ইটিং ফার্স্ট, মিটিং সেকেন্ডারি

ইটিং ফার্স্ট, মিটিং সেকেন্ডারি

এ্যলামনির মধ্যমনি পীযূষ-শ্রাবণী এবারের মিটিংএর হোস্ট। নয়ডা থেকে প্রায় পঞ্চাশ কিমি দূরে নবনির্মিত দ্বারকা এক্সপ্রেস ওয়ের পাশে নূতন স্যাটেলাইট টাউনশিপ। গুরগাও হল মিলিয়েনিয়াম সিটি। চল্লিশ বছর পরে তৈরী এই সাবসিটি গুরগাওকে ছাড়িয়ে যাবে নিশ্চয়ই, কারণটা হল প্রযুক্তি দৃষ্টিভঙ্গীর আধুনিকীকরণ। আজকাল গুগল  ম্যাপ লাগিয়ে গাড়ী চালানো অভ্যাস। তবে আজ আমার রোল ড্রাইভারের নয়, নেভিগেটরের। ডোর টু ডোর সার্ভিস। কার্টসি প্রদীপ্তদা। ডানদিকে এয়ারপোর্টের প্লেনের ওঠানামা দেখতে দেখতে একটা জায়গায় পৌঁছে দেখি রাস্তা দুদিকে দ্বিধাবিভক্ত।


পীযূষ অবশ্য লিখেছিল এক্সিট ওয়ান লেখা কাট-টা নিতে হবে। ইনপুট বেশী হলে আমার মাথার ট্যাক্সেশন বেড়ে যায়। পীযূষ লিখেছিল ম্যাপ, রাস্তা উপর নীচে হওয়াতে গুগলের বুদ্ধি গুলিয়ে গিয়ে গোলমাল করে ফেলে। এখানে অবশ্য বাঁদিকের রাস্তাটা যদিও ম্যাপে দেখাচ্ছে, কিন্তু এক্সিট ওয়ান লেখা নেই। নিজের বুদ্ধি খাটাই। এরপর সিরিজ অফ মিসটেক।  ডানদিকের এলিভেটেড রোডটাকে দ্বারকা এক্সপ্রেস ওয়ে ভেবে এগিয়ে যাই।

তিন-চার কিলোমিটার দূরে দেখা গেল চন্ডীগড়/পানিপথ লেখা সাইনবোর্ড। বুঝলাম নেভিগেটরের পরীক্ষায় ডাহা ফেল। প্রদীপ্তদা বল্লেন - আগে দেখা যাচ্ছিল ১৯ মিনিট এখন তো চল্লিশ মিনিট দেখাচ্ছে। গাড়ী রিভার্স করে আবার পুরানো জায়গাতে পৌঁছে এগোন গেল।

সোসাইটির গেটে পৌঁছে মনে হল যুদ্ধ জয় করে এলাম। বিজন এতক্ষণ চুপচাপ পিছনে বসে ছিল। এতক্ষণে মুখ খুলে সন্দেহ প্রকাশ করল- “হ্যাঁ রে, ফেরার সময় চিনে যেতে পারবি তো?” কথায় আছে কষ্ট করলে কেষ্ট মেলে। আমাদের ধর্মেও আছে ঠাকুরের কৃপাদৃষ্টি বর্ষিত হবে যখন কষ্ট করে মন্দিরে যাওয়া হবে। কেদারনাথ, অমরনাথ এই ধারণার প্রমাণ করে। আমি অবশ্য ঠাকুরের কৃপাদৃষ্টিতেঅনাথ’, কারণ পায়ে হেটে কষ্ট করে দশ মাইল দূরের মন্দিরে যাওয়ার পক্ষপাতী আমি নই। তবে এই রাস্তা গুলিয়ে গোলযোগের উত্তম ফলপ্রাপ্তি  উপলব্ধি করলাম কিছু পরে যখন ফিসফ্রাইএ কামড় দিলাম।

বাকী ডিশ গুলোতে পরে আসছি। তবে জানেনই তো মরনিং শোজ দ্য ডে।  

অমলেন্দুদা আগেই এসেছেন। আশির উপর বয়েসে মেট্রোতে করে এসেছেন। সাধুবাদ জানাই। সঙ্গে নীল ঝোলা।


