মুক্তধারায় মিলন

 


মুক্তধারায় মিলন

কাল এ্যলামনির এজিএম হয়ে গেল। এই প্রথমবার অনুষ্ঠিত হল দিল্লির বাঙ্গালীদের সংস্কৃতির পীঠস্থান স্বরূপ মুক্তধারা মঞ্চে। এই মঞ্চে পৃষ্ঠপ্রদর্শন সমীচীন নয়। তার উপর ফ্রি ডিনারের হাতছানি। আক্ষরিক অর্থে ফ্রি। কারণ এ্যলামনির সভ্যদের বার্ষিক চাঁদা শূণ্য। এরকমটা হবুচন্দ্র রাজার দেশে হয়ে থাকে শুনেছি, তবে বর্তমানে বহাল তহিয়তে যাদবপুর এ্যলামনিতে চলছে। মুক্তধারায় মুক্তচিন্তায় সামিল হতে বাড়ীতে প্রস্তুতি শুরু হল। আমি এখন মুক্তকচ্ছ মানুষ।  রবিবারের গুরুভোজের পর গুরুতর চিন্তা। মুক্তকচ্ছ মানুষের কাছা খোলাই থাকে, পরিচিতদের খালি টান দেওয়ার অপেক্ষা। প্যান্ট-শার্ট না পায়জামা-পাঞ্জাবী, দোটানায় থাকি! বকলমে বঙ্গ-সম্মেলন, তাই দ্বিতীয়টাই বেছে নেওয়া গেল। গলায় কালো মটরমালা। রুদ্রাক্ষের মালাও ছিল। ধর্মের দিকে বেশী বায়াস দেখানো ঠিক নয়। কয়েকদিন আগেভোলেবাবাকেস খেয়েছেন! সোনার চেন নেই। মধ্যবিত্ত জামাই হিসাবে একটি সোনার পাথর বাঁধান আংটি লাভ হয়েছিল। বৌএর নাম সুমিতা, মোনা হলে বলা যেত… “মোনা, লে আও সোনা!” গতস্য শোচনা নাস্তি! তা সেই আংটি মেয়ের বিয়ের সময় গলিয়ে ফেলেছি। পেনসেনহীন জীবনের টেনসেন কাটাতে পেনলেস স্যাক্রিফাইস। কথাতেও আছেযম, জামাই, ভাগ্না, কেউ নয় আপনা। তাই সোনার আংটি বাঁকা হওয়ার আগে পত্রপাঠ বিদায়! পরিচ্ছদের তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ জিনিষ হল টুপি। টু-প্রঙ্গ স্ট্রাটেজী। টাকটাও ঢাকা পড়ল, কাছা টানার সুযোগও দেওয়া গেল! কয়েকটা টুপি আয়নার সামনে ট্রাই করে কিন্নরী টুপিতেই মনস্থির করা গেল। হিমাচলে জায়গা বিভেদে বিভিন্ন ক্যাপ। রামপুর-বুশহরে একরকম, কুলুতে আরেক রকম, কিন্নর-লাহুল-স্পিতিতে অন্যররম। আমরা বঙ্গসন্তানরা বুদ্ধিমান, তাই টুপি পরানো মুস্কিল। খালি শীতে আমরা একত্রিত হই টুপি পরার জন্য। টু ডিজিটের মিনিমাম টেম্পারেচারে ম্যাঙ্কি ক্যাপ পরে হ্যাঁচ্চো হ্যাঁচ্চো করে বাড়ী মাথায় তুলি।


আমার এই কিন্নরী টুপির পিছনে ছোট্ট গল্পটা বলে নিই। কয়েকদিন আগে হিমাচলে বেড়াতে গিয়ে ছিলাম কল্পা-তে।

