মালোয়া ভ্রমণ পার্ট ৪

 


উজ্জয়িনী পর্ব

ওঙ্কারেশ্বর থেকে উজ্জয়িনীর দূরত্ব ১৫০কিমি।মান্ডু থেকে যে ড্রাইভার আমাদের নিয়ে এসেছিল, সে একটা নম্বর দিয়েছিল। উজ্জয়িনী থেকে যে সব গাড়ী যাত্রী নিয়ে ওঙ্কারেশ্বর আসে, তারা ফিরতি পথে যাত্রী পেলে কম ভাড়ায় নিয়ে যায়। আমরা ওরকমই একটা গাড়ী পেলাম, যে আমাদের নিয়ে যাবে ২৫০০/- ভাড়াতে। রাস্তায় খুব বৃষ্টি পেলাম।পাঁচটা নাগাদ এসে পৌঁছালাম উজ্জয়িনীতে।পুরাকালে বুদ্ধের জন্মের আগে এই জায়গার নাম ছিল অবন্তিকা। পুরাণ অনুযায়ী খ্রীষ্ট জন্মের একশ বছর আগে বিক্রমাদিত্য ছিলেন উজ্জয়িনীর রাজা। কথায় আছে, অযোধ্যা, মথুরা মায়া, কাশী ,কাঞ্চী, অবন্তিকা, পুরী, দ্বারকা, মোক্ষদায়িকা।কথিত আছে, যখন দেবতা আর অসুরের মধ্যে যখন সমুদ্রমন্থনের পর অমৃত নিয়ে কাড়াকাড়ি পরে গিয়েছিল, তখন চারটি জায়গায় তার ছিটা পড়ে। তার মধ্যে অন্যতম হল উজ্জয়িনী। কবি কালিদাসের কর্মভূমি এই উজ্জয়িনী। কুম্ভ মেলার সময় শিপ্রা নদীর একতীরে শিব আখাড়াতে নাগা সাধুরা অন্যতীরে বিষ্ণু আখাড়াতে বৈষ্ণব সাধুরা শাহি স্নান করেন। 

  এখানে আমরা উঠেছি এম পি ট্যুরিসিমের হোটেল অবন্তিকাতে।


ম্যানেজার এক মহিলা, রাত দশটা অব্দি রোজ থাকেন। বল্লেন কাছাকাছি থাকেন, তাই বাড়ী যাওয়াটা চিন্তার বিষয় নয়, অফিসে বেশী থাকলে অনেক রকম ট্যুরিস্টের সঙ্গে আলাপ হয়, সময় বেশ কেটে যায়। আমরা যে বিল্ডিংটাতে আছি, সেটা পুরানো, ওটা ভেঙে ২৫০ বেডের হোটেলের প্ল্যান এপ্রুভ হয়েছে। আমাদের রুমটা ছোট হলেও এসিটা বেশ এফেক্টিভ আর বাথরুমটাও বড় ও রিনোভেটেড। বৃষ্টি থেমেছে, তবে হোটেলের সামনের পথটুকু জলমগ্ন। একজনের স্কুটারে পিলিয়ন রাইডার হয়ে বাইরে থেকে অটো নিয়ে এলাম।হোটেল থেকে মহাকাল মন্দিরের দূরত্ব চার কিমি। দ্বাদশ জ্যেতির্লিঙ্গের অন্যতম এই মহাকালের মন্দিরের দ্বার দক্ষিণমুখীএটাই একমাত্র দক্ষিণমুখী জ্যোতির্লিঙ্গ। হোটেলের পাশেই বাসস্ট্যান্ড। তাই প্রচুর অটো বা টুকটুক রাস্তায় দাঁড়িয়ে। অটোওয়ালা বল্ল, কালকেশাহি সওয়ারিআছে, তাই পুলিশ অটোওয়ালাদের মন্দিরের গেটের কাছে য্তে দিচ্ছে না। ফ্লাইওভারের কাছে ছেড়ে দেবে। সেখান থেকে মন্দির সোয়া কিমি। অটোওয়ালার কাছে শুনলাম, শাহি সওয়ারি শাওন মাসে চারটে আর ভাদ্র মাসের দ্বিতীয় সোমবার হয়। আগামীকাল সেই ভাদ্র মাসের সোমবার। এটাই সবচেয়ে বড় শাহি সওয়ারি। আমরা ঢুকলাম এক নম্বর গেট দিয়ে।