এ্যলামনির শিশু বয়েস থেকে সঙ্গে আছেন। সত্তর দশকের শুরুতে কনটপ্লেসের বাইলেনে মিটিং হত। তখন যিনি প্রেসিডেন্ট ছিলেন তিনি পাশ করেছিলেন ১৯২৩ সালে। ভেবে দেখি আজ ২০২৪ সাল। মানে শতবর্ষ আগের ব্যাপার। রবি ঠাকুরের কবিতা মনে পড়েআজি হতে শতবর্ষ পরে/কে তুমি পড়িছ বসি আমার কবিতাখানি/কৌতূহলভরে-- হতেই পারে আমার এই লেখা ২১২৪ সালে এ্যলামনির মিটিংএ পড়া হবে। ভবিষ্যত জানা নেই, তাই স্বপ্ন দেখতে দোষ কি! আপাতত নীল ঝোলার রহস্য উন্মোচনে ব্যস্ত হই। দীপকদা এসেছেন সস্ত্রীক। একটু পরে দুলালদা এসেছেন লাঠিহাতে। দীপকদা কুশল বিনিময়ের পর জিজ্ঞাসা করছেন -বেটারহাফ কেন এলেন না। দুলালদা বল্লেন মন্দিরে পুজো আছে। আজ থেকে গুরুপূর্ণিমা লাগছে। পাশ থেকে ওভার হিয়ার করছি শাক্ত মতে এটা হয়, বৈষ্ণব মতে অন্যরকম। ভক্তিযোগের অলিন্দে ঢুকে পড়েছেন দুজনেই। পূজা-আর্চায় আমার জ্ঞান দুর্গাপুজার অঞ্জলির মধ্যেই সীমিত। চিত্ত অস্থিরমতি, ঠ্যাংটাও নাচতে থাকে অঞ্জলির সময়। এই বয়সে অনেকেই ধ্যান করেন শুনেছি। চোখবন্ধ করে দুইএকবারওং মনিপদ্মে হুমবলে মিনিটখানেক বসার চেষ্টা করেছি। আজকাল শুনছি বুদ্ধের পাদপদ্মে বসে শান্তির বাণী শোনা একটা নূতন ট্রেন্ড। চোখ বন্ধ করলে ট্রেনের জানালায় বসে দেখা দৃশ্যাবলীর মত সব ঘটনা ভেসে আসে। গুরুপূর্ণিমা কথাটা শুনেছি বটে, তবে বিজ্ঞমহলে জিজ্ঞাসা করতে ভরসা পাই না। গুগল ঘেঁটে জানা গেল এদিনে গুরুকে স্মরণ করতে হয়। পাশেই পার্থদা দাঁড়িয়ে।ঢাক-ঢাক, গুড়-গুড় না করেই বলি আমার কোনগুরুভার নেই। নিশ্চিন্ত। আমি নিজেই নিজের গুরু! অফিসেও সবাই বলত - রায়সাব খুদই খুদকা বস হ্যায়! পার্থদা অবশ্য আমায় শুধরে দিলেনতোমার গুরু হল মোবাইল। বিশ্বগুরুও বলতে পার!” ভেবে দেখি কথাটা ঠিক। সকালে চা খেয়েই বেরিয়েছি। পীযূষ শ্রাবণী পারফেক্ট হোস্ট। দক্ষিণ হস্তের সদ্ব্যব্যবহারের জন্য এলাহী ব্যাপার। বাঙালীর অন্যতম প্রিয় স্ন্যাক্স হল ফিস ফিঙ্গার মোচার চপ। সি আর পার্কের ক্যাটারার। খাওয়া-দাওয়ার মসৃন রাস্তাপথের শুরুটা একশ মিটার স্প্রিন্টারের স্পিডে এগোই। গোটা চারেক ফিসফিঙ্গার আর দুটো মোচার চপ খেয়ে রেস্ট নিই। বাসা ফিশের ফিশি কারবার নয়, রীতিমত অভিজাত ভেটকি। ভেটারেন ভেটকির স্বর্গীয় স্বাদের জগত থেকে বাস্তবে ফিরে আসি। অমলেন্দুদার আধ্যাত্বিকজ্ঞানের কিঞ্চিত প্রসাদ পাই। আমলেন্দুদা বলছেনএই যে মনে কর কেউ তোমায় নাম জিজ্ঞাসা করল, তুমি নাম বল্লে বা লিখলে তোমার ব্রেনে সিগন্যাল গেল, ব্রেন জানাল নামটা, তোমার নার্ভের মধ্যে দিয়ে মোটর এ্যকশান হল। তারপর মাসলের শক্তি নিয়ে লিখলে। এখানে তুমি কিছু নয়। তুমি কর্মের ধারক। এক অদৃশ্য শক্তি তোমাকে দিয়ে করিয়ে নিচ্ছে।সামান্য নামের পিছনে এরকম অসমান্য থিয়োরি শুনে ঘাবড়ে যাই। ঠাকুরেরনাম-গানএর পিছনে কি কারণ বিরাজ করছে সেটা আরো কমপ্লেক্স থিয়োরি, এটা বোঝা গেল। সংসার তরণীভোলেবাবা পার করেগাএই মুক্তচিন্তায় বিশ্বাস রাখাই শ্রেয়। 