কল্পনার হিমশিখর যেন হাতের নাগালের মধ্যে। হোটেলের একটা জানালা দিয়ে আপেল বাগান, অন্যটা দিয়ে উত্তুঙ্গ পর্বতশিখর। মনে পড়ল যোশীমঠে পোস্টিংএর সময় আমার এক জুনিয়ার কলিগ কিন্নরের বাসিন্দা কুলদীপ নেগি বলেছিল,”স্যার , আমাদের ওখানের প্রাকৃতিক দৃশ্য, এখানকে টেক্কা দেয়।কথাটা কল্পাতে এসে সত্যি মনে হল। আমার ভোডাফোন মৃত। অর্ধাঙ্গিনীর এয়ারটেলেরহটস্পটনিয়ে কাজ চালাচ্ছি। অন্যান্যবার ঘোরাঘুরি কেসে সকাল হলে বেরিয়ে পরি বাইরের আস্বাদ নিতে। এবারে হটপ্রপার্টি হটস্পটের কল্যাণে কোল্ডস্টোরেজে, মানে লেপেই লেপটে আছি! কুলদীপকে ম্যাসেজ করে জানাই আমি এখন কল্পাতে। কুলদীপ ফোনে জিজ্ঞাসা করে কতক্ষণ আছি। বল্লাম একটু পরে বেরিয়ে পড়ব টাবোর উদ্দেশে। একটু পরেই দেখি এক ভদ্রলোক ঝোলাসমেত উপস্থিত। অভিবাদন জানিয়ে নিজের পরিচয় দিলেন কুলদীপের ব্রাদার-ইন-ল।

হিমাচলি আতিথেয়তার নিদর্শনস্বরূপ কর্তা-গিন্নীর মাথায় উঠল এই টুপি।

সঙ্গে আপেল থেকে বানানো লোকাল ড্রিংকস এবং রাজমা। গাছে আপেল নেহাতই ছোট ছোট, নইলে ওটাও জুটত! টুপির মাথায় সাদা-নীল ফুল। ভেবেছিলাম কাগজের কিছু বালখিল্য ব্যাপার। কুলদীপকে ধন্যবাদ জানানোর সময় শুনলাম এটা অরিজিনাল ফুল, প্রসেস করে শুকনো করা হয়েছে। এই ফুল আবার কিন্নরে পাওয়া যায় না,

সুন্দরনগর/বিলাসপুর থেকে আসে। যাই হোক ফুলওয়ালা টুপি পরে ফুলবাবু হয়ে বেরোলাম। অর্ধাঙ্গিনী সাবধান করে দিল -আজ নাকি আমার কপালে মুরগী হওয়া আছে! হের হিটলারের মত হাতটাকে সামনে করে ফটোর জন্য পোজ দিলাম। 

মুক্তধারা হলের সুবিধা হল সামনেটা অনেকটাই মুক্ত। গাড়ী পার্কিংএর বিশেষ সুবিধা। ফ্রি ডিনারের মত ফ্রি পার্কিং! দিল্লীর আর কোথাও রাস্তার থেকে চওড়া পার্কিং স্লট আছে বলে মনে হয় না। 

সাড়ে পাঁচটা থেকে শুরু। সেইমত পৌনে পাঁচটায় বেরোলেই চলবে। চারটে নাগাদ বিজনকে ফোন করি, আমার সঙ্গে যাওয়ার জন্য। থাকে আমার কাছাকাছি ইন্দিরাপুরমে। বিজনের ঘড়ি মনে হল ঘোড়া। অলরেডি সে মেট্রোতে রাজীবচক পৌঁছে গিয়েছে। নিলাদ্রীদার যোগ্য উত্তরসূরী দেখছি।