অন্যান্য দিন লম্বা ফ্লাইওভার দিয়ে এই গেটের কাছ অব্দি অটো চলে আসে। গেট থেকে মন্দিরের প্রবেশ পথের দূরত্ব অনেকটা। ভিতরে শুল্কবিহীন ব্যাটারী গাড়ী চলছে, তবে দর্শনার্থীর তুলনায় অপ্রতুল এবং লোকেরা হেঁটে যেতেই পছন্দ করছে, কারণ পুরো পথটাই সুন্দরভাবে আলোকিত শিবের নানা ম্যুরাল মূর্তিতে সুসজ্জিত।

হাঁটতে হাঁটতে চললাম মহাকাল দর্শনের আকাঙ্খায়। যে গেটটা দিয়ে ঢুকলাম তার নাম হল নন্দীদ্বার।  হলুদ লাইটিংএর ছটায়, করিডোরের গেট, দেওয়ালের ম্যুরাল, দেবাদিদেব মহাদেবের পুরাণে কথিত বিভিন্ন মুদ্রার মূর্তি দেখতে দেখতে এগিয়ে চলি।

চলার পথে পড়ল ১০৮টা রেড স্যান্ডস্টোন স্তম্ভ। হিন্দু ধর্মের নব জাগরণের সহায়ক এই মহাকাল মন্দিরের সরকারী খরচা সাড়ে আটশ কোটি টাকা।  কালকে শাহি সওয়ারি। তাই সাধারণ পুণ্যার্থীর জনপ্রবাহের জোয়ার। এই করিডোরের নাম হলমহাকাল পথ ত্রিপুরাসুরকে বধ করে শিবের নৃত্য হলআনন্দ তান্ডব স্বরূপ

এরকম অসংখ্য মূর্তি। মন্দিরের কাছে এক জায়গায়নিঃশুল্ক জুতোরাখার জায়গা দেখে জুতো খুলে মন্দিরে প্রবেশ করা গেল। অরিজিনাল মন্দিরের পরিধি অনেকটা বাড়িয়ে, দর্শনাপ্রার্থীদের জন্য জিলিপির প্যাঁচের মত পদব্রজে গমনের করিডোর।

দেবদর্শনে পরিক্রমার কম্পালসারি ক্রিয়াকর্ম। মহাকাল ডেভেলপমেন্টের আগে দর্শনার্থীর সংখ্যা ছিল বছরে দেড় কোটি, সেটা বেড়ে তিন কোটি হবে, তাই বুদ্ধি করে একই সঙ্গে তিনটে রো-তে (তিনটি সারি ক্রমপর্যায়ে একটু উঁচুতে অন্যটির থেকে) যাতে মহাকাল দর্শনে ভিশন ব্লক না হয়ে যায়।

আড়াইশ টাকার স্পেশাল দর্শনীর ব্যবস্থা আছে। শুনলাম ঘন্টাখানেক সাধারণ লাইনে দাড়ালে দর্শন করা যাবে। মহাকাল দর্শনে ঘন্টাখানেক ধৈর্য ধরে দাঁড়ানোর মত ক্ষমতা এখনো আছে তাই সাধারণ লাইনে দাঁড়ালাম।

খুব
ধ্বনি উঠছে পুণ্যার্থীদের - ‘বোম বোম মহাকাল কালো পাথরে শিব ঠাকুরের মুখ আঁকা। সাদা রং দিয়ে আঁকতে হয়েছে, কারণ কালো পাথরে সাদা রং চোখে পড়বে।

তাই ত্রিকালদর্শী বৃদ্ধ শিবঠাকুরের রোষ কষায়িত ত্রিনেত্রর দিকে তাকিয়ে ভক্তিভরে প্রণাম করে উঠতেই কাঁধে সিকিউরিটির ঠেলা। হবেই তো, আমার পরে হাজারো ধর্মবিশ্বাসীর ভীড়।


