রাবনের দেশে-১


 রাবনের দেশে 

ছোটবেলায় সত্যেনদ্রনাথ দত্তের কবিতায় পড়েছিওই সিন্ধুর টিপ সিংহল দ্বীপ কাঞ্চনময় দেশ, ঐ চন্দন যার অঙ্গের বাস তাম্বুল-বন কেশ” ! ভারত মহাসাগরের কোলে ছোট্ট দেশ শ্রীলঙ্কা। এর সঙ্গে আবার বাঙ্গালীদের গৌরবগাথা মিশে আছে। খ্রীষ্টপূর্বাব্দ প্রায় পাঁচশ বছর আগে বাংলাদেশ থেকে বিজয় সিংহ তাম্রলিপ্ত বন্দর থেকে যাত্রা শুরু করে শ্রীলঙ্কায় নিজের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেন, তারই দেওয়া নাম হল সিংহল বা শ্রীলঙ্কা। সিংহলি জনগোষ্ঠির আদিপুরুষ বিজয় সিংহ, যারা মূলত বুদ্ধিষ্ট। অন্য অংশ হল তামিল, যাঁদের ধর্ম হিন্দু। সিংহলি ভাষার অরিজিন ইন্দো-এরিয়ান আর তামিলদের ভাষা এসেছে দ্রাবিরিয়ান থেকে। তবে সিংহলি ভাষার স্ক্রিপ্ট কিন্তু দ্রাবিরিয়ান।

আমাদের এবারের শ্রীলঙ্কা সফরের ভ্রমন সঙ্গী আমাদের নিয়ে মোট দশজন। সৌরভ অরিন্দম কলকাতা থেকে সস্ত্রীক, ডগ্রুপে আছে চার বিদেশী, যারা আমার ছেলে-মেয়ের বয়সী বা আরো ছোট।


ওরা কলকাতায় একটা এনজিও-তে কয়েকমাসের জন্য চাকরী করতে এসেছে।প্রাণবন্ত, যৌবনের দূত, উচ্ছল ছেলে-মেয়েগুলির সাহচার্যে আমাদের সফর আরো চিত্তাকর্ষক হয়ে পড়ল।মজার হল, চারজনের কাছে কোন সুটকেস নেই। ছোট সাইজের একটা করে রুকস্যাক। যথাসময়ে ওদের কথা লিখব।

আমাদের এয়ার ইন্ডিয়ার ডাইরেক্ট ফ্লাইট। আজ হল ১৯শে জানুয়ারী ২০২৪। দিল্লিতে কনকনে শীত।


রাত দশটা কুড়ির ফ্লাইট ছাড়ল দুই ঘন্টা লেটে। ফলে রাতের ঘুম মাটি। এয়ারপোর্টে ইমিগ্রেশন, ডলার ভাঙিয়ে টাকা নেওয়া নূতন সিম নিতে লেগে গেল আরো এক ঘন্টা। এক ডলারে পাওয়া গেল ৩১৭ টাকা করে। ৪০০ ডলার ভাঙ্গতেই লাখপতি! পরে দেখলাম সব জিনিষের দাম আমাদের দেশের তুলনায় বেশী।একটা ডিম ষাট টাকা, পেয়াজ ৫০০ টাকা কিলো। এবার বুঝে নিন।

সুটকেস নিয়ে এয়ারপোর্ট থেকে বেরোতে যাব, সুমিতা বল্লসেরেছে, একটা সুটকেস তো আমাদের নয়।সত্যিই তো, কালার একই, সাইজ সেম কিন্তু চেনের কালার আলাদা। অগত্যা আবার সিকিউরিটিকে বলে কয়ে ঢুকলাম। বেল্টের ঘূর্ণন বন্ধ, আমার সুটকেস নীচে নামান, পাশে দুই মহিলা, উদ্বিগ্ন মুখ। সরি,টরি বলে সুটকেস বদল করে বেরোলাম। দিল্লির হাড়কাঁপান ঠান্ডার বদলে শরীরে আর্দ্র গরম হাওয়ার পরশ লাগল। গাড়ীতে আমাদের গন্তব্য নিগাম্বো শহর, মাত্র তের কিমি দূরে, এয়ারপোর্ট থেকে কলম্বো শহরের দূরত্ব চল্লিশ কিমি। এয়ারবিএনবিতে বুক করা হোম স্টে। সকাল ছটা বাজে। ঐদিন সকাল আটটা থেকে আমাদের চরকিবাজি। ফলে ঘুম হল না।


