অতুলনীয় টার্কি (পর্ব ২)



অতুলনীয় টার্কি (পর্ব )

পরদিন সকালে বাস আমাদের আবার সুলতানমেট এরিয়াতে নামিয়ে দিল। ভিতরের রাস্তা বেশ সরু, তবে ওয়ানওয়ে।


ফুটপাথ আর রাস্তার মাঝে, ছোট ছোট লোহার স্তম্ভ। বড় বাস কোনমতে বাঁকা রাস্তায় টার্ন নিয়ে চলেছে।



নেমে একটু হেঁটে আমরা পৌঁছালাম টিকিট কাউন্টারের সামনে। ছোট চত্বরের আরেকদিকে হাগিয়া সোফিয়ার টিকিট কাউন্টার। সামনেই হাগিয়া সোফিয়ার পিছনদিকের অংশ। দুই দ্রষ্টব্যস্থলেই বেজায় ভীড়। জেম আলি আমাদের একটা করে হেডফোন দিল আর নিজের হাতে মাইক্রোফোন। প্যালেসে ঢোকার প্রথম গেট হল সুলতান গেট।

এটা
বানিয়েছিলেন মেহমেদ-টু ইস্তাম্বুল জয়ের পর ১৪৭৮ সালে। ভিতরে অনেক হাঁটতে হয়। দ্বিতীয় গেটটার নাম গেট অফ স্যালুটেশন।

দুইদিকের তোরণে বাইজানটাইন আর্কিটেকচারের ছাপ।এই দ্বিতীয় গেটের ভিতর বাইরের সাধারণ লোকের ঢোকা মানা ছিল। কেবল সুলতান ঘোড়ায় চড়ে ভিতরে যেতে পারতেন। বাকী আমাত্য বা ডিগনিটারিদের পায়ে হঁটে যেতে হত।   ভিতরে ঢোকার পর জেম আলির উঁচু করে ধরে থাকা ছাতা অনুসরণ করলাম। গোল্ডেন হর্নের ঠিকপাশে অটোমান এম্পায়ারদের এই রয়াল প্যালেস। জায়গাটা অনেকটা ছড়ানো। প্যালেস বলতে আমরা যেরকম রাজপ্রাসাদ ভাবি সেরকমটা নয়।
       Aerial view of Topkapi palace
কারণ অটোমানরা আদতে নোমাড টার্কদের বংশোদ্ভুত। তারা থাকত তাঁবুতে। ইস্তাম্বুলের আগে  আরো উত্তরে Edirne বলে তুরস্কের শহরে অটোমানদের প্যালেস ছিল। সেখানেও সব একতলা ছড়ানো বিল্ডিং ছিল। এখানেও তাই। সেকেন্ড কোর্টইয়ার্ডের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন প্রাসাদ হল ইমপেরিয়াল কাউন্সিল।

বিল্ডিং
এর বাইরেটাতে ছাদ বিশিষ্ট লম্বা করিডোর।কিছুটা আমাদের দেওয়ানি খাসের মত। তবে পাঁচিলবিহীন নয়, ঘরের মধ্যে সামনের দেওয়ালে জাফরির কাজ করা।
The window with wire mesh in the wall is the place where sultan used to sit. The final verdict will be given by sultan after discussion with grand yuzir and council of ministers. 

সুলতান নাকি এর ভিতরে বসতেন। সুলতান, গ্রান্ড উজীর অন্যান্য কাউন্সিল মিনিস্টারদের সভা হত রাজ্য পরিচালনা নিয়ে।ভিতরে Iznik টাইলসের সোনালী ডিজাইন।

   পরের ঘরটা ঘড়ির মিউজিয়াম।



তৃতীয়
ঘরটার নাম inkwell chamber. 
এখানে রাজকার্য সম্বন্ধিত সমস্ত ডকুমেন্ট লেখালেখির কাজ হত।

