মালোয়া ভ্রমণ (পার্ট ২)
বেলা সাড়ে আটটা নাগাদ ব্রেকফাস্ট সেরে বেরিয়ে পড়লাম ধারের উদ্দেশ্যে। গুগল ম্যাপে ৬৬ কিমি দেখাচ্ছে। তবে আমরা যাব পরশুরামের মন্দির ও চম্বল নদীর উদ্গম হয়ে। কাল যে অটো করে স্টেশন থেকে হোটেলে এসেছিলাম, এই গাড়ীটা সেই ঠিক করে দিয়েছে। পরশুরামের মন্দির ও ধারের সব দ্রষ্টব্য দেখিয়ে হোটেলে ছেড়ে দেবে। ভাড়া নেবে ২৮০০/-। শহরের বাইরের দিকে আসার সময় ড্রাইভার দেখাল আইআইএম, ইন্দোর। ঘন্টা দুয়েক পরে মুম্বাই হাইওয়ে ছেড়ে প্রবেশ করলাম অপেক্ষাকৃত ছোট রাস্তায়। একটা গ্রাম পেরিয়ে এলাম। এর নাম জনপাও। আরেকটু এগানোর পর শুরু হল ঘন জঙ্গল। বর্ষার জলে পুষ্ট সবুজ অরন্যাণী।
বিন্ধ্যপর্বত মালা যা কম বেশী দুইহাজার ফিট উচ্চতায়, ভারতবর্ষের উত্তর ভাগ ও দাক্ষিন্যাত্যের বিভাজক হিসাবে ধরা হয়।মহাভারতের কথা অনুযায়ী অগ্যস্ত মুনি ছিলেন বিন্ধ্যপর্বতের গুরু। বিন্ধ্যপর্বতের উচ্চতা তখন দ্রুত বাড়ছিল। তাতে দেবতার শঙ্কিত হয়ে অগ্যস্ত মুনির শরণ নিলেন। অগ্যস্ত মুনি উত্তর থেকে দক্ষিণে যাওয়ার সময় বিন্ধ্যপর্বত গুরুকে প্রণাম করতে নতমস্তক হলেন।
অগ্যস্ত শিষ্যকে বলে গেলেন মাথা হেঁট করে থাকতে যতদিন না তিনি ফিরবেন। অগ্যস্ত আর ফেরেন নি, সেই থেকে বিন্ধ্যপর্বতের উচ্চতা বাড়ে নি। চম্বল, বেতোয়া, কেন এই নদীগুলি বিন্ধ্যপর্বতমালা থেকে উত্তরমুখী হয়ে গঙ্গা-যমুনাতে মিশেছে আর বিন্ধ্যপর্বতের দক্ষিণের ঢাল ও তারও দক্ষিণদিকে অবস্থিত সাতপুরা রেঞ্জের মধ্যে দিয়ে নর্মদা ও তাপ্তি প্রবাহিত হয়ে আরব সাগরে মিশেছে।
শিপ্রা নদী, যার তীরে উজ্জয়িনী অবস্থিত, সেই নদীও উত্তরে প্রবাহিত হয়ে চম্বল নদীতে মিশেছে। বিন্ধ্যপর্বতের উত্তর ও মধ্যভাগ হল মালোয়া প্লেটো যা ভূতাত্বিতক মতে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যিত্যুৎপাতে নির্গত লাভার উপরি অংশের ভাগে তৈরী। আমাদের ভ্রমণের মানচিত্রে যে জায়গাগুলি আছে সেইগুলি যথাক্রমে ইন্দোর, জনপাও, ধার, মান্ডু, বাঘ কেভস, মহেশ্বর, ওঙ্কারেশ্বর, উজ্জয়িনী। এর মধ্যে বাঘ কেভস ও মহেশ্বর ছাড়া বাকী স্থানগুলি মালোয়া অঞ্চলে পড়ছে। বিন্ধ্যপর্বতের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশের নাম হল নিমার, যার মধ্যে বাগ ও মহেশ্বর পড়ছে। পরশুরামের জন্মস্থান দেখার থেকেও, আমার উৎসাহের প্রধান কারণ হল এই জনপাও (Janapav) থেকে চম্বল নদীর উৎপত্তি হয়েছে। চম্বল নদী উত্তরবাহিনী হয়ে মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশের মধ্যে দিয়ে হাজার কিমি পথ অতিক্রম করে যমুনাতে মিশেছে। এর পাশেই হল বিখ্যাত চম্বলের বেহড়, যা একদা প্রসিদ্ধ ছিল চম্বলের ডাকাতদের আশ্রয়স্থল হিসাবে। চম্বল নদী হল ভারতের অন্যতম নির্মল ও স্বচ্ছ নদী। এই নদীতে ঘরিয়াল ও গ্যাঞ্জেটিক ডলফিন পাওয়া যায়।
সেগুন গাছের ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে বর্ষাস্নাত কালো পিচের রাস্তা উঠে গেছে ২০০০ ফিট উঁচুতে জনপাও কুঠিতে। একটু খাড়াইতে উঠতেই গাড়ী আর চলে না। সেই বাঁদরের পিচ্ছিল বাঁশে এক কদম উঠে দুই কদম পিছিয়ে আসার মত অবস্থা। প্লেন রাস্তায় দিব্যি চলছে। এখনও চার কিমি রাস্তা বাকী। মিনিট দশেক চেষ্টা করে আমাদের অবস্থা ‘ন যযৌ ন তস্হৌ’ এর মত। তবে ড্রাইভার দেখি কনফিডেন্ট। পরে বুঝলাম তার আত্মীয় আছে জনপাও গ্রাম। গাড়ী ঘুরিয়ে আমরা এলাম আত্মীয়র বাসাতে। এরা এখানের আদি বাসিন্দা। বাড়ীর মালিকের খাওয়ার দোকান পরশুরাম মন্দিরের পাশে। তার স্ত্রী আপ্যায়ন করে বাড়ীর ভিতরে খাটিয়াতে বসালেন। একটা লম্বা টানা ঘর পার্টিশন দিয়ে সেপারেট করা। আসার সময় রাস্তার দুইধারে সবুজ ফসলের খেত দেখছিলাম।
বাজে সাড়ে দশটা। এরা সকাল সকাল লাঞ্চ করে নেন। সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করে গাড়ীতে উঠি। একটু পরেই মসৃন পাহাড়ী রাস্তা দিয়ে পৌঁছে গেলাম জনপাও কুঠিতে। এটাই হল পরশুরামের জন্মস্থান। পুরাণ অনুযায়ী ঋষি জমদগ্নির পুত্র ছিলেন পরশুরাম। তাঁর মায়ের নাম ছিল রেনুকা। রেনুকা ছিলেন ভিষকাচার্য, তিনি এই পাহাড়ে উপলব্ধ নানা ভেষজ গুনসম্পন্ন গাছ-গাছড়া থেকে ঔষুধ বানাতেন। আজও অনেক বটানিস্ট এই পাহাড়ে আসেন ভেষজগুন সমৃদ্ধ হার্ব খুঁজতে। পরশুরাম ছিলেন ভগবান বিষ্ণুর ষষ্ঠ অবতার। এখন ভাদ্র মাসের শুরু। শ্রাবণ মাসের প্রতি সোমবার শিবের পুজোর জন্য এখানে ভক্ত সমাগম হয়।