মহাকাল সবাইকে আশীর্বাদ দেবেন। নকুলদানা প্রসাদ পেলাম। যত্ন করে তুলে রাখি। পতির পুণ্যে সতীর পুণ্য হয় শুনেছি। নকুলদানায় পুণ্যের ভাগ আরো বাড়বে নিশ্চয়ই।

পরের দিন হোটেল থেকে বেরিয়ে সোজা রামঘাট।


ক্ষিপ্র গতি থেকে নাকি নদীর নাম শিপ্রা। অটো নামিয়ে দিল একটা ব্রীজের কাছে। একটু দূরে দেখা যাচ্ছে রামঘাট। ব্রিজের কাছেও বাঁধানো ঘাট। আজকে জলস্তর সর্বোচ্চ উচ্চতায়। দলে দলে পুণ্যার্থী আসছেন। বেশীরভাগ সমাজের গরীব শ্রেণীভুক্ত।


মহিলাদের মাথায় মোট। ভোজনং যত্রতত্র শয়নং হট্টমন্দিরে। শিপ্রার
 খরস্রোতে ঘোলা জল বয়ে চলেছে। সতর্ক পুলিশ ব্যারিয়ার লাগিয়ে ঘাটের দরজা বন্ধ রেখেছে। কিন্তু পুণ্যার্থীদের দমিয়ে রাখা দায়। বেশ দূরে দেখা যাচ্ছে কিছু লোক স্নান করছে। পার্থ জলে নামবেই।

এককালে শ্রীরামপুরে গঙ্গা এপার-ওপার করত। এডভেঞ্চারের নেশা এখনো যায় নি। আমি ব্রীজের উপর দিয়ে লাগানো এক পাইপের উপরে গিয়ে বসি। পাশে এক সাধু বসে।

দোহারা চেহারা, একমুখ দাঁড়ি। আলাপচারিতা শুরু করি। উনি এসেছেন মথুরা থেকে, আজকের শাহি সওয়ারি দেখতে। 

সাধু মহারাজের নাম নাগাবাবা। জিজ্ঞাসা করাতে বল্লেন বার বছর বয়েসে গৃহ ছেড়েছেন। গুরুর চেলা হয়ে ছিলেন বেশ কিছু বছর। তারপর দীক্ষা নিয়ে গেরুয়া বসন ধারণ। উনার আশ্রমের নাম দত্তাখাড়া সন্ন্যাস দশনাম জুনা আখড়া, মথুরা। আশ্রমে শুধু নাম জপ করলেই হয় না, আশ্রমের অনেক জমি, সেখানে ফুল-ফলের গাছের পরিচর্যার দায়িত্ব তাঁর। উনার কাছে শুনলাম আজ হল  সোমতি অমবস্যা, মানে সোমবারের অমবস্যা। এই দিনে শিপ্রাতে স্নান করে তীর্থযাত্রীরা পিতৃপুরুষের উদ্দেশে তর্পন করেন। আরো বল্লেনচার শাহি সওয়ারি হোতি হ্যায় শাওনকি, দো সওয়ারি ভাদ্র কি, উসমে সোমবার হল শক্তির বার মানে শিবের পুজোর বার  তায় আজ আবার অমাবস্যা। তাই আজকের শাহি সওয়ারি অনেক মাহাত্ব্য। নাগা বাবা নর্মদা পরিক্রমও করেছেন-অমরাকন্টক থেকে শুরু করে দুধতলাই ভারুচ পর্যন্ত। এখান থেকে শাহি সওয়ারি দেখে যাবেন জুনাগড়। সেখানেও আশ্রম আছে। এরা সবাই শিবভক্ত। জিজ্ঞাসা করি সাধুদের নাকি ধ্যান করতে হয় রোজ। নাগাবাবা রোজ ভোরে একঘন্টা ধ্যান করেন। ধ্যানের উচ্চমার্গে পৌঁছাতে পারলে নাকি শূন্যগতি প্রাপ্ত হয়। যদিও নাগা বাবা এতদিনে সেই পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেন নি বলে অকপটে স্বীকার করলেন।

