রাবণের দেশে পর্ব-৫
কলম্বোতে আমরা উঠেছি এআরবিএনবি থেকে বুক করা হোম স্টে তে।
রাতে খাওয়ার জন্য গেলাম একটা ফুড কোর্টে।আমাদের দেশে ফুড কোর্ট হয় মলে, এখানে রাস্তার পাশে বেশ কিছুটা জায়গা নিয়ে ফুডকোর্ট।
পরের দিন সকালে বেরনোর আগে গ্রুপ ফটো তোলা হল, কারণ শ্রীলঙ্কাতে আমাদের “অদ্য শেষ রজনী”। কলম্বো শহর দর্শন সাঙ্গ করে, রহমত আমাদের এয়ারপোর্ট ছেড়ে দেবে।
কলম্বো মিউজিয়াম যাওয়ার পথে, শহরের রাস্তাঘাট দেখলাম বেশ পরিচ্ছন্ন। সন্ধ্যেতেও দেখলাম সাফাই কর্মচারী রাস্তা পরিষ্কার করছে। আমাদের দেশে খালি সকালেই সাফাই কর্মচারীদের দেখা যায়।কলম্বো, আমাদের মেট্রো শহরের তুলনায় অনেক ছোট, এক মিলিয়নের কম পপুলেশন।সারা দেশের জনসংখ্যা দিল্লি-এনসিআর থেকে অনেক কম। বাড়ীগুলোর ডিজাইন বেশ সুন্দর। রাস্তাঘাটে গাড়ী কম। মারুতির পুরানো মডেল ৮০০ ও দিব্বি চলছে।
কলম্বো ন্যাশানাল মিউজিয়াম বেশ পুরানো স্থাপত্যশৈলীতে সাদা বিল্ডিং, অনেকটা জায়গা জুড়ে।
স্কুলের ছেলে মেয়েরা মিউজিয়াম দেখতে যাচ্ছে সুশৃঙ্খল ভাবে লাইন দিয়ে, সবার পরনে সাদা স্কুল ইউনিফর্ম। সাদা ড্রেস দেখলাম শ্রীলঙ্কাতে খুব চলে।
পুরো মিউজিয়াম দেখতে দুই ঘন্টা লাগে। একটা গ্যালারী দেখলাম সূক্ষ ডিজাইনের তরোয়াল, বন্দুক, কামান। এত সুন্দর কাজকরা অস্ত্র আগে কখনো দেখি নি।
দেওয়াল লিখন পড়ে জানলাম এই অস্ত্রগুলো ওয়ার ট্রফি হিসাবে ডাচ-রা নিয়ে যায় নিজেদের দেশে, ১৭৬৫ সালে ক্যান্ডির রাজাকে যুদ্ধে পরাস্ত করে। ১৯৬০ থেকে অনেক কূটনৈতিক ডায়ালগের পর মাত্র ২০২৩ সালে আমস্টারডাম -এর রিজকস মিউজিয়াম থেকে ডাচ গভর্নমেন্ট শ্রীলঙ্কাকে ফিরিয়ে দিয়েছেন। এরকমভাবেই ব্রিটিশরা ১৮১৫ সালে ক্যান্ডির রাজাকে সিংহাসনচ্যুত করে, রাজার মুকুট ও সিংহাসন নিয়ে যায় ইংল্যান্ডে। ১৯৩৪ সালে শ্রীলঙ্কাকে সিংহাসন ফেরত দেন কিং জর্জ ফাইভ।
আরেকটা গ্যালারিতে মডেল দিয়ে শ্রীলঙ্কার দুই হাজার বছরের বেশী পুরানো ইরিগেশন সিস্টেম বোঝান হয়েছে। বর্ষার জলকে ধরে রাখার জন্য বড় বড় রিজার্ভার, সেখান থেকে ক্যানেলের মাধ্যমে সেচের ব্যবস্থা ছিল বা আছে।
অনেক আগে ভারতীয়রা শ্রীলঙ্কার এই রেন ওয়াটার হারভেস্টিং শিখতে যেত।
