অমরকন্টক

 


অমরকন্টক

গঙ্গা সিন্ধু নর্মদাকাবেরী যমুনা , বহিয়া চলেছে আগের মত, কই সে আগের মানুষ কই- এই নজরুলগীতিটা সম্প্রতি প্রয়াত অনুপ ঘোষালের গলায় খুব পপুলার হয়েছিল। গঙ্গার উৎপত্তি থেকে মোহনা কর্মসূত্রে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে, সিন্ধু নদীর প্রথম ভাগ লাদাখ ভ্রমনের সময় দেখেছি, কাবেরী নদী সাউথ ইন্ডিয়া ভ্রমনের সময় বৃন্দাবন গার্ডেনসে দেখেছি। যমুনার তীরে দিল্লি শহরে জীবনের বেশীরভাগ সময়টা কেটে গেল, খালি নর্মদা নদীটা দেখা হয় নি। নর্মদাই নাকি একমাত্র নদী যার পরিক্রমা হয়। নর্মদার উৎপত্তিস্থল হল মধ্যপ্রদেশের অমরকন্টকে, বিন্ধ্য পর্বতের সানুদেশে।

 শুনেছি অবসর গ্রহনের পর তীর্থ পরিক্রমা করে পুণ্যসঞ্চয় অর্জন করলে পরপারে স্বর্গের পথ প্রশস্থ  হয়। ধর্মে কর্মে মতিতে খামতি থাকলেও, শেষ পারাণির কড়ি অর্জনের লোভ সামলান গেল না। খালি তো তীর্থদর্শনের পুণ্যটুকু নয়, ধর্মপিপাসু মানুষের আকুতি, তার ভক্তিভরে মন্দিরদর্শন, পরিক্রমা, তাদের অখন্ড বিশ্বাস, কষ্টসহিষ্ণুতা আমার মনকে ভরিয়ে তোলে এক অনাবিল আনন্দে। মন্দিরের গর্ভগৃহের প্রস্তরমূর্তি যত না ভক্তি জাগায়, মানুষের অন্তরের ভগবান বিশ্বাস আমায় বেশী আপ্লুত করে। তীর্থদর্শনের মুখ্য উদ্দেশ্য খালি অর্ঘের ডালি সাজিয়ে দেবতার চরণে অর্পণ করা নয়, বেশীটা থাকে সরল মানুষগুলির ভগবানের শ্রীচরণে আত্মসমর্পণের আকুলতার সাক্ষী হতে।

এবারের সফরসঙ্গী অভিন্নহৃদয় বন্ধু গৌতম। আমরা একই বয়সী।


ব্যাচেলর লাইফে কাছাকাছি থাকতাম, একসঙ্গে নাটকও করেছি। গৌতম এখনও নাটক করে, আমি নেপথ্যের মিউজিক প্লেয়ার। সম্পর্ক ক্রান্তি এক্সপ্রেস ট্রেনে যাত্রা শুরু হল নিজামুদ্দিন স্টেশন থেকে সন্ধ্যে ছয়টাতে। যাত্রা পথের বিবরণে সময় নষ্ট করব না। পেন্দ্রা রোড স্টেশনে, ট্রেন একঘন্টা লেট করে, সকাল ১১টাতে পৌঁছাল।


এখান থেকে শেয়ারে বোলেরো গাড়ী যাচ্ছে অমরকন্টক। ঘন্টাখানেকের রাস্তা। শালের জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে পাকদন্ডী ফাঁকা রাস্তা। পরিষ্কার নীলাকাশ।

সূর্যের আলো শাল জঙ্গলের ফাঁক ফোঁকর দিয়ে মাটিতে পড়ছে। এখানে না আছে দিল্লী শহরের মত গাড়ীর আধিক্য বা পলিউশনের ভ্রুকুটি। গাড়ীতে আরো চার-পাঁচটি তরুণ ছেলে। বেশভূষা কি চেহারায় মনে হয় নি তারা আইআইটিতে পড়ে। চেহারা ছবি কি কথাবার্তায় সফিস্টিকেশনের অভাব। বাড়ীর আর্থিক স্বচ্ছলতা সেরকম নয়, দেখে সেইরকম মনে হল।

এরা সবাই বিভিন্ন আইআইটিতে অধ্যয়নরত। এই সময়টা ছুটি। জিজ্ঞাসা করলাম, “তোমরা একে ওপরকে চিনলে কি করে?” জানা গেল এরা সব পাটনাতে একই কোচিং সেন্টারে পড়ত। হিল্লি/দিল্লি ছেড়ে অমরকন্টক বেড়াতে আসছে অল্পবয়সীদের দল, একটু অবাক করা ব্যাপার। জিজ্ঞাসা করলাম পাশ করে এদেশে চাকরী করবে না বিদেশ গিয়ে উচ্চশিক্ষার ইচ্ছে। সমস্বরে উত্তর পেলামদেশেই থাকব। আমাদের সময় উচ্চশিক্ষাটা সমাজে প্রতিষ্ঠিতদের কাছে নিম্নবর্গের তুলনায়  অনেক বেশী সহজলভ্য ছিল। আরো আগে তিরিশ/চল্লিশের দশকে খুশবন্ত সিং এর লেখায় পড়েছি, উনি থার্ড ডিভিশনে পাশ করলেও বংশকৌলিন্যের জোরে লাহোরের সবচেয়ে ভালো কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন। এখন অবস্থা বদলেছে। মেরিট রিজার্ভেশন ভাল কলেজে ভর্তির চাবিকাঠি। আজকাল বংশকৌলন্য খালি সম্বন্ধ করে বিয়েতে কাজে লাগে।

বিন্ধ্য পর্বতের মাইকাল পাহাড় হল নর্মদা নদীর উৎসস্থল।বিন্ধ্যকে যদিওপর্বতআখ্যা দেওয়া হয়েছে, তবে একে অল্প উঁচু পাহাড়ের রেঞ্জ বললেই ভাল। পুরাণে কথিত আছে বিন্ধ্য পর্বত খুব তাড়াতাড়ি উঁচু হতে থাকায়, বিন্ধ্য পর্বতের গুরু অগস্ত্য মুনি দাক্ষিণাত্যে যান। যাবার সময় বিন্ধ্য পর্বত অতিক্রম করার সময়, গুরুকে দেখে বিন্ধ্য নতমস্তক হন। অগস্ত্য মুনি বলে যান, তিনি ফিরে না আসা অব্দি ওইভাবে থাকতে। অগস্ত্য আর ফেরেন নি, আর সেই থেকে বিন্ধ্য ছোট পাহাড়ই রয়ে গিয়েছে। এই কাহিনীঅগস্ত্য যাত্রানামে পরিচিত।

