মালোয়া ভ্রমন (মধ্যপ্রদেশ) পার্ট ১
ইন্দোর এক্সপ্রেস ছাড়বে সোয়া সাতটাতে নিউ দিল্লি স্টেশন থেকে। আজকাল উবেরের ড্রাইভাররা ফটাফট ক্যান্সেল করে দেয়। বেশ টেনশন করে তিনবার ক্যানসেল হওয়ার পর চতুর্থজনকে পেয়ে স্বস্তির নিশ্বাস ফেল্লাম। টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে। আজ জন্মাষ্টমী। সাধারনত এইদিন বৃষ্টি হয়। ছুটি বলে রাস্তা খালি। ড্রাইভার গল্প জুড়েছে।
সবার জীবনেই গল্প থাকে। নৌশাদ আগে স্কুল বাস চালাত। ১৮০০০/- টাকা মাইনে ছিল। সকাল থেকে শুরু হয়ে সাড়ে তিনটের মধ্যে ছুটি। একটু কম মাইনে, কিন্তু শান্তি বেশী। আরেকটু বেশী রোজগারের আশায় এখন উবের চালায়। দিনে চোদ্দ ঘন্টা ডিউটি করে। কোন ছুটিও নেই। গাড়ীর কিস্তি দিনে পাঁচশ টাকা। ইউপি, দিল্লি, গুরগাঁও টোল ট্যাক্স দুইশত টাকা, সিএনজির খরচা মিলিয়ে দিনে হাজার টাকা ফিক্সড খরচা। দিনে রোজগার আঠারশ-দুই হাজার। ছুটির দিনে কম। আমায় দেখাল আজকে এখন অব্দি নয়শত বাহাত্তর টাকা হয়েছে। ঘটনা হল যতটুকু রোজগার বাড়ল, তার তুলনায় খাটনি বাড়ল কয়েক গুণ। ব্যাপারটা হল গিয়ে “নদীর এপার বলে ছাড়িয়া নিশ্বাস, ও পাড়েতে সর্বসুখ আমার বিশ্বাস”। পৌঁছে গেলাম নিউদিল্লি স্টেশনের আজমীরি গেটে সাইডে।
আজকাল স্টেশনে কুলি নিই না। সব প্ল্যাটফর্মেই এস্কালেটার থাকে। ট্রেনের কোন প্যাসেন্জার এক জৈন ফ্যামিলি। সঙ্গে তাদের দুই মেয়ে। একজন পড়ে ক্লাস সেভেনে অন্যজন থ্রিতে।
মধ্যবয়স্ক লোকটির বাড়ী বাশওয়ারা (Banswara) বলে রাজস্থানের একটি শহরে। এমপি বর্ডার থেকে কাছে। রতলাম জংশনে নেমে গাড়ীতে আশি কিলোমিটার। মফস্বল শহর। এর আছে শাড়ীর দোকান। জিজ্ঞাসা করি শাড়ী কোথা থেকে আনেন? জানালেন- ইন্দোর নয়ত আমেদাবাদ। নয়ডাতে জৈনদের এক ধর্মসভা ছিল। সেটাতে ভাগ নিতেই সপরিবারে আসা। একটু পরে উনাদের ডিনার শুরু হয়ে গেল।
দেখলাম পুরির সঙ্গে শেও ও দুই তিনরকম মশলা সহযোগে বেশ সুন্দর খাওয়া হয়ে গেল। পরে বৌটি জানাল পরিবার ডিনার করে খেলে সন্ধ্যার সময়। রাতে কিছু খান না। মশলা, শেও সব বাড়ীতেই বানান। মেয়েদুটি দেখলাম মোবাইলে স্ক্রাবেলের মত গেম খলছে। আমাকেও শিখিয়ে দিয়ে মোবাইলে এ্যপস ডাউনলোড করিয়ে দিল।
