অতুলনীয় টার্কি (পর্ব ৩)
অতুলনীয় টার্কি (পর্ব ৩)
ক্যাপাডোকিয়া টুরিস্টদের স্বর্গরাজ্য। এখানের পাহাড়ী ল্যান্ডস্কেপ অতুলনীয়। প্রকৃতি আপন খেয়ালে পাহাড়ের বিভিন্ন ডিজাইন করেছে। আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতে গঠিত, বহুবছরের বায়ুপ্রবাহ ও অন্যান্য ভৌগলিক কারণে যে শিল্পষুষমামন্ডিত অসাধারণ ডিজাইন তৈরী করেছে, তার আকর্ষণে দূরদূরান্ত থেকে পর্যটকরা এখানে ভীড় জমান।
অনেক ট্যুরিস্ট ভোরে উঠে বেলুন রাইডে যায়। আমরা করিনি।ভোরের সূর্যোদয়ের সাথে ক্যাপাদোকিয়ার ল্যান্ডস্কেপ নাকি “once in a life time” এক্সপিরিয়েন্স।
পারহেড ৩২৫ ডলার, অনেকটাই বেশী মনে হল। তবে সবাই বলে বেলুন রাইড না করাটা বিশাল মিস। এযাত্রায় বেলুন রাইডকে “আঙুরফল টক” ধরে নিয়ে মনকে শান্ত করি!
সকাল সকাল বেরিয়ে আমরা চল্লিশ কিমি দূরে, পৌঁছালাম ডেরেনকিউ (Derinkuyu) আন্ডার গ্রাউন্ড সিটি। রাস্তায় ক্যাপাডোকিয়ার ইউনিক ল্যান্ডস্কেপ চোখে পড়ল। ক্যাপাডোকিয়াতে প্রায় ২০০ আন্ডারগ্রাউন্ড সিটি আছে। তবে এর মধ্যে বড় ও দেখার মত দুটো সিটি -একটা ডেরেনকিউ আর অন্যটা Kaymakli. অনেকেরই বাড়ী এক্সটেনশেন করতে গিয়ে হঠাৎ করে ক্লাস্টার অফ কেভস এর সন্ধান পেয়েছে। ডেরেনকিউ তে এরকমই ব্যাপার ঘটেছিল। স্থানীয় একটি লোকের মুরগী প্রায়ই হারিয়ে যেত, অনেকদিন পর সেই লোক এই গুহার সন্ধান পায়।
টিকিট কেটে ঢোকার আগে কাঁচের মধ্যে একটা মডেল রাখা ছিল। জেম আলি জানাল সবচেয়ে উপরের তলায় রাখা থাকত গবাদি পশু, দ্বিতীয় লেভেলে রাখা হত খাদ্যশস্য, তৃতীয় লেভেলে থাকত গুহাবাসীরা আর সবচেয়ে নীচের লেভেলে কমিউনিটি কিচেন ছিল। মনে করা হয় এখানে একসময়ে ২০,০০০ লোক থাকত। আন্ডারগ্রাউন্ড সিটিতে ঢোকার আগে জেম আলি সতর্ক করে দিল কাউর যদি ক্লাস্ট্রোফোবিয়া থাকে বা ঠিকমত ফিটনেস না থাকে তবে না নামাই ভাল, কারণ খুব সরু সারপেন্টাইন গলি দিয়ে এক গুহা থেকে অন্যটাতে যেতে হবে। সবাই খুব এক্সাইটেড, কারণ এরকম মাটির ভিতরে শহর কেউ আগে দেখে নি। গুহাগুলির ভিতর আলোর সুবন্দোবস্তো আছে। প্রথম লেভেলে জেম আলি দেখাল গুহার মধ্যে নীচে আংটার মত গর্ত করা যাতে গবাদি পশু বেঁধে রাখা যায়।
