মঞ্চে আমি


 মঞ্চে আমি

সাহিত্য জগতে কল্কে পেতে গেলে ছাপার অক্ষরে বই প্রকাশ জরুরী, তার সঙ্গে সাহিত্য পরিমন্ডলীতে আনাগোনা অবশ্যকর্তব্য সাহিত্যসভার মঞ্চে সশরীরে বিরাজমান হওয়া এরপরবর্তী ফুটস্টেপ হিসাবে ধরে নেওয়া যায়। প্রথমে বর্ণিত দুটো কাজের একটাও না করে আজকে মঞ্চে ওঠার সৌভাগ্য হল। অবশ্যই একা নই, সঙ্গে বেশ কয়েকজন সাহিত্য জগতের মহারথী (যদিও ক্ষুদ্র পরিসরে, দিল্লীর বঙ্গ সংস্কৃতির আঙিনায়), এদেরই সঙ্গে মঞ্চ আলোকিত (আমি টুনি বাল্ব) করলাম, সৌজন্যে নয়ডা কালিবাড়ী।


শুভম এই অনুষ্ঠানের উদ্যোক্তা। পৌষমেলা বইমেলার যুগলবন্দী অনুষ্ঠান। শুভমে- ফোনে আমন্ত্রণ ছিল - কিছু বলতে হবে - রম্যরচনা সংক্রান্ত, সঙ্গে প্রবাসে বাংলা সাহিত্যচর্চার অসুবিধা তার কাটান। চর্চায় আমি গ্রীণহর্ন, চুল পাকলেও লেখা এঁচোড়ের পর্যায়ে, কাঁঠাল হতে ঢের দেরী। ছোটবেলাতেও এঁচোড়েপাকা বদনামটা ছিল, এখন সেই এঁচোড়কে কাঁঠাল পাকাবার প্রচেষ্টায় সাহিত্যসভার মঞ্চে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার গুরুভার দায়িত্ব। মন দোলাচলে, যাব কি যাব না- টু বি অর নট টু বি! আমন্ত্রণ একসেপ্ট করে নিয়েছি এবং না গেলে ক্যাপিটালের সমমনস্কদের সঙ্গে মন দেওয়া-নেওয়ার অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত হব, এসব ভেবে যাওয়া মনস্থ করলাম। এরকম ক্ষেত্রে প্রস্তুতি দরকার। রম্যরচনা ঠিক কি জিনিষ জানা নেই। এক্ষেত্রে একদম গোড়া থেকে শুরু করা দরকার। গুগল বাবাজী জানালেন - রম্যরচনা হল রমনীয় রচনা, মানে যা সুন্দর রচনা তাই রম্যরচনা। আরো চিন্তিত হয়ে পড়লাম। পাঠকের সুচিন্তিত মতামতে জানা যায় লেখা সুন্দর হল কিনা। তাহলে পাঠকের মতে মারকাটারি লেখা বই যার বাজারে কাটতি বেশী, সেটাই হল রম্য রচনা। এই ব্যাখ্যা ঠিক মনঃপূত হল না। আমার মতে হাসির গল্পের শ্রেনীভেদ আছে। উচ্চতর শ্রেনীর হাসির গল্প হল রম্যরচনা, যে রকমটা সৈয়দ মুজতবা আলি, হিমাণীশ গোস্বামী বা তারাপদ রায় লিখে গিয়েছেন। আমার মত আম আদমী রয়েসয়ে পড়ি, যাতে রসস্বাদনে ঘাটতি না হয়। শিবরাম কি নারায়ণ গাঙ্গুলির লেখা ইন্সট্যান্ট হাসির খোরাক।  প্রিপারেশন আর বেশী এগোল না। যা থাকে কপালে!