আরো বেশ কিছুটা হেঁটে যে বিল্ডিংএ এলাম, আদতে ছিল ট্রেজারি বিল্ডিং।


এখন এটা মিউজিয়াম। সুলতান সেলিম (রাজত্ব ১৫১২-২০), আরবে যুদ্ধে জিতে প্রফেটের নানা রেলিক (দাঁত, দাঁড়ি, পায়ের ছাপ) রাখা আছে।
            Box to keep prophet Muhammad’s sandal
       Sandal of Prophet Muhammad 


            (Prophet Muhammad’s footprint)
একটা ঘরে অটোমান শাসকদের অস্ত্রসস্ত্র প্রদর্শিত হয়েছে। 

টোপকাপি প্যালেস সুলতান মেহমদ- নির্মান করেন ১৪৭৮ সালে। তারপর ৪০০ বছর ধরে ৩০জন সুলতান তাদের রাজত্বকালে নূতন নূতন নির্মান করেন। প্যালেসে চারশ ঘর আছে, সুলতান আমলে ৪০০০ লোক থাকত। ঢোকার সময় দেখেছি দ্বিতীয় চত্বরের বাঁদিকে আলাদা লাইনে টিকিট কেটে অনেকে হারেমে ঢুকছে।


হারেমে সুলতানের রাণীরা থাকত। আমাদের হাতে মাত্র ঘন্টা দেড়েক সময়। ভাল করে দেখতে তিন/চার ঘন্টা লাগবে। এরপর আমরা বসফরাসে cruise চেপে দুই ঘন্টা ঘুরব। 

মিউজিয়াম পেরিয়ে চতুর্থ চত্বরে ঢুকলাম। এটাই শেষপ্রান্ত। তিনদিকে সমুদ্র। মাঝখানে সুদৃশ্য গার্ডেন বাঁদিকে দুটো মার্বেলের তৈরী বিল্ডিং, ডানদিকেও কয়েকটা প্যাভেলিয়ান। একটা প্যাভেলিয়ানে ঢুকেছি, ভিতরটা ফাঁকা, বাইরে লেখা-এখানে সুলতানের বংশধরদেরসুন্নাত’(circumcision) করান হয়।


এখান থেকে গোল্ডেন হর্ন এর সমুদ্র তার পারে  গালাটা টাওয়ার সহ ইউরোপিয়ান ইস্তাম্বুলের একাংশ,
The view of Golden horn and also part of Istambul fort wall which was heavily damaged due to cannon fire by Mehmad II, the conqueror in 1453 during his epic 53 day seize of Istambul fort occupied by Byzantine.
                        At Topkapi premises
অন্যদিকে বসফরাসের অপর পারে এশিয়ান ইস্তাম্বুল। 

গোল্ডেন হর্নের একপাশে বাগদাদি কিয়স্ক।


১৬৩৯ সালে সুলতান মুরাদ-৪ বাগদাদ বিজয়ের স্বারক স্বরূপ এটা বানিয়েছিলেন।
                      Interior of Baghdadi kiosk
 তোপকাপি প্যালেসের রসুইখানা বিখ্যাত।
         (তোপকাপির রসুইখানা, ৮০০ শেফ কাজ করত)
এখানে বারহাজার পটারি আছে। দূর থেকে দেখলাম লম্বা লাইন। টাইম নেই, জেম আলি তাড়া দিচ্ছে। তাই কিচেনটা বাদ দিতে হল। যা দেখলাম, তাই অনেক। প্যালেসের ঘরগুলির মধ্যে যে সূক্ষ কারুকাজ আছে, তা মুসলিম  আর্কিটেকচারারে অপূর্ব নিদর্শন।