এরকম আন্ডারগ্রাউন্ড সিটি প্রথম বানিয়েছিল খ্রীষ্টপূর্ব শাতশ/আটশ বছর আগে, বানিয়েছিল ফিগ্রিয়ানরা (Phigryian) রা। ফিগ্রিয়ানদের পর আসে বাইজানটাইনরা। এদের সময় সবচেয়ে বেশী ভূগর্ভস্ত শহর তৈরী হয়। পরে খ্রিষ্টানরা এখানে থাকা শুরু করে। খ্রীষ্টাব্দ ৭০০ সাল অব্দি লোকেরা এখানে থাকত। সরু গলির মধ্যে পাকদন্ডী দিয়ে সিঁড়ি নেমেছে নীচে। কোথাও হাঁটু মুড়ে চলতে হচ্ছে। বেশ রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। ভলকানিক ইরাপশনে উপরের ক্রাস্টটা ব্যাসাল্ট হয়ে শক্ত থাকে, নীচে থাকে সফ্ট রক। অনুমান করা হয়, বন্য জীবজন্তুর হাত থেকে রক্ষা পেতে ও অত্যাধিক শীত এড়াতে, অধিবাসীরা খনন কার্য করে গুহা বানায় ও ধীরে ধীরে গুহার সংখ্যা বাড়তে বাড়তে ছোটখাট শহরের রূপ নেয়। তৃতীয় তলায় যেখানে কিচেন, তার ছাদগুলো সব কালো হয়ে আছে।
ধূয়া বেরানোর একটা প্যাসেজও আছে। গম বা জোয়ার পেষার চাক্কিও দেখা গেল। একঘন্টা পুরো লাগল ভিতরটা ঘুরে দেখতে। বেরিয়ে এসেছি ধরণীর বহির্ভাগে, তবে যা দেখে এলাম তা মনের মণিকোঠায় চির অমলিন থাকবে।
বাইরের কোর্টইয়ার্ডের পাশে ওরকমই গুহার মুখ দেখতে পেলাম। মন বলছে ওখানে খননকার্য চালালে এরকমই কিছু পাওয়া যাবে নিশ্চয়ই!
ওখান থেকে আমরা এবারে ফিরে এলাম মূল ক্যাপাডোকিয়া শহরের কাছে পাসাবাগ (Pasabag) দেখতে। ইংরাজিতে এর নাম Valley of monks. তুর্কী ভাষায় পাসাবাগ মানে হল ভাইনইয়ার্ড।
On the way to see Pasabag Smokey chimney
Ticket counter for Pasabag
এই জায়গায় একসময় বাইজানটাইন গ্রীকেদের বসতি ছিল। এই ওপেন এয়ার মিউজিয়ামে প্রকৃতির আপন খেয়ালে ন্যাচারাল ওয়েতে তৈরী ব্যাঙের ছাতার মত অসংখ্য ‘ফেয়ারি টেল চিমনি’ আছে। ফটোগ্রাফির স্বর্গরাজ্য। এখানে ঢুকতে টিকিট লাগে। লম্বা চিমনির উপরিভাগটা কালো রংএর। উপরটা শক্ত ব্যাসাল্ট এর।
নীচের ভাগটা অপেক্ষাকৃত সফ্ট রক। কয়েকটা চিমনিতে কিছুটা উপরে ওঠা যায়। তার মধ্যে আবার ছোট গুহা।
গুহার খোলা জানালা দিয়ে দূরের চিমনির ফটো নিলাম। অনেক ট্যুরিস্ট এসেছে। এপ্রিম, মে মাস হল ট্যুরিসিমএর পিক সিজন। এই মূহূর্তে টার্কি দেশ হিসাবে তৃতীয় স্থানে আছে বিদেশী পর্যটক আসার ক্ষেত্রে। এই বছর পাঁচকোটি লোক টার্কি বেড়াতে এসেছে। পঞ্চাশ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে টার্কি পর্যটনভিত্তিক ব্যবসা থেকে।
পাসাবাগ থেকে কাছেই হল বিখ্যাত গুরেম (Goreme open air museum ) ভ্যালি। বাস থেকে নেমে যাওয়ার রাস্তায় সারি সারি দোকান। বেশ কিছুটা হেঁটে যাওয়ার পর দুইদিকে দুটো সিঁড়ির রাস্তা। ডানদিকের রাস্তাটা অনেকদূর অব্দি চলে গিয়েছে। চারিদিকে বেশ কিছু ফেয়ারি চিমনি। বামদিকে কিছু সিঁড়ি ভেঙে উঠলে পাহাড়ের গায়ে চার্চ দেখা যাচ্ছে।