পাহাড়ের চূড়াটা অনেকটা জায়গা জুড়ে সমতল। দূরে তাকালে সমতলে ঘন সবুজ বনানী। পুরো জায়গাটা জুড়ে এক শান্ত নীরবতা ছড়িয়ে আছে এক তো জায়গাটা পরিষ্কার আর দর্শনার্থী প্রায় নেই, মেঘলা আকাশে এই উচ্চতায় হাওয়াটাও ঠান্ডা। জমদগ্নী ও রেণুকার সাধন-ভজনের উপযুক্ত জায়গা বলেই মনে হল। পরশুরামের জন্ম হয়েছিল ব্রাহ্মণ বংশে। তার জন্মের পরে ক্ষত্রিয়দের বল বাড়তে থাকে। তার পিতার হত্যার প্রতিশোধ নিতে পরশুরাম ২১বার বিশ্ব থেকে ক্ষত্রিয় নির্মূল করেছিলেন। পরশুরামের প্রধান অস্ত্র ছিল কুঠার।
জনপাও কুটি-র একপ্রান্তে রাজস্থানের লাল পাথরে কারুকার্যমন্ডিত ৬০ ফিট উঁচু এই নবনির্মিত পরশুরাম মন্দির। মন্দিরের গর্ভগৃহের বাইরের মন্ডপমটি সুপরিসর। থামগুলিতে নানা ধরনের ভাস্কর্য।
পরশুরামের মূর্তিটি পরনে বাঘছাল, শ্মশ্রু ও জটামন্ডিত মুখ। দুই দেহাতী রাজস্থানী ভক্ত আমার পাশে। তারা বিশাল পাগড়ী খুলে প্রণাম করল পরশুরামকে।
এরা এসেছে রাজস্থানের ঝুনঝুন থেকে। মন্দিরের পাশে এক সুবিশাল বাঁধানো কুন্ড। এটাই নাকি সাতটি নদী মতান্তরে সাড়ে বারোটি নদীর উৎপত্তিস্থল।
কুন্ডের পাশ দিয়ে রাস্তা বানানো আছে। পিছনদিকে গিয়ে দেখি বিশাল হনুমানের দল ঘোরাঘুরি করছে।
তবে এরা ভদ্র মনে হল। খাবারের লোভে দর্শকদের উত্ত্যক্ত করছে না। মনে হয় এই ঘন জঙ্গলে তাদের খাবারের অভাব নেই। দুরে যতদিক যায় সবুজের হাতছানি। নূতন মন্দিরের উল্টোদিকে পুরানো মন্দির।
ভিতরে এক সাধু পুজো করছেন। এই মন্দির নাকি আড়াই হাজার বছরের পুরাতন শিব মন্দির। একটা প্রতীকি কুঠারও দেখা গেল।
পরশুরাম শিবভক্ত ছিলেন। তাই শিবলিঙ্গও দেখা গেল।
সাধু মহারাজকে জিজ্ঞাসা করি - কোথা থেকে চম্বল নদীর ধারা দেখা যায়? সাধুজী বল্লেন একটু নীচে পঞ্চমুখী হনুমান মন্দিরের কাছে চম্বলের ধারা দেখা যায়। ড্রাইভার বল্লেন মন্দিরটা চেনেন। গাড়ী যাবে। জনপাও কুটি ছেড়ে যেতে মন চাইছিল না। তবে আমাদের ধার শহরে পৌঁছে দর্শনীয় স্থান ঘুরে হোটেলে ঢুকব। তাই এখানে দেরী করা ঠিক না। কিছুটা নীচে নেমে মেঠো রাস্তা দিয়ে গাড়ী এসে একটা নির্জন স্থানে থামল। চারিদিকে ঘন জঙ্গলের মাঝে একটি মন্দির।
এখানেই আছে পঞ্চমুখী হনুমান মন্দির। পঞ্চমুখী রুদ্রাক্ষের নাম শুনেছি, কিন্তু পঞ্চমুখী হনুমানের নাম শুনি নি। এখানের পূজারী জানালেন নর্মদার জলধারা ট্রেক করে যেতে হবে। বর্ষাকাল বলে এখন পূর্ণ জলধারা আছে। কিন্তু বর্ষায় কর্দমাক্ত রাস্তাতে ঢালু পথে যাওয়া মুস্কিল।
গাড়ী চল্ল ধারের রাস্তায়। ধার জেলা সদর। এর ইতিহাস প্রাচীন। নয়শত থেকে তেরশ শতক অব্দি পারমার রাজাদের রাজত্ব ছিল মালওয়াতে আর ধার ছিল রাজধানী। এই বংশের সবচেয়ে খ্যাতনামা রাজা ভোজ, তার রাজত্ব ছিল আজ থেকে হাজার বছর আগে (১০১০-১০৫৫)। তার সময়ে রাজ্য বিস্তৃত ছিল উত্তরে চিতোর, পশ্চিমে সবরমতী নদী, পূর্বে বিদিশা ও দক্ষিণে কোঙ্কন অব্দি। এরপর দিল্লি সুলতানেটের আলাউদ্দিন খিলজি ১৩০৫ সালে মালোয়া জয় করেন। ১৭৩০ সাল মারাঠা অধীনের আগে অব্দি মালোয়া ছিল মুসলিম শাসিত।
ঘন্টাখানেকের মধ্যে আমরা এসে গেলাম ধার শহরে। এই অঞ্চল আদিবাসী অধ্যুষিত, যার মধ্যে ভীল জাতির সংখ্যা বেশী। আর পাঁচটা ছোট শহরের মত রাস্তাঘাট ও লোকজনের কোলাহলে মুখরিত। আমরা প্রথমে যাব ভোজশালাতে।
রাজা ভোজ পারমার রাজ্যের রাজধানী উজ্জয়িনী থেকে ধারে শিফ্ট করেন। রাজা ভোজ খালি পরাক্রমশালী রাজা ছিলেন না তিনি একাধারে কবি, জ্যোতিরবিজ্ঞান, ব্যাকারণের উপর বই লিখেছিলেন। সংস্কৃত শিক্ষার জন্য রাজা ভোজ এখানে ভোজশালা নির্মান করেছিলেন। গুগল ম্যাপ যেখানে ভোজশালা দেখাচ্ছিল, যদিও ভোজশালার পিছনদিকের স্ট্রাকচার দেখা গেল, কিন্তু সেখান দিয়ে কোন এনট্রি পেলাম না। স্থানীয়দের জিজ্ঞাসা করে ঘুরপথে গন্তব্যস্থলে পৌঁছালাম। একটা মাঠের মধ্যে দিয়ে পথ। মাঠের সামনে আবার পুলিশের ব্যারিয়ার লাগানো।
দূরে সাদা ডোমওয়ালা মসজিদে সবুজ পতাকা উড়ছে। ভোজশালার গেটে সাইনবোর্ডে লেখা এএসআই এই পুরাতাত্বিক নিদর্শনের রক্ষানাবেক্ষণ করেন।