সকাল ছয়টা নাগাদ পৌঁছে গেলাম ইন্দোর স্টেশনে। আমার হোস্টেলের রুমমেট পার্থ আসছে মুম্বাই থেকে। বেড়ানোর ক্ষেত্রে ওর মত উৎসাহী ও এ্যকমোডেটিভ জুড়ি পাওয়া ভার। ফোনে যখন কথা হচ্ছিল এই ট্রিপটা নিয়ে, ফোন শেষ করার আগেই দেখি পার্থ টিকিট কেটে ফেলেছে। আমাদের হোটেলের নাম হল Plyotel Sonash. স্টেশন থেকে পাঁচ কিমি। সকালে ফাঁকা রাস্তা দিয় আসতে বোঝা গেল বেশ পরিষ্কার শহর, তাই কয়েক বছর ধরে সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন শহরের তকমা পেয়ে আসছে। পার্থর সঙ্গে কথা হল। কাল বরোদা সাইডে বন্যা পরিস্থিতির জন্য সব ট্রেন ঘুরে আসছে। সকাল নটার বদলে পাঁচ-ছয় ঘন্টা লেটে পৌঁছাবে। অটো ওয়ালা বল্ল হোটেলের আশেপাশে অনেক কোচিং ইনস্টিটিউট। কম্পিটিটিভ পরীক্ষার প্রিপারেশন করতে নানা জায়গা থেকে ছাত্র-ছাত্রীরা এখানে পিজিতে থেকে ইনস্টিটিউটে পড়ে।হোটেলে আর্লি চেকইন করে ব্রেকফাস্টের জন্য বেরোই। বাইরের গলিতে অনেক ছোট খাবার দোকান। এখানের বিখ্যাত স্ন্যকস হল পোহা।
পোহা, কচুরি, জিলিপি সহযোগে দারুন ব্রেকফাস্ট হল মাত্র তিরিশ টাকায়। হোটেলে ফিরে স্নান করে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে পড়ি। যা দেখার আজকেই দেখে নিতে হবে। কাল সকালে বেরোব ‘ধার’ এর উদ্দেশে।
প্রথম গন্তব্য হল অন্নপূর্ণা মন্দির। প্রবেশ পথের দ্বারটি সাউথ ইন্ডিয়ান গোপুরম স্টাইলে তৈরী।
দুগ্ধধবল মার্বেলের মূল মন্দির পরিসরটি বেশ বড় এবং পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, ভীড়ও কম। ডানদিকে ও পিছনে আরো মন্দির। জুতো খুলে ডানদিকের পুরানো মন্দিরের দিকে যাই। পাশেই বেদগৃহ।
সেখানে দেখি বাচ্চারা দুলে দুলে সংস্কৃত পড়ছে। একটি ছেলেকে জিজ্ঞাসা করে জানলাম উপনিষদ পড়ছে। এরা নিশ্চয়ই বড় হয়ে পূজারী হবে। পাশেই মন্দির। সিঁড়ি দিয়ে উঠে দেখি পদ্মাসনে বসা শিবঠাকুরের বিশাল মূর্তি।
এক ভক্তকে দেখলাম শিবের মাথায় জল ঢেলে বারান্দাতে কিছু করছেন। জিজ্ঞাসা করি-আপনি কি পূজারী? উনি বল্লেন- না, কাছেই থাকি, রোজই আসি, মন্দিরের নানা কর্মের সঙ্গে যুক্ত থাকতে ভাল লাগে। উনি জানালেন ১৯৫৯ সালে স্বামী প্রবানন্দগিরি মহারাজ এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন, আর মূল অন্নপূর্ণার মন্দিরটি ২০২২ সালে নির্মিত কুড়ি কোটি টাকা ব্যায়ে।
