রাবণের দেশে-২
পর্ব ২
আজকের রাতে আমরা উঠেছি সিগিরিয়াতে শিশিরা লজে, এআরবিএনবি থেকে বুক করা। খুবই সাধারন মানের।
পরেরদিন সকালে ব্রেকফাস্টে বিশুদ্ধ বাঙ্গালী পাটিসাপটা দেখে আমরা চমকিত। পরে দেখলাম এদেশে পাটিসাপটা বেশ চলে। আজসকালে যাচ্ছি শ্রীলঙ্কার পুরানো রাজধানী অনুরাধাপুর দেখতে। যেতে দুই ঘন্টা লাগবে। শ্রীলঙ্কার পিচের রাস্তা মসৃন, খানাখন্দ নেই।
দুই পাশে ধানের ক্ষেত, গ্রামবাংলার মতই। রহমত বল্ল বছরে দুইবার ফসল হয়। এখন রবি শস্যর সময়। ধানগাছ এখন সবুজ, হারভেস্টিং এর সময় আরো মাস দুয়েক পরে।
অনুরাধাপুরের এনশিয়েন্ট সিটি হল বিশাল জায়গা জুড়ে। পুরোটা ভাল করে দেখতে দিন দুয়েক লাগবে।
পার্কিং লটে এক গাইড পাওয়া গেল। আমাদের হাতে ঘন্টা তিনেক সময়। নাম বল্লেন রাজা।
পুরো নাম জিজ্ঞাসা করতে বল্লেন উনার নাম রাজাপাক্ষা, তবে টুরিস্টদের পুরোটা বলেন না, কারণ বছরখানেক আগে শ্রীলঙ্কার ইকনমিক ক্রাইসিসে তখনকার প্রেসিডেন্ট রাজাপাক্ষা ও তার ভাই এবং আত্মীয়দের দায়ী করে ভিলেন বানিয়েছে দেশের লোকে।
গাইড সাহেব বল্লেন অনুরাধাপুর অতীতের রাজধানী, ৩০০০ বছর ধরে এর অস্তিত্ব। অনেকটা জায়গা নিয়ে এক একটি মনুমেন্ট, সব দেখা ঘন্টা দুয়েকে সম্ভব নয়। পার্কিং থেকে দেখা যাচ্ছিল বিশাল টিলার মধ্যে মন্দির। প্রথম গন্তব্য ওখানেই। এর নাম ইসুরুমুনিয়া, তৈরী করেছিলেন রাজা দেভনমপিয়া তিস্যা।
ইনি অশোকের সমসাময়িক ছিলেন। এর দরবারেই সম্রাট অশোকপুত্র মহেন্দ্র বুদ্ধধর্মের প্রচারে এসেছিলেন। পরে তাঁর বোন সংঘমিত্রা আসেন সিংহলে একই উদ্দেশ্যে, সঙ্গে ছিল বোধিবৃক্ষের একটি ডাল, যা অনুরাধাপুরায় রোপন করা হয়। এখন সেই গাছ মহীরুহ। পরে যখন বুদ্ধগয়ার অরিজিনাল বোধিবৃক্ষ নষ্ট হয়ে যায়, তখন এই অনুরাধাপুরা থেকে গাছের ডাল নিয়ে লাগান হয়েছিল। ইসুরুমুনিয়ার মন্দিরের ভিতর শায়িত বুদ্ধমূর্তি, মন্দিরের কিছু অংশ পাথর কেটে বানান হয়েছে। আরেকটা মন্দির একটু ছোট, সিঁড়ি দিয়ে উঠতে হয়। অন্য একটা সিঁড়ি দিয়ে আমরা টিলার উপরে উঠলাম। পিছনে বাঁধের টানা পাঁচিল। বাঁধের নাম তিস্যাওয়ে। ২২০০ বছর আগে বানান বৃষ্টির জল ধরে রাখতে। মন্দির চত্বরে দেখলাম এক মঙ্ক বসে আছেন, তার পাশে শুভ্রবসনে উপবিষ্ট দুই শিষ্য-শিষ্যা। কৌতূহল হল। জিজ্ঞাসা করে জানলাম ওরা কলম্বোতে থাকেন।
মঙ্কের কাছে সারমন শুনছেন। খোলা চত্বরে গাছের ছায়ায় আশ্রমিক পরিবেশ।
এরপর গাড়ীতে গেলাম আরেকটা পার্কিংলটে। সেখান থেকে হেঁটে গেলাম জয় শ্রী মহাবোধি,
যেখানে সেই বোধিবৃক্ষ আছে। অনেকেই দেখলাম পদ্মফুল নিয়ে আসছে বোধিবৃক্ষের তলায় রাখার জন্য।
