সেমিনার-জেএনইউ ও আরো কিছু

 


সেমিনার-জেএনইউ আরো কিছু

সবে ভাতঘুমের আবেশ এসেছে তখনি তন্দ্রাহরনীর ফোন।শ্রাবনের ধারা মত  শ্রাবনীর কলকন্ঠ। এল্যামনি নৌকার পালের কান্ডারী। ওয়ার্লড টেকনোলজি ডে তে এল্যামনির মিনি সেমিনারের খবর হোয়াটস এ্যপে আগেই পেয়েছি। এবার শ্রাবনীর সাদর নিমন্ত্রণ। টেকো মাথায় টেকনোলজির কচকচি শুনতে হবে জেএনইউ তে। শ্রাবনীর বরাভয়দাদা, যাতায়ত নিয়ে কোন টেনশন নেই, পিনাকীদা আপনাকে গাড়ীতে তুলে নেবে  এরপর না করার কোন অবকাশ নেই! ডোর টু ডোর সার্ভিস পাওয়া যাচ্ছে। পিনাকী থাকে আমার সোসাইটিতে। দিল্লিতে থাকলেও জেএনইউতে কখনো যাওয়া হয় নি। আমাদের যাদবপুরের সাথে খুব মিল আছে ছাত্রভাবধারায়। রাজনৈতিক আন্দোলনের আঁতুড়ঘর। বামদোষে দুষ্ট বলে সনাতনপন্থীরা দোষারোপ করে থাকেন। আমি আবারসাতে পাঁচে থাকি নাদলের লোক। দূর থেকে ছাত্রনেতাদের সমীহের চোখে দেখি। ডান বা বা বাম কোনদিকে ঘাড় কাত না করে নাকবরাবর দেখি। রাজনীতি না করার জন্য একবারই খুব দুঃখ হয়েছিল। সময়টা ১৯৮১ বলে মনে হয়। অরবিন্দ ভবনে ভিসি ঘেরাও চলছে। শ্লোগানিয়ারিং এর পর জমিয়েওরা আমাদের গান গাইতে দেয় নাবলে তালি বাজিয়ে গান চলছে। বেশ টানটান উত্তেজনা। আশেপাশে ঘোরাঘুরি করে নয়টা নাগাদ চলে গিয়েছি মেন হোস্টেলে, কারণ দেরী হলে মেস বন্ধ হয়ে যাবে। পরেরদিন সকালে কলেজে গিয়ে শুনলাম, ক্যাম্পাসে পুলিশ এসেছিল, ডান্ডার বাড়ি খেয়ে অনেকেই আহত। দুই তিনজন পরিচিত মুখ দেখলাম ব্যান্ডেজ বেঁধে ঘুরছে। পরে খবর পাওয়া গেল লাঠির বাড়ি জনা কয়েকের পড়েছিল, বাকী অনেক নেতা তাড়া খেয়ে লেডিস হোস্টেলে ভীড় করেছিল, কারণ পুলিশ লেডিজ হোস্টেলে ঢুকবে না। কয়েকজন ডান্ডা না পড়লেও ঠান্ডামাথায় আহতের অভিনয় করে মেয়েদের দিয়ে ব্যান্ডেজ বাঁধিয়ে নিয়েছে। ওই আর কি -“একটুকু ছোঁয়া লাগে, তাই দিয়ে মন মনে, রচি নব ফাল্গুনী 

নির্দিষ্ট সময়ের পাঁচ মিনিট আগেই পৌঁছে গেলাম। মেন গেট দিয়ে ঢুকে মনে হল এটা ইউনিভার্সিটি নাকি কোন ন্যাশানাল পার্ক? গাড়ীতে যাচ্ছি, দুই দিকে এ্যকেশিয়া গাছের জঙ্গল। জনপ্রাণী খুব একটা চোখে পড়ল না। গুগল ম্যাপই ভরসা। লাল লাল ইটের বিল্ডিং দেখা গেল। ব্যাপার কি, প্লাস্টার নেই কেন। পিনাকী জানাল এটাই হল ডিজাইন।


