেট থেকে কয়েক পিস ক্ষীর-কদম্ব বেরোল। একপীস আমিও পেলাম। জমে ক্ষীর! সাবাস বাঁশ। 

প্যান্ডালের কাপড়ের রং সিলেকশন হচ্ছে। একপিস আকাশী নীলও ছিল। এই মূহুর্তে ওই কালার বর্জনের পক্ষে একটা সহমতি পাওয়া গেল।


প্রেসিডেন্টসাহেব আমাকে দেখে রীতিমত শংকিত। উনার পাশের চেয়ারেই বসেছি।

লেখা থেকে বিরত থাকার অনুরোধ এল। কলম ফস্কে লেগ-পুলিং হওয়ার সমূহ চান্স। দেবী দুর্গার ত্রিশূলকে বেশী ভয় লাগত। নবলব্ধ উপলব্ধি হল বীণাপাণির কলমের জোর বেশী শক্তিশালী।অসির চেয়ে মসী বড়কথাতেই আছে। প্রেসিডেন্ট সাহেব ভয় দেখালেন লেগপুলিংএর শাস্তি প্যান্ডেল থেকে পত্রপাঠ বিদায়। কিন্তু “আমি কি ডরাই সখী ভিখারী রাঘবে!” সবিনয় নিবেদন করি-স্যার আমার সোসাইটি হল পার্কের পাশে।

বাঁমদিকের বিল্ডিংএর উপরের ফ্ল্যাটের নীচেরটা হল আমার। সেরকম হলে পাঁচিল টপকে গলতা দিয়ে ঢুকে পড়ব!

বাঁশের গভীরের মত, ৬২ বংসের বঙ্গসন্তানদের গভীরের খোঁজখবর হাওয়াতে ভাসে, তারই কিছু সুতো ধরে সূত্রধর হই, যদিও উদ্দেশ্যটা আদপেই বাঁশ দেওয়ার নয়। আমাদেরই এক পুরানো সংস্কৃতিবান মেম্বার ক্যামেরার শাটারে হাত পাকিয়ে আজকাল মঞ্চের লাইমলাইটেও সমান স্বচ্ছন্দ। ইনি চাকরীজীবনের প্রথমদিকে নিউমার্কেটের সিলেক্টিভ দোকান থেকে বাজার করতেন বেশী দাম দিয়ে, কারণ সেলসম্যান ইংরাজিতে কথা বলে। আজকাল তাকে ধুতি-পাঞ্জাবিতে বেশী দেখা যায়। মাইকেল মধূসুদনের উত্তরসুরী বলা যায় -‘কেলিনু শৈবালে ভুলি কমল কানন এর হরিহর আত্মা বন্ধুর প্রভাবও হতে পারে। উনি যখন ট্যাশ মার্কেটে খরিদারি করেন, বন্ধুপ্রবর তখন গ্রান্ড হোটেলের ফুটপাথে শারদীয়া দেশ, আনন্দবাজার কেনায় ব্যাস্ত।


বন্ধুটি এখনও বঙ্গসংস্কৃতির মূল ধারার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ভাবে যুক্ত।

এক্সটেন্ডেড পুজোর অংশ হিসাবে বিগত দুই-তিন বছর ধরে প্যান্ডালের পাদপ্রদীপের সামনে মহালয়ায় বীরাঙ্গনার বীরেন্দ্র বাণী শোনার নূতন ফ্যাশেনের প্যাশান চলছে। এবার এতে এ্যপেনডিক্সের মত যুক্ত হয়েছে তর্পন। তর্পনে নিজেকে অর্পন করার জন্য প্রমীলা বাহিনীও পিছিয়ে নেই। পারলৌকিক ক্রিয়ার পুরুষতান্ত্রিক ব্যাস্টিয়ন ভেঙে মেয়েরাও আসনপিঁড়ি হয়ে বসেছেন।


প্রথমদিকে সবাই সামনে মুখ করে বসেছিলেন। একটু পরে দেখলাম সবাই পিছনে ঘুরে গেলেন, তারপর আবার নব্বই ডিগ্রিতে।দেখে মনে পড়ে গেল বাচ্চারা এইরকমভাবে একজনের পিছনে আরেকজন দাঁড়িয়ে কু-ঝিকঝিক করে রেলগাড়ী চালাতাম। তবে এযাত্রায় আলুরদম হওয়ার ভয় নেই, কারণ সবাই বসে। বেশ ঘন্টাখানেকের রিগোরাস ড্রিলিং। শার্প মেমরিটাও দরকার। এক ঢিলে দুই পাখি মারার মত বাবার দিকে মায়ের দিকে পিতামহ, প্রপিতামহ, বৃদ্ধ প্রপিতামহম থেকে মাতামহ, মতামহী সবার নাম মনে রাখতে হবে। তবে হিন্দু ধর্মে সব বিধানের কাটান আছে, বেশীরভাগটায় সেটা কাঞ্চনমূল্যে ভক্তরা করেন, এখানে দায়টা পুজো কমিটির।

ঠাকুর মশাই এক সর্বনামের বিধান দিলেন। আশা করা যায় স্বর্গীয় পিতৃ/মাতৃপুরুষ এতে অসন্তুষ্ট হবেনা না। ঠাকুরমশাই ‘মহা’  ‘মহী’র লিঙ্গভেদ এক্সপ্লেন করে দিলেন। উদোর পিন্ডি (আক্ষরিক অর্থে) না বুধোর ঘাড়ে চেপে বসে। দাদুর বদলে দিদিমার ভূত এলেই কেলো। পন্ডিতমশাই আমাদের পুজোর বহুকালের পূজারী। তবে তর্পন প্রথমবার হচ্ছে, তাই সঙ্গে খেরোর খাতা। তর্পনের শেষে সবাই বেশ খুশী। অনেকের কাছেই মেডেন এক্সপিরিয়ান্স। গঙ্গার ঘাটের ঘোলাজলে হাঁটু ডুবিয়ে মিনিট পাঁচেকে কর্তব্যকর্ম সমাপনের থেকে বাড়ীর কাছে পরিচিতদের মধ্যে শাল্ত পরিবেশে তর্পনের মজাই আলাদা। খালি দক্ষিণহস্তের লুচি, ছোলার ডাল, বোদে অন্যদের থেকে দেরীতে পাওয়া যাবে। আমি লুচি-ছোলার ডাল সহ তর্পনের কর্মকান্ড দেখতে দেখতে কব্জি ডুবিয়ে খাচ্ছি, নাচার, কারণ চামচ ছিল না, দেখি সেন-মহাশয় ব্যাজার মুখে বলছেনসরে যান, সরে যান, আমাকে দেখিয়ে খাবেন না।বোঝাই গেল উনার মন পিতৃপুরুষের থেকে ফুলকো লুচির দিকে বেশী ঝুঁকে। তবে সিনসিয়ার লোকও আছেন। গৌতম খুঁজে বেড়াচ্ছে বটগাছ।


তর্পনের জল বটমূলে ঢালতে হবে। আমার ক্ষুদ্রবুদ্ধিতে মনে হল রিচুয়ালটা তৈরী হয়েছে কারন পিতৃপুরুষরা আমাদের মাথার উপর বটগাছের মত ছেয়ে থাকেন।

মহালয়ার একটু ভিতরে ঢুকে পড়ি। যারা আমার হাল্কা লেখা পছন্দ করেন, তাদের জন্য একটু গুরুপাক লাগতে পারে। 

এটুকু আমরা সবাই জানি মহালয়া হল পিতৃপক্ষের শেষ দিন। পারলৌকিক ক্রিয়াকর্মের অন্তে পুর্বপুরুষরা দেবতাদের সঙ্গে মিলিত হন। স্মার্ত মত (ব্রাহ্মণরা যে রিচুয়াল তৈরী করেছেন) অনুযায়ী মৃত ব্যাক্তি একবছর প্রেতলোকে থাকেন।


এটাকে বলা যেতে পারে ট্র্যনজিশনাল ফেজ। ইহলোকের কৃতকর্মের ফলস্বরূপ নির্ধারিত হতে থাকে স্বর্গ না নরক কোথায় আত্মা যাবে। এখানেই ব্রাহ্মণদের মন্ত্রশক্তির পরাক্রম। পিন্ডদানের মাধ্যমে পিতৃপুরুষদের সন্তুষ্ট করে তাদের দেবতাদের সঙ্গে মিলিত হবার পথ প্রশস্ত করা হয়। বৈদিক মতে কিন্তু এই প্রেতলোক ফেজটা নেই। সোজাসুজি স্বর্গে উত্তরণ। তবে ব্রাহ্মিনিকাল মতে এক বছর প্রেতলোকে থাকার ফান্ডাটা, নিজের বুদ্ধি দিয়ে এক্সপ্লেন করার চেষ্টা করি। আমার ফান্ডা আবার বেয়াড়া রকমের প্রাক্যটিকাল। সময় হল বেস্ট হিলিং টাচ। সেই হিসাবে ধরা যেতে পারে বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর বছরখানেক শোকপালনের পর সবাই স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন। এরপর শোকও কমে আসবে, প্রোপরশেনটলি পিন্ডদানের ইচ্ছে। এসবের জন্য পন্ডিতমশাইদের শরানাপন্ন হতে হয়। সুতরাং দক্ষিণাদির জন্য মৃত্যুর পর একবছর প্রেতলোকে থাকার বিধান দেওয়া হয়েছে।

মহালয়ার অনুষ্ঠান শুরু সাড়ে পাঁচটা থেকে। অতি কষ্টে ছটাতে উঠে অকুস্থলে উপস্থিত হয়েছি। শখানেক লোকজন।


বেশ ধূপ-টুপ জ্বলছে, একটা পবিত্র ভাবের ভাইব চারিদিকে। ঘাসের মধ্যে দুই তিন জায়গায় ধুয়া দেখে ভাবলাম ধুনো জ্বলছে, তবে কাছে যেতে খোলসা হল 

