অতুলনীয় টার্কি (পর্ব ৪)







অতুলনীয় টার্কি (পর্ব )

আমরা এখন তুরস্ক ভ্রমনের মধ্যবর্তী পর্যায়ে। আজ সকালে আমরা যাত্রা শুরু করব কনিয়ার উদ্দ্যেশে। আমাদের গ্রুপে একটু রদবদল হল। সাতজন গেল এখান থেকে উত্তরের দিকে অন্য বাসে। নূতন এলেন আটজন। এরমধ্যে তিনটি হাসব্যান্ড-ওয়াইফ জুটি। এরা সবাই একসঙ্গে পঞ্চাশ বছর আগে ইন্ডিয়ান নেভিতে ক্যাডেট হিসাবে জয়েন করেন। এতবছর পর আবার সবাই একসঙ্গে বেড়াতে এসেছেন। অন্য আর দুই ভদ্রলোক, পঞ্চাশের কোটায় বয়স হবে, একসঙ্গে এয়ারটেলে চাকরি করতেন। এখন সব ছেড়ে বিশ্বভ্রমন করছেন। একজন থাকেন কর্নাটকের হুবলিতে, অন্যজন চেন্নাইএর বাসিন্দা। কনিয়ার দূরত্ব আড়াইশ কিলোমিটার। তবে পথে আমরা দুই জায়গায় থামব।আমরা প্রথমে এলাম ৮০কিমি দূরে ইলারা (Ihlara) ভ্যালিতে। অনেকটা পাহাড়ী রাস্তা দিয়ে নেমে, বাস যেখানে দাঁড়াল,



তার পাশেই দেখলাম খরস্রোতা এক ঝরণার মত স্বল্প প্রস্থের এক নদী। ঝরনার পাশে অনেগুলি ইটারি। এখান থেকে অনেকে ট্রেক করে সাত কিমি দূরে গুহার মধ্যে চার্চ দেখতে যায়।
              Fresco painting in Ilhara valley church


valleys of Cappadocia became increasingly important for Christians fleeing persecution during early Christianhood . Initially fleeing Roman persecution and later shelter from Arab raids, and Seljuk expansion, the Christian populations of Cappadocia turned to underground cities or hidden places such as this. Even in times of peace, monks seeking quiet turned to the Ihlara valley where the lush valley offered a peaceful and bountiful environment to support a small population. In total, some 4,000 dwellings and 100 churches were built in the Ihalara valley 



আমরা এসেছিলাম ঝরনা পেরিয়ে একটা কেভ চার্চ দেখতে। কিন্তু লোকাল লোকজন জানাল এখন চার্চে রেস্টোরেশনের কাজ চলছে। তাই জেম আমাদের আশপাশটা ঘুরে দেখতে বল্ল। আমাদের হাতে আধঘন্টা সময় দিল। উপরে চার্চের ছবি ও লেখাটা নেট ঘেঁটে পেয়েছি। আমি একাই নদীর পাড় দিয়ে এগিয়ে যাই। একদঙ্গল হাঁস ঘুরছে দেখে বাংলাদেশের কথা মনে পড়ে গেল।

নদীর পাড়ে গাছপালা, একটু দূরে দূরে নদীর উপর দিয়ে সাঁকো। আরো দূরে পাহাড়ের গায়ে খোপ খোপ গুহা।

এই অঞ্চলের ল্যান্ডস্কেপে পাহাড়ী টিলার মধ্যে গুহা খুবই কমন। নদীর অপর পাড়ে টুং টুং আওয়াজ শুনে দেখি ভেড়ার পাল চলছে চারণভূমিতে, সঙ্গে


মেষপালক দুই শিকারী কুকুর, ভেড়াগুলিকে গার্ড করে নিয়ে যাচ্ছে। সাঁকো পেরিয়ে ছবি তুলি। লোকটার সঙ্গে আলাপ হল। ভাষাগত সমস্যা। তবে বুঝলাম পাশের গ্রামে থাকে। এই বড়সড় কুকুরগুলির জাতকাঙ্গাল এই ব্রীড টার্কির নিজস্ব। এদের দাঁতের কামড়ের জোর সিংহের থেকেও বেশী। এরা শেপার্ড ডগ এবং খুব প্রভুভক্ত। বডিটা হালকা ব্রাউন, মুখের দিকটা কালো। আমার অনুরোধে মালিক ওর সামনের দুই পা ধরে আদর করছে। আমি ভিডিও তুলছি। এর পরে, আমিও সাহস করে এগিয়ে যাই।

কুকুরটার সামনের পাদুটো তুলে ওকে আদর করি। যদি তখন  জানতাম ওদের ‘জ’ এর ধার মারাত্মক, তবে নিশ্চয়ই এত সাহস হত না!