 হোটেলে থাকার ইচ্ছে ছিল না। আশ্রমিক পরিবেশে থাকলে তীর্থক্ষেত্রের ফিল পাওয়া যাবে, এরকমটাই মাথায় ছিল। নেট ঘেটে দুটো আশ্রমের নাম পেলাম। একটার নাম কল্যাণ আশ্রম, অন্যটা মৃত্যুঞ্জয় আশ্রম।


তার মধ্যে কল্যাণ আশ্রমে বুকিং পাওয়া গেল না। পরে কল্যাণ আশ্রমে ঘুরতে গিয়ে শুনলাম, ওখানে রেডক্রসের লোকজন এসেছে। ওদের আশ্রমের ভিতরের মন্দিরটা দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। অখন্ড গীতা পাঠ চলছে। আশ্রমিক পরিবেশ। কথা বলা বা ফটো তোলা নিষেধ। ফেরার দিন আমাদের গাড়ীতে সওয়ার ছিলেন এক ব্যাক্তি। কেন্দ্রীয় ট্রাইবাল ওয়েলফেয়ার ডিপার্টমেন্ট আদিম জনজাতির ছেলে মেয়েদের জন্য স্কুল চালায় ট্রাইবাল অধ্যূষিত অঞ্চলে। এই চেন অফ স্কুলের নামএকলব্য স্কুল উনি উমারিয়ার কাছে স্কুলে পোস্টেড। কল্যাণ আশ্রমে এঁদেরই ট্রেনিং হচ্ছিল রেড ক্রসের তত্বাবধানে। 

মৃত্যুঞ্জয় আশ্রমের বিশাল কারুকার্যমন্ডিত গেটের সামনে আমাদের নামিয়ে দিয়ে গাড়ী চলে গেল। রাস্তার উল্টোদিকে অনতিদূরে নর্মদা নদী দেখা যাচ্ছ। ভিতরের কমপ্লেক্সটা অনেকটা জায়গা জুড়ে। পাথরের চাট্টানের উপর ঝাঁসির রাণী লক্ষীবাঈ এর যুদ্ধরত স্ট্যাচ্যু।


বামদিকে লম্বা করিডোরের পাশে লাইন দিয়ে পরপর রুম। মাঝখানে বিশাল চত্বর। ডানদিকটাতে বড় বড় হল ঘর, মেঝেতে বিছানা পাতা। নর্মদা পরিক্রমা যারা করছেন, তাদের জন্য থাকা-খাওয়া ফ্রি। পাশে বিশাল ডাইনিং হল। এছাড়া কনফারেন্সের জন্য বড় হলও তৈরী হয়েছে সম্প্রতি। জানকী প্রসাদের সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছিল ট্রেন থেকেই।

রুম আছে। হাজার টাকা ভাড়া। ভাড়া বল্লেন বটে, তবে রসিদে ডোনেশন লেখা ছিল। ট্রাস্টের লোক বা রেকমেন্ডেশনে এলে থাকা-খাওয়া ফ্রি। জুতো খুলে রিসেপশনে ঢুকতে হল, আশ্রমের এটাই নিয়ম। খাওয়া দাওয়া ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করাতে জানালেন, ধুতি পরলে তবেই ডাইনিং হলে ঢোকার অনুমতি মিলবে।

কলকাতার সাহেবী ক্লাবে ড্রেস কোড আছে শুনেছি, স্যুটেড, বুটেড না হলে এনট্রি ব্যান, আশ্রমে দেখছি উল্টোটা চলছে। কত রঙ্গ দেখব দুনিয়ায়! ডিসেম্বরের মধ্যভাগ। তাপমাত্রা দেখেছিলাম দিল্লির মতই। তবে দিল্লির থেকে বাতাসে আর্দ্রতার জন্য ঠান্ডা বেশী লাগছে। সাড়ে তিন হাজার ফুট উচ্চতায় অবস্থিত অমরকন্টক, মাইকাল পাহাড়ের যে  চূড়ায় অবস্থিত, তার অধিকাংশটাই কম বেশী  সমতল ভূমি। অমরকন্টক তিনটি নদীর উৎসস্থল। নর্মদা ছাড়া শোন জোহিলা নদীও এই বিন্ধ্য পর্বত শ্রেণী থেকে উৎপত্তি হয়েছে।

রুমে সুটকেস রেখে হাত মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হতেই বাইরে হই হট্টগোলের মধ্যে কাঁসর-ঘন্টার আওয়াজ। ব্যাপার কি জানার জন্য বাইরে বেরিয়ে দেখি কয়েকজন সাধু একটি কলস নিয়ে মঠ-প্রধান, যিনি সম্প্রতি দেহত্যাগ করেছেন, তার ঘরে ঢুকে ছবির সামনে রাখলেন। আমিও ঢুকে পরলাম খবর সংগ্রহের উদ্দেশ্যে। তীর্থস্থানের ধার্মিক মাহাত্ব্য জানার ঔৎসুক্য আমার বরাবরের। শুনলাম এই পবিত্র কলসে অযোধ্যা থেকেপিলা-চাউলপাঠান হয়েছে প্রত্যেক জেলায়। সেখান থেকে ছোট ছোট কলসে করে বিভিন্ন জায়গায়, বিশেষত তীর্থক্ষেত্রে পাঠান হচ্ছে।


২৪শে জানুয়ারীর রামলালার মন্দিরের উদ্বোধনের মাহেন্দ্রক্ষণে লক্ষ লক্ষ ভক্তের সমাগমের আশায় এই বিশেষ কলস পূজা। এক গেরুয়াধারী চেয়ারে উপবিষ্ট। বাকী সবাই ছড়িয়ে ছিটিয়ে কার্পেটে বসে। বেশ ওজনদার বাবাজী মনে হল। নাম শুনলামশান্তি কুটীর বালে বাবাজী পরে বুঝলাম উনি মৃত্যুঞ্জয় আশ্রমের পাশেই শান্তি কুটীর আশ্রমের প্রধান। কিছু প্রবচন শোনার আশায় উনার শ্রীচরণের পাশে বসে পড়লাম।

