আনন্দময়ী মা ও কিছু উপলব্ধি

 আনন্দময়ী মা কিছু উপলব্ধি


কনখলের মা আনন্দময়ীর আশ্রমের সঙ্গে প্রথম পরিচয় ১৯৭৩সালে। তখন ক্লাস নাইনে পড়ি। গরমের ছুটিতে হরিদ্বার গিয়েছিলাম। সঙ্গে মা, মাসী, মায়ের স্কুলের আরো দুই দিদিমনি। ছিলাম এক ধর্মশালায়। হরিদ্বারের ঘাটে গঙ্গার শীতল জলে শিকল ধরে স্নান আর ফেরার পথে দাদা-বৌদির হোটেলে লাঞ্চ খেয়ে ফেরাটা খুব মনে আছে।


একদিন টাঙ্গা করে যাওয়া হল কনখল। এও এক পবিত্র তীর্থক্ষেত্র। দক্ষের মন্দির, আনন্দময়ী মায়ের আশ্রম, সবই দেখেছিলাম। উনি তখনও সশরীরে ধরাধামে ছিলেন, তবে চাক্ষুষ করেছিলাম কিনা মনে নেই। উনার নাম শোনা ছিল, কপালে বড় টিপ পরা ছবিও দেখেছি। পরিচিতিটা বেশী ছিল, কারণ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ওর ভক্ত ছিলেন। 

চাকুরীরত অবস্থায় যখন ঢাকাতে ছিলাম, তখন রমনা পার্কের পাশে সোরাবর্দী উদ্যানে আনন্দময়ী মায়ের আশ্রম দেখেছি। রমনা কালীবাড়ী তার পাশেই মায়ের আশ্রম।


চারিপাশের গাছ গাছালির মধ্যে অবস্থিত। বুদ্ধদেব বসুর স্ত্রী প্রতিভা বসুর জন্ম (১৯১৫) কৈশোর জীবন কেটেছিল ঢাকাতে। বিয়ের আগে তার নাম ছিল রাণু সোম। তাঁর লেখা আত্মজীবনীজীবনের জলছবিতে, খুব ছোটবেলায় আনন্দময়ী মায়ের কথা আছে। তিনি তখনও অত পরিচিত ব্যাক্তিত্ব নন। বাবার হাত ধরে রাণু গিয়েছিলেন তার আশ্রমে। খুব ফরসা সুন্দরী, বড় সিঁদুরের টিপ পরা এক মহিলা  একটি মূমুর্ষ বাচ্চার কপাল স্পর্শ করে বসে আছেন। ছেলেটিকে নিয়ে যমে-মানুষে চলছিল, কবিরাজ জবাব দিয়ে দিয়েছে, শেষ ভরসা মা আনন্দময়ী। প্রতিভা বসু যখন দেখতে গিয়েছেন, তখন ছেলেটির সঙ্কট কেটে গিয়েছে, আনন্দময়ী মা রাত জেগে প্রর্থনা করেছেন। এই অলৌকিক ঘটনা প্রত্যক্ষ করতে অনেক ভক্তসমাগম হয়েছে।

রিটায়ারমেন্টের আগে আমার পোস্টিং ছিল যোশীমঠ। হরিদ্বারে এনটিপিসির গেস্ট হাউস ছিল কনখলে। যাওয়া বা বাড়ী ফেরার রাস্তায় গেস্টহাউসে উঠতাম। গেস্ট হাউস থেকে পায়ে হাঁটা দূরত্বে ছিল আনন্দময়ী মায়ের আশ্রম।



 

একবার আমি আর সুমিতা গিয়েছি গেস্টহাউস থেকে আশ্রমে। চত্বরের ভিতরে একটা দোকান আছে। মায়ের জীবনী পূজার সামগ্রী, রুদ্রাক্ষের মালা ইত্যাদি পাওয়া যাচ্ছে। একজন বিদেশীনি দোকান চালাচ্ছেন। আলাপ হল। ইনি মায়ের ভক্ত। বছর তিনচার ধরে আছেন। আদতে এ্যমেরিকান। খুব সফ্ট স্পোকেন। বিদেশীদের একটা জিনিষ দেখেছি, যখন যেটা করে, পুরো ডেডিকেশন থাকে সেই কাজের মধ্যে। মায়ের নামগান করেই দিন কেটে যায়। আশ্রমিকদের মত নিরামিষ খেতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছেন। আমরা একটা পঞ্চমুখী রুদ্রাক্ষ কিনলাম। উনি যখন শুনলেন আমি ঢাকার আশ্রমও দেখেছি, তখন গল্প আরো জমে উঠল। 