এখানে নাকি সবইস্কুল এই ব্যাপারে যাদবপুর অবশ্যই টেক্কা দিয়েছে জেএনইউকে। বেশ গালভরা নামফ্যাকাল্টি অফ ইঞ্জিনিয়ারিং এ্যন্ড টেকনোলজি। জঙ্গল সাফারি শেষে পৌঁছান গেল গন্তব্যস্থলে। সামনে লাল ইঁটের বিল্ডিং। আমাদের গন্তব্য এসএস বিল্ডিং। সিকিউরিটির থেকে কনফার্ম হয়ে গেট দিয়ে ঢুকতেই চমক। সেমিনার রুমের বদলে সামনে গ্যালারীযুক্ত মঞ্চ। বেশ জোরে মিউজিক বাজছে, মাইক টেস্টিং চলছে।

তিনচারটি ইয়াং ছেলে। দূর দূর তক গুরুগম্ভীর সেমিনারের আয়োজন দেখা গেল না। নিশ্চয়ই ভুল জায়গা। বেরিয়ে আসি। রাস্তায় এক তরুণী। নিশ্চয়ই স্টুডেন্ট হবে। জিজ্ঞাসা করি -“এসএস বিল্ডিং খুঁজছি। সে জানালএটাই সেটা, তবে দুটো এস এর বদলে ট্রিপল এস। পরে বুঝলাম এটা হলস্কুল অফ স্যোশাল সাইন্সএসএসনয়, সত্যিই তো, ‘এসএসহল হিটলারের কুখ্যাত নাৎসী বাহিনী! অনুপ ফোনে বল্লওই হল দিয়ে ঢুকে অন্য গেট দিয়ে বেরোলেই সেমিনার রুম। এল্যামনির প্রেসিডেন্ট কল্লোলদা সহ বেশ কিছু পরিচিত মুখ। একটু আলাপচারিতার পরই জানালা দিয়ে চোখ গেল বাইরে, নীল গাই ঘুরছে।

বেরিয়ে গেলাম ফটো তুলতে। খোদ রাজধানী শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ইউনিভার্সিটিতে এরকম বন্যপ্রাণী ঘুরছে, বেশ অবাক কান্ড বটে। কল্পনা করি কেনিয়ার মাসাইমারাতে আছি, ইম্পালার দল চলেছে। সাধে কি যুধিষ্টির মনকে সবচেয়ে দ্রুতগামী আখ্যা দিয়েছিলেন

চারিদিকটা ভাল করে লক্ষ করি। বিল্ডিং এর গায়ে ডিপার্টমেন্ট ইত্যাদি লেখা নেই। ধরেই নেওয়া হচ্ছে, নবাগত কেউ নয়। যাদবপুরের মত বেশ কিছু পোস্টার সাঁটা দেওয়ালে। কয়েকদিন আগে খবরের কাগজে পড়েছি ছাত্র ইউনিয়ানের নির্বাচনে বামপন্থী এসএফআই জিতেছে। দক্ষিণপন্থী হল এভিবিপি। দিল্লি ইউনিভার্সিটির ইউনিয়ান তাদের দখলে। এখানের পোস্টারে দেখা গেল


কাস্তে-হাতুড়ী-তারা, এভিবিপির মুখ বন্ধ করে রেখেছে। সব ক্ষেত্রেই শাসক শোষিতের শ্রেনীভেদ।

আরেকটা পোস্টারে জানান দিচ্ছে, গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্সে দেশের অবনয়ন। ১১০০/-


সিলন্ডারের চাপে গরীব লোক চিঁড়ে-চ্যাপটা। বাস্তব যাই হোক, এখন ২০৪৭ পর্যন্ত অমৃতকাল চলছে, সেই আনন্দে থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ!

আরেকটা পোস্টারে দেখা গেল BAPSA বলে এক ছাত্র রাজনীতিক সংগঠন। পুরোটা হল- বীরসা, আম্বেদকর, ফুলে স্টুডেন্টস এ্যসোশিয়েশন।


আম্বেদকর ছাতামাথায় এদের পরিত্রাতা। বোঝা গেল এরা SC,ST গ্রপের লোক। ফেস্টুনে লেখা থেকে বোঝা যাচ্ছে, শাসকদল এদের ভোট যোগাড় করে এদের উপর ছড়ি ঘোরাচ্ছে। রাজনীতি প্যাঁচালো সন্দেহ নেই! অন্য পোস্টারটাতে এসএফআই জনৈক নাজিবকে খুঁজে বেরাচ্ছেন। খোলসা হল না যে, ইনি কি সেই দিল্লির প্রাক্তন গভর্নর নাজিব জঙ্গ কিনা।