আমার মন্দির সম্বন্ধিত প্রশ্নবানে খুশী হয় প্যাটেলবাবু ঝোলা থেকে প্রসাদ বার করে দিলেন - কলা ও খেজুর। ভাল লাগল উনার আন্তরিকতা। একটা সেলফি নিলাম উনার সাথে।
অন্নপূর্ণা মেন মন্দিরের পাশে আরেকটি বড় হলঘরওয়ালা মন্দির যেখানে রাম,লক্ষণ, সীতা, গনেশের মূর্তি আছে।
কিছু ভক্ত, দেখে স্থানীয় মনে হল, সব ঠাকুরকে ঘুরে ঘুরে নমস্কার করে টিকা লাগিয়ে চলে যাচ্ছেন। সেল্ফ হেল্প মনে হল। পূজারী নেই। একটি জিনস পরিহিতা তরুণী মাটিতে বসে কিছু পৌরাণিক গাঁথা মন দিয়ে দুলে দুলে পড়ছে।
ভাল লাগল অল্প বয়েসের এই ভক্তিটুকু। মন্দিরে সাধারনত মধ্যবয়স্ক বা বয়স্ক লোকই বেশী আসেন। এবার এলাম অন্নপূর্ণা মন্দিরে।মার্বেলের তৈরী এই মন্দিরের থাম ও দেওয়ালে নানা কারুকার্য।
অলেকটা খোলা বারান্দা। ভীড় নেই বলে আরো ভাল লাগল।
বেরিয়ে এসে একটা অটো ধরে এলাম রাজওয়ারা বলে একটা জায়গাতে। অটো যেখানে ছেড়ে দিল, সেখান থেকে কিছুটা হেঁটে আসতে হল।
কাল ছিল জন্মাষ্টমী। ফুটপাথার পাশে ছোট ছোট দোকানে রকমারী পসরা সাজিয়ে বসে আছে দোকানীরা।
রাজওয়াড়া জায়গাটি ইন্দোর শহরের প্রাণকেন্দ্র। একটি বড় গোল সার্কেলের ধারে হলুদ-বারগেন্ডি (burgundy) কালারে সাততলা মঞ্জিল, প্রায় দুইশত বছরের পুরানো হোলকার সম্রাজ্যের প্রাসাদ।
মঞ্জিলের প্রথম তিনতলা পাথরের তৈরী, তার উপরের আরো চারতলা কাঠের তৈরী। এগারটাতে গেট খুলবে দর্শনার্থীদের জন্য কিছুক্ষণের অপেক্ষা। ফটো শেসন হল। অটোওয়ালা এসে ধরেছে, সব দর্শনীয় স্থান দেখিয়ে দেবে। এরা দরদামের সময় প্রথমে জিজ্ঞাসা করে নেয় সওয়ারী কজন? আমি একা শুনে একটু হতাশ হল। বল্ল পাঁচশ টাকা লাগবে। অটোওয়ালাকে অনুরোধ করে গেটের সামনে ফটো তুলে নিলাম।
২৫/- টিকিট কেটে বিশাল দরজা পেরিয়ে ভিতরে ঢোকা গেল। এই রাজপ্রাসাদ এখন স্টেট আর্কিওলজি ডিপার্টমেন্টের অধীনে। ভিতরে পাথরে বাঁধানো বড় চত্বর।
তিনদিকেই বিল্ডিং। স্থপত্য গুলি দেখলে মনে হয় ভিন্ন সময়ে তৈরী। একদম সামনে যে দুইতলা ইমারত, তাতে রাজস্থানী ঝরোকার সাথে ইউরোপিয়ান স্টাইলের আর্চড থাম।
দোতলায় বিশাল লম্বা হলঘর। এটাই দরবার হল বলে মনে হল। মাঝখানে ঝাড়লন্ঠন।
সারি দেওয়া থামের শীর্ষভাগ ডিজাইন করা