একটি গ্যালারিতে শ্রীলঙ্কাতে বুদ্ধধর্মের আগমন ও প্রসার নিয়ে নানা পুঁথি, বুদ্ধমূর্তি ও সংক্ষিপ্ত লেখা আছে। খ্রীষ্টধর্মের ক্যাথলিক, প্রোটেস্টান্টদের মত এদেরও থেরাভেডা ও মহাযান সম্প্রদায় আছে। প্রথমরা বিশ্বাস করেন জগৎ থেকে মুক্তি পেয়ে নির্বানলাভ করতে, দ্বিতীয়দের বিশ্বাস পৃথিবীতে থেকে মানুষের সেবা করতে। একটু সরলীকৃত হলেও মূলকথা এটাই। একটা জায়গাতে বুদ্ধের বিশাল বড় পাদুকা রাখা আছে।
দোতলার ঘরগুলিতে শ্রীলঙ্কার আর্ট ও পেন্টিং সংরক্ষিত আছে।
মিউজিয়াম থেকে বেরিয়ে রাস্তার পাশে দেখলাম রাস্তার পাশে ওপেন এয়ার আর্ট মার্কেট। শিল্পীরা বড় বড় ক্যানভাসে পেন্টিং বানাচ্ছেন।
পরের গন্তব্য হল গঙ্গারামাইয়া বুদ্ধিষ্ট টেম্পল। এই প্রথম কোন মন্দির দেখলাম, যেটা দুটো অংশে বিভক্ত একটা পার্টে মিউজিয়াম আর বেশ কিছুটা দূরে একটা লেকের মধ্যে মন্দির। টিকিট কেটে ঢুকতে হল।
এই টিকিটই আবার মন্দির দেখতে লাগবে। মিউজিয়ামে অনেক এক্সিবিট-সমস্তই পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বুদ্ধকে দান করা হয়েছে। কি নেই সেখানে, রোলস রয়েস থেকে শুরু করে, হাতীর দাঁতের সূক্ষ ডিজাইন করা শোপিস, নানা ধরনের কাটলারি, ভাস, দেখে চাইনিজ বা জাপানিজ মনে হল।
একটা জায়গাতে দেখলাম সোনার জল করা বিশাল বুদ্ধমূর্তি। এক সিকিউরিটির লোক এসে আমায় দেখালেন মোবাইলের ফটো জুম করে, মূর্তির সামনের রাখা ক্যাসকেডের মধ্যে রাখা আছে বুদ্ধের চুল।
কলম্বোর পেট্টা মার্কেট হল অনেকটা কলকাতার বড়বাজারের মত। এরপাশেই হল জামি উল আলফা মস্ক।
সাদা আর পাটকিলে রংএর মোজাইক ডিজাইনের স্থাপত্যের উপরি অংশে, মুসলিম স্থাপত্য রীতির অনুকরণে তৈরী চারটি ডোম দেখে ধারণা করা যায় যে এটি একটি মসজিদ। অনেক টুরিস্ট গেটের সামনে দাঁড়িয়ে। পনের বিশজন করে এক এক ব্যাচে ঢোকান হচ্ছে। অপেক্ষা করছি । আমার পাশে এক বিদেশী তরুণ দাঁড়িয়ে। হাল্কা গুম্ফশশ্রুমন্ডিত মুখ, পরণে গেরুয়া, গায়ে ও হাতে হিন্দুদের পবিত্র ‘ওঁ’ চিহ্ন আঁকা।
মুখের স্মিত হাসিতে শিশুর সারল্য। জিজ্ঞাসা করলাম-“তুমি কি ভারত ঘুরে এখানে এসেছ? উত্তরে জানাল - ও জার্মান। ভারতবর্ষ ও আধ্যাত্বিকতাবাদ নিয়ে ওর অপরিসীম কৌতূহল। ভারতীয় জনজীবনের বিবিধ বৈচিত্র, আপাত ব্যস্ততাময়, কোলাহলপূর্ণ, জীবনযুদ্ধে টিঁকে থাকার রসদে লিপ্ত এক সমাজ, ক্যানভাসের কোলাজে তা খালি হিজিবিজি আঁকিবুকি নয়- তার মধ্যে সে খুঁজে বেড়ায় জীবনের অন্তনির্হিত নিগূড় সত্য। ছেলেটির নাম