অতুলনীয় টার্কি (পর্ব ১)




অতুলনীয় টার্কি (পর্ব ১)

তুরস্ক বা টার্কি বেড়ানোর ইচ্ছেটা জেগেছিল নেটফ্লিক্সেরেজারেকশন এর্টুগুলনামে একটা সিরিজ দেখে। এপিক- বলা যায়। কমবেশী আড়াইশ এপিসোড। মধ্য এশিয়া থেকে আসা নোমাডিক টার্করা কি করে এখানে খুঁটি গাড়ল বাইজান্টাইন সম্রাজ্যের অবসান ঘটাল, তারই গোড়ার দিকের ঘটনাবলী। সময়কাল ১৩শ শতাব্দী।


তবে আমাদের এই ট্রাভেল গ্রুপে একএকজনের উদ্দেশ্য বলাবাহুল্য ভিন্ন। একজন জানালেন, তিনি নেটে সার্চ করছিলেন -অর্থনৈতিক অবস্থার কারণে কোন কোন দেশ বর্তমানে ভ্রমনের উপযুক্ত। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য যে টার্কি দেশটা বর্তমানে হাই ইনফ্লেশনে ভুগছে। বছরে চল্লিশ পার্সেন্টের উপর ইনফ্লেশন রেট। তবে ভ্রমন শেষে সবাই একবাক্যে স্বীকার করলেন এরকম সুন্দর, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ঐতিহাসিক ঘটনা সমৃদ্ধ দেশের জুড়ি মেলা ভার। 

 ২২শে এপ্রিল ইন্ডিগোর ‘ক্যাটেল’ ক্লাসে চড়ে, দিল্লীর গরম থেকে যাত্রা করে, ছয়ঘন্টার বিমান যাত্রা শেষে ইস্তাম্বুলের আবহাওয়া মনে হল দিল্লির মিড ডিসেম্বর।


মেঘলা আকাশে ঠান্ডা হাওয়া চলছে। বিমান বন্দর থেকে হোটেলে আসার পথে ঘন সবুজের আস্তরনে মোড়া রোলিং হিলস টাইপের ল্যান্ডস্কেপ।

টার্কিতে সমতল ভূমি বা প্লাটো কম, তার কারণ অতীতে ভলকানিক ইরাপশন থেকে টার্কির জন্ম, এছাড়া কন্টিনেন্টাল ড্রিফ্টের কারণে ইউরেশিয়ান প্লেট এখানে ধাক্কা খেয়ে হিলি টেরন তৈরী হয়েছে। পরে গাইডের কাছে জেনেছি, এই কারনে রেললাইন টার্কিতে খুব কম। তবে হাইওয়ে অসাধারন মসৃন বিশাল নেটওয়ার্কে বিস্তৃত যা আমাদের সফরকালে বুঝেছি, এবং সমস্ত হাইওয়ে ইলেকট্রিফায়েড, রাতে আলোকিত থাকে।বেশীরভাগ শহরেই এয়ারপোর্ট আছে তবে পার্সোনাল গাড়ী বিশেষত ছোট শহরে  দেখলাম  ২০-২৫ বছরের পুরানো মডেল। গাইড বলছিল, টার্কিতে গাড়ীর উপর ধার্য ট্যাক্স বেশী হওয়ার জন্য মধ্যবিত্তদের পক্ষে নূতন গাড়ী কেনা মুস্কিল। তিন মিলিয়ন টার্কিশ লিরা (এক লিরা মোটামুটি আড়াই টাকা ধরা যায়দিয়ে নূতন গাড়ীর বদলে এক-দুই লাখে পুরানো গাড়ী কেনা বুদ্ধিমানের কাজ। এখানে কাউকে সাইকেল চলতে প্রায় দেখি নি, কারণ উঁচু-নীচু ল্যান্ড স্কেপ। টার্কিশ মিলিটারী হল পৃথিবীর সপ্তম বৃহৎ মিলিটারি পাওয়ার। দেশের প্রত্যেক নাগরিকের মিলিটারী ট্রেনিং হল কম্পালসরি। 

