অতুলনীয় টার্কি (পর্ব ৫)

 


অতুলনীয় টার্কি (পর্ব )

আজকে আমরা যাব চারশ কিমি দূরে পামুক্কালে (Pamukkale) মাঝ রাস্তায় পড়বে টার্কির দ্বিতীয় বৃহত্তম সুইট ওয়াটার লেক।

তারই পাশে ছবির মত সুন্দর শহর হল ইগিরদির (Igirdir) আমাদের মধ্যাহ্নভোজনের বিরতির জায়গা।


এই
শহর সেইভাবে ট্যুরিস্ট সার্কিটে পড়ে না, তবে শহরটা ফালির মত হয়ে লেকের ভিতর ঢুকেছে, তাই তিনদিকে জল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার। জেম আলি বল্ল, আজকাল নাকি অনেক লোক রিটায়ারমেন্টের পর এখানে থাকছে। ছোট শান্ত শহর এবং জলবায়ু টেম্পারেট। 

বাস এসে থামল রেস্টুরেন্টের সামনে। রাস্তার ওপর পারে লেক। রাস্তা আর লেকের মাঝে টানা লম্বা পার্ক।


সবে বারটা বাজে। হেভি ব্রেকফাস্টের পর খিদে পায় নি, তাই বার্গার কিনে আমরা লেকের ধারে বেঞ্চে বসে লাঞ্চ সারলাম। জেম আলি একঘন্টা সময় দিয়েছে। এখনো চল্লিশ মিনিট বাকী। সুন্দর ওয়েদার। তাই লেকের ধার ঘেঁষে হাটতে বেরোলাম।


শহরের প্রাণকেন্দ্রে একটা পাথরের তৈরী মসজিদ। মসজিদের উল্টোদিকের গলি দিয়ে এগিয়ে পৌঁছালাম এক তোরণওয়ালা কেল্লার পাঁচিলের পাশে।


গেটের কাছে ফলকে লেখা আছে এই ক্যাসেল বাইজানটাইন আমলে তৈরী হয়েছিল। তুরস্ক দেশটার এই মজা। সব জায়গাতেই টুকরো টুকরো ইতিহাস। অতীতে ভলকানিক ইরাপশন থেকে দেশটা তৈরী বলে, পাথর দিয়ে প্রাচীন মসজিদ, কেল্লা বানান হয়েছিল, তাই সবার অস্তিত্ব এখনো বর্তমান। 

চারটে নাগাদ আমরা পৌঁছালাম পামুক্কালেতে।


আমরা উঠে এসেছি সমতলভূমি থেকে ১০০০ ফিট উপরে।  পামুক্কালে বিখ্যাত দুটো কারণে। এই উপরের জায়গাটা অনেকটা অংশ ফ্ল্যাট ল্যান্ড। এখানেই গড়ে উঠেছিল

বিখ্যাত রোমান সিটি হিয়ারোপলিস (Hierapolis), যার ধ্বংসাবশেষ আছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। আরেকটা কারণ হল তুষারধবল প্রান্তর, দূর থেকে ভ্রম হয় পর্বত যেন শিখরে জমে থাকা বরফ।


সাদা জমিতে গোলকার অসংখ্য নীল জলের সমাহার, যেন অনেকটা পুকুরে প্রষ্ফুটিত পদ্ম বা শাপলা পাতাসমেত।


এই জিনিষ দেখলে মনে
হয় প্রকৃতি তার বিচিত্র রূপের পসরা সাজিয়ে রেখেছেন দেশ বিদেশে। পামুক্কালের এই বরফসদৃশ রূপ আর হেয়ারোপলিস ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের তকমা পেয়েছে।

ভৌগলিক কারণটা হল এখানের অনেকগুলি উষ্ণ প্রস্রবনের জল, মাটিতে পড়ে ক্যালসিয়াম কার্বনেটের স্তর বানিয়ে ফেলেছে, যার রং একদম সাদা।

আমরা টিকিট কেটে ঢুকলাম। টিকিট ঘরের কাছে একটা হেয়ারোপোলিসের ম্যাপ বানান আছে। সেখানে নম্বারিং করে ইমপর্টেন্ট স্ট্রাকচার কোথায় কোথায় আছে তা দেখান আছে।


আমরা যে পাথরের গেটটা দিয়ে ঢুকলাম, তার নামসাউথ রোমান গেট

হেয়ারোপলিসের মধ্যে দিয়ে গিয়ে তবে পামুক্কালের উষ্ণ প্রস্রবন। এক কিলোমিটার হাঁটতে হল। দূরে হেয়ারোপলিসের এ্যম্ফিথিয়েটার দেখা যাচ্ছে।

বেশ বড় খালি প্রান্তর। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পাথরের ভগ্নাবশেষ দেখে বোঝা যাচ্ছে,