গ্রুপের বাকীরা ডানদিকে চলে গেল। আমরা দুইজন সিঁড়ি ভেঙে চার্চে পৌঁছালাম। এখানে পাহাড়ের গায়ে খোপকাটা। দূর থেকে দেখলে জানালা মনে হয়। এই গুরেম ভ্যালির পাহাড়গুলিতে বাইজানটাইন সময় থেকে খ্রিষ্টান মঙ্ক ও নান-রা সমষ্ঠিগত ভাবে থাকত। পাথর কেটে কেটে চার্চ/চ্যাপেল বানিয়েছিল। আমরা যে পাহাড় কেটে বানানো চার্চে ঢুকলাম, এটাই সবচেয়ে বড়, নাম হল বাকল (Buckle) চার্চ।
খ্রিষ্টাব্দ ৮০০ এডি তে তৈরী হয়েছিল। এটাই এই অঞ্চলের প্রথম চার্চ। ভিতরটা বেশ বড়। রেস্টোরেশনের কাজ চলছে। দেওয়াল ও ছাদে নানাধরনের খ্রীষ্টের জন্ম থেকে শুরু করে তাঁর জীবনের নানা কাজ সম্বন্ধিত পেন্টিং। উজ্জ্বল নীল কালার চোখে পড়ল।
এরপর সিঁড়ি দিয়ে নেমে, আমি একাই ডানদিকের সিঁড়ি ভেঙে রাস্তা ধরলাম। দলের বাকীরা অনেক আগেই এই রাস্তা দিয়ে এগিয়ে গিয়েছে। চড়াই রাস্তার শেষে চিকিট কাউন্টার ও গেট।
গাইডের কাছে আমার টিকিট থাকার কথা। কিন্তু টার্কিতে সিম নিই নি, তাই ফোন করার সুযোগ নেই। কিছুক্ষণ বসে থাকলাম। জেম আলির নম্বর ছিল আমার কাছে। চট করে মাথায় আইডিয়া এল।
গেটের সিকিউরিটিকে বুঝিয়ে বল্লাম জেমকে ফোন করতে। একটু পরে জেম এসে টিকিট স্ক্যান করিয়ে আমায় ভিতরে নিয়ে
সামনেই বামদিকে এক তিনকোণা পাহাড়। এগুলো সবই সলিড রক। তাই কোথাও সবুজের আভাস নেই। জেম বল্ল এটা ছিল নানেদের থাকার জন্য। আরেকটু এগিয়ে বর্তুলাকারে রাস্তা, পরিধির পাশে পাশে রকের মধ্যে চার্চ ও থাকার গুহা। প্রথমে যে চার্চটা দেখে এলাম, তার প্রায় ১০০ বছরের মধ্যে বাকী চার্চ তৈরী হয়। জায়গাটার ল্যান্ডস্কেপ এমন অতিপ্রাকৃত ধরনের যে আদ্ধ্যাত্বিকতা ও ধর্মস্থান হিসাবে পপুলারিটি গেন করে, পরের দিকে গোরেমে হয়ে ওঠে পিলগ্রিমেজ প্লেস। চার-পাঁচটা চার্চ আছে দেখার মত। সবই তৈরী হয়েছে হাজার বছর আগে। একটা চার্চের নাম এপেল চার্চ, আরেকটার নাম স্নেক চার্চ। গেল।
This is known as Dark church, most well preserved but requires seperate ticket
🎟️ প্যাসেজ দিয়ে কিছুটা ঢুকে, দুইদিকে চওড়া হয়ে গিয়েছে।