ইতিমধ্যে পার্থ শাহি স্নান করে ফিরলে, আমরা চল্লাম কাছেই রামঘাটে। স্নান নিষিদ্ধ, কিন্তু ভারতীয়যোগাড়ুবিজনেস সবসময় চলে। ঘাটে কয়েকজন লোক বালতি করে জল নিয়ে এসে শাহি স্নান করিয়ে দিচ্ছে পুণ্যার্থীদের। 



রামঘাটের কাছে পারদেশ্বর মন্দিরের চাতালে কালসর্প পূজা চলছে।


যাদের কুন্ডলীতে রাহু-তেতু দোষ আছে, তা ঠিক করার জন্য অমবস্যাতে এই পূজা করতে হয়। 

বিশ্বদোষ, গুরু চন্ডালী দোষ ইত্যাদি নানারকম দোষ আছে। তিন ঘন্টা লাগে এই পুজো করতে। এক পূজারীর সঙ্গে আলাপ হল। সবে পুজো সেরে উঠেছেন।


দেখলাম পূজাস্থলে নানা রংএর চাল পড়ে আছে। পুজোর প্রধান উপকরণ মনে হল।

শিপ্রা নদীর ওপর পাড়ে বেশ কিছু মন্দির আছে। একটা অটো ভাড়া করলাম। আমাদের সবকিছু দেখিয়ে আবার মহাকালের কাছে ছেড়ে দেবে।  নদী পেরিয়ে প্রথম মন্দির হল গড়কালী মন্দির।


খ্রিষ্টিয় পঞ্চম শতকে দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের আমলে কবি কালিদাস এই মন্দিরে পুজো করে দেবী কালীর বরে অসাধারণ রচয়িতা হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেন।


মন্দির পরিসরে দুইদিকে উঁচু উঁচু ত্রিকোণাকৃতি মশাল জ্বালানোর জায়গা। আজকাল সন্ধ্যেবেলা প্রদীপ জ্বলে। তেলচিটে দেওয়ালে তীর্থযাত্রীরা পয়সা লাগাচ্ছেন। একটা জায়গায় বোর্ডে লেখা আছে দেখলাম খ্রীষ্টপূর্ব ১ম শতকে বিক্রমাদিত্যের আমল থেকে এই মন্দির আছে।

কেউ বলেন কালিদাস সময়ে রাজকবি ছিলেন আবার অনেকের মতে পঞ্চম শতকে দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের (ইনাকেও বিক্রমাদিত্য বলা হত) আমলে সভাকবি ছিলেন কালিদাস। মন্দিরের ভিতরে খালি মা কালীর মুখ, সেটাও গেরুয়া রংএর।

বাঙালী হিসাবে মা কালীকে কালো রূপেই দেখতে অভ্যস্ত। 

এরপর এলাম কালভৈরব মন্দিরে। উজ্জয়িনীতে মহাকাল এবং কালভৈরব এই দুই জায়গাতে সবচেয়ে বেশী দর্শক সমাগম। অটোওয়ালা বল্ল লাইনে দাঁড়িয়ে দর্শন করতে দুইঘন্টা লাগবে। কালভৈরব হলেন মহাকালের দ্বাররক্ষী। ইনার পুজোতে মদিরা ভোগ দেওয়া হয়। স্বয়ং শিবের দ্বাররক্ষী সুরাসেবন করে দ্বাররক্ষায় বেসুরো হবেন না কেন তাই ভাবি। ভক্তরা বিশ্বাস করেন কাল ভৈরবের অনুমতি নিয়ে তবেই মহাকালের মন্দিরে যেতে হয়। আমরা মহাকাল দর্শন কাল করে নিয়েছি। এই বয়েসে লিমিটেড এন্যার্জির বেশীটা এখানে দর্শনের জন্য খরচ করে ফেললে সন্ধ্যে অব্দি টানা মুস্কিল।


তাই বাইরে থেকে ফটো নিয়ে পরের ডেস্টিনেশনে চললাম। এরপর আমরা এলাম সিদ্ধবট মন্দিরে। শিপ্রা তীরবর্তী এই বটগাছ ২০০০ বছর পুরানো বলে কথিত।