আমাদের গাইড হল জেম মহম্মদ। ক্যাপাদোকিয়াতে বাড়ী। মেক মাই ট্রিপের চ্যানেল পার্টনার হল (যারা আমাদের ট্যুর অর্গানাইজ করছে) ইউরোপামুন্ডা। সাতাশ বছর বয়সী ছেলেটি গাইডের চাকরি নিয়ে এখন ইস্তাম্বুলে থাকে। ওকেও ছয়মাসের মিলিটারি ট্রেনিং নিতে হয়েছে। মজার কথা হল আজকাল টাকা জমা দিয়ে ট্রেনিং পিরিয়ডের সময়সীমা কম করা যায়। টার্কির জনসংখ্যা সাড়ে আট কোটি, তার মধ্যে আড়াই কোটি লোক থাকে ইস্তাম্বুলে। তবে ইস্তাম্বুল কিন্তু টার্কির রাজধানী নয়, রাজধানী হল আঙ্কারা, ইস্তাম্বুল থেকে ৪৫০ কিমি দূরে। 

টার্কিতে জিনিসপত্রের দাম বেশী। ইনফ্লেশন হল ৪৫% জেম আলি বলছিল,পার্শ্ববর্তী দেশ জর্জিয়াতে বেড়াতে যায় টার্কিশ লোকেরা, আসল উদ্দেশ্য, শস্তায় ড্রিংকস, মোবাইল ফোন ইত্যাদি কেনার জন্য।

ইস্তাম্বুলে আমাদের হোটেলের নাম হল এলিট ওয়ার্লড ভিস্তা। তেইশতলা উঁচু বিল্ডিংটি খুবই দৃষ্টিনন্দন, লোটাস শেপে তৈরী। 


পরের দিন সকাল আটটার সময় আমাদের ১৭ জনের গ্রুপের ইস্তাম্বুল সফর শুরু হল। একই ট্রিপে অন্য বাসে ৩০ জনের স্পানিশ গ্রুপ। আমাদের গাইড ইংলিশ স্পিকিং আর ওদের গাইড স্পানিশ ভাষায় বলবেন। আমাদের গ্রুপে ছয়জন জন্মসূত্রে ভিয়েতনামি হলেও সেটলড অস্ট্রেলিয়াতে। বাকীরা সব ভারতীয়।৩২ সিটারের ঝকঝকে আধুনিক মার্সিডিজ বেঞ্জ বাস।


চমৎকার আবহাওয়া। মেঘলা আকাশে মৃদুমন্দ ঠান্ডা হাওয়া। আমাদের হোটেল হল ইউরোপিয়ান সাইড অফ ইস্তাম্বুলে। আমরা যাবসুলতানামেটনামক এরিয়াতে, হোটেল থেকে ২৫ কিমি। এই জায়গাটাই হল ইস্তাম্বুলের প্রধান ট্যুরিস্ট স্পট। এখানেই আছে বিখ্যাত হাগিয়া সোফিয়া মস্ক। এছাড়া আরো দুইটি মসজিদ আছে দেখার জন্য একটির নাম ব্লু মস্ক অন্যটি সুলতানশাহী মসজিদ। তিনটি মসজিদের বিশেষত্ব হল তাদের বিশালাকায় আয়তন। তবে হাগিয়া সোফিয়া হল সবচেয়ে পুরানো, বাইজান্টাইন পিরিয়ডে সম্রাট জাস্টিনিয়ান এর নির্মান করেন, এটা আদতে ছিল চার্চ, পরে পনেরশ শতকে অটোমান এম্পায়ারের সময় এটা পরিণত হয় মসজিদে।

মর্ডান টার্কির উত্থানের সময় এটাকে মিউজিয়ামে রূপান্তরিত করা হয়। তবে কয়েক বছর হল রাইট উইং গভর্নমেন্ট এটাকে আবার  মসজিদে পরিবর্তিত করেছেন। ইতিহাসের নানা উত্থান-পতনের সাক্ষী হাগিয়া সোফিয়া। 