এই প্রাচীন নগরীর বিল্ডিং সবই প্রায় কালের অমোঘবিধানে  জরাজীর্ণ। খ্রীষ্ট জন্মের ২০০ বছর আগে থেকে এখানে বসবাস শুরু হয়, প্রথমে এসে সেটল করেছিল Jew রা, তার প্রধান কারণ ছিল পামুক্কালের হট স্প্রিং, কিছুটা মেডিক্যাল সেন্টারের মত, এখানের মিনারেল ওয়াটার রিচ জলে স্নান করে রোগ সারাবার জন্য।

খ্রিষ্টজন্মের সমসাময়িক সময়ে গ্রেকো-রোমানরা লেট হেলেনিস্টিক পিরিয়ডে এই শহর গড়ে তোলে।

এই ছবিটা গ্রীক দেবতা এ্যপোলোর মন্দিরে ঢোকার গেট ছিল। মূল মন্দিরের কিছু অবশিষ্ট নেই। 

 আমরা প্রথমে গেলাম, যেখানে মাটির উপর দিগন্তবৃস্তিত সাদা ক্যালসিয়াম কার্বনেট। হট স্প্রিংএর জল এসে পড়ছে। অনেক জায়গাতে হাঁটু অব্দি জল জমে আছে।



তবে সাঁতার কাটার মত পর্যাপ্ত জল বা গভীরতা নেই। পুরো জায়গাটা টুরিস্টে ছয়লাপ। জুতো খুলে নেমে পড়লাম। সাবধানে পা টিপে টিপে দাঁড়ালাম জলের মধ্যে। কারণ শক্ত ক্যালসিয়াম কার্বনেটে আছাড় খেলে হাত-পা ভাঙার চান্স। 

প্রস্নবনের পাশেই হেয়ারোপলিসের মিউজিয়াম।



রোমান আমলে তৈরী হামাম হল বর্তমানের মিউজিয়াম। হামামের কিছু ভাঙাচোরা গেট চোখে পড়ল।

মিউজিয়ামের ভিতরে নানা রোমান আমলের আর্টিফ্যাক্টস। সবচেয়ে চোখে পড়ার মত বড় বড় বাথটাব যার আউটার ওয়ালে মানুষ বা দেবতাদের খোদাই করা মূর্তি।


অনেক রোমান দেবদেবীর মূর্তিও আছে, তবে বেশীরভাগই অক্ষত নেই।


হেয়ারোপলিসের বেশীরভাগ স্থাপত্ব্য ধ্বংস হয় যাওয়ার কারণ খ্রিষ্টাব্দ ৭০০ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্প। পাশে একটা ওপেন এয়ার মিউজিয়াম। সেখানেও অনেক মূর্তি রাখা। 

সামনে কিছুটা দূরে এক টার্কিশ উষ্ণ প্রস্রবনের হামাম। এখানে ঢুকতে টাকা লাগে। জেম আলি বলে দিয়েছিল, পামুক্কালে আমাদের হোটেলে উষ্ণ প্রস্রবনযুক্ত রেডপুল আছে। সন্ধ্যায় হোটেলে গিয়ে ওই রেডপুলে নেমেছিলাম। ওপেন এয়ারে বেশ ঠান্ডা, আর পুলের লাল রংএর গরম জলে সাঁতার কেটে খুব এনজয় করেছিলাম। 

হাফ কিমি দূরে দেখতে পাচ্ছি বেশ বড় আকারের রোমান থিয়েটার।


রেস্টোরেশন করে পুরানো আকার আনা হয়েছে। জেম আলি খালি দূর থেকে দেখিয়েছিল, কিন্তু দূরে বলে যেতে এনকারেজ করে নি। এখনও বিশ মিনিট বাকি, সব দেখে বাসের সামনে মিট করার জন্য। শর্টকাট করে মেঠো রাস্তা দিয়ে হেঁটে পৌঁছালাম থিয়েটারে। শুনশান রাস্তায় চলতে গিয়ে সামনে পড়ল এক ছোট্ট কচ্ছপ। অবাক কান্ড! কোথা থেকে এল কে জানে। ভাঙা পাথরের উপর দুটো বিড়াল ঝগড়া করছে। 


এ্যম্ফিথিয়েটারটা সাইজে বেশ বড়। অর্ধচন্দ্রাকৃতি শেপে। দর্শকদের গ্যালারি অনেক উপর অব্দি উঠে এসেছে।