২০২০তে অবসরগ্রহনের পর যোশীমঠ থেকে ফেরার সময় আবার গেলাম। ওখানে দেখেছি ভক্তদের থাকার জন্য ঘর আছে। ভাবলাম হরিদ্বারে বৃদ্ধ বয়সে এসে কিছুদিন ধর্মকর্ম করে, সংসারজীবন থেকে স্বাদ বদলানোর জন্য এই আশ্রমিক পরিবেশ মন্দ নয়। পুরো সময়ের জন্য সমর্পিত মন হওয়ার মত উচ্চাকাক্ষা আমার নেই। একটাই জীবন, তাই সবরকম একটু একটু করে পরীক্ষা করে তার স্বাদ নেওয়ার আমি পক্ষপাতী। এটা চঞ্চল মনের লক্ষণ। ওই যে কবিগুরু লিখে গিয়েছেন-“আমি চঞ্চল হে, আমি সুদূরেরও পিয়াসী।

আশ্রম দুটো পার্টে। রাস্তার এদিক আর উল্টোদিকে। এক অংশের পিছন দিয়ে গঙ্গার স্রোতস্বিনী ধারা প্রবাহিত হচ্ছে।


ঘাটের সিঁড়ি দিয়ে নেমে অবগাহন করা যায়। এইদিকে মায়ের সমাধি আছে। ১৯৮৪ সালে তার দেহান্ত হয় এই কনখলে।

অন্য পার্টে আশ্রম, দোকান আশ্রমিকদের থাকার জায়গা। এবারে ভাবলাম বিদেশিনীর আবার দেখা পাব। কিন্তু কাউন্টারে বসে এক প্রৌড় সাধু। আশ্রমিক বলে মনে হল। গল্প শুরু হল। উনার নাম রাজু মহারাজ। যুবক বয়েস থেকেই আশ্রমে আছেন। উনার দাদাও এখানে থাকেন। বেনারসের আশ্রমেই বেশীদিন কাটিয়েছেন।


বল্লাম, “বেশ সুখেই আছেন। কী সুন্দর পবিত্র পরিবেশ। কমিউনিটি কিচেনে খাওয়া দাওয়া। কত রকম ভক্তজনের সমাগম হচ্ছে। তাদের সঙ্গে আলাপচারিতায় সময় কেটে যায় নিশ্চয়ই। কি সুন্দর ঘাট আপনাদের। রোজ পুণ্য স্নান করেন গঙ্গার ধারায়।রাজু মহারাজের গলাটা একটু ম্লান শোনালো। একটু একটু করে নিজের মনের কথা মেলে ধরলেন। মনের মত শ্রোতা পেলে, স্বল্পপরিচিতিতেও অনেকেই হৃদয়ে জমে থাকা দুঃখ-কষ্ট অকপটে মেলে ধরেন। 

উনার কথা শুনে রবি ঠাকুরের কবিতার লাইন মনে পড়ে গেল-

আমি যে দেখেছি গোপন হিংসা কপট রাত্রি-ছায়ে

হেনেছে নিঃসহায়ে।আমি যে দেখেছিপ্রতিকারহীন, শক্তের অপরাধে, বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে।


আমার সামনে প্রতিভাত হল, রাজু মহারাজ খুব সুখে নেই, আশ্রমের ধারাবাহিক রুটিন, আননন্দময়ী মায়ের পূজা পাঠ, ধূপের সুগন্ধ- এর মাঝে লুকিয়ে আছে দলাদলি, ক্ষমতার লড়াই। আশ্রমে খালি ত্যাগ, তিতিক্ষার জায়গা নয়, লোভ, হিংসা, দ্বেষ সব মিলিয়ে এক সাধারণ সমাজের প্রতিচ্ছবি। সেই অমেরিকান মহিলার কথা বল্লেন, এখানের দলাদলিতে তিষ্টোতে না পেরে উনি থাইল্যান্ড চলে গিয়েছেন। রাজু মহারাজ বল্লেন উনি খুব সরল মনের মানুষ ছিলেন। রাজু মহারাজ এর আগে বেনারসে আনন্দময়ী মায়ের আশ্রমে ছিলেন। অনেক বিদেশী ভক্তকে দেখেছেন। বেশীরভাগ সরল প্রকৃতির, তারা অনেকেই ট্রাস্টে অনেক টাকা দান করেন, কিন্তু খ্রীশ্চান বলে তাদেরকে কিছুটা অচ্ছুত করে রাখা হয়।তাদের খাওয়ার থালা বা খেতে বসার জায়গা আলাদা রাখা হয়। সাধারনভাবে বিদেশীরা যতদিন আশ্রমে কাটান, তাদের টানটা থাকে বেশী স্পিরিচুয়ালিটির দিকে। পরম সত্যকে খোঁজার এক ব্যাকুলতা থাকে। যখন সেই ঐকান্তিক ইচ্ছেতে ভাঁটা পড়ে, ওরা পাততাড়ি গুটিয়ে ফেলেন। 

রাজু মহারাজের দাদাও থাকেন এখানে। উনার ডিউটি এখন কিচেনে। দুই ভাই একত্রে আছেন, তাই ভাল-মন্দে জীবন কেটে যাচ্ছে। ছোটবেলায় এসে গিয়েছিলেন  এই আশ্রমিক জীবনে, এতবছর পরে এই জীবন ছেড়ে যাওয়ার কোন উপায় নেই। এটা অনেকটা সেইদ্য আদার সাইড অফ রিভার ইজ মোর গ্রীনার।যারা এখানে অনেকদিন ধরে আছেন তারা ভগবানকে কতটা মন থেকে চাইছেন জানা নেই। প্রাত্যহিকতার ম্লান স্পর্শে, ভক্তির কষ্টিপাথর কখন ক্ষয়ে গিয়ে সংসারিক দলাদলির আখড়ায় পরিণত হয়, আশ্রমিকরা জানতেও পারেন না। বাহ্যিক শুচি, কঠোর নিয়মানুবর্তিতা, প্রবাহিত সময়ের সাথে সাথে  মনেকে করে তোলে কঠোর।চরৈবতিকথাটার থেকে সত্যি বোধহয় আর কিছু নয়। কিছু যুগপুরুষ বা মহিয়সী হয়ত আছেন যারা কঠোর সংযম, একাগ্রচিত্তে ঈশ্বরের আরাধনায় রত থেকে দিব্যশক্তি লাভ করেন এবং আমাদের মত সাধারণ মানুষকে শুভচিন্তার পথ দেখান। শ্রীরামকৃষ্ণ বিবেকানন্দ চিরকাল গৃহী ভক্তের কথা বলে গিয়েছেন। পুরাণকালে বাণপ্রস্থের চল ছিল। সংসার জীবনের সায়াহ্নে যখন জাগতিক কর্মকান্ডের ভার কমে আসে, তখন আধ্যাত্বিক চিন্তার ইচ্ছে জাগে। তখনই শুরু হয় দীক্ষা নেওয়ার পালা। পরপারের পথ প্রশস্ত করতে, নাকি ভগবানের চৌকাঠে পৌঁছাতে কিংবা মনের প্রশান্তি আনতে, অথবা হয়ত উপরোক্ত সবগুলির মিশ্রনে জীবনের শেষভাগ কাটাতে সাধারণ মানুষ আশ্রমগুলির দ্বারস্থ হয়।

দেবদত্ত 

২৪/১২/২৩


Comments

  1. লেখা উত্তরোত্তর সমৃদ্ধ হয়ে চলেছে

    ReplyDelete
  2. আমিও হরিদ্বার থাকাকালীন কনখলের আশ্রমে বহুবার গেছি। তবে সেরকম ভালো লাগেনি কখনোই। তোর লেখাতে যে সত্য প্রকাশ পেয়েছে সেটাই আসল কথা। বাইরের তকমার আড়ালে সেই একই রূপ। খুব ভাল লিখেছিস।

    ReplyDelete
  3. খুব ভাল লাগল। আশ্রম ইত্যাদিতে কখনোই আমার আগ্রহ নেই। তবে এগুলো চলে একটা সংগঠনের মত। সংগঠনের ভিত্তি হল ক্ষমতা। ধার্মিক জীবন যাত্রার অন্তরালে তাই ক্ষমতার লড়াই থাকা স্বাভাবিক ।

    ReplyDelete
  4. ইয়ারো রি ভিজিটেড। খুবই সুন্দর লেখা।

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

ত্রিবেনী তীর্থপথে ও আরো টিটবিট

রবিঠাকুর ও কিছু হাসি মশকরা

A walk to explore Delhi’s lesser known monuments