প্রবেশমূল্য মাত্র একটাকা দেখে অবাক হলাম, কারণ সব মনুমেন্টে আজকাল ভারতীয়দের প্রবেশমূল্য ২৫/-।
আমরাই একমাত্র দর্শক। ঢোকার সময় পার্থর একটা ফটো তুলেছিলাম গেটের কাছে। সেটা কেউ দেখতে পায় নি। ঢুকতেই দেখি তিনজন সিকিউরিটি গার্ড ও টিকিট বিক্রেতা। সবাই সাবধান করে দিলেন ফটো তোলা সম্পূর্ন নিষিদ্ধ। বেশ কিছুক্ষণ তর্ক চলল, কারণ এর আগে আইএসআই সংরক্ষিত কোন মনুমেন্টে এরকম রুল দেখি নি। কিন্তু এদের বক্তব্য- উপর থেকে আদেশ আছে, কিছুদিন আগে সরকারীভাবে জরিপ করা হয়েছে জায়গাটির, তারপর থেকে ফটো নেওয়ার অনুমতি নেই। এদের কাছেই শুনলাম এই চত্বরের ভিতরে মঙ্গলবার হিন্দুরা পুজো করে আর শুক্রবার মুসলিমরা নামাজ পড়ে।চতুষ্কোন খোলা জায়গাটিকে ঘিরে চারিদিকে পাথরের কলামের সাহায্যে ছোট ছোট ঘর। পিছনের দেওয়ালের গায়ে মেহরাব-এ (মক্কার দিক নির্দেশিত স্ট্রাকচার), ফারসীতে লেখা কিছু কোরানের বাণী। মুসলিম স্থাপত্যরীতিতে তৈরী কৌনিক চূড়া সহ গেটের আদলে নির্মিত স্থাপত্য দেওয়ালের গায়ে, দেখলে বোঝা যায় এগুলি মূল স্ট্রাকচারের পরবর্তী সংযোজন।
গেটের বাইরে দেখি পুলিশ বসে। বাইরে থেকেও ফটো নেওয়া গেল না। উর্ধতন পুলিশ অফিসারকে ফোন করে লাভ হল না। বোঝানই গেল না যে বাইরে থেকে ফটো নিলে ক্ষতি কোথায়? যাইহোক ইন্টারনেটে ফটোর অভাব নেই বলে মনকে প্রবোধ দিলাম।
ইতিহাস থেকে জানতে পারা যাচ্ছে রাজা ভোজের সময় থেকে ভোজশালা এক নামকরা বিদ্যাচর্চার কেন্দ্র ছিল যেখানে জ্যোতির্বিদ্যা, সংস্কৃত, আয়ুর্বেদ, দর্শনশাস্ত্রের পঠন-পাঠন চলত। এখানে সরস্বতী মন্দির ছিল, যে সরস্বতীর মূর্তি এখন লন্ডন মিউজিয়ামে রাখা আছে।
আলাইদ্দিন খিলজী ১৩০৫ সালে প্রথম পারমার রাজাদের উপর হামলা চালিয়ে মুসলিম শাসনের আয়ত্তায় নিয়ে আসেন মালোয়াকে। এরও ৩৬ বছর আগে কমল মৌলানা নামে এক মুসলিম সুফী এখানে ধর্ম প্রচার করতে এসেছিলেন। তাঁরই দেওয়া মালোয়া অঞ্চলের তথ্য অবগত হওয়ার পর আলাউদ্দিন খিলজি মালোয়া অভিযান করেন। আলাউদ্দিন খিলজি
নাকি ভোজশালার বারশ শিক্ষার্থীকে হত্যা করেছিলেন। এরপর ১৪০১ সালে দিলাবর খান নামে এক শাসক সরস্বতীর মন্দির ভেঙে সেই পাথর দিয়ে আর্চ বানিয়ে মসজিদের সূচনা করেন আর বাইরে যে মসজিদ দেখলাম আসার সময়, সেখানের জমি নিয়ে কমল মৌলানা দরগা বানান। ১৯৯৭ সালে মুখ্যমন্ত্রী দিগ্বিজয় সিং এখানে মুসলিমদের নামাজ পড়ার অনুমতি দেন আর ২০০৩ সালে হিন্দুদের পুজো করতে দেওয়ার অধিকার প্রদান করা হয়। বর্তমানে পুরো ভোজশালা হিন্দু কনট্রোলে আনার জন্য কোর্টে পিটিশন দায়ের করার পর মামলা চলছে। তাই স্ট্যটাস কুয়ো মেনটেন করতে গিয়ে মনে হয় টিকিটের মূল্য এক টাকা রাখা হয়েছে।
ধার শহরের এই অঞ্চলটা পুরানো ও ঘিঞ্জি। ফিরে আসি শহরের প্রধান চৌমাথা মোড় ‘ঘোড়া চৌপাটি’তে।
অপেক্ষাকৃত শান্ত বামদিকের রাস্তা যেটা উত্তরে রতলাম যাচ্ছে, সেটা ধরে আধ কিমি গেলেই ধার কেল্লা দেখা গেল। প্রথম গেটটা দিয়ে গাড়ী ঢুকে গেল।
হিন্দুধর্মের পুনর্জাগরণ। মই পাওয়া যায় নি তাই হাত উঁচু করে যতটা সম্ভব ততটাই পেন্ট করা হয়েছে। দ্বিতীয় গেটের পাশ থেকে কেল্লার ৩০ ফুট উঁচু পাঁচিল ও তারপর দ্বিতীয় গেটের সমকোণে তৃতীয় গেট। কারণটা মনে হল আচমকা দিকপরিবর্তন করে শত্রুপক্ষ কেল্লাতে প্রবেশ করতে চাইলে প্রতিরোধ করা সহজ। তৃতীয় গেটের পরেই বামদিকে “বাবা বন্দী ছোড় মাজার” দেখা গেল।
তার ঠিক পাশেই গৈরিক রংএ ফাটকের দেওয়ালে হিন্দু মূর্তি।
গোয়ালিয়ার ফোর্টে বন্দী ছিলেন শিখ ষষ্ঠ গুরু হর গোবিন্দ। তিনি নিজের অলৌকিক সাধনার ফলে আরো বাহান্নজন রাজা সহ, মুঘল বাদশা জাহাঙ্গীরের হাত থেকে মুক্তি লাভ করেন। শিখ সম্প্রদায়ের লোকেরা দেওয়ালীর দিনটিকে ‘বন্দী ছোড়’ দিবস হিসাবে উদযাপিত করেন। কথিত আছে এই দিনে বন্দী ছোড় বাবার পুজো করলে কোর্টে মামলার বিচার নিজের পক্ষে যায়। আজকালকার স্ট্যাটিসটিক্স বলছে ভারতের জেলে ৭৫% ভাগের বেশী আন্ডার ট্রায়াল আছে। এরা এখনও এই বন্দীছোড় বাবার পুজো সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল নন, নইলে এই মুহূর্তে পুজোর হিড়িক লেগে যেত। তবে এই বন্দী ছোড় অন্য কোন মুসলিম পীর হবেন।পরে হোটলে ফিরে নেট ঘঁটে দেখলাম বছর দেড়েক আগে মাজারে নামাজ পড়েছিলেন কিছু মুসলিম। তারপর হিন্দুরা এসে হনুমান পুজো করে মাজারকে গোবর লেপে পবিত্র করেছে। এই নিয়ে বেশ টেনশন আছে।