ডিমের ট্রে থেকে ধুয়া উঠছে। মশা মারার নূতন টেকনিক! কাল বাসব আর গৌতম যখন মাইক সেট করতে ব্যস্ত তখন শুনছিলাম ধুনুচি জ্বালানোর নারকেল ছোবড়া পাওয়া যাচ্ছে না। বল্লাম কেন, মাদার ডেয়ারিতে গেলেই পাওয়া যাবে, সবাই তো ছোবড়া ছাড়িয়ে নারকেল নিয়ে যায়। তখন শুনলাম আজকাল নারকেল ন্যাড়ামুন্ডি হয়ে বাজারে আসছে। সত্যিই, ফেরার সময় দেখি ফলওয়ালার কাছে মুন্ডিতমস্তক নারকেল শোভা পাচ্ছে। ইমাজিন করিএর পরের ধুনো জ্বালাতে গেলে এম্যাজন থেকে নারকেলের ছোবড়া কিনতে হবে।

 আসনগ্রহন করতে না করতে চা-বিস্কুট এসে গেল।মোর ঘুম ঘোরে কে এলে মনোহর নম নম দেবী দুর্গার মনোহর রূপের বদলে ধূমায়িত চা এর কাপ। ঘুমের ঘোর কাটাতে চা এর জুড়ি নেই। চায়ের কাপে তুফান না তুলে নীরবে পারিপার্শ্বিক পর্যবেক্ষণে মন দিই। গান-টান, স্তোত্রপাঠ সবই চলছে, সব ছাপিয়ে শ্রোতৃমন্ডলীর কলকাকলী ভেসে আসছে। পাঠ শোনার পাট চুকিয়ে সবাই গল্পগাছায় ব্যস্ত। দীর্ঘ বছর শেষে দেবীপক্ষের সূচনার মধ্যে দিয়ে বাষট্টি বঙ্গ পরিবার একত্রিত হয়েছে। তাই মহিষাসুরমর্দিনী শোনা উপলক্ষ্যমাত্র। আর কয়েকদিন পর মঞ্চ কাঁপাবেন লোকাল আর্টিস্টরা। জোরকদমে রিহার্সাল চলছে। তারই খোশগল্প। আগে মঞ্চ ছিল মহিলাদের ডোমেন, এখন কিছু সিজনড এর সঙ্গে এম্যেচার মেল ভয়েস ঘাঁটি গেড়েছেন। তবে শিল্পকলার ষোলকলা তখনই পূর্ন হয় যখন সঙ্গীত শিল্পের সঙ্গে পোষাক শিল্পের মেলবন্ধন ঘটে। মানানসই ড্রেস হল মঞ্চে ওঠার অন্যতম শর্ত। মহিলা মহলে কিছু গুনগুন-ফিসফাস শোনা গেল। ফিশি ব্যাপার মনে হচ্ছে। কান খাড়া করেও শুনতে পেলাম না, কারণ বীরেন্দ্র কৃষ্ণ তখন উদাত্ত গলায় মা দুর্গাকে সাজাচ্ছেন। চক্রব্যূহ থেকে এক পরিচিত ভদ্রলোক বেরিয়ে আসার পর খোলসা হল।


গ্রুপ সংএ যে ড্রেস অনলাইনে কেনা হয়েছে, হুবহু সেই একই ড্রেস পরে দুই একজন ঘুরছেন। ঝুলি থেকে ক্যাট আগেই বেরিয়ে গেল। মঞ্চে ক্যাটওয়াকের মজাটা আর রইল না। 

পেসিডেন্ট সাহেব আমাকে একটু এড়িয়ে চলছেন। দেখা হতেই জানালেন - আমার থেকে একটু দূরে থাকাই ভাল, কলমের খোঁচা খাওয়ার ভয় আছে। সবিনয়ে বলি - স্যার আপনি দু-দুটো পোস্ট হোল্ড করে আছেন, নিজের সোসাইটির প্রেসিডেন্ট আবার পুজোর কর্মকর্তাদের মধ্যমনি, আমার মত দু কলমের কলাকারকে ভয় পেলে কি করে চলব। দুটো স্লিপারি সারফেসে স্কিলফুলি নেগোশিয়েট করছেন কোন নেগেটিভ মার্কিং ছাড়া, তো আমি কোন ছার! একটু খুশী হলেন মনে হল। বংস টিমের মিঃ ডিপেন্ডেন্ট বাসব তখন একাই অডিও সিস্টেম গোটাচ্ছে। বল্লাম কাল সন্ধ্যাতে এসে দেখি, বাসব একাই তার-টার লাগিয়ে কানেকশন করে স্পিকার লাগাচ্ছে। পেসিডেন্ট (অভয়া বা নির্ভয়া কান্ডের পর হোয়াটস্ এ্যপে পিসি শুনে শুনে আমার কলমে প্রেসিডেন্টের বদলে পেসিডেন্ট চলে আসছে, কবে পিসিডেন্ট হয়ে যাবে কে জানে!) জানালেন এবারে আরেকটা নবতম ইভেন্ট সংযোজন হতে চলেছে, সেটা হল রাস্তায় আলপনা দেওয়া হবে। বাসব এর প্রধান রূপকার। বলি - সে তো ঝাড়ু মেরে আগে রাস্তা সাফ করতে হবে। পেসিডেন্ট সাহেব জানালেন বাসব পুরো ব্লু প্রিন্ট বানিয়ে রেখেছে, মিনিট টু মিনিট এ্যক্টিভিটির হিসাব আছে তাতে। তবে এটা জানাতে ভুললেন না গতকাল আমার মত উনিও এসেছিলেন প্যান্ডালে, তবে আমার মতকাঠালীকলানা হয়েমার্গ দর্শনএর গুরুদায়িত্ব পালন করে গিয়েছেন। এ্যম্পলিফায়ার গানের সঙ্গে কড়কড় আওয়াজ দিচ্ছিল। খালি অসুর বধের সময় ম্যালফাংশান করলে ঠিক ছিল, কিন্তু সারাক্ষণ নয়েজ হচ্ছে। পেসিডেন্ট সাহেব গানের ভলিউমের থেকেঅডিও কোয়ালিটিরদিকে বেশী নজর দিতে বলেছিলেন। তাই সিস্টেম চেন্জ হল। খালি একটু দুঃখ করলেন, নিজের সোসাইটির অডিও সিস্টেমটা ফাংশানে দিতে পারেন নি বলে। কেউ যদি দেখে বলে চেয়ারের অপব্যবহার হচ্ছে! পেসিডেন্ট হওয়ার হ্যাপা কম নয়। সবদিক সামালকে চলনা পড়তা হ্যায় ভাই কলামনিস্ট। তো কাগজের উপর আঁকিবুকি নয়, ম্যান ম্যানেজমেন্ট জড়িত। পার্কের এক কোনে মোবাইল টাওয়ার। তারপাশে আরো খোঁড়াখুড়ি চলছে। শুনলাম লোড বেশী হয়ে গিয়েছে তাই ইন্দাস টাওয়ার কোম্পানি নূতন টাওয়ার লাগাবে। তবে শুনলাম সব সোসাইটির আপত্তি হল যাতে নিজেদের সোসাইটির পাশে টাওয়ার না লাগে। বাজারে গুজব ছড়িয়েছিল মোবাইল টাওয়ারের সিগন্যাল  থেকে কাউর নাকি ক্যান্সার হয়েছিল। কালকেই টিভিতে দেখছিলাম ইরান একসঙ্গে দুশ মিসাইল ফায়ার করেছে তেল আভিভের উপর।


টিভিতে অন্ধকার আকাশে আগুনের গোলার মত মিসাইল উড়ছে। ভাবি সমান্য মোবাইল টাওয়ারের সিগন্যালে এত ভয়, এরকম মিসাইল দিল্লি-নয়ডার আকাশে দেখলে লোকে তো ভিরমি খাবে। আমাদের পেসিডেন্ট সাহেব কায়দা করে পুজোপার্কের পাশের সোসাইটি শক্তিকুঞ্জ আর RWA এর পেসিডেন্ট গুপ্তাকে জানিয়ে দিয়েছেন। তারা এখন ফিল্ডে নেমেছেন ব্যাটিং করতে। পাশে আরএকজন ভদ্রলোক গুপ্তার নাম শুনে একটা মজার ঘটনা জানালেন। আমাদের সোসাইটিগুলির সামনের রাস্তায় কিছু শব্জিওয়ালা ফলওয়ালা বসে। গুপ্তার ঠ্যালা খেয়ে তারা মাঝে মাঝে ডিসলোকেট হয়ে উদ্বাস্তুর মত ঠ্যালাগাড়ীতে শব্জি বিক্রি করে। কিছুদিন আগে সব্জির দোকানগুলোর সামনে ঝগড়া হচ্ছিল। লোক জমে গিয়েছে। মধ্যমনি গুপ্তাজি। আমাদের সোসাইটির এক মহিলা তার পেট কুকুরকে নিয়ে বাজারে যান। সেই সারমেয় খুব সুইট। বাজার থেকে ফেরার সময় সে নাকি বাজারের থলি মুখে ধরে নিয়ে আসে। গুপ্তাজী মহিলাকে বলছেন -“আপকা কুত্তাসে মুঝে বহুত ডর লাগতা হ্যায়, কভি ভি কাটেগা, বাজারমে মত লাইয়ে কুকুর অবশ্য চেনে বাঁধা। মহিলা ছাড়বার পাত্র নন, তার সপাট জবাবআপ ভি কুত্তাই হো, কভি ভি কিসিকো কাট সকতে হো, পুরা ৬২ আপকা খিলাপ হ্যায় গুপ্তাজি নাকি এরপর রণেভঙ্গ দিয়েছেন। পাবলিক ফিগারদের এসব একটু সইতে হয়। 

কলকাতার দেখাদেখি আজকাল এনসিআরে থিম পুজোর ফ্যাশান শুরু হয়েছে। তবে এবছরে থিম একটাই, সেটা হল নির্ভয়া কান্ড। মহালয়ার প্রভাতী অনুষ্ঠানের পর ওপেন মঞ্চ। একটি বাচ্চা মেয়ে নির্ভয়া কান্ডের ন্যারেশনের সাথেসাথে নাচ করল।