তীর্থক্ষেত্রে এসেছি। সাধুসন্তের সান্নিধ্যই তো কাম্য। সাধুবাবাকে প্রণাম করে পেঠা প্রসাদ পাওয়া গেল। কথাবার্তার মোড় রাজনীতির দিকেই গেল। তিন গোবলয় রাজ্যে গেরুয়া দল জেতার পর আসন্ন ২৪ ইলেকশনে তার প্রভাব নিয়ে ইতিবাচক গবেষণার আলোচনা হচ্ছে। আমি বিরোধী পক্ষের স্টেটের লোক শুনে সাধুবাবা একটু ক্ষুন্ন হলেন। 

মৃত্যুঞ্জয় আশ্রমের সামনের রাস্তাটা নর্মদার সমান্তরাল পথ ধরে চলে গিয়েছে নর্মদার উদ্গমস্থল। কথিত যে এইখানে মা নর্মদা প্রকট হয়েছিলেন। মন্দির কমপ্লেক্স দুগ্ধধবল, এরকম সাদা মন্দির খালি গঙ্গোত্রীতেই দেখেছি।


চারিদিক ধরে পাঁচিল দেওয়া মেন মন্দিরের বাইরের চত্বরের অন্যদিকে স্নানের জন্য বড় কুন্ড। পাশেই মন্দিরে পূজার সামগ্রী বিক্রির দোকান। জিজ্ঞাসা করলাম, মাটির তলা থেকে নর্মদার জল বেরোচ্ছে, কি করে বুঝব। শুনলাম প্রতি দুই-তিন মাস অন্তর যখন কুন্ডের জল পরিষ্কার করা হয়, সেই সময় দেখা যায়, মাটির তলা থেকে জলের ধারা বেরিয়ে আসছে। 

যেটা ভাল লাগল সেটা হল, পুরো মন্দির চত্বর বাইরেটা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, তীর্থযাত্রীদের লম্বা লাইন নেই, পূজাসামগ্রী কেনার জন্য জোরাজুরি নেই, সর্বোপরি কোলাহল মুক্ত।



সব মিলিয়ে শান্ত সমাহিত পরিবেশ, যা মনে এক স্নিগ্ধ পবিত্রভাবের সঞ্চার করে। মেন কুন্ডের পাশে কাঁচের মধ্যে নর্মদা মায়ের মূর্তি, এখানে সন্ধ্যে সাতটা থেকে আরতি হয়। হরিদ্বারের মত সারি দিয়ে পূজারীদের আরতির ব্যাবস্থা নেই, একজন পুরোহিত আরতি করেন, পাশে আরেকজন মন্ত্রপাঠ করছেন।

আরতির শেষে পুষ্পাঞ্জলি হল। আমরা সবাই ফুল নিয়ে অঞ্জলি দিলাম। বেশ আপন আপন পরিবেশ।

শুনলাম শাওন মাসে ভীড় বেশী থাকে। জুতো রাখতে গিয়ে দেখি পাশে এক সাধুবাবা।নাম বল্লেন মঙ্গলদাস মহারাজ। উনি অমরকন্টকেই থাকেন।

এখন বয়স হয়েছে। যৌবনকালে সারা ভারত পদব্রজে ঘুরেছেন। এখন শরীর দেয় না। বিকালে এখানে এসে বসেন। তীর্থযাত্রীরা যা সাহায্য করে তাতেই চলে যায়। জিজ্ঞাসা করি সাধু কেন হলেন। আমার দিকে গভীর দৃষ্টি নিক্ষেপ করে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বল্লেন-“বাবা, পূর্বাশ্রমের কথা বলতে নেই, তবু বলি বিহারে আরা জেলায় বাড়ী ছিল। বাড়ীতে বাবা-মায়ের মধ্যে অশান্তি ছিল। গ্রামে এক সাধু এসেছিলেন। তখন স্কুলে পড়ি। ওই সাধু যাচ্ছিলেন কামাখ্যা। ওঁর সঙ্গ ধরে বেরিয়ে পড়ি। ভাই বোন অনেক ছিল। মা-বাবা আর খোঁজখবর করেন নি। সেই শুরু। 

মন্দিরের বাইরে পূজাসামগ্রীর দোকানের পাশে লক্ষ্য করলাম বেশ কিছু জড়িবুটির দোকান। আশেপাশে জঙ্গলাকীর্ণ পাহাড়ী অঞ্চলে অনেক রকম ঔষুধি গাছ আছে। আলাপ হল কান্তি বাঈ যাদব নামে এক দোকানীর সঙ্গে।


অনেক রকম গাছের শিকড়, ছাল, পাতা নিয়ে বসে আছেন। চল্লিশ বছর ধরে এই আয়ুর্বেদিক গাছ গাছড়া বিক্রি করছেন। আগে নিজেই জঙ্গলে যেতেন। এখন কাছাকাছি গ্রামের আদিবাসীরা জঙ্গল থেকে এনে উনাকে বিক্রি করে। সীতাবরি, মুশলি, ব্রাহ্মীবুটি , কলিচুরি, জটাশঙ্করী, ফসফসানি, অর্জুন ছাল, কায়াফল, বজ্রকাঠ, ইত্যাদি নানারকম আয়ুর্বেদিক ঔষুধের উপকরণ। ব্যাথার উপশমের মালিশের তেলও আছে। 

মন্দির থেকে দুই কদম দূরত্বে দেখি পুরানো আমলের কিছু মন্দিরের সমষ্টি। পুরো মন্দির কমপ্লেক্স পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। এটা এএসআই প্রোটেক্টটেড হেরিটেজ মন্দিরগোষ্ঠী। অন লাইনে টিকিট কেটে ঢুকলাম। মন্দিরগুলো দেখলেই তাদের প্রাচীনত্ব সম্বন্ধে কোন সন্দেহ থাকে না। পড়ন্ত সূর্যের আলো মন্দিরগাত্রের লালচে-কালো পাথরে থেকে বিচ্ছুরিত হয়ে এক অপূর্ব মোহময় পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।


নর্মদার মন্দিরে যদিও কিছু ভক্ত সমাগম দেখেছি, এই মূহুর্তে  প্রাচীন মন্দিরে এক প্রেমিক যুগল