ফোর্ট দেখার জন্য কোন টিকিট নেই, তবে ফোর্টের ভিতরে একটা মিউজিয়াম আছে তাতে টিকিট লাগে।প্রবেশ দ্বারের কাছে বোর্ডে,
এই ফোর্টের ইতিহস সম্বন্ধে লেখা দেখছি, পারমার রাজাদের আমলে এখানে প্রাচীর বেষ্টিত একটি বাগান ছিল ও বাউরী ছিল। আইন-উল-মুলুক মুলতানি বলে একজনের নাম দেখলাম। পরে নেট থেকে দেখলাম ইনাকেই আলাউদ্দিন খিলজি পাঠিয়েছিলেন ১৩০৪/০৫ সালে ধার-এ, মালোয়া দখল করতে। যুদ্ধ বিজয়ের পর ইনিই ছিলেন মালোয়ার প্রথম গভর্নর। গভর্নমেন্টের ওয়েবসাইট অনুযায়ী ধার কেল্লা তৈরী হয়েছিল ১৩৪৪ সালে গিয়াসউদ্দীন তুঘলকের সময়ে। ডেকানে যাবার জন্য প্রথমদিকে মালোয়ার ধার ও পরে যখন রাজধানী স্থানান্তরিত হয়, তখন মান্ডু ছিল প্রবেশদ্বার। ১৪০৬ সালে হোসেঙ্গ শা মান্ডুতে রাজধানী স্থানান্তরিত করলে পরে এই কেল্লা পরিত্যক্ত হয়, তখন এউ ফোর্টকে সেনা ছাউনীর কাজে ব্যবহার করা হত। পরে ১৭৩০ সালে মারাঠারা এই কেল্লা দখল করে।
টিকিট কেটে মিউজিয়ামে ঢুকলাম। ভিতরে তিনদিক জুড়ে একতলা ঘরে বিভিন্ন পুরাতাত্বিক সংগৃহীত দেব দেবীর মূর্তি আছে বেশীরভাগই দশম শতাব্দী থেকে বারশ শতকের হিন্দু দেবদেবীর মূর্তি।
এছাড়া একটা গ্যালারিতে অনেকগুলো ইনসক্রিপশন দেখলাম। মিউজিয়ামের খোলা চত্বরে অনেকগুলি তোপ ও আর্টিফেক্টস রাখা।
মিউজিয়ামের কালেকশন বেশ ভাল এবং মালোয়া অঞ্চলের মেডিয়াভিল পিরিয়ড (৫০০-১৫০০ শতক) এর সমৃদ্ধ ইতিহাস তুলে ধরেছে। ফোর্টের রক্ষণাবেক্ষন অপর্যাপ্ত, মাঝখানের সবুজ অংশটাতে আগাছার জঙ্গল, পাশের মেঠো রাস্তা দিয়ে বাইক গেল। ফোর্টের পরিধির মধ্যে দূরে কিছু ঘর দেখা যাচ্ছে। টিকিট কাউন্টারের লোকটি বল্ল-ফোর্টের ভিতর বেশ কিছু পরিবার বাস করে। উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে, কেল্লার প্রাচীরের কাছে কয়েকটি পুরানো স্থাপত্যের নিদর্শন।
প্রথমে পড়ল শীষ মহল, তৈরী করেছিলেন মহম্মদ বিন তুঘলক। ১৩২৫ সালে মহম্মদ বিন তুঘলক দিল্লির মসনদে বসার পর মোঙ্গল আক্রমনের ভয়ে রাজধানী পুনঃস্থাপন করেন দৌলতাবাদএ (মহারাষ্ট্র, ঔরঙ্গাবাদ)। ১৩২৭ থেকে ১৩৩৪ পর্যন্ত দিল্লি সুলতানদের রাজধানী ছিল ডেকানের দৌলতাবাদ ফোর্ট। এই সময়ে ধার ফোর্ট একটি বড় ট্রানজিট পয়েন্ট ছিল। ঐ সময়ে এই শীষ মহল তৈরী করা হয়েছিল। দেখলাম কিছু রেস্টোরেশন হয়েছে, তবে সেটা যৎসমান্য। সিঁড়ি দিয়ে ফোর্টের শেষপ্রান্তে পাঁচিলের উপর উঠে পড়লাম আমি আর পার্থ।
দূরে ধার শহরটাকে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। বর্ষাকাল বলে চারিদিক শ্যামলিমায় ছাওয়া। পাঁচিলের একপ্রান্তে আরেকটা মহল। এটার নাম খরমুজা মহল।
১৭৩০ সালে মারাঠা শক্তি ধার কেল্লা দখলের পর এই মহল বানান হয়। উল্লেখযোগ্য হল, মহলের পাশে বোর্ডে লেখা, এই কেল্লাতে পেশোয়া বাজীরাও-২ এর জন্ম হয়েছিল, ১৭৭৫ সালে। বাজীরাও-২ শেষ পেশোয়া ছিলেন মারাঠা সম্রাজ্যের।
১৮১৭ সালে তৃতীয় এঙ্গলো-মারাঠা যুদ্ধে হেরে যাওয়ার পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে ডেকান চলে যায়। খরমুজা ও শীষ মহলের ভিতরের ডেকোরেশন প্রায় কিছুই নেই।
ফোর্ট থেকে বেরিয়ে আবার ঘোড়া চৌপাটি হয়ে উত্তরের রাস্তা চলে গিয়েছে মন্দাসুরের দিকে। এই রাস্তাতেই আমাদের হোটেল। বিকালে বেরোলাম গাড়ী ঠিক করতে কাল আমরা যাব মান্ডু। এখান থেকে ৩৮ কিমি দক্ষিণে। একটা মারুতি এক্কো গাড়ী ঠিক হল। কাল আমাদের পিক আপ করে মান্ডুর সব দ্রষ্টব্য স্থান ঘুরিয়ে হোটেলে ছেড়ে দেবে। ভাড়া নেবে ১৭০০/, কমই মনে হল। ধারে রাস্তার পাশে বিকালে শব্জী বাজার বসেছে। পার্থ দাম জেনে এসে বল্ল অনেক শস্তা।
সত্যই তাই ঢেরস কুড়ি টাকা কিলো, দিল্লীতে ষাট টাকা। ফুলকপি ৪০টাকা বর্ষাকালে দিল্লিতে এই সময়ে ১২০/- কিলো। ষাটোর্ধ বয়স হলে কি হবে, পার্থ তারুণ্যে ভরপুর। ফুটপাথের যে দিক দিয়ে হেঁটে গেলাম, ফেরার সময় অন্য ফুট নেবে, পাছে কিছু মিস হয়ে যায়! রোজ সকালে উঠে একঘন্টা হেঁটে চারিপাশ দেখে আসে, আমি তখন গভীর ঘুমে। হোটেলের রুমের ফ্যানটা বেশ স্পিডে ঘুরছে, তবে হাওয়া সেই অনুপাতে কম। পার্থর কলেজে ব্রাঞ্চ ছিল মেকানিক্যাল। সেই ফান্ডা কাজে লাগিয়ে তড়াক করে বিছানায় উঠে ফ্যানের ব্লেড বাঁকিয়ে নেমে এল।