শুনলাম প্যান্ডালের গেটের বাইরে আরজিকর কান্ডের প্রতিবাদে ব্যানার লাগানো হবে। তবে ফটো সিলেকশন নিয়ে নানা মুনির নানা মত। একটি মেয়ের রক্তাত্ব অবয়বের স্কেচ বাতিল হয়ে গেল, কারন নারীমূর্তি (তা সে স্কেচ হোক) চলবে না। অবশেষে অসুরদলনী দুর্গা পরিত্রাতা হয়ে এলেন। মাতৃরূপিনী দুর্গা           


ঠিক
নারী নন, তিনি অশুভ শক্তি বিনাশকারী প্রতীকী মূর্তি। তবে একটু ধ্বন্দে থাকি, প্রতিবাদের ঝড় সুবিচারের আশায় দেশ উত্তাল, হোয়াটস্ এ্যপে টনটন অশ্রুপাত, কাস্টমার ব্যানার ইত্যাদি লাগছে, কিন্তু পুজো বাজেটে বৃদ্ধি ঘটেছে, উৎসবের সেলিব্রেশনে কোন কমতি হচ্ছে না, খালি তিলোত্তমা তিল তিল করে অন্তর থেকে মিলিয়ে যাচ্ছে। রবিঠাকুরের কবিতা মনে পড়ে যায়-“তোমার পূজার ছলে তোমায় ভুলে থাকি

ফাংশনের শেষে গান গাইল এক তরুন। ভিনি ভিডি ভিসি। নাম শুভময়।


বাষট্টির কলামন্ডলীর ক্যাপে নূতন পালক। আলাপ করি। আপাতত চাকরীসূত্রে এখানে। আদি নিবাস ইস্পাত নগরী জামশেদপুরে। এখন টাটানগরকে টা-টা বাই-বাই করে বাটা নগরে থিতু হয়েছেন। শুনেছি ওখানে গঙ্গার ধারে অনেক সোসাইটি হয়েছে।


এরা গঙ্গার শীতল সমীরণ সেবনের সৌভাগ্যের অধিকারী। বাটা নগরে বাটা মাছ পাওয়া যায় কিনা জানি না, তবে ইলিশ নাকি ডায়মন্ডহারবারের জেলের জাল টপকে বাটানগরের মার্কেটে লাফিয়ে ঢুকে পড়ে! তারপর হেঁসেলে ঢুকে সর্ষেবাটা ইলিশ!

সংযুক্তার চশমা দেখি সামনে গোঁজা।


জিজ্ঞাসা করি এটা নূতন স্টাইল মনে হচ্ছে। বল্লাম তোমায় বেশ এল্যিগান্ট দেখাচ্ছে, আর বয়েসটাও কম লাগছে। সংযুক্তা থ্যাঙ্ক ইউ দিল। বলি - দিল সে দিচ্ছ তো, আমার মত পাকাচুলের থেকে কমবয়সী কমপ্লিমেন্ট দিলে বেশী খুশী হতে বোধহয়। সংযুক্তা অবশ্য ঘাড় নেড়ে জানাল সেরকমটা মোটেই নয়। 

ভাঙা হাটে যেখানে অডিও সিস্টেম ছিল, তার সামনে গিয়ে দেখি একটা পিতলের ঘড়ার উপরে ডাব বসিয়ে স্বস্তিক চিহ্ন আঁকা।


বাসব জানাল জায়গাটাতে একটু পবিত্র ভাব আনার চেষ্টা হয়েছে। চিত্ত প্রসন্ন হবে আর কি-“হে মোর চিত্ত, পুণ্যতীর্থে জাগো রে ধীরে মহিষাসুরমর্দিনী শুনতে শুনতে সবাই ভাবসাগরে নিমজ্জিত হব। বাসবকে জিজ্ঞাসা করি ঘড়া কোথায় পেলে? তারপর অনেকের মুখেই শুনলাম, বিয়ের সময় যৌতুক হিসাবে বাসন-কোষন সমেত এই ঘড়া লাভ করেছেন। লক্ষীঠাকুরের হাতেও এরকম ঘড়া দেখেছি। সম্পদের দেবীর কাছে ঘড়া মানে মালকড়ি নিশ্চয়ই ভেতরে আছে। আমি অবশ্য বিয়েতে পিতলের ঘড়া পাই নি, একটা ঘড়ি পেয়েছিলাম মনে আছে। কিন্তু নাকের বদলে নরুণে কি মন ভরে! তিন ডজন বছর পেরিয়ে আবার শোক উথলে উঠল। তর্পনে বসি নি বলে বেশ অফশোষ হল। এই সময় শ্বশুর মশাইকে পিন্ডদান করার সময় টুক করে ঘড়াটাও চেয়ে নিতাম। যাক গতস্য শোচনা নাস্তি। 


মহালয়ার পর থেকে পুজোর আগমনী ধ্বনিকে জোরদার করার জন্য রোজ রাতে মিটিং। ফান্ডের ফান্ডা পাওয়া গেল। বাজেটের অর্ধেকের থেকে কিছু কম আসবে মেম্বারদের চাঁদা থেকে, বাকীটা এ্যডভারটাইজমেন্ট স্টল বুকিং থেকে। এক্সিকিউটিভ মেম্বার হলে চাঁদার উপর আবার উপরি দক্ষিণার বিড়ম্বনা থাকে। কাজ এক্সিকিউট না করতে পারলেও কি করে এক্সিকিউটিভ মেম্বার হলাম কে জানে!

প্যান্ডালে ঢুকে দেখি প্রতিমা মুখ ঢেকে পূজাবেদীতে বিরাজমান। অসুরে চোখ গেল।


মাথাটা আমার মতই সাদা মরুভূমি। কি ব্যাপার-বয়স্ক অসুর নাকি! নিজেকে অসুরের ভাই মনে হল। মা দুর্গার ত্রিশূলের খোঁচা খেলে নিশ্চিত স্বর্গবাস। তাহালে আর ইহজন্মের পাপকর্মের দায়ভার নিয়ে নরকের ওয়াশিং মেশিনে ধুয়ে তারপর স্বর্গের দরজায় কড়া নাড়তে হবে না। চুলচেরা বিচার করে নবলব্ধ আনন্দের রেশ কাটল, কারণ শুনলাম যে অসুরের চুল লাগানো এখনও বাকী! অসুরের নবতম সংযোজন হল পায়ে নাগরাই জুতো।
ঠাকুর-দেবতাদের খালিপায়ে দেখতে অভ্যস্ত। অসুর দেখা যাচ্ছে টেকন্যিকালি এ্যডভান্স। তবে এতে মৃৎশিল্পীর বুদ্ধির পরিচয় পাওয়া গেল, শর্টকাট মেরেছেন, খালি পা বানাতে মেহনত বেশী। বিশ্বজিত এসে চুপিচুপি  বলে গেল মা লক্ষী সরস্বতীকে দেখে মনে হচ্ছে এরা নিয়মিত জিম করছেন। গনেশের পেটে চর্বির পরিমাণ কম। আজকাল পুজোর অবসার্ভার হিসাবে পরিচিতি লাভ হবার সুবাদেস্টোরিস্বতপ্রবৃত্ত হয়ে আমার স্টোরে ঢুকে পড়ে। সরজেমিনে তদন্ত করে আসি। আজকালের ফ্যাশান ট্রেন্ড অনুযায়ী দেবতা দেবী নির্বিশেষে জিরো সাইজ মনে হল। মনে মনে বলি ঠাকুর দেবতা নিয়ে হাসি মশ্করা ঠিক না। অপরাধ নিও না মা- ‘ মিনতি করি পদে অসুরের নাগরাই জুতোর রহস্য ভেদ করতে হবে। আরো গভীরে ঢুকতে হবে। দিল্লিতে খোদ বাঙালীর পীঠস্থান সিআরপার্কে চলে যাই চতুর্থীর দিন। পঞ্চমীর দিন ৬২র দিন আনন্দমেলার ভাগে বঞ্চিত হয়ে নিরানন্দ থাকতে চাই না। মেট্রোই ভরসা। গ্রেটার কৈলাসে নেমে ১০ টাকার শেয়ার টোটো চেপে পৌছালাম গন্তব্যস্থানে। সিআর কালীবাড়ীর পিছনে ঠাকুর তৈরী হয়।

মেলাগ্রাউন্ড ঘুরে কালীবাড়ী যাই। মৃৎশিল্পী ফিনিশিংটাচে ব্যস্ত। সূদুর নয়ডা থেকে অসুর সম্বন্ধিত প্রশ্ন শুনে সন্দিহান চোখে তাকান।


জিজ্ঞাসা করি অসুরের নাগরাইএর রহস্য। উনি বোঝালেন অসুর ছিলেন রাজা, তাই পায়ে নাগরাই, এটাই চলে আসছে অনেক বছর ধরে। বাকী দেব-দেবীর বেয়ার চরণযুগলের রহস্য উন্মোচনের চেষ্টা করি। লজিক অনুযায়ী মনে হল ঠাকুরের পাদুকাবিহিত পদযুগল স্পর্শে পুণ্যের আধিক্য থাকবে, এছাড়া মা দুর্গা, লক্ষী, সরস্বতীরঅতুল রাতুল চরণকমলদর্শনে ভক্তিভাব আসে। 

এবার প্যান্ডেল কমিটিকে দশে দশ। কৃতিত্ব অবশ্যই কারিগরদের।



দীর্ঘ তেইশ বছরে এত নীট ক্লিন প্যান্ডেল হয় নি। ৬২র প্যান্ডাল চিরকালই আয়তনে নজর কেড়েছে, সৌন্দর্যে নয়। এবার সে কমতিটুকু পূরণ হল। এই প্রথম শ্যান্ডেলিয়ার লেগেছে। শুভ জানাল দুই প্রধান কারিগর তাপস বলাই প্যান্ডালের সাইজ অনুযায়ী অঙ্ক কষে বাঁশের কলামের সঙ্গে উপরের আড় বাঁশের ছাউনির কমপ্লেক্স ক্যালকুলেশন করে কাজ শুরু করেছিল। পূর্ব অভিজ্ঞতার ফসল, এবার পুরো প্যান্ডেলের উপরে ত্রিপল। বিগত কয়েক বছরে অকালবর্ষনে দর্শকদের দাঁড়িয়ে অনুষ্ঠান শুনতে হয়েছে। তবে নিজস্ব অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি এবার বৃষ্টি হবে না, কারণ সারাজীবন যতবার বর্ষাকালে ছাতা নিয়ে বেরিয়েছি, বৃষ্টি পাই নি, মাঝখান থেকে ছাতা হারিয়ে বাড়ী ফিরেছি। গেটটাও বেশ নয়নমনোহর।