এখানে বিক্রমাদিত্য তপস্যা করে তাল-বেতাল প্রাপ্ত করেছিলেন। বটমূলে দুধ ঢেলে পিন্ডদানের প্রথা আছে। দেখলাম অনেকেই পিতৃপুরুষের  পিন্ডদানের পূজাও করছেন। সুমিতা আগেই বলে দিয়েছিল দুধ ঢেলে তর্পন করতে।


সেটাই করলাম। আজকে অমাবস্যা বলে অনেকই এসেছেন পিন্ডদান করতে।
পাশেই শিপ্রানদীর বাঁধানো ঘাটে স্নান করে পুজো শুরু করছেন। বাঁধানো ঘাট ও দূরে শিপ্রা নদীর বাঁক খাওয়ার মনোরম সৌন্দর্য দুই চোখ ভরে দেখি। 


এরপর শিপ্রার ব্রীজের অপর পাড়ে এক মন্দির চূড়া দেখা গেল। ব্রীজের উপর অটো দাঁড় করিয়ে ফটো নিলাম।


এই মন্দির হল সমগ্র বিশ্বে মঙ্গলের একমাত্র মন্দির। সবচেয়ে ইনটারেস্টিং হল এই মন্দির ভৌগলিক প্রাইম মেরিডিয়ান (কল্পিত উত্তর-দক্ষিণ লাইন) আর কর্কটা ক্রান্তি রেখার মিলনস্থলে। পুরাকালে এখান থেকে জ্যোতির্বিদ্যার চর্চা হত।আমাদের শেষ গন্তব্য দূরে একটা খোপ কাটা লম্বা টাওয়ার দেখা যাচ্ছে।

শুনলাম ওটা নাকি পাখিদের বাসার জন্য করা হয়েছে। এই মন্দিরে শিবরূপী মঙ্গলের পূজা হয়।


মঙ্গল গ্রহের জন্মস্থান এই মন্দির। ভিতরে দর্শনের জন্য লাইনে দাঁড়াতে হল। সব শিব মন্দিরে মন্দিরের বাইরে শিবের বাহন বুল থাকে। এখানে তার ব্যতিক্রম। এখানে রাখা আছে ভেড়া। দর্শনের লাইনে দাঁড়িয়ে ভেড়ার সঙ্গে সেল্ফি নিয়ে

দেখি ভেড়ার পিছনে সাক্ষাত বাবরি চুলওয়ালা জীবন্ত মহাদেব। 

এরপর আমরা এলাম সন্দীপনি আশ্রমে।


মহাভারতেও এই মন্দিরের উল্লেখ আছে। ভিতরটা বেশ গাছ-গাছালিতে ভরা।


নয়ন-মনোহর একটা আশ্রমিক পরিবেশ। একটি চুড়োওয়ালা মন্দির ছাড়া বেশ কয়েকটি অট্টালিকা। মন্দিরের মধ্যে শ্রীকৃষ্ণর কালো মার্বেলের বিশাল মূর্তি।

একটা ঘরে দেখলাম শ্রীকৃষ্ণের জীবনের নানা ঘটনা বর্ননা করা চিত্রসহ।

এর প্রাচীনত্ব বলতে গেলে জানাতে হয় যে এই আশ্রমের পাঠশালাতে গুরু সন্দিপনের কাছে শ্রীকৃষ্ণ, বলরাম সুদামা শিক্ষা লাভ করেছিলেন। একটি বিশাল হলঘরের প্রবেশপথে লেখা


এখানে চৌষট্টি কলা চৌদ্দ ধরনের শিক্ষা প্রদান করা হত। ভিতরে সারাটা দেওয়াল জুড়ে আছে বিভিন্ন সাবজেক্টের নাম ছবিসহ। সেগুলি হল-

পুরাণ, লজিক, থিওলজি, etimology, grammar, ছন্দ শাস্ত্র (prosody), teaching, ayurveda, music, যজ্ঞ, ইন্দ্র সুপ্রীম গড, অগ্নি প্রণাম। হাইজিন নিয়ে কোন সাবজেকট নেই! তাই বোধহয় আমরা এখনো পরিষ্কার থাকটা রপ্ত করতে পারি নি! 