আমরা দুই বন্ধু, আর কেউ নেই। 

প্রধান তিনটি মন্দির হল শিব মন্দির, কর্ণ মন্দির পাতালেশ্বর মন্দির।


এগুলি সবই একাদশ শতাব্দীতে নির্মান করেছিলেন কালাচরী বংশীয় রাজা কর্ণদেব (১০৩২-১০৭৪) তিনটি মন্দিরই শিবের। প্রত্যেকটি মন্দিরেই শিবলিঙ্গ আছে। বাইরে থেকে ঠিকমত দেখা যায় না, কারণ গর্ভগৃহে যাওয়ার প্রবেশপথ তারজালির ঢাকনা। মন্দিরের প্রথম ধাপে থাকে মন্ডপম, তারপর গর্ভগৃহ। তিনটি মন্দিরের মধ্যে, পাতালেশ্বর মন্দিরের বৈচিত্র্য হল এর গর্ভগৃহ মন্ডপের লেভেল থেকে দেড় মিটার নীচে। সেইজন্য নাম পাতালেশ্বর। এখানে শিবলিঙ্গ স্বয়ম্ভু।  কথিত আছে আদি শঙ্করাচার্য প্রথম এখানে এসে শিবের পূজা করেছিলেন এবং নর্মদার উৎস মুখ খুঁজে পেয়েছিলেন।  এএসআই সংরক্ষিত মন্দিরে সাধারণভাবে ডেয়টির পুজো হয় না, তাই জুতো খোলা ব্যাপারটা নেই। মন্দিরের স্থাপত্য শিল্পের সঙ্গে ভুবনেশ্বরের লিঙ্গরাজ মন্দির বা পুরীর জগন্নাথ টেম্পলের মিল দেখলাম। এই ধরনের মন্দিরশৈলীকেনাগারাস্টাইল বলে। এটা মূলত নর্থ ইন্ডিয়ান মন্দির শৈলী। দক্ষিণের মন্দিরের মত গোপুরম নেই, পাথরের উঁচু বেসের উপর মন্ডপম, সেটা পেরিয়ে মূল মন্দির বা গর্ভগৃহ, মন্দিরের শিখরে কলস আকৃতির পাথর, তার উপর চূড়া।

মন্দিরের পাথরে খোদিত নানা ধরণের কার্ভিং, শত শত শত বর্ষের জল হাওয়ার প্রভাবে পাথরের উপরিভাগ ঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছে।

মন্দিরগুলির মাঝে একটি টিনের ছাউনি দেওয়া বাড়ী। রাস্তার পাশ থেকে কাঠ কেটে একটি ছেলে নিয়ে যাচ্ছে। এএসআই প্রোটেক্টেড মনুমেন্টের মাঝে কেউ বাস করছে দেখে অবাক হলাম। যে ছেলেটি টিকিট দিচ্ছিল, সে বল্ল, এখানে এক সাধ্ধী থাকেন অনেক বছর ধরে, যদিও জমিটা তাঁর নয়। অনেক বলেও ওঠান যায় নি, অন্য জায়গায় জমি অফার করা সত্বেও। মামলা করে কিছুদিন আগে এএসআই জিতেছে, এবারে পুলিশের সাহায্যে হটানো হবে। পুরানো স্থাপত্য নিদর্শন, প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতার প্রতীক, হাজার বছরের পুরাতন মন্দির প্রস্ফুটিত করেছে অতীতের এক পল, তাকেই চাক্ষুষ করে অনুভব করছি জঙ্গালাকীর্ণ শ্বাপদসঙ্কুলএই মন্দিরে পুরোহিত কম্পিতহস্তে পিতলের বিশাল পিলসুজ নিয়ে মন্ত্রপাঠ করছেন, ঠিক যেমনটা অবন ঠাকুর রাজকাহিনীতে লেখা ছিল।

সন্ধ্যে হতেই মৃত্যুঞ্জয় আশ্রমে তীর্থযাত্রীদের আনাগোনা শুরু হল।


সবাই দেহাতী, পদব্রজে পরিক্রমায় রত, রোজকার বিশ-ত্রিশ কিলোমিটার চলার পর শ্রান্ত শরীরে এসে পরিচয়পত্র দেখিয়ে দক্ষিণের বড় বিল্ডিংএর গোটা চারেক হলঘরে ভীড় করছেন। সেখানে সারি দিয়ে মাটিতে জাজিম পাতা। রাতের আশ্রয়স্থল, কম্বল, বালিশও আছে। বাইরে কন্টেনারে চা রাখা, রাতে ডিনারও ফ্রি। যেখানে যেখানে ধর্মশালায় যাচ্ছেন পরিক্রমারত তীর্থযাত্রী, সেই আশ্রমের সিলসহ তারিখ লাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তখন জানকীজী বা তার সহকারী কেউ নেই, এক যাত্রীকে আমিই সিল লাগিয়ে পরিচয়পত্রের ফটো তুললাম।

সাতটার সময় আবার বেরিয়েছি নর্মদা মন্দিরে আরতি দর্শন করে রাস্তার পাশে মাড়োয়ারী হোটেলে খেয়ে ফিরব। পাশের শান্তিকুটীর থেকে ঘন্টার আওয়াজ আসছে। উঁকি মারলাম মন্দিরে। আরতির প্রস্তুতি চলছে। আশ্রমের ছাত্রদের দল, সবার অর্ধ মুন্ডিত মস্তিষ্ক, পিছনে টিকি, ধুতি পরিহিত প্রার্থনার প্রস্তুতি নিচ্ছে।


গিয়ে ওদের সঙ্গেই বসে পড়ি। সামনের বেদীতে দাড়িযুক্ত কোন একজনের মূর্তি। ব্রহ্মা বিশ্বকর্মা (তাও সব জায়গায় নয়ছাড়া, সব দেবতাই শশ্রু-গুম্ফ বিহীন। আদিকালে দেবতারা কি দিয়ে দাড়ি কাটতেন কে জানে! একটি বাচ্চা আমাকেও একটা হিন্দিতে লেখা মন্ত্রর কাগজ ধরিয়ে দিল। ওদের সঙ্গে গলা মিলিয়ে নামগান করলাম। ভক্তির প্রাবাল্য যত না, বেশীটা নূতন জিনিষকে উপলব্ধি করা। খুদে ভক্তের দল, স্বভাবেচিত ভঙ্গিতে কেউ জোরে, কেউ দুলে দুলে, অন্যের দিকে চেয়ে, সপ্তম স্বরে একে অন্যের গলা ছাপিয়ে সুর করে মন্ত্র বলছে। গুরুগম্ভীর পরিবেশ মোটেই নয়, খেলাচ্ছলে পূজা বলা যায়। বাচ্চাদের কাছে এটাই এক্সপেক্টেড। বেরিয়ে এলাম রাস্তায়। 