বাস নিয়ে এল বসফরাসের তীরে। আমরা উঠলাম cruise এ। উপরে নীচে দুই জায়গাতে বসার ব্যবস্থা। সমুদ্রের ঠান্ডা হাওয়া লাগছে। গোল্ডেন হর্ণের যে ব্রীজটা সুলতানমেট আর টাকসিম স্কোয়ারকে জুড়েছে, তার কাছ থেকে ছাড়ল cruise. সমুদ্রের ঠান্ডা হাওয়া লাগছে গায়ে। বসফরাসের বাঁদিকের কোণ ঘেঁসে চলেছি। সমুদ্র হলেও এটা একটা প্রণালী, ডানদিকের পাড়ও সুন্দর দেখা যাচ্ছে।



দুইদিকটা ছবির মত। বসফরাসের উপর দিয়ে ইউরোপ এশিয়ার সংযোগকারী তিনটে ব্রীজ আছে। প্রথম ব্রীজ ক্রস করার পর একটা প্রাসাদ দেখা গেল।

এর নাম বেইলিরবেয়ি (Beylerbeyi palace) পাশ্চাত্য সভ্যতার সংশ্পর্ষে এসে ১৮৬৫ সালে অটোমান সুলতান এই প্যালেস তৈরী করেন ইউরোপিয়ান আদলে। ১৯২২শে গৃহযুদ্ধের সময় এখানেই সুলতান আবদুল হামিদ- কে গৃহান্তরীণ রাখা হয়েছিল।

কিছু জায়গায় দেখলাম মৎসশিকারীরা ছিপ নিয়ে বসে আছে। আরেকটা হলুদরংএর লম্বা প্যালেস দেখা গেল। এটি তুরস্কের সবচেয়ে পুরানো স্কুল। ১৪৮১ সালে প্রতিষ্ঠিত এই স্কুল পাশ্চাত্যের ইটনের সঙ্গে তুলনীয়। বর্তমানে এর নাম গালাটাসরাই ইউনিভার্সিটি।


একটা ছোট পাহাড়ী জায়গাতে বসফরাসের পাশে ফোর্ট দেখা গেল। এর নাম রুমেলিহিসারি (Rumelihisari) ফোর্ট।



ইস্তাম্বুল জয়ের সময় মেহমট- বানিয়েছিলেন। এই ফোর্টকে ব্যবহার করা হত যাতে বাইজানটাইনদের সাহায্য করতে বসফরাস দিয়ে কোন শত্রুপক্ষের জাহাজ না আসতে পারে। 

বসফরাসের দ্বিতীয় ব্রীজের কাছ দিয়ে আমরা ইউ টার্ন নিয়ে ফেরত এলাম।


এবারে জাহাজ বাম দিক ঘেঁষে এল। বসফরাসারে ধারে ছবির মত প্রাইভেট রেসিডেন্স। আমরা নামলাম এশিয়ান সাইডের জেটিতে। 

দুই ঘন্টার cruise সফর শেষে, দুপুর দেড়টা নাগাদ বাসে চড়লাম।আজকের গন্তব্য আঙ্কারা, তুরস্কের রাজধানী, ইস্তাম্বুল থেকে ৪৫০ কিমি, পাঁচ ঘন্টা লাগবে।


টার্কির হাইওয়ে মসৃন, ছোট ছোট পাহাড়ের পাশ দিয়ে কোথাও টানেল বা গিরিখাদে পিলার বানিয়ে তার উপর দিয়ে হাইওয়ে। জেম আলি দীর্ঘ বাসজার্নিতে বর্তমান তুরস্কের নানা কথা শোনাল। তুর্কীতে ইনফ্লেশন প্রচন্ড হাই, ৪৫% বছরে। এখানে এভারেজ ইনকাম ১৭০০০ লিরা মাসিক। আমরা যখন ছিলাম তখন লিরা ছিল ভারতীয় রুপিতে .৫৮/- মারমারা সাইডে ইউরোপিয়ান ছোয়া, ধর্মীয় গোঁড়ামি কম। যত ইস্টে যাওয়া যাবে তত অর্থোডক্স।  রাত আটটা নাগাদ পৌঁছে গেলাম আমাদের হোটেল রাডিসন ব্লু-তে।