এবার একটু টার্কির ম্যাপের দিকে তাকান যাক।



ইস্তাম্বুল শহরটা উত্তর পশ্চিম সীমানায়। প্রকৃতির কল্যাণে টার্কির পূর্বসীমানা বাদে চারিদিকে সমুদ্র। ভূমধ্যসাগর ডারডানেলেস প্রণালী (Dardanelles straight) দিয়ে যুক্ত হয়েছে সি অফ মারমারা- সঙ্গে, আর সি অফ মারমারা যুক্ত হয়েছে কৃষ্ণসাগর বা ব্ল্যাক সি-এর সঙ্গে স্ট্রেট অফ বসফরাসের মধ্যে দিয়ে। এই বসফরাসের উত্তরদিকে ইউরোপিয়ান সাইড অফ ইস্তাম্বুল আর দক্ষিণে এশিয়ান সাইড অফ ইস্তাম্বুল। ব্ল্যাক সি দিয়ে দানিয়ূব নদীতে পৌঁছান যায়, যার মাধ্যমে যুক্ত ইস্টার্ন ইউরোপিয়ান দেশগুলি, ফলে সামুদ্রিক বাণিজ্য রুটের জন্যও মারমারা-বসফরাস-কৃষ্ণসাগরের গুরুত্ব অপরিসীম। মারমারা শব্দটা এসেছে মার্বেল থেকে। 

আমাদের বাস পুরানো ইস্তাম্বুলের ছোট রাস্তা গুলির মধ্যে দিয়ে এঁকেবেকে সুলেমানিয়া মস্কের কাছে দাঁড়াল।



রাস্তা সরু বলে এখানে সব ওয়ান ওয়ে। রাস্তার পাশে ছোট ছোট লোহার পিলার। এই চত্বরে তিনটে বড় মস্ক আছে অন্য দুটো হল ব্লু মস্ক আর হাগিয়া সোফিয়া। সবই আমরা ঘুরব পায়ে হেঁটে। 

বাস থেকে নেমে আমরা পাঁচিল ঘেরা মস্কের ভিতরে ঢুকলাম। বামদিকে মস্কের আউটার ওয়াল, ডানদিকে অনেক কবর। অটোমান সম্রাজ্যের সবচেয়ে দীর্ঘবছর রাজত্ব করেছেন সুলেমান (রাজত্বকাল ১৫২০-৬৬),


এনাকে আইনই সুলতান নামেও অভিহিত করা হত, কারণ মুসলিম শরিয়া এর পাশাপাশি ক্রিমিনাল, জমি ট্যাক্স -এর প্রবর্তন করেন। মস্কের পাশে সারি দিয়ে বিভিন্ন অভিজাত পরিবারের কবর।


সবচেয়ে মজা হল কবরের মাথায় নানারকম পাগড়ী বা টুপি বা ফুলের ডিজাইন। পাগড়ী বোঝায় কোন স্কলার বা ধর্মগুরুর, টুপির শেপ সাইজ সাধারন ভাবে বিভিন্ন শ্রেনীর যোদ্ধা সেনাপতির এবং ফুল আকা জিজাইন হল মহিলাদের। ডানদিকে সুলতান সুলেমানিয়া তার পত্নী হুরেম সুলতান  (রক্সেলেনা) কবর,


পৃথক ডোম-ওয়ালা ঘর (Mausoleum) এর মধ্যে। লক্ষ করেছি এদিককার মসজিদ বা কবরস্থানে ছাদের ডোমগুলি অর্ধ-গোলাকার। এটা অটোমানদের আগে রাজত্ব করা বাইজানন্টিয়ান স্টাইল।  দুটো মুসোলিয়াম বেশ বড় সাইজের আট-কোনা বিল্ডিং, ভিতরে উজ্জ্বল সবুজ বা নীল রং- কোরাণের বাণী। 


ওখান থেকে বেরিয়ে এসে আমরা বাইরের চত্বরে এলাম। বড় লনের পাশে পাঁচিল। তার পাশে মাদ্রাসা। গাইডের কাছে শুনলামএই মাদ্রাসার লাইব্রেরিতে একলক্ষের উপর পান্ডুলিপি রাখা আছে। সব মিলিয়ে অনেক বড় কমপ্লেক্স। কারাভানসরাই, বাজার, স্কুল, ইমারেতি (পাবলিক কিচেন) সবই আছে। দূরে গোল্ডেন হর্ন দেখা যাচ্ছে।