আরো এগিয়ে গিয়ে গ্রামের রাস্তা ধরি। নির্জন পরিবেশ।



পাথরের কয়েকটা বাড়ী রাস্তার পাশে। নদীর কাছে বলেই বেশ গাছপালাও আছে। গাছ থাকলে পাখিও থাকবে। পাখির কূজন শুনতে পাচ্ছি।রাস্তার পাশে একটা পুরানো মডেলের গাড়ী চোখে পড়ল।

ছোটখাট শহর বা হাইওয়ে দিয়ে যাবার সময় দেখেছি অনেক গাড়ী পুরানো মডেলের। পেট্রোল পাম্পে একটা পুরানো মডেলের গাড়ী দেখে ড্রাইভারকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম। ইনি ২৫ বছরের পুরানো শেভ্রোলে চালাচ্ছেন। জেম আলিও বলেছিল নূতন গাড়ীর প্রচন্ড দাম, তাই লোকে পুরানো গাড়ী রাখে। 

এরপর আমরা ক্যাপাডোকিয়া-কনিয়া হাইওয়ের পাশে সুলতানহানি ক্যারাভানসরাই (Sutanhani Caravanserai) তে পৌঁছালাম। ক্যাপাডোকিয়া থেকে ১৬০কিমি দূরে। এই জায়গাটার নাম কায়েসেরি (Keyseri) এই মধ্যযুগীয় ক্যারাভানসরাই, টার্কির সবচেয়ে ওয়েল প্রিসার্ভড ক্যারাভানসরাই।



আজ থেকে হাজার/বারশ বছর আগে, যখন সিল্ক রূট দিয়ে চায়না/সেন্ট্রাল এশিয়ার সঙ্গে এনাতোলিয়া দিয়ে উটের কাফিলা যেত বা আসত মালপত্র নিয়ে ইউরোপের দিকে, তখন রাতের আশ্রয়ের জন্য এই ক্যারাভানসরাই ব্যবহৃত হত।

এই ক্যারাভানসরাই নির্মিত হয়েছিল, সেলজুক আমলে। সুলতান আলেদিন কাইকুবাদ১ (Alaeddin Keykubad-1) দ্বারা ১২২৯ সালে নির্মিত। সামনে অনেকটা খোলা চত্বর, চারিদিকে প্রাচীর ঘেরা, সামনে এক বিশালাকায় তোরণ। সেই আমলে ক্যারাভানসরাই থেকে মালিক (সাধারনত ওই অঞ্চলের সুলতান) ট্যাক্স কালেক্ট করত, ট্রেডারদের কাছ থেকে যারা এখানে রাত কাটাত দীর্ঘ যাত্রাপথে। পরিবর্তে ক্যারাভানসরাই এর মালিক তাদের রাতে থাকার ব্যাপারটা সুরক্ষিত রাখত প্রহরীর দ্বারা। রাতে ক্যারাভানসরাই এর মেন দরজা বন্ধ রাখা হত। মূলফাটকের গেটটা খুব ইমপ্রেসিভ।

দরজার উচ্চতার থেকে তুলনামূলকভাবে গেটের স্ট্রাকচারের উচ্চতা অনেকটাই বেশী। গেটের উপরে তিনকোণা খোপযুক্ত ডিজাইন অনেক মস্ক টুম্বের ডিজাইনে দেখেছি। ১১শ শতক থেকে শুরু, এই ধরণের মুসলিম আর্কিটেকচারাল  ডিজাইনের নাম মুকারানাস (Muqaranas বা ইংরাজিতে stalactite vault)

ভিতরে ঢুকে মাঝামাঝি জায়গায় একটা মসজিদ। চত্বরের দুইপাশে থাকার জায়গা। শীত গরমে দুই সময়ে থাকার জন্য বন্ধ বা খোলা ঘর ছিল। একদম পিছনে একটা বিশাল কক্ষ। অনেকগুলি থাম আর্চের সাহায্যে অনেকটা জায়গা জুড়ে ছাদওয়ালা বিল্ডিং। এর মধ্যে থাকত ব্যাপারীদের বহনকারী উট ঘোড়া।