রাতে হোটেলে ডিনার করে বেরিয়েছি, পায়ে হেঁটে আশপাশটা ঘুরব। একটু এগিয়ে চৌমাথার পাশে আলোকিত মস্ক।


The name of this monument is ‘victory monument’. Built in 1927 to commemorate Turkish war of independence, the equestrian is none other than Kamal Ataturk

Melike Hatun (a 14th century Anatolian royal lady, who won many property in Ankara) Mosque.🕌 

বাঁমদিকের ফুটপাথ দিয়ে এগিয়ে পরের চৌমাথার পাশে লনে বেশ কয়েকটা বসার চেয়ার।


একটা চেয়ারে বসে চারিদিক অবজার্ভ করছি, পরের বেঞ্চে তিনটি তরুণ হিন্দিতে কথা বলছে। আলাপ করলাম। দুইজন পাকিস্তান থেকে আর অন্যজন ইউপির রামপুর।


এরা সবাই সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে। একজন দইহান, অন্যজন ফারহাজ আর তৃতীয়জন হাসান। ফারহাজ পার্ট টাইম জব করে। পড়াশুনার পর এখানে জব পাবে কিনা শিওরিটি নেই। তবে এখানে ওদের অসুবিধা হচ্ছে না। একসঙ্গে সবাই থাকে। পরদেশে হিন্দুস্তান-পাকিস্তান ভাই-ভাই। শুধু ভারতে আমরা এক অদৃশ্য বিভেদের প্রাচীর তুলে রেখেছি। রাস্তার উল্টোদিকের একতলা বিল্ডিং দেখিয়ে বল্ল-এটা স্বাধীন টার্কির প্রথম পার্লামেন্ট।

একটু দূরে রাতের অন্ধকারে আবছা অবয়বে পাহাড়ের উপর আঙ্কারা প্যালেস। আগামীকাল আমাদের এখানেই আসতে হবে। প্রত্যেক শীতকালে এখানে বরফ পড়ে। খালি এই শীতে পড়ে নি। আঙ্কারা শহরটা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৩০০০ ফিট উপরে। তাই তুরস্কের বাকী জায়গার থেকে ঠান্ডা বেশী।
ওরা আমাকে গল্প করতে করতে হোটেল অব্দি এগিয়ে দিল। জল কিনতে হবে। হোটেলে খালি দুটো হাফ লিটার বোতল দিয়েছে। এমনি জাগে জল দেওয়ার নিয়ম নেই। হোটেলে কিনলে আধ লিটার জলের দাম ৭৫ টাকা। ফুটপাথের পাশে দেড়লিটার জল নিলাম ৪০ টাকায়। পরে দেখলাম একমাত্র ইস্তাম্বুল ছাড়া কোন হোটেলে বরাদ্দ আধ লিটার ছাড়া এক্সট্রা বোতল দেবে না।

তৃতীয় দিন সকালে বেরিয়েছি। আজ আমরা আঙ্কারার দ্রষ্টব্য Archeological Museum কামাল আতাতুর্কের Mausoleum দেখে যাব ক্যাপাডোকিয়াতে। পথে আরো দুটো দেখার জায়গা আছে। 

আঙ্কারা হল এনাতোলিয়া রিজিয়নে। এনাতোলিয়ার ল্যান্ডস্কেপ হল পাহাড়ী, মারমারা বা মেডিটেরিয়ান রিজিয়নের থেকে বৃষ্টি কম ফলে গাছপালা কম, এদিকে শীতকালে ঠান্ডও বেশী পড়ে। সফরের পরের পার্টে আমরা যাব ক্যাপাডোকিয়া কনিয়াতে। এরাও এনাতোলিয়া রিজিয়নে। তবে সিভিলিয়াজেশনের দিক দিয়ে এনাতোলিয়ার ইতিহাস প্রাচীন। ১২০০০ বছর আগে মানুষের বসবাসের নিদর্শন আছে গোবলকি (Gobekli Tepe) এবং শ্যাটালহক (Catalahouyk) ৮০০০ বছর পুরানো শহরের খননকার্য এখনও চলছে।