খ্রীষ্টাব্দ ১১০০শতক নাগাদ এনাতোলিয়া দখল করে সেলজুক ডাইনাস্টি। এরা ছিল মুসলিম। তখন খ্রিষ্টানরা এই জায়গা ছেড়ে চলে যায়। ১৯০০ সাল নাগাদ এখানের চার্চে আসত গ্রীক অরিজিন খ্রিষ্টানরা। ১৯২৪ সালে সব গ্রীক চলে যায় গ্রীসে, পরিবর্তে গ্রীস থেকে মুসলিমরা আসে টার্কিতে। তারপর থেকে গোরেমে এবানডনড হয়ে পড়েছিল। বছর পঞ্চাশ আগে তুরস্কের সরকার এই অঞ্চলের ট্যুরিসিম পোটেনশিয়াল বুঝতে পেরে, সমস্তরকম ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপ করে। একটা চার্চে ঢুকতে পারি নি। তার নাম স্নেক চার্চ। এর জন্য আলাদা টিকিট কাটতে হয়। এটার নাম ডার্ক চার্চ। এর ওয়াল পেন্টিং সবচেয়ে ওয়েলপ্রিসার্ভড। লোকাল লোকেরা এখানে পিজিয়ন বিষ্ঠার কালচার করত, যার জন্য পেন্টিং সব ইনট্যাক্ট আছে। ক্যাপাডোকিয়াতে একটা পিজিয়ন ভ্যালি আছে, যার পাহাড়ের খোপে খোপে অসংখ্য পিজিয়ন থাকত।
Pigeaon valleyলোকাল চাষীরা এই বিষ্ঠা সার হিসাবে ব্যবহার করত। ওরা বলে ওই কারণে এখানের ফল সবচেয়ে মিষ্টি।
ফেরার রাস্তায় আমরা নামলাম এক জুয়েলারি শপে।
ইন্ডিয়ানরা জুয়েলারি কেনাতে কার্পণ্য করে না। সবাই কিছু না কিছু কিনছে। টার্কিশ লোকাল স্টোন “সুলতানেট” খুব বিখ্যাত। এটার কালার চেঞ্জ হয়, ডিফারেন্ট লাইটের সামনে ধরলে। সুমিতা একটা আংটি কিনল। পাঁচটা নাগাদ হোটেলে ফিরে দেখি তখনো সন্ধ্যে হয় নি। একাই বেরোলাম কাছাকাছি ঘুরে ফিরে দেখতে। আমাদের হোটেলের নাম রামাদা। বেশ বড় লাক্সারি হোটেল। হোটেলের সাইডের রাস্তা দিয়ে যেতে গিয়ে দেখি, হোটেলের তলায়ও রককাট গুহা।
ক্যাপাদোকিয়াতে যেখানেই যাও না কেন কিছু না কিছু প্রাকৃতিক কর্মকান্ড দেখা যাবে। গতকালের দেখা কলোনির পাশ দিয়ে গিয়ে একটা অপেক্ষাকৃত বড়রাস্তায় পড়লাম। দূরে ভ্যালি দেখা যাচ্ছে। একটা হোটেল দেখলাম গুহার মধ্যে তৈরী।
জেম আলি আসার সময় বলছিল, অনেক লোকাল, ক্যাপাডোকিয়াতে গুহার মধ্যে বুটিক হোটেল বানিয়েছে। পিক সিজনে খুব চড়া দাম, কারণ অনেকেই এরকম গুহার মধ্যে হোটেলে থাকার ফিল নিতে চায়। জেম আলির বাড়ী ক্যাপাডোকিয়ার কাছে। ওর মা নাকি বলে তিরিশ চল্লিশ বছর আগে যারা কেভের ভিতর বাসস্থান করে থাকত, তাদের গরীব ধরা হত। এখন হোটেল খুলে তারা টু-পাইস কামাচ্ছে।
হোটেলে ফিরে, সুইমিং, সওনা, স্টিমবাথ সবই ঢুঁ মারলাম। টেম্পারেচার কনট্রোলড পুল। ভোরবেলা ঘুম ভেঙে গেল।
মনে ছিল এইসময় বেলুন রাইড হয়। জানালার পর্দা সরিয়ে দেখি দূর আকাশে কয়েকটা বেলুন দেখা যাচ্ছে।
ক্রমশঃ


































Comments
Post a Comment