গেটসন্নিহিত সাততলা বিল্ডিংএর দুইতলা অব্দি যাওয়া যায়। চত্বরের নীচে একপাশে হোলকার বংশের ইতিহাস রয়েছে। এই রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা মালহা রাও হোলকার (১৬৯৩-১৭৬৫)।
ইনি ছিলেন পুনের পেশোয়া বাজীরাও এর সৈন্যবাহিনীর সুবেদার। আঠারশ শতকের মধ্যভাগে মারঠা শক্তি তখন প্রচন্ড শক্তিশালী ভারতবর্ষের বুকে। দক্ষিণের তামিলনাড়ু থেকে উত্তরে পেশোয়ার এবং পূর্বে বাংলা পর্যন্ত বৃস্তিত ছিল মারাঠা সম্রাজ্য। ১৭০৭ সালে অওরংজেবের মৃত্যুর পর দিল্লির মুঘল বাদশার শক্তি কমতে থাকে এবং মারাঠা শক্তি বাড়তে থাকে। ১৭৩০ সালে মন্দাসুর যুদ্ধে সফল অভিযান থেকে ফিরে আসার পর তাঁকে মালোয়া ক্ষেত্রের জায়গীরদার দেন পেশোয়া বাজীরাও। মালহা রাও হোলকার ইন্দোরে রাজধানী শুরু করেন। ওই একই সময়ে পেশোয়ার আরেক বীর সেনাপতি ছিলেন জানকোজি রাও সিন্ধিয়া। তাঁকে দেওয়া হয় উজ্জয়িনীর জায়গীরদার। পরে সিন্ধিয়ারা গোয়ালিয়রকে তাদের রাজধানী বানান। প্যালেসে একটি মিউজিয়ামও আছে। সেটার প্রবেশ ডানদিকের রাস্তা দিয়ে গিয়ে পিছনদিকে। এই মিউজিয়ামের প্রবেশমূল্য আলাদা। ঢুকতেই কাঠের থামে ছাদওয়ালা প্রশস্ত চতুষ্কোণ করিডোর।
পরবর্তী কালে কয়েকদিনের সফরে বিন্ধ্যপর্বত ও সাতপুরা রেন্জের মধ্যে মালোয়া ভূমিতে সেগুনের ঘন অরণ্য দেখেছি।
তাই প্রাসাদ বানাতে কাঠের অভাব হয় নি। বাঁদিকে সিড়ি দিয়ে উঠে মিউজিয়াম। হোলকার রাজত্বকালের সময়ের নানা নিদর্শন, যেমন অস্ত্রশস্ত্র, চিত্র, পালকি ইত্যাদি রাখা।
১৮৭৪ সালে হোলকারদের অনুদানে ব্রিটিশ নির্মিত মিটারগেজ রেললাইন (১৩৮কিমি) শুরু হয়। বিন্ধ্যপর্বতমালা ও নর্মদা নদী অতিক্রম করে এই লাইন তৈরী হয়েছিল। সেই নির্মানের সময়ের ফটো রাখা আছে।
বেরিয়ে এসেছি। হোলকার প্যালেসে একটা বোর্ডে লেখা ছিল দর্শনীয় স্থানগুলির নাম এবং দূরত্ব।
সবচেয়ে কাছে কাঁচ মন্দির। এক কিমি দূরত্বে। অটো নিলে ঘুরে যেতে হবে। তাই হেঁটেই চল্লাম। প্যালেসেরএর পিছনে হল ইন্দোরের বিখ্যাত শরাফা বাজার। তার মধ্যে দিয়ে রাস্তা। দুইদিকে অনেক গয়নার দোকান। রাস্তার উপর থেকেই এনট্রান্স। ভিতরে সবই নানা বর্নের কাঁচের প্যানেলিং।
একটু ইউনিক। এটা জৈন মন্দির। ভিতরে গর্ভগৃহে জৈন তীর্থঙ্করদের মূর্তি।