ফেরার পথে অটো আমাদের নামিয়ে দিল সেই ফ্লাইওভারের মধ্যস্থলে।


এখন বাজে তিনটে। চারটে থেকে শাহি সওয়ারি শুরু হবে। দেখলাম প্রশেসনে যাওয়ার জন্য কয়েকটি দল ঝাঁকি নানা বাজনা সহকারে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে।

হেঁটে ফ্লাইওভার পেরিয়ে যাই লাঞ্চের সন্ধানে। পথের পাশে অনেক হোটেল। ভেবেছিলাম উজ্জয়িনীতে খাস মহাকালের দোড়গোড়ায় খালি নিরামিশ খাবার হবে। চিকেন পাওয়া যাচ্ছে দেখে দুইজনেই খুশী। এর আগে ইন্দোর থেকে শুরু করে কোথাও ননভেজ পাই নি। একেই বলে প্রদীপের তলায় অন্ধকার। খেয়েদেয়ে আবার মহাকাল মন্দির করিডোরে প্রবেশ করি। বেশ ভীড়। সবাই এসেছেন শাহি সওয়ারি দেখতে। রেড স্যান্ডস্টোনে তৈরী ভারতমাতা মন্দিরের কাছে আরাম করে বসেছি।

মন্দিরের পাশে হল মহাকাল যাত্রী নিবাস। এখানে থাকাই সবচেয়ে সুবিধা। কিন্তু মিনিমাম একমাস আগে বুকিং করতে হয়। পার্থ মন্দির দেখে এল। শুনলাম এইমুহূর্তে মহাকাল দর্শন পনের মিনিটে হয়ে যাচ্ছে। আবার করিডোর ধরে এসে মহাকাল মন্দিরে এলাম। এবার আর ভুল করি নি। জুতো জোড়াকে ব্যাগে পুরে নিলাম। জুতো খোঁজার ঝক্কি রইল না। সব দর্শনার্থী এখন সাহি শওয়ারি দেখতে ব্যাস্ত।

আবার দর্শন হল। এবারে ভীড় কম বলে আমাদের আড়াইশ টাকার লাইনে ঢুকিয়ে দিল। মহাকালের কৃপা! ডাবল পুণ্যি! বেরিয়ে এসে করিডোরে ফটো তুলছি।
                 সমুদ্র মন্থনের হলাহল পান করছেন নীলকন্ঠ
 
পার্থর মাথায় ঘুরছে শাহি সওয়ারি রামঘাট হয়ে আবার মন্দিরে ফিরবে রাত নয়টাতে। ঠিক করল ফেরার রাস্তায় কোন একটা জায়গা থেকে দেখবে। সারাদিন ঘুরে আমি ক্লান্ত। একাই ফিরে এলাম হোটেলে। 

আজ ভ্রমনের শেষদিন। ইতিহাস ধর্মের মিশ্রণের সুখস্মৃতি অনেকদিন পর্যন্ত মনে থাকবে। সকালে ঠিক করলাম কালিয়াদেহ মহল যাব। অবন্তিকা, এম পি ট্যুরিসমের রিশেপসনের পাশে, বোর্ডে ধর্মীয় স্থান ব্যাতীত এটাই একমাত্র স্পট। গতকাল শিপ্রা নদীর অপর তীরে যে মন্দিরগুলি অটো ভাড়া করে দেখেছিলাম, সেখান থেকে আরো ছয়-সাত কিমি দূরে। সকাল সকাল বেরিয়েছি। অটোওয়ালা ঘনশ্যাম বেশ হাসিখুশী এবং ব্যবহারে মার্জিত। ভাড়াও রিসনেবল। উজ্জয়িনীর শহরের মধ্যস্থল হল টাওয়ার স্কোয়ার। এর কাছেই সুদৃশ্য মার্বেলের পাঁচতলা উঁচু ঘন্টাঘর দেখে দাঁড়ালাম।



