আম-তত্ব
অথ আম কথা
আম আদমী হিসাবে আম নিয়ে দুই-এক কথা লেখার জন্য কলম ধরছি। কলম যে খালি লেখার কলাকারির কাজে লাগে তা নয়, শুনেছি কলমের আম, গাছের আমের থেকে খেতে সুস্বাদু হয়। তবে খাগের কলম, কলমের চারা, এদেরকে দুইয়ে দুইয়ে চার করতে গেলে, চারমিনারে চট করে কয়েকটা সুখটান দিতে হবে। দিল্লিতে এখন সবে সফেদি আমের আবির্ভাব ঘটেছে। হলুদ ছাল ওয়ালা আম কিকরে সফেদি আখ্যা পেল, সেটা গবেষণার বিষয়। মরশুমের গোড়ায় আম একশ টাকা কেজি। তাই আমের আশা বাদ দিয়ে পাঁচটাকার কলাতে স্টিক করে আছি। নাকের বদলে নরুণ! কলা চিরকালই মিঃ ডিপেন্ডেবল। সব সিজনেই পাওয়া যায়। দামের তারতম্য নেই। বেশী আমের আশা না করাই ভাল। পৌষ্টিকতন্ত্র আবার আম-ভারে, আম-আশার যোগফলে, আমাশা হয়ে নির্গত হয়। বম্বে সাইডের আম হল আলফানসো। বেশ পর্তুগীজ জলদস্যু টাইপের নামের সঙ্গে মানানসই দাম। পাঁচশ টাকা কিলো। নামেই ভয় পাই, তাই কেনার প্রশ্ন নেই। বেশ সুন্দর নামের আম হল আম্রপালী, গোলাপখাস, হিমসাগর। আর ল্যাংড়া, ফজলি শুনলে মনে হয়, পাড়ার অপোগন্ড ছেলে। তব কবি বলেছেন ‘নামে কিবা আসে যায়’! ল্যাংড়া আর দশেরী এই দুটো জুলাই মাসে দিল্লির বাজারে আসবে। তারপর আসবে চোষা। আমের ব্যাপারে আমার সাকিং ইন্সটিঙ্ক্ট নেই। তাই চোষা নামের আম আমি কেটেই খাই।
আজকাল অবশ্য পার্মলামেন্টের মনসুন সেশনে শোরগোল উঠেছে আম ডিপ্লোম্যাসি নিয়ে। সদ্য নির্বাচিত অপোজিশন লিডার রাহুল গান্ধীকে পাকিস্তান এ্যমবাসি থেকে আম পাঠান হয়েছে। শাসকদল অভিযোগ করছেন, গান্ধিদের পারিবারিক চুনাও ক্ষেত্র আমেথি (যার নামের শুরু আম দিয়ে), সেই স্থানের আম নাকি রাহুলের রসনায় রসহীন।
ঘরের ছেড়ে প্রতিবেশীর আমে মজেছেন রাহুল তথা কংগ্রেস, এতে বিরোধীরা গভীর ষড়যন্ত্রের আভাস পাচ্ছেন!