হলের সিঁড়ির পাশে রবি ঠাকুরের হাফ বাস্ট। কবিবর একটু ঝুঁকে পড়েছেন মনে হল।


ঠিক মানানসই লাগছে না। উনিই তো লিখেছিলেন “চিত্ত যেথা ভয়শূণ্য, উচ্চ যেথা শির”। বাঙালীর আর দুই আইকন নেতাজী ও বিবেকানন্দর তেজোদ্দীপ্ত মূর্তির সঙ্গে মানানসই হওয়া উচিত বিশ্বকবির হাফবাস্ট।  একটু
 আগে যাওয়ার ফয়দা হচ্ছে, সবার সঙ্গে দুটো কথা বলার সুযোগ পাওয়া যায়। তবে আমার হ্যান্ডিক্যাপ হল নাম-“কি নামে ডেকে বলব তোমাকে”! আকাশ পাতাল ভেবে ফেলি, নেহাত চুল নেই বলে ছেঁড়ার উপায় নেই-নাম সহজে মনে পড়ে না। ছোটবেলায় নামতা নিয়েও একই কান্ড হত। ভাববাচ্যে কাজ চালাই। প্রদীপদা সিনিয়ার মেম্বার। চলন্ত বিশ্বকোষ। এ্যলামনির সবার নাম মুখস্থ। তাঁর অসংখ্য কাটাকুটিতে ভরা খেরোর খাতায় সবার নাম ঠিকানা লেখা। পাশেই মানবদা, কেজরীওয়ালের হাজতবাস নিয়ে আলোচনা। পক্ষে বিপক্ষে নানা সওয়াল। আগেই ফোনে জেনেছি প্রদীপদা জানিয়েছেন সদ্য নেদারল্যান্ডে ঘুরে এসেছেন, ডিউটি ফ্রীও বাড়ীতে মজুদ। ফ্রি জিনিষে হামলে পড়ার অভ্যাস আমার বরাবরের। অযাচিত হয়ে নেমন্তন্ন বাগিয়ে নিয়েছি। মানবদাকেও খবরটা দিই। আম আদমীর ফয়সালাটা না হয় সিঙ্গল মল্টের আসরে করা যাবে। মানবদাও লুফে নিলেন প্রস্তাবটা। একজন সিনিয়ার দাদার সঙ্গে আলাপ হল। উনি প্রথম এসেছেন। তাই নাম জানতে ইতস্তত করার প্রশ্ন নেই। উনি ৬২ সালে পাশ করেছেন।

সুদূর জম্মু থেকে এসেছেন শুধুমাত্র আজকের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে। সুরিন্দার গুপ্তাজির বয়স পঁচাশির কাছাকাছি। ওঁকে কুর্ণিশ না জানিয়ে উপায় নেই। আজকের ফাংশানের প্রথম পর্ব নূতন কমিটি গঠন। হলে বসতে না বসতেই হবু প্রেসিডেন্ট ঋত্বিক এগিয়ে আসা কাগজ-কলম সহ।

আমাদের মধ্যে মিল হল চকচকে টাক। বেশ কিছু দস্তখত দরকার। উৎসাহের সঙ্গে জানালাম রিটায়ারমেন্টের পরে সিগনেচারে কোন আপত্তি নেই। পিএসইউর চাকরীতে বেকায়দার দস্তখত, পরে গিয়ে নাকে খৎ দেওয়ার পর্যায়ে চলে যায়। সাইন করে লিখতাম -“ফর ইয়োর এনএ প্লিজ মানে সাইন আমি করে দিলাম বটে, নেসেসারি এ্যকশন তোমার হাতে। অর্থ্যাৎ তুমি যা ভাল বোঝ কর- আমি সাতে পাঁচে থাকি নাএটা জেনে রাখো। ইদানীং কালে অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছেনিজের ব্ল্যাঙ্ক চেকে সাইন ছাড়া যা কিছুতে সাইন করিয়ে নাও।  