এরপর আবার শরাফা বাজার পেরিয়ে, রাজওয়াড়া হয়ে যাব কৃষ্ণপুরম ছত্রীতে। লাঞ্চ করা হয় নি। রাস্তায় একটি মিষ্টির দোকানে বেশ ভীড় দেখে ঢুকলাম। নাম হল সর্ব ফলাহারী মিষ্টান্ন ভান্ডার।
পরে শুনলাম এটি ইন্দোরের প্রসিদ্ধ মিষ্টির দোকান। এই দোকানের সব মিষ্টি হল বাঙ্গালী মিষ্টি। সবাই দেখি দহি শিখন্জি খাচ্ছেন। খুব ঘন দই দিয়ে তৈরী।
একটা কাপে দিলেও সেটা এত ঘন যে চামচ দিয়ে খেতে হচ্ছে। ওই এক গ্লাস খাওয়া মানে লাঞ্চ হয়ে যাওয়া। মালিকের সঙ্গে আলাপ হল। একশ বছরের পুরানো দোকান। পিছনের ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট ফটো দেখিয়ে বল্লেন
রাজওয়াড়ার সেই হোলকার প্যালেসের গেট থেকে পাঁচশ মিটার এগিয়ে এলে ব্যাস্ত টিজয়েন্টের একপাশে হল কৃষ্ণাপুরম ছত্রী।
মারাঠা রীতির ছত্রী আসলে হল কোন বিশিষ্ট মৃত ব্যাক্তির স্মরণে তৈরী সেনোটপ বা চারিধার খোলা ছাদযুক্ত কারুকার্যমন্ডিত একটি স্থাপনা। পিছনদিকে একটা নদী শহরের মধ্যে দিয়ে বয়ে চলেছে। এর নাম হল সরস্বতী। হোলকার রাজপরিবারের কৃষ্ণাবাই হোলকার যিনি মহারাজা যশোবন্ত রাও হোলকারের (১৭৯৯-১৮১১) উপপত্নী ছিলেন স্মৃতির উদ্দেশে তৈরী হয়েছিল ১৮৪৯ সালে। পাথরের গায়ে মারাঠা স্টাইলের সুন্দর কারুকার্য।
এর পাশে আরো একটি ছত্রী। দুইটির মন্দিরের স্টাইলে সুউচ্চ চূড়া। দূর থেকে চোখে পড়ে। সিঁড়ির দুইদিকে দ্বারপালের মূর্তি পাথরে খোদাই করা। সিঁড়ি বেয়ে উঠে একটা মন্দিরও চোখে পড়ল। চত্বরের থামগুলোও নানাররম ডিজাইন ও দেবদেবীর মূর্তির নকশা করা। মিনিট পনের ঘুরে বেরিয়ে এলাম। এখান থেকে পাঁচ কিমি দূরে হল লালবাগ প্যালেস। অটো আমাকে নামিয়ে দিল লালবাগ প্যালেসের সামনের রাস্তার উপর। গেটটা বেশ রাজকীয়।লোহার গেটে কলোনিয়াল পিরিয়ডের সিম্বল লাগানো।
এটাকে ‘কোট অফ আর্মস’ বলে। ব্রিটিশ আমলে সব করদ রাজ্যের জন্য আলাদা আলাদা ‘কোট অফ আর্মস’ ছিল। ভিতরে ঢুকে অনেকটা হেঁটে পৌছান গেল লালবাগ প্যালেসে। বেশ মেঘ করেছে। দুই পাশের গাছের ডাল