শ্যাটালহক ছিল কনিয়া শহর থেকে ২৫কিমি দূরে। ঠাসা প্রোগ্রামের জন্য ইচ্ছে থাকলেও যাওয়া হয় নি। পুরো তুরস্ক প্রত্নতত্ব সমৃদ্ধ দেশ। 

Anatolian Archeological Museum দেখে এখানের প্রাচীন সভ্যতার সম্যক পরিচয় পাওয়া গেল।

                               Museum entry
                   Entry ticket gate for Museum 
৬৫০ বছর আগে এই বিল্ডিং অরিজিনালি ছিল ক্যারাভানসরাই (Caravansar) ৪,০০০ বছর আগে ইরাকের এসিরীয়ান ( Assyrian ) দের সঙ্গে এনাতোলিয়ানদের ট্রেডিং চলত।

এসব লেখা আছে এসিরীয়ানদের প্রবর্তিত কুনিউর্ম (Cuneiform) শিলালিপি থেকে। এরপর খ্রীষ্টপূর্ব (১৮০০-১২০০) শতকে হিটাইটরা (Hittite) এখানে রাজত্ব করত।এরপর আসে বালকান স্টেট থেকে ফিগ্রিয়ান (Phigryian)
                  Pottery made by Phygrians
        Wooden table made by Phygrians who were good .            in woodwork (600-800 BC)
তারপর রোমানরা।

Cybele was considered the Great Mother of the Gods and was associated with motherhood, nature, fertility, and agriculture. She was originally worshiped in the kingdom of Phrygia, but her cult spread to Greece and Rome, where she was identified with various Greek and Roman goddesses. Her cult was a major cult in the Roman Empire.
এনাতোলিয়াতে
শুরুর দিকে খ্রীষ্টধর্মের প্রথম প্রচার হয়। রোমানদের তাড়া খেয়ে খ্রীষ্টধর্মের প্রচারকরা এখানের গুহায় বসবাস করতেন। এর নিদর্শন পরে আমরা ক্যাপাডোকিয়াতে দেখেছি। পঞ্চাশটার উপর রুমে নানারকম প্রত্নতাত্বিক নিদর্শন।
Dating back to 700-900 BC found Gaziantep, a city near Syria border, the sculpture depicts musician playing instruments 
Servants carrying sacrificial animal for legendary Sumerian queen ‘Kubaba’

Model showing Bronze age people
Findings from Roman Theatre in Ankara
King Mutallu 1200-700BC, believed to be a local king, send by king of Assyria, Sargon II

এরপর আমরা গেলাম কামাল আতাতুর্কের সমাধি দেখতে। আঙ্কারা শহরের মধ্যবর্তী অংশে, একটু উঁচু পাহাড়ী টিলার উপরে, সবুজ প্রকৃতির মাঝে  বিশাল চত্বর জুড়ে সমাধি ও সংলগ্ন মিউজিয়াম।প্রথম বিশ্বযুদ্ধে (১৯১৪-১৮) জার্মানির সঙ্গে মিলে যুদ্ধে যোগ দিয়েছিল টার্কি। তখনও আজকের মডার্ন ইউরোপ তৈরী হয় নি। ব্রিটিশ, ফ্রেঞ্চ, জার্মান, অস্ট্রোহাঙ্গেরিয়ান, রাশিয়ান এম্পায়ারের মত অটোমান এক শক্তিশালী এম্পায়ার ছিল। যুদ্ধে হেরে আটলাখ অটোমান সৈন্য মারা যায়। যুদ্ধশেষে ব্রিটিশ, ফ্রেঞ্চ রা ঠিক করেছিল,,টার্কিকে টুকরো করে নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করে নেবে। মুস্তাফা কামাল (১৮৮১-১৯৩৮) ছিলেন একজন আর্মি কমান্ডার।  বিশ্বযুদ্ধ শেষে ফ্রেঞ্চ, গ্রীক, আর্মেনিয়ান সবাই টার্কি দখলের জন্য অগ্রসর হয়। আঙ্কারাতে এসে মুস্তাফা কামাল টার্কিশ ন্যাশালিস্ট আর্মি বানান।তিন বছর যুদ্ধের পর রিপাবলিক অফ টার্কির জন্ম হয়। মৃত্যু পর্যন্ত তিনি ছিলেন টার্কির প্রেসিডেন্ট। সুইপিং রিফর্ম করে মুসলিম থেকে সেকুলার দেশর মর্যাদা দেন। মেয়েদের ভোটিং রাইট দেন। অচোমান স্ক্রিপ্ট থেকে রোমান স্ক্রিপ্ট চালু করেন। তার আমলে টার্কির প্রভূত উন্নতি হয়। এর আগে টার্কি ছিল মূলত কৃষিভিত্তিক দেশ।  মূল গেট থেকে বেশ কিছুটা হেঁটে গিয়ে সিঁড়ি ভেঙে এক বিশাল চত্বরে পৌঁছালাম।