কারিগর বল্ল -একটু দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের আদলে তৈরী। যদিও আমার কাছে কষ্টকল্পিত মনে হল।


ইলেকট্রিক কমিটির মধ্যমনি অধিকারীদা পিনাকী। পিনাকী থাকে আমার সোসাইটিতে।


পেসিডেন্ট সাহেব সব কাজকর্মের খবর রাখেন। তার কাছে খবর পেয়েছিলাম ইলেকট্রিকালে রেভেলিউশন। সাইন্টিফিক ওয়েতে তার টানা হচ্ছে, বিনা ইলিউশন। পিনাকী মাথা খাটিয়ে এসএলডি (সিঙ্গল লাইন ডায়াগ্রাম) বানিয়ে ফেলেছে। আমি ওই লাইনের হলেও এখন ভিএমডি (ভুলে মেরে দিয়েছি) পিনাকী বল্ল ড্রইং এখন অটোক্যাডে ফাইনাল প্রিন্ট হয়ে এলে ডিসপ্লে করা হবে কন্ট্রোল রূমে। পিনাকীকে কংগ্রাচুলেট করে বলি নিজের নামটার সঙ্গে বিই (হনস) লিখে ডিসপ্লে করে দিও। এখন হল মার্কেটিংএর যুগ।  এমারজেন্সি সাপ্লাইএর জন্য একটা পুরানো ডিজি সেট এসেছিল। পিনাকীর কোয়ালিটি চেকে ফেল।

কন্ট্রাক্টারকোই বাত নেহিবলে ঘন্টা দুয়েকের মধ্যে সাড়ে দশলাখ টাকার ডিজি সেট নিজেই ট্রাক্টরে চাপিয়ে নিয়ে এলেন।

আলাপ হল। এর নাম আবিদ। এর কাছে একশরও উপর ডিজি সেট আছে। ৬২র রামলীলা থেকে সারা নয়ডা জুড়ে বিজনেস। জিজ্ঞাসা করি-এত ডিজি সেট কোথায় রাখেন? আবিদ জানাল সেক্টর ৬৩তে গোডাউন আছে নিজস্ব। বাণিজ্যে বসতি লক্ষী! আবিদের পরনের শার্টে ছোপ ছোপ দাগ। কে বলবে কোটি টাকা কামাচ্ছে। বল্লাম-‘আপ কো তো স্যুচ-টাই পহনকে ঘুমনা চাহিয়ে।” আবিদ জানাল সে এই ড্রেসে ট্রাক্টর চালিয়ে বেশী আনন্দ পায়। কথায় আছে -‘ঢেকি স্বর্গে গেলেও ধান ভাঙে”! 


 মিটিং হচ্ছে সন্ধ্যাতে। পুজো কমিটির দুই সিনিয়ার মেম্বার এক কোণে চেয়ার টেনে সিরিয়াস ডিসকাশনে রত। শুনলাম এবার ভজঘট পুজোর টাইমিংএর জন্য রাতেই পুজোর জিনিষপত্র গুছিয়ে রাখতে হবে। পেরিশেবল আইটেমের জন্য দরকার ফ্রীজ। অত সকালে দুধ পাওয়া যাবে না। অতএব দুধ রাখার জন্য নিরামিষ ফ্রীজ চাই। বাঙালী বাড়ীতে নিরামিশ ফ্রীজ আর সোনার পাথরবাটি সমগোত্রীয় আমি বল্লাম- আমাদের লিবারেল হিন্দুধর্মে সবেরই কাটানের বিধান আছে। পুরুত মশাইকে এরজন্যমূল্য ধরেদিতে হয় অথবা গঙ্গাজল ছিটিয়ে বিশুদ্ধ করে নেওয়ার নীতি আছে। এরা অবশ্য আশ্বস্ত করলেন এক সংস্কারী শাশুড়ি-বৌমার কাছে এরকম ফ্রীজের বরাত ফ্রীজ করা হয়েছে। 

ইনি পরিচিত প্রসিদ্ধ মিষ্টান্নভান্ডার “_মহাশয়নামে। ৬২ সমাজে ভোকাল টনিকের জন্য পরিচিত। ভিষকাচার্য মহলে  তার রেফারেন্সে গেলে ডিসকাউন্টে চিকিৎসার সুবিধা পাওয়া যেতে পারে, এরকমটাই বংস গ্রুপে জানিয়েছিলেন। আজকাল গন্ধরাজ লেবুর ডিপ্ল্যোম্যাসি করে নাম কামিয়েছেন। তবে এই সুগন্ধের রসনাতৃপ্তি নিতে গেলে বার্টার সিস্টেমে বাটার চিকেনের বিনিময় মূল্য ধার্য করে রেখেছেন। সান্ধ্য মিটিংএ পাশেই বসে ছিলেন। জানালেন আজকাল একটু দুখী আছেন। কারণটা জানা গেল তার সোসাইটিতে সম্প্রতি এক রিটায়ার্ড বঙ্গসন্তান এসেছেন। তার বাক্যবাণে _মহাশয় সাহেব কুপোকাৎ। এতদিন ৬২ সমাজের অম্ল-মধুর ভাষণের মুকুটহীন সম্রাটের তকমা টলটলায়মান। নবউদিত ভদ্রলোক একটু দেরী করে পার্কে মর্নিংওয়াকে যান, তাই ইনি রক্ষা পেয়েছেন, এরকমটাই জানালেন। যাক তাহালে বাবারও বাবা আছে, কারণ ইনার হাত থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য আমি দূর থেকে ইনাকে হাই-হ্যালো করে থাকি।

আমাদের স্যুভেনির কমিটির সেক্রেটারী সুশোভন কুল হেডেড হাসিখুশী ভালমানুষ।পর্দার আড়ালে কাজ বলে সেলিব্রেটি স্ট্যাটাসে আসতে পারেন নি। তবে তাতে সুশোভনের কোন অফশোষ নেই। ইনি অল সিজন ভেজিটেবল। আলু টাইপের। না দোষের কিছু নেই, গুনেরই সমাহার। অল সিজন বল্লাম এই কারণে যে সুশোভনের কাজ সারা বছর ধরে চলে। সমস্ত এ্যডভারটাইজিংএর কাগজপত্র সামলানো, তার ইনভয়েস পাঠান, বিজ্ঞাপণের কনটেন্ট রাখা, পেমেন্ট ট্রাকিং ইত্যাদি তো আছেই তার সঙ্গে সংস্কৃতির কলমচিদের কলমের খোঁচা সামলে ম্যাগাজিনে পাবলিশ করা-এসব সারা বছরের কাজ। বিনিময়ে একদিন মঞ্চে ওঠার সৌভাগ্য, বাকী তিনশ চৌষট্টি দিন হোমফ্রন্টের, ‘ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো অনুযোগ। জনান্তিকে বলে রাখি পুজোর জন্মলগ্ন থেকে জড়িত থাকলেও জড়তা কাটিয়ে মঞ্চের রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা অর্জনের সৌভাগ্য হয় নি। এবার নেপথ্যে থেকে রঙ্গমঞ্চের সঞ্চালিকার একটি উপক্রমনিকা লিখে দেবার সৌভাগ্য অর্জনের বিরল কৃতিত্বের অধিকারী হয়েছি। বছরের ট্রেন্ড অনুযায়ী লেখনীতে জেনারাস পাঞ্চ অফ অভয়া দিতে হয়েছে।

আমার নাম স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে কেউ রিসেপশন কমিটিতে ঢুকিয়ে দিয়েছে। এতে অবশ্য আপত্তি থাকার কথা নয়। বাকী কমিটিগুলো, প্যান্ডাল, লাইটিং, ভোগ, কালচারাল কমিটির মত দুই-তিনমাস আগে থেকে প্রিপারেশনের দরকার নেই। পুজোর দিনগুলিতে ফুলবাবু সেজে, রিসেপশন কমিটির উচ্চাসনে বসার সৌভাগ্য হয়। উঁচু থেকে ফাংশান দেখতেও সুবিধা। 

যে কজনের নিরলস প্রচেষ্টায় এই পুজো সুষ্ঠভাবে সম্পন্ন হয়ে আসছে তার মধ্যে অন্যতম শুভব্রত বাসব। পাঠককুল - সবার নাম নিলাম না বলে আমার উপর উষ্মা প্রকাশ করবেন না। পসিটিভ থিংকিংএ থাকবেন। ভাববেন না যে আপনার নাম কেন বাদ গেল, বরঞ্চ যাদের নাম বাদ গেল তাদের কথা ভেবে খুশী থাকুন। শত্রুপক্ষের লোক হলে খুশী আরো দ্বিগুন হওয়ার কথা। অবশ্য প্রকাশ্যে - ‘ মা ছি-ছি, কি যে বলেন, আমরা সবাই তো বন্ধু’, রকম একটা সাফাই শোনা যায়, কিন্তু বাঙ্গালীর পুজোতে একটু দলাদলি না হলে কিছু একটা মিসিং লাগে। 

শুভ পাবলিকেশন জগতের লোক। এখন প্রকাশ ভারতীতে আছে।


আগে ছিল অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেসে। শুভর মুখে শুনলাম, ইউনিভার্সিটির ছত্রছায়ায়, ইন্ডিয়াতে বই পাবলিশ করে টু পাইস কামাচ্ছিল, এফএম এবার ঘেঁটি ধরে দশ কোটির উপর ট্যাক্স আদায় করে নিয়েছেন। মনে পড়ল কয়েকদিন আগে হোয়াটস্ এ্যপে ঘুরছিল, নির্মলা তাই-এর কাছ থেকে কাউর রক্ষা নেই! পাশে বসে শুভ এ্যমাজনে টি শার্টের ডিজাইন দেখছে। জনৈক সহৃদয় মেম্বার প্যান্ডাল ওয়ার্কারদের টি শার্ট উপহার দেবেন।