আমরা আছি ইউরোপিয়ান সাইডে। গোল্ডেন হর্নের সমুদ্র প্রণালীর ওপর পাড়টাও ইউরোপ। ডানদিকে আরও বিস্তারিত জলরাশি হল বসফরাস। তার পিছনে এশিয়া মহাদেশের ইস্তাম্বুলের পার্ট।  মেঘলা আকাশ, সমুদ্রের ঠান্ডা হাওয়া গাংচিলের উপস্থিতিতে সুন্দর পরিবেশ।একগুচ্ছ ফটো শেসন হল।  এরপর আমরা ঢুকব বিখ্যাত সুলেমানিয়া মসজিদে। ঢোকার আগে গেটের পাশে দেওয়ালের গায়ে একটা আরবিক লেটার আঁকা।

জেম আলি বল্ল, এটার শেপ মাতৃদেহের জঠরের মত, এটা ভক্তদের মনে করিয়ে দেয় যে প্রাণের উৎপত্তি এই জঠরে আর মানবজীবন শেষে এই প্রাণ মিশে যাবে ধূলিকণায়। বিশাল আয়তনের মসজিদের উপরের মধ্যভাগে সবচেয়ে উঁচু ডোম, যা বিশতলা বাড়ীর সমান উঁচু, তার চারিদিকে বর্তুলাকারে আরো ছোট ছোট ডোম। সব ডোম মিনারেটের উপরেক্রেসেন্ট মুনলাগান। দূর থেকে কালার মনে হচ্ছে ছাইবর্ণের।

এই ডোম তৈরী হয়েছে লেড দিয়ে। মসজিদের বাইরের দিকে কোনরকম অর্নামেন্টাল বা ফ্লোরাল ডেকোরেশন নেই, যা আছে সবই মসজিদের ভিতর দিকে। গেট দিয়ে ঢুকে প্রথমে দেখা গেল বিশাল চত্বরের মাঝে ফোয়ারা, তিনদিকে ঘিরে সারিসারি ঘর আর একদিকে মসজিদ। মসজিদের ভিতরে পুরোটা জুড়ে মোলায়েম, সুন্দর লাল রংএর কার্পেট।

আমাদের গাইড বলছিল টার্করা ১১০০-১১৫০ সালে যখন প্রথম এনাতোলিয়া (Anatolya) তে আসে, তখন থেকেই মসজিদে কার্পেট ব্যবহার শুরু করে। মধ্যযুগে টার্কিস কার্পেট, সুলতান বা বাদশারা উপহার বা ভেট হিসাবে দিতেন বা পেতেন। ঠান্ডা আবহাওয়ার কারনে, মসজিদের ভিতর খালিপায়ে এসে প্রেয়ারের সুবিধার জন্য কার্পেট রাখার প্রচলন।মুসলিমরা মসজিদে প্রবেশের আগে দেহের পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার উপর খুব নজর রাখে। তাই এদেশে হামামের এত বাড়বাড়ন্ত। যে কয়টা হোটেলে থেকেছি, সব হোটেলে সওনা, স্টীম-বাথ, টার্কিস হামাম ছিল। হামামের ভিতরটা উষ্ণ, খোলা ঘরের মধ্যে অনেকগুলি আলাদা-আলাদা জায়গায় বসে স্নানের বন্দোবস্তো। ঠান্ডা গরম দুরকম জলই আসছে। নিয়ম হল একবার ঠান্ডা আর একবার গরম জল অলটারনেটলি নিয়ে গোসল করতে হবে। 

মসজিদের ভিতরটা চতুর্ভুজাকৃতি (৫৯x৬০ মিটার) দূরের দেওয়ালের মাঝামাঝি জায়গায় দরজার আকৃতিতে দেওয়ালের মধ্যে ঢোকান কারূকাজ করা জায়গা। উপরটা ডোম শেপের, মধ্যে হনিকম্ব ডিজাইন। একে বলে মিরহাব (mihrab)


মিরহাব মক্কার দিকনির্দেশনা করে। নামাজ পড়তে হয় মিরহাবের দিকে মুখ রেখে। চারিদিকের নীল সবুজ টাইলসে আরবী ভাষায় কোরাণের বাণী লেখা। মাঝামাঝি জায়গাটাতে পনের/বিশ ফিট উপরে বৃত্তাকারে, বড় থেকে ছোট সাইজের লোহার ফ্রেমে লাইট লাগান।

