এ্যলামনিতে শুভবিজয়া
এ্যলামনিতে শুভবিজয়া
এল্যামনি এসোশিয়েশনর বিজয়া সম্মিলনী। দিল্লির বাতাসে পলিউশনের থাবা। কয়েকদিন ধরেই মিস্টিক-মিস্টিক ওয়েদার। রবি ঠাকুর ঠিকই ফোরকাস্ট করে গিয়েছিলেন “যাহারা তোমার বিষাইছে বায়ু, নিভাইছে তব আলো”, একদম তাই চলছে এখন - বিষবায়ুর সাথে সূর্যের আলোও নিভুনিভু, দিনে সূয্যি মামুর দেখা নেই,
রাতে স্ট্রিটলাইটগুলোকে দেখলে মনে হয় লন্ডনের কুয়াশাস্নাত মায়াবী রাত। তবে এই মোহিনীরূপে ভুললে চলবে না, পিএম২.৫ নামক এক খতরনাক জিনিষ ৪০০ লেভেলের উপর ঘোরাঘুরি করে পাবলিককে বাধ্য করছে বাড়ীতে এয়ার পিউরিফায়ার চালিয়ে বসে থাকতে। মেয়ের কল্যাণে একপিস আমার বাড়ীতেও আছে। চালালে পরে লালবাতি জ্বলে, মানে ভীষণ পলিউশন, বেশ কিছু পরে হলদে আরো অনেক পরে গ্রীন আলো জ্বলে। বাড়ীর বাইরে ট্র্যাফিক সিগন্যালে এরকম লাইট দেখে অভ্যস্ত, আজকাল ঘরের মধ্যে এই সিগন্যাল বেশ উপভোগ করছি। টাইম মন্দ কাটছে না, কখন লাল থেকে হলুদ হয়ে সবুজ হল এই অপেক্ষায় থাকি।
তফাৎটা বাইরের সিগন্যালে গাড়ী স্টার্ট করে “আগে বাড়ো”, এখানে পিউরিফায়ারের সুইচ বন্ধ করি। এসির জন্য বেডরুমের দরজা সামারে বন্ধ থাকত, এখন নভেম্বর মাসেও বন্ধ পিউরিফায়ারের বদান্যতায়। যাই হোক এই পলিউশনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে টিটোয়েন্টি ওয়ার্লডকাপ। এই যুগলবন্দীর, একটির বিকর্ষণ ও অন্যটির আকর্ষণ পরিত্যাগ করে বেরোনো কষ্টকর। আমি অবশ্য ক্রিকেটের ভক্ত নই, ফাংশানে এসেই লো এটেনডেন্সের কারণস্বরূপ ইন্ডিয়ার ক্রিকেট ম্যাচ আছে, সেটা জানলাম। ক্রিকেট নাকি ভদ্রলোকের গেম, আমার অবশ্য তা মনে হয় না, মাঠে একজনকে আউট করতে ১১জন খেলছে, রাফ এ্যন্ড টাফ ফুটবলই বেশী পছন্দ। আজকালকার প্রজন্ম ক্রিকেটের বেশী ভক্ত এরকমটাই ভাবছিলাম, শ্রাবনীর ছেলে ফাইভে পড়ে, স্টেজের পাশে ফাংশন চলাকালীন ক্রিকেট বল নিয়ে খেলছিল, তবে আমার প্রশ্ন শুনে সে বল্ল-ফুটবলই তার পছন্দ।
আজকাল কোথাও যেতে মেট্রোটাই আমার সুবিধা মনে হয়। সিআর পার্কের বিপিন পাল অডিটোরিয়ামের
কাছেই জিকে মেট্রো স্টেশন। দুপুর বেলা ক্লাসমেট বিজনের ফোন এল। বল্ল -“আমি গাড়ী নিয়ে যাব, তুই চল আমার সাথে, তবে শর্ত হল তুই গাড়ী চালাবি”। বিজন বছর দুয়েক এনসিআরে এসেছে, এখনও দিল্লির রাস্তায় সড়গড় হতে পারে নি। তাই সই, গাড়ী চালাতে আমি চিরকালই ভালবাসি। গাড়ী আসার পর দেখলাম ড্রাইভারও আছে। বুঝলাম না এটা আমার গাড়ী চালানোর উপর ভরসা না করতে পেরে, না ইন্দিরাপুরম থেকে নয়ডা-৬২ সেক্টর, চারকিমি রাস্তায় নিজের ড্রাইভিংএ আস্থা না রাখতে পেরে। প্রথমটাই সম্ভব, কারণ আমার পাস্ট হিস্ট্রি বলছে দিল্লিতে প্রথম দশ বছর বিনা লাইসেন্সে গাড়ী চালিয়েছি, রেড লাইট জাম্প করতাম, বেশ থ্রিলিং লাগত। নয়ডাতে ট্র্যাফিক পুলিশ বরাবরই ঢিলেঢোলা। তবে, টাচ উড কোনদিন টিকিট কাটে নি, মানে ফাইন দিতে হয় নি। আজকাল ক্যামেরা বসার পর স্পীড লিমিট রেখে চালাই, শুনেছি অনেকেই কেস খেয়েছে লিমিট ক্রস করার জন্য। আমারও একবার মোবাইলে ১০০/- ফাইন এল রং পার্কিংএর জন্য। ট্র্যাফিক ডিপার্টমেন্টের ওয়েবসাইটে দেখাল আমি জগৎপুরীতে এই কান্ড ঘটিয়েছি। যে ডেট বলছে সেটা দুইমাস আগের। চল্লিশ বছর দিল্লিবাসে ওই তল্লাটে কখনও যাই নি। শুনেছি ওখানে প্লাম্বিং, স্যানিটারি ও্যয়ার পাওয়া যায়। চালানের পেজে বলছে “ভাল মানুষের মত চুপচাপ ফাইন দিন, নইলে কনটেস্ট করুন, পরে কোর্টে বিচার হবে।” একশটাকা কিছু নয়, ওই মাথার পোকাটা কিলবিল করে উঠল “সদা সত্য কথা বলিব”। বেশ কিছুদিন কেটে গিয়েছে। পরিবার সমেত জয়পুরে জয়গড় ফোর্ট দেখতে যাচ্ছি। বেশ ময়ূর-টয়ূর দেখে এগোচ্ছি। মূর্তিমান রসভঙ্গের মত ময়ূরের কর্কশ ডাকের মত মোবাইল বেজে উঠল। দিল্লি পুলিশের থেকে ফোন, বল্ল-আরে সাব আপ কাঁহা হ্যায়, আপকো সমন দেনা হ্যাঁয়, ঘর সে ঘুমকে আ গিয়া, এ্যড্রেস দিজিয়ে, ডাক মে ভেজেঙ্গে। পিলে-টিলে চমকে গেল, এ সব টার্ম তো চোর ডাকুদের জন্য, আমি ছা-পোষা লোক, আমাকে কেন টানাটানি। কয়েকদিন পর শমন পেলাম, কারকারডুমা কোর্টে ছয় নম্বর ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে অমুক দিনে, তমুক সময়ে পেশী হতে হবে, ট্রাফিক আইনভঙ্গের দায়ে। প্রস্তুত হচ্ছি নূতন এক অভিজ্ঞতার জন্য। আরেকবার ওয়েবসাইট খুলে নিজের অপরাধের ফিরিস্তি খুলে বসলাম, এবারে সিসিটিভি ক্যামেরার ছবিসহ, প্রায় বামাল সমেত চোর ধরার মত। ইউরেকা-আনন্দে নেচে উঠলাম এতো আমার গাড়ীর নম্বর নয়, আমার নম্বর ২৫৩৩, এটা ২৪৩৩। নির্ঘাত টাইপো এরার। তবে কোর্টে বিনাদোষে কোর্টমার্শাল হওয়া কোন ব্যাপার নয়। আমার বন্ধুবর ও ক্লাসমেট অতীশ বলছিল, ও পাম্পে যাচ্ছিল পলিউশন চেক করাতে। পুলিশ ধরছে ঢোকার মুখে। ওর সার্টিফিকেট দুদিন আগে এক্সপায়ার করেছিল। “হাম সার্টিফিকেট করানে কে লিয়ে আয়ে হ্যায়, এসব বলে লাভ হয় নি। পুলিশ আরসি নিয়ে চালান কেটে বলেছে কোর্টে জমা করতে। অতীশ কলেজলাইফ থেকে অতীশ দীপঙ্করের মত জ্ঞান বিতরণে অভ্যস্ত। এখনও সেই অভ্যাস যায় নি। ম্যাজিস্ট্রেটকে বোঝাতে গিয়েছিল ঠিক কি ঘটছিল। সেনটেন্স শুরু