নীল। প্রতিবছর কয়েকমাস ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে বেরায়। হিন্দু ধর্মের প্রতি তীব্র টান ওকে নিয়ে যায় ভারতের বিভিন্ন মন্দিরে। এবারে গঙ্গোত্রী, যমুনোত্রী হয়ে, দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন মন্দিরে ঘুরে এখন শ্রীলঙ্কাতে এসেছে। সাউথ ইন্ডিয়ার মন্দির তার খুব পছন্দ। নীলের বয়স হল তেত্রিশ। জিজ্ঞাসা করি -“তুমি যে এত বেড়াচ্ছ-খরচাপাতি কোথা থেকে পাও?” ও বল্ল, ওর ফ্যামিলি ওকে সাপোর্ট করে। বল্লাম -ও, আচ্ছা তুমি বিবাহিত। নীল বল্ল - না, ও বিয়ে করে নি। বাবা-মা ওকে সাহায্য করে। এই ট্রিপে আমার বিদেশী সাথী ও রাস্তায় আলাপ হওয়া সব তরুণ-তরুণীদের মুখে অকপটে বয়ফ্রেন্ড বা গার্লফ্রেন্ড থাকার কথা শুনেছি, তাই নীলকে জিজ্ঞাসা করি - তোমার গার্লফ্রেন্ড নেই। নীলের উত্তর শুনে অবাক হলাম। ও বল্ল-“না, আমার কোন গার্লফ্রেন্ড নেই, বিয়ে করব না, আই এ্যম ম্যারেড টু গড”। এ যে দেখি সাক্ষাত আমাদের দেশের মীরাবাই। পশ্চিমি প্রাচুল্যে ভরা উন্নত পরিবেশে লালিত জগৎ ছেড়ে জনবহুল দেশের ধূলিধূসরিত পথকে আপন করে মন্দিরে মন্দিরে খুঁজে ফিরছে ধর্মের পথ ধরে পরম ব্রহ্মকে। সারা অঙ্গে তাই “ওঁ” ট্যাটু আঁকা। হাজার হোক জার্মান জাত শুনেছি খাঁটি আর্য। আমাদের দেশও তো আর্য সভ্যতার অঙ্গ। কোথাও একটা নাড়ীর যোগ আছে নিশ্চয়ই। বিষ্ময়ে তাকিয়ে দেখি ছেলেটিকে। বিদেশীদের মধ্যে যে গুনটা দেখে ভাল লাগে, সেটা হল যখন যেটা করে পুরো মনটা তাতেই সমর্পন করে। গল্প করতে করতে গেট খুলে দিল মসজিদ দর্শনের জন্য। মেয়েদের জন্য বোরখা টাইপের একটা গাউন দিল। ভারতীয় মুসলিমরা প্রেয়ার করার জন্য ১৯০৮ সালে এই মসজিদ তৈরী করে। শুক্রবারের নামাজে দশ-বার হাজার লোক একসঙ্গে নামাজ পড়ে এই মসজিদে। রহমত আমাদের গাড়ীর ড্রাইভার। ও মুসলিম। বেশীরভাগ মুসলিম তামিল বা কেরালা অরিজিনের। রহমত বাড়ীতে তামিল বলে।
মসজিদের আশেপাশের জায়গাটা অনেকটা আমাদের বড়বাজারের মত। মসজিদ থেকে দুই কিমি দূরে কলম্বো পোর্টের কাছে গাড়ী থামল। পাশে অনেক ছোট ছোট দোকান। ব্যাগ আর জুতোর দোকান বেশী। এই বাজারের নাম পেট্টা মার্কেট।
জোকমো এতদিন খালিপায়ে ঘুরেছে। শ্রীলঙ্কা ছেড়ে যাওয়ার আগে জুতো কিনবে।রবিবার বলে অনেক দোকান বন্ধ। কেনাকাটি চলছে। রাস্তার মাঝে একটা বড় ঘন্টাঘর দেখলাম। এটা হল কলম্বোর ক্লক টাওয়ার ও লাইট হাউস।