এটাই সবচেয়ে বড় স্স্ট্রাকচার হেয়ারোপলিসে। ১৯৫৭ সালে ভাঙাচোরা অবস্থায় এক ইটালিয়ান আর্কিওলজিস্ট এর হদিশ করেন। পরে ধীরে ধীরে রেস্টোরেশনের পর এই শেপে এসেছে। অনুমান করা হয় পনের হাজার দর্শক এখানে একসাথে বসতে পারত। রোমানরা প্রথম তৈরী করে খ্রীষ্টপূর্ব প্রথম শতকে, পরে আগুনে পুড়ে যাওয়ার পর খ্রিষ্টাব্দ দ্বিতীয় শতাব্দীর শেষের দিকে তৈরী হয়। নীচে নেমে ঘুরে দেখার সময় নেই। খালি ফটো নিলাম এ্যম্ফিথিয়েটারের, আর ফলকে যা লেখা আছে সেটার। তড়িঘড়ি গাড়ীতে ফিরে এলাম। গেটের পাশে জেম আলি একা দাঁড়িয়ে। বাকীরা সব গাড়ীতে উঠে পড়েছে।

পামুক্কালেতে আমাদের হোটেলের নাম ‘Spa hotel colossae thermal’. রাতে খাওয়ার পরে হোটেল থেকেই বেলিড্যান্স শো এর বন্দোবস্তো ছিল। আগে কোনদিন দেখি নি। বেশ ভাল লাগল।

পরের দিনের নাইট স্টে হবে এজিয়ান (Agean sea) সি এর কোস্টাল  সিটি কুসাদাসিতে (Kusadasi)পামুক্কালে থেকে দূরত্ব ২২০ কিমি। তবে রাস্তাতে আমাদের তিনটে জায়গায় থামার কথা। তিনটে জায়গা হল ভার্জিন মেরি হাউস, রোমান সিটি ইফেসাস এবং সেন্ট জনস বারিয়াল। 

সকাল সকাল বাস চলেছে। এখন আমরা টার্কির ওয়াস্টার্ন কোস্টলাইনের কাছে। গাছপালা ক্রমশ বড় সাইজের হচ্ছে,


সবুজও যেন অনেকটা বেশী। পামুক্কালে থেকে দুইশত কিমি দূরে হল ভার্জিন মেরী হাউস। এর থেকে মাত্র পাঁচ কিলোমিটার দূরে হল বিখ্যাত রোমান শহর ইফেসাস। খ্রিষ্টধর্মের গোড়ার দিকে তখন ইফসাসের রমরমা অবস্থা, Aegean সি থেকে খাঁড়ি ঢুকে এক ন্যাচারাল হারবারের সৃষ্টি হয়েছে।

ইফেসাসের বাকী বর্ণনায় পরে আসব। জেম আসার সময় বাসে বলছিল, খ্রিষ্টধর্মের গসপেল অনুযায়ী প্রভু যীশু ক্রুশিফিক্সেসনের আগে

সেন্ট জনকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন মাতা মেরীর সুরক্ষার জন্য। যীশুর মৃত্যুর পর সেন্ট জন মেরীকে এখানেই নিয়ে আসেন পাথরের তৈরী বাড়ীতে বাস করতেন।

এই ঘটনার প্রমাণ পাওয়া যায় খ্রিষ্টাব্দ ৪৩১এ লেখা ইফেসাসের রোমান কাউন্সিলের মিটিংএর নথি থেকে। তবে ভার্জিন মেরির কবর কোথায় আছে, তা নিয়ে দ্বিমত আছে। কেউ বলেন টার্কিতেই তার মৃ্ত্যু হয়েছিল আর কবর দেওয়া হয় ইফেসাসে, অন্যমতে ভার্জিন মেরীর কবর হল জেরুজালেমে। আমাদের বাস একটা ওয়াইন্ডিং রাস্তা ধরে, কিছুটা উচ্চতায় মাউন্ট কোরেসস (Koressos) পৌঁছালাম। পাইন আর ওক গাছে ঘেরা নির্জন জায়গা।

কিন্তু অনেক দর্শক। ভার্জিন মেরী হাউস হল খ্রিষ্টনদের পিলগ্রিমেজ প্লেস। একটা জায়গায় দেখলাম দেওয়ালটা সাদা হয়ে আছে।

এখানে সবাই কাগজে উইশ করে ঝুলিয়ে রাখছে। এরকমটা কাস্টম আমাদের দেশেও আছে। গাছের গায়ে সুতো বেধে আমিও পুরীতে মাসীর বাড়ীতে মানত করেছিলাম। ভগবানে ভক্তিটা সাধারণ মানুষের চাওয়া-পাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ভার্জিন মেরীর হাউসটা ছোট্ট, সাধারণ দেখতে একটা পাথরের বাড়ী।