একটু পরে রবিদা এলেন।


৬৪র ব্যাচ হলে কি হবে, মোটেই প্রান্তিক সূর্য নন। উৎসাহ কালারফুল পোষাকে টগবগে তরুনকেও হার মানান। আজ এসেছেন লাল পাঞ্জাবী পড়ে। রবিদা বলছিলেন ষাটের প্রথম ভাগের কথা। হেমচন্দ্র গুহর মত প্রখর ব্যক্তিত্বসম্পন্ন প্রফেসার আর দুটি দেখেন নি। চোস্ত সাহেবীয়ানা ছিল। ছাত্ররা তার কামরাতে ঢুকতে ভয় পেত। কলকাতা ছিল বেশীরভাগ মাল্টিন্যশানাল কোম্পানি টাটা/বিড়লার হেডঅফিস। রবিদা প্রথম চাকরি করেন EMCকলকাতায়। এরা ছিল ট্রান্শমিশন লাইনের কোম্পানি। অফিসে স্যুট-টাইএর চল ছিল। কলোনিয়াল ল্যিগাসীর শেষ রেশ। সেই পুরানো কলকাতার ঐতিহ্যকে এখনও ভুলতে পারেন নি রবিদা।দুলালদা বৌদির সঙ্গে দেখা। আমার বাড়ীতে আসব আসব করেও আসা হয় নি। দুলালদা এখন ব্যস্ত ইনকামট্যাক্স নিয়ে। বল্লেন সেই সময়ে তিনশ টাকা মাইনেতে চাকরীতে ঢুকেছিলেন। তখন পাঁচ-দশটাকা এদিক ওদিক করে জমাতেন। সেগুলো এখন মাইক্রোস্কোপ দিয়ে খুঁজে-পেতে ট্যাক্স ডিপার্টমেন্টে জমা দিতে হবে। ইয়াং ব্রিগেডের সত্যজিতকে দেখা গেল বাংলা ফন্টে বাঙালীর আবেগযুক্ত স্লোগানপূর্ন টি শার্টে।

এটা এক দিক দিয়ে ভাল। বাঙালীয়ানা বোঝতে ধুতি-পাঞ্জাবী পরার দরকার নেই, এরকম টি শার্ট যথেষ্ট। কাছায় টান পরার কোন অবকাশ নেই! মাছ-ভাত, ফুটবল, রসগোল্লা, বাঙালির সব নস্টালজিয়া টি শার্টে ফুটে আছে। দীপক বাসুদা আরেকজন সিনিয়ার মেম্বার। আমার লেখা টার্কি সিরিজটা খুব ভাল লেগেছে জানালেন। সিদ্ধার্থ চৌধুরিদার সঙ্গে অনেকদিন পরে দেখা। লেখার প্রশংসার পর বল্লেন - তুমি আশি নব্বই এর দশকে যখন এ্যলামনিতে আসতে তখন তো জানতাম না তুমি লেখালেখি কর। সবিনয়ে জানাই তখন ‘নোট’ কামাতে, নোটশিট লিখতে হত, হালফিলের লেখার প্রতিভা(?) না কেরামতি নিজেই আবিষ্কার করলাম অবসরপ্রাপ্তির পর। অবসরের অবসাদ কাটাতে এই বাচালপনা! বাচাল তাও ঠিক আছে, বেচাল হলেই বিপদ।রেখো মা দাসেরে মনে, মিনতি করি পদে।” 

আমাদের মিস্টার ডিপেন্ডেন্ট হল ৮৮ ব্যাচের সুমিত। কথা কম কাজ বেশী। খুব সুন্দর একটা চার পাতার লিফলেট বানিয়েছে, বিগত বছরের ইভেন্টের সিনপসিস ছবিসহ। সেটা সবাইকে সার্কুলেট করা হল। 