থামগুলোর নীচে পশুদের বেঁধে রাখার জন্য আংটা দেখলাম। সেন্ট্রাল এনাতোলিয়ার কার্পেট বয়নশিল্প জগতবিখ্যাত। রেস্টোরেশনের পর থামগুলি থেকে কার্পেট ঝুলছে। চৌকোনা পিলার যুক্ত বিশাল স্থাপত্যের মধ্যে ঘুরতে ঘুরতে মনে হচ্ছিল ইতিহাস চোখের সামনে প্রতিভাত হয়েছে।

সিল্করূটের রাস্তায় এরকম অসংখ্য ক্যারাভানসরাইএর দখলদারি নিয়ে যুদ্ধও হত, কারণ ক্যারাভানসরাইএর ট্যাক্স থেকে রাজকোষে অর্থ আসত, যেটার সিংহভাগ খরচা হত সেনাবাহিনীর মাইনে দিতে। ক্যারাভানসরাইএর মধ্যে খাওয়া-থাকার বন্দোবস্তো ছাড়াও,   হামাম ছিল স্নানের জন্য, হাকিম থাকত অসুস্থ যাত্রীর জন্য।যাতায়তের পথে ঘোড়া বা উটের নাল, জিন ইত্যাদি মেরামতের জন্য মুচি, কামার মজুদ থাকত ক্যারাভানসরাইতে। 

সাড়ে তিনটে নাগাদ বাস পৌঁছাল কনিয়াতে (Konya) বেশ ছড়ানো শহর।


শহরটা একটা ভ্যালির মধ্যে,পশ্চিম দিগন্তে পাহাড়ের সারি দেখা যাচ্ছে। কনিয়া হল মুসলিমদের পিলগ্রিমেজ প্লেস। বিখাত মিস্টিক সুফি দার্শনিক কবি, মেভলানা জালালউদ্দিন রূমির (১২০৭-১২৭৩) কর্মকান্ড এই কনিয়াতে।


আমরা যাব রূমির টুম্ব দেখতে। বাস যেখানে দাঁড়াল, তারপাশে চওড়া রাস্তা, মাঝখান দিয়ে ট্রাম লাইন। ১২/১৩শ শতকে কনিয়া ছিল সেলজুক সুলতানদের রাজধানী। সেলজুক আমলের স্টোন কার্ভিংযুক্ত অনেক মসজিদ মাদ্রাসা আছে কনিয়াতে। সেলজুক ডাইনাস্টির স্বর্ণযুগে এদের সম্রাজ্য বিস্তৃত ছিল সেন্ট্রাল এশিয়া থেকে মিডল ইস্ট মেডিটারিয়ান সি এর কোস্টলাইন সমূহ। 

বাসস্ট্যান্ড থেকে আড়াইশ মিটার দূরে মেভলানা কমপ্লেক্সে ঢোকার গেট। দূর থেকে টুম্বের এমারেল্ড গ্রীন কালারের চিমনির মত শেপের চূড়া নজরে আসছে।



এখানে ঢুকতে টিকিট লাগে। টিকিট ঘরের পর অনেকটা জায়গা জুড়ে উদ্যান। তারপর কমপ্লেক্সে ঢোকার গেট। গেটের ভিতর বেশ বড় চত্বর।

বামদিকে মেভলানার মুসোলিয়াম, ডানদিকে এল শেপে সারি সারি ঘর। এখন মিউজিয়াম হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। চত্বরে আরো দুটো বিল্ডিং দেখা যাচ্ছে।  অনেক মুসলিম এসেছেন মেভলানা রূমিকে শ্রদ্ধা জানাতে। জুতো খুলতে হল না। ঢোকার মুখে সু-কভার দেওয়া হল। ভিতরে প্যসেজের দুইদিকে বেশ কিছু কবর আছে।

       মেভলানা রুমির কবর

কবরের মাথায় সাদা টারবান দেখে বুঝলাম এরা ইস্লামিক স্কলার ছিলেন। সবুজ রং এর সবচেয়ে বড় কফিনে রাখা রুমির দেহ।

সবুজ ভেলভেটের কভারে সোনার জলে লেখা কোরানের বাণী। কবরের পাশে আরেকটা হল আছে।
This lamp used to light up at the time of evening Namaz and put out at night. This used to be a part of sacred ritual
              Koran 8th century