গাইড জেম আলি জানাল, ইলেকট্রিসিটি আসার আগে যখন মোমবাতি বা মশাল জ্বালান হত, তার থেকে যে কালো ধূয়া বেরোত, সেটা উপরের দিকে উঠে এক নির্দ্দিষ্ট স্থানে জমা হত। ছাদে বিভিন্ন এ্যঙ্গেলে ঘুলঘুলি আছে। এর মধ্যে দিয়ে দিনের বেলা সূর্যালোক আসত হাওয়ার ফ্লো এমনভাবে আসত যে কাল ধূয়া একই জায়গায় জমত। সেই জমা ছাই (soot) দিয়ে পরে লেখার কালি তৈরী হত। 


হলের একদিকে বিভিন্ন ভাষায় কোরান রাখা। যে কেউ চাইলে নিতে পারে বিনামূল্যে।

সুলতানিয়া মসজিদের চারকোণে চারটে মিনারেট আছে। ব্লু মস্কে আছে ছয়টা মিনারেট। কোন মসজিদে সাতটা মিনারেট দেখা যাবে না। কারণ পবিত্র মক্কার মসজিদে আছে ছয়টা মিনারেট। হজরত মহম্মদের সন্মানার্থে ইসলাম প্রথা অনুযায়ী ছয়টার বেশী মিনারেট বানানো যায় না। এদিকের মিনারেট গুলো পেনসিল-শেপড।


লম্বা, সূঁচালো হয়ে উঠে গিয়েছে। মসজিদে মিনারেট তৈরীর প্রধান কারণ দুটো, এক তো অন্য জায়গা থেকে আসা যাত্রীরা দূর থেকে বুঝতে পারে যে এই জায়গায় মসজিদ আছে এবং মসজিদ থাকা মানে জনবসতি আছে, অন্য কারণ হল মিনারেটের উপর থেকে আজান দিলে অনেক দূর থেকেও লোকে শুনতে পারবে। 

সুলেমানিয়া মসজিদ থেকে বেরিয়ে আমদের সুলতানামেট এরিয়াতে পদব্রজে যাত্রা শুরু হল। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাস্তা।



দু দিকে দোকান দেখতে দেখতে আমরা পৌঁছালাম গ্রান্ড বাজারে। ১৪৬১ সালে এই বাজারের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল।


(গ্রান্ড বাজারের গেটে লেখা আছে ১৪৬১ সালে এই বাজার শুরু হয়)
গাইডের কথা অনুযায়ী আমরা গ্রান্ড বাজারের পাশে অনেক মানি এক্সচেঞ্জের দোকানের মধ্যে থেকে একটাতে ঢুকে ডলার ভাঙিয়ে নিলাম। এই এরিয়াতে সবচেয়ে ভাল রেট পাওয়া যায়।

গ্রান্ড বাজারে ট্যুরিস্টদের সবচেয়ে বেশী ফুটফল হয়। এই বাজারে চারহাজেরের বেশী দোকান, ৬১ টি রাস্তা এবং ২১টি গেট আছে। পুরো বাজারটাই কভার্ড। এটাকে অনেকে পৃথিবীর ওল্ডেস্ট মল বলে থাকেন। অটোমান শাসক ১৪৫৩ সালে কনস্টানটিনোপল জয় করার পর বাজার তৈরী শুরু করেন। এই বাজারের রেভিনিউ যেত হাগিয়া সোফিয়ার ওয়াফত বোর্ডের কাছে। সিল্ক রোডের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যকেন্দ্র ছিল গ্রান্ড বাজার। বিশেষত কাপড় কার্পেট বিক্রি হত। উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে যখন ইউরোপে মিলে তৈরী কাপড় এসে গেল, তখন এই বাজারের রমরমা কমে এল। গাইডের কাছে শুনেছিলাম এই বাজারে খুব দরদাম চলে। আমাদের অবশ্য কিছু কেনার নেই। গাইডের কথা মত উল্টোদিকের গেট দিয়ে বেরিয়ে সামনে একটা মসজিদ দেখলাম। গ্রুপের বাকী লোকজন আসে নি, তাই বসে না থেকে মসজিদটা ঘুরে দেখলাম। এর নাম নুর--ওসমানি মস্ক।