আমতত্ব লিখতে গেলে, আমসত্বের কথা আসবেই। ফুল্লরার বারমাস্যাতে যদি আমের বিরহ-বেদনা থাকত, তবে বর্ষার শেষ থেকে আম-আদমীর আমের বিরহের কথা লেখা হত। আম-তত্বের এইভাগে আম-সত্বের কথা আসবেই। আমসত্ব সারা বছরই পাওয়া যায়। বিরহের দিনে আমসত্বের রসাস্বাদনে রসনার
কিঞ্চিত পূর্ণতা প্রাপ্তি ঘটে। “আমসত্ব দুধে ফেলি, তাহাতে কদলী দলি, সন্দেশ মাখিয়া দিই তাতে…”। এরকম খেলে পাতে পিঁপড়ে কেদে যাওয়ার কথা।
আম নিয়ে নিয়ে বেশী উচ্ছাস করছি না, কারণ আম আদমী পার্টির তাবড় নেতারা জেলে। তবে পার্টির গ্রাসরুটে আম-আদমীর সঙ্গে কিরকম যোগাযোগ জানা নেই, কিন্তু টপ লিডার আম-যোগে দুষ্ট, এরকমটাই অপোজিশন পার্টি জানাচ্ছে। দেদার আম খেয়ে টপ লিডার সুগার লেভেল হাই করে বেল পাওয়ার চেষ্টায় আছেন, এরকমটাই বাজারে খবর। আজকে জানালাম বেল হয় নি, তবে জাজসাহেব স্বাস্থ্যউদ্ধারে বেল খাবার পরামর্শ দিয়েছেন কিনা সে খবর জানা নেই। বেলের আরেক নাম শ্রীফল আর জেলের অরেক নাম শ্রীঘর। বেল ও জেল দেখছি ওতোপ্রোতভাবে জড়িত। আমাদের এক বর্ষীয়ান দাদা গেছুড়ে ছিলেন এরকমটাই জানলাম। আম, জাম, নারকেল সব গাছে চড়তেই সিদ্ধহস্ত ছিলেন। সিদ্ধহস্ত-পা বলাটাই শ্রেয়, কারণ পায়ের কলাকারি গাছে চড়তে হাতের কারসাজির থেকে কম নয়। তবে উনি শ্রীফল পাড়ার জন্য গাছে উঠতে পেরেছিলেন কিনা জানি না। কন্টক-দংশনে শঙ্কিত থাকাই স্বাভাবিক। বেলগাছের তলায় ন্যাড়া নাকি একবারই যায়। খালি ন্যাড়ার মাথা কি বেলের টার্গেট? একবার কেন বারবার গেলে কি হবে, কুঞ্চিত কেশদাম নিয়ে গেলে কি বেল পড়বে না? সেই দাদা কলেজে পড়াকালীন গ্রামের বাড়ী থেকে নানারকম আম নিয়ে বিজ্ঞানী সত্যেন বোসকে ভেট দিতেন। তাই খেয়ে স্যার খুব খুশী হতেন। স্যারের রসাস্বাদনে সিক্ত মন আমের ঠিকুজীর দিকে মন দেন নি। আম-কে “রঙ্গিনী” ধরলে, মান্না দের গান হল -‘রঙ্গিনী কত মন মন দিতে চায়/কি করে বোঝাই কিছু চাইনা চাইনা চাইনা। অর্থাৎ, খালি আমটি চাই, গাছের খবর চাই না, চাই না! জ্ঞানবৃক্ষের ফল খেয়ে কৃতবিদ মানুষটি আইনস্টাইনের সঙ্গে যুগ্ম-পেপার লিখেছিলেন অনেক আগেই, তাই আমৃতের স্বাদে , ‘কি,কেন, কোথা থেকে’ ইত্যাদি পার্থিব প্রশ্নত্তোরে বিরত থেকেছেন। কোন আমের জাত স্যারের বেশী ভাল লেগে লেগেছিল সেই গূড় রহস্য আজও উন্মোচিত হয় নি। কেউ কেউ এই রহস্যভেদে আগ্রহী ছিলেন, কিন্তু হোয়াটএ্যপ গুগলীর চাপান উতোরে চেপে গিয়েছেন। স্যারের মনে হয় আমারই মত কোর্স (coarse) টাং। কমলাভোগ, পান্তুয়া, রসগোল্লা, সন্দেশ, সবার টেস্ট আলাদা, কিন্তু খেতে সবই ভালো লাগে। যাই হোক আম-জ্ঞানের এখানেই সমাপ্তি ঘটাই। লেবু কচলালে তেতো হয় জানি, আম কচলালে কি হয় তাও জানি। দই-চিড়ে বা দই-মুড়িতে আম কচলে বেশ ভাল করে মাখা যায়, সকালের জলখাবারে অমৃত।
দেবদত্ত
১০/০৫/২৪


তোমার প্রত্যেকটি লেখার মত এটাও অসাধারণ। ঠিক যেন কাঁচামিঠে আম। পড়তে পড়তে ব্যাঙ্গ আর সুমধুর রসিকতার রসে মন ভরে যায়। দারুণ।
ReplyDelete