অনুরাধাপুরার অন্যতম আকর্ষক দ্রষ্টব্য হল তিনটে স্তূপ, স্থানীয় ভাষায় ডাগোবা। তিনটের নাম হল জেটাবনরামাইয়া, রুয়েনওয়েলি, অভয়গিরি। জেটাবনরামাইয়া স্তূপ অরিজিনালি ৪০০ ফিট উঁচু ছিল।
২২০০ বছর আগে তৈরী এই স্তূপ, গিজা ও খুফু পিরামিডের পর সবচেয়ে উঁচু স্থাপত্য নিদর্শন। রুয়েনওয়ালি স্তূপ যদিও ২০০০ বছর আগে তৈরী, এটাকে রিনোভেট করে সাদা রং এর জন্য অত পুরানো লাগে না। এর সামনে দাঁড়িয়ে ফটো তুললাম।
দুই হাজার বছর আগে তিন হাজার বৌদ্ধ ভিক্ষুদের ডাইনিং হল ও থাকার জায়গা ছিল। খ্রীষ্টাব্দ দশম শতাব্দীর শেষ দিকে চোলা ডাইনাস্টির শাসন শুরু হয় শ্রীলঙ্কাতে। রাজা রাজা চোলা অধিকার করেন অনুরাধাপুরা। তখন অনুরাধাপুর থেকে রাজধানী স্থানান্তরিত হয় পুলানাওয়ারা-তে।
ফিরে চলেছি সিগারিয়াতে, বিখ্যাত সিগারিয়া রক দেখব। ১৮ ডলারের টিকিট বলে সৌরভ ঠিক করল সিগারিয়া রকের পাশে পিদুরাঙ্গুলা বলে আরেকটা রক আছে, সেটাতেই আমরা উঠব। এটার উচ্চতা কম, উঠতে সুবিধা। আদতে দেখা গেল পিদুরঙ্গলাতে কোন সিঁড়ি নেই, খাঁজকাটা পাথরের মধ্যে দিয়ে রাস্তা, ওঠা বেশ কঠিন।
প্রায় শেষ প্রান্তে একটু সমতল জায়গায় শায়িত বুদ্ধমূর্তি। পুরোটা ওঠাতে পারলাম না, কারণ দুর্গম রাস্তা। পরে বুঝলাম খুব বাজে ডিশিসন ছিল সিগারিয়াতে টিকিট কেটে না ঢোকা। সবাই শ্রীলঙ্কাকে আসে সিগারিয়া রক দেখতে। ছয়শ ফিট উঁচু এই টিলাতে উঠতে বারশ সিঁড়ি ভাঙতে হয়। একদম উপরের চাতালে শ্রীলঙ্কার রাজা কাশ্যপ-১ এর রাজধানী ছিল আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর আগে। চারিদেকের সমতলভূমির মধ্যে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে সিগারিয়া রক। সঙ্গী চার তরুন-তরুনীর অদম্য উৎসাহ। পরের দিন ভোরে উঠে ওরা সিগারিয়া রক দেখে এল। ওদের তোলা ছবি শেয়ার করলাম লেখাতে।
পরের দিন সকালে আমাদের ক্যান্ডি যাওয়ার কথা।আমাদের হোম স্টে শিশিরা লজ, মালিক দম্পতির ছেলের নাম। শিশিরাই সব দেখাশুনা করে। হোম স্টের পাশেই ওদের বাড়ী। আসার সময় ওদের ফটো নিলাম।
চেক আউট করে সিগারিয়া দেখতে গেলাম, টিকিট কেটে উপরে ওঠার টাইম নেই। অগত্যা একটা অটো ভাড়া নিয়ে রকটাকে সার্কেল করে ঘুরলাম।
রাজধানী সুরক্ষিত করার জন্য, সমতলে গোল করে পরিখা কাটা, তার পাশ দিয়ে রাস্তা, চারিদিকে ঘন জঙ্গল। কয়েকটা ভিউপয়েন্ট থেকে সিগারিয়ার সুন্দর ভিউ পাওয়া যায়। সেখান থেকেই সিগারিয়ার ফটো তুললাম। আমাদের সঙ্গী ইটালিয়ান ছেলেপুলের দল অল্পবয়সী, ওরা সকাল ছয়টাতে বেরিয়ে হোম স্টে থেকে তিন কিমি হেঁটে এসে রকে উঠেছিল। পরে আফশোষ হল-ওদের সঙ্গে কেন এলাম না, আমার বয়েসে একটু স্ট্রেনাস হত, তবে দেখা তো হত। যাক গতস্য শোচনা নাস্তি।