একটা নয়, মোবাইলের ফ্রেমে চার-চারটে নীলগাই।


বেশ বড়সড় চেহারা। তবে নিতান্তই শান্ত। সেলফি নিলেও আপত্তি করল না। 

 সেমিনার শুরুর টাইম তিনটে হলেও, যাদবপুরের ট্র্যাডিশন মেনে ২০/২৫ মিনিট পরে অনুষ্ঠান শুরু।হাই টি ভরসায় হাই উঠছে না, যদিও বাড়ীতে থাকলে এই সময়টা টিভি দেখতে দেখতে হাই তুলে ঘুমিয়ে পড়ি। পাশে বিজনকে জিজ্ঞাসা করিকি দেবে রে? হাই টি বল্ল, ভাল কিছু হবে তোচা-টামানে হল চা এর সঙ্গে লেড়ো বিস্কুট, “হাই-টিহল একটু রিফাইনড ইংলিশ কায়দা, এক্সপেক্টেশন হাই রাখাটাই ন্যাচারাল জাস্টিস!” বিজন অম্লানবদনে জানালতোর জন্য চিকেন প্যাটি আছে”! বিজনের কাঁধ থেকে ঢাউস ব্যাগ ঝুলছে। জিজ্ঞাসা করিব্যাগে কি এনেছিস?” বিজন বল্লজলের বোতল। মেট্রোতে এসেছি। তোর থেকেই শিখেছি, জলের বোতল সঙ্গে রাখতে।এটা অবশ্য ঠিক। ২০০এমএল জলের বোতল সবসময় নিয়ে বেরোই।

ট্রিপল এস এর ডিন সেমিনারের উদ্বোধন করলেন। উনার কাছে জানা গেল ২৫০ টিচার ৪০০০ স্টুডেন্ট আছেন জেএনইউতে। পুষ্প-স্তবক এবং ভারতীয় ক্যালেন্ডার সম্বলিত ডাইরি দেওয়া হল স্পিকার এবং গেস্টদের। যদিও আমরা ইংলিশ ক্যালেন্ডার ফলো করি, তবুও আজকাল নবজাগরণের জোয়ারে- ‘পরধন লোভে মত্ত, কেলিনু শৈবালে…. ‘ - এরকম একটা জেন্টল রিমাইন্ডার দেওয়া হচ্ছে! আমাদের সব ছিল, আমরাও সব পারি!

প্রথম বক্তা শ্রীযুক্ত প্রভাকর সিং সাহেব। তিনি সিপিডাব্লুডি- এক্স ডিজি। সৌম্য চেহারার মধ্যে একটা স্নিগ্ধভাব আছে।



পরিচিতি দেওয়ার সময় শুনলাম অনেক এ্যওয়ার্ড পেয়েছেন, লিস্ট ইজ এন্ডলেস, দুই-একটা যা মনে আছে তা হল -ভোজপুরী সন্মান, গোল্ডেন পিকক এওয়ার্ড। একটু অফ বিট নাম বলেই মনে আছে। একাডেমিশিয়ান নন, পিওর টেকনোক্র্যাট। টেকনিক্যাল কচাকচি থাকলে আমি একটু পরে বোর হয়ে যাই। সিং সাহেব নিজের কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা মেলে ধরলেন। ৭৯ সালে আইআইটি, খড়্গপুড় থেকে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং করে, সরকারী চাকরীতে ঢোকা তখন রেয়ার ছিল। ফ্রিডম ফাইটারের পরিবার, বাবা বলেছিলেন দেশে চাকরি করে দেশের সেবা করতে হবে। বন্ধুরা বেশীরভাগ অমেরিকা অথবা মোটা মাইনের প্রাইভেট কোম্পানিতে, কিন্তু সিং সাহেব বাবার অনুরোধ মাথায় পেতে নিলেন। আশি বা নব্বই দশকের সরকারি কর্মীদের ওয়ার্ক কালচার নিয়ে অভিযোগের অন্ত ছিল না। সরকারি লাল ফিতের ফাঁস বা দীর্ঘসূত্রিতা সবার জানা ছিল, এছাড়া গ্রিজিং দ্য পাম তো ছিলই। 