এটা বানিয়েছিলেন মাধব রাও সিন্ধিয়া। সিন্ধিয়া বা শিন্ডে যারা অধিক পরিচিত গোয়ালিয়র এর রাজা হিসাবে, সেই বংশের পূর্বপুরুষ ১৭৩২ সালে মারাঠা রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন। আরো কিছুটা ইতিহাসের পিছনের পাতা উল্টালে দেখা যাচ্ছে, দিল্লির সুলতানেট পিরিয়ডের ইলতুৎমিস আজ থেকে প্রায় আটশ বছর আগে (১২৩৪/৩৫) পারমার শাসিত উজ্জয়িনী জয় করেন। মহাকালেশ্বর মন্দির লুন্ঠনের পর শিবলিঙ্গকে নিকটস্থ পুকুরে ফেলে দেন। পরবর্তী পাঁচশ বছর ধরে জ্যোতির্লিঙ্গ পুকুরেই পড়েছিল। আঠারশ শতকের প্রথমদিক থেকে মারাঠা সম্রাজ্যের পেশোয়াদের প্রতিপত্তি বাড়তে থাকে। ১৭৩২ সালে সিন্ধিয়া বা শিন্ডে বংশের রানোজি সিন্ধিয়াকে পেশোয়া উজ্জয়িনীর শাসক নিযুক্ত করলে এই জ্যোতির্লিঙ্গ আবার পুনরুদ্ধার করে মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করা হয়। সিন্ধিয়া রাজপরিবারের কথা জানা ছিল গোয়ালিয়রের শাসক হিসাবে, কিন্তু সিন্ধিয়া পরিবারের উজ্জয়িনীর সাথে নিগূড় সম্পর্কের কথা এখানে এসে জানতে পারলাম। গতকাল যে শাহি সওয়ারি অনুষ্ঠান ছিল, তাতে বর্তমান সিন্ধিয়া পরিবারের মন্ত্রী জ্যোতিরাদিত্য তার উদ্বোধন করেন। 

অটো এগিয়ে চলেছে। কালকের দেখা মন্দিরসমষ্টি পেরিয়ে এসে পৌঁছালাম বাহান্ন কুন্ডে,



যার পাশেই হল কালেদহ প্যালেসের ভগ্নাবশেষ। জায়গাটার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অনবদ্য। পবিত্র স্কন্দপুরাণে উল্লেখ আছে সূর্য মন্দিরের, যেটি ব্রহ্মকুন্ড সূর্যকুন্ডের মাঝে অবস্থিত। এখানে পাওয়া শিলালিপি থেকে জানা যায়, মালওয়ার সুলতান মহম্মদ খিলজি ১৪৫৮ সালে কালেদহ প্রাসাদ বানিয়েছিলেন। শিপ্রা নদীতে বাঁধ দিয়ে নদীপ্রবাহকে দুই ভাগে বিভাজিত করে মধ্যবর্তী ভূখন্ডে কালেদহ প্যালেস।

অটো থেকে নেমে এগিয়ে যাই নদীর পাড়ে। আজকে বর্ষার জলে পুষ্ট শিপ্রার জলধারার নীচে রয়ে গিয়েছে ঘাট। রেড স্যান্ড স্টোনে নির্মিত পার্শিয়ান আর্কিটেকচারের খিলানগুলির উপরিভাগ দৃশ্যমান।


বাহান্ন কুন্ড নাম হয়েছে, কারণ সুলতান নাসিরুদ্দিন শিপ্রার প্রবাহকে ডাইভার্ট করে ৫২ টি কুন্ড বানিয়েছিলেন, যার মধ্যে জল একবার ক্লকওয়াইজ আরেকবার এ্যান্টি ক্লক ওয়াইজ প্রবাহিত হয়ে জায়গাটি ঠান্ডা রাখত। দেখলাম কিছু পুণ্যার্থী স্নান করে পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে তর্পণ করছেন। ছড়িয়ে ছিটিয়ে কিছু পুজা-সামগ্রীর দোকান। পুরাতন বাঁধের আর্চ-শেপড গেটের মধ্যে দিয়ে তীব্র গতির শিপ্রার জলের গর্জনে জায়গাটি বেশ সরব। বাঁধের উপরের রাস্তা দিয়ে দ্বীপ-স্থিত কালেদহ প্যালেসে গেলাম।