এখনও সবাই এসে উঠতে পারে নি। মিটিং এর জন্য সংরক্ষিত টেবিলের চারপাশের চেয়ারের মুখ ঘুরিয়ে ফিসফিঙ্গার মোচার চপ সফ্টড্রিঙ্কস সহযোগে গুলতানি চলছে।শ্রাবণীর ছেলে অবশ্য এই হট্টোগোলের মাঝে মন দিয়ে কার্টুন আঁকছে। 


রামকৃষ্ণ ঠাকুরের ভক্ত অনেকেই। এরা অনকেই নরেন্দ্রপুরের ছাত্র ছিলেন। গুরগাওএর রামকৃষ্ণ মিশনের সিভিল ডিজাইন দুলালদা করেছেন। ওখানের মহারাজের নামটা কিছুতেই উচ্চারণ করতে পারছিলাম না। শ্রাবণী বুঝিয়ে দিল সন্ত আত্মা দুটো মিলে সন্তাত্মা মহারাজ। বাংলা ব্যাকারণ অনুযায়ী সন্ত যে আত্মা, এটা হল কর্মধারয় সমাসের উদাহরণ। 

মিটিং শুরু হল ১২-৩০ নাগাদ। সর্বসম্মতিক্রমে নূতন একজনকে ইসি মেম্বার করা হল।


এর নাম শুভাসিশ। লেডিস ফার্স্ট হিসাবে ইনার অর্ধাঙ্গিনী মেম্বার ছিলেন। আটকলা ছিল, এবার ষোলকলা পূর্ণ হল। নূতন নবীন প্রেসিডেন্ট প্রাণ চাঞ্চল্যে ভরপুর। নবীনকে সাহায্য করতে পাশে প্রবীন দীপক বাসুদা। দুইজনের মধ্যে কানাকানি।

 এ্যনুয়াল সাবস্ক্রিপশনের আলোচনা চলছে। একটা মেম্বার শিপ ফি একশ টাকা ধরা আছে। এ্যনুয়াল সাবস্ক্রিপশন কম্পালসরি কিনা সেটা নিয়ে দ্বিমত। জিজ্ঞাসা করি যদি কেউ মেম্বারশিপ নিয়ে এ্যনুয়াল সাবস্ক্রিপশন দিল না, তবে কি সে সব ফাংশানে আসতে পারে। কেউ মত দিলেন এটাকে তাহালে এ্যনুয়াল সাবস্ক্রিপশন না বলে এ্যনুয়াল কনট্রিবিউশন বলা হোক। তাতে অবশ্য মূল প্রশ্নের সমাধান হল না। এবারে প্রোপোসাল এল নবীন এবং প্রবীনদের পকেটের রেস্ত কম, তাই তাদের এ্যনুয়াল সাবস্ক্রিপশন কম রাখা হোক। তিন রকম স্ল্যাব। ব্রেন স্টর্মিং শেসনে ব্যাপারটা ঝুলে রইল। তারপর পাস্ট পারফরমেন্স এনহ্যান্সমেন্ট করে চাঁদা তোলার ব্যাপারটা শুরু করা হোক এরকম এক মতবাদও চলে এল। ফলে আপাতত এটা কোল্ড স্টোরেজে রাখা হল। শুরুতে নূতন ইসি কমিটির মেম্বারদের সেল্ফ-পরিচিতি দেওয়ার দস্তুর আছে। ডি এন বাসুদা জানালেন প্রথম প্রথম উনি শিবপুর এ্যলামনিতে যেতেন, কারণ অফিসে তারাই সংখ্যা গরিষ্ট ছিল। দুই কলেজের নামের শেষে পুর আছে, তাই একে অপরের পরিপূরক বলা যায়। পার্থদা বল্লেন অরুণদার কথা। ১৯৪৫ মেক্যানিকাল। দীর্ঘদিনের এ্যলামনির প্রাণপুরুষ। একবার কাজের চাপে মিটিংএ যেতে পারবেন না বলে জানালেন। বসের (তিনি যাদবপুরের) কাছে ফোন গেল, মিটিংএ যাওয়াও সহজ হয়ে গেল। পার্থদাও এ্যলামনির ভেটারেন। একবার পোস্টিং নিয়ে গিয়েছিলেন নর্থইস্টে। সেমিনার হবে কি না হবে জানতেন না। নিজেই স্বতপ্রবৃত্ত হয়ে ১০,০০০/- চাঁদা তুলে দিল্লিতে পাঠিয়ে দিলেন। এমনটাই ছিল এ্যলামনির প্রতি ভালবাসা। প্রদীপ্তদার চাকুরিজীবনের শুরুতে ট্রেনিং হয়েছিল হলদিয়াতে। যাদবপুর এ্যলামনির নাটকের সঙ্গে যুক্ত হয়ে রিহার্সাল চলছে, দুম করে পোস্টিং হয়ে চলে যেতে হল দুর্গাপুরে। নাটকের দিনে যাতে হলদিয়া যেতে পারেন তাই দুই প্রোজেক্টের এ্যলামনির সহয়তায় ট্যুর জুটে গেল। প্রদীপদা সসন্মানে আবার মেম্বারলিস্ট তৈরীর ভার পেলেন। গতকাল ইন্টারনেট ক্র্যাশের পর হার্ড কপির মাহাত্ব্য বেড়েছে। তাই প্রদীপদার গুরুত্বও বাড়ল।