একটি লোক তার ডিটারমিনেশন ভিশন দিয়ে অর্গানাইজেশন কালচারে আমূল পরিবর্তন আনতে পারে সেই কাহিনী উঠে এল বক্তৃতায়। 

যখন উনি জয়েন করেন সবাই বলেছিল- এটা সিভিল ইঞ্জিনিয়ারদের জায়গা, তুমি এখানে সুপারেনটেন্ডেন্ট ইঞ্জিনিয়ারের বেশী উঠতে পারবে না। সিং সাহেব ডিজি তো হয়েছিলেন এবং কাজের দক্ষতার পুরষ্কার হিসাবে তিনবার এক্সটেনশন পেয়েছিলেন, যা শতাধিক বৎসরের অধিক পুরানো এই অর্গানাইজেশনে কাউকে দেওয়া হয় নি। অনেক টুকরো টুকরো ঘটনা, যে কটা মনে আছে সেগুলোই লিখি। সিং সাহেবের অধীনস্থ এক কর্মচারী একদিন দুঃখ করছিল ছাব্বিশ বছর চাকরী করার পরও তার প্রমোশন হয় নি। মেয়ের বিয়ের সম্বন্ধ এলে সবাই ভাবছে, নিশ্চয়ই করাপ্ট লোক, তাই প্রোমশন হয় নি। অথচ সেই সময়ে প্রোমশনে দীর্ঘসূত্রিতা চিরাচরিত প্রথা ছিল। উনি ডিজি হওয়ার পর সেটাকে ছয় বছরে নামিয়ে আনেন, ফলে কর্মচারীদের মনোবলও বাড়ে। অনেক এমপ্লয়ি বাড়ীতে ঠাকুরদেবতার পাশে তার ছবিও  রাখত। এতেই বোঝা যায় কর্মচারীরা তাকে কতটা সন্মানের চোখে দেখত। সাধারন ভাবে সরকারী অফিসে ছকে বাঁধা প্রফেশনাল লাইফ চলে। ভিজিলেন্স, অডিট, রুলস-রেগুলেসনস এর গন্ডীর মধ্যে থেকে শিকল ভেঙে এগানোর ইচ্ছেটা ডরম্যান্ট থেকে যায়। সদ্য ডিজি হওয়ার পর ডাক পড়েছিল মিনিস্টারের কাছে। সঙ্গে ছিলেন এনবিসিসির চেয়ারম্যান। মন্ত্রীর প্রশ্নের জবাবে জানান দশ হাজার কোটির কাজ করছে সিপিডাব্লুডি, এনবিসিসি- কাছে তার আটগুণ কাজ। তবে কনফিডেন্ট সিং সাহেব মিনিষ্টারকে বলেন -“আমি একবছরের মধ্যে ওদের ওভারটেক করে নেব।হয়েছিলও তাই, বিশ্বাস করতেন নূতন টেকনোলজিতে, তিনিই প্রথম সিপিডাব্লুডি-তে R&D খোলেন। আগে সব প্রোজেক্টেই ডিলে এবং কস্ট ওভার রান হত। দশ হাজার কোটি প্রোজেক্ট থেকে উনি আড়াইলক্ষ কোটি টাকার প্রোজেক্ট এর কাজ করতে থাকেন। লোকসংখ্যা একই। কাজের রিডিস্ট্রিবিউশন করেন। কিছু পদ ছিল, যেখানে কোন কাজ ছিল, রিটায়ারমেন্টের আগে সেখানে পোস্টিং হত। সে সব পোস্ট তুলে দেন। কেউ আপত্তি করলে সোজা বলতেন-“না পোষালে রেজিগনেশন দাও!”   