সাহিত্যসভার
একদিন আগে শুভম-এর হোয়াটস্ এ্যপ মেসেজে জানলাম আজ দুপুর তিনটে থেকে চারটে হল সাহিত্যসভার টাইম স্লট। আমার আবার এই সময়টা হল দ্বিপ্রাহরিক আহারান্তে নিদ্রাদেবীর আরাধনার সময়। বছর দুয়েক আগে শুভম আমাকে দুর্গাপুজার সময় বাংলা কবিতা আবৃত্তির জাজ হতে ডেকেছিল। মহাউৎসাহে সময়মত পৌঁছে দেখি জাজ এবং পার্টিসিপেন্ট সবাই নোপাত্তা। মহাঅষ্টমীর অঞ্জলির মন্ত্রেচ্চারণের মধ্যে শুভম জানাল শিশু আবৃত্তিকারদের থেকে জাজের সংখ্যা বেশী, রয়ে সয়ে শুরু হবে। প্রবল ভরসা নিয়ে এসেছিলাম, কাজী অনিরুদ্ধের কবিতাপাঠ ইউটিউবে শুনে কবিতায় হাত, থুড়ি কান পাকিয়ে এসেছি। ভগ্নমনোরথ হয়ে অঞ্জলির লাইনে ঢুকে পড়েছিলাম। 

এবারে তিনটের বদলে সাড়ে তিনটেতে হাজির হয়েছি কালিবাড়ী প্রাঙ্গনে। আশ্বস্ত হলাম যে, মঞ্চে আপাতত লোকাল শিল্পী গাইছেন, অর্থাৎ সাহিত্যসভার মঞ্চে শোভিত হতে সময়ের অপেক্ষা। শিল্পীর বসার জন্য চেয়ারের বদলে বেঞ্চ। পিঠে হেলান না দিতে পেরে শিল্পী যাতে তাড়াতাড়ি গান শেষ কোরে, পাশের খাওয়ার স্টলে পিঠে-পুলির স্বাদ নিতে পারেন তারই প্রচেষ্টা বলে মনে হল। তবে উনি ছাড়বার পাত্র নন, উপস্থিত শ্রোতৃমন্ডলীর গুঞ্জন উপেক্ষা করে আধাঘন্টা মঞ্চে রইলেন। এরপর সমবেত কন্ঠে গান শুরু হল। এই ললনাবৃন্দ একই ডিজাইন কালারের শাড়ীতে শোভিত প্রভূত উৎসাহ নিয়ে গান করলেন। সামনে তাদের পাড়ার মহিলারা নৃত্যরত। দুর্গাপুজার ভাসানেও আজকাল ট্রাকের সামনের লিড ড্যান্সাররাও মহিলাব্রিগেড। 

ইতিমধ্যে শুভম আমাকে বাকী বক্তাদের সঙ্গে


পরিচয় করিয়ে দিল উদীয়মান ব্লগার হিসাবে। দুই একজনকে আমি আগে থেকেই চিনি। কলমচিরা বেশ কিছু ক্যাটাগরিতে বিভক্ত। সাহিত্যিক, গল্পকার, কবি প্রাবন্ধিক এবং হালফিলে আমার মত নূতন প্রজাতিব্লগার ব্লগাররা হলেন সাহিত্য আঙিনায় গ্রীণহর্ন। লেখক তকমা পেতে লাখ দেরী। সাহিত্যসভার আমন্ত্রিত বক্তাগণ একটু উশখুশ করছেন। দুই তিন দফা চা-পান হয়ে গেল, দিল্লির জানুয়ারি মাসের মেঘলা, উত্তুরে হাওয়া সমৃদ্ধ ঠান্ডা ঠেকাতে। 