নানা ইভেন্টের রূপরেখা আগেই তৈরী ছিল। এবার প্রত্যেকটির কোঅর্ডিনেটার আইডেন্টিফাই করা হল। বিড়ালের গলায় ঘন্টা বাঁধা অর্থ্যাত সেমিনারের দায়িত্ব মানবদার হাতে। এই ইভেন্ট থেকে মা লক্ষীর কিঞ্চিত কৃপাদৃষ্টি এল্যামনি পেয়ে থাকে। আশি নব্বই দশকে বেশ বড় লেভেলের সেমিনার হত, সেন্ট্রাল মিনিস্টাররা চীফগেষ্ট হয়ে আসতেন। সেই রামও নেই, সেই অযোধ্যাও নেই! এখন অবশ্য রামমন্দির আছে।মন্দিরে গো-মাতার সেবাঅথবাপশু ক্লেশ নিবারণী সমিতিটাইপের টপিক হলে মন্ত্রীরা আসতে পারেন চীফ গেস্ট হয়ে। এটা জোরগলায় বলা গেল না। ভক্তরা ভোকাল দলে ভারী।


এ্যমাজনে গরুর মশারী বিক্রি হচ্ছে। একটাহবনববলে ইভেন্টের নাম শুনলাম। ইয়াং ব্রিগেডের বেশী উৎসাহ দেখা গেল। এটাও গুগল করতে হল। এটা হল ইনফরমাল শোসাল মিক্সিং। বোঝা যাচ্ছে ম্যান ইজ সোশাল এ্যনিমাল। নূতন ইভেন্ট যুক্ত হল। খিচুড়ি ইলিশ। আমার মতে নাম হওয়া উচিত ইলিশ-উৎসব। তখনও বাংলাদেশে পদ্মা সেতু হয় নি। সাইট (দক্ষিণ বঙ্গের বাগেরহাট ডিসট্রিক্ট) থেকে ঢাকা যেতে মাওয়া ঘাট দিয়ে স্টিমারে পদ্মা পার হতে হত। বর্ষাকালে পদ্মার ইলিশ ভাজা গরমভাতে ইলিশভাজার তেল কাচালংকা সহযোগে খেয়ে মনে হত অমৃত। নববর্ষে পান্তাভাতে ইলিশের চল ছিল। খিচুড়ির টেষ্ট আলাদা। সেটার সঙ্গে ইলিশের টেস্ট বেমানান। 

হেরিটেজ ওয়াকটা আমি ইনহেরিট করলাম, গতবারে নাকি ঠিকঠাক নামাতে পেরেছি, এরকম একটা ধারণা লোকের মনে রয়েছে।সবচেয়ে ভাল কমপ্লিমেন্ট পেলাম খুদে গোগলের কাছে