ফ্যানের স্পিড কমে গেল, হাওয়া একই রইল।
হোটেলের রেস্টুরেন্টেই থালি খেলাম। এইসব জায়গাতে পুরো ভেজ, এমনকি ডিমও পাওয়া যায় না।
ধারে আমাদের হোটেল দেব। এমঅমটি থেকে অনলাইন বুকিংপরের দিন সকালে বেড়িয়েছি গাড়ীতে। মেঘলা আকাশ, ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছে। চারিপাশে সবুজ সয়াবীনের ক্ষেত। গাড়ী থামিয়ে পার্থ চলে গেল ক্ষেতে, সয়াবীন কেমনভাবে গাছে ঝুলছে দেখার জন্য।
যাবার পথে মান্ডুর কাছাকাছি একটি দর্শনীয় স্থান হল ‘কাকরা খো’। রাস্তার পাশে গাড়ী দাঁড়াল।একটু পায়ে চলা রাস্তা দিয়ে এগোতেই অপরূপ নয়নাভিরাম দৃশ্য।
অশ্ব খুরাকৃতি জায়গাটার মাঝে এক গভীর গিরিখাদ, সবুজ শ্যামলিমা দিকচক্রবালের নীলাকাশে মিশেছে। উপরি পাওনা জলপ্রপাত, বর্ষার সময় যা স্বমহিমায় তীব্র গর্জনের সাথে ফেনিল জলরাশির ধারা সমেত তিন-চারশ ফিট নীচে ধাবমান। আসার সময় দেখছিলাম একটা উট প্রচন্ড জোরে মাথা ঝাকাচ্ছে আর কর্কশ গলায় প্রাণপনে ডেকে চলেছে। কাছে যখন এলাম তখন তার ডাক বন্ধ।
বছর কুড়ির একটি ছেলে উটের মালিক। দর্শকদের উটের পিঠে চড়িয়ে একচক্কর ঘুরিয়ে আনে।
পাশে একটা নড়বড়ে লোহার সিঁড়ি। যাক উটের পিঠে চড়তে লালমোহনবাবুর মত ল্যাজে-গোবরে হতে হবে না! পঁচিশ বছর আগে জয়সলমীরে উটের পিঠে চড়েছিলাম। আমি আর পার্থ আজকে উটের প্রথম সওয়ারী। উটের চওড়া পিঠে অতি কষ্টে পা ফাঁক করে বসেছি। জিনটাকে বেশ শক্ত করে ধরে রেখেছি।
বেশ ইনটারেস্টিং মনে হল। গাড়ী দাঁড় করিয়ে টিকিট কেটে ভিতরে ঢুকলাম। কাউন্টারের পাশে লেখা ছিল ‘রিয়েল ডাইনাসোর এগ’। ডাইনসোরের ডিম, এখন ফসিল
ইনভেস্টিগেট করার মতই ব্যাপার! ভিতরে সুন্দর বাগান। বামদিকে একটা রেস্টুরেন্ট। ডানদিকে সুবিশাল দুই ডাইনোসরের মূর্তি। পিছনের দিকে দুটো ইগলু শেপের ঘর। প্রথমটাতে ঢুকতেই চোখে পড়ল বিশালাকৃতির ডাইনসোর ডিমের ফসিল। লেখা আছে দেখলাম, স্থানীয় ভীল উপজাতির লোকেরা একে বলে ‘কাকর ভৈরব’, কাকর মানে জমি আর ভৈরব হল শিব। এরা এই কাকর ভৈরবের পুজো করে। একটা ফটো দেখলাম যে জায়গাতে এই ডিম পাওয়া গিয়েছিল এবং তার আশেপাশের অঞ্চলের। বেশ কিছু সচিত্র লেখা দেখে এই অঞ্চলের ভূততত্বের প্রাথমিক জ্ঞান পাওয়া গেল।
ডাইনোসর পার্কের পিছনদিকে ‘কাকর খো’র মত গভীর গিরিখাদ। পার্কে কিছু এ্যডভেঞ্চার স্পোর্টস ছিল, তবে এখন বন্ধ।
পিছনদিকে পার্ক লাগোয়া সুইস কটেজ। আমরা দুইজন ডাইনাসোরের মূর্তির পাশে দাঁড়িয়ে ফটো নিলাম।
পার্ক থেকে বেরনোর সময় গেটকিপারকে জিজ্ঞাসা করলাম এই ডাইনাসোরের ডিম কোথায় পাওয়া যায়। সে অবশ্য কিছু জনে না, তবে আমায় একটা ফোন নম্বর দিল যিনি এই ডাইনাসোর পার্কের পরিকল্পনা করেছিলেন। রাতে হোটেল থেকে বিশাল শর্মাজিকে ফোন করলাম। উনি থাকেন মুনাওয়ারে। কাল আমরা যাব বাগ কেভস দেখতে। রাস্তায় মুনাওয়ার পরে। জিজ্ঞাসা করি আপনার কি তরে সিওর হলেন যে এটা ডাইনাসোরের ডিম? উনার কাছে জানলাম যে এটা পাঠানো হয়েছিল BARC এ, তারা কোন নিউট্রন সাইক্লোট্রন (?) মেথডে এর সত্যতা যাচাই করেছেন। যে জায়গাতে ডিম পাওয়া গিয়েছিল সেটা বাগ কেভসের কাছাকাছি, তবে জানালেন যে বর্ষাতে যাওয়া যাবে না।
মান্ডু বা মান্ডভ ফোর্টে ঢোকার জন্য দুটো গেট পেরোতে হল যার নাম আলমগীর দরওয়াজা ও দিল্লি গেট। মান্ডু হল ভারতের তৃতীয় বৃহত্তম কেল্লা, যার পাঁচিলের পরিধি ৪৫ কিমি ও গেট আছে বারটি। মান্ডুর উচ্চতা কমবেশী ২০০ ফিট বলে আবহাওয়া মনোরম। এই জায়গার প্রকৃতিক সৌন্দর্য ও উচ্চতার জন্য সুলতানেট ও মুঘল শাসকরা মান্ডুতে কেল্লা তৈরী করেন।
রাস্তার পাশে এক জায়গায় বিশাল কান্ডওয়ালা বাওবাব গাছ দেখে দাঁড়ালাম।
বিশাল আকৃতির এই গাছ অরিজিনাল আফ্রিকার, আর মান্ডু অঞ্চলেই সবচেয়ে বেশী দেখা যায়। হঠাৎ দেখলে মনে হয় পাতা নেই, কাছ থেকে দেখলাম ফল ঝুলছে। পরে দেখেছি অনেক জায়গায় লোকালরা এই ফল বিক্রি করছে।