এরকম মেলাতে দুই একজন পরিচিতর সঙ্গে দেখা হয়ে যাওয়াটাই ভবিতব্য এনটিপিসিতে আমার ব্যাচমেট দিলীপ শিকদারের সঙ্গে দেখা হল। গিন্নি সমেত উপস্থিত। এসব আলাপে পুরানো বন্ধুবান্ধব, কে কোথায় আছে, তারই খবর সিংহভাগ থাকে। কথার ফাঁকে দিলীপের বৌ মোচার চপ নিয়ে এল। দিলীপের গিন্নি বল্ল, রিটায়ার করে সারাদিন আমায় জ্বালায়, একটু গান গাইতে পারে, কোন গ্রুপে ঢুকিয়ে দিন না। বল্লাম, ঠিক এই কারণে আমারও লেখার হাতেখড়ি হয়েছে। সময়ও কাটছে, হোমফ্রন্টেও শান্তি।


যাক নির্ধারিত সময়ের দেড়ঘন্টা পরে আমাদের ডাক পড়ল মঞ্চে। আমাদের জন্য বেঞ্চ বেঞ্চমার্ক নয়, চেয়ারের ব্যবস্থা হয়েছে। ঘোষিকা জানালেন আমাদের মত গুণী ব্যক্তিদের একত্রে মঞ্চে পেয়ে উদ্যোক্তারা আপ্লুত। এরকম ক্ষেত্রে ঝুঁকে পড়ে এক হাত বুকের কাছে নিয়ে অভিবাদন করাই ভদ্রোচিত। আমিও সেইরকম এক প্রচেষ্টা করলাম। এরপর একটি করে গোলাপফুলের প্রাপ্তি হল। তবে গোলাপের সুগন্ধে সৌরভিত হতে পারলাম না, কারণ মনের কোণে ঈশান মেঘ। উপস্থিত লেখকমন্ডলী সিজনড বক্তা। দিল্লীর বিভিন্ন বইমেলা বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে এদের প্রায় সবাইকে দেখেছি শ্রোতা হিসাবে। এবার আমি একসারিতেএক স্টেপে সরাসরি তিন সিঁড়ি ভাঙার ফল নাকি কৃতকর্মের খেসারত। মাইক নট মাই লাইক! এরকম ক্ষেত্রে যত তাড়াতাড়ি মাইক হাতে পাওয়া যায় ততই মঙ্গল। নিজের ভাষণের ভারমুক্ত হয়ে ভারিক্কি চালে বাকী ভারী ওজনদার (হেভিওয়েট) দের  জ্ঞানগম্যি হৃদয়স্থ করার সুযোগ পাওয়া যায়। চেয়ারের নাম্বারিং অনুযায়ী আমি দ্বিতীয় বক্তা।

শুভম হল সঞ্চালক। এনটিপিসিতে আমার পরের ব্যাচ। মাইক হাতে স্বচ্ছন্দ। শুভম একসময়ে বন্ধুমহলে গল্পদাদু নামে পরিচিত ছিল। সুন্দর উপক্রমণিকা দিয়ে আলোচনা শুরু। প্রথমবক্তা স্বরূপবাবু, ফিজিক্স পড়েছেন বটে, তবে ইতিহাসই তার প্রথম পছন্দ। এছাড়া ছোটদের জন্য বিজ্ঞানকাহিনী লিখে থাকেন। উনি জানালেন কলকাতা হল প্রবাসী বাঙ্গালী লেখকদের মক্কা। প্রকাশক সব ওখানেই থাকেন। সদ্য কলকাতা বুক ফেয়ার শুরু হয়েছে। উনিও যাচ্ছেন। এলিট ক্লাসের লেখকরা ওখানেই থাকেন। দিল্লির বিখ্যাত লেখকা হলেন তসলিমা নাসরিন। নিজের দেশ এবং পরবর্তীকালে পশ্চিমবঙ্গ থেকে বিতাড়িত হয়ে দিল্লির বাংলাসাহিত্যে নিজগুনে মধ্যমনি। উভয় বাংলার লস আর দিল্লির বাঙ্গালীর লাভ। 