তার কয়েকটা কম পড়েছে, তাই অর্ডার করতে হবে। শুভ বল্ল কয়েকদিন আগে এই একই টি শার্ট অর্ডার করেছিল, ঠিকানার সিলেকশনের গেরোতে সেটা পৌঁছে গিয়েছে কলকাতায় তার মায়ের হাত ঘুরে দেশের বাড়ী বালুরঘাটে। মা তো অবাক। শুভ বল্ল ভালই হয়েছে, ঠাকুরের ইচ্ছে ছিল, দেশের বাড়ীতে কিছু পাঠাই, তাই এই ঠিকানা বিভ্রাট হল। যেটা বলছিলাম বাসব শুভ এখন যথেষ্ট দূরে শিফ্ট করে গিয়েছে, কিন্তু ৬২র পরিচিত গন্ডীর সান্নিধ্য বেশী পছন্দ, তার জন্য রোজ দুইবেলা দশ কিলোমিটার ড্রাইভিংএ আপত্তি নেই। বাসব এবার নূতন কারিক্রম শুরু করেছে।সেটা হল প্যান্ডালের সামনের রাস্তায় আল্পনা অঙ্কন।


এটা প্রথম দেখেছিলাম বাংলাদেশে ২১শে ফেব্রুয়ারি ভাষাদিবসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাস্তায়। এর স্বপ্নায়নের দীর্ঘ প্রস্তুতিপর্ব বাসবকৃত। ব্যাপারটায় রূপকারের মস্তিষ্কের ক্রিয়েটিভিটি কায়িক শ্রমের ফসল।

পথে কি ধরনের আল্পনা হবে সেটা ভিসুয়ালাইজ করে ড্রইং বানিয়ে তাকে অটোক্যাডে সফ্ট বানানো। এরপর হল কাঠের দোকান থেকে এমডিএফ বোর্ড কিনে। সিএনসি মেশিনে (সেটা গ্রাটার নয়ডার বিশার্ক বলে কোথাও) সাত ঘন্টা দাঁড়িয়ে স্টেনসিল বানাতে হয়েছে। ফাইনাল প্রোডাক্ট গাড়ীর উপর বেঁধে আনার সময় হাওয়াতে একপিস হাওয়া। গাড়ী থামিয়ে সেটাকে গরু খোঁজা করে বাসব সময়মত পৌঁছেছে। কেউ কেউ একটু সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন, বিশ-পচিশ হাজারের রংএর আঁকিবুকি রংবাজী হয়ে যাবে না তো! রাস্তা বন্ধ করে কাজ হবে। তবে পেসিডেন্ট সাহেবের অগাধ ভরসা। জানালেন বাসব পুরো মিনিট টু মিনিটের প্ল্যানিং করে রেখেছে। সব ফ্যাচাং কাটিয়ে সংখ্যাগরিষ্ট উৎসাহীরা হোয়াটস এ্যপে নাম লেখালেন। পৌনে বারটায় অকুস্থলে পৌঁছে দেখি রাস্তায় আলাদা হ্যালোজেনে আলোকিত। পুলিশ পারমিশন পাওয়া গিয়েছে। রাস্তা সকালেই জল দিয়ে ধোয়া হয়েছে। জনৈক লোকাল পেন্টের দোকানের মালিক

মাতাজীকে লিয়েপুরো পেন্ট দান করেছেন। কম নয়, বিশ লিটারের বেশ কিছু ডাব্বা। ফটোগ্রাফার ভাড়া করে আনা হয়েছে। রেডি হই। গতবারের ম্যাগাজিনে সব অনুষ্ঠানের তো ছেড়ে দিলাম, কোন গ্রুপ ফটোতেও আমি নেই। এবারে মেন ফোকাস ফটো তোলায় রাখতে হবে।  গেট সেট গো। বাসব অলরেডি চক দিয়ে রাস্তায় দাগ টেনে স্টেনসিল বসিয়ে টেস্টপিস বানাচ্ছে। রং গোলান কমপ্লিট। প্রায় জনা চল্লিশ ভলিন্টিয়ার বাসবের চারিদিকে। এক্ষুনি ভীড়ে ঢোকা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। এখন “সেল্ফি লে লে”র সময়!

যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসাবে প্রথমে একটা সমরাস্ত্র অর্থ্যাৎ ব্রাশ তুলে নিই। ব্রাশ দিয়ে ফুটপাথের ধুলো ঝেড়ে বসি। মশাও অনেক ঘুরঘুর করছে। মশককুলের সঙ্গে মশকরা নয়। এই যুদ্ধক্ষেত্রে একবিন্দু রক্তপাতের জন্য আমি প্রস্তুত নই। আমার থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট।

হাফ ফুলের মাঝামাঝি। বছর দুয়েক আগে এক দিদিমনি খুব বকাবকি করেছিলেন হাফু নিয়ে। আমি সামারে হাফুর ভক্ত। তবে এবার মাথা খাটিয়ে মিন্ত্রা ঘেঁটে এই থ্রী কোয়ার্টার পাওয়া গিয়েছে। এদিক ওদিক তাকিয়ে খুঁজে বার করি কারা ওডোমস নিয়ে এসেছে। একবার আনোয়ার একবার নিরূপম, এই দুজনের কাছে পালাক্রমে গিয়ে ওডোমস লাগিয়ে আসি। প্রথমদিকে রিজার্ভ লাইনে বসে খেলা দেখা ভাল। পরের দিকে উইকেট পড়লে মাঠে নামা যাবে। বসে বসেই চা বিস্কুট এসে গেল। ভোলার চায়ের দোকান আমাদের সামনের মার্কেটে। আজকে ভোলাও আমাদের সঙ্গে রাত দখল অভিযানের আংশীদার। আট বছরের বাচ্চা থেকে অক্টোজেনারিয়ান নন্দীবাবু,

সবাই আছেন। রাস্তার মাঝের ডিজাইনটা কমপ্লিকেটেড। বুদ্ধি খাটিয়ে এক একটি খোপে এক এক কালার। একটা স্টেনসিলে একটি বৃত্তের এক চতুর্থাংশ। রাস্তার দুই সাইডের ডিজাইনটা সোজা মনে হল। একটাই রং সাদা। ভুল করে লালের জায়গায় নীল লাগাবার চান্স নেই। স্টেনসিল কম, রং-তুলি ধরার লোক বেশী। দুই একজন পরিচিত গ্লাভস পরে রেডী ছিলেন। একটা বাজার আগেই ঘুমে ঢুলু ঢুলু চোখে বিদায় নিলেন। লোকাল সারমেয় বাহিনীও আমাদের সাথে রাতদখল অভিযানে সামিল হয়েছে। রাজদীপ হল ভোগ কমিটির কর্তা। ওই কমিটির উপযুক্ত চেহারা। রাজদীপ সব ব্যাপারে উৎসাহী। মিটিংএ এসে আমায় কানে কানে বলে গিয়েছে-‘রায়দা, আপনার লেখায় আমি যেন থাকি। ওর ব্যাটিং শুরু সপ্তমী থেকে। তখনি মওকা পাব লেখার।রাজদীপ সন্দিহানবসেও তুলি চালাতে পারবে কিনা। আমি বুদ্ধি দিলাম - সেরকম বুঝলে হাত পা ছড়িয়ে রাস্তায় শুয়ে পরে তুলি চালাবে, নিজেকে ব্যাটেলফিল্ডের সৈনিক ভেবে নেবে। আড়াইটা নাগাদ অনেকে ট্রিপ করে গিয়েছেন দেখে গুটি গুটি পায়ে এগোই।খালি সাদা রং লাগানোর ডিজাইন তিনজন মহিলা উইথ স্টুল দেখে এগিয়ে যাই। পিঁড়ি ছাড়া বসাটা পীড়াদায়ক। কোওয়ার্কারদের সঙ্গে আলাপ হল। একজন হলেন মিসেস (Shaw).

মিসেস হলেন দ্বারভাঙ্গার আর মিস্টার বঙ্গসন্তান না হলেও কলকাতার লোক। মৌসুমী ম্যাডাম শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একটানা পেন্টিং করে গেলেন।সব্যসাচীর মতো কখনো দুই হাতে। অন্য কোওয়ার্কার মিসেস শেঠ। কলেজে ল্যাবে তিনজনের গ্রুপ হত। আমরা বলতাম কোওয়ার্কার।    

এখানেও সেই রকম ব্যাপার হল। মিস্টার শেঠের সঙ্গে দুই বছর আগে পুজোতেই আলাপ। ফি বছর আমার কিছু জ্ঞানলাভ হয়। এবারেও মশা নিয়ে কিছু জানলাম।মাঝে মাঝে ওডোমস মেখে আসছি। মস্কুইটো রিপেল্যান্ট বলে জানি। শেঠসাহেব ক্ল্যারিফাই করলেন, ওডোমসের গন্ধের জন্য মশা রনেভঙ্গ দিচ্ছে, এরকমটা ঠিক নয়। আমাদের বডির স্কিন থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড বেরোয়, এতদিন জানতাম এটা খালি নাকের কাজ। মশা নাকি আকর্ষিত হয় বডি অডার থেকে। এরপরের নলেজ হার্ট সম্বন্ধিত। হার্টের একটি ছোট সংস্করণ পায়ের কাফ মাসলে আছে। প্রেমে পড়লে আমরা বলি হার্টথ্রব, সেরকমটা মনে হল বালক বয়েসে প্রেমের উন্মেষ হলে সেটা হল কাফলাভ।   মাঝখানে লাইট চলে গেল। বাকীরা কাজ বন্ধ করে গল্পে ব্যস্ত। এটাই হল এ্যটেনশন ড্র করার প্রকৃষ্ট সময়।