তিনদিক ঘিরে মিউজিয়াম, একদিকে বিশাল রস্ট্রামের উপর আতাতুর্কের কবর। স্কুলের পড়ুয়াতে ভর্তি। জেম আলি বল্ল - স্কুল কি কলেজের কোন বড় ধরনের অনুষ্ঠানের আগে ছাত্র/ছাত্রীরা এখানে আসে আতাতুর্ককে সন্মান জানাতে। আমাদের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে যেন সিল্কের রোব, ক্যাপ থাকে, এখানেও বিভিন্ন স্কুল কলেজের বাচ্চাদের বিভিন্ন কালারফুল ড্রেস। শিশুসুলভ কলকাকলী, ফটো শেসন দেখে নিজের স্কুল, কলেজ লাইফের উচ্ছাসের কথা মনে পড়ে গেল। তবে আলাপ জমানো মুস্কিল। ইংরাজী প্রায় কেউই বলতে পারে না। জেম আলি বলেছিল-টার্কিতে মিলিটারি চ্রেনিং বাধ্যতামূলক। অনেক আগে তিন বছরের ট্রেনিং হত। এখন ছয়মাসের ট্রেনিং হয়। জেম নিজেও ট্রেনিং নিয়েছে। তবে আজকাল টাকা দিয়ে ট্রেনিং পিরিয়ড কম করা যায়। মুসোলিয়ামের দুইদিকে কয়েকজন করে গার্ড। এরা সবাই শিক্ষানবীশ।


প্রতি ঘন্টায় গার্ড চেঞ্জ হয়, জাতীয় সঙ্গীতের বাজনার মধ্যে। আতাতুর্কের টুম্বে ঢোকার দুইপাশের দেওয়ালে তাঁর জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণের অংশবিশেষ লেখা। ভিতরে কবরটা মার্বেলে তৈরী।


সিলিংটা অনেক উঁচুতে।


(Turkish war of independence museum 1918-22)

টুম্বের ডানদিকে, টার্কিশ ওয়ার অফ ইনিডিপেন্ডেন্সের মিউজিয়ামটা বেশ বড়। যুদ্ধের বড় বড় পোর্টেট ছাড়াও 3D তে ব্যাটেল গ্রাউন্ডের মডেল রয়েছে।