কাজের লক্ষমাত্রা পূরণের থেকে ইন্টার ডিপার্টমেন্টাল রাইভালরি বেশী চলত। ডিসিশন মেকিংএ মাল্টিলেয়ারিং ছিল। সিং সাহেব সব সিনিয়ারদের ডেকে বোঝালেন কাজের লক্ষমাত্রাটাই আসল, সেটাকেই টার্গেট করে এগোতে হবে। মরিব্যান্ড ওয়ার্কফোর্সে প্রাণের উচ্ছলতা এল। প্রতিরোধ, প্রতিকূলতা ছিল। নূতন টেকনোলজিতে অগাধ বিশ্বাস। মনে করতেন সিপিডাব্লুডি সেন্ট্রাল গভর্নমেন্টের লিডিং ইঞ্জিনিয়ারিং এনটিটি হিসাবে নূতন টেকনোলজির পাইনিয়ার হিসাবে দায়িত্ব নিয়ে স্টেটগভর্নমেন্টের এজেন্সিগুলোকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব তার। কাজ এত আসতে থাকল যে অনেককে রিগ্রেট জানাতে হত। আসার কারণ হল, সিং সাহেব বলেছিলেন উন্নত টেকনোলজির সাহায্য প্রজেক্ট কমপ্লিশন টাইম কমিয়ে তিরিশ পার্সেন্ট কম কস্টে প্রোজেক্ট বানিয়ে দেব। সমস্ত স্টেট থেকে কাজ আসতে লাগল। ইঞ্জিনিয়ারদের স্কিলসেট ডেভেলপমেন্টে দেশে-বিদেশে ট্রেনিং এর বন্দোবস্তো করেছিলেন। উনিই প্রথম যিনি এনডিএমসির মালিদের জন্য ট্রেনিং শুরু করান। এক সিনিয়ার আইএএস কথাপ্রসঙ্গে সিংসাহেবকে বলেন-“আপনাদে মালীরা খালি গাছ পুঁতে জল দিতে জানে, ঝরা পাতা পরিষ্কার করে আর লন মোয়ার দিয়ে ঘাস কাটতে পারে। কিন্তু এর বাইরে অনেক কিছু জানার আছে।সিং সাহেব বোঝেন চ্রেনিং এর গুরুত্ব অপরিসীম। মালিদের মরালও হাই হয়, তারা এর আগে কোনদিন  ভাবে নি যে তারাও ট্রেনিং করার যোগ্য। লেট এইট্টি তে সিং সাহেব প্রথম সরকারী কোয়ার্টারে সোলার হিটিং চালু করেন। নব্বই দশকের গোড়ায় যখন প্রথম সিএফএল ল্যাম্প আসে, তখন দাম বেশী হওয়াতে সাধারন লোক কিনত না। উনি সরকারকে প্রপোজাল দেন যে, সব সরকারি কাজে সিএফএল ম্যান্ডেটারি করলে ম্যানুফাকচ্যারিং বাড়বে, দামও এফর্ডেবল হবে। পরে সেটাই হয়।

বছর কুড়ি আগে ইআরপি ইমপ্লিমেন্ট করেন অফিসে। তখন নজর পড়ে সিপিডাব্লুডির মান্ধাতার আমলের ম্যানুয়ালের উপর। এ্যমেন্ডমেন্টএর পর এ্যমেন্ডমেন্ট জুড়ে সেটা তখন হাজার পাতার ডকুমেন্ট,পাঠোদ্ধার দুঃসাধ্য। সেখান থেকে কোন ব্যাপারের দিকনির্দেশনা পাওয়া দুরূহ। সিং সাহেব সেই ম্যানুয়াল ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে নিজে মাত্র ৪৫ পেজে নূতন ম্যানুয়াল বানান।

সিং সাহেব একটা মজার কথা জানালেন। ৮৯/৯০ তে নেদারল্যান্ডে এমবিএ করছেন। কথায় কথায় ওখানের অফিসের লোকেরা জানালেন-“তোমাদের দেশের লোকেরা এখানে চাকরী করে আমাদের অনেক সমস্যার নূতন অঙ্গিকে সমাধান আনছে, কিন্তু তোমাদের নিজেদের দেশে কেন ইঞ্জিনিয়াররা বিদেশি টেকনোলজির উপর নির্ভর করে থাকে

এমডিআই গুরগাওতে পড়ার সময় প্রজেক্ট নিয়েছিলেনহাউ টু মেক ক্যারিয়ার পাথ ইন সিপিডাব্লুডি। প্রফেসাররা এবং বন্ধুরাও অবাক এরকম অফবিট টপিক নেওয়াতে। সিং সাহেবের মনে হয়েছিল অফবিট হতে পারে কিন্তু সিপিডাব্লুডির তমসাচ্ছন্ন কালচারের আগল ভেঙেভেঙেছ দুয়ার, এসেছো জ্যোতির্ময়ে আবির্ভাব ঘটাতে এরকম টপিকই সময়োপযোগী। 