ক্যান্ডি যাওয়ার রাস্তায় পড়ল নালন্দা গেডিগে নামে ১২০০ বছরের পুরানো এক মন্দির। মেন রাস্তা থেকে একটু ঢুকে একটা রিজার্ভারের পাশে এই মন্দির, শান্ত পরিবেশ।
পাশেই শ্রীলঙ্কান আর্কিওলজির অফিস। টিকিট লাগে না, কোন টুরিস্টও নেই। শুধু পাথরের তৈরী, যদিও এটা বুদ্ধ মন্দির কিন্তু ড্রাভিড়িয়ান আর্কিটেকচার সুস্পষ্ট। ১৯৭০ সালে যখন ড্যাম তৈরী হচ্ছিল, তখন মন্দিরটা জলের তলায় চলে যাচ্ছিল, পুরো মন্দিরটাকে ডিসম্যান্টেল করে উপরে নিয়ে পুনঃস্থাপন করা হয়েছে।
ক্যান্ডি শহর ভূপৃষ্ঠ থেকে পাঁচশ মিটার উঁচুতে। শহরটাকে দেখলে আমাদের
নৈনীতালের কথা মনে পড়ে যায়।
শহরের মাঝে এক বিশাল লেক। এখানে আছে বিখ্যাত টুথ রেলিক টেম্পল। আমাদের গাড়ী এসে দাঁড়াল ভিউ পয়েন্টে। এখান থেকে নীচে লেকসমেত ক্যান্ডি শহরের সুন্দর ভিউ পাওয়া যায়।
এরপর আমরা গেলাম লেকের পাশে এক মঞ্চে শ্রীলঙ্কার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান দেখতে। রহমত আগে থেকে টিকিট কেটে রেখেছিল।
হলটা আমাদের পুরানো সিনেমা হলের মত। মাদল বাজিয়ে নৃত্য পরিবেশন ও তারপর নানারকম মুখোশ-নৃত্য হল। শ্রীলঙ্কার সংস্কৃতির বিশেষ অংশ হল মুখোশনৃত্য।সবশেষে দর্শক আসনের চেয়ার সরিয়ে ফ্লোরের মধ্যে বেশ ডেয়ারিং ফায়ার ড্যান্স হল। আগুন-নৃত্যের পর হলের ভিতর গরম লাগছিল। বাইরে বেরিয়ে প্রথমে আইসক্রিম সেবন করে পরবর্তী গন্তব্যস্থল, বিখ্যাত টুথ-রেলিক টেম্পল দেখতে এলাম। লেকের পাশেই, সমান্য হাঁটা পথ। টিকিট কেটে ভিতরে ঢুকলাম। একতলায় বুদ্ধমূর্তি, বন্ধ দরজার সামনে ড্রামবাদ্য চলছে।
কিছু হাতীর দাঁত মন্দিরের সামনে রাখা। বুদ্ধের দাঁত দেখার আগে হাতীর দাঁতের শো! বেশ ভীড়। দোতলায় লাইন দিয়ে চলতে হল, তবে সেই পবিত্র দাঁত সুদৃশ্য বাক্সের মধ্যে বন্দী।
বুদ্ধের এই দাঁত খ্রীষ্টাব্দ ৩০৯ সাল নাগাদ কলিঙ্গ থেকে এসেছিল, তারপর থেকে সিংহলের যে রাজার কাছে এটা থেকেছে, তাঁকেই সিংহলের প্রকৃত রাজা হিসাবে ধরা হত। পাশে সিঁড়ি দিয়ে উঠে আরেকটা মন্দির, সেখানে সোনার জল করা বুদ্ধমূর্তি দেখলাম।সেই ঘরের সবকিছু সোনার জল করা, আলো ঠিকরাচ্ছে।এক লামা সাদা রংএর একটা সুতো দিলেন হাতে বেঁধে মনস্কামনার জন্য। রহমতও ছিল আমাদের সঙ্গে। সুমিতা মন্দিরে আসে নি, খালি পায় চলতে অসুবিধা। রহমত একটা সুতো জোগাড় করে আমায় দিল- বল্ল বৌদিকে হাতে বেঁধে দেবেন। ভালো লাগলো ওর এই আন্তরিকতাটুকু।


































Comments
Post a Comment