হোম স্টে বেশ সুন্দর, এখানের সব বাড়ীর উঠোনে অনেকটা জায়গা নিয়ে বাগান। সব বাড়ীর ছাদ ত্রিকোণ। বাগানে নারকেল গাছ অনেকগুলি, আমার হাইটে ডাব ঝুলছে।

 

আমাদের পরবর্তী দিনগুলির ড্রাইভার কাম গাইড রহমত গাড়ী নিয়ে হাজির। পুরো ট্রিপে রহমতকে সবসময় হাসিখুশী দেখেছি।


আমাদের প্রতিটি খুঁটিনাটি স্বাচ্ছন্দের প্রতি ওর তীক্ষ্ণ নজর ছিল। শুধু যে ভ্রমনস্থল গুলো সম্বন্ধে আমাদের গাইড করেছে তা নয়, বছরখানেক আগে শ্রীলঙ্কার ইকনমিক পলিটিক্যাল ক্রাইসিস নিয়ে ওর বক্তব্যে গভীর জ্ঞানের পরিচয় পেয়েছি। রহমতের বয়স ৩২। মাস কয়েক আগে ওর বিয়ে হয়েছে। তামিল মুসলিমরা বিয়ের পর বর শ্বশুরবাড়ীতে থাকে।রহমতের বৌ এখন তার মায়ের কাছে থাকে, সাথে রহমতও। ওদিকে রহমতের মা অসুস্থ বলে, ওর বোনও মায়ের দেখাশুনা করে। আমাদের দেশের মেঘালয়ের মত মাতৃতান্ত্রিক সমাজ।

আমাদের প্রথম গন্তব্য নিগম্বোরঅঙ্গুরকারমুল্লাবুদ্ধ মন্দির।



দোতলা বাড়ীর উচ্চতায় সোনালী বুদ্ধমূর্তির পাদদশে ড্রাগনের মুখাকৃতির প্রবেশদ্বার। শ্রীলঙ্কার যে কোন মন্দির- হিন্দু বা বুদ্ধ, দেখতে গেলে খালি যে জুতো খুলতে হবে তা নয়, এমনকি টুপিও খুলতে হয়। মন্দিরের ভিতর শায়িত বুদ্ধমূর্তি। ঢোকার সময় হাজারটাকা চাইছিল। না ঢুকে চলে আসছিলাম, তখন আবার যেতে দিল। পরে বুঝলাম ডোনেশন চাইছে। মন্দির থেকে বেরিয়ে দুজন অল্পবয়সী মঙ্কের সঙ্গে আলাপ হল। ওরা বল্ল পিছনে একটা ঘর হলহাউস অফ হেল সেখানে নরকে শাস্তি নানারকম মডেল দিয়ে দেখান। কোথাও ফুটন্ত কড়াইতে ফেলে চোবান হচ্ছে, কোথাও দুই পা ফাঁক করে করাত চালান হচ্ছে। ভূত, প্রেতের সমাহার।

বুদ্ধধর্মেও তাহলে নরক আছে! ভালবেসে ভক্তি উদ্রেকের বদলে ভয় দেখিয়ে উপরওয়ালার শরনাপন্ন হওয়ার হাতছানি বেশী কার্যকরী মনে হল।

আমাদের সফরসঙ্গী দুই তরুণ দুই তরুণী ইটালিয়ান ছেলে মেয়ে। কার্তিকের মত গোঁফওয়ালা ছেলেটির নাম জোকোমো।


এই কয়মাসে অল্প অল্প বাংলা শিখে নিয়েছে। ইটালির নর্থে ওর বাড়ী। মেকাট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে ওর মনে হয়েছিল ইঞ্জিনিয়ারিং ওর জন্য নয়। লাইন চেঞ্জ করে পড়াশুনা করেছে ইন্দোলজি নিয়ে। আমাদের সময় এরকম লাইন চেঞ্জ করার কথা স্বপ্নেও ভাবা যেত না। সংস্কৃত ভাষা শিখেছে। বল্ল - কলকাতা খুব এনজয় করছে। এরমধ্যে রাজস্থান ঘোরা হয়েছে, দিল্লি, মথুরা দেখেছে, দক্ষিণে হাম্পি, আইহোল, পট্টাডাকাল, বিজাপুর ঘুরে নিয়েছে। এরপর প্ল্যান অজন্তা, ইলোরার। ভারতীয় সভ্যতার ব্যাপ্তি ওকে মুগ্ধ করেছে। যেটুকু সময় ভারতে আছে, কাজের ফাঁকে ফাঁকে যতটা পারে এই উপমহাদেশ ভ্রমন করে নেবে। সত্যিই তো, এই  তো জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের সময়। সবচেয়ে মজা হোলো, জোকোমো পুরো ট্রিপটা খালি পায়ে ঘুরলো।