নর্থব্লক, সাউথ ব্লক, প্রেসিডেন্ট ভবনে এসি ছিল না, বিদেশী ডিগনিটরিরা গরমে হাঁসফাঁস করতেন, এরকম আইকনিক স্ট্রাকচারে ফলস সিলিং লাগান যাবে না, এই অজুহাতে সিপিডাব্লুডিতে সিং সাহেবের পূর্বসূরীরা এসির ব্যাপারটা এড়িয়ে গিয়েছেন। সিং সাহেব অন্য ধাতুতে গড়া। উনি ভিআরভি টেকনোলজি দিয়ে এসি লাগালেন। আশির দশকে মোতিবাগের পশ সরকারি কোয়ার্টারগুলোতে জলের কষ্ট। সিং সাহেব শুনেছেন তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হবে জলের কারনে। প্রভাকর সাহেবের চেষ্টায় ওয়াটার কনজারভেশন, ওয়েস্ট ওয়াটার চ্রিটমেন্ট করিয়ে রিসাইক্লিং করিয়ে, আজকের দিনে মোতিবাগে জলের স্তর বেড়েছে, এখন ওয়াটার সারপ্লাস। তারই তত্বাবধানে নেট জিরো এনার্জি বিল্ডিং তৈরী হয়েছে সুরাটে, গান্ধী স্মৃতি ভবন। 

লোদি গার্ডেনের রাস্তায় গেলে এখন বিল্ডিংগুলোর বাইরের দেওয়ালে সুন্দর গ্র্যাফিটি দেখা যায়।



উদ্যোগটা সিং সাহেবের। বলছিলেন কি উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্যে দিয়ে ইয়াং আর্টিস্ট, আর্ট কলেজের ছাত্ররা কাজ করেছে। বলছিলেন ভারতের পোটেনশিয়াল ভারতের ইয়ূথ। আমাদের দুর্ভাগ্য এত ট্যালেন্টেড পুলকে আমরা এফেক্টিভলি কাজে লাগাতে পারছি না। 

এস্থেটিক সেন্সের ব্যাপারে আমাদের চরম উদাসীনতার কথা বলছিলেন। কর্মসূত্রে বিভিন্ন প্রদেশে যেতে হয় লক্ষ্য করলেন সিপিডাব্লুডির গেস্টহাউসের জিজাইন সব জায়গায় এক। দিল্লির অফিসের ডিজাইন ধার করে কপি-পেস্ট। এটাই এদেশে সবাই করে থাকে। লিস্ট রেজিস্ট্যান্স, ইজি টু ইমপ্লিমেন্ট পাথ, কারণ সরকারী অফিসে প্রিসিডেন্সটা বড় কথা। আগে এরকম হয়েছিল, তাহালে চোখ বুঁজে ফাইলে সাইন হয়। ডেভিয়েশন হলেই চুলচেরা প্রশ্নবাণ। এই ধরণের বিল্ডিংএ লোকাল ফ্লেভার নেই। যে স্টেটের বিল্ডিং, সেই স্টেটের সংস্কৃতির ছাপ থাকলে, শুধু যে নান্দনিক সৌন্দর্য প্রকাশ পায় তা নয়, স্টেটের শোকেসিং হয়, কারণ গেস্টহাইসে বাইরের লোকেরা এসে থাকেন, তারা পরিচিত হতে পারেন সেই স্টেটের সংস্কৃতির সঙ্গে। শুধু যে এটাই তাও নয়, জলবায়ূর তারতম্যে বিল্ডিং কনস্ট্রাকশনে ডিফারেন্ট এপ্রোচ লাগে। অরুণাচল কি মেঘালয়ে বৃষ্টি বেশী হয় মরুপ্রদেশ রাজস্থান্র তুলনায়, সুতরাং ছাদের ডিজাইন ভিন্ন হওয়া উচিত।