যখন সে আমার কাছে জানতে চাইল আবার কবে হেরিটেজ ওয়াক হবে! 
নিজের মনোবলও বেড়েছে, কারণটা, আমার কাজের ব্যাপারে বেটার হাফের যা ধারণা, তার থেকে আমি কিছুটা বেটার নিশ্চয়ই, পাবলিক এ্যসেসমেন্টে সেরকমই লাগছে। আমার মত দীর্ঘ সংসার জীবনে অভিজ্ঞ অনেকেই ভাবেন ন্যাড়ার একবারও বেলতলায় যাওয়া উচিত না। এবারে আমাদের নবীনমুখ শুভ্র সেটা আগেই উপলব্ধি করেছে। বাংলা অনার্স পড়ার সময় সহপাঠিনীদের থেকে প্রথম পাঠ নিয়ে আপাতত দোটানায় আছে। এরকমটা মনে হওয়ার কারণ দশ বছর চাকরি করেও বেলতলার সাহস সঞ্চয় করতে পারে নি! এবারে এ্যলমনির ম্যাগাজিন বেরোনোর কথা হচ্ছে। শুভ্র কোঅর্ডিনেটর।

পা টিপে টিপে চলেছি। আমার নিজের সোসাইটি ২০ বছরের পুরানো। সোসাইটির মধ্যের রাস্তার ছাল-চামড়া উঠে গিয়েছে। আছাড় খাওয়ার চান্স থাকে। দোতলার ক্লাব থেকে একতলায় বাথরুমে যাব। ঝা-চকচকে টাইলস।


নিজের সোসাইটির রাস্তায় গর্তে পা পড়ে ঠ্যাং ভাঙার বিপদ, আর এখানে হল আধুনিক মসৃন টাইলসে স্লিপ করার চান্স। বিপদের ধরণটা এক কিন্তু নিমিত্ত দুই মেরুর। নিচে নেমে বাথরুম খুঁজছি। নব্য শিক্ষিতরা অবশ্য বাথরুম বলেন না। টয়লেট শব্দটাও উঠে গিয়েছে। সত্যিই তো ফ্যাশানদুরস্ত আধুনিকাদের মুখে টয়লেট কথাটা একদম বেমানান। হালফিলের প্রতিশব্দ হল ওয়াশরুম বা রেস্টরুম বা হিজ/হার। আমার মত অজ্ঞরা অবশ্য পাশে আঁকা স্কার্টের প্রোফাইল বা প্যান্ট-শার্টের ছবি দেথে বুঝে নিই। তলদেশের চাপ সামলে খুঁজে বেড়াই পরশপাথর। একজায়গায় লেখা চেঞ্জরুম।

একটু দূরে সুইমিং পুল দেখা যাচ্ছে। ভাবলাম এটা নিশ্চয়ই সুইমিং কস্টিউম চেঞ্জের ঘর। পরে সিকিউরিটির কাছে জানলাম এটাই হল আমার মত লে-ম্যানের মাইনাসের জায়গা। যাক অভিধানে আরেকপিস যোগ হল। 

অনেক ভোট অফ থ্যাঙ্কস দেওয়া হল হোস্ট কাপলকে। মিটিংএর পরিসমাপ্তি। সুচারুরূপে মিটিং কনডাক্ট করার জন্য ঋত্বিককেও ধন্যবাদ দেওয়া হল। মিটিং কন্ডাক্ট করার ধরণ দেখে বোঝা যায় পোড় খাওয়া লোক। 

এরপর দক্ষিণ হস্তের কাজ। মিটিংএর পর ইটিং। আমলেন্দুদারনামা’-বলীর কড়চাতে এখন সব কাজই কমপ্লেক্স এ্যলজেবরা লাগছে। খাবারের বহর দেখে চক্ষু ছানাবড়া। বরাভয় মুদ্রায় শুগারের পিলটাকে মুখে পুরে সুঘ্রানের এ্যপিলে সাড়া দিই।


মাছের মাথা দিয়ে ডাল, ভেটকির পাতুরি, চিকেনের ঠ্যাং নিয়ে তরিজুত করে বসি। খেতে খেতে শুনলাম, নিরামিষ পটলের ডালনা ভেবে যেটা ছেড়ে এসেছি, সেটাও চিংড়িযুক্ত আমিষ পদ। মাঝরাস্তায় উঠে ওটাও নিয়ে আসি।