কষ্ট সহ্য করার এলেম আছে। 

নোগাম্বো থেকে বেরিয়ে আশি কিলোমিটার যাওয়ার পর পুনাওয়ালা এ্যলিফান্ট স্যাংচুয়ারি পড়বে। মাঝরাস্তায় গাড়ী দাঁড় করিয়ে ডাব খাওয়া হল।


এখানে ডাবের কালার সোনালী-হলুদ। ১৫০ টাকার ডাবে জলও মিষ্টি এবং প্রতি ডাবে শাঁস আছে। পিনাওয়ালাতে  প্রাইভেট গভর্নমেন্ট দুই ধরনের এ্যলিফান্ট স্যাংচুয়ারি আছে। প্রাইভেটে ট্যুরিস্টরা হাতীর কাছে যেতে পারে, হাতীকে খাওয়াতে পারে। আমরা গভর্নমেন্টের এ্যলিফান্ট স্যাংচুয়ারিতে গেলাম। শ্রীলঙ্কাকে যে কোন দ্রষ্টব্য স্থানের টিকিট মহার্ঘ। ভারতীয় মুদ্রায় এখানে হাজার টাকার উপর লাগল।

রাস্তার একদিকে জঙ্গলে ২০-২৫টা হাতী। নিয়ম করে সকালে বিকালে স্নান করতে রাস্তার উল্টোদিকে নদীতে নিয়ে আসা হয়। আমাদের সামনে গলির মধ্যে সারি সারি দোকানের পাশ দিয়ে তারা সব গেল। নদীতে নেমে তাদের পাইপের জল দিয়ে স্নান চল্ল।

দুই একটা চঞ্চল হাতী দেখি নদী পেরিয়ে অন্যদিকে জঙ্গলে যাচ্ছে। বাচ্চা হাতীগুলোকে বড় হাতীগুলো শুড় দিয়ে জল ছিটোচ্ছে।

ঘড়িতে তিনটে বাজে। শ্রীলঙ্কা আর ভারতের টাইম জোন এক। আমাদের আজকের শেষ গন্তব্য ডাম্বুলা কেভ টেম্পল। খ্রীষ্টপূর্ব প্রথম শতাব্দী থেকে খ্রীষ্টাব্দ দশম শতাব্দী পর্যন্ত এই গুহাগুলি নির্মিত হয়।



প্রায় তিনশ সিঁড়ি ভেঙে উঠতে হল। ডাম্বুলা জায়গাটা শ্রীলঙ্কার মধ্যবর্তী স্থানে। সিঁড়ি চড়ার রাস্তা থেকে চারিদিকের খুব সুন্দর জঙ্গলের ভিউ দেখা গেল।

রাস্তার পাশে খুব পদ্মফুল বিক্রি হচ্ছে।বুদ্ধমন্দিরে দর্শনার্থীরা সবাই পদ্মফুল দিয়ে পুজো দেন। পুরোহিত দিয়ে মন্ত্রপাঠের কোন ব্যবস্থা নেই। বুদ্ধের উপবিষ্ট ধ্যানমূর্তিও সবজায়গায় পদ্মফুলের উপর।পাঁচটি গুহাতে সর্বমোট দেড়শত স্ট্যাচু আছে। কিছু মূর্তি ২০০০ বছরের পুরানো। তবে সবই রিনোভেটেড রিপেন্টেড। গুহার মধ্যে অনেক পুরানো চিত্র আছে। তবে ভারতের অজন্তা ইলোরা এর তুলনায় অনেক বড়।

পার্ট ১ অফ ৫
২২/০২/২০২৪

Comments

  1. Very nice,enjoy.........

    ReplyDelete
  2. বেশ লাগছে। ওখানেও হয়তো আমাদের দেশের মত বিদেশীদের জন্য টিকিটের দাম বেশি তাই তোর মহার্ঘ্য মনে হয়েছে।

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

ত্রিবেনী তীর্থপথে ও আরো টিটবিট

রবিঠাকুর ও কিছু হাসি মশকরা

A walk to explore Delhi’s lesser known monuments