বিগত সম্পাদকমন্ডলী কল্লোলদা, সন্দীপন রণজয় সারা বছরের এ্যক্টিভিটির বিবরণ দিল।


এ্যলামনির মানি স্পিনিং মেশিন (ইদানীং কালে নয়) সেমিনার ছাড়া বাকী সবই সুসংগঠিত হয়েছে। আমিও একটু বাহবা পেলাম, হেরিটেজ ওয়াক অর্গানাইজ করার জন্য। ফাইনান্সিয়াল রিপোর্টের মোদ্দা কথা হল আমরা পঞ্চাশলাখের কাছাকাছি টাকার মালিক। সভ্যদের বার্ষিক চাঁদা কেন নেই এই নিয়ে প্রশ্ন উঠল। চাঁদা নিয়ে একটু আগে অন্য কথা হচ্ছিল। বিজন এগিয়ে গিয়ে মিসেস ঋত্বিককে ধরেছে। ভিলাই কানেকশন। বিজন বল্লতুমি তখন ছোট ছিলে, তোমাদের বাড়ীতে চাঁদা তুলতে যেতাম, মনে আছে কি”? এসব ব্যাপারে আমি আগ বাড়িয়ে কাঠালীকলা হয়ে পড়ি। বল্লাম- চাঁদা তুলতে যাওয়া পাবলিক হল ব্রাত্য। চাঁদা চাওয়া পাবলিকের চাঁদবদন কেউ মনে রাখে না।এ্যলামনিতেও চাঁদার ব্যাপারটাধরি মাছ না ছুঁই পানি মত। মিটিংএ প্রায়ই ডিসকাস হয়। চাঁদা নেওয়ার পক্ষে সবারই ভোট পড়ে, তবে বেড়ালের গলায় ঘন্টা বাঁধা আর হয়ে ওঠে না। কল্লোলদার কাছ থেকে জানা গেল গতবছর ইনকাম হল সাকুল্যে তিনশ টাকা, তিনজন নূতন মেম্বার হওয়ার সুবাদে। টাকার দৈন্যদশাটা অবশ্য যাদবপুরের ল্যিগাসি।টিউশন ফি, হোস্টেল ফি ছিল নামমাত্র, আজকের যুগে এই ফি- ফ্রি বলা যায়! আমার ফ্রিএর নেশাটা বোধহয় কলেজ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া। এরপর নির্বাচন নূতন কার্যমন্ডলীর। রিটার্নিং অফিসার হিসাবে দীপকদা, পার্থদা, অমলেন্দুদা।

যাদবপুরের ট্র্যাডিশন অনুযায়ী দাদা-ভাই/বোন সম্পর্কের বহিঃপ্রকাশ ইলেকশনে। সিলেকশনে কোন প্রতিদ্বন্দ্বীতা নেই, সব আনঅপোজড ইলেক্টেড। মঞ্চ ভরে গেল নূতন কান্ডারীর দল। সৌভাগ্যক্রমে আমিও সেই দলে।

গতবারের মত এবারেও ভাইস প্রেসিডেন্ট। স্বাধীনতার আগে ভাইস-রয় ছিলেন সর্বোচ্চ কর্তা। এখনভাইসতার কৌলিণ্য হারিয়েছে। পদের মজা হল আছিও বটে আবার নেইও বটে। গুরুদায়িত্ব নেই, তাই ঠাকুরকে ডাকিগুরুদেবও দয়া কর দীনজনে বর্ষীয়ান রবিদা থেকে শুরু করে নবাগত শুভ্র, নবীন-প্রবীনের সমন্বয়।

এটাই যাদবপুরের ঐতিহ্য। শ্রাবণীসহ কমপারেটিভ লিটারেচারের দুই মহিলা ইসি মেম্বার। বুদ্ধদেব বসুর ডিপার্টমেন্ট। আমার লেখার কি কমপারিজন করবে তাই নিয়ে চিন্তিত থাকি।

 নূতন কমিটির ফটো তুলতে গিয়ে ক্যামেরাম্যান হিমসিম। সবাই ফ্রেমে আনতে গেল বাঁদরের রুটি ভাগের মত একটা দিক কেটে যায়। অধিক সন্নাসীতে গাজন নষ্ট নয়, অধিকন্তু নঃ দোষায়-এই মূলমন্ত্রে বিশ্বাস রাখতে হবে। এরপর টি ব্রেক। বেশ বড়-সড় সাইজের কিছু দেখা যাচ্ছে হলুদ রংএর। কমলাভোগ আবার কবে থেকে চারকোণা হল-ধ্বন্দে থাকি! বেশ ভীড়।