এর পরের বক্তা প্রফেসর ধীরজ শর্মা, সারদা ইউনিভার্সিটি। মূল বক্তব্য, টেকনোলজি মূলত সফ্টওয়্যারবেসড এ্যপসের কল্যাণে, খালি মোবাইলের বোতাম টিপে কতকাজ হয়ে যাচ্ছে। ব্যাঙ্কে যেতে হয় কচিৎ-কদাচিত। ট্যাকসি বুকিং,থেকে ফুড ডেলিভারি বা গ্রসারি আনানো আজকাল কত সোজা। অনলাইনে গারমেন্ট আনিয়ে নিন, পছন্দ না হলে ফেরত। দৈনন্দিন জীবনে অপরিহার্য এগুলো, বিশেষত যারা সিটিতে থাকেন সবাই জানেন। কিন্তুআনে বাল কালকি বলছে? ‘এআই’ শুধু বাজ ওয়ার্ড নয়, ঘরের দোড়গোড়ায় কড়া নাড়ছে। দুনিয়াতে মেটা, এ্যপেল, মাইক্রোসফ্ট, এনভিডিআ এদেরই রাজত্ব।


চার্টে দেখা যাচ্ছে অপেক্ষাকৃত নূতন কোম্পানি, এনভিডিআ (চ্যাট জিপিটির মালিক), ২০২২শে যাত্রা শুরু করে আজ তৃতীয় পজিশনে, এবং আশা করা যায় আর দুই তিন বছরে নম্বর ওয়ানে পৌঁছৈবে।  

ভারতের জিডিপি . ট্রিলিয়ন ডলারের আশেপাশে, আরেকটা গ্রাফে দেখলাম মাইক্রোসফ্ট আর এ্যপেলের সম্বিলিত ভ্যালুয়েশন ট্রিলিয়নের উপর।


সবই ইউএস বেসড কোম্পানি সাধে কি আমেরিকা সব দেশের উপর দাদাগিরি করে বেড়ায়!

অনুষ্ঠান শেষ। কাস্টমারি ভোট অফ থ্যাংকস দিল অনুপ, এ্যলামনির কর্মবীর। ঠোটের কোণে সবসময় মিষ্টি হাসি। মনে পড়ল আশির দশকের শেষের দিকে আরেক অনুপ এ্যলামনির সেক্রেটারি ছিল বেশ কয়েক বছর। 

এল্যামনির জয়দীপ নামে একটি ছেলের সঙ্গে আলাপ হল। যাদবপুর থেকে বায়োটেকনোলজি(?) তে পিএইচডি করে হামবোল্ট স্কলারশিপ নিয়ে জার্মানীতে ছিল আট বছর। এখন জেএনইউ তে ফ্যাকাল্টি। কথাবার্তায় শান্ত-ধীর। আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞাসা করি - ফিরে আসতে গেলে কেন? ওদেশে আজকাল স্কিল শর্টেজ, এখান থেকে তরুণ প্রজন্ম ইউরোপে যাচ্ছে। জয়দীপ জানাল,ছেলেকে দেশীয় সভ্যতায় বাংলা ভাষা শিক্ষার তাগিদে ফিরে এসেছি। বোঝাই ওকে, কাজের স্যাটিসফ্যকশন, স্বচ্ছলতা, উন্নত ব্যবস্থাপনা, এসবই লোকে চায়, তাই মাতৃভূমি ছেড়ে লোকে বাইরে বসতি করে, ছেলেকে বাংলা চাইলে জার্মানীতেও শেখাতে পারবে। যেটা বল্লাম না, সেটা হল সব দেশের কালচার থেকে অনেক কিছু শেখার আছে, বেসিক ইনস্টিংকটগুলো, পরিবারের প্রতি টান, ফেলোফিলিং সব দেশেই সমপরিমাণে আছে। ধনের অপ্রতুলতা বরঞ্চ মানুষের মনকে সংকুচিত করে। একটু পরে জয়দীপ অকপট -“দাদা, আমার বৌও একথাই বলে!”