প্রত্নতাত্বিক বিভাগের কোন বোর্ড দেখা গেল না। একটাই মাত্র বড় স্ট্রাকচার আছে, তার উপরের ডোম এবং দরজা জানালার নির্মানশৈলীতে মুসলিম স্থাপত্যের নিদর্শন সুস্পষ্ট। কালেদহ প্যালেস যে একসময়ে মালওায়া- উল্লেখযোগ্য প্রাসাদ ছিল তার প্রমান হল ১৫৯৯ সালে আকবর এবং ১৬১৬ সালে জাহাঙ্গীর এখানে এসেছিলেন ডেকান অভিযানের সময়। ইদানীং এটাকে রিনোভেট করা হয়েছে মনে হল। সিন্ধিয়া পরিবার এটিকে এখন সূর্য মন্দিরে রূপান্তরিত করেছেন।


সিকিউরিটি গার্ড বল্ল, ঘাটের পুরোহিত অবসর সময়ে এসে পুজো করেন। শুনলাম ভূগর্ভস্ত অনেক মহল আছে। নদীর পাড়ে যাওয়ার সুড়ঙ্গও আছে। কিন্তু কোন অজ্ঞাত কারনে এখানে প্রত্নতাত্বিক খননকার্য হয় নি। আশপাশটা ঝোপঝাড়ে ভর্তি। প্যালেসের অন্যদিকে বেশ কিছুটা চওড়া শিপ্রার অন্য শাখাটি দেখা যাচ্ছে। শীতকালে এখানে প্রচুর জনসমাগম হয় পিকনিকের জন্য। শিপ্রার দুইদিকের জলধারা এক কিমি এগিয়ে মিলিত হচ্ছে। অটো ড্রাইভার ঘনশ্যাম ভাল মানুষ। একবার বলতেই আমাদের নিয়ে গেল সঙ্গের কাছে। চারিদিকটা সবুজ।


দূরে গ্রামও দেখা যাচ্ছে। ছবি তুলে ফেরার পালা। ঘনশ্যাম আমাদের নামিয়ে দিল হোটেলের কাছে একটা রেস্টুরেন্টে প্রাতরাশ সারার জন্য। আলু-টিকিয়ার মত সাবু টিকিয়া, নানা রকম মশালা দই সহযোগে। এটা আগে খাই নি। কাল রাতের ডিনারও এখানেই করেছিলাম। 

ফিরে গিয়ে প্যাকিং করে সোজা স্টেশন। যাব ইন্দোর। সেখান থেকে দিল্লী ফেরার ট্রেন। চুপি চুপি বলি নিজের বুদ্ধু  বনার কথা।


উজ্জয়িনী স্টেশনে বসে ইন্দোর-দিল্লীর ট্রেনটা দেখি উজ্জয়িনী হয়েই যাবে। মানে আমি অনায়াসে উজ্জয়নী বোর্ডিং দিতে পারতাম। ওই ট্রেনটা সন্ধ্যার সময় এখানে আসে। খামোখা দুইশ টাকা দিয়ে উজ্জয়িনী-ইন্দোর 

টিকিট কাটলাম। ইন্দোর থেকে ট্রেন বিকালে ছেড়ে দুই ঘন্টা পর উজ্জয়িনীতে দাঁড়াল। আমার কোচ নম্বর জেনে নিয়ে দেখি পার্থ দাঁড়িয়ে আছে প্ল্যটফর্মে। ওরও ট্রেন একটু পরে আসবে ইন্দোর থেকে।


ও এরমধ্যে বাসে করে দেবস (Dewas) গিয়ে রোপওয়ে চড়ে টেকরি মন্দির দেখে এসেছে। 

চার সেপ্টেম্বর সকালে নিজামুদ্দিন স্টেশনে নেমে অটো ধরে ফিরে এলাম বাসস্থানে। 

Comments

Popular posts from this blog

ত্রিবেনী তীর্থপথে ও আরো টিটবিট

রবিঠাকুর ও কিছু হাসি মশকরা

A walk to explore Delhi’s lesser known monuments