এবার আমার পালা। শুভম দর্শকমন্ডলীর কাছে আমার পরিচিতি দিল। নিজের সাহিত্যচর্চা স্বল্পকথায় সেরে ফেলে প্রবাসে বাংলা সাহিত্যচর্চার বিভিন্ন দিকের কথা শুরু করা গেল। আমার বক্তব্য কিছুটা উত্তরবাহিনী গঙ্গার মত। কার্পেটের তলায় উঁকি মারার অভ্যাসটা বরাবরের এইজন্য চাকুরীজীবনে বসেদের কাছে বকা খেয়েছি। এতদিন পরে অভ্যাস কি আর বদলায়। রিটায়ারমেন্টের পর আরও মুক্তকচ্ছ। আমি অবশ্য, সাহিত্যচর্চা, কোন ভৌগলিক গন্ডীর মধ্যে আবদ্ধ রাখায় বিশ্বাসী নই। লেখাটা মাতৃভাষায় হলেও কুশীলব অন্যপ্রদেশের হলে ক্ষতি কি। প্রাদেশিকতা ভাবধারার উপরে আমরা ভারতীয়। আরেকটা কথা সবিনয়ে জানালাম যে এ্যমেচার লেখক বা শিল্পী (গায়ক কি নাটক বা নৃত্য) সবারই একই ধরনের প্রবলেম। লেখকদের লেখার সার্থকতা পাঠকের এপ্রিশিয়েসনে। শিল্পীদের প্রবলেম আরো এককাঠি উপরে, প্রথমে দরকার মঞ্চ তারপর দর্শককুলের হাততালি। আমার এক নাট্যপ্রেমী বন্ধু নিজের গ্যাঁটের পয়সা খরচা করে হল বুক করে নাটক করে। সেমসাইড গোল হল মনে হচ্ছে।এ্যমেচারকথাটা বাকীদের পছন্দ হয় নি বলেই মনে হল। মঞ্চ উপস্থিত অনেকেই ষাটোর্ধ। জীবনের সঞ্চিত অভিজ্ঞতার ঝুলি থেকেএই বয়েসে জ্ঞানবিতরন করাই পরম্পরা। তবে আমার মতে, জাত লেখকরা (কবিরা আরো এককাঠি উপরে) প্রথম জীবনেই সাহিত্যে কি কবিতায় তাদের পদক্ষেপ (ঠিক হল না বোধহয়-হস্তক্ষেপ আরো মানানসই, লেখাটাতো হাতেরই কাজ) প্রতিষ্ঠিত করেন।এরপরে আসরের মধ্যমনি হিসাবে অধিষ্ঠিত পাঁচকড়িবাবু বক্তব্য রাখলেন। তিনি ক্যাপিটালে আঠারো বছর ধরে লিটল ম্যাগাজিন চালাচ্ছেন। অতীতেবর্তমানএর হাত ধরে তার পথচলা শুরু। নিজের লেখা ছাপার অক্ষরে প্রথম দেখে খুব উল্লসিত হয়েছিলেন। তারপর গঙ্গা দিয়ে অনেক জল বয়ে গিয়েছে। পরিণত বয়সে আমার মত গ্রীনহর্নদের সাহায্যের জন্য তার ম্যাগাজিন হাত বাড়িয়ে আছে। উনি শ্রোতৃমন্ডলীকে উপদেশ দিলেন (বসে থাকা বেশীরভাগ মহিলা পরের গানের ফাংশনের অপেক্ষা করছেন, কারণ সাহিত্যসভা শিডিউলের থেকে ঘন্টাদেড়েক পিছিয়ে) যে, তারা যাই লিখে থাকুন না কেন, আলমারীজাত না রেখে, নিজের প্রতিভা প্রকাশিত করতে প্রকাশকের কাছে পাঠাতে।