উদ্গম স্থলের কাছে গিয়ে দেখি আরতি শুরু হয়ে গিয়েছে। বাইরে জুতো খুলে গেলাম তাড়াতাড়ি করে আরতি দেখতে। আনেক বাঙ্গালী। আলাপ হল। সবাই রিটায়ার্ড। ট্রাভেল এজেন্ট নিয়ে এসেছে। পনের দিনের মধ্যপ্রদেশ ট্যুর। আসানসোলে থাকেন। রিটায়ার্ড এক হেডমাস্টারের সঙ্গে আলাপ হল। আরতির পর প্রসাদ খেয়ে বেরিয়েছি, জুতোজোড়া মিসিং আমার আর গৌতম দুজনেরই। এই সেরেছে। এমন জমাটি ঠান্ডায় জুতো ছাড়া থাকাই মুস্কিল। মন্দিরের বাইরে খোলা জায়গার একপাশে জুতো রাখার জায়গা থেকে কীর্তি ডাকছে, “বাবুজী, ইধার আইয়ে, ম্যায়নে উঠাকে রাখ লিয়া যাক বাঁচা গেল। ওর সঙ্গে আগেই আলাপ হয়েছে। কাছের গ্রামে থাকে। চারটে বাচ্চাকে ওর জা এর কাছে রেখে রোজ আসে এখানে ডিউটি দিতে। 

মন্দিরে আসার জন্য মেন রাস্তার থেকে দুই তিনটে প্যারালাল রাস্তা, তার মধ্যে দিয়ে আসতে চোখে পড়লবেঙ্গলি টি স্টল ঢুকে পড়ি সেখানে। বাঙ্গালী দোকানদারটির সঙ্গে আলাপ হল ওর নাম রিন্টু। গরম গরম আলুর চপ, সাবুদানার চপ, একদম কলকাতা স্টাইলে। বেশ টেস্টি। চা খেতে খেতে আলাপচারিতা বাড়ে।


রিন্টুর বয়স পয়ত্রিশ-চল্লিশের মাঝামাঝি। নর্মদা মায়ের বিশেষ ভক্ত। রিন্টু জানাল ২০১৬ সালে বেড়াতে এসে জায়গাটা পছন্দ হয়ে যায়, নর্মদা পরিক্রমার খোঁজ পেয়ে, রিন্টু পদব্রজে যাত্রা শুরু করে। চারমাস লেগেছিল সব মিলিয়ে। ততদিনে শৈলেন্দ্র নারায়ণ ঘোষাল লিখিততপোভূমি নর্মদাবইটি পড়া হয়ে গিয়েছে। নর্মদার সঙ্গে সখ্যতা জন্মেছে, কলকাতায় আর ফিরে যাওয়ার ইচ্ছে হয় না। গেরুয়াধারী সাধু হয়ে, আশ্রমে বা ভক্তদের দানের মুখাপেক্ষী থাকার ইচ্ছে করে নি। তাই এই চপের দোকান। পশ্চিমবঙ্গে, মাঝে ভারী শিল্পের পরিবর্তে চপশিল্পে বিপ্লব আনার ডাক এসেছিল, যদিও জনসাধারণ অনুপ্রানিত হয় নি, হাসি মজাক হিসাবে নিয়েছে। রন্টু সুদূর অমরকন্টকে চপশিল্পের কল্যাণে টুপাইস করছে।

পরের দিন অটো করে বেরোন গেল। প্রথমে যাব কপিলধারা দুধধারা। শহর থেকে দশ কিলোমিটার দূরে। জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে কালো পিচের রাস্তা। যাবার সময় রামকৃষ্ণ আশ্রম চোখে পড়ল। এখানে থাকা যায়, তবে অমরকন্টকের প্রাণকেন্দ্র থেকে দূরে। অমরকন্টক এখনও অন্যন্য তীর্থক্ষেত্রের মত বাণিজ্যিক হয়ে ওঠে নি। নয়ডাতে পার্স নিয়ে বেরোতে হয় না। ফুটপাথের দোকানও পেটিএম বা গুগল পে তে পেমেন্ট নেয়, অমরকন্টকে এখনও খালি ক্যাশ ট্রানজাকশন চলে। তীর্থযাত্রীদের পকেটকাটার জন্য উন্মুখ পূজারী বা দোকানদার , কাউকেই দেখি নি। এমনিতেই মধ্যপ্রদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের লোকজন সরলপ্রকৃতির হয়।

অটো যেখানে নামিয়ে দিল সেখান থেকে কিছুটা হেঁটে কপিলধারা।


কয়েকটা খাবার দোকান হাঁকাহাকি করছে। একটা দোকানে ঢুকেছি। আটখানা পুরী সমেত ছেলের দাম মাত্র পঞ্চাশ টাকা। দোকানে তখন কোন খদ্দের নেই।

বন্ধু গৌতম খাবারের কোয়ালিটি নিয়ে সন্দিহান। গৌতম চলে গেল কিচেনে। সব দেখেশুনে স্যাটিসফায়েড। তখনই কাঠের আগুনে উনান জ্বেলে, আটা মেখে পুরী তৈরী হল। খালি অমরকন্টক মেন শহর নয়, কাছাকাছি সব জায়গায় শ্রী রামচন্দ্রের বাঁদরবাহিনীর পরাক্রমে মানুষের তটস্থ অবস্থা। বাইরের টেবিলে বসি নি ইচ্ছে করে, যদিও বসলে চতুর্দিকের সুন্দর ভিউ উপভোগ করা যেত, তবুও বাঁদরের ভয়ে দোকানের ভিতরে বসেছি। তবে শেষরক্ষা হল না। হঠাৎ হুপ-হাপ আওয়াজ, কিছু বোঝার আগেই গৌতমের প্লেট থেকে দুটো পুরী হাওয়া। গুলতি নিয়ে একজন বাইরে পাহারা দিচ্ছে। ওর চোখ এড়িয়ে এই কান্ড। দূরে দেখলাম বাইকে লাগান কাপড়ের ব্যাগ দাঁত দিয়ে ছিড়ে ফর্দাফাই করছে খাবারের আশায়। দোকানের ছেলেটি, যে আমাদের ডেকে এনেছিল, বেশ হাসিখুশী, ওর একটু আপন আপন ভাবও আছে, “অতিথি দেবভবএই ভাবে বিশ্বাসী, খুব যত্ন করে খাওয়াল। নাম তার  দীনেশ কুমার যাদব।