অনেকে কিনছে স্যুভেনির হিসাবে। আমিও কিনলাম। দাম কিছুই না, মাত্র দশ টাকা। পেপারে দেখেছি বাওবাব গাছের জিআই ট্যাগের জন্য মধ্যপ্রদেশ সরকার কোর্টে আবেদন করেছে।
মান্ডুর পরতে পরতে ইতিহাসের কাহানী আর পুরানো খন্ডহারের অস্তিত্ব। রাস্তার পাশে একটা ভগ্নাবশেষ দেখে দাঁড়ালাম। জায়গাটা জনমানবহীন। সামনের গেট তালাবন্ধ। পাশের সাইন বোর্ডে লেখা ‘গদা শাহ কি দুকান’। পাঁচিলের পিছনে যে উচ্চতার আর্চড থাম দেখা যাচ্ছে, তাতে এই স্ট্রাকচারকে হালফিলের মল বললেও অত্যুক্তি হবে না।
রাস্তার অপরপ্রান্ত দিয়ে ঢুকলাম। চারিদিকে সবুজ ঘাসের গালিচা। আমি ছাড়া আর কোন দর্শক নেই। বোঝা গেল মান্ডুর পপুলার ট্যুরিস্ট স্পটে এটা পড়ে না। প্রথমে দুটো বড়-সড় বাউরি বা স্টেপওয়েল পড়ল।
একটার নাম আন্ধেরি আর অন্যটা উজালা বাউরি। দূরে দেখা যাচ্ছে গদা শাহের দুকান। প্রায় তিনতলা সমান উঁচু খিলানওয়ালা বিল্ডিংএর খালি কলাম গুলো আছে, ছাদ সব ভাঙ্গা। বর্ষার জলে পুষ্ষ্ট শেওলার দাগে ভাঙা আর্চড কলামগুলোকে এক অন্য মাত্রা দিয়েছে।
গুগল করে দেখলাম গদা শা একজন ধনী রাজপুত ব্যবসাদার ছিলেন। তখন ট্রেডিং এর প্রধান মাল ছিল আইভরি, জাফরান ও আতর।
মান্ডুতে যে জায়গাগুলো পপুলার ট্যুরিস্ট স্পট, তার মধ্যে প্রধান হল জাহাজ মহল। এছাড়া দেখার জায়গা হল মাল্ডু শহরের একদম মধ্যিখানে অবস্থিত হোসেঙ্গ শাহের সমাধি, আরো পাঁচ-ছয় কিমি দূরে সবচেয়ে উঁচু জায়গাতে রাণী রূপমতী মহল, বাজবাদুর প্যালেস, নীলকন্ঠ মহাদেব মন্দির।
গাড়ী হোসেন শাহের সমাধিকে বামদিকে রেখে এক কিলোমিটার এগিয়ে পৌঁছাল জাহাজ মহলে। টিকিট কাউন্টারের সামনে বড় চত্বর। সেখানে কয়েকজন বসে ম্যাপ নিয়ে কিছু ডিসকাস করছেন। দেখে মনে হল এএসআই এর লোক। ভোজশালাতে ফটো তুলতে দেয় নি বলে কমপ্লেন করার ইচ্ছে। জিজ্ঞাসা করে জানলাম এরা এমপি ট্যুরিজমের লোক। যিনি অফিসার ছিলেন তার সঙ্গে আলাপ হল। তাকেই বললাম ভোজশালার ঘটনা। ভিতরে ছবি তুলতে না হয় নাই দিল, বাইরে থেকে তুললে অসুবিধা কোথায়। অফিসারের নাম ডি এস পারমার।
পারমারসাহেব স্বীকার করলেন যে বাইরে থেকে ছবি নিতে আপত্তি না হওয়াই উচিত, আমাকে আশ্বাস দিলেন ইন্দোরে ফিরে এএসআই এর সঙ্গে কথা বলবেন।
ট্যুরিস্টের ভীড় থাকলেও জায়গাটা বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। টিকিট কেটে ভিতরে ঢুকলাম। বাঁমদিকে এক দোতালা বিল্ডিং। পুরাতন আমলে একতলাটা ছিল আস্তাবল আর দোতলা ছিল সহিসদের থাকার জন্য।
এখন একতলাতে মিউজিয়াম। মিউজিয়ামটা ঘুরে দেখলাম। সুলতানী আমলের প্রত্নতত্বিক নিদর্শন ও কিছু ইনসক্রিপশন রাখা।
ডানদিকে টানা লম্বা স্থাপত্যটি হল জাহাজ-মহল। জাহাজের শেপ থেকে এই নাম। দুইদিকের জলাশয়ের জন্য নামটা যথাপযুক্ত হয়েছে।
একটু ইতিহাসের পাতা ওল্টাতে হবে মান্ডুর মুসলিম শাসনকাল সম্বন্ধে জানতে। ১৩০৫ সালে পারমার রাজত্বের পতনের পর প্রায় একশ বছর দিল্লির সুলতানদের অধীনে ছিল মালোয়া অঞ্চল, যার রাজধানী ছিল ধার। ১৩৯২ সালে মালওয়া সুলতানেটের প্রতিষ্ঠাতা আফগান বংশীয় দিলাবর খান, দিল্লিতে খাজনা পাঠানো বন্ধ করে দেন। ১৪০১ সালে তাঁর ছেলে হোসেঙ্গ শাহ ধার থেকে মান্ডুতে রাজধানী স্থানান্তরিত করেন। মান্ডু ফোর্ট কমবেশী ২০০০ ফিট উঁচু সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে, আর ফোর্টের পাঁচিলের দৈর্ঘ্য ৩৫ কিমি, যার থেকে বোঝা যায় ফোর্টের বিশাল পরিধির কথা। হোসেঙ্গ শা ছিলেন ঘুরী বংশীয়। ১৪৩৬ সালে তুর্ক বংশোদ্ভূত মহম্মদ শা খিলজি, ঘুরী বংশের শেষ নবাবকে হত্যা করে মালোয়ার সুলতান হন। এরই সন্তান নাসিরুদ্দিন শা ১৫০০ সালে মালোয়ার সুলতান হন। এর সময়েই জাহাজ-মহল তৈরী হয়েছি। এটা ছিল হারেম যেখানে ১৫০০০ উপপত্নী থাকতেন। নেটে যদিও এরকমই লেখা, তবে সংখ্যাটা আমার কাছে অবাস্তব মনে হল। দোতলা এই ৭০-৭৫ মিটার লম্বা বিল্ডিং এ খালি নীচে ও ছাদে যাওয়া যায়। ছাদের উপরে দুই প্রান্তের ছত্রীগুলিতে রাজস্থানী শিল্পের প্রভাব রয়েছে। খাড়াই সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠলাম। উপর থেকে দুই পাশের দুই জলাশয়ের মাঝে জাহাজ মহলকে সত্যিই জাহাজ মনে হচ্ছিল। ছাদে সুন্দর ডিজাইনের বিশাল চৌবাচ্চা।
তাতে জলভরার চ্যানেলগুলো আল্পনার ডিজাইনে।
জাহাজ মহলের পিছনদিকে হল হিন্দোলা মহল। এর কলামগুলো হেলে থাকায় ঝুলার মত হেলে থাকে বলে এই নাম।
জাহাজ মহলের আগে তৈরী হিন্দোলা মহল মনে করা হয়। সুলতানের দরবার হিসাবে ব্যবহৃত হত। ভিতরে গিয়ে দেখলাম খালি কলাম গুলিই অবশিষ্ঠ, ছাদ নেই। আর রোজ রাতে এই মহলের ব্যাকড্রপে লাইট এ্যন্ড সাউন্ড শো হয়।
হিন্দোলা মহলের পিছনে হল চম্পা বাউলি আর রয়াল প্যালেস। চম্পা বাউলির তলায় ছিল হামাম।
কপুর তালাও, এর বামদিকে জাহাজ মহলচম্পা বাউলি ও হামাম
এই হামামের কনসেপ্টটা তুর্ক জনজাতির মধ্যে প্রচলিত ছিল। গিয়াসুদ্দিন ছিলেন তুর্ক। চম্পা বাউলির পিছনে রয়েল প্যালেস। তবে এই ভাঙাচোরা স্থাপত্য দেখে বোঝার উপায় নেই, অরিজিনালি প্যালেস কেমন ছিল। দূরে বাঁমদিকে জাহাজ মহল আর সামনে বিশাল দিঘী হল কপুর তালাও।
কপুর তালাও এর বাঁমদিকেও কিছু পুরানো ধ্বংসাবশেষ। পুরো কমপ্লেক্সটা ঘুরে দেখতে ঘন্টা দেড়েক লাগে।
ঢোকার আগে রাস্তার উপরে খাওয়ার দোকান দেখেছিলাম। সব দোকানের উপরে লেখা ডাল-বাফলা।মধ্য প্রদেশ বিশেষত মালোয়া অঞ্চলের লোকাল ফুড। ডাল রান্না রাজস্থানী স্টাইলে, বেশ ঝাল, সঙ্গে বাফলা হল বিহারের লিট্টি-চোখার লিট্টি। আহামরি কিছু নয়।
লাঞ্চ করে আমাদের গন্তব্য হল নীলকন্ঠ মন্দির। মাঝ রাস্তায় একটা মিউজিয়াম চোখে পড়ল। এমপি আর্কিওলজিক্যাল
ডিপার্টমেন্টের তত্বাবধানে একটা পুরানো টুম্ব ও তার পাশে নির্মিত একটা বিল্ডিংকে মিউজিয়াম করা হয়েছে।এই টুম্বের নাম হল ছাপ্পান মহল। বাইরের কম্পাউন্ডে
একটা খুব সুন্দর শায়িত বিষ্ণুমূর্তি আছে ১৩শ শতকের।কিছু জৈন তীর্থঙ্করের মূর্তিও আছে। টুম্বের ভিতরে এই অঞ্চলে প্রাপ্ত প্রত্নতাত্বিক সংগ্রহ
এবং টুম্বের পাশের বিল্ডিংএ আদিবাসী জীবনযাত্রার নানা নিদর্শন রয়েছে।
নীলকন্ঠ মহাদেব মন্দিরের রাস্তায় বেশ কয়েকটি বাঁওবাব গাছ দেখলাম। এই মন্দিরের স্থপতিকার হিসাবে আকবরকে বলা হয়। দুটি বাচ্চা মেয়ে পুজোর ফুল বিক্রি করছিল।
মাত্র দশটাকা করে। বর্ষাকালে ফুলগুলি দেখে সদ্য প্রস্ফুটিত মনে হচ্ছিল। ফুল কিনে ঢুকতেই বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। বেশ কিছু সিঁড়ি নেমে তবে মন্দির। তবে বহিরাঙ্গ মন্দিরের মত নয়, মুঘল স্থাপত্যের নিদর্শন স্পষ্ট। মন্দিরে খালি পা-তে যাওয়া বেশ কষ্টের, তার উপর বৃষ্টির জলে সিড়িগুলি পিচ্ছিল। শিব লিঙ্গ অব্দি পৌঁছান গেল না।
শিবের বাহনকেই মালা পড়িয়ে তুষ্ট করে বেরিয়ে আসি।
এখান থেকে আমরা যাব রূপমতী মহলে। মান্ডুর কেল্লার একপ্রান্তে পাহাড়ের কোণে এই মহল। রাণী রূপমতী ও বাজবাহাদুরের প্রেমকথা মান্ডুর ফোকলোর। অনেক ব্যালার্ড তৈরী হয়েছে এই প্রেম কাহিনীকে ঘিরে। বাজবাদুর ছিলেন মালোয়ার শেষ সুলতান। ষোলশ যতকের মাঝামাঝির কথা। বাজবাহাদুর নর্নদার তীরে জঙ্গলে শিকারে গিয়ে এক কিন্নরকন্ঠীর গানে মুগ্ধ হয়ে গেলেন। এই কিশোরী স্থানীয় অধিবাসী রূপমতী। বাজবাহাদুর বিয়ে করতে চাইলেন রূপমতীকে যদিও তাঁরা ভিন্নধর্মী।
রূপমতীর শর্ত ছিল তাকে এক প্রাসাদ বানিয়ে দিতে হবে মান্ডুর এক পাহাড়ী কোণে যেখান থেকে রূপমতী দেখতে পাবেন নর্মদা নদীকে। তখনই তৈরী হল এই মহল।পরিষ্কার দিনে এখান থেকে নর্মদাকে দেখা যায়। দুজনের প্যাশান ছিল সঙ্গীত ও শের-সায়েরী। রূপমতীর প্রেমে পাগল সুলতান রাজকার্য ভুলতে বসলেন। মুঘল বাদশা আকহর তার ধাত্রী মায়ের ছেলে অধম খান, যিনি মুঘল সেনাবাহিনীরলএক জেনারেল ছিলেন, তাকে পাঠালেন মান্ডু দখল করতে। বাজবাহাদুর যুদ্ধে হেরে নিরুদ্দেশ হয়ে গেলেন, কিন্তু রূপমতী তখনও মান্ডুতে। অধম খান রূপমতীর রূপের খবর পেয়েছিলেন। তিনি চাইলেন রূপমতীর সঙ্গে দেখা করতে। কিন্তু রূপমতী ভাবতে পারেন না বাজবাহাদুর ছাড়া আর কাউকে সঙ্গ দিতে। অধম খান আসার আগে রূপমতী বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেন। এই করুণ পরিনতি আজও মান্ডুর আকাশে হাতাসে অনুরণিত হয়। টিকিট কেটে অনেকটা খাড়া চড়াই পেরিয়ে এলাম রূপমতী মহলে।
শেপটা কিছুটা জাহাজ মহলের মত, তবে ছাদে ওঠার সিঁড়ি বন্ধ। একতলার উপরে একটা স্টেপ ওয়েল আছে।
নর্মদার জল এখানে আনা হত। এক পশলা বৃষ্টির পর মেঘলা আকাশ। একটু পরে বাদল মেঘের দল এসে খেলা করতে লাগল রূপমতী মহলের অলিন্দে।