এসে রাস্তার উপরে সবুজ চাঁদোয়া সৃষ্টি করেছে। ২৫/- টিকিট কেটে ভিতরে ঢুকলাম। এই প্রাসাদ তৈরী শুরু হয়েছিল উনবিংশ শতাব্দীর শেষদিকে আর নির্মানকার্য শেষ হয় ১৯২৬ সালে। তবে কালের অমোঘ নিয়ম মেনে প্রাসাদটি, বিশেষত তার ইন্টিরিয়ার ডেকোরেশন, মূল্যবান গালিচা ও চিত্রকলা জরাজীর্ন হয়ে পড়েছিল। ২০১৭ সালে এমপি আর্কিওলজি ডিপার্টমেন্ট ও ওয়ার্ল্ড মিউজিয়াম ফান্ডের সহযোগিতাতে এর রেস্টোরেশন সম্ভব হয়েছে। এখন ভিতরের শিল্পকলাসমূহ ঝকঝকে অবস্থায় দৃশ্যমান।
হোলকার রাজপরিবারের তুকাজি রাও হোলকার এই প্রাসাদে থাকতেন ১৯৭৮ সালে তার মৃত্যুর আগে পর্যন্ত। ভিতরে ঢুকে যেটা নজর কাড়ল সেটা হল ইউরোপিয়ান স্থাপত্য ও ডেকোরেশানের প্রাধান্য।প্রথমেই পড়ল ব্যাঙ্কোয়েট হল।
থামগুলোর মার্বেলের চাকচিক্য দেখে বোঝা গেল, এগুলো ইটালিয়ান মার্বেল। বিল্ডিংএর মধ্যবর্তী অংশে পড়ল লম্বা টানা বলরুম। কাঠের মেঝে।
লেখা আছে দেখলাম মেঝেটা স্প্রিং লোডেড, যাতে নাচকরার সময় রীদম ভাল আসে। বাকী সময় এখানে ব্যাডমিন্টন খেলা হত। একটা বিশাল বাঘের পুরো বডি ট্যাক্সিডার্মি করে রাখা। বলরুমের দুইদিকের বারান্দার পাশে পরপর ঘর কোনটা মিটিং রুম, কোনটা ওয়েটিং রুম, লাইব্রেরি। একটা ইন্ডিয়ান ডাইনিং হল ও একটা ওয়েস্টার্ন ডাইনিং হল দেখলাম। ভারতীয়টাতে প্রথাগতভাবে বসে খাওয়ার ব্যবস্থা।
একটা পুরানো আমলের লিফ্ট দেখা গেল।বিল্ডিংটা দোতলা। তবে দোতলা দর্শকদের জন্য খোলা নয়। সবচেয়ে সুন্দর দুটো হলঘর দেখলাম একটা হল ক্রাউন হল বা রাজদরবার
এবং তার ঠিক উল্টোদিকে ওয়েটিং হল। ভিতকে ঢোকা নিষেধ। দরজার পাশ থেকে দেখতে হল। ইনফ্যাক্ট সব রুমই বাইরে থেকে দেখার ব্যবস্থা। কার্পেট, ঝাড়লন্ঠন, সোনালী জলের অর্নেটেড দেওয়াল ইউরোপিয়ান স্টাইলের স্বাক্ষর বহন করছে।
সবচেয়ে চোখে যেটা ভাল লাগল, সেটা হল ছাদ জুড়ে ফ্রেসকো। থীমটা মনে হল ডানাওয়ালা এঞ্জেল, যা অনেক ব্যাসিলিকা বা চার্চে দেখা যায়। প্যালেস দেখা শেষ। বাইরে বেরিয়ে দেখি বিশাল বাগান।
এক কোনে রাণী ভিক্টোরিয়ার স্ট্যাচু। বেরিয়ে এলাম। হোটেল ফিরতে অটো চাইল দুইশ টাকা। লোকাল একজনকে বাসের কথা জিজ্ঞাসা করে বাসের হদিশ পেলাম। ১৫ টাকাতে হোটেল ফিরে এলাম। পার্থ একটু আগে পৌঁছেছে। ও বেরোল আমার সার্কিটটা দেখতে। আমি রেস্ট করলাম। ঠিক হয়েছে সন্ধ্যেবেলা আমরা বেরোব খেতে ‘ছাপ্পান’ বলে একটা জায়গায়। এটা হল ইন্দোরের সবচেয়ে পপুলার ফুডজয়েন্ট। ছাপ্পান্নটা নানা ধরণের স্ন্যাকসের দোকান। বিকালের দিক থেকে দোকানগুলো খোলে।