করতেই ‘স্যেনটেন্স’ বেড়ে গেল মানে হাজার টাকা দুই হাজার হয়ে গেল! অতীশ ‘টেন্স’ হয়ে আরো কিছু বলতে গেলে, পাশ থেকে একজন বল্ল “দাদা চুপ হো যাও, নেহি তো তিনহাজার হো যায়গা ফাইন!” অতীশ রণেভঙ্গ দিয়ে সে যাত্রায় দুইহাজার ফাইন দিয়ে এসেছে। আমি আবার এত বছর দিল্লি থেকেও হিন্দিতে লবডঙ্কা। ছবির প্রিন্ট আউট বার করলাম। বেশী কিছু না বলে সোজা ছবিটাই দেখাব, একেবারে খাপখোলা তলোয়ার! মসির চেয়ে অসি বড়! যাই হোক আলটিমেটলি ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে এনকাউন্টার হয় নি। ফ্লপ শো এর মত একটা মেল করে দিয়েছিলাম, খোদ ট্রাফিক পুলিশের হেডকে। এরপর আর কোথাও থেকে ফলোআপ আসে নি।
যাই হোক সোফার ড্রিভেন গাড়ীতে “সো-ফার” এ্যলামনির প্রোগ্রামে যাওয়ার সৌভাগ্য হয় নি। অফিসে সেল্ফ ড্রাইভ করেই যেতাম। ইডি লেভেল থেকে ড্রাইভার সহ গাড়ী পাওয়া যায়। বেশ লোভনীয় পোস্ট। এখন ইডি শুনলে ভয় লাগে, এরা নাকি চারিদিকে ‘রেড’ করে বেড়ান! আমাদের অফিসের একটা মজার ঘটনায় আসি। ইডি থেকেই মনে পড়ল। ডিজাইন অফিসে ম্যানেজার পোস্টের গালভরা নাম ছিল ডিসিডিই। আমাদের শংকরদা সদ্য ম্যানেজার হয়েছেন। এক ভেন্ডারকে কিছু বোঝাতে বোঝাতে বলেছেন - হাম ডিসিডিই বোল রহা হ্যায়”! অপর প্রান্ত থেকে ব্যাজার মুখে বল্ল সাব “হাম ইয়ে সব এবিসিডি জানতে হ্যায়, আসলি চিজ বাতাইয়ে!” শংকরদা উত্তেজিত গলায় বলছেন “হাম বোলতা হ্যায় কি হাম ডেপুটি চিফ ডিজাইন ইঞ্জিনিয়ার হ্যায়!” এর উপরের পোস্ট হল সিডিই অর্থ্যাৎ চিফ ডিজাইন ইঞ্জিনিয়ার।
যাক ধান ভানতে অনেক শিবের গীত হল। উপক্রমনিকা দীর্ঘতর হলে পাঠকের ধৈর্যচ্যুতির সমূহ সম্ভাবনা। পাঁচটা থেকে চা ও টা সহযোগে খেজুরে গল্প এবং বিজয়ার কুশল বিনিময়।
গাড়ী থেকে নেমে দেখি ওপেন এয়ারে টি-পার্টির এ্যরেঞ্জমেন্ট। কল্লোলদা
এবছরের প্রেসিডেন্ট। গুরুদায়িত্ব। আমি কপালগুনে ভাইস প্রেসিডেন্ট। তাও ওয়ানথার্ড। সুপ্রিম কোর্টে যেমন চিফ জাস্টিসের তলায় অনেক জাজ, তেমনি এ্যলামনিতে তিনজন ভাইস প্রেসিডেন্ট। অধিক সন্ন্যাসীতে গাজন নষ্ট, তেমনি তিন ভাইস প্রেসিডেন্ট মানে ‘তা ধিন তিন না’! নিজের ‘ভাইস’ আছে কিনা জানি না, তবে ‘এ্যডভাইস’ দিতে কার্পণ্য করি না! কল্লোলদার দৌড়োদৌড়ি দেখে, খুব ব্যস্ত-সমস্ত ভাব দেখিয়ে বল্লাম, “কিরকম একটা গিল্টি ফিলিং হচ্ছে কি কাজ করব বলুন”, যদিও ভাল করে জানি কাজটা কথা না বলে এগিয়ে গিয়ে কাজ করতে হয়। এটাই বোধহয় আমার “ভাইস”! দীপকদা র সঙ্গে দেখা। ৮৩-৯২, সি আর পার্কে আমার ভাড়াবাড়ীর কাছেই