তাকালেই তার প্রাচীনত্ব বোঝা যায়। প্রবেশের আগে বেশ লম্বা লাইন।

তীর্থক্ষেত্রের সঙ্গে মানানসই শান্ত পরিবেশ, যদিও ভারতীয় তীর্থস্থানগুলি কোলাহলমুখর থাকে, শুধু মানুষের নয়, সঙ্গে ঘন্টা মন্ত্রপাঠের মূর্ছনা! লাইন দিয়ে ভিতরে ঢুকলাম। ভিতরে ছবি তোলা বারণ। ভার্জিন মাতার মূর্তিকে প্রণাম করে বেরিয়ে এলাম। আমাদের গাইড জেম-এর কলেজ ছিল কাছেই কুসাদাসিতে। কলেজে পড়ার সময় ট্যুরিস্টদের নিয়ে আসত এখানে রবিবার মাস প্রেয়ারের সময়।

একটা জায়গায় পাথরের দেওয়াল দিয়ে জল পড়ছে। সেটা খ্রিষ্টানদের কাছে হোলি ওয়াটার। মুসলিমদের যেমন জমজমের জল বা হিন্দুদের গঙ্গার জল পবিত্র ধরা হয় খ্রিষ্টানদের সে রকমটা নয়। স্থানমাহাত্ব্যে সেই জল পবিত্র হয়ে যায়!

একটা গোল পাথরে ঘেরা জায়গা দেখিয়ে জেম বলল-এখানে খ্রিষ্টান শিশুদের ব্যাপটাইজ করা হত।  


ইফেসাস হল রোমান শহর আজ থেকে দুই হাজার বছর আগে তৈরী। শহরের অস্তিত্বটাকে দুইভাগে ভাগ করা যায়।




প্রথম পর্বটা হল রোমান সম্রাজ্যের সময়কালে, যার শুরু খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকে।পরের পর্বটা হল বাইজ্যান্টাইন ইফেসাস, যার শুরু ধরা যায় খ্রিষ্টাব্দ ৩৯১ সনে। এই সালে অফিসিয়ালি Byzantine সম্রাট Theodosius-I, খ্রিষ্টধর্মকে এই শহরের অধিবাসীদের ধর্ম হিসাহে ঘোষিত করেন। আর এই বাইজ্যান্টাইন ইফেসাসের স্থায়িত্বকাল ছিল ১৪০০ এডি অব্দি। ইফেসাসে তৃতীয় শতকে বেশ কিছু ভূমিকম্প হয়েছিল, মেজর ভূমিকম্প হয় ২৬২ সালে। তারপর ধীরে ধীরে ইফেসাস আবার গড়ে ওঠে।  রোমান আমলে ইফেসাসে ছিল বিখ্যাত আরটেমিস মন্দির আর বাইজ্যানটাইন আমলে ইফেসাসের কাছে তৈরী হয় সেন্ট জন ব্যাসিলিকা। এই কাঠের তৈরী ব্যাসিলিকা নষ্ট হয়ে যাওয়াতে, সম্রাট জাস্টিনিয়ান- এর আমলে ষষ্ঠ শতকে 
পাথরের তৈরী চার্চ তৈরী হয়। ফলে রোমান আমলে আরটিমিসের মন্দিরের কল্যাণে এবং খ্রিষ্টান আমলে সেন্ট জন চার্চ ভার্জিন মেরির হাউসের অবস্থানের ফলে তীর্থক্ষেত্রের রূপ নেয়। সেই কারণে এই শহরের অস্তিত্ব ১৪০০ শতক অব্দি বজায় ছিল। হেয়ারোপলিস ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার পর আর পুনর্নিমিত হয় নি, কিন্তু ইফেসাসে বন্দর থাকায় রোমান সম্রাজ্যের ফাইনান্সিয়াল ক্যাপিটাল হওয়াতে, ট্যাক্স কাটিং সরকারী অনুদানে অনেক ভেঙে যাওয়া বিল্ডিং আবার নির্মিত হয়। উপরের ইতিহাসটুকু ওখানের কয়েকটা সাইনবোর্ডের লেখা থেকে সংক্ষিপ্তসার। আরেকটা খবর জানা গেল খ্রিষ্টপূর্ব ৩৩ সালে এ্যন্টনি আর ক্লিওপেট্রা এখানে শীতকালটা কাটিয়েছিলেন।

 এই শহরের অনেক কিছুই ভাঙা অবস্থায় আছে, তবুও এর থেকে রোমান সিটি যে ধাঁচে তৈরী হত এবং রোমানদের সোশ্যাল লাইফ কেমন ছিল তার এক যথাযথ আভাস পাওয়া যায়। ইফেসাসের অবস্থান একটা ঢালু পাহাড়ী জায়গায়। পুরাতাত্বিকদের মতে এর এরিয়া ছিল ৪৮ স্কোয়ার কিমি এবং রোমান সম্রাজ্যের স্বর্ণযুগে এখানে ৩লক্ষ লোকের বসবাস ছিল। সমুদ্র (Agean sea) এখান থেকে কাছে। এফেসাস ছিল নদী বন্দর।


