টুকরো ঘটনা
টুকরো ঘটনা
আজ ২২শে জুলাই। মেট্রোতে এসে নেমেছি জনপথে। বাইরে বেরিয়ে সদ্যস্নাত দিল্লির সবুজরূপ দেখে চোখ জুড়িয়ে গেল।
আজকের গন্তব্য দেড় কিমি দূরে, অশোকা রোডে, ৯ নম্বর বাংলো। বেলা চারটে থেকে মিটিং এর সময়, মিটিং না বলে সৌজন্যমূলক সাক্ষাতকারও বলা যায়। এটা হল শ্যামা প্রসাদ মুখার্জি রিসার্চ ফাউন্ডেশনের অফিস। জনপথ দিয়ে বিএসএনএলের অফিসকে পাশে রেখে এগিয়ে যাই উইন্ডসর গোল চক্করে।
ওখান থেকে অশোকা রোড ধরি। ইন্ডিয়া গেটের হেক্সাগন থেকে রাস্তাটা (অশোকা রোড) বেরিয়ে প্যাটেল চক হয়ে গোল ডাকখানা গিয়ে শেষ হয়েছে। চির পরিচিত রাস্তা। সবসময় গাড়ীতেই ক্রস করি। এই রাস্তার উপরে আগে বিজেপির পার্টি অফিস ছিল। এখন বিশাল বাড়ী করে উঠে গিয়েছে। ইলেকটোরেট বন্ডের সদ্বব্যবহার। অশোকা রোড ধরে পায়ে হেঁটে এই প্রথম আসা। ফুটপাথের দুইপাশে অনেক জাম গাছ। এটা জামের সময়।
রাস্তা ভর্তি জাম। রাস্তার পাশে উঁচু রেলিংএর ধারে বৃষ্টির জলে ভেজা জাম পড়ে আছে। কয়েকটা তুলে খেলাম। সাইজ খুব ছোট। একটা ছেলে দেখি জাম বিক্রি করছে।
জিজ্ঞাসা করি এই জাম কি এখানের গাছের? ও বল্ল না, মান্ডি থেকে কিনে এনেছে। ২০০/- কিলোতে বিক্রি করছে। আর কিছুক্ষণ চলার পর মিনিট কুড়ির মধ্যে পৌঁছে গেলাম ৯ নম্বরে।
এখানে মিটিং আছে যাদবপুর এ্যলামনির সাথে ডাঃ অনির্বান গাঙ্গুলির। ইনি এই ফাউন্ডেশনের কর্তাব্যাক্তি।অনির্বান বাবু এবার লোকসভা নির্বাচনে যাদবপুর থেকে হেরে গিয়েছেন সায়নী ঘোষের কাছে। দুঃখ করছিলেন পেপারে লিখেছে “Anirban trounced by Sayani with margin of 2.5 lac vote. অনির্বানবাবু যাদবপুর থেকে ২০০০ সাল নাগাদ মাস কমিউনুকেশনে মাস্টার্স করে ২০১২ সালে ফিলোজফিতে ডক্টরেট করেছেন। বিজেপির এক থিঙ্ক ট্যাঙ্কও বটে। তার ঝুলিতে আছে নিজের লেখা বেশ কিছু বই।
মিনিট কুড়ি আগেই এসে গিয়েছি। মিটিংএর আগে পিছনের লনটা দেখতে গেলাম। সবুজ ঘাসের গালিচা।
তালগাছ একপায়ে দাঁড়িয়ে।
বারান্দার একদিকে ডাই করা পার্টির পতাকা। ইলেকশনের পর এখন অনাদরে পড়ে আছে।
দিল্লির বাংলোগুলি অনেকটা করে জায়গা নিয়ে। ঘরের সিলিংগুলো বেশ উঁচু। কলোনিয়াল এরাতে এসে গিয়েছি মনে হল।