বিজনের ভবিষ্যতবাণী বিফলে গেল। পকোড়াতে কামড় দিয়ে এল্যামনির পড়তি রমরমার কথা ভাবি। চা, গোলাপজাম, বিস্কুট, ধোকলা পর্ব শেষ করে বিদায়ের পালা

হাই টি পর্ব শেষ করে টা-টা করে বাইরে আসতেই এক ঝাঁক সুন্দরী প্রজাপতির জটলা।আমরা চঞ্চল, আমরা অদ্ভূত, আমরা নূতন যৌবনেরই দূত এই প্রজন্ম ভবিষ্যতে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। নিজের কলেজ লাইফের সোনালী দিনগুলি মনে পড়ে। মহাভারতের সুবিশাল অষ্টাদশ অধ্যায়ের মত জীবনের প্রতিটি পর্বের আলাদা আলাদা অভিজ্ঞতা শিক্ষা, সমাজ জীবনের পাঠ, আমার মননকে পরিশীলিত করে আজকের এই আমি। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের গল্পের সুশীলের মত পুরানো দিনকে ফিরে পেতে চাই না, ভবিষ্যতের অনন্ত ক্যানভাসে আরো কিছু কোলাজের অপেক্ষায় থাকি। 

পিনাকীর গাড়ি থেকে মাঝ রাস্তায় নেমে মেট্রো ধরি। জোড়বাগ স্টেশনে নেমে হাঁটতে হাঁটতে এস পড়ি লোদি গার্ডেনের ভিতর। আসন্ন সন্ধ্যায় পাখির কলকাকলী মুখরিত, আলোকিত বড়া গুম্বজ, শীষ গুম্বজকে পাশ কাটিয়ে ঢুকে পড়ি আইআইসিতে। ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো রবিঠাকুরের সম্পর্ক নিয়ে গান পাঠের আয়োজন। অদিতি গুপ্ত গাইছেন। দক্ষিণীর প্রাক্তন ছাত্রী। রবীন্দ্রনাথ যখন আর্জেন্টিনা যান তার বয়স ৬৩ আর ওকাম্পো ৩৪। পরিচিতির পর ওকাম্পো অসুস্থ কবির জন্য নদীর ধারে বুয়েনস এয়ার্সের কাছে একটি বাসা ভাড়া করেন। সেখানে কবি দুইমাস ছিলেন। প্রাচ্যের এই শুভ্র শুশ্রমন্ডিত ঋষিটির সান্নিধ্যে ওকাম্পোর মনে অনুরাগ মিশ্রিত শ্রদ্ধার সৃষ্টি করেছিল। রবিজীবনীকারেরা এই সম্পর্ক নিয়ে অনেক আলোচনা করেছেন। রবি ঠাকুরের গানে যেমন পূজা প্রেম পর্যায়ের গানগুলির সূক্ষপার্থক্য অনেকসময়ই ধরা পড়ে না, আমার মনে হয় ওকাম্পোর রবি ঠাকুরের প্রতি অনুভূতিটুকু এ্যডমিরেশন ভাললাগা মিশিয়ে। ওকাম্পো নিজেও সাহিত্যজগতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

আজকাল তসলিমা নাসরিনকে বাঙালীদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে খুব দেখা যায়। এই ফাংশনেও এসেছিলেন। বেরোবার সময় সিঁড়িতে দেখা। বাংলাদেশে তিন বছর চাকরীর সুবাদে বাঙালভাষা অল্পস্বল্প আসে। জিজ্ঞাসা করিজী আপা, আপনি তো ময়মনসিংহের ম্যাইয়া বাঙাল ভাষা শুনে একটু অবাক। বল্লামপার্টিশনের আগে আমরা থাকতাম মায়মনসিং এর আঠারবাড়ীর জমিদারের লাগোয়া বাড়ীতে। জিজ্ঞাসা করলাম চেনেন নাকি নামে? বল্লেন হ্যাঁ তো, আমার ছোটবেলা ময়মনসিংহে কেটেছে। বল্লাম, জানি আপনার বইতে পড়েছি। মেট্রোতে ফিরব। তাড়াতাড়িতে সেলফি নেওয়া হয় নি!

দেবদত্ত

১৩/০৫/২৪

Comments

  1. Replies
    1. Thanks Prasun

      Delete
    2. Khub bhalo lekha. Jyotirmay

      Delete
  2. Khub bhalo lekha
    Chalie jao. Excellent

    ReplyDelete
  3. দারুণ লাগল। অনেক কিছু জানলাম। 👌

    ReplyDelete
  4. অপূর্ব। তোমার সাবলীল লেখা, তথ্য, সাহিত্য রস, ফটো সব মিলিয়ে অনবদ্য।

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

ত্রিবেনী তীর্থপথে ও আরো টিটবিট

রবিঠাকুর ও কিছু হাসি মশকরা

A walk to explore Delhi’s lesser known monuments