সেখানে রুমির ব্যবহৃত পোষাক, ১২৭৮ সালে কপি করামনসভি” (রুমির বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ), নবম শতকের কোরাণ রাখা আছে। 

রুমির জন্ম হয়েছিল বালখ বলে ইরানের এক শহরে (বর্তমানেআফগানিস্থানে), তাঁর জন্মের পর, মোঙ্গল ইনভেডারদের ভয়ে, পুরো পরিবার চলে অসে সেলজুক অধিকৃত অনাতোলিয়াতে। রুমির বাবা বাহ-আল-দিন একজন নামকরা সুফি স্কলার ছিলেন এবং কনিয়ার এক মাদ্রাসার শিক্ষক ছিলেন। ১২২৮ সালে রুমি বাবার সাথে কনিয়াতে আসেন সুফি মিস্টিসিজিমের সঙ্গে শিক্ষালাভ তার বাবার কাছে। বাবার মৃত্যু (১২৩১) পর রুমি তার স্থলাভিষিক্ত হন। ১২৪৪ সালে তার আলাপ হয় আরএক দরবেশ সামস্ তাবরিজির সঙ্গে, যা তার ইস্লামিক ভাবধারার মোড় ঘুরিয়ে দেয়।


ট্রাডিশনাল সুফি সেন্টদের থেকে তাব্রিজির চিন্তাধারার ফারাক ছিল। রুমি তাবরিজি একান্তে ইসলামিক দর্শন নিয়ে আলোচনা করতেন। তাদের ঐকান্তিক মেলামেশা রুমির সন্তানরা ভাল চোখে দেখত না। কথিত আছে যে রুমি তার মাদ্রাসার কাজকর্ম পরিবারকে নেগলেক্ট করছিলেন। ১২৪৭ সালে তাবরিজি নিখোঁজ হয়ে যান। সবাই বলে তাকে হত্যা করা হয়েছিল। বন্ধুর মৃত্যুর পর শোকাহত রুমি তার মর্মবেদনা, কবিতার মাধ্যমে প্রকাশ করেন। ৩০,০০০ সুফি কবিতা লিখেছেন রুমি, যেখানে তার তাবরিজির প্রতি আকর্ষণ, ঈশ্বরচিন্তা ইউনিভার্সাল লাভ প্রকাশ পেয়েছে। প্রকৃতির প্রতিটি সৃষ্টির মধ্যে তিনি ভালবাসার প্রকাশ, তার কবিতার মধ্যে প্রকাশ করেছেন।  তিনি অনেক কবিতা, সামস্ তাবরিজির নাম দিয়ে লিখেছেন। রুমির সবচেয়ে নামকরা গ্রন্থ হলমনসভি ইয়া মানভী তার লেখা বেশীর ভাগ ফারসি ভাষায়, কিছু লেখা তুর্কী ভাষাতেও আছে।


মেভলেভি
(Mevlevi) ইংরাজিতে হল ‘whirling Dervishes’ রুমির সুফি চিন্তাধারার প্রকাশ ঘটেছে এই নৃত্যের মাধ্যমে। এই নাচের পদ্ধতির নাম সেমা (Sema) রুমির দৃঢ় বিশ্বাস ছিল - সঙ্গীত, নাচ গানের মাধ্যমে মহান ঈশ্বরের দরবারে পৌঁছান যায়।


Some sayings of Rumi


Love is here like the blood in my veins and skin.

It has emptied me of myself and filled me with the Beloved.

His fire has penetrated all the atoms of my body.

Of “me” only my name remains; the rest is Him.


Love is reckless; not reason.

Reason seeks a profit.

There is no one more insane that the lover

For his reason is blind and deaf because of love.


In generosity and helping others, be like a river.

In compassion and grace, be like the sun.

In concealing others’ faults, be like the night.

In anger and fury, be like the dead.

In modesty and humility, be like the earth.

In tolerance, be like the sea.

In generosity and helping others, be like a river.