মোবাইল জ্বেলে কাজে লেগে পড়ি। মাঝে মাঝে সুদৃশ্য জাপানী হাতপাখার হাওয়া পাচ্ছি।

সৌজন্য প্রমীলাকুল।
পটাপট ফটো উঠিয়ে শান্তি।চারটে নাগাদ একটি তরুন এল। নাইট ডিউটি দিয়ে ফিরছিল। ভাঙা বাংলায় জানাল সে আর্টিস্ট, তার মা বাঙালী, বাবা উড়িয়া, জগন্নাথ মন্দিরের পুরোহিত। বিশ্ব আর্টিস্ট, তারুণ্যের উচ্ছাস তার চোখে মুখে।সে নিজেই আলাদা করে কিছু বানাতে চাইল।

দুই দিকে দুটো আল্পনা আঁকল সে। একটা বাচ্চা ছেলেও এসেছে। মা-বাবার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে রাত জাগছে।

তার নাম কৈরভ। আমার বাংলা স্টকে এই শব্দের সঙ্গে পরিচিত নই। ছেলেটি জানাল এর মানে হলহোয়াইট লোটাস
শেষের দিকে ঘুম কাটাতে গণসংগীত হল, সঙ্গে নাচ। পরিবেশনায় মানসীবৌদি ও পিয়ালী। সোয়া পাঁচটাত গিয়ে সব কমপ্লিট। সাড়ে চারটের সময় একদল মধ্যবয়স্ক মহিলা-পুরুষ, এক ডিজাইনের টিশার্ট পরে বেরিয়েছেন জগিংএ। ভারত বৈচিত্র্যময় দেশ। সাড়ে চারটায় ঘুম থেকে ওঠার লোক আছে, আবার আমার মত নয়টাতে ওঠার লোকও আছে। 
পঞ্চমীর দিন সকালে প্যান্ডাল পরিদর্শনে গিয়েছি। সুদূর গোয়া থেকে আমাদের ঢাকি হাজির। ওর নাম সন্জীব দাশ। জেনারেশন উপস্থিত। সঙ্গে ছেলে, আর বাবা এসেছেন হাওড়া থেকে। শাশ্বত ভারতের রূপ। প্রজন্ম পরাম্পরায় চলে আসছে জীবিকার জন্য অধীত বিদ্যার উত্তরাধিকার। গতবার ঢাক নিয়ে ফেরত যাবার সময় নিজামুদ্দিন স্টেশনে তারের খোঁচা খেয়ে “ভেসে গেল ফঁসে গেল কালীরামের ঢোল” হয়ে গিয়েছিল। ওর বাবা হাওড়া থেকে ছাগলের চামড়া নিয়ে এসেছেন। এটার উপর ঢাকের কাঠি পড়ে। 
বাঁধা হচ্ছে যে ফিতে দিয়ে সেটা হল গরুর চামড়া থেকে। গোরক্ষা সমিতি এখনও খবর পায় নি মনে হচ্ছে!
ষষ্ঠীর সকালে মানে সাড়ে এগারটা নাগাদ ঢুকি মন্ডপে। আমার রঙ্গমঞ্চ- রিসেপশন কমিটির সদরদপ্তরে চেয়ারে বসে একাই বুঁদিগড় সামলাই।

ঢাক বাসছে গেটের কাছে। বাকী কর্মকর্তারা একটু ব্যস্তসমস্ত মনে হল। ‘ব্যান্ড বাজা বরাত কেস’ লাগছে। কি ব্যাপার? সকাল সকাল কোন ভিআইপির আগমন। এক সুন্দরীকে দেখা গেল। সঙ্গে ক্যামেরাম্যান।

তাঁকে বুকে দিয়ে অভ্যর্থনা জানানো হল। তড়াক করে লাফিয়ে যাই জটলার দিকে। জটিল ব্যাপার। বড় কর্মকর্তাদের পরিচিতি চলছে। ইনি এসেছেন স্টার আনন্দ থেকে। টিভিতে ফটো আসার চান্স আছে। সেঁটে থাকতে হবে। মনটা আনচান করলেও আগ বাড়িয়ে যাওয়াটা সমীচীন নয়। আমার পরিত্রাতা হয়ে এলেন সুতপা বৌদি। আমার রিএ্যক্টিভ পাওয়ার (ইলেকট্রিক্যাল লাইনের লোকেরা বুঝবেন) কে এ্যক্টিভ করিয়ে আলাপ করিয়ে দিলেন এ্যক্টিভ মেম্বার হিসাবে। ব্যাটিংএ নেমেছি। প্রথম বলেই ছক্কা। ম্যাডামকে বল্লাম-আপনার শাড়ীটার ডিজাইন খুব সুন্দর।

একদম বং বিউটি লাগছেন। ম্যাডাম খুশী হয়ে থ্যাঙ্ক ইউ দিলেন। পরে আলাপ হল। নাম অদিতি অরোরা।হিমাচলের পাঞ্জাবী পরিবার, বর হল মারাঠী। বল্লাম মারাঠীরা তো শুনেছি ভেজ। অদিতি জানালেন শ্বশুরবাড়ী ইউপিতে। এরা ননভেজও খান। অদিতি সিজনড এ্যঙ্কার মনে হল। আগে আজ-তকে ছিলেন। দুর্গা প্রতিমার সামনে, প্যান্ডালের ভিতরে বাইরে ঘুরে ঘুরে দুর্গাপুজোর উপর আলোকপাত করলেন। মেম্বারদের গ্রুপ সং প্রতিমার সামনে বসে রেকর্ডিং হল।

আমি লিপ সার্ভিস দিয়ে গায়কের তকমা পেলাম। বাঙালী নির্ভেজাল আড্ডারও রেকর্ডিং হল। গেলবার শুধু ছেলেদের ড্রেসের উপর প্রাইজ ছিল-এরকমটা শুনে অদিতি জিজ্ঞাসা করলেন মেয়েদের কেন হয় নি। ফোড়ন কাটলাম-তাহালে আর রক্ষা থাকবে না। ‘জয় মা চামুন্ডা’ বলে ঝগড়া শুরু হবে। মহিলারা অদিতির সঙ্গে দুর্গা প্রতিমার সামনে ফটো তুলছেন দেখে-বলি -  ‘অদিতি ম্যাডাম, হাম পুরুষলোগোকে দুখী মত করিয়ে! আমাদের সাথেও ফটো চাই।’ প্রেসিডেন্ট সাহেবকে শোল্ডার পুশ দিয়ে ম্যাডামের পাশে দাঁড়িয়ে পড়ি।

মরনিং শোজ দ্যা ডে। পুজোটা ভালই কাটবে মনে হচ্ছে!
দেবদত্ত
৮/১০/২৪

পুজো যে পার্কে হয় সেটা বেশ টানা লম্বা। প্যান্ডালের পিছনের দিকে সারি সারি স্টল।


খাবার দোকানগুলোর রমরমা বেশী। এরমধ্যে একটা মিস্টির দোকান হল আমাদের সোসাইটির সেক্রেটারি শর্মাজীর। মাল্টিট্যালেন্টেড লোক। সম্প্রতি দেখলাম নামের পাশে এ্যডভোকেট লিখছে। এতদিন চাকরি করত HCL এর ফাইন্যান্স ডিপার্টমেন্টে। বছর দুয়েক ধরে সোসাইটিতে দুইভাগে বিভক্ত মন্দির ইস্যু নিয়ে। শর্মাজি মন্দির দলের কান্ডারী। বছর দুয়েক আগে ঘটা করে তুলসী বিবাহ হয়েছিল। কালীগন্ডকী নদীতে প্রাপ্ত নারায়ণরূপী শালগ্রামশিলার সাথে তুলসীরূপী লক্ষীর বিবাহ।এই অনুষ্ঠানের পর, প্রথমে একটা মুরগীর খাঁচাতে তুলসী-নারায়ণ শিবলিঙ্গ নিয়ে সূচনা। যার বাড়ীর পাশে মেকশিফ্ট মন্দির, তিনি একদিন ঘন্টার শব্দে অতিষ্ঠ হয়ে

পদাঘাতে খাঁচা ফেলে দিলেন, শিবলিঙ্গ মাটিতে গড়াগড়ি যাচ্ছে দেখে ভক্তদের আত্মারাম খাঁচাছাড়া হওয়ার যোগাড়। পুলিশ এল এবং নাস্তিক লোকটি একরাত হাজতবাস করে বেল পেলেন। পুলিশ কনফিউসড, কারণ সেমসাইড গোল, কালপ্রিট নিজেও হিন্দু। ঘন্টার শব্দে ভক্তিযোগের মোটিভেশন না পেয়ে পদাঘাতের মোটিভ হল শব্দব্রহ্মর নিনাদ! এই নিয়ে যুযুধ্যমান দুই গোষ্ঠীর বিবাদ আদালত অব্দি গড়াল। শর্মাজি অপোজিশন কে শায়েস্তা করার জন্য পাশ করে এখন দিল্লি বার কাউন্সিলের মেম্বার। মন্দির কমিটি এখন সোসাইটির ম্যানেজমেন্ট কমিটিতে। প্রত্যেক শনি-রবিবার খাঁচার সামনে ঘন্টা নেড়ে, দুই বছরের মাথায় আস্ত মন্দির খাড়া করে ফেল্ল। বেশ নূতন স্টাইলের মন্দির। রাজস্থান থেকে সিএনসি মেশিনে দেবতার এমবসড ডিজাইন সহ স্ল্যাব দিয়ে একসপ্তাহে মন্দির রেডি।

চারদিন ব্যাপী বেনারসের পন্ডিত কথকথা করে তার প্রাণ প্রতিষ্ঠা করলেন, এই রামনবমীর সময়। শর্মাজি এখন চাকরি ছেড়ে হালুইকর। স্টলে ৩০/- প্লেটের কচুরী বাঙ্গালী মিষ্টি বিক্রি হয়েছে দেদার। 