দূরের লনে দাঁড়িয়ে অনুভূতি হল, কুয়াশাবৃত অস্পষ্ট অবয়ব রূপমতী মহলকে এক অপার্থিব মর্মরসৌধের রূপ দিয়েছে। কল্পনার ডানায় ভর করে মনে হল উপরের ছত্রীতে বসা রূপমতীর সঙ্গীত মূর্ছনার সুরভী বয়ে যাচ্ছে চারিদিকে।
একরাশ ভাললাগা নিয়ে নীচে নেমে গাড়ীতে উঠি। বেশ কিছুটা অবতরণের পর গাড়ী দাঁড়ান বাজবাহাদুর প্যালেসের সামনে। পাকদন্ডী রাস্তার একপাশে বাজবাহাদুর মহল, অন্য প্রান্তে কিছু নীচুতে রেওয়া কুন্ড,
যা বাজবাহাদুর নির্মান করেছিলেন নর্মদা থেকে এক্যোয়াডাক্টের মাধ্যমে নদীর জল এনে। এই ভবনের নাম বাজবাহাদুরের নামে হলেও, এটা আরো আগে সুলতান নাসিরুদ্দিন শাহের সময়ে (১৫০৮-০৯) তৈরী। সিঁড়ি পেরিয়ে প্রথম তোরণের পর চত্বর।
তারপর আরেকটা তোরণ অতিক্রম করে বাঁধানো চত্বরের চারিপাশে কিছু ঘর। উপরে রাজস্থানী স্টাইলের ছত্রী, যেরকমটা একটু আগে রূপমতী মহলে দেখে এলাম। এর পাশে আরেকটা একই ধরণের জলাশয়ে ঘেরা ভবন, যার একদিকটা বারাদরী স্টাইলে থামওয়ালা খোলা জায়গা, যার ফাঁক দিয়ে বাইরের পাহাড় দৃশ্যমান।
সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে আসি। আমি একাই উঠেছি। পার্থ নীচে। প্যালেসে আর কোন দর্শক নেই। সবুজ জঙ্গলের গালিচার ভিতর দিয়ে দূর পাহাড়ের শীর্ষপ্রান্তে রূপমতী মহল স্পষ্ট দৃশ্যমান।
আসন্ন সন্ধ্যায় নিস্তব্ধ চরাচরে, সবুজ পাতার ফাঁকে দিয়ে খালি ভেসে আসছে পাখীর কূজন। বর্ষাস্নাত মান্ডু তার যৌবনের স্বরূপে আমার সামনে প্রতিভাত। আগ্রার কেল্লা থেকে বন্দী বৃদ্ধ শাহাজাহান যেমন তাজমহল দেখতেন, তেমনি হয়ত বাজবাহাদুর এই ছত্রীর তলায় দাঁড়িয়ে তৃষিত নয়নে রূপমতী মহল পানে চেয়ে থাকতেন। শোনা যায় বাজবাহাদুর শের-শায়রী ও রূপমতীর প্রেমে এতই নিমগ্ন থাকতেন যে রাজকার্যে অবহেলা হত। মান্ডুর ইতিহাসের অনেকখানি ঘিরে আছে এই দুইজনের প্রেমগাথা।
সূর্যাস্তের কিছু আগে আমরা পৌঁছালাম জাহাজমহলের রাস্তার পাশে সানসেট পয়েন্টে।
পাঁচিলের নীচে ভ্যালি। আকাশে ছোপ ছোপ কালো মেঘের আড়ালে সোনালী আভা। মেঘের কোল থেকেই সূয্যিদেব বিদায় নিলেন।
পার্থর অফুরাণ উৎসাহ। গাড়ী আগেই হোটেলে ছেড়ে দিয়ে দুই কিমি রাস্তা হেঁটে সানসেট পয়েন্টে এসেছি। ফেরার সময় খবর পেলাম জাহাজ মহলে লাইট এন্ড সাউন্ড শো হয়। হিন্দি আর ইংরাজিতে। আধা ঘন্টার প্রোগ্রাম। সন্ধ্যে সাতটা থেকে হিন্দি, সাড়ে সাতটা থেকে ইংরাজী। দেখার খুব ইচ্ছে। তবে প্রবলেম যেটা দাঁড়াল এই শোয়ের এনট্রি সকালে যে গেট দিয়ে ঢুকেছিলাম, সেখান গিয়ে নয়, পুরো হাত ঘুরিয়ে খাওয়ার মত আড়াই কিমি রাস্তা ঘুরে পিছনে হিন্দোলা মহলের গেট দিয়ে যেতে হবে। হেঁটেই যেতে হবে। পার্থর উৎসাহে চল্লাম অন্ধকার রাস্তা পেরিয়ে। আমরা দুইজনই খালি দর্শক।
১৮০/- করে টিকিট। যারা মান্ডু আসেন, অনেকেই দিনে দিনে দেখে ফিরে যান, যারা থাকেন, তাঁরা অবগত নন এই শোএর ব্যাপারে। আরেকটা হল এনট্রি পয়েন্টটা অনেক দূরে। লেসার শো। আলোর মাধ্যমে প্রাচীন মান্ডু থেকে মধ্যযুগীয় মান্ডুর ইতিহাস তুলে ধরা হল। উপরি পাওনা কবীর বেদীর ব্যারিটোন ভয়েসে ন্যারেশন। পা আর চলছিল না। কাউন্টারে যে ছেলেটি টিকিট দিচ্ছিল, সে বলেছিল যাওয়ার সময় আমাদের দুইজনকে স্কুটারে করে পৌঁছে দেবে। তাই হল। স্কুটারে অনেকদিন চড়ি নি। দুর্গা দুর্গা বলে আমি আর পার্থ উঠলাম। ছেলেটি আমাদের হোটেলের কাছে নামিয়ে দিয়ে গেল। প্রাইভেট হোটেলটা শহরের মাঝে, সামনে বেশ বড় ঝলমলে রেস্টুরেন্ট, পরে দেখলাম, রুম ততোধিক বাজে, নোংরা বালিশের ওয়ার। বলার পরে ততোধিক নোংরা অন্য বালিশ নিয়ে এল। নালিশ করে কিছু হল না। দুদিন থাকব ভেবেছিলাম। ভাগ্যিস একদিনের টাকা এ্যডভান্স করেছি। সকালে উঠে চুপচাপ চেকআউট করে এমপি ট্যুরিসিমের হোটেলে এলাম। নরক থেকে স্বর্গে এসেছি মনে হল। যেমন সুন্দর ঝকঝকে প্রপার্টি ও রূম, তেমনি নয়নাভিরাম বাইরের দৃশ্য। রুমের বাইরে ব্যালকনি থেকে দেখা যাচ্ছে ঝিল ও কিছু পুরানো স্থাপত্য।
আজকে আমরা যাব নব্বই কিমি দূরে বাগ কেভস দেখতে। সারাদিনের প্রোগ্রাম। কিন্তু সেটা পরের পর্বে।















































































































Comments
Post a Comment