বাণিজ্যিক শহর হিসাবে, এশিয়া মাইনর বা তুরস্কের সবচেয়ে বড় শহর ছিল Ephesus. রোমান সম্রাজ্যের রাজনৈতিক ক্যাপিটাল ছিল রোম, কিন্তু ইফেসাস ছিল ইকনমিক And ক্যাপিটাল। বাস আমাদের হিলের উঁচুদিকের গেটে ছেড়ে দিল। আমরা উপর থেকে পুরো শহরটা দেখতে দেখতে নীচের দিকে আসব। নীচে আরেকটা গেট আছে। বাস ওখানেই থাকবে। দুইদিক দিয়েই টিকিট কেটে ঢোকা যায়। এই প্রাচীন ধ্বংসাবশেষের ইতিহাস খ্রীষ্টজন্মের হাজার বছরের পুরানো হলেও, দর্শকদের জন্য দেখার মত এ্যম্ফিথিয়েটার, লাইব্রেরি, থিয়েটার জিমনেসিয়াম, যা এখনো বর্তমান, সবই তৈরী হয়েছিল। 

টিকিট কেটে ঢুকে যে দিকে তাকাইসেইদিকেই পাথরের স্তুপ, মাঝে মাঝে কিছু কিছু কলাম মাথা তুলে দাঁড়িয়ে, পাথরের রাস্তা মাঝখান দিয়ে নেমে গিয়েছে। প্রথমে ঢুকতেই ডানদিকে যে বেশ কয়েকটা পাথরের আর্চওয়ালা পাঁচিল দেখলাম


সেটা রোমান বাথ হাউস (Agora bath) এসব এক্সকাভেট করে বার করা হয়েছে। ফলকে লেখা দেখলাম হট ওয়াটার বাথও ছিল। এরপর যে জায়গাটাতে প্রথমে এসে দাঁড়ালাম, সেটা হল প্রাইটেনিয়াম (Prytaneum) রোমান এক্সিকিউটিভ কাউন্সিল (Prytan), যাদের উপর ইফেসাস চালনার ভার থাকত, তাদেরকে শহরের ধনী এলিট সম্প্রদায় থেকে নির্বাচিত করা হত।



এই বিল্ডিংএ তাদের মিটিং হত, বাইরের ডিগনিটারি এলে এখানেই অভ্যর্থনা জানান হত। এখন ধ্বংসাবশেষের মধ্যে কিছু টুসকান(Tuscan) কলাম দাঁড়িয়ে আছে। রোমান স্থাপত্যশৈলীর বিশেষত্ব ছিল এই লম্বা লম্বা Tuscan column. গ্রীস স্থাপত্যশৈলীতেও এইরকম কলাম হত, কিন্তু রোমান আর্কিটেকচারে কলামের উপরিভাগে (বিমের সংযোগকারী জায়গাতে) নানা ধরণের, বিশেষত রোমান দেব-দেবীর শিল্পকর্ম খোদিত থাকত। জেম আমাদের বল্ল রোমান আমলের বিখ্যাত আরটিমিসের মন্দির এই ইফেসাস শহরের মূল অংশ থেকে একটু দূরে, কিন্তু মন্দির পুরো ভাঙা অবস্থায়, তাই ট্যুরিস্টরা দেখতে যায় না। 

আরেকটু এগিয়ে জেম দেখাল দর্শকের গ্যালারি যুক্ত সেমি সার্কুলার ওয়েতে একটি মঞ্চ।


এটা কিন্তু ওয়েলপ্রিসার্ভড স্ট্রাকচার। আগে যা দেখলাম সেরকম কষ্ট কল্পনার দরকার নেই। জেম বলল এটার নাম ওডিওন (Odeon). এখানে কালচারাল ফাংশন, পলিটিকাল মিটিং, সোশাল ইভেন্ট অনুষ্ঠিত হত। এরপর চারটে করিন্থিয়ান (Corinthian) কলামের উপর আর্চওয়ালা একটা স্ট্রাকচার দেখতে পেলাম।

এর নাম Temple of Hardian. টেম্পল নাম হলেও এটা আদতে একটা মনুমেন্ট। সম্রাট হার্দিয়ানের ইফেসাস ভিজিটের আগে বানান হয়েছিল। বাকী ভাঙাচোরার মধ্যে এটা একটা নজরকাড়া স্ট্রাকচার। পাথরে বাঁধান রাস্তা ঢালু হয়ে নেমেছে। এই রাস্তার নাম হল কিউরেটেস (Curetes) স্ট্রিট।