বরাভয় দিলেন, সব লেখা ছাপা নাই হতে পারে, তবে চেষ্টার কোন বিকল্প নেই এরকমটাই পাঁচকড়িবাবুর কথাতে বোঝা গেল। তবে দর্শককুলের নিস্পৃহতা দেখে অপাত্রে জ্ঞানদান মনে হল, খালি মঞ্চে উপস্থিত আমরা কজন মন দিয়ে শুনলাম। শুভম পাঁচকড়িবাবুর বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে জানাল পল কোহেন নামক জগতবিখ্যাত লেখক তার প্রথম উপন্যাসের পান্ডুলিপি আঠারোজন প্রকাশকের কাছ থেকে ফেরত পেয়েছিলেন।


উনিশবারে প্রভূত সাকসেস, এই ঘটনা একদম স্কুলজীবনে রবার্ট ব্রুসে কথা মনে করিয়ে দিল, মাকড়সার ধৈর্য দেখে, উনিও শিক্ষালাভ করে যুদ্ধে অনেক হেরেও হাল না ছেড়ে শেষপর্যন্ত বিজয়ী হয়েছিল। 

পরের বক্তার সাহিত্যজীবনের সঙ্গে মাইকেল মধুসূদনের প্রভূত মিল পাওয়া গেল। উনি লেখালেখির মাঝরাস্তায় ভাষাবদল করে ইংরাজীতে ঝুঁকে পড়েন। তিনটে ইংরাজি লেখা তার দখলে, তার মধ্যে একটা নাকি তিনটে আলাদা ভাষায় অনূদিত হয়েছে। পরে আবার ট্র্যাক চেঞ্জ করেবঙ্গ ভান্ডারের বিবিধ রতনখোঁজাখুজিতে ব্যস্ত। মাতৃভাষা মাতৃদুগ্ধ, এর বিকল্প নেই। বলিউডের একটি সিনেমা উনার লেখা কোন উপন্যাসের প্লট থেকে টুকলিফাই।লেখককুলের আস্ফালন নিতান্তই মসী চালনার মধ্যে সীমিত, অসিরূপী উকিলের মাধ্যমে মামলা মোকদ্দমার রাস্তায় হাঁটার প্রবৃত্তি হয় নি। এই লেখক জানালেন তার আঠারটি বই বাজারে আছে। বাজারে কেমন কাটছে নাকি প্রকাশকের গুদামে উই কাটছে - সেই খবরটা জানা গেল না। আমি নিজে বই কেনার ব্যাপারে বুদ্ধিমানের আপ্তবাক্য মেনে চলি।বই ধার নিয়ে পড়তে হয়। আশায় থাকি ধার দেওয়া বন্ধুটির কাছে এই ঘটনা কবে বিস্মৃতির আঁধারে তলিয়ে যাবে। মোবাইলে প্রায় সব নামকরা বইএর পিডিএফ বিনামূল্যে পাওয়া যায়। টি ভি বই পড়ার মধ্যে সময় সমবন্টন করতে গিয়ে খালি সিলেক্টেড পছন্দের লেখকের বই পড়ি, কারণ সময়ল্পতা। 