একটা গান ক্যারেজ দেখলাম, এটাতে করে আতাতুর্কের মরদেহ প্রশেসন করে আনা হয়েছিল। সময় কম, তাই তাড়াতাড়ি দেখে বাসে উঠে পড়লাম।আঙ্কার থেকে বেরিয়ে বাস থামল ১৫০কিমি দূরে এক লেকের ধারে। 
এর নাম হল টুজ গলু (Tuj Golu), টার্কিশ ভাষায় মানে হল সল্ট লেক। লেকের পাশে বেশ বড় ছাদের তলায় বাজার। ঢুকতেই প্রথমে হাতে কিছুটা নুন দিয়ে অভ্যর্থনা হল। ওটা দুই হাতে রাব করতে হয়। স্কিনের মধ্যে একটা সফ্টনেস এল, যেমনটা ক্রিম মাখলে হয়। সল্ট দিয়ে তৈরী সাবান বিক্রি হচ্ছে। পাশে লেকের কাছে গেলাম।

জল পাড়ের অনেকটা গোলাপী আভাযুক্ত সাদা রং। এটা টার্কির দ্বিতীয় বৃহত্তম লেক। লেকের গভীরতা / ফিট। সামারে জল অনেকটাই শুকিয়ে যায়। লেকের পাড়ের অনেকটা পর্যন্ত মাটির বদলে সাদা সল্ট।


লেকের জলে পা ভিজিয়ে অনেক ফটো সেশন হল। দুপুরের খাওয়াও ওখানে করা হল।

এর পরের গন্তব্য হাজি বেকটাশি মস্ক কমপ্লেক্স।


Hazi Bektashi Veli (১২০৯-৭১) একজন সুফি সেন্ট ছিলেন।

সময়ে সেলজুক (Seljuk) ডাইনাস্টি, এনাতোলিয়াতে সম্রাজ্য বিস্তার করে। এদের সৈন্যবাহিনীতে সবচেয়ে ফিয়ার্স ফাইটারের দলকে বলা হত জেনিসারি (Jenisseri).

জেনিসারিরা বেকটাশির ফলোয়ার ছিল। হাজি বেকটাশির মূল ফিলজফি ছিল হিউম্যানিটি, সোশাল ইকোয়ালিটি এবং ভালবাসা। গান্ধীজির ফিলোজফির মত -“কেউ আঘাত করলেও তুমি প্রত্যাঘাত করবে না।বেকটাশি রিলিজিয়াস ডগমাট্যিসমের উর্ধে ছিলেন। যেন ধরা যাক ইসলামে মদ্যপান নিষিদ্ধ। কিন্তু বেকটাশি কমপ্লেক্সে তখনকার সময় মদ্যপান প্রচলিত ছিল, কিন্তু অবশ্যই অল্প পরিমানে।



          Burial of sufis, noble men of Bektasi follower 

                        
                               Tomb of Hazi Bektasi



এই কমপ্লেক্স ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের অন্তর্ভুক্ত। এনাতোলিয়া ছাড়াও বালখান অঞ্চল, আর্মেনিয়া, জর্জিয়াতেও বেকটাশি ফলোয়ার আছে। আমাদের গাইড জেম আলির পরিবারও বেকটাশির ফলোয়ার। বেকটাশিরা শিয়া মুসলিম। কামাল আতাতুর্ক ক্ষমতায় আসার পর সব ধরণের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নিষিদ্ধ করে দেন। তখন হাজি বেকটাশির মূলকেন্দ্র আর্মেনিয়াতে শিফ্ট করা হয়। 

বাস থেকে নেমে মেন গেটে ঢোকার আগে হাজি বেকটাশির মর্মরমূর্তি। আগামীকাল ক্যাপাডোকিয়া দেখে আমাদের গ্রুপ ভাগ হয়ে কয়েকজন উত্তরে কৃষ্ণসাগরের দিকে যাবে, আমরা যাব দক্ষিণে মেডিটারিয়ানের দিকে। 


তাই বেকটাশির মূর্তির সামনে গ্রুপ ফটো তোলা হল। ভিতরে একটা জায়গায় তিনটে নল দিয়ে জল পড়ছে। এই পবিত্র জলধারার মাঝেরটাআল্লা’, বামদিকেমহম্মদ ডানদিকেআলিয়ানামে অভিহিত।আরেকটা গেটের ভিতর গিয়ে এক দেওয়ালের মধ্যভাগে, সিংহের মুখ দিয়ে জল পড়ছে। 