আরটিমিসের পূজারীদের বলা হত কিউরেটাস। এই রাস্তা দিয়ে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বেরোত আরটিমিস মন্দিরে যাওয়ার জন্য, সেই থেকে এই রাস্তার নামকরণ। বেশ কিছুটা দূরত্বে ইফেসাসের সবচেয়ে বর্ণময় স্থাপত্য লাইব্রেরি অফ সেলসুস (Celsus) দেখা যাচ্ছে।

সব স্ট্রাকচারই রাস্তার ডানদিকে। বামদিকে একটা কভার্ড জায়গা দেখা গেল। জেম বলল এটা মিউজিয়াম কাম এলিট লোকেদের বাসস্থান। এখানে এখনও এক্সভাশন চলছে। এইখানে ঢুকতে আলাদা টিকিট লাগে। একটু এগিয়ে দেখলাম পাবলিক টয়লেট।

মল-মূত্র বার করার জন্য কমন স্যুয়ারেজ লাইন দেখলাম। একটু এগিয়ে রাস্তাটা ডানদিকে ঘুরে গিয়েছে।

এর ঠিক পাশেই হল লাইব্রেরির ম্যাজেস্টিক ডবল কলাম ওয়ালা গ্র্যান্ড এনট্রি।


রোমের প্রভাবশালী, বিত্তবান সেন্টার সেলসুসের নাম তার ছেলে এই লাইব্রেরি বানান। ১৩৫ এডিতে এর কনস্ট্রাকশন সম্পূর্ন হয়। বার হাজার scroll ছিল এই লাইব্রেরিতে। ইফেসাসে সবচেয়ে সুন্দর ফটো তোলার জায়গা হল লাইব্রেরির গেটের ব্যাকগ্রাউন্ডে। 

জেম একটা মজার জিনিষ জানাল। লাইব্রেরির সামনের রাস্তার ঠিক উল্টোদিকে ছিল ব্রথেল। তলা দিয়ে আন্ডারগ্রাউন্ড টানেল ছিল, লাইব্রেরি থেকে সোজা টানেলে যাবার! বোঝাই যাচ্ছে দুই হাজার বছর পরেও সমাজে ভাবমূর্তি স্বচ্ছ রাখার একই রকম প্রচেষ্টা। বৌকে লাইব্রি যাচ্ছে বলে টানেল দিয়ে বারাঙ্গনা বিহারে গেলে কে আর কি বুঝছে! লাইব্রেরির ডানদিকে বিশাল খোলা চত্বরের তিনদিক জুড়ে খোপে খোপে ঘর।



এটা ছিল ইফেসাসের বাজার। মাঝখানের জায়গাটাতে রোমান নোবেলদের স্ট্যাচু ছিল। বাজার থেকে একটু এগিয়ে রাস্তার ডানদিকে দেখলাম এ্যম্ফিথিয়েটার। এই থিয়েটারের তৈরী শুরু হেলেনিস্টিক পিরিয়ডে (আলেকজান্দারের সময়ে) তারপর রোমান পিরিয়ডে এম্পারার ক্লডিয়াস (Claudius 42-51 AD) তারপর নিরো (54-68 AD) আর সম্পূর্ন হয় এম্পারার ট্রাজান (Trajan 98-117AD) এর সময়ে।ইফেসাসেরএটা রিনোভেটেড সবচেয়ে ওয়েলপ্রিসারভড স্ট্রাকচার।



অর্ধচন্দ্রাকারে দর্শকদের থ্রি-টিয়ার গ্যালারী। পিছনের পাহাড়ের একটা অংশ কেটে ধাপে ধাপে উঠে গিয়েছে দর্শকদের গ্যালারি। জেম দেখাল একদম উপরের দর্শক আসনের পাশে এ্যকোআডাক্ট।


ওই চ্যানেল দিয়ে জল আসত। এরকম aqueduct রোমান আর্কিটেকচারের বৈশিষ্ট্য। ইস্তাম্বুলেও দেখেছি পাথরের - মিটার উঁচু কলামের উপর দিয়ে aqueduct যাচ্ছে। নীচে প্ল্যটফর্মের পাশে সুড়ঙ্গ।

এর
মধ্যে দিয়ে খেলোয়াড় বা এনিম্যল আসত। এখানে গ্ল্যডিয়েটর ফাইটও হত ৭০০ এডি পর্যন্ত। নীচের দিকের সিটগুলো ভিআইপি গ্যালারি। ফটো তোলা হল অনেক। হেয়ারোপলিসে যেমন ভূমিকম্পে ভেঙে যাওয়ার ফলে প্রান্তরের বেশীরভাগটাই খালি বা ধ্বংসস্তূপ, যে সব মূর্তি বা অন্যান্য artefact পাওয়া গিয়েছে সবই কোন না কোন মিউজিয়ামে স্থানান্তরিত হয়েছে,কিন্তু ইফেসাসে বুঝতে অসুবিধা হয় না আদতে এনসিয়েন্ট রোমান সিটির লেআউট বৈশিষ্ট্য কি ধরণের ছিল।

এরপরের গন্তব্য অনিতদূরে সেন্ট জন চার্চ।



একটা হিলের উপর (Ayasuluk hill) এই চার্চ ছিল। সেন্ট জন, যীশুর ১২ জন অনুগামী সেন্টদের মধ্যে একজন। তাঁর কবরের উপর প্রথমে কাঠের তৈরী চার্চ ছিল, পরে জাস্টিনিয়ান১ এর সময় ১২টি ডোম বিশিষ্ট একটি ব্যাসিলিকা তৈরী হয়।


জাস্টিনিয়ানের সবচেয়ে বড় দুইটি ইম্পিরিয়াল প্রজেক্টের মধ্যে একটা হল হাগিয়া সোফিয়া এবং অন্যটা হল সেন্ট জন চার্চ।

১৩০৪ সালে সেলজুক ডাইনাস্টি ইফেসাস দখল করে চার্চকে মসজিদে কনভার্ট করে। এর পরে মোঙ্গল ইনভেশন ১৩৬৫ সালের ভূমিকম্পের সময় পুরোপুরি ভেঙে যায়।

অটোমানদের আমলে এই চার্চ রুইন হয়ে পড়েছিল। ২০২০ থেকে এখন আবার রেস্টোরেশনের কাজ চলছে। জেম আলি গ্রাউন্ড লেভেলে চার্চের ভগ্নাবশেষের নীচে মার্ক করে দেখাল এই চার্চের লেআউট, যীশুর ক্রুসের (Greek orthodox cross)

আকৃতির ডিজাইনে করা হয়েছিল।

এখন খালি কয়েকটা কলাম আর আর্চ রেস্টোরেশন করে খাড়া করা হয়েছে। 

এরপর বেরিয়ে এজিয়ান সি-এর পাশে কুসাডাসিতে পৌঁছালাম। কুসাডাসি নামকরা বিচ রিসোর্ট। অনেক হোটেল cruise liner দাঁড়িয়ে।


আমাদের
সফরসঙ্গী ভিয়েতনামি ভদ্রলোক জানালেন গতবছর উনি ক্রুজ করে ইটালি থেকে গ্রীস হয়ে কুসাদাসিতে ছিলেন। পরে দেখলাম, অনক ট্যুরিস্ট ক্রুজে চেপে ইটালি থেকে এখানে আসেন। জাহাজ এক রাতের জন্য নোঙর করে। দিনেরবেলা ইফেসাস, ভার্জিন মেরী, সেন্ট জন দেখিয়ে আবার ক্রুসে নিয়ে আসে। 

এই সামার টাইমে কুসাডাসি ট্যুরিস্টে ভর্তি। শহরের মধ্যে রাস্তায় ট্যুরিস্টের ভীড়, একদিকে সমুদ্র,



অন্যদিকে হোটেল, বাজার, পাহাড়ের স্লোপের উপর হোটেল, হোম স্টে, বেশীরভাগ সাদা রংএর।কুসাদাসিতে যে হোটেলে, সেটা আমারদি বেস্টলেগেছে। নাম হল La Bleu. একদম সমুদ্রের লাগোয়া। যে রুমে ছিলাম সেটা স্যুইট ছিল। পাঁচখানা বেড, ব্যালকনি থেকে সমুদ্র দেখা যাচ্ছে।


সমুদ্র এখানে ঘন নীলবর্ণ। নীচে সমুদ্রের উপর দিয়ে অনেকটা অব্দি কাঠের পাটাতনের ব্রীজ। রেস্টুরেন্টটা হল একদম সমুদ্র ঘেঁষে। সমুদ্রের ঠিক পাশে বসে তারিয়ে তারিয়ে মাছভাজা খেতে খেতে সূর্যাস্তে রাঙানো আকাশ দেখছি,


একটা বেড়াল এসে পিছন থেকে ভাগ বসালো ফিসফ্রাইতে! মূর্তিমান রসভঙ্গ।

পরের দিন আমাদের গন্তব্য বুর্সা (Bursa) হয়ে ইস্তাম্বুল।৬০০ কিমির উপর বাসজার্নি। বুর্সা ৪২০কিমি কুসাদাসি থেকে। বুর্সা ছিল প্রথমদিকে অটোমান সম্রাজ্যের রাজধানী। বেশ রোমাঞ্চ হচ্ছিল। কারণ যে টার্কিশ জনপ্রিয় সিরিজরেজারেকশন এর্টগুলদেখে টার্কি ভ্রমনের ইচ্ছে জেগেছিল, সেই নোমাডিক টার্ক গোষ্ঠীপতি ইর্টুগুলের সন্তান ওসমান গাজী