এরপরের বক্তা জানালেন বই লেখা শুরুর আগে অনেক বই পড়া দরকার। ব্যাপারে তপন রায়চৌধুরীর বাঙালনামাতে পড়েছিলাম ঐতিহাসিক যদুনাথ সরকার, আওরংজেবের জীবনী লেখার মশালা সংগ্রহ করেছিলেন বিশ বছর ধরে এবং পরবর্তী বিশ বছর লেগেছে বইটা লিখতে। আজকালের ফাস্টফুড ফাস্টলাইফের যুগে অকল্পনীয় ব্যাপার। লিখছেন অনেকেই, কিন্তু কালজয়ী লেখা মুষ্টিমেয়। ইনি এবং পরবর্তী বক্তার কথায় আসছে প্রজন্মের সময় বাঙলা সাহিত্যের দুরবস্থার ভবিষ্যতবাণী শুনে শংকিত হয়ে পড়লাম। একজন জানালেন মঞ্চে কোন তরুণ সাহিত্যিক নেই। বাংলার শস্যশ্যামল সংস্কৃতিক্ষেত্র, দিল্লির শুকনো আবহাওয়াতে নেতিয়ে পড়েছে। একবক্তা জানালেন, সম্প্রতি ক্যাপিটালের ১৮টি বাংলা স্কুলের রচনা প্রতিযোগিতায়, কয়েকজন মাত্র বাংলাতে লিখেছে। বক্তারা সবাই দর্শকমন্ডলীকে উপদেশ দিলেন, তারা যেন বাড়ীতে বাচ্চাদের সঙ্গে বাংলাতে কথা বলেন বাংলা শেখান। দ্বিতীয়টা আমার কাছে কষ্টসাধ্য মনে হল। স্কুলের ঝোলার ভারে ঝুলে পড়া বাচ্চাদের বাংলা অক্ষর পরিচয় করানো প্রায় রেস্টুরেন্টে ডিশের উপর জিএসটির বোঝা। এই বোঝা বইতে গেলে স্কুলের পরীক্ষায় গড্ডালিকা প্রবাহে বয়ে যাওয়ার সমান। আমি নিজে বিশ্বাস করি সময়ের প্রভাবে বাংলাচর্চার অবনমনে গ্লোবালাইজেশনের প্রভাব অবশ্যম্ভাবী। এই বহুলচর্চিত বিষয়টির সামাধান খোঁজা বৃথা জেনেও, আলোচনার সময়সীমা বর্ধিত করার মোক্ষম টুল। 

এরপরে বলার পালা একমাত্র লেখিকা স্ট্রবেরিদি। বরের ভাতঘুমে ব্যাঘাত ঘটিয়ে, গাড়ীর চালকের আসনে বসিয়ে উপস্থিত হয়েছেন। আমি অবশ্য সবার পরে পৌঁছেও লেটলতিফ সন্মানে বিভূষিত হই নি, কারণ সাহিত্যসভা চালু হয়েছে সুপারলেট টাইমে। স্ট্রবেরিদির ডুয়েল ডিগ্রি বলা যায়। একাধারে গায়িকা লেখিকা। উনি আমাদের সেক্টরেই থাকেন।  পুজো প্যান্ডালে নিয়মিত সোলো করেন, তবে সেটা সোলটাচিং কিনা তাই নিয়ে নানামুনির নানা মত। স্ট্রবেরিদি অবশ্য এসবের তোয়াক্কা করেন না। ফুলে ফুলে ফুলে, দুলে দুলে অথবাআয় তবে সহচরী, হাতে হাতে ধরি ধরিএইধরণের গান সুরে অদলবদল করে গান, বিশ্বভারতীর কঠোর নিয়ম এখন রিল্যাক্সড, তারই লিবার্টি স্ট্রবেরিদির গানে।স্ট্রবেরিদি মুখে সবসময় শিশুসুলভ সারল্য, সবেতেই হাসিমুখ। স্ট্রবেরিদি কবিতা লেখেন, দুটো বইও আছে ছাপার অক্ষরে। এখানের স্টলে পাওয়া যাচ্ছে। একটি কবিতার থিম শোনালেন। প্রথমে সিট নিয়ে ট্রেনে সহযাত্রীর সঙ্গে বচসা, পরে জানা গেল তারা ছোটবেলায় পাড়ার বন্ধু। 

পরবর্তী বক্তা আপেক্ষাকৃত তরুণ। উনি একটি ইংরাজি দৈনিকের বাংলা সংস্করণে সপ্তাহে একদিন কলম চালিয়ে কলাম লেখেন। দিল্লির সংস্কৃতিক মহলে সুপরিচিত মুখ। ধুতি-পাঞ্জাবি-জ্যাকেট শোভিত ফুলবাবু, কৃষ্টির সৃষ্টির জন্য পারফেক্ট এ্যটায়ার। শুভম মডারেট করার সময় জানাল আসন্ন আন্তর্জাতিক ভাষাদিবসে এরকমই আরেকটি সাহিত্যসভার আয়োজনের প্রচেষ্টা হচ্ছে, সেখানে রিজিওনাল ভাষার লেখকদেরও একত্রিত করা হবে। সাধু উদ্দেশ্য সন্দেহ নেই।

এরপর সুন্দরী ঘোষিকা জানালেন যে এইরকম সংস্কৃতি জগতের দিকপালরা সাহিত্যের বিভিন্ন দিকে আলোকপাত করে দর্শকমন্ডলীকে একটি মনোজ্ঞ অনুষ্ঠান উপহার দিয়েছেন, সেইজন্য নয়ডা কালীবাড়ী কমিটি আন্তরিক ভাবে কৃতজ্ঞ। একটি করে বই মিস্টির প্যাকেট প্রাপ্তি হল।


আজকাল রাম-রাজত্বে প্রাচীন ভারতীয় আধ্যাত্ববাদের পুনরুথ্থান হয়েছে। হিন্দু ওয়ে অফ স্পিরিচুয়ালিটিতে কিভাবে লিডারশিপ কোয়ালিটি বাড়াতে হবে, তারই উপদেশ সম্মিলিত পুস্তক। আমি আজীবন ফলোয়ার। মঞ্চে উঠে লিডারশিপের প্রথম পাঠ হল আজকে, এই বই আমায় আমায় শিখরে না নিতে পারলেও শিকড়ে বীজবপণ করবে এরকমই একটা আশা রইল। সভার শেষে স্ট্রবেরিদি আলুর চপ চা খাওয়ালেন। দিলখুশ করে বেরোবার সময় পাঁচকড়িবাবুর সাথে দেখা-“বল্লাম, দিল্লির সাহিত্যসভায় যদি আমাকেও সভ্য করে নেন তবে বাধিত হব মনে ভয় কারণ ছাপার অক্ষরে বই বেরোয় নি, আমার দৌড় কালিবাড়ীর ম্যাগাজিন পর্যন্ত। আখেরে কল্কে পাওয়া যাবে কি? উনি বল্লেন -ওটার দায়িত্বে আছেন স্বরূপবাবু, উনাকে বলুন। যথা আজ্ঞা বলে স্বরূপবাবুকে ধরেছি। উনি জানালেন -ওটা পাঁচকড়ি বাবুর ডিপার্টমেন্ট। যাঃ চলে, আটোসাটো বৃত্তের বাইরে আমি ঘূণায়মান। ফিজিক্সে পড়া সেই প্রোটনকে ঘিরে ইলেকট্রনের কক্ষপথ।

রবার্ট ব্রুস কি পল কোহেনের মত আমিও শপথ নিই, একবার ফেল হয়ে মুষড়ে পড়লে চলবে না, আঠারো বারে নিশ্চয়ই হবে, তবে প্রশ্নচিহ্ন হল, ততদিন ধরাধামে থাকব কিনা!

দেবদত্ত 

১৩/০১

Comments

  1. ভালো লাগল পড়ে ।এবার এখানে পত্র পত্রিকায় লেখা পাঠা ।তোর লেখা সব একসঙ্গে করে একটা সংকলন বের করে কোনো বইমেলায় প্রকাশ কর।

    ReplyDelete
    Replies
    1. হুম… সবে তো লেখার শুরু… পরে হবে

      Delete
  2. যথারীতি মচমচে আর মুখরোচক

    ReplyDelete
    Replies
    1. অনেক ধন্যবাদ প্রসূন

      Delete
  3. ক্রমাগত ভালো ক্রমশ ভালোতর

    ReplyDelete
    Replies
    1. অনেক ধন্যবাদ সুদীপ্ত।

      Delete
  4. ভালো লাগলো

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

ত্রিবেনী তীর্থপথে ও আরো টিটবিট

রবিঠাকুর ও কিছু হাসি মশকরা

A walk to explore Delhi’s lesser known monuments