অষ্টমীর দিন রিসেপশনের পডিয়ামে বসে ফাংশান দেখছি, কর্মকর্তাদের ডাকাডাকিতে উঠে যাই জটলার মধ্যে। তিন-চারজন পুলিশকেও দেখা গেল। খাকি পোশাককে চিরকালই ভয় পাই।এবারে পুলিশের দাবী অনুযায়ী পুলিশ বুথ বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমি বুথ থেকে যথাসম্ভব দূর দিয়ে চলি! আজকাল এঁরাও ফায়ার আর্মসের থেকে সোশাল মেডিয়ার আক্রমণে বেশী বিচলিত থাকেন। শুনলাম জনৈক অজিত ভারতী টুইট (আজকাল নাম বদলে এক্স) করেছেন ৬২র প্যান্ডালে বিহারীদের ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। সর্বৈব মিথ্যা। পুলিশও জানে গেটে কাউকে আটকানো হয় না। কিন্তু পুলিশ জানাল আধঘন্টার মধ্যে টুইট ভাইরাল হয়ে ৪০০০ ভিউ হয়েছে। পাড়ার ছোটখাট কাজে টুইট করে নয়ডা অথরিটির কাছ থেকে কাজ আদায় করা গিয়েছে। আমার উপর গুরুদায়িত্ব চাপল জবাব দেওয়ার।


আমার পুলিশের যৌথ উদ্যোগে অভিযোগটিকে নস্যাৎ করা হল। এর উত্তরে কেউ কেউ লিখলেনঅমুক ধারায় মামলা করে দিন।পরের দিন সন্ধিপুজো। বিশ্বাস করুন কি না করুন, এতদিন পর্যন্ত এই সন্ধিপূজা দেখার সৌভাগ্য হয় নি। দুর্গা ঠাকুরের সঙ্গে আমার সন্ধি হল কেউ কাউকে বেশী বিরক্ত করব না। খালি অঞ্জলিটা মিস করি না, তাহালে মিশনবোদে প্রসাদমিস হয়ে যাবে। এবারে সকাল সকাল উঠে মুখ না ধুয়েই প্যান্ডালে হাজির হই। একটি তরুন ছেলেকে দেখি মাটিতে বসে কলপাতায় প্রদীপ জ্বালিয়ে কয়েক রকম ফল সাজিয়ে মাতৃ আরাধনায় রত।

ভক্তিরসের সঙ্গে সঙ্গে শৃঙ্গার রসের যোগ। দুইদিকে বড় সাইজের ফল রেখে বাকী ছোট ফল মাঝে একই লাইনে সুন্দরভাবে সাজিয়েছে। ঢুকে গিয়েছি ভিআইপি বক্সে। ঠাকুরের ভোগের রন্ধনপটিয়সীরা ব্যস্তসমস্ত। ভোগরান্নার ঘরের মধ্যে দিয়ে ঠাকুরের সামনের বক্সে এনট্রি।


বেশ সুঘ্রান এসে নাকে লাগছে। নিঃশ্বাস বন্ধ করে এগোই। ঘ্রানেন অর্ধভোজনং হয়ে গেলে পাপ লাগবে। এক ব্রাহ্মিণীর কৃপাদৃষ্টির ফলে মাঝে মাঝে এই সুস্বাদু মহাভোগের ভোজনের অভিজ্ঞতা হয়েছে। প্রসাদ নাকি কণিকামাত্র। তবে আমার রসনা চক্ষুকর্ণের মাথা খেয়ে স্বল্পে নিবৃত্ত হয় না। এরপর নিশিকান্তর ঘ্যাট জোলাপ লাগে। ভোগ কমিটির বাজেট বরাদ্দে কাঁটছাট হয়েছে মনে হয়। অথবা দুইদিন খাসির সঙ্গে ট্রেডঅফ করতে গিয়ে খাস তিনদিন সপ্তমী, অষ্টমী, নবমীর ভোগ লঙ্গরসমান। যাইহোক ভিতরে গিয়ে সন্ধিপুজো দেখার সৌভাগ্য হল। এই মাহেন্দ্রক্ষণে দুর্গা চন্ড মুন্ড নামে দুই মহিষাসুরের দুই চেলাকে বধ করেছিলেন। তবে মহিষাসুর বধ ঠিক কোন সময়ে হয়েছিল সেই নিয়ে ধ্বন্দে থাকি। সেই মাহেন্দ্রক্ষণের খোঁজে গুগল বাবাজীর শরণাপন্ন হই। তবে এর সদুত্তর পাই নি। হাল না ছেড়ে এআই (মেটা) এর সাহায্য নিই।

ইনাকে গুগলের বড়দা বলা যায়। তবে এতেও বড়রকম কোন সলিউশন পাওয়া গেল না! তবে মেটার ইনাটালিজেন্স লেভেলে ভারতীয় বুদ্ধিমত্তার পরিচয় পাওয়া গেল, উত্তরে মাহেন্দ্রক্ষণের সঠিক সময় না দিলেও দেবী মাহাত্ব্য অসুরবিনাশ নিয়ে প্রচুর তথ্য পাওয়া গেল। আমিও ছাড়বার পাত্র নই। পুনরায় জিজ্ঞাসা করি একই প্রশ্ন।

এবার অবশ্য জবাব দিয়ে মেটা আমার জ্ঞানপিপাসা মেটালেন। জানা গেল দশমীর দিন অসুরবধ হয়েছিল। বুঝলাম তাই আমরা দশমীকে বিজয়া-দশমী বলে। ঠাকুরের বেদীর কাছে শয়নশয্যার ব্যবস্থাও দেখলাম। দীর্ঘ চারদিনব্যাপী পুজোতে তাঁদেরওতো বিশ্রাম দরকার।

এরপর ১০৮ প্রদীপ জ্বালানর পালা। উপস্থিত ভক্তবৃন্দ একেকজন একটি প্রদীপ জ্বালিয়ে সন্তুষ্ট নন। সবাই একাধিক জ্বলালেন, পুণ্যের সঞ্চয় বাড়ল। কিউ-তে আমার চিরকালই কিন্তু কিন্তু ভাব। সব প্রদীপ জ্বালার পর ভীড় পাতলা হতে সক্রিয় হই। দুটো প্রদীপ ঠিকমত জ্বলে নি। সেগুলোই ঠিকঠাক করে জ্বালাই। সেকেন্ডহ্যান্ড পুণ্যঅর্জনের ভাগীদার হয়ে বর্তে যাই!

 ইতিমধ্যে যে ছেলেটি প্রদীপ জ্বেলে একান্তমনে পুজো করছিল, ঠাকুরের কৃপাদৃষ্টির পরিবর্তে তার উপরকমিটি রোষানল বর্ষিত হয়।পসিবল ফায়ার হ্যাজার্ডেরদোহাই দিয়ে তাকে বকাবকি শুরু হল। দুই-একজন মাতৃস্থানীয় পুজোস্থল ছেড়ে ছেলেটিকে আগুনেরপরশমনিনা শুনিয়ে তার এইরকম ডেয়ারিং এ্যডভেন্চারের কুফল নিয়ে প্রভূত সতর্কতা বার্তা শোনালেন। ছেলেটির অবস্থা মনে হল অভিমণ্যুর চক্রব্যূহে ঢুকে ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়ার দশা।

দশমীর দিন সকাল সকাল হাজির হয়েছি, টি শার্ট না মিস হয়ে যায়।



বছর তিন-চার হল নয়ডা অথরিটির বানানো পাড়ার পুকুরে বিসর্জন হচ্ছে। আগে দশকিমি দূরে যমুনাতে বিসর্জন হত। এনসিআরএর সব পুজোর ভাসান যমুনাবক্ষে হত। ভীড়ের মধ্যে নিজের পাড়ার লোক চিনে ট্রাকে ওঠার জন্য টিশার্ট খুব কাজে দিত। এখন সেই ব্যাপারটা নেই, টি-শার্টের প্রয়োজনীয়তা কমলেও ল্যিগাসিটা রয়ে গিয়েছে। টিশার্ট ডিস্ট্রিবিউশনে আছে অতনু। নাম লিখে একেকজনকে দিচ্ছে। ভাবলাম একটা ঝেঁপে দিয়ে জামাইবাবাজীকে দেব, কারণ সেও আমার সঙ্গে দেবীবরণ দেখতে এসেছে, একযাত্রায় পৃথক ফল ভাল নয়। তবে অতনু শক্ত ঘাঁটি, ঘাপটি মেরেও সুবিধা হল না, যেখানেই যাচ্ছে টি-শার্টের পোটলা হাতে আছে।

প্রতিবারের মত ঢাকের তালে মহিলাদের সিঁদুর খেলা নাচ চলেছে। ঠাকুরবরণের জন্য দীর্ঘ লাইন। কেউ কেউ অনুযোগ জানাচ্ছেন ঠাকুরের মুখে মিষ্টি ছোঁয়ানো যাচ্ছে না, কারণ মই ছাড়া অত উঁচুতে হাত যাবে না। লাইনের ধারেকাছেই থাকি, যদি দিদিমনিদের কেউ বিজয়ার মিষ্টিমুখ করান। মিষ্টান্ন মিস করলেও দধিকর্মার ভাগ পাওয়া গেল। কর্মফল আর কি! নাকের বদলে নরুণই সই! দুটো ট্রাকে ঠাকুর উঠেছেন। মহিলা ব্রিগেড সবার আগে। ভাসানের নাচ চলছে। পুকুরটা কাছেই।


তবে এবার অক্টোবরে সূর্যদেব বেশ তেজী। সবার চক্ষু এড়িয়ে দ্বিতীয় ট্রাকের সামনের সীটে উঠে পড়ি। রাস্তার গাছের ডাল সব ঝুঁকে পড়ে দেবীবরণ করছে। ইয়াং ব্রিগেড ট্রাকের উপর লগি হাতে গাছের ব্যূহ থেকে ঠাকুরের রাস্তা বানাতে গাছকোমর বেঁধে লেগেছে। পুকুড় পাড়ে সবাই একত্রিত। ঢাকের বাজনায় বিসর্জনের করুণ সুর।


ঠাকুর ভাসান হচ্ছে। আমি ট্রাকের সিটিং পজিশন থেকে নড়ি না। একে রোদ তায় আবার চারিদিকে ধুলো। পকেটের রুমালটাকে মুখে বেঁধে নিই, ডাবল এ্যকশন স্ট্রাটেজি-ধুলোর প্রটেকশনও হল আবার লোকের চোখে ধুলো দেওয়া গেল!