লোকাল বেশীরভাগ লোকই যাদব সম্প্রদায়ের। এবারে মধ্যপ্রদেশে নির্বাচনে সবাই বিজেপিকে ভোট দিয়েছে, আগে দিত বিএসপিকে। গ্রামের মুখিয়ে যাকে বলবে, সব গ্রামবাসী নাকি তাকেই ভোট দেয়। বছরখানেক ধরে বিজেপি সরকারেরলাডলি বহিনযোজনাতে সব দরিদ্র মহিলা হাজার টাকা করে পেত, ভোটে জিতলে ওটা তিনহাজার টাকা হবে, এই আশায় বিজেপিকে ভোট দিয়েছে। ফেরার সময় দীনেশ আমাদের অটোর সওয়ারী। মুখটা দুখী দুখী। গাঁওতে ফিরে যাচ্ছে। দোকানের মালিক চুক্তিমত টাকা দেয় নি। তাই ঝগড়া করে মনের দুঃখ ভুলতে দেশী মদ খেয়েছে। ড্রাইভারি জানে। সেই কাজই করবে। ওকে যেখানে নামালাম সেখান থেকে বিশ কিমি হেঁটে ওর গ্রাম। যাবার সময় ওকে একশ টাকা দিলাম।   

কপিলধারায় নর্মদার উৎসস্থল থেকে কয়েক কিমি দূরে নর্মদার জল একশত ফিট নীচে ঝর্ণাধারায় পড়ছে। কথিত আছে কপিলমুনি এখানে তপস্যা করেছিলেন। রেলিং দেওয়া একটা জায়গা থেকে সুন্দর ভিউ প্রপাতের। ক্যামেরায় ফটো তুলে প্রিন্ট বার করে দিচ্ছে, মাত্র পঁচিশ টাকা। দুজনে মিলে ফটোর জন্য দাঁড়াতে ক্যামেরাসহ ফটোগ্রাফার উঠে পড়ল রেলিং এর উপর, কারণ ওখান থেকে ভাল ভিউ পাওয়া যায়, শরীর বেঁকিয়ে যখন সাটার টিপছে, আমার ভয় হল ওই উঁচু থেকে না পড়ে যায়। সেরকম অবশ্য কিছু হল না। কপিলধারা থেকে দুইশ ফিট নীচে দুধধারা। কিছুটা সিঁড়ি আর বাকীটা এবড়ো খেবড়ো বোল্ডারের মধ্যে দিয়ে পথ।সাবধানে এগোতে হচ্ছে। একটা লাঠি থাকলে সুবিধা হত।



আমার
পিছনে গৌতম। হঠাৎ এক মহিলার আর্তনাদ আর ধপাস করে পড়ার শব্দ। বয়স্ক মহিলা পা স্লিপ করে ফ্ল্যাট হয়ে পড়েছেন। গৌতমকে ধরে সামলানোর চেষ্টা করেছিলেন। গৌতম অতি কষ্টে সামলেছে। পড়লে আমিও নির্ঘাত পড়তাম। নর্মদা মাইয়ার অশেষ কৃপা বলে মনে হল। এই রাস্তায় অনেক পরিক্রমাযাত্রী। বেশ কিছু লোক স্নান করছেন নর্মদার জলধারায়। চারিদিকে মন্ত্রপাঠের আওয়াজ। বড় একটা গ্রুপ এসেছে মহারাষ্ট্র থেকে। সঙ্গে পুরোহিত একটা হ্যান্ড মাইক নিয়ে মন্ত্র পড়ছেন। অনিতদূরে সারি দিয়ে বসে ভক্তবৃন্দের দল।

সবার সামনে ছোট কাপড়ের উপর কমন্ডুল, ধূপদানি, ফুলমালা ছোট্ট একটা ঘন্টা। পন্ডিতজির মন্ত্রের সাথে সাথে এরা নর্মদা মাএর স্তোত্র পাঠ করছে। দেখে মনে হচ্ছিল যেন গ্রামের কোন পাঠশালা। খালি কিশোর ছাত্রদলের বদলে বয়স্ক লোকজন। তবে সবাই বেশ ভক্তিভরে পাঠ করছেন ঘন্টা নাড়ছেন প্রাণপনে। মাঝে মাঝে সমস্বরে রব উঠছে, “নর্মদা মাই কি জয় আমিও কন্ঠ মেলালাম ওদের সঙ্গে। পিছনের উঁচু ঢালানে তৎপর সুযোগসন্ধানী বাঁদরের দল। একটু অসতর্ক হলেই পাশে রাখা ঝোলের উপর আক্রমণ। এক পুণ্যার্থীর সঙ্গে আলাপ হল- নাম রমেশ তনুনি,

এসেছেন জিলা ঐরঙ্গাবাদ জেলার জালেশ্বর তহশীল থেকে, গ্রামের নাম অমরেশ্বর। ইনি পরিক্রমা শুরু করেছেন ওঙ্কারেশ্বর থেকে। এটা ছোট পরিক্রমা, পদব্রজে দুই তিন সপ্তাহে হয়ে যাবে। গ্রামে চাষবাস করেন। কাপাসতুলার ক্ষেত আছে। সেচ ব্যাবস্থা উন্নত নয়, তাই বরুণদেবই ভরসা। নর্মদা পরিক্রমার পুরো পথের দৈর্ঘ একহাজার কিমির উপর।অমরকণ্টক থেকে শুরু হয়ে গুজরাতের খাম্বাত উপসাগরে গিয়ে মিশেছে পুণ্যতোয়া নর্মদা। বয়ে গিয়েছে মধ্যপ্রদেশ, ছত্তীসগঢ়, মহারাষ্ট্র গুজরাতের উপর দিয়ে। এই যাত্রা শেষ হয়মাই কি বাগিয়াতে। এটা নর্মদা কুন্ড থেকে দুই কিলো মিটার উজানে। নর্মদার আসল উৎপত্তি মাই কি বাগিয়াতে, এর পরে অন্তঃসলিলা হয়ে নর্মদাকুন্ডে নর্মদা মাপ্রকটহয়েছেন। আমাদের পরের গন্তব্যস্থল হল মাই কি বাগিয়া। কপিলধারা থেকে যে রাস্তা দিয়ে আমরা হেঁটে অটোতে উঠব, তার ডানদিকে নর্মদা বয়ে যাচ্ছে আর বাঁমদিকে পাহাড়ী পায়েচলা পথ হল ট্রাডিশনাল পরিক্রমা যাত্রীর পায়ে চলার রাস্তা। সারি দিয়ে ভক্তরা হেঁটে চলেছে। বেশীরভাগেরই খালি পা। 

মাই কা বাগিয়া যাওয়ার রাস্তায় পড়ল জৈন মন্দির।


সামনে পাথরে কারুকার্যমন্ডিত বিশাল রসট্রাম। মূল মন্দির অনেকংশে তৈরী। রাজস্থান থেকে আগত পাথরের শিল্পীরা কাজ করছেন। তেইশ বছর ধরে কাজ চলছে। মন্দিরের ভিতরে অস্টধাতুর তীর্থঙ্কর আদিনাথের বিশাল মূর্তি। 