১৭৫৫ সালে ওয়েস্টার্ন ইনফ্লুয়েন্সে Baroque স্টাইলে তৈরী। লক্ষণীয় হল এর ডোমটা লেড-এর বদলে পাথর দিয়ে তৈরী, আর মসজিদটা অকটাগোনাল। বেশ কয়েকটা সিঁড়ি দিয়ে উঠে বড় চত্বরের মাঝে মসজিদ। উপর থেকে সুন্দর ভিউ আসছে গ্রান্ড বাজারের। সামনের গেটে অটোমান এম্পায়ারের সিম্বল দেখা গেল।

জেম আলি আমাদের নিয়ে চল্ল সিস্টার্ন ব্যাসিলিকা দেখাতে। রাস্তাতে টার্কিশ মিষ্টি বাকলাভার দোকান দেখলাম ১৮৬৪ সালের।


এরপর আমরা গেলাম বিখ্যাতব্যাসিলিকা সিস্টার্নদেখতে। এটা আদতে একচা আন্ডারগ্রাউন্ড রিজার্ভার। ১৪০ মিটার লম্বা ৭৯ মিটার চওড়া। মোট ৩৩৬টা, ৯মিটার উঁচু কলাম। ষষ্ঠ শতকে বাইজান্টাইন সম্রাট জাস্টিনাইন তৈরী করেছিলেন। একোয়া-ডাক্ট দিয়ে এই রিজার্ভারে জল আসত। টিকিট কাটতে হয় ঢোকার জন্য। লম্বা লাইন।




গাইডের আলাদা কাউন্টার বলে সহজেই আমরা টিকিট কেটে সিঁড়ি দিয়ে নামলাম। ভিতরটা সুন্দর লাইটিং আছে। কয়েকটা কলামে ডিজাইন করা। ১৪০০ বছর আগে এরকম বড় সাইজের জলাধার তৈরী হয়েছিল, ভাবলেই অবাক লাগে। বন্ডের সিনেমাফ্রম রাশিয়া উইথ লাভএর শ্যুটিং হয়েছিল এখানে। সিস্টার্নের ভিতরটা স্যাতস্যাতে, উপর থেকে ফোঁটা ফোঁটা জল পড়ছে। কলামের তলায় জল, পাশ দিয়ে ওয়াকওয়ে আছে।

সুলতানামেটের ট্রাম রাস্তা পেরিয়ে চলেছি। একজন মুচিকে দেখলাম। তার বাক্সটাও এই জায়গার প্রাচীনত্বর সঙ্গে মানানসই।


লাঞ্চের পালা। আমরা গেলাম চারশত বছরের পুরানো দোকানে। সুলতানমেট এরিয়া, পুরোটাই প্রাচীন ঐতিহ্যে ভরা। রেস্টুরেন্টের দেওয়ালে সেলজুক আমলের পোষাক ডিসপ্লে করা।



প্রথমে রুটি আর স্যুপ দিয়ে গেল। এটা ফ্রি। পরে কাবাব। এরপর বেরিয়ে এলাম ব্লু মস্ক দেখতে। সামনে কিছু দূরে হাগিয়া সোফিয়া দেখা যাচ্ছে।

টার্কিতে সব মসজিদে ঢুকতে গেলে জুতো খুলতে হয়। চারটে বিশাল স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে ৪৩ মিটার উঁচু মধ্যেকার ডোম। এটা তৈরী করেছিলেন সুলতান আহমেদ-, ষোলশ নয় থেকে ষোলশ ষোল সালের মধ্যে। হাগিয়া সোফিয়াকে টেক্কা দেওয়ার জন্য মূলত বানিয়েছিল। ব্লু মস্ক নামকরণের পিছনে কারণ হল এর ভিতর ২০,০০০ ইজনিক (Iznik) টাইলসে অঙ্কিত ফুল বা নানা ডিজাইন।