মস্ক থেকে বেরিয়ে পাশের মিউজিয়ামে ঢুকলাম। পরপর ঘর। এই ঘরগুলিতে সেলজুক অটোমান সময়ে শিক্ষানবিশী দরবেশি (Dervish)রা থাকতেন। একটা ঘর থেকে বেরিয়ে আরেকটাতে ঢুকতে হয়। ওই সময়কার সঙ্গীতের ইন্সট্রুমেন্ট একটা ঘরে আছে।




অন্য একটা ঘরে তাবরিজির টুপি লেখার ম্যানাসক্রিপ্ট রাখা আছে। 

সামনের আরেকটা বিল্ডিং ছিল, যেটা তখনকার সময়ের কিচেন ছিল, তুর্কী ভাষায় Matbah. ভিতরে Dervish ড্রেস পরে  প্রমানসাইজের বিভিন্ন মডেল রান্নার কাজে নিয়োজিত। 



এরপর বাস আমাদের নিয়ে যাবে হোটেলে। তখন পাঁচটা বাজে। আজ শনিবার। আগে থেকে খবর পেয়েছি কনিয়া কালচারাল সেন্টারে Dervishes সেমা ড্যান্স হয়, শুধুমাত্র শনিবার। সিনেমাতে সুফি গানের সঙ্গে এই নাচ দেখেছি। কিন্তু খোদ দরবেশি কালচারের উৎপত্তিস্থল কনিয়াতে সামনাসামনি এই নাচ দেখার সুযোগ হাতছাড়া করা যায় না। তার উপরে কনিয়া কালচারাল সেন্টার খুবই কাছে, মেন রাস্তা দিয়ে হেটে গেলে এক কিলোমিটার। জেম আলির কাছ থেকে হোটেলের নাম, ফোন নম্বর নিলাম। বাস চলে গেল হোটেলে। সাতটার সময় শো শুরু হবে। টিকিট তখনই কাটা যায়। এক ঘন্টার শো। হোটেলে ডিনার নটা নাগাদ শেষ হয়। হোটেল কতদূরে বা ট্যাক্সি পাব কিনা জানি না। সে সব পরে ভাবা যাবে। হেঁটেই যাচ্ছি। মাঝামাঝি জায়গাতে একটা গোল গম্বুজওয়ালা বিল্ডিং দেখলাম।


লেখা আছে কনিয়া প্যানারোমিক মিউজিয়াম। হাতে অনেক সময়। ১৫ লিরা পার হেড টিকিট করে ভিতরে ঢুকলাম। ইচ্ছেটা বেঞ্চে বসে বিশ্রাম করব। গোল সার্কুলার শেপের বিল্ডিং।
Middle circle of museum display models of Madrasa and mosque in Konya

মধ্যে কনিয়ার কিছু নামকরা মাদ্রাসা মসজিদের মডেল। কিছুক্ষণ বিশ্রামের পর উঠেছি। সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে মাঝখানে একটা গোলাকার হল। মাথাটা ডোমের মত অনেকটা বিড়লা প্ল্যানেটোরিয়ামের ছাদের মত। ৩৬০ ডিগ্রিতে সেলজুক আমলের জীবনযাত্রার থ্রি ডি মডেল।


বাজার, রাজপ্রসাদ, ব্যাপারী, পশু পাখি এবং সাধারণ মানুষের এত নিখুঁত মডেল ওই সময়ের জীবনযাত্রার ছবি শিল্পীর তুলি ভাস্কর্যে যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে। অবাক বিষ্ময়ে তাকিয়ে থাকি। দেখে যেন আঁশ মেটে না।

তলায় এসে কফি খেয়ে বেরোলাম। অনতিদূরেই কালচারাল সেন্টার।

টিকিট তক্ষুনি পাওয়া যায়। খুব বড় হল, অনেক দর্শক ধরে, ফলে টিকিট পাওয়া যায় সবসময়।

সেন্টারে নীচে নাচের জায়গা। স্টেডিয়ামের মত সার্কুলার ওয়েতে দর্শকদের বসার আসন। নাচিয়েরা এলেন, বেশ আনেকজন, দুই তিনটে অল্পবয়সী ছেলেও ছিল। সাদা রং এর রোবে সজ্জিত সবাই। মাথায় কনিয়ার লম্বা টুপি।



নাচ শুরু হল। সুফি গানের সঙ্গে তারা নিজেকে প্রদক্ষিণ করে ঘুরতে থাকলেন। একটা হাত উপরে অন্যটা নীচের দিকে। ১০/১২ মিনিচ ধরে নাচ।


পরে একটু বিরতি। এরকম ক্ষেপে ক্ষেপে চার/পাঁচবার নাচ হল। দেখার মত হল নাচিয়েদের শরীরী অভিব্যক্তি। পুরো শরীরটা যেন হাওয়াতে ভাসছে, যেন ঈশ্বরের চরণে আত্মসমর্পনের প্রচেষ্টা। তার সঙ্গে কখনো হালকা নীলাভ বা সবুজ হলুদ বা লাল আলোর খেলা। অতীন্দ্রিয় পরিবেশ। মন ভরে গেল। অতুলনীয় অনুভূতি নিয়ে বেরিয়ে এসে বাস্তবের সন্মুখীন হলাম। হলের সামনে কোন Taksi (তুর্কীতে এরকম স্পেলিং!) নেই। আসার সময় দেখেছি একটু দূরে একটা ট্যাক্সি লেখা বুথ। টার্কিতে নাইট লাইফ সেরকমটা নেই, হোটেলেও নয়টাতে ডিনার শেষ হয়ে যায়। জেম আলি বলেছিল এই কালচারাল সিটি কনিয়া বেশী কনজারভেটিভ। পা চালিয়ে ট্যাক্সি স্টান্ডের সামনে দাঁড়াই। সবেধন একটা ট্যাক্সি দেখছিলাম, পৌঁছাতেই দেখি ড্রাইভার স্টার্ট দিচ্ছে খালি গাড়ী। ইশারায় বল্ল ওয়েট কর, আসবে। শুনশান জায়গা। একটি মেয়ে এল, সেও ট্যাক্সি খুজছে। ইরান থেকে এসেছে। বুথের গায়ে একটা নম্বর। বল্লাম তুমি ফোন করে দুটো ট্যাক্সি আসতে বল। এরপর আরো দুই-তিনজন এল। সবাই সেমা ড্যান্স দেখে ফিরছে। অপেক্ষা করছি। কাকস্য পরিবেদনা! কিছুই আসে না। এখানে উবের সার্ভিস নেই। থাকলেও লাভ নেই। সিম তো নিই নি। নিরুপায় হয়ে দূরে রাস্তার ধারে এগোই। রাস্তায় গাড়ী নামমাত্র। সবই প্রায় প্রাইভেট গাড়ী। একটা ট্যাক্সি বেরিয়ে গেল, মনে হয় লোক ছিল। হঠাৎ করে পরিত্রাতার মত একটা ট্যাক্সি দাঁড়াল। তখন আমার কাছে ভগবান। ভাষার সমস্যা। মোবাইলে হোটেলের নাম আর ছবি দেখালাম।
Bayir diamond hotel at Konya
হোটেল পাঁচ/ছয় কিমি দূরে ছিল। নটার মধ্যে পৌঁছে চেকইন করলাম। ভাগ্য ভাল। ডিনারের সময় সাড়ে নটা পর্যন্ত। একটা মজার ঘটনা ঘটল। রুমের ভিতরটা গরম লাগছিল। জানালাটা খুলেছি। এসি আর চলে না। ফোন করতেই প্রথম প্রশ্ন - জানালা কি খোলা? বল্লাম-হ্যাঁ। জানালা খোলা থাকলে এসি চলে না। জানালা বন্ধ করে এসি অন তো হল, কিন্তু ঠান্ডা হচ্ছে না। এবারে এসি মেকানিক এল। সে ছাদের ল্যুভার খুলে ডাক্ট চেক করল। টার্কিশ ভাষা কি বল্ল বোঝা গেল না। মোটের উপর ঠান্ডা হচ্ছে না ঠিকমত। কি করা যায় যথেষ্ট ক্লান্ত। শুয়ে পড়েছি, তখন আবার বেল। হল কি! এবার হাউস ক্লিনিং এর লোক। ডাক্ট চেকিংএর সময় দুই ফোঁটা জল পড়েছিল, সেটা খুব সুন্দর করে ফ্লোর ক্লিনার স্প্রে করে মুছে দিল। কাজের কাজ হল না, তবে নিখুঁত ব্যবস্থাপনার উপস্থিতি টের পেলাম!
View from Hotel room
 

ক্রমশঃ


Comments

  1. রুমির কবিতা পড়া ছিলনা। এবার পড়ব। এটা একটা উপরি পাওনা। খুবই চমৎকার হয়েছে লেখা। 🌹

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

ত্রিবেনী তীর্থপথে ও আরো টিটবিট

রবিঠাকুর ও কিছু হাসি মশকরা

A walk to explore Delhi’s lesser known monuments