হলেন অটোমান সম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা। বুর্সাতেই ছিল অটোমানদের রাজধানী। ওসমানের পর তার ছেলে ওরহান ইজমিরও জয় করেন। বুর্সাতে এর্টুগুলের টুম্ব আছে, সেখানে কিছুক্ষণ পরপর গার্ড চেঞ্জ হয়।

সিরিজটার মেন ক্যারেক্টার এর্টুগুল আর তার দুই ছায়াসঙ্গী টুর্গুট আর বামসি, যে রকম ড্রেস তাদের ট্রেডমার্ক অস্ত্র নিয়ে থাকত, গার্ডরাও ঠিক ওইরকম সেজে থাকে। আমাদের হাতে সময় কম। তাই বাস দাঁড়ল মেহমদ১ (Mehmad 1) টুম্বের সামনে।  সামনে গ্রীন মস্ক আর আরেকটু দূরে একটা উঁচু প্ল্যাটফর্মের উপর গ্রিন টুম্ব।



টুম্ব মস্কের টাইলসের কালার নীল, আশেপাশে অনেক গাছপালার গ্রিন কভারেজ, তাই নাম হয়েছে গ্রিন মস্ক। মেহমদ১ অটোমান বংশের পঞ্চম সুলতান। তৈমুর লঙ্গের সাথে আঙ্কারর যুদ্ধে (১৪০২), অটোমানদের হার হওয়ার পর, অটোমান সম্রাজ্য তিনভাগে ভাগ হয়ে যায়।  মেহমুদ১ আবার অটোমানদের একত্রিত করেন এবং বুর্সা থেকে Edrine রাজধানী শিফ্ট করেন। এরপর মেহমদ২ Edrine থেকে এসে ১৪৫৩ সালে ইস্তাম্বুল জয়ের পর অটোমান সম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা হয়। 

কাছেই একটা দোকানে লাঞ্চ করে, দেখি রাস্তার পাশে সুন্দর জলের কল লাগান।


এ্যন্টিক স্থাপত্য দেখে ওই কলের জল খেতে খেতে ফটো তুললাম। 

জেম আলি বলছিল বুরসাতে পৃথিবীর লঙ্গেস্ট কেবলকার আছে। শীতকালে সবাই উইন্টার স্পোর্টস করতে যায়।

বুরসা থেকে ইজমির হয়ে বাস পৌঁছাল ইস্তাম্বুলের সেই এলিট ওয়ার্লড হোটেলে। পরের দিন রাত আটটাতে ফেরার ফ্লাইট। 

কনডাক্টেড ট্যুর শেষ। এবার বেরোতে হলে নিজেদের প্ল্যানে। ঠিক করলাম হাগিয়া সোফিয়ার ভিতরটা দেখা হয় নি। ১৪০০ বছরের পুরানো এই মস্ক কখনো চার্চ ছিল, বাইজান্টাইন আমলে। ভিতরে মিউজিয়াম আছে। ২৫ ইউরো করে টিকিট। সকালে ব্রেকফাস্ট করে বেরিয়েছি। হোটেল থেকে ট্যাক্সি নিলাম। ২৫ কিমি দূরে যেতে হব। কিন্তু কপালে হাগিয়া সোফিয়া লেখা ছিল না। আজ পয়লা মে। মে-ডে পালিত হচ্ছে। সুলতানমেটের কিছু আগে ট্যাক্সি ঘুরিয়ে দিল। ভাবলাম কাছে মেট্রো স্টেশনে নেবে ট্রনে করে যাব। কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখলাম ট্রেন বন্ধ। অগত্যা ঘুরে আমরা মল অফ ইস্তাম্বুলে নামলাম। কেনাকাটির কিছু নেই। লাঞ্চ করে হোটেলে ফিরে এলাম। ৩টের সময় গাড়ী এসে আমাদের এয়ারপোর্টে ড্রপ করে দিল।

টার্কি ভ্রমন সাঙ্গ হল। 

শেষ



Comments

  1. Fascinating chronicle of a captivating pilgrimage through history throbbing with life. The writeup is so complete, so informative yet so unobtrusive that I have enjoyed the Turkey trip totally and won't need to visit physically. Thanks for saving my time trouble and money !!!

    ReplyDelete
  2. সব পর্বগুলো ধীরে সুস্থে পড়ে শেষ করলাম, আমার ও মানস ভ্রমণ হয়ে গেলো...খুব ভালো লাগলো।

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

ত্রিবেনী তীর্থপথে ও আরো টিটবিট

রবিঠাকুর ও কিছু হাসি মশকরা

A walk to explore Delhi’s lesser known monuments