আমার সঙ্গে আছে ঋত্বিক, অনুপ ও শুভ্র। খত্বিক আর্কিটেক্ট, অনুপ লাইব্রেরি সাইন্সে পিএইচডি করে জেএনইউতে পড়ায় আর শুভ্র আছে সাহিত্য কলা এক্যাডেমির গ্রন্থাগার বিভাগে। অনুপকে ধন্যবাদ জানাই এই ৪২ বছরের দিল্লিবাসে প্রথম লুটিয়েন দিল্লির কোন বাংলো পরিদর্শনের সুযোগ করে দেওয়ার জন্য। আমাদের মূল উদ্দেশ্য এ্যলামনির জন্য অনির্বান বাবুর মত রিসোর্সফুল লোককে কাজে লাগিয়ে সেমিনার সফলভাবে করার যাতে এ্যলামনির তহবিলে কিছু রেস্ত আসে।
আমরা বসেছি সোফাযুক্ত এক হল ঘরে।
সামনে শ্যামাপ্রসাদের বড় ছবি, পাশের ছবিটা চিনলাম না। একদিকে শেরাওয়ালি মাতার ছবি ভারতের ম্যাপে। সিংহের কেশরটা জবরদস্ত।
গির অরণ্যের রিকেটি সিংহের মত নয়! ইনাকেই ভারতমাতা বলা হচ্ছে। পতাকাটা লাল রংএর, সাইডের কিছুটা কাপড় কেটে ট্রাঙ্গুলার শেপ দেওয়া হয়েছে। এটা নাকি শিবাজী মহারাজের পতাকা।
নির্দিষ্ট সময়ের থেকে ছয় মিনিট লেটে এসেছেন বলে অনির্বান বাবু প্রথমেই ক্ষমা চেয়ে নিলেন। উনি বিজেপির সেন্ট্রাল কোর কমিটিতে আছেন। চেহারাতে একটা সৌম্যভাব এবং কথাবার্তাতে খুব সোবার। ওয়েস্ট বেঙ্গল পলিটিক্স নিয়ে অনেক কথা। ইনি অবশ্য বল্লেন ২০২৪ এ বিজেপি টোটাল ভোট ১৯ এর থেকে বেশী পেয়েছে। তৃণমূল ক্যাম্পেন করতে দেয় নি এবং গ্রামের দিকে গ্রাসরুট অর্গানাইজেশন ওদের ভাল সেটা স্বীকার করে নিলেন। বল্লাম লক্ষীর ভান্ডারে টাকা ঢুকিয়ে তৃণমূল ভাল ভোট টেনেছে। খত্বিক একসময় সিপিএম করত। লাল কার্ড ছিল, যা দেখিয়ে সেই আমলে নিখরচায় চিকিৎসা ও বাস রাইড হয়ে যেত। একবার জ্ঞানচক্ষু খুলতেই তরণী বাম থেকে ডানে ঘুরে গেল। আরএসএসের শাখায় গিয়ে নব্বইএর দশকে একই রুমে তিনটে টিভি কেন আছে জানতে চাওয়াতে, সেখানের সভ্যরা বলেছিলেন আমরা আগে বিদেশের খবর দেখি, তারপর দেশের। ওকে বোঝান হল জিওপলিটিক্সটাই আসল, দেশী পলিটিক্সে তো তোমরা সব দাবার বোড়ে, ক্রমাগত এক্সপ্লয়েট হয়ে চলেছ। সেই শুরু। ঘোরতর নাস্তিক থেকে মুন্ডিত মস্তক আস্তিক। কথাবার্তার মধ্যেই স্ন্যকস এসে গেল। খান্ডুই, কেক, পনির চপ, সঙ্গে কফি ও বিস্কুট। পনির চপটা বেশ ভাল হয়েছে বলাতে, আরেকপ্রস্থ চপ চলে এল। পেটের উপর একটু চাপ বাড়ল! এ্যলামনির পরের প্রোগ্রাম হল ইলিশ উৎসব। তাতে সাদর নিমন্ত্রণ দিলাম। এ্যলামনির জন্য সর্বরকম সাহায্যের আশ্বাস দিলেন। আসার আগে উপহারস্বরূপ তিনটে বই পাওয়া গেল। সত্যিই আতিথেয়তার তুলনা নেই।
বইসহ গ্রুপ ফটোও উঠল। ফ্রি জিনিস আমি খুবই পছন্দ করি। তবে মোবাইলের দৌলতে স্থির হয়ে বসে বই পড়ার অভ্যাস চলে গিয়েছে। তা ছাড়া বাড়ীতে স্থানসঙ্কুলান বাড়ন্ত।