ইসলাম ধর্ম অনুযায়ী কোন জীবজন্তু বা মানুষের ছবি আঁকা যায় না। তৈরীর সময় একটা মজার ঘটনা ঘটে। সুলতানের আদেশ ছিল অলটারনেট মিনারেট সোনালী কালারে হবে। কিন্তু তুর্কী ভাষায় বুঝতে ভুল হওয়াতে স্থপতি ছয়টা মিনারেট বানিয়ে ফেলেন। তখন মক্কার মসজিদে ছয়টি মিনারেট ছিল।

মিনারেটের সংখ্যা মক্কার মসজিদের সমান হতে পারে না। সুলতান পড়লেন মহা চিন্তায়।শেষ পর্যন্ত সলিউশন এল - সুলতান মক্কার মসজিদে সপ্তম মিনারেট বানিয়ে দেন। বেরোবার গেটের সামনে শিকল ঝুলছে।

জেম আলি বল্ল, যাতে উট বা ঘোড়ায় চড়ে কেউ ঢুকতে না পারে তাই এই ব্যবস্থা। 

বেরিয়ে এক বিশাল আয়তাকার চত্বর। মাঝে দুটো পিলার দেখা যাচ্ছে।


টাইল দিয়ে বাঁধানো এই জায়গাটা দেখে বোঝার উপায় নেই যে এর তলায় প্রত্নতাত্বিকদের জন্য লুক্কায়িত বাইজানটাইন সম্রাজ্যের গৌরবময় অধ্যায়। এই জায়গার নাম হচ্ছে হিপোড্রোম (hippodrome)


রোম থেকে এসে খ্রীষ্টধর্মে দীক্ষিত, কনস্টানটাইন ৩৩০ এডি তে কনস্ট্যানটিনোপলে বাইজানটাইন সম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন। রোমান ভাষায়হিপোমানে হল ঘোড়া। ৪৫০x১৩০মিটার আয়তক্ষেত্রের জায়গাটিতে চার ঘোড়ায় টানা চ্যারিয়ট রেস হত।

চারিপাশে গ্যালারি ছিল দর্শকদের জন্য। U শেপের এই ট্র্যাকের একদিকে ছিল রয়াল ফ্যামিলির বাসস্থান, যাতে তাঁরা সহজে হিপোড্রামে আসতে পারেন। ঘোড়দৌড় একটা স্যোশাল ইভেন্ট ছিল। বাজী ধরা ছাড়াও মাঝে মাঝে রায়ট লেগে যেত। আমাদের ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগানের মত, ঘোড়দৌড়ে গ্রীন-ব্লু দলের মধ্যে রেষারেষি ছিল। সম্রাট জাস্টিনাইন এর সময়, এই নিয়ে এক রায়ট (Nika riot) হয়েছিল, যাতে তিরিশ হাজার লোক মারা যায়।১২০৪ সালে ফোরথ ক্রুশেডের সময়   হিপোড্রামের মাঝে থাকা নানা ধরণের রোমান মূর্তি ধ্বংস করে গলিয়ে ফেলা হয়। এরপর অটোমান রাজত্বে হিপোড্রোমের অস্তিত্ব শেষ হয়ে যায়। এখন চত্বরের মাঝে আছে obelisk of Theodosius.
(বাইজানটাউন কিং বসে ঘোড়দৌড় দেখছেন)
            (ওবেলিস্ক অফ থিওডোরাস)
(পিছনে সারপেন্টাইন কলাম, এটা গ্রীসের ডেলফি থেকে নিয়ে এসেছিলেন কনস্ট্যানটাইন ৩২৪ এডিতে)

ওবেলিস্ক হল চতুষ্কোণ বিশিষ্ট, কৌণিক স্তম্ভ। এটাই ইস্তাম্বুলের সবচেয়ে পুরানো নিদর্শন। খ্রিষ্টপূর্ব ১৪০০ সাল আগে মিশরের ফ্যারাওদের আমলের। নীলনদী দিয়ে প্রথমে আনা হয়েছিল আলেকজান্দ্রিয়াতে। পরে শেষ রোমান সম্রাট Theodosius এটাকে নিয়ে আসেন কনস্টানটিনোপলে। ওবেলিস্কে, পাখি দেবদেবীর মূর্তি আঁকা, যেমনটা ফ্যারাওদের সময় দেখা যেত।