দীপকদা থাকতেন, চিরকাল এ্যলামনির নীরব কর্মী, শান্ত স্বভাবে একটু লাজুক। দীপকদাকে বেশ কিছুদিন পরে দেখলাম। বল্লাম-“আপনার মুখে বয়েসের ছাপ নেই, পঁচাত্তর পার করেছেন কি? দীপকদা লাজুক মুখে জানালেন ৮৫ পার হয়ে গিয়েছে! উনার মেয়ে তখন থ্রি-ফোরে পড়ত, এ্যলমনির ফাংশানে ওই বয়সীদের দিয়ে নৃত্যনাটিকা বা গণসঙ্গীত গাওয়ানো হত। এখন সে সাউথ আফ্রিকায় থাকে। দীপকদার যাওয়ার কথা সাউথ আফ্রিকা। বল্লাম ওর উপরেই নামিবিয়া। চিতা সব ওখান থেকেই কুনোতে এসেছিল, বেশীরভাগই কুপোকাৎ হয়ে চিতেয় উঠেছে। আপনি পারলে নামিবিয়া গিয়ে চিতা দেখে আসুন।
দীপকদার কাছে খবর পাওয়া গেল রিসেপশনে শ্রাবনী কুপন নিয়ে বসে আছে। ওটা আগে হস্তগত করতে হবে, কারণ ওটাই হল দক্ষিণহস্তের চাবিকাঠি! রিসেপশন আলো করে বসে আছে শ্রাবনী। একাই সামলাচ্ছে পুরো কাউন্টার। মুখে সবসময় মিষ্টি হাসি। বল্লাম “তোমার হাসিমুখের ফটো না নিলেই নয়।
শ্রাবনীকে সবসময় শাড়ীতেই দেখি। আজকে যে শাড়ীটা পড়েছে, সেটা যুগপত এলিগ্যান্ট ও গর্জাস। আজকাল দিল্লিহাটে গিয়ে গিন্নির সঙ্গে থেকে শাড়ী সম্বন্ধে কিঞ্চিত জ্ঞানলাভ হয়েছে। তানা-বানাতে সিল্ক কটন মিক্স না সিল্ক-পলিয়েস্টার ব্লেন্ড এসব জানছি। মেশিন স্টিচ, হ্যান্ডস্টিচ এর ডিফারেন্স অল্প কিছু বুঝি। স্বল্পসব্ধ জ্ঞানে শ্রাবনীকে বল্লাম “এটা নিশ্চয়ই পুজোর শাড়ী, খুব সুন্দর লাগছে শাড়ীটাতে। শ্রাবনী বল্ল-“হ্যাঁ, দাদা, পুজোতে একটাই শাড়ী কিনেছি। থ্যাঙ্ক ইউ”। আমি বল্লাম সব মহিলারা নিশ্চয়ই তোমার শাড়ীর প্রশংসা করেছে, কোন দাদারা কি বলেছে?” শ্রাবনী বল্ল “না, এই আপনি বল্লেন, ছেলেরা বল্লে আরো ভালো লাগে!” সত্যিই তো সেটাই হওয়া উচিত।
নারকেল নাড়ু, রসগোল্লা, সিঙ্গাড়া সহযোগে বৈকালিক চা-পানের আড্ডা চলছে। প্রদীপদা বসন্তকুঞ্জ থেকে এসেছেন। এ্যলামনিতে খুব রেগুলার। সরকারী চাকুরী থেকে অবসরপ্রাপ্তদের উপর খুব রাগ। তাদের মাস গেলে নিশ্চিন্ত পেনশন। আধাসরকারি পিএসইউতে চাকরি করার সময় ফরেন ট্যুর, ভাল মাইনে (সেই সময়ে অন্য চাকরির তুলনায়) বেশ রস ছিল, রিটায়ারমেন্টের পর খালি কস, কারণ পেনসেন না থাকায় টেনসেন! বড় মেয়ে কাছাকাছি থাকে। কিন্তু প্রদীপদা অজ্ঞাতকারণে ইনডিপেনডেন্ট থাকেন, মেয়ে শোফারড্রিভেন গাড়ী পাঠিয়ে জন্মদিন বা কোন অনুষ্ঠানে ডাকাডাকি করে, তবে প্রদীপদা এসবে যান না। বৌদিকে বল্লাম -“মেয়ে আদর করে ডাকছে, প্রদীপদাকে এখনও সিধে করতে পারলেন না!” বৌদি বল্লেন “ও আর সিধে হবার নয়, এখন তো মেয়ে ডাকাডাকি বন্ধ করে দিয়েছে!”
ঋত্বিক এসেছে, এ্যলামনির ডিপেন্ডেবল হ্যান্ড। আগে সেক্রেটারি পদও অলংকৃত করেছে। আজকের ফাংশনের কনভেনার। কল্লোলদা আর ঋত্বিক মিলে সমোসা সামলাচ্ছে। ঋত্বিকের মাথা চকচকে।
অপসৃয়মান কেশরাজিকে কেস খাইয়ে বিদায় করেছে। আমিও একটু টিপস নিয়ে নিলাম। আমার মাথার মধ্যপ্রদেশে চুল বাড়ন্ত। চুলচেরা বিচার করছি ঋত্বিকের পদাঙ্ক অনুসরন করব কিনা। ফাংশন চলাকালীন দেখলাম ঋত্বিক মাঝে মাঝে এসে অর্ধাঙ্গিনীর পাশে বসছে, তবে দুজনের মাঝে দুটো সিটের তফাত!
“এই কুলে আমি আর ঐ কুলে তুমি”- মাঝখানে নদীর বদলে দুটো সিটের দূরত্ব। অনুষ্ঠান শেষে এই গূড়তত্বের রহস্যভেদে নিজের অভিজ্ঞতা ঋত্বিকের সাথে শেয়ার করলাম। বল্লাম বিয়ের বিশ-পঁচিশ বছর পর মাখো মাখো প্রেম, “পুরানো চাল ভাতে বাড়ে” প্রবাদবাক্য মেনে চলে না, অল্প দূরত্বে ঠোকাঠুকির চান্স কম। ইয়াং জেনারেশন অবশ্য এটাকে পরস্পরকে “স্পেস দেওয়া” বলে।
একজন মিঃ সিনহার সঙ্গে আলাপ হল। নয়ডাতে থাকেন সেক্টর পঞ্চাশে। ন্যাশনাল ফার্টিলাইজারে পাঞ্জাব, হরিয়ানা তে চাকুরীজীবন কাটিয়েছেন। পাশে একজন ম্যাডাম সিনহা। উনি বল্লেন সেকটর১৩৭শে থাকেন। ‘দুইয়ে দুইয়ে চার’ মেলাতে পারছি না দেখে সিনহাবাবু ক্ল্যরিফাই করলেন উনার বেটারহাফ একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছেন। এটাই “এই কুলে আমি, ওই কুলে তুমি” কেস পর্যায়ে ফেলা গেল।
সিনহা ম্যাডামের সঙ্গে ভাব জমালাম। আগে দেখি নি। উনি আগে সিআর পার্কে থাকতেন, চাকরীসূত্রে দিল্লি আসা, এখন নয়ডাতে থাকেন। ভোডাফোনে চাকরী শুনে অভিযোগ জানাতে যাচ্ছিলাম, আমার ভোডাফোনের নেটওয়ার্ক কোথাও কোথাও বেশ উইক পাচ্ছি, কল ড্রপও হচ্ছে। পামেলা ম্যাডাম (ততক্ষণে নাম জানা হয়ে গিয়েছে) জানালেন উনি এখন এক আমেরিকান কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত। ঝামেলাটা হল ওদের টাইম অনুযায়ী, মানে রাত জেগে কাজ করতে হয়। জিজ্ঞাসা করলাম -“আপনি কি আইটি লাইনের। পামেলা ম্যাডাম ঘনঘন মাথা নেড়ে জানালেন উনি যাদবপুর থেকে কমপারেটিভ লিটারেচার পাশ করেছেন ৮৮ সালে,
তবে আইটি না হলেও তাদের ‘হ্যান্ডলার’। হ্যান্ডলারটা ইদানীং ওটিটি প্ল্যাটফর্ম থেকে শিখেছি। থ্রিলার সিরিজগুলোতে যে সব এজেন্ট বিদেশে ‘র’ এর হয়ে কাজ করতে যায় তাদের যে কন্ট্রোল করে সে হল হ্যান্ডলার। পামেলা দিদিমনি হলেন একজন “আইটি প্রফেশনাল” রিক্রুটমেন্ট এজেন্ট। বল্লেন - ‘ব্যাপারটা খুব ইনটারেস্টিং। আগে কোন ধারণাই ছিল যে রিক্রুটমেন্ট একটা মাল্টি বিলিয়ন ডলার বিজনেস হতে পারে।’ আমারও এব্যাপারে ধারণা নেই। ম্যাডাম বোঝালেন -“ধরুন আমেরিকাতে কোন ‘এ’ নামক কোম্পানির একজন জাভাতে দক্ষ লোক চাই। এবারে পামেলা ম্যাম তার এজেন্টদের মাধ্যমে কোন টেকিকে জিরো ইন করবেন। এবার পামেলা ম্যামের আমেরিকান কোম্পানি (ধরা যাক ‘বি’) তার জন্য এইচওয়ানবি ভিসা বানাবে এবং অবশ্যই তারজন্য ক্যান্ডিডেটের কাছ থেকে টাকা নেবে, কারণ আমেরিকা সবার কাছে ড্রিম ডেস্টিনেশন। এবারে ছেলেটি বা মেয়েটি আমেরিকাতে পৌঁছালে ‘বি’ কোম্পানি তাকে ঘন্টা বেসিসে ‘এ’ কোম্পানিকে হায়ার করতে দেবে। ধরা যাক ‘এ’ কোম্পানি ‘বি’ কে ১০০ ডলার পার ঘন্টা হিসাবে দিচ্ছে। এবার ‘বি’ তার হায়ার করা ছেলেটিকে ধরা যাক ৩০ ডলার দিল, নিজে রাখল ৪০ ডলার, পামেলা ম্যাডাম কিছু পেলেন…. এরকম ভাবে লম্বা চেন। বল্লাম এ তো পুরো ভারতীয় শব্জি মার্কেটের ফান্ডা- খেতের দুই টাকার টমেটো সেখান থেকে ফড়েরা নিয়ে আসে লোকাল মান্ডিতে, সেখান থেকে আড়তদার ট্রাকে করে মাল পাঠায় শহরে, শহরের মন্ডি থেকে ডিস্ট্রিবিউট হয় লোকাল শব্জীবিক্রেতার কাছে। আমরা ২টাকার জিনিশ ত্রিশ টাকায় কিনি। ভারতের সঙ্গে আমেরিকার তফাত হল আমরা যে বিজনেস মডেল ভেজিটেবলে ফলো করি, সেটা ওরা ম্যানপাওয়ারে করে। থিঙ্ক বিগ, আর্ন বিগ! আর মজার ব্যাপার হল কমিশনটা ওয়ানটাইম নয়, যতদিন ছেলেটি কাজ করবে ততদিন পামেলা ম্যাডামের কমিশন এনশিওরড। জিজ্ঞাসা করলাম- তা, আপনার কমপারেটিভ লিটারেচারের স্কিল কোন কাজে লাগছে? পামেলা বল্লেন -ঐ যে, কম্পারেটিভ স্টাডি করতে হয়, বায়োডাটাতে কতটা জল মেশানো। ভারতীয়রা এই ব্যাপারে দক্ষ। লিঙ্কডিনের সঙ্গে বায়োডাটা কমপেয়ার করি।
কমপারেটিভ লিটারেচরে নবনীতা দেবসেন পড়াতেন। তাঁর লেখার আমি খুব ভক্ত। ক্যান্স্যার হওয়ার পর পামেলা ওঁর সঙ্গে দেখা করত গিয়েছিলেন। হিন্দুস্তান পার্কে ওনার বাড়ীটার নাম ‘ভাল-বাসা’।
ওটা আমিও দেখেছি। আজকাল নাকি ঐ অঞ্চলে অনেক বাড়ীর মত ওটাতেও কাফে খুