মাইহার ও বাবা আলাউদ্দিন
মাইহার ও বাবা আলাউদ্দিন খাঁ
রাতের ট্রেনে রওয়ানা হয়েছি মধ্যপ্রদেশের পেন্দ্রা রোড স্টেশন থেকে মাইহারের পথে। ট্রেন ভোর সাড়ে তিনটেতে মাইহার পৌঁছাবে। তবে এই সাউথ-ইস্ট সেন্ট্রাল জোনে মালগাড়ী খুব বেশী চলে আর নূতন ট্র্যাক সম্প্রসারনের কারণে প্যাসেঞ্জার ট্রেন ইদানীং লেট রান করছে। আড়াই ঘন্টা লেটে পৌঁছালাম মাইহার স্টেশনে। তখন বাজে ভোর সাড়ে পাঁচটা। মধ্যপ্রদেশের ট্যুরিস্ট ম্যাপে মাইহার দ্বিতীয় শ্রেনীর নাগরিক। সতীপীঠের এক পীঠ হিসাবে মাইহারের পরিচিতি ধার্মিক স্থান হিসাবে। মধ্যভারতের অধিবাসীদের কাছে মা সারদা যতটা পরিচিত, অন্য প্রদেশের লোকেরা অতটা ওয়াকিবহাল নন।
তবে আমার উদ্দেশ্য মা সারদা দর্শনের সাথে সাথে ভারতীয় ধ্রুপদী যন্ত্রসঙ্গীতের প্রবাদপ্রতিম পুরুষ, উস্তাদ বাবা আলাউদ্দিনের বসতবাড়ী দেখা।
আমার সফরসঙ্গী বন্ধু গৌতম। স্টেশনের কাছেই আমাদের হোটেল। নাম শ্যাম প্যালেস। আগে থেকেই বুক করা ছিল। এনট্রি করে রুমে ঢুকে শুয়ে পরলাম। ট্রেন লেট করায় ঘুমটা ঠিকমত হয় নি। খালি ভয় ছিল, এই বুঝি টাইম মেকআপ করে, ট্রেন যত লেট দেখাচ্ছে, তার আগেই পৌঁছে যাবে।
নয়টা নাগাদ উঠে রিসেপশনে গিয়ে দেখি রিসেপশনিস্ট ছেলেটি একগ্রচিত্তে তবলায় চাঁটি মারছে। বছর একুশের ছেলেটির নাম অঙ্কিত চৌবে।
আমরা বাঙ্গালী শুনে বেশ খুশী হল। জিজ্ঞাসা করলাম “মা সারদার মন্দির এখান থেকে কতদূর, আলাউদ্দিনের বাড়ী কি করে যেতে হবে?” শতকরা নিরানব্বইভাগ লোক আসে মা সারদার মন্দিরে পুজো দিতে। অঙ্কিত বেশ অবাক যে আমরা আলাউদ্দিন খাঁ সাহেবের বাড়ী দেখতে এসেছি। অঙ্কিত বাজনা থামিয়ে বল্ল-“মাইহারের গোটা কয়েক বাসিন্দা ছাড়া কেউ জানে না মাইহার যে একসময়ে সঙ্গীত শিক্ষার পীঠস্থান ছিল। সেতারিস্ট রবিশংকর, সরোদবাদক আলি আকবর, বাঁশুরীবাদক পান্নালাল ঘোষ, সেতারশিল্পী নিখিল ব্যানার্জির মত যন্ত্রসঙ্গীত শিল্পীরা মাইহারে এসে সঙ্গীত জীবনের পাঠ নিয়েছিলেন।”। অঙ্কিতের বাড়ী মাইহার থেকে পঁচিশ মাইল দূরে। অল্পবয়েসে বাড়ী ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছে সঙ্গীতের টানে। দিনের বেলা কলেজে পড়ে, রাতে হোটেলের ডিউটি, এরই মধ্যে তবলা প্র্যাকটিস। কলকাতায় গিয়ে একমাস ছিল, পন্ডিত সুব্রত ভট্টাচার্যের কাছে তবলা শিখে এসেছে। ডিসেম্বরের শেষে গোয়ালিয়ারে অনুষ্ঠিত হবে তানসেন সঙ্গীত সমারোহ। দেশ বিদেশের খ্যাতনামা মার্গ সঙ্গীত শিল্পীরা সেখানে ভাগ নেন। সেখানে ডাক পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। অঙ্কিতও ডাক পেয়েছে সঙ্গীত সম্মেলনে যাওয়ার। এখন সে জোর তালিম নিচ্ছে। কে বলতে পারে ভবিষ্যতে হয়ত অঙ্কিত এক নামকরা তবলচী হবে। অঙ্কিতের কাছেই শুনলাম ‘মাইহার ব্যান্ড’ ভারতীয় ধ্রুপদী সংগীত ব্যান্ড— তৈরি করেছিলেন বাবা আলাউদ্দিন-ই। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর মাইহারে প্লেগের মড়কে বেঁচে থাকা অনাথ শিশুদের নিয়ে, তাদের ভারতীয় ধ্রুপদী সংগীতে তালিম দিয়ে, বাবা তৈরি করেছিলেন তাঁর সাধের ব্যান্ড। এখন অবশ্যই, সেই ব্যান্ডের প্রথম বাজিয়েরা আর বাজাচ্ছেন না।
উত্তরসূরিরা সেই ঘরানাকেই বহন করে চলেছেন।
মেন রোডের উপরেই নাকি এখনো মাইহার ব্যান্ডের নিজস্ব আস্তানা আছে।
হোটেল থেকে বেরিয়েছি। যাব আলাউদ্দিন খাঁয়ের বসতবাড়ী, যেটা এখন মিউজিয়াম, সেটা দেখে যাব সারদা মায়ের মন্দিরে। দুটো গন্তব্য স্থান একই রাস্তার উপর। উস্তাদ আলাউদ্দিন ছিলেন খাঁটি বাঙাল, ছোটবেলা কেটেছে অধুনা বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবেড়িয়া সাব ডিভিশনের নবীনগরের শিবপুর গ্রামে। জন্ম ১৮৬২ সালে। প্রসঙ্গত নবীনগরে আমার ঠাকুমার বাপের বাড়ী ছিল। বালক আলাউদ্দিনের বাড়ীতে ছিল সঙ্গীতের পরিবেশ। পাঁচ ভাইয়ের বাকীরাও ছিলেন সঙ্গীত অনুরাগী। সঙ্গীতের টানে মাত্র আট বছর বয়েসে বাড়ী ছেড়ে বেরিয়ে আসেন। তখন মায়মনসিং এর মুক্তাগাছার জমিদারের দরবারে উস্তাদ আহমদ আলি ছিলেন সারেঙ্গীবাদক। সেখান থেকে আসেন কলকাতায় এসে সঙ্গীতজ্ঞ কৃষ্ণ গোপাল ভট্টাচার্যের কাছে (উনি নুনো গোপাল নামেও পরিচিত ছিলেন) কন্ঠসঙ্গীতে তালিম নেন। কিন্তু নুনো গোপাল অকালে প্লেগে মারা গেলে আলাউদ্দিন গান আর গাইবেন না বলে ঠিক করেন। যন্ত্রসঙ্গীত শেখার জন্য পাড়ি জমান সুদূর রামপুরের নবাবের দরবারে। কথিত আছে নবাবের সঙ্গে দেখা হচ্ছিল না বলে একদিন নবাবের ঘোড়ার গাড়ীর সামনে ঝাপিয়ে পড়েন নবাবের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে।
হোটেল থেকে কিছুটা হাঁটার পরই পড়ল সেই বিখ্যাত বাড়ী, যেখানের ধুলোর প্রতিটি রেণুতে রয়েছে সঙ্গীতের মূর্ছনা।
পাটকিলে রংএর রং করা পুরানো আমলের বাড়ী। বাইরে থেকে দেখতে জমিদার বাড়ীর মতন। রাস্তার পাশে নীল ফলকে লেখা জানান দিচ্ছে এটা বাবা আলাউদ্দিনের বাড়ী। দরজা জানালার খিলান আগেকার আমলের আর্চ শেপের, বারান্দায় চওড়া থাম। সামনে গেট, অনেকটা জায়গা নিয়ে পুরো বাড়ীটা পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। বাড়ীর নাম মদিনা ভবন। দরজা জানালা সবই বন্ধ। চত্বরে ঢোকা যাবে কিনা তাই নিয়ে আমরা সন্দিহান।
প্রবেশ পথের গেটের ল্যাচ হাত ঢুকিয়ে টানতেই খুলে গেল। ভিতরটা শুনশান। গেটের বামদিকে সুরসাধকের অন্তিম সমাধি স্থলে আটচালার শেপে একটি টুম্ব। আলাউদ্দিনের ছেলে আলি আকবর বাবা-মায়ের পাশাপাশি কবরের উপর স্মৃতিসৌধ নির্মান করেছেন।
ফলকে দেখলাম উস্তাদ আলাউদ্দিন দেহরক্ষা করেন ১৯৭২ সালে। অর্থাৎ ১১০ বছর বেঁচেছিলেন। রবি ঠাকুর আর বিবেকানন্দর সমসাময়িক।
প্রথমে দুই বন্ধু টপাটপ কয়েকটা ফটো তুলে ভাবছি, এবার কি করা যায়। এতদূর থেকে এসে বাড়ীর ভিতরটা দেখা যাবে না? দেখলাম এক ব্যাক্তি মোটরসাইকেল নিয়ে বাড়ীর পিছন দিক দিয়ে এসে গেট দিয়ে বেরোচ্ছেন। তড়িঘড়ি গিয়ে তাকে ধরলাম।
যদিও আমরা প্রবাসী বাঙ্গালী কিন্তু এক্ষেত্রে কলকাতা বল্লে একটু সফ্ট কর্নার হতে পারে, কারণ সঙ্গীতগুরু নিজে ছিলেন খাঁটি বাঙ্গালী, এই আশা নিয়ে বাংলা এ্যকসেন্টে হিন্দিতে বল্লাম- “হামলোগ কলকাত্তা সে আতা হ্যায়, বাড়ীকা ভিতর দেখনেকা খুব ইচ্ছে। মেহেরবানি করকে একটু খোল দো।” ভদ্রলোক পরিষ্কার বাংলায় বল্লেন, “আমিও বাঙ্গালী, যে ছেলেটির কাছে চাবি থাকে, সে আসবে দুপুর দেড়টার পর। ওর নাম মুকেশ। ওকে বলবেন, ও দেখিয়ে দেবে।” আলাপ শুরু হল। উনার নাম হারাধন পুরকায়েত। আদত বাড়ী ছিল হাওড়াতে। ১৯৭৩ সালে, বাচ্চা বয়েসে চলে আসেন মাইহারে। পুরকায়েতবাবুর মা রান্না করতেন কলকাতায় আলি আকবরের গড়িয়াহাটের বাড়ীতে। আলি আকবরের স্ত্রী জুবেদা খাতুন, পুরকায়েতবাবুকে এখানে নিয়ে এসেছিলেন। পুরকায়েতবাবু উনাকে দিদিমা বলত। মাইহারে খুব গরম পড়ে। পঞ্চাশ ডিগ্রী টেম্পারেচার উঠে যায়। গরমের সময়টা জুবেদা তার শাশুড়ীকে নিয়ে চলে যেতেন কলকাতায়। পুজোর সময় থেকে আটমাস এখানেই থাকতেন। ৮৯ সালে আলাউদ্দিন খাঁনের পত্নী মদিনা বিবির দেহান্ত হয়। উনার সঙ্গে দেখা করতে বড় বড় শিল্পীরা যেমন আল্লারাখা, ভীমসেন যোশী, বিসমিল্লা খান এবং আরো অনেকে আসতেন। পুরকায়েতবাবু উস্তাদ আলাউদ্দিনকে চোখে দেখেন নি, তবে অনেক গল্প শুনেছেন। একবার মাইহারের রাজার সঙ্গে কোন ব্যাপারে কথা কাটাকাটি হওয়াতে, রাজা ছড়ি দিয়ে আলাউদ্দিনের হাতে আঘাত করেন। আলাউদ্দিন অভিমানে তল্পিতল্পা গুটিয়ে মাইহার স্টেশনে বসে আছেন ট্রেন ধরার জন্য, রাজা খবর পেয়ে নিজে এসে আলাউদ্দিনকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে আবার ফেরত নিয়ে যান।
বাবা আলাউদ্দিন যেমন সোজা সরল ছিলেন, আবার চট করে রেগে যেতেন। নিজে বাজার করতে ভালবাসতেন। সমান্য দুই এক পয়সার জন্য শব্জীওয়ালার সঙ্গে চেঁচামেচি করতেন, আবার বাড়ীতে গরীব দুঃখী এলে অকাতরে দান করতেন। শিষ্যদের কাছ থেকে কোনদিন দক্ষিণা নেন নি।
একবার নাকি রাজদরবারে এক সিপাহীর কাছ থেকে বন্দুক সিঁড়িতে পড়ে যায়। সিঁড়ি দিয়ে গড়াবার সময় বন্দুকের নল মেঝেতে লেগে ঠকঠক আওয়াজ হচ্ছিল। রাজামশাই তখন সিপাহীকে শাস্তি দিতে উদ্যত। ওস্তাদজী রাজা মশাইকে শান্ত করে অনুরোধ করলেন আরো বিশটা বন্দুক নিয়ে আসতে। রাজা তো অবাক। কি আর করেন। বন্দুক এলে পরে আলাউদ্দিন বন্দুকের নলগুলিকে বিভিন্ন দৈর্ঘ্যে কেটে জলতরঙ্গ ধরনের এক যন্ত্র বানালেন, নাম দিলেন নলতরঙ্গ।
পুরকায়েতবাবুর কাছে শুনলাম, এবার দিল্লিতে জি২০ সম্মেলনে, মাইহার ব্যান্ড নলতরঙ্গ সহকারে অনুষ্ঠান করেছিল।
পুরকায়েত বাবুকে অফিস যেতে হবে। মাইহারে তিনটে সিমেন্ট প্ল্যান্ট আছে। উনি আলট্রাটেক সিমেন্ট ফ্যাক্টারিতে কাজ করেন। যাওয়ার আগে নিজের ফোন নম্বর দিয়ে বল্লেন, উনি কেয়ারটেকার ছেলেটিকে বলে দেবেন যাতে মন্দির দর্শনের পর আমরা ফিরলে বাড়ীটা ঘুরে দেখায়। ধন্যবাদ জানিয়ে উনাকে বাই বাই করে দিলাম।
তখন বাজে দুপুর বারটা। ঠিক করলাম মা সারদাকে দর্শন করে আবার এখানে আসব।বাবা আলাউদ্দিনের বাসা থেকে মন্দির তিন-চার কিলোমিটার দূরে। ব্যাটারি গাড়ীতে দশ মিনিটে পৌঁছে গেলাম। রাস্তা থেকেই দেখলাম সমতল ভূমি থেকে ১০০০-১২০০ ফিট উঁচুতে ত্রিকূট পাহাড়ের শৈলশিরার চূড়ায় মা সারদার মন্দির। এই মন্দির দেড়হাজার বছরের পুরানো। মন্দিরে দুইভাবে পৌছান যায়, পায়ে হেঁটে ১০৫০ সিঁড়ি ভেঙে অথবা রোপওয়েতে চড়ে। দেবতার চরণে পৌঁছাতে ধৈর্যের দরকার। ভক্ত সমাগমের খামতি নেই। রোপওয়েতে ওঠার জন্য আধাঘন্টা দাঁড়াতে হল।
এক একটা ট্রলিতে চারজন করে। উপরে পৌঁছে আবার লম্বা লাইন। তবে উপর থেকে নীচে মাইহার শহর ছবির মত দেখায়। দূরে সিমেন্ট প্ল্যান্ট দেখা যাচ্ছে। পাহাড়ের একটা অংশ টেবিল টপের মত ফ্ল্যাট।
লাইনের ভক্তদের বেশীরভাগের কপালে “জয় মাতা দী” লেখা ফেট্টি। সামনে এক তরুন কাপল।
সদ্য বিয়ে হয়েছে মনে হল। আলাপ হল রেওয়া থেকে এসেছে। এদিকের প্রথাই নাকি বিয়ের পর মা সারদাকে দর্শন করে আশীর্বাদ নেওয়া। সবার হাতে পূজার সামগ্রীর মধ্যে নারকেল আর চুরনি রয়েছে। নারকেল ঠাকুরের পায়ে ছুঁইয়ে পুরুত মশাই ফেরত দিচ্ছেন। অমরকন্টকেও দেখেছিলাম নারকেলের আধিক্য। লাইনে অপেক্ষা করতে করতে ভাবতে লাগলাম নারকেলের এত পপুলারিটির কারণ কি? নারকোল বেশ অনেকদিন পর্যন্ত ঠিক থাকে। শক্ত খোলার কারণে নিয়ে যেতেও সুবিধা। বাড়ী গিয়ে ফাটিয়ে সবাইকে প্রসাদ দেওয়া যায়। একটি পুরো ফ্যামিলিতে তিনজন মহিলা। সবার পুজোর থালাতে শাড়ী। জিজ্ঞাসা করলাম-“এটা কি পুজো দেওয়ার পর ফেরত দেবে?” ওঁরাও জানেন না। এটা না কি পূজারীর উপর নির্ভর করছে। মা সারদার দর্শনেও আরো ঘন্টা খানেক লাগল। আজকাল গর্ভগৃহের সামনে বাউন্সার থাকে। ভাল করে সারদা মাকে লোকেট করার আগেই, কাঁধে রামধাক্কা। পিছনের দুই-তিনজন দর্শনার্থীর সঙ্গে বাউন্সারদের বাকযুদ্ধ বেঁধে গেল। ভারতের মত জনবহুল দেশে এটাই হয়ে থাকে।
আড়াই ঘন্টা পরে নেমে এসেছি নীচে রোপওয়েতে করে। মাইকে এন্যাউন্স হচ্ছে ফ্রি প্রসাদ খাওয়াচ্ছেন কোন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা। ডালিয়ার খিচুড়ি। তাই সই। খিদে পেলে সবই অমৃত। ওখান থেকে একটা ব্যাটারি গাড়ী ভাড়া করলাম। আমাদেরকে মাইহার ফোর্ট দেখিয়ে, আলাউদ্দিন খাঁ এর বাড়ীর সামনে ছেড়ে দেবে।
সব দ্রষ্টব্য কাছাকাছি। মিনিট পনেরর মধ্যে পৌঁছে গেলাম মাইহার রাজবাড়ীতে। মাইহার ইংরেজ আমলে প্রিন্সলি স্টেট ছিল। মাইহারের রাজা ছিলেন নয়টা গান স্যালুটের অধিকারী। প্রিন্সলি স্টেটের পরিধি, সম্পত্তি, খাজনার পরিমাণ দেখে ব্রিটিশ প্রভুরা নম্বার অফ গান স্যালুটের মাধ্যমে তাদের স্ট্যটাস নির্ধারণ করত। মাইসোর, গোয়ালিয়র আর বরোদার রাজা, হায়দ্রাবাদের নিজাম ও জম্মু-কাশ্মীরের নবাব প্রথম সারিতে ছিলেন ২১ গান স্যালুটের অধিকারী হয়। এই সব ছিল “ডিভাইড এ্যন্ড রূল” এর একরকম অস্ত্র। ভোপালের রাণী নিজের স্টেটে ২১ আর রাজ্যের বাইরে ১৯ স্যালুটের অধিকারী। কি সূক্ষ ভাবে ইংরেজ প্রভুরা ভারতীয়দের মধ্যে মর্যাদার ডিফারেন্স করেছিল। টোটো আমাদের নিয় গেল রাজবাড়ীর পিছন প্রান্তে। রক্ষণাবেক্ষনের অভাবে বেশ ভাঙাচোরা।
ভগ্নাবশিষ্ট গেট দিয়ে ভিতরে ঢুকলাম। বিশাল চত্বর এখন গোডাউন। রাজপরিবার থেকে এল এ্যন্ড টি কে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। শুনলাম সাতনা জেলায় ভূগর্ভস্থ পাইপলাইন দিয়ে পানীয় জলের প্রোজেক্টের কাজ চলছে।
ফটো শেসন করে রাজপ্রাসাদের সামনের গেটে এলাম টোটো নিয়ে। লোহার গেট ঠেলে ভিতরে ঢুকলাম। সাদা রংএর বিল্ডিং। এখন সামনের দিকটাতে হেরিটেজ হোটেল হয়েছে।
সামনের লন আর রাজবাড়ীর মাঝে পরিখা। মহারাজা ব্রিজনাথ সিং ১৯১৮ সালে বাবা আলাউদ্দিনকে নিয়ে আসেন মাইহারে রাজদরবারের প্রধান সঙ্গীতজ্ঞ করে। এর আগে আলাউদ্দিন ছিলেন রামপুরে বিখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ ওয়াজির আলি খাঁয়ের শিষ্য। ওয়াজির খাঁ ছিলেন তানসেনের বংশধর। তার মতো বড় ওস্তাদ তখন সারা ভারতবর্ষে আর কেউ ছিল না। তিনি রামপুরের নবাবের সভাবাদক। তিনি ছিলেন একজন বীণাবাদক। এরপর আমৃত্যু আলাউদ্দিন মাইহারে ছিলেন।
গান-বাজনা হোক কি খানাপিনা, সবতেই একসময় সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে কলকাতার নাম দেশের বাকী শহরের থেকে উপরে ছিল। বাঙ্গালীর নিজস্ব খাবার ডাল, ভাত, মাছ, তরকারী। কিন্তু বিরিয়ানী হোক কি কাবাব, যা নবাবী ঐতিহ্য বহন করে, তারও অথেন্টিক ডিশ কলকাতায় পাওয়া যায়। এর পিছনের ইতিহাস দেখতে গেলে বলতে হয় লক্ষৌর শেষ নবাব ওয়াজেদ আলি শা, অউধ থেকে বিতাড়িত হয়ে কলকাতার মেটিয়াবুরুজে ঘাঁটি গাড়েন ১৮৫৬ সালে। সঙ্গে ছিল ছয়হাজার লোক। নবাব ছিলেন একাধারে সঙ্গীত প্রেমিক ও খাদ্যরসিক। তারই বাবুর্চিখানা থেকে লক্ষৌর বিরিয়ানী, পোলাও, কাবাব ধীরে ধীরে কলকাতায় জনপ্রিয় হয়। নবাব আবার নৃত্য-গীত পছন্দ করতেন। ওর হাত ধরেই কলকাতা কত্থক নৃত্যের আখড়া হয়ে ওঠে। উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে বাংলার নিজস্ব কোন ঘরানা ছিল না। একদম ছিল না বল্লে ভুল। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে বিষ্ণুপুর ঘরানা আর কোটালী ঘরানা (কোটালীপাড়া বাংলাদেশের গোপালগঞ্জ জেলায় অবস্থিত) হল বঙ্গদেশের ঘরানা। কিন্তু বেশী পরিচিত হল গোয়ালিয়র ঘরানা, বেনারস ঘরানা, রামপুর ঘরানা, আগ্রা ঘরানা, কিরানা ঘরানা, পাটিয়ালা ঘরানা, মেওয়াটি ঘরানা, জয়পুর ঘরানা। উত্তর বা মধ্য ভারতে রাজা বা নবাবদের দরবারে যারা রাজদরবারের বাদক বা গায়ক ছিলেন, তারা সেই দরবারের নিজস্ব স্টাইল বা ঘরানা চালু করেন। কলকাতায় ইংরেজ শাসন তাড়াতাড়ি শুরু হওয়ায়, সেই অর্থে রাজদরবার ছিল না, তাই গায়ক বা বাদকদের পৃষ্ঠপোষকতা করার কেউ ছিল না। তবুও কলকাতা ছিল মার্গ সঙ্গীতের পীঠস্থান। ডোভার লেন কনফারেন্সে তাবৎ গুণী শিল্পীরা আসতেন। কলকাতা ছিল নাকি সমঝদার শ্রোতা ও সঙ্গীত রসিকের আখড়া। পন্ডিত জ্ঞান প্রকাশ ঘোষ ও বাবা আলাউদ্দিন ছিলেন প্রকৃত অর্থে শিক্ষাগুরু। এদের হাত ধরে বড় বড় শিল্পী যেমন, রবিশংকর, আলি আকবর, পান্নালাল ঘোষ, অন্নপূর্ণা দেবী, নিখিল ব্যানার্জি, অজয় চক্রবর্তী উঠে এসেছেন।
টোটো আমাদের ছেড়ে দিল মদিনা ভবনের সামনে। এখনো সকালের মতই শুনশান লাগছে। পুরকায়েতবাবুকে ফোন করলাম। উনি বল্লেন বাড়ীর পিছনদিকে কেয়ারটেকারদের বাসস্থান। মুকেশ ওখানেই থাকে। পিছনে গিয়ে মুকেশ বলে ডাকতেই একটি তরুণ ছেলে বেরিয়ে এল চাবি সহ। প্রথমে দেখলাম বাবার সমাধি পাশে মদিনা বেগমের সমাধি।
উপরে যে সমাধি ফলক আছে, মেঝের তলায় আসল সমাধি। সিঁড়ি দিয়ে নেমে দেখা যায়। এরপর মূল বাড়ী। ভিতরে প্রথমে পড়ল বৈঠকখানা। তার দুইপাশে দুইটি ঘর। অসংখ্য ছবি, আলাউদ্দিন খাঁ এর তৈরী নানা ধরণের বাদ্যযন্ত্র।
একটি আলমারিতে রাখা আলাউদ্দিন খাঁয়ের জামাকাপড়।
ভারত সরকারের দেওয়া পদ্ম বিভূষণের ফলক।
ড্রেসিং টেবিলের একপাশে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের ছবি।
বাড়ীটা বিশাল বড়। মাঝখানের কোর্টইয়ার্ডকে ঘিরে পিছন দিকে দোতলা ও দুইপাশে একতলা সারিসারি ঘর।
উঠোনের দিকে বারান্দাতে রাখা ব্যাবহৃত তক্তপোশ।
সিঁড়ি দিয়ে দোতলার ছাদে উঠলাম। পিছনে বিশাল গ্রাউন্ড। ওই মাঠে প্রতিবছর মার্চমাসে সঙ্গীত নাটক এ্যকাডেমির উদ্যোগে আলাউদ্দিন খাঁ সঙ্গীত সমারোহ হয়। একতলার ছাদ থেকে দূরে দেখা যাচ্ছে মা সারদার মন্দির। সুরসম্রাট রোজসকালে মা সারদার প্রণাম করে দিন শুরু করতেন। প্রায়ই হাজার সিঁড়ি ভেঙে মন্দির দর্শনে যেতেন। ধর্ম কোনদিন ভক্তি ও সঙ্গীতের অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়নি। উনি নামাজও যেমন পড়তেন, তেমনি সরস্বতী বন্দনা, রামকৃষ্ণের পূজাও করতেন।
শুনলাম সব মিলিয়ে চৌত্রিশটা ঘর আছে। বাবার ছেলে মেয়ে নাতি নাতনী, ভাই ও তাঁদের পরিবার ও শিষ্যদের নিয়ে জমজমাট প্রাণবন্ত এই বাড়ী সুরের মূর্ছনায় গমগম করত। এখন এক অদ্ভুত নৈঃশব্দ বিরাজ করছে। সময়ের পলের সাথে সাথে কত কি বদলে যায়। সেই মানুষগুলি আজ অতীতের অন্তরালে, কিন্তু তাদের সুরের মূর্ছনার রেশ বাড়ীটির পরতে পরতে জড়িয়ে আছে। আজ অবহেলায় পড়ে থাকা যন্ত্র সম্ভার এক সময় উস্তাদের আঙুলের পরশে ঝংকার তুলত।
এসেছি সুরসাধকের আঙিনায়। ভগবান, গানে বা বাজনায় অধমকে অজ্ঞ রেখেছেন, কিন্তু অন্তর পরিপূর্ণ সঙ্গীতের দরবারে এসে, এ এক স্বর্গীয় অনুভূতি। না হতে পারি সরোদবাদক, এই ভ্রমনের স্মৃতিকে অক্ষয় করে রাখতে বাইরের সিঁড়িতে বসে সরোদবাদকের ভঙ্গিতে ফটো উঠল।
রবিশংকরের লেখা থেকে জানতে পারি আলাউদ্দিন কড়া ডিসিপ্লিনিয়ারিন ছিলেন। সময়ের একচুল এদিক ওদিক হত না। তালিমে যথাসময়ে না এলে বার করে দিতেন। বাবরি চুল একদম পছন্দ করতেন না। সবাই কদমছাট দিয়ে আসত। এক শিষ্যর খুব শখ ছিল চুলের। সে কায়দা করে দুইপাশে চুল ছোট করে মধ্যে বড় চুল রাখত। বাবা আলাউদ্দিনের সামনে টুপি পরে থাকত। প্রথমে উস্তাদজী টের পান নি। একদিন বাজনা ঠিকমত না হওয়ায় ছেলেটিকে একটি চড় মারেন। তার টুপি উড়ে গিয়ে সব চুল বেরিয়ে পড়ে। তার পরের অবস্থা বলাই বাহুল্য।
বাবা আলাউদ্দিনের মেয়ের নাম ছিল অন্নপূর্ণা। নামটা রেখেছিলেন মাইহারের মহারাজ। আলাউদ্দিন তার বড় মেয়েকে গান শিখিয়েছিলেন, কিন্তু তার বিয়ে হয়েছিল যে বাড়ীতে, সেখানে গানের চল ছিল না। মনের দুঃখে আলাউদ্দিন ঠিক করেছিলেন অন্নপূর্ণাকে গান শেখাবেন না। একদিন আলি আকবরকে সরোদের বাজনার টাস্ক দিয়ে গিয়েছিলেন। অন্নপূর্ণা বাইরে খেলছিলেন। সর্বদা তার বাবার ছাত্রদের শেখানো শুনে তাঁর গানের কান তৈরী হয়েছিল।অন্নপূর্ণা এসে বল্লেন, দাদা, বাজনায় ভুল হচ্ছে, বাবা এরকমটা বলে গিয়েছিল, বলে গেয়ে শোনালেন। সেই শুনে আলি আকবর দুই একবার চেষ্টা করে হঠাৎ থেমে গেলেন। সামনে অন্নপূর্ণা গাইতে গাইতে বল্লেন, “দাদা তুমি থেমে গেলে কেন?” চোখের ইশারায় দাদা দেখালেন-পিছনে বাবা দাড়িয়ে শুনছেন। অন্নপূর্ণা তো ভাবলেন এবার বাবার বকুনি শুনতে হবে। কিন্তু আলাউদ্দিন মেয়েকে বুকে টেনে নিয়ে বল্লেন, আমি খুব ভুল করেছি, তোর এত সুরজ্ঞান, তোকে আমি আজ থেকে শেখাব।