আমাদের হোটেল থকে ছাপ্পান হল ৬/৭ কিমি। সামনের বড় রাস্তার মাঝখানে করিডোর দিয়ে বাস যাচ্ছে। মেট্রোস্টেশনের আদলে স্টপেজ থেকে টিকিট কাটতে হয়। পৌঁছে গেলাম ছাপ্পানে।
অনেক খুজে পেতে আমরা খেলাম সাবুর খিচুড়ি আর রোল।
কাছেই দেখি খুব ঢাক-ঢোল বাজছে। কাছ যেতে দেখলাম সুন্দর সুন্দর ঝাঁকি সাজানো হয়েছে।
পাশে এক অর্গানাইজারকে জিজ্ঞাসা করে জানলাম প্রতি বছর এইদিনে বাল্মিকী সমাজের উদ্যোগে এখান থেকে ঝাঁকি বেরিয়ে যাবে পালাসিয়া অব্দি।
আজ ছপ্পানে খেতে গিয়ে ডাবল ধামাকা। একবার পার্থ কালপ্রিট, আরেকবার আমি! ফলে শোধবোধ! ছপ্পনে একটা দোকানে বসে খাচ্ছি। ব্যাকপ্যাকে জলের বোতল। সামনের সীটে ব্যাগ রেখে খান বল্ল যাওয়ার সময় মনে করে নিতে হবে। যথারীতি ছপ্পান থেকে বেরোবার সময় আমার চোখে পড়ল খানের পিঠে ব্যাগ নেই। এবার দৌড় দৌড়। শেষ পর্যন্ত ব্যাগ অক্ষত পাওয়া গেল। এবার আমার পালা। হোটেল থেকে বাসে এসেছি পনের টাকা ভাড়ায়। অটো আড়াইশ টাকা চাইছিল। এই বাস চলে রাস্তার মধ্যে দিয়ে। দুইদিকে রেলিং। এক কিমি দূরে দূরে স্টপেজ।
মেট্রোর মত বাইরে বাসস্টপে টিকিট কাউন্টার। আমার কাঁধের ছোট পাউচে যৌথ টাকা। আজকেই একেকজন দুই হাজার দিয়ে ফান্ড বানিয়েছি। বাস আসছে দেখে পার্থ দৌড়ে গিয়ে বাসের দরজা ধরে দাঁড়িয়ে আছে। কোনমতে টিকিট কেটে উঠেছি। বাসে বসে কাঁধের পার্সে হাত ঢুকিয়ে দেখি চিচিঙ ফাঁক। ভাঁড়ার শূন্য। নিশ্চয়ই টাকা পড়ে গিয়েছে টিকিট কাটতে গিয়ে। কিংকর্তব্যবিমূড় হয়ে, খান বল্ল বাস থামাতে। ড্রাইভার আবার নেক্সট স্টপের আগে নামাবে না। পরের স্টপে ফিরতি বাসে উঠে শেষ চেষ্টার জন্য রওয়ানা হয়েছি। পকেটে হাত দিয়ে মোবাইল ঠিক আছে কিনা দেখতে গিয়ে কাগজে সুড়সুড়ি লাগল। বার করে দেখি হারানিধি! ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল। আবার উল্টোদিকের বাসে চেপে ফিরে কুলপি খেয়ে মধুরেণ সমাপেয়ত হল! আমাদের ইন্দোর ভ্রমনের সমাপ্তি। কাল সকালে ব্রেকফাস্ট করে বেরোব ধার এর উদ্দেশ্যে।































































খুব ভালো লিখেছিস। খুবই interest নিয়ে পড়লাম।
ReplyDelete