এর পরের গন্তব্য মাই কা বাগিয়া। রাস্তা থেকে কিছু সিঁড়ি নেমে কুন্ড। তার পাশে মায়ের প্রস্তরমূর্তির সামনে ভক্তদের পুজো দেওয়ার লাইন। এখানেও সেই বসে মন্ত্রপাঠ চলছে।


এই পর্যায়ে পরিক্রমা শেষ। নারকেল আর চূর্ণি চড়ান প্রথা। সেই নারকেল জড়ো হচ্ছে উপরে। এক গেরুয়াধারী সেগুলোকে নিয়ে চলেছেন কোথাও জমা দিতে।

দীর্ঘ পথের পরিসমাপ্তির পর পুণ্যসঞ্চয় করে ঘরে ফেরার তাড়া। 

পরের গন্তব্য হল শোনমুড়া। এটা শোন নদীর উৎপত্তিস্থল। সিঁড়ি বেয়ে রাস্তা নেমে গিয়েছে পাহাড়ের শেষপ্রান্তে। সেখান থেকে সামনে ভ্যালি দেখা যাচ্ছে। ভোরবেলা এখান থেকে সূর্যদোয় দেখা যায়। মাঝরাস্তায় কয়েকটি মন্দির। এখানেই শোন নদীর উৎপত্তিস্থল।

এর পরে গেলাম শ্রীযন্ত্র মন্দিরে।


এটা বছরের বেশীরভাগ সময় বন্ধ। মন্দিরের গেটে চার দেবতার মুখযুক্ত বিশাল অবয়ব। বেশ ইমপ্রেসিভ স্ট্রাকচার। ৩২ বছর ধরে এর নির্মানকার্য চলছে। পাশের উঁচু রাস্তা দিয়ে উঠলে ভিতরটা দেখা যায়। গোলাকৃতি মন্দির নির্মান রত অবস্থায়। শাস্ত্র অনুযায়ী শ্রীযন্ত্রের নির্মান করা যায় কেবলমাত্র গুরু পূষ্য নক্ষত্রের দিনগুলিতে, যা কেবলমাত্র বছরে পাঁচদিন পাওয়া যায়। উপর থেকে সুন্দর ফটো তোলা গেল।

তিনটে নাগাদ মৃত্যুঞ্জয় আশ্রমে ফিরে বিশ্রাম নিয়ে কল্যাণ আশ্রম (এর কথা আগেই লিখেছি) গেলাম। সেখান থেকে বেরিয়ে নর্মদার উপরে ব্রীজ ক্রশ করে উল্টোদিকের নির্জন রাস্তা ধরে এলাম নর্মদা কুন্ডে। ব্রীজের উপর থেকে নর্মদা নদীকে বেশ চওড়া লাগল। স্থির জলরাশি। লক্ষ করলাম অনতিদূরে বাঁধ দেওয়া আছে। জল যখন বেশী হয় বাঁধের উচ্চতাকে ডিঙিয়ে প্রবাহিত হয়। সেইজন্য কিছুটা অংশে নদী চওড়া। যেদিকে আমাদের আশ্রম কুন্ড, দিকে বাঁধানো ঘাট স্নানের জন্য, নাম রামঘাট। এই ঘাটের সামনে আমাদের মৃত্যুঞ্জয় আশ্রম। হাতে অঢেল সময়। রাস্তার পাশে ছোট ছোট দোকান। পাথরের নানা সাইজের শিবলিঙ্গ।


এখানে শিবের মন্দিরই বেশী, কারণ নর্মদা শিবঠাকুরের মেয়ে। শৈব পীঠ, তাই গাঁজার কল্কেও দেদার বিক্রি হচ্ছে। বাণলিঙ্গ বলে একরকম ইলিপটিক্যাল পাথর বিক্রি হচ্ছে। অনেকে একেই শিবলিঙ্গ জ্ঞানে পূজা করেন। উত্তর ভারতের একটি প্রচলিত প্রবাদ হল "নর্মদা কে কঙ্কর সে উঠা শঙ্কর" বৈষ্ণবদের কাছে যেমন শালগ্রামশিলা, শৈবদের কাছে তেমন বাণলিঙ্গ।

ঘুরতে ঘুরতে আবার সেই রিন্টুর তেলেভাজার দোকান দেখে লোভ সামলানো গেল না। আজকের স্পেশাল ভেজিটেবল চপ। রিন্টু দোকান খোলে বিকালে। সকালটা যায় মেটেরিয়াল প্রিপারেশনে। আজকের স্পেশাল ভেজিটেবল চপ। গরম ভেজিটেবল চপে কামড় দিয়ে জিজ্ঞাসা করি-“ রিন্টু কলকাতায় যাও না?” রিন্টু বল্ল -গিয়েছি বার দুয়েক, ওই ভীড়, চ্যাঁচামেচি, ধুলো বালি সহ্য হয়। মনে হয় কবে এই স্বর্গে আবার ফিরব, নর্মদা মায়ের কোলে এসে শান্তি পাব।রিন্টুর কলকাতায় কোটি টাকা দামের বাড়ী আছে, এখানে আসার আগে দশ বছর চুটিয়ে এসি ইনস্টলেশনের বিজনেস করেছে। একেই বলে স্থানমাহাত্ব্য। রিন্টু বলে - এত সুন্দর পাহাড়ী জায়গা, সাধু সমাগমে পুণ্যভূমি, কত টুরিস্টের সঙ্গে আলাপ হয়, এরকম জায়গা ছেড়ে কোথায় যাব।

সকাল বিকাল দুই বেলাই আশ্রমের অন্নসত্রের সামনে চায়ের পাত্র রাখা থাকে। সকালে চা খেতে খেতে দেখি তিন তীর্থযাত্রী আশ্রমের গেটের কাছে দাঁড়িয়ে। দুইজন পুরুষ, বয়স ষাটের কোঠায় হবে, সঙ্গে এক মহিলা। সাধুদের মত চেহারা।


আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন নর্মদা মায়ের অফিস কোথায় জানি না কি। এরা এসেছেন ইস্টার্ন উত্তর প্রদেশ থেকে। গঙ্গোত্রী থেকে কন্যাকুমারী পরিক্রমা হয়ে গিয়েছে। যাত্রা শুরুর আগে পরিচয়পত্র বানাতে হবে। এই পরিক্রমা শেষ হলে অযোধ্যা যাওয়ার ইচ্ছে। কথায় আছে -“বহতা নদী রমতা সাধু এরা অবশ্য গৃহী সাধু। ভগবান রাম এদের আরাধ্য দেবতা। শ্লোক শোনালেন, “যাহা পর কৃপা রাম জী কে হোই তা পর কৃপা করে সবকোই