এটা ১৯৫৭ সালে তৎকালীন গভর্নর তৈরী করেছিলেন। ১০০ ফুট উঁচু এই টাওয়ারের ঘড়ি তৈরী করেছিলেন লন্ডনের বিখ্যাত বিগবেন ঘড়ি তৈরীর কারিগর। ঐসময় লাইট হাউসের আলো জ্বলত কেরোসিন দিয়ে। উপরে বিশেষ কাঁচ লাগান হয়েছিল, যার প্রতিফলনে ১৬ মাইল দূর থেকে জাহাজ কলম্বো বন্দরের হদিশ পেত। ১৯০৭ সালে গ্যাস এলে পর গ্যাসের সাহায্যে বাতি জ্বলত আর ১৯৩৩ সাল থেকে ইলেকট্রিক বাল্ব জ্বালান শুরু হয়। এখন আশেপাশে অনেক উঁচু বাড়ী হওয়াতে এটা এখন খালি ঘড়িঘর।
সন্ধ্যে হওয়ার আগে আমরা পৌঁছালাম কলম্বো শহরের সি-সাইডে। জায়গাটা অনেকটা বোম্বের মেরিন ড্রাইভের মত।
সমুদ্র সৈকতের পাশের রাস্তার উল্টোদিকে তাক লাগানো সব স্কাই স্ক্যাপার। আজ রবিবার বলে লোকাল লোকের ভীড়। সমুদ্রে যাওয়া যায় না। লোকে পাঁচিলের উপর পা ঝুলিয়ে বসে। বিচের আশেপাশে অনেক পাথর। একটা জায়গায় দেখি বেশ ভীড়।বিচের পাশে শ্রীলঙ্কার ফ্ল্যাগ লাগানো ছিল। সন্ধ্যেবেলায় সেটা সেরিমোনিয়াল গার্ড অফ অনার দিয়ে নামানো হয়।
সেই অনুষ্ঠান দেখলাম। একটু পরে সূর্যাস্ত হল। কলম্বোর সমুদ্র তট হল পশ্চিমে। তাই সবাই সূর্যাস্ত দেখতে এখানে আসে। ভারতের কন্যাকুমারী থেকে সূর্যাস্ত ও সূর্যোদয় দুইই দেখা যায়।
আমাদের শ্রীলঙ্কা সফরের মেয়াদ প্রায় শেষ। রহমত আমাদের এয়ারপোর্ট ড্রপ করে দিল। শহর থেকে চল্লিশ কিলোমিটার দূরে এয়ারপোর্ট। আমাদের ফ্লাইট রাত তিনটেতে। চেন্নাইতে পৌঁছালাম ভোর সাড়ে চারটেতে। সকাল সাড়ে আটটাতে দিল্লির ফ্লাইট। লাগেজ নেওয়ার সময় বিপত্তি। বেল্ট থেকে একটা সুটকেস তুলতেই কাস্টমসের লোকেরা পাকড়াও করল। কোথা থেকে আসছি, কি করি, ঠিকুজী-কুষ্টি নিয়ে সুটকেস নিয়ে গেল আবার স্ক্যান করাতে। স্ক্যানিংএর পর সুটকেস খুলতে হল। খুব ঘাটাঘাটি করে এক অফিসার ইউরেকা বলে যেটা বার করলেন সেটা হল ছাতা! ছাতাটা খুলে উল্টেপাল্টে দেখে সন্দেহ নিরসন হল। আমিও মুক্তি পেলাম। নয়ডা পৌঁছালাম যখন তখন বাজে দুটো। সফর শেষ হল।
সমাপ্ত

































খুব সুন্দর trip 🙂
ReplyDeleteRead all parts, another great travel document and good literature, good guide for others
ReplyDeleteশ্রীলঙ্কা না গিয়েও লেখা পড়ে আর ফটো দেখে একটা ধারণা হলো। ভাল লিখেছিস।
ReplyDelete