সবুরে মেওয়া ফলে। মেওয়াটা অবশ্য মিষ্টি নয় হল ধোকলা। পুরো ধোঁকা অবশ্য খাই নি। ডবল ধোকলা এসেছে হাতে। ডবল ফ্রি নিয়ে সন্তুষ্ট হই। 

হঠাৎ এক পরিচিত মুখ। উনি অবশ্য এ্যলামনির নন। মুক্তধারার বেসমেন্টে সাহিত্যসভা করতে এসেছিলেন। মেঘ না চাইতেই জল। এবারের হেরিটেজ ওয়াকের জন্য লিডার খুঁজছিলাম। ইনার এতটা হেরিটেজ ওয়াকের গ্রুপ আছে। আমিও কয়েকবার গিয়েছি। এ্যডভান্স বুকিং করে ফেল্লাম। দিল্লি ইউনিভার্সিটির হাসিখুশী দিদিমনি শম্পাদি গতবার কেমেস্ট্রির বেসিক ফান্ডা দিয়েছিলেন। এবার আমার লেখালেখির কেমেস্ট্রি নিয়ে উচ্ছসিত প্রশংসা করলেন। লেখাতে কিক্যাটালিস্টদিলে পাঠকের দরবারে আরো সমাদর হবে, সেটা আর জিজ্ঞাসা করা হয়ে ওঠে নি। এই আমার দোষ। কাজের জিনিষ কাজের সময় মনে পড়ে না। কয়েকদিন আগে হিপ জয়েন্টের নাছোড়বান্দা পেনের জন্য আমার বয়সী এক অর্থোপেডিকের শরণাপন্ন হয়েছিলাম। ডাক্তারবাবু এক্স-রে দেখে বল্লেন জয়েন্ট তো ঠিক আছে। মাসল পেন মনে হচ্ছে। এবার আমার পালা। নিজের স্বল্পজ্ঞানের ভান্ডারের ঝুলি খুলে বল্লাম -“বুর্সাইটিস (bursitis) তো নয়।ডাক্তারবাবু চশমা নাকের নীচে নামিয়ে জুলুজুলু চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বল্লেন-“ ইয়ে বুর্সাইটিস কেয়া হোতা হ্যায়?” আমি আমতা আমতা করছি দেখে আবার কটমট করে বল্লেনআগলেবার আনে কা পহলে পড়কে আইয়েগা। “বাঘে ছুলে আঠার ঘা”, এই প্রবচন মনে পড়ে গেল। আম জনতার জীবনে ডাক্তার, উকিল, পুলিশ হল এই “বাঘমামা”! মানে মানে করে সটকে পড়াই শ্রেয় মনে হল। তাড়াহুড়োতে আর জিজ্ঞাসা করা হল না কতদিন লাগবে সারতে, বা কোন এক্সারসাইজ আছে কিনা ইত্যাদি। বাড়ীতেও বৌ বকুনি লাগাল। শাখের করাত। অনেককাল আগে এ্যঙ্কেল জয়েন্টের পেনে ডাক্তার বলেছিলবুর্সাইটিস সেই ফান্ডা দেখাতে গিয়ে ল্যাজে-গোবরে আর কি। পাঠকের জ্ঞাতার্থে জানাই NEET জয়েন্টের ঘোটালা চললেও আমার জয়েন্ট এখন পারফেক্ট। অর্থকরী ব্যাপারটারও খেয়াল রাখতে হয়। গতবারের ট্রেজারার ইয়াং ছেলে। প্রথামত সফ্টওয়ারের লোক নয়, আমাদের জমানার মত পাবলিক সেক্টরে নাম লিখিয়েছে। বিএইচইএল এর অর্ডারবুক বাড়বাড়ন্ত। শেয়ারের ভবিষ্যত ভাল। দুইজন এ্যলামনির সঙ্গে আলাপ হল। এরা চাকরী করেন এ্যটমিক এনার্জি কমিশনে। এ্যটম, প্রোটন, নিউট্রন এরা ক্ষুদ্রতম কণা আবার চেনে বেঁধে ফেললেই বোমা। সে কথাই বলিএ্যটম শুনলেই ভয়, সেই হিরোসিমা, নাগাসাকি। এরা অবশ্য এ্যটমের শান্তিকারী বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারে মযগুল। 