চা খেয়ে দুই মক্কেল চল্লাম সামনের রামঘাটে। সকাল সকাল চারিদিক গমগম করছে। ঘাটের পাশে মাঠের মধ্যে, বেশ কিছু বাস, গাড়ী দাঁড়িয়ে।



তীর্থযাত্রীরা কোথাও জটলা করে দাঁড়িয়ে, ঘাটে অনেকে স্নান করছেন, ঘাটের পাশেই নর্মদা মায়ের মূর্তি রেখে মহিলাদের পূজা চলছ,

বাসের পিছন থেকে রান্নার সরঞ্জাম বার করে সকালের নাস্তার প্রস্তুতি চলেছে। এক তীর্থযাত্রীর সঙ্গে আলাপ করলাম। নাম হল মদন সিং প্যাটেল, জাতে রাজপুত - গাঁও নরসিংপুর উমারিয়া জিলা জব্বলপুর। বাসে করে গ্রুপে এসেছেন।

২২ দিনের সফরে খরচা ১২,০০০/- গ্রামে বাসা থাকলেও, পরিবার সমেত ইন্দোরে থাকেন, পেশায় মজদুর। সঙ্গে একটা ছোট ডায়রী। নিজের মোবাইল নেই। ছেলে-মেয়ের নম্বর লেখা। কথা বলার ইচ্ছে হলে অন্য কাউর ফোন চেয়ে নেন।

নর্মদা মন্দিরের খুব পাশেই হোটেল সর্বোদয়। সকালে পাশের মাড়োয়ারী হোটেলে ব্রেকফাস্ট সেরে ওখানে রুমরেন্ট জানতে রিসেপশনে দাঁড়িয়ে আছি। বাঁদর অধ্যূষিত জায়গায় বাঁদুরে টুপি পরে এক ভদ্রলোক বেরিয়েছেন। চেহারায়তেও বাঙ্গালী বলে বোঝা যায়। আলাপ হল। কথায় কথায় জানা গেল আমরা একই বয়সী, রেলের ডাক্তার ছিলেন, শেয়ালদার কাছে রেলের হাসপাতালে চব্বিশ বছর চাকরী করেছেন। রিটায়ার করলেও এখনও কনসালটেন্ট হিসাবে চাকুরীরত। নাম হল স্নেহাংশু শেখর প্রামানিক।


গাড়ী নিয়ে কলকাতা থেকে বেরিয়েছেন, অমরকন্টক হয়ে পান্না টাইগার রিজার্ভে যাবেন। কলেজ ছিল কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ। আমার স্কুলের এক ব্যাচ সিনিয়ার অসিত মন্ডলকে ভালই চেনেন। তখন খেয়াল ছিল না, পরে নর্মদা কুন্ডের কাছে আবার দেখা হতে, আমাদের ক্লাসের ফার্স্ট বয় কৃপাসিন্ধু দে- কথা জিজ্ঞাসা করলাম। কলকাতা মেডিক্যালে পড়ত। ভাল করেই চেনেন জানালেন। ফোন নম্বর এক্সচেঞ্জ করে নিলাম। উনি থাকেন বাইপাসে রুবী হসপিটালের কাছে। যাওয়ার আগে অনুরোধ করলেন কলকাতায় গেলে যেন অবশ্যই যোগাযোগ করি। মন্দির থেকে বেরিয়ে দেখি এক জায়গায় হালুয়া প্রসাদ বিতরণ হচ্ছে। খাঁটি ঘি দিয়ে পেস্তা, কাজু দিয়ে গুড়ের অতি সুস্বাদু প্রসাদ। শান্ত মুখশ্রীর একটি মেয়ে তার বাবা প্রসাদ বানিয়ে জব্বলপুর থেকে এসেছেন।

তীর্থস্থানে এরকম চল আছে, এতে পুণ্য সঞ্চয় হয়। 

মন্দির চত্বর থেকে বেরিয়ে আবার রিন্টুর সঙ্গে দেখা। হাতে ব্যাগ।


বাজার করে ফিরছে, চপ বানানোর সরঞ্জাম অন্যান্য আনুষঙ্গিক। রিন্টু জমি কিনে বাড়ীও বানিয়েছে। মন্দিরের বাইরে চায়ের দোকানে বসলাম। সামনে প্রাচীন মন্দির কমপ্লেক্স। সামনের পাতালেশ্বর মন্দির দেখিয়ে রিন্টু শোনাল শিব তার কন্যা নর্মদার কথা।

প্রতি বছর শাঁওন মাসে কোন এক সময় নর্মদা আসেন তার পিতা শিবের সঙ্গে দেখা করতে। নদীর জল এসে যায় পাতালেশ্বর শিবের গর্ভগৃহে, কারণ হল গর্ভগৃহ মাটির থেকে পাঁচ ফিট নীচে। ওই সময় ভক্তদের ভীড় বাড়ে।

ফিরে এলাম আশ্রমে। আজকে আমরা অমরকন্টক ছেড়ে যাব মাইহারে, এটা একটি সতীপিঠ। ভারতবর্ষের কৃষ্টি-সংস্কৃতি সভ্যতায় নদীর অবদান অতুলনীয়। স্তন্যদায়ী মাতার যে অবদান শিশুর কাছে, বর্ষা বরফ গলা জলে পুষ্ট বহমান নদীর ফেনিল জলরাশি ভারতের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী যারা কৃষিকাজে নিয়োজিত, তাদের কাছে নদী মাতৃসমা। তাই তো দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসে এই নদী বন্দনায়। এই উপলব্ধি নিয়ে অমরকন্টক থেকে বিদায়ের পালা। 

দেবদত্ত 

১৯/১২/২৩

Comments

  1. খুব সুন্দর লেখা। ভার্চুয়াল ভ্রমণ হয়ে গেল।

    ReplyDelete
  2. তুমি অপূর্ব ঘুরে অপূর্ব লিখে ধন্য আমরা পড়ে ধন্য

    ReplyDelete
  3. This comment has been removed by the author.

    ReplyDelete
  4. Excellent description..... reminds me about our Amarkantak visit last in the year 1993

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

ত্রিবেনী তীর্থপথে ও আরো টিটবিট

রবিঠাকুর ও কিছু হাসি মশকরা

A walk to explore Delhi’s lesser known monuments