প্রথমে গান দিয়ে শুরু করেছিলেন, পরে টনসিলাইটিসের কারণে বাবা তাকে প্রথমে সিতার এবং পরে আরো কমপ্লেক্স ইনসট্রুমেন্ট সুরবাহার বাজানো শেখান। অন্নপূর্ণা দেবীর ইন্টারভিউতে শুনেছি, তাঁর দাদা বাজনা নিয়ে বাবার কাছে বকুনি খেতেন, কিন্তু অন্নপূর্ণা এতই মনোযোগী শিষ্য ছিলেন যে কোনদিন বকুনি খান নি। রবিশংকরের সঙ্গে ১৯৪১ সালে বিয়ের পর, বাবা আলাউদ্দিন চেয়েছিলেন মেয়ে-জামাই মাইহারে সেটল করুক।
সেই জন্য জমি দেখে রেখেছিলেন। কিন্তু রবিশংকর সস্ত্রীক বছর তিনেক বাদে বম্বে চলে যান। এর পরের ঘটনার সঙ্গে অভিমান সিনেমার ভীষণ মিল। দুজনে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এক সঙ্গে ডুয়েট করতেন। সেই সময়ে অন্নপূর্ণাকে দর্শক বেশী পছন্দ করত। রবিশংকর পঞ্চাশের শেষ দশক অব্দি স্ট্রাগলিং আর্টিস্ট ছিলেন। বিটলসদের সঙ্গে বাজনা সঙ্গত করার পর ধীরে ধীরে নাম হয়। অন্নপূর্ণা দেবীর শিষ্যদের মধ্যে সবচেয়ে নামকরা হলেন বিখ্যাত বাশুরীবাদক হরিপ্রসাদ চৌরাশিয়া। হরিপ্রসাদের ইন্টারভিউতে শুনেছি, উনি তখন বম্বেতে ফিল্মে বাঁশী, হারমোনিয়াম বাজাতেন। অভিনেতা সঞ্জীবকুমার হরিপ্রসাদের বন্ধু ছিলেন। সঞ্জীবকুমার বলেন বাঁশীটাকে আরো ভাল করে শিখতে। ছোটবেলায় হরিপ্রসাদ যখন এলাহাবাদে থাকতেন, তখন মাঝেমধ্যে উস্তাদ আলাউদ্দিন আসতেন অল ইন্ডিয়া রেডিওতে লাইভ প্রোগ্রাম করতে। সেখানে হরিপ্রসাদের বাঁশী শুনে, বাবা বলেছিলেন, “বেটা তুম মাইহার আ কে মেরা পাশ শিখনা। তখন হরিপ্রসাদ বলেছিলেন,”আমি স্কুলে পড়ি। বাবা যেতে দেবে না।” বাবা বলেছিলেন “আমি এখন বুড়ো হয়েছি, তুই বরঞ্চ পারলে আমার মেয়ের কাছে শিখিস। এরপর বম্বেতে টানা তিনবছর হরিপ্রসাদ যেতেন অন্নপূর্ণা দেবীর কাছে। কিন্তু প্রথমে অন্নপূর্ণা দেবী রাজী হন নি। দীর্ঘ তিন বছর পর গুরু মায়ের মন গলল, তবে এই শর্তে রাজী হলেন যে আগে যা শিখেছেন সব ভুলে নূতন করে শিখতে হবে।
পন্ডিত যতীন ভট্টাচার্য দীর্ঘ সাত বছর বাবা আলাউদ্দিনের কাছে তালিম নিয়েছেন। ইনার নাম অতটা শোনা যায় না। ইনি বেনারসের বাঙ্গালী ছিলেন। বাবার খুব প্রিয় শিষ্য ছিলেন। একটু ঠোটকাটা ও স্ট্রেট ফরোয়ার্ড ছিলেন বলে সঙ্গীতজগতের দলাদলিতে কোনঠাসা হয়ে পড়েন। যতীনবাবু ছিলেন দর্শন শাস্ত্রে এমএ। ১৯৭৯ সালে উনি আলাউদ্দিন খাঁয়ের জীবনী লেখেন।
ইন্টারনেটে দ্বিতীয় খন্ডটা আছে। প্রথম খন্ডে তার চিরাচরিত অকপটতায় সঙ্গীত জগতের অন্ধকার দিক তুলে ধরেছেন। তখনকার দিনের কতিপয় নামকরা গাইয়ে বাজিয়েদের পলিটিক্স নিয়ে লিখেছিলেন। প্রথম পর্বটা আর পাওয়া যায় না। তার লেখা, নিম্নোক্ত ঘটনা থেকে বোঝা যায়, বাবা কিরকম সরলমতির মানুষ ছিলেন। সুযোগসন্ধানীরাএই সরলতার আশ্রয় নিয়ে তাকে বোকা বানিয়েছে, প্রকৃত হিতাকাঙ্খীকে তার চোখে হেয় করেছে। বাবার মিউজিক স্কুল তখন সরকারী গ্রান্টে চলে। উস্তাদজী যতীনজিকে বল্লেন-“আমার হয়ে তুমি স্কুলটা চালাও। যতীনজি এসেছিলেন বাজনা শিখতে, ইচ্ছে না থাকলেও