চুপিচুপি জানাই লেভে পড়ে আরেকটা পাতুরি পাতে তুলে নিয়েছিলাম। এরপর মিষ্টিমুখ। শ্রাবণীর তৈরী ক্ষীর খেয়ে জমে ক্ষীর। এরপর রসগোল্লা, মিষ্টিদই, মিষ্টি পান, কোল্ড ড্রিংকস খেয়ে মধুরেণ সমাপেয়ত। সমবেত জনতা সাধুবাদ দিচ্ছে হোস্ট কাপলকে। আমার কাছে অনুরোধ এল লেখাতে যেন খাওয়াটা ঠিকভাবে রিফ্লেক্ট হয়। রান্নার উৎকৃষ্টতা সবগুলি খাবারের গুণগত মান দেখে বোঝা যায়। খাওয়ার মেনু সিলেকশনে নিঁখুত বাঙালিয়ানার পরিচয় ছিল।সি আর পার্কের ক্যাটারারের কার্ড নিলাম। পরে কাজে লাগবে।

এবার শ্রাবণীর বাড়ী দেখার পালা। ১২ তলায় বিশাল ফ্ল্যাট।


সাজানোতে গৃহিণীর চারুকলার প্রতিভার ছাপ স্পষ্ট।


শ্রাবণীর নিজের আঁকা বেশ কিছু পেন্টিং দেখলাম। ধ্যানমগ্ন বুদ্ধের এক মূর্তি রাখা। কান দুটো বেশ লম্বা মনে হল।

গুরুপূর্নিমাতে আমার গুরুকে স্মরণ করি। কেউ বলেন জগতের লোকের দুঃখ শোনার জন্য বড় কান, অন্য থিয়োরি হল প্রথমজীবনে রাজপুত্র ছিলেন বলে বড় দুল পরে এই হাল। আমার থিয়োরিদেবদত্তহিসাবে হল আমার প্রতিপক্ষ হিসাবে কানমলা খেয়ে লম্বকর্ন! আজকের মিটিংএ এক তরুণীর বড়সড় কানের দুল দেখলাম। দূর থেকে হীরে লাগছিল। চক্ষুকর্ণের বিবাদ ভঞ্জন করতে ফটো তুলে ফেলি। 

যেটা বেশী খুশী করল সেটা হল চারটে বড় বড় ব্যলকনি। রান্নাঘরটাও বেশ বড়।

দুটো গ্যাস সিলিন্ডার
 রাখা। নয়ডাতে অনেকদিন হল পাইপড গ্যাস। এবারে ফেরার পালা। প্রফেসর কস্তুরী ম্যাডাম জানালেন আমার লোদি গার্ডেনের উপর করা ভিডিওটা খুব ভাল লেগেছে।

দুঃখ করলেন এতদিন দিল্লিতে থাকলেও সুব্রত নিয়ে যায় নি। নাকি বলে গাছপালা তো পার্কেই দেখা যায়, কষ্ট করে লোদি গার্ডেন কেন যেতে হবে। ম্যাডামের কাছে খবর পাওয়া গেল সুব্রত রেস্টুরেন্টে যেতে আপত্তি করে না। সুব্রত সামনেই হাঁটছিল। ডেকে বল্লাম লোদি রোডের ইশ্লামিক সেন্টারে করিমস আছে। এমবিয়েন্সও দারুণ। সুব্রত উৎসাহী হয়ে পড়ে। তখন বলি, পাশেই লোদি গার্ডেন আছে। খিদে বাড়াতে রেস্টুরেন্টে ঢোকার আগে অথবা খেয়ে হজম করতে লোদি গার্ডেনে এক চক্কর লাগিয়ে নেবে। 

এরপর সবাইকে টা-টা বাই বাই করে ঘরে ফেরার পালা।

দেবদত্ত

২৩/০৭/২৪


Comments

  1. বেশ ভালোই, তোর পেট পূজো ও যে বেশ ভালো হয়েছে বোঝা গেল ।আর যার যেদিকে নজর,flat এর interior decoration ও খুব সুন্দর।

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

ত্রিবেনী তীর্থপথে ও আরো টিটবিট

রবিঠাকুর ও কিছু হাসি মশকরা

A walk to explore Delhi’s lesser known monuments