এটা দিয়েছিলেন ইরাণের শাহ, যিনি নিজেও শিয়া সম্প্রদায়ের। জমজমের জল যেমন মুসলিমরা নিয়ে যায়, বা আমাদের যেমন গঙ্গাজল, তেমনিনএই জল বেকটাশি সম্প্রদায়ের লোকেরা নিয়ে যায়। আমরা ছাড়া আর কোন দর্শনার্থী নেই। শান্ত, কোলাহলহীন পরিবেশ, মেঘলা আকাশে ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছে। এই কমপ্লেক্স একটা ছোট টিলার উপরিভাগে। অনেকদূর অব্দি ভ্যালি, তারও পরে গ্রাম। পারিপার্শ্বিক মিলিয়ে মনে হচ্ছে যেন আমরা মধ্যযুগে চলে এসেছি। ভিতরে খোলা জায়গায়র একদিকের ঘরগুলিতে প্রদর্শিত সেলজুক জমানার ব্যাহৃত নানা জিনিষ, অস্ত্রশস্ত্রও আছে। গেটের উপরে অঙ্কিতস্টার অফ ডেভিড’, তার মাঝে পদ্মফুল। এটা সেলজুক আমলের সিম্বল। চত্বরের উল্টোদিকে কমিউনিটি কিচেন। ইসলামের রীতি মেনে এখানেও যে কোন অতিথি এলে তার তিনদিনের জন্য থাকা-খাওয়া ফ্রি। বেশীদিন থাকলে স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাইকে কাজ করতে হবে। ভিতরে পীরদের মডেল, কিচেন রান্না করার সিকোয়েন্স, মডেল দিয়ে দেখানো।


      Grain storage space in kitchen
           Musical instruments 

আরকেটা গেট দিয়ে আমরা শেষ চত্বরে এসে পৌঁছালাম। সামনে গম্বুজ তিনকোণা ছাদওয়ালা বেকটাশির সমাধি, ডানদিকে একটু দূরে, অপেক্ষাকৃত ছোট বিল্ডিং- বালিম সুলতান (১৪৬২-১৫১৬) এর কবর।



ইনি এখানে ছোটবেলায় ছিলেন, পরে সেলজুক সম্রাজ্যে সন্মানীয় পদে ছিলেন। তাকে দ্বিতীয় পীর বলা হত।  বেকটাশি ফলোয়াররা যেই সব রিচ্যুয়াল, সেরিমনি পালন করে, তা বালিম সুলতানের নির্দেশনা অনুযায়ী শুরু হয়। 

বাইরে এসে মনে হল এক মধ্যযুগীয় স্বর্গীয় পরিবেশ থেকে বেরিয়ে এলাম। 

আরো একশ কিলোমিটার এসে বাস থামল ক্যাপাডোকিয়ার রামাদা হোটেলের সামনে।


               Cappadocia house being built by stone
Local village back of hotel, during my evening stroll 
Hotel Ramada at Cappadocia
তখনো সন্ধ্যা হয় নি। চেকইন করে জল কেনার অছিলায় বেরোলাম। হোটেলের সামনে হাইওয়ে। পিছনদিকে ছবির মত একটা গ্রাম। হাঁটতে হাঁটতে সেই কলোনিতে পৌঁছালাম। বাড়ীগুলো সব পাথরে তৈরী। লাল রং এর ত্রিভুজাকৃতি ঢালু ছাদ। সুন্দর ডিজাইন। লোক বিশেষ দেখলাম না। ফেরার সময় হাইওয়েরলপাশের দোকান থেকে জল কিনলাম।

ক্রমশঃ


Comments

Popular posts from this blog

ত্রিবেনী তীর্থপথে ও আরো টিটবিট

রবিঠাকুর ও কিছু হাসি মশকরা

A walk to explore Delhi’s lesser known monuments