এরপর সংস্কৃতি অনুষ্ঠান। প্রদীপ্তদার সুন্দর আবৃত্তি দিয়ে অনুষ্ঠানের শুরু। পরে জানা গেল কবি হলেন - নান আদার দ্যান অমলেন্দুদা। অনেক হাততালি হল। এরপর একটি মেয়ে গান গাইবে। তার মা আমার পিছনে বসে। যাদবপুর থেকে ফিল্ম স্টাডিজ নিয়ে পড়েছেন।  মেয়ে মায়ের চেহারায় খুব মিল।



মোবাইলে রেকর্ড করা ট্র্যাক চল্ল না। যেখানে বাঘের ভয়, সেইখানে সন্ধ্যা হয়।তবে খালি গলাতেই শুনতে ভাল লাগল। মেয়ের মা খুশী হয়ে বল্লেন -“এতো শাপে বর হয়েছে”! এরপর অতিথি শিল্পীর দল। মিহির পরিচিত মুখ। গতবারে গায়ক ছিল এবার বাদকের রোলে। গায়িকা সুকন্ঠী। আর্টিস্টরা হলের মিউজিক সিস্টেম নিয়ে চিরকালই উৎকন্ঠিত থাকেন। আমার মত সঙ্গীতমূর্খের কাছে যে যত টিউনিংএ সময় নেন, তিনি তত বড় আর্টিস্ট।

গায়িকা হাসিহাসি মুখে উপরে সাউন্ড রেকর্ডিস্ট কে জানাচ্ছেএকটু ড্রাই লাগছে ড্রাই-ডে, ড্রাই ফ্রুট শুনেছি। ড্রাই মাইক জানতাম না।জানার কোন শেষ নাই, জানার চেষ্টা বৃথা তাই  প্রথমে দুর্গাবন্দনা দিয়ে শুরু, তারপর প্রায় সবই ফোক সং হল। দর্শকরাও খুশী পার্থদার পঞ্চাশ বছরের বিবাহিত জীবন উপলক্ষে বুকে দেওয়া হল। আজকের ডিনার পার্থদা স্পনসর করেছেন। পার্থদাকে বিবাহবার্ষিকীর অভিনন্দন জানালাম। বাড়ী এসে ডিনার হল ফিসফ্রাই, চিলিচিকেন, মিষ্টি সহকারে।জমে ক্ষীর। পার্থদা যুগ যুগ জিও। 

দেবদত্ত

//২৪

  

Comments

  1. Ritwik Sengupta8 July 2024 at 08:02

    Awesome, as always

    ReplyDelete
  2. খুব ভাল হয়েছে। চা বিরতির আগে চলে এসেছিলাম। জানা গেল চায়ের সঙ্গে টা আর নৈশ ভোজ কী ছিল।👋👋

    ReplyDelete
  3. গল্প পড়া শেষ না করে উঠতে পারছিলাম না। একদম ঝরঝরে।

    ReplyDelete
  4. অনেক কিছু জানা গেল।তবে ডিনার করে আবার বাড়িতে ফিরে ডিনার???

    ReplyDelete
  5. খুব ই সুন্দর।

    ReplyDelete
  6. Video ,reels sobai korte pare,but eto sundor blog korar jobab hoy na..🙏

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

ত্রিবেনী তীর্থপথে ও আরো টিটবিট

রবিঠাকুর ও কিছু হাসি মশকরা

A walk to explore Delhi’s lesser known monuments