কারণ বাকীরা লক্ষ্য করলে পরে প্যাঁক খেতে হত। মাঠে ফেরত এসে ফণীর চায়ের স্টলের ঠেকে বসা গেল। চা কোল্ড ড্রিংকস সহযোগে পুজোর হাইলাইটস নিয়ে আলোচনা হল।


ভালয় ভালয় পুজো মিটেছে, অর্গানাইজাররা হাঁফ ছেড়ে বেচেছেন, এখন সবাই রিল্যাক্সিং মুডে। বাসব একটা হ্যাট পরেছে।

এটা এনেছে ভিয়েতনাম থেকে। রাতে মাংস ভাতের আয়োজন। সন্ধ্যে বেলায় কোলাকুলির পালা। আমার অশান্ত মনে শান্তি জলের কথা মনে থাকে না। বাকীদের দেখে এগিয়ে যাই। পুকুরের ঘোলা জল। পুরুতমশাইয়ের হাতে পড়ে তাই এখন পবিত্র। সোমদত্তা বলে একটি মেয়ে গান গাইল। আর্টিস্ট বল্লে বোধহয় সুবিচার হয় কারণ শিল্পীর দক্ষিণামূল্য আছে। মাংসভাত শেষ। খবর পাওয়া গেল দুই-একজন মাছ, মাংস, পনির তিনটেরই সদ্বব্যবহার করেছেন। অতিথি শিল্পীও ডিনার করে জল খাচ্ছেন। দর্শকদের বেশ প্রশংসা
করলেন।

মুড ভাল দেখে সুযোগ বুঝে এগিয়ে গিয়ে সেল্ফি তুলে ফেলি। 

লক্ষীপুজোও শেষ। এরপরের ফাংশান কালীপুজো। মধ্যবর্তী সময়ে রিল্যাক্সিং করতে চলে যাই কুমায়ূন হিলস। ওখানেই দুঃসংবাদ পেলাম সংযুক্তা আর আমাদের মধ্যে নেই।


কয়েকদিন আগে এই প্রাণবন্ত মেয়েটিকে দেখেছি পুজোর সমস্ত অনুষ্ঠানে ভাগ নিতে, সারারাতব্যাপী রাস্তায় আলপনা দিতে। মন মেনে নিতে চায় না, কিন্তু বাস্তব কখনো বড় কঠিন নিষ্ঠুর। আরো কত কি চাওয়া পাওয়ার বাকী ছিল, অর্ধশতাব্দীব্যাপী জীবন এক ফুৎকারে নিভে গেল। এর আগের পর্বে ওর কথা লিখেছিলাম।তখন কি স্বপ্নেও ভেবেছি কয়েকদিন পরে চিরকালের মত হারিয়ে যাবে, স্মৃতি হয়ে রয়ে যাবে ওর মধুর ব্যবহার আর ঠোটের কোণের সদাবিরাজমান মিষ্টি-মধুর হাসি। ৯৩-৯৪ সালে যখন বদরপুর পাওয়ার স্টেশনে পোস্টেড ছিলাম, সেই সময় সংযুক্তার বর নিরুপম এনটিপিসিতে ট্রেনিং এর পর পোস্টিং পায়। বাঙ্গালী বলে ভালই আলাপ ছিল। 

আজ কালীপুজোয় দুপুর ১২টা থেকে মিটিং। সদ্যপ্রাপ্ত কুমায়ুনী টুপি রোদচশমা লাগিয়ে হাজির হই মিটিং স্থলে।


ট্রেজারার বোসদার মন প্রসন্ন। সাথে সবসময় থাকে খাজাঞ্চির ঝোলা। ইনার মেজাজের ওঠানামা দেখে বোঝা যায় বাজেট কালেকশনে ঘাটতি না সারপ্লাস।

এবারে মোটামুটি টার্গেট মিট হয়েছে এরকমটাই জানা গেল। মার্কেটে ভোলার চায়ের স্টল থেকে মনভোলান চা বিস্কুটও হাজির। সোমাদেবী একটা সোনার কয়েন বার করেছেন।

এটি কোন এক মহিলা দুর্গাঠাকুরকে নিবেদন করেছেন। পুরুতমশাই নাকি এটা বাগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু অতনুর শ্যেনদৃষ্টি এড়াতে পারেন নি। ম্যাডাম জানালেন সোনার টিপ কাস্টডিতে আসার পর রোজই রাতে নিজের গয়না ছেড়ে টিপকে টিপেটুপে দেখেন। মায়ের অলংকারের কাস্টোডিয়ান, হারিয়ে যাওয়ার শংকাতে শংকিত। আজ মিটিংএ হ্যান্ডওভার করতে চাইলেন। টিপের ভবিষ্যত নিয়ে অনেকেই টিপস দিলেন। কেউ বল্লেন ওটা প্রতিবছর মায়ের কপালে লাগিয়ে বিসর্জনের আগে খুলে ফেলা হবে। সবশেষে ঠিক হল ওটা বিক্রি করে টাকাটা পুজোর কাজে লাগান হবে। পেসিডেন্ট সাহেব সব কমিটিকে ধন্যবাদ জানালেন
সুচারুরূপে সব কাজ সম্পন্ন হওয়ার জন্য।কালচারাল কমিটির পূর্ব অধ্যক্ষ হিসাবে পরিচিতির সুবাদে সব আর্টিস্টদের ফি পাঁচ-দশ হাজার কমিয়ে দিয়েছেন, এরকমটাও জানাতে ভুললেন না। মিটিং এর মধ্যেই জনৈকর ফোন এল রাতে মাংস-ভাত না নিরামিশ? নিরামিশ হলে ডিনার মিস করবেন এরকমটা বোঝা গেল। একজন কলকাতা থেকে ফোন করে রাতের ভোজন থেকে বিরত থাকার রায় দিলেন। পেসিডেন্ট সাহেব জানালেন সবরকম বিপরীতধর্মী আলোচনা তাকে বুদ্ধি করে সামলাতে হয়। রাতে প্যান্ডালে উপস্থিত হয়েছি। এবার চারিদিকে বেশ বাজী ফাটার আওয়াজ পাচ্ছি। পুলিশ চুপচাপ আছে। আমারও মনে হয় একদিনের বাজীতে কি ভোজবাজির মত পলিউশন বাড়বে। পুরানো ট্রাডিশন চলতে দেওয়া উচিত। রিসেন্ট রিসার্চ পেপারে দেখলাম দেওয়ালী বাজী থেকে নেগলিজিবল পলিউশন হয়।
কাবেরীদি তার ছোট মেয়েকে নিয়ে হাজির। এবার পুজোয় কাবেরীদির গানের গুঁতো মিস করেছি। সদাহাস্যময়ী কাবেরীদি কবিতাও লিখে থাকেন। উনার হাসব্যান্ড দে-সাহেব আমাদের কোম্পানিতেই ছিলেন, বছর দশেকের সিনিয়ার। কাবেরীদি শিবভক্ত। এই বয়েসে কেদারনাথ, পশুপতিনাথ, মুক্তিনাথ সব ঘুরে এসেছেন। কাবেরীদির মেয়ে নামকরা বার্ডওয়াচার। ওর কাছেই জানলাম বার্ডওয়াচারদের রাঙ্কিং হয় কত স্পিসিসের পাখি দেখেছে তার উপর।

সেই হিসাবে ইন্ডিয়াতে সে প্রথম সারিতে আছে। ও একবার সেন্ট্রাল অমেরিকার কোস্টারিকাতে ঘুরে এসেছে। বল্ল আবারও যাবে। ওর কাছে শুনলাম ভারতীয় উপমহাদেশে ১৩০০ প্রজাতির পাখি আছে, ছোট্ট দেশ কোস্টারিকাতেও ১৩০০ প্রজাতির পাখি! বল্লাম আমি খালি রামপাখির ভক্ত। ও একটু অবাক।খোলসা করি- রামপাখি হল মুরগী, চিকেন আমার প্রিয়। দিনকয়েক আগে কুমায়ুনে আলমোড়া জেলাতে ছিলাম। মোবাইলে একটা নাম না জানা পাখীর ফটো তুলেছিলাম।


পরীক্ষা করার জন্য ছবি দেখিয়ে নাম জিজ্ঞাসা করি। দেখে বল্ল -এটা হল ব্ল্যাক হেডেড জে। কংগ্রাটস দিয়ে বলি পরীক্ষায় সসন্মানে উত্তীর্ন। 

দেবদত্ত

৩১/১০/২৪



Comments

  1. Too good and too detailed - waiting for more

    ReplyDelete
    Replies
    1. Thank you so much. Debating for adding more or not. After all it requires considerable time and observation.

      Delete
  2. This comment has been removed by the author.

    ReplyDelete
  3. খুব মজা পেলাম। আপনার লেখায় একদিকে যেমন বিস্তৃত বিবরণ তেমনি সাথে সাথে চুটকি চাটকা, কাঠি বাঁশ চলায় শুকনো রিপোর্ট একদমই মনে হয় না। সার্থক নাম ব্লগের। অনেক অভিনন্দন ও ধন্যবাদ

    ReplyDelete
  4. Debasish Chatterjee6 November 2024 at 06:06

    Great work. Detailed description of Puja activities with a hilarious tone. All tit bits of Puja Pandal consolidated in one place. Read in one go as it quite absorbing.
    Looking forward for more.

    ReplyDelete
    Replies
    1. Thanks Debashis. I had more material to write. But got busy with other stuff

      Delete
  5. Khub sundar ebong sabalil lekha. Podte bhalo lage. Aapni likhte thakun. Apni amader garbo. We / I are / am proud of you.

    ReplyDelete
  6. Oporer ta PRDas , Sharad Kunj theke

    ReplyDelete
  7. Thank a lot Das-da… your comments are really inspiring 🙏🏼

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

ত্রিবেনী তীর্থপথে ও আরো টিটবিট

রবিঠাকুর ও কিছু হাসি মশকরা

A walk to explore Delhi’s lesser known monuments