এবার ফেরার পালা। আমরা সুলতানমেট এরিয়া পায়ে হেঁটে সকাল সাড় আটটা থেকে বিকাল চারটে অব্দি ঘুরলাম। বাসের জন্য অপেক্ষা করছি। জেম আলি দেখাল দূরে নীচের দিকে হিপোড্রোমের খননকার্য চলছে। ফেরার রাস্তার অনেকটা অংশ বসফরাসের পাশ দিয়ে। রাস্তার অন্যপাশে কিছুকিছু জায়গায় ভাঙা পাঁচিল দেখা গেল।


বাইজানটাইন আমলে কনস্ট্যানটিনোপল ছিল দুর্ভেদ্য দুর্গ। তিনটি স্তরে প্রাচীর ছিল। অটোমান সম্রাট মেহমুদ টু ১৪৫৩ সালে অবরোধ করেন কনস্ট্যানটিনোপল। এই যুদ্ধের জন্য বড় সাইজের কামান বানিয়েছিলেন।

পঞ্চান্ন দিন অবরোধের পর অটোমানদের হাতে আসে এই শহর। এই যুদ্ধের উপর নেটফ্লিক্সে সিরিজ আছেঅটোমাননামে।

হোটেলে বিশ্রামের পর, রাত আটটার সময় আমাদের নিয়ে গেল টাসকিম স্কোয়ারে। সুলতানামেট আর টাসকিম স্কোয়ারের মাঝে হল গোল্ডেন হর্ন। আমরা ব্রিজ পেরিয়ে এসে নামলাম। এক বিশাল চত্বরের একপাশে আলোকিত টাসকিম মসজিদ,



মাঝখানে তুরস্কের স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মরণে স্ট্যাচু। টাকসিম স্কোয়ারের চারিদিকে অনেকগুলি রাস্তা।যে রাস্তাটা ধরলাম, সেটা বিখ্যাত নাইট লাইফের জন্য, অনেকটা কলকাতার পার্ক স্ট্রিটের মত। আলো ঝলমলে বিপণী তরুণ-তরুণীর ভীড়ে ঠাসা। একটা ভিন্টেজ ট্রাম চলে রাস্তাতে।


এক বগির ট্রাম দাঁড়িয়ে ছিল।এই রাস্তার শেষ প্রান্তে গালাটা টাওয়ার Galata Tower. আমি দেখতে দেখতে যাব, তাই হাঁটাই মনস্থ করলাম। দুই কিমি রাস্তা। অনেক খাবার দোকান। মিস্টির দোকানে তুরস্কের বিখ্যাতবাকলাভাবিক্রি হচ্ছে।


গালাটা টাওয়ার একটু উঁচু জায়গায়, শহরের উপর দৃষ্টি রাখার জন্য বানান হয়েছিল বাইজানটাইন আমলে। এখন মিউজিয়াম। তবে শুনলাম এখন রিনোভেশন হচ্ছে বলে বন্ধ। বিভিন্ন কালার প্যাটার্নের লাইট চেঞ্জ হচ্ছে টাওয়ারের উপর। রাস্তার ধারে সোরবা বিক্রি হচ্ছিল।


চিকেন রোলের মত। লম্বা শিকের মধ্যে চিকেন ছুরি দিয়ে কেটে নামিয়ে রোল তৈরী হচ্ছে। সাড়ে এগরটা নাগাদ হোটেলে ফিরলাম। আগামীকাল টোপকাপি প্যালেস দেখে, বসফরাসে ক্রুজ করে বাস ধরব আঙ্কারা যাওয়ার জন্য। আঙ্কারা হল তুরস্কের রাজধানী।

ক্রমশঃড

Comments

  1. ছবির সাথে তার বর্ণনা পড়ে ভার্চুয়াল বেড়ানো হয়ে গেল। এবার দ্বিতীয় পর্ব পড়বো।

    ReplyDelete
  2. হাগিয়া সোফিয়া/ আয়া সোফিয়া আর কামাল আতাতুর্কের অবদান ব্যতিরেকে তুর্কিয়ার কাহিনী অসম্পূর্ণ থাকে।

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

ত্রিবেনী তীর্থপথে ও আরো টিটবিট

রবিঠাকুর ও কিছু হাসি মশকরা

A walk to explore Delhi’s lesser known monuments