গুরুর আদেশ শিরোধার্য করে দায়িত্ব নিলেন। একদিন সকালে যতীনবাবু গিয়েছেন পোস্টঅফিসে চিঠিপত্র আনতে, সেখানে আলাউদ্দিন খাঁ সাহেবের সঙ্গে দেখা। আলাউদ্দিন যতীনবাবুকে বল্লেন -“তুমি বড় নিমকহারাম… তোমারে বসাইছি আমার কলেজে শিক্ষা দিতে, হালায় কোন সাহসে তুমি লেখ যে, তুমি ভাইস প্রিন্সিপাল, আর আমি হইলাম প্রিন্সিপাল!” যতীনবাবু বুঝে পান না প্রবলেম কোথায়। আলাউদ্দিন চেঁচিয়ে বলেন - “বোঝাইবার কি আছে, তুমি বাইশ প্রিন্সিপাল, আমার থেকে বাইশ গুন উপরে আছ, এমএলএ সাহেব কাল আমারে কয়।” যতীনবাবু কি আর করেন, পোস্ট মাস্টারকে সব বুঝিয়ে বল্লেন উস্তাদজীকে বোঝাতে।
সব শুনে পন্ডিতজী তখন যতীনবাবুর কাছে বারবার ক্ষমা চাইতে লাগলেন। আবার বিপরীতে কোমল দয়ালু মনের অধিকারী ছিলেন। মাইহারের মহারাজের নির্দেশ ছিল, তাঁর কাছে বাজাবার আগে আলাউদ্দিন কে শুনিয়ে, উনি যদি মঞ্জুর করেন, তবেই রাজার সামনে বাজানর পারমিশন পাবে। আলাউদ্দিন সব বাজনাদারদের পারমিশন দিতেন। রাজা অনুযোগ করলে বলতেন, “যতই হোক, নাদ সাধনা তো করেছে, এরা ভগবানের পূজা করছে, এদের আমি নিরাশ করতে পারি না।” নিয়ম ছিল বাইরের বাজনাদার রাজদরবারে বাজালে, তার তিরিশ শতাংশ দরবারের বাদকের প্রাপ্য হবে। কিন্তু বাবা আলাউদ্দিন কখনো এক পয়সাও নেন নি। পন্ডিত রবিশংকরের ইন্টারভিউতে শুনেছি, দেশের কোন অনুষ্ঠানে যেখানে রবিশংকর, আলি আকবর বাজাচ্ছেন, সেখানে হয়ত বাজিয়েদের মধ্যে বাবা আলাউদ্দিনও আছেন। রবিশংকর যারপরনাই লজ্জিত হতেন যখন দেখা যেত গুরুর সন্মানদক্ষিণা শিষ্যর তুলনায় অনেক কম। আসলে উদ্যোক্তারা উস্তাদ আলাউদ্দিনের সারল্যের সুযোগ নিতেন।
ফিরে এসেছি হোটেলে। আজ রাতেই ট্রেন। টেকন্যিকালি চেকআউট করেছি দুপুরে। সন্ধ্যাবেলায় হোটেলের মালিককে পাওয়া গেল। অল্পবয়স্ক। আলাপ হতে নাম বল্ল হিমাংশু, বয়স ২৩ বছর। আমাদেরকে বল্ল রুম খুলে দেবে, আমরা একটু বিশ্রাম করতে পারি। একটু পরেই স্টেশন যাব। তাই গল্প শুরু হল। আগে এটা রেস্টুরেন্ট ছিল। এখন উপরে ছোট ছোট ঘর বানিয়ে হোটেল করেছে। বাবা মারা গিয়েছে ২০১৬ সালে, অকাল বয়েসে। গৌতম ওকে বলছিল আমরা অমরকন্টক বেড়িয়ে ফিরছি, খুব সুন্দর জায়গা। গৌতম জিজ্ঞাসা করল ওকে অমরকন্টক গিয়েছে কিনা। হিমাংশু মাথা নেড়ে না বলে, গৌতম বল্ল একবার মাকে নিয়ে ঘুরে এস। ও প্রত্যুত্তর করল না। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, তোমার বাবা এত অল্প বয়েসে মারা গেলেন কি করে? হিমাংশু জবাব দিল- এ্যকসিডেন্টে। ওর বাবা, মা, ভাই অমরকন্টক থেকে নর্মদা মায়ের দর্শন করে ফিরছিল। এক বাঁকের মুখে গাড়ী উল্টে যায়। এগারজন যাত্রীর মধ্যে ওর বাবাই খালি মারা যায়, আরো কারো কিছু হয় নি। এখন বুঝলাম ও তখন কেন চুপ করে ছিল। মানুষের জীবনে কত ট্রাজেডি ঘটে যায়, কে তার খবর রাখে। রাত নয়টায় ট্রেন। হোটেল ছেড়ে একটু তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়লাম। মাইহার ভ্রমণ সাঙ্গ হল।
দেবদত্ত
২৯/১২/২৩






































সাধু সাধু
ReplyDeleteঅমূল্য লেখা। তুই ঘুরে ধন্য। আমি পড়ে ধন্য।
ReplyDelete