আমি গতবছর একটা হেরিটেজ ওয়াক করিয়েছিলাম। এবারেও হবে। নূতন পার্লামেন্ট ভবন ঘুরে দেখা যাবে নাকি সেটা জিজ্ঞাসা করলাম। উনি পিএকে বলে দিলেন খবর নিতে।
ফেরার সময় অটো করে রবীন্দ্র ভবনে নামলাম।
এটা হল ললিত কলা একাডেমির অফিস। এর মধ্যেই শুভ্রর অফিস। এই চত্বরে আমি প্রায়ই আসি। পার্কিং লটে ফ্রিতে গাড়ী রাখা যায়। শুভ্র লাইব্রেরিতে নিয়ে গেল। সাহিত্য একাডেমির লাইব্রেরি। এদের ব্রাঞ্চ আছে কলকাতা ও চেন্নাইতে। ২৪টা ভাষার বই রাখা। মোট আড়াই লক্ষ।
এদের সঙ্গে ন্যাশানাল লাইব্রেরির কোন সম্পর্ক নেই। এরা ফি বছর সাহিত্যে একাডেমি পুরষ্কার প্রদান করেন। সাধারনত মার্চ বা ফেব্রুয়ারিতে হয় অনুষ্ঠান। আমি ওই সময় এই চত্বরে নাটক দেখতে আসি। তখন বার দুয়েক একাডেমির সাহিত্যসভায় এসেছি। একটা ১৯৬১ সনের মেট্রোপলিটান ম্যাগাজিন নিয়ে বসলাম। রবীন্দ্রনাথের জন্ম শতবার্ষিকী পালন হচ্ছে, তার খবর দেখলাম। ইনটারেস্টিং সব এ্যড। সেই বছর মন, ছটাকের পরিবর্তে ডেসিমাল সিস্টেম শুরু হয়েছে।
তারই ভলিউম মেজারের বিজ্ঞাপণ।
ক্যাপস্টান সিগারেট, এলআইসি, লিলি বার্লির এ্যড দেখলাম। একটা এ্যড খুব মজার লাগল।
ছোটবেলাতে দেখা কেরোসিন স্টোভের বিজ্ঞাপণ। অনেক সুখ্যাতি করে বলা হয়েছে রান্নাঘরে এবার দূষণমুক্ত পরিবেশ। মনে আছে, এই স্টোভে গোল করে বসান অনেকগুলো সলতে থাকত। মাঝে মাঝে সেইগুলোর মাথা কাচি দিয়ে কেটে সমান করতে হত। ছোটবড় থাকলে ইয়লো ফ্লেম বেরোত। লাইব্রেরির চমেম্বারশিপের ফর্ম নিলাম। কশান মানি (রিফান্ডেবল) ২০০০/-, পরেক বছর থেকে ১০০/- করে ফি বছর।
বেরিয়ে এসে মান্ডি হাউসের গোল চত্বর পেরিয়ে যাব বেঙ্গলি মার্কেটে। দেখি এক কিম্ভুত দেবদেবীর মাথা সহ কোন শিল্পকর্ম বসানো হচ্ছে সুন্দর লনের ভিতর।
আমরা এখনও দেবদেবীর উর্ধে উঠতে পারি নি।
তানসেন মার্গ দিয়ে হাঁটছি। ডানদিকে ত্রিবেণী কলা সঙ্গমের সামনে জটলা দেখে ঢুকে পড়ি।
ভিতরে আর্ট এক্সিবিশন চলছে। এক্রিলিকের ছোপ ছোপ কাজ।
এতে যে কি শিল্পকর্ম আছে বুঝি না। আর্টিস্টরা নিশ্চয় বোঝেন। আজকে বোধহয় ইনাগুরেশন। চা, স্যান্ডউইচ, শিঙ্গারা পাওয়া যাচ্ছে। আরেক রাউন্ড স্ন্যাকস খেয়ে বেরিয়ে আসি।
নাথ্থু বেকারিতে আমার ফেভারিট চিস বিস্কুট কিনে ফিরতি পথের মেট্রোতে উঠি। আজকের মত অভিযান শেষ।
দেবদত্ত
২৩/০৭/২৪


























খুব ভাল হয়েছে। ঝরঝরে তরতরে
ReplyDeleteDarun lekha hoechhe
ReplyDeleteদারুণ বর্ননা!!
ReplyDeleteNice read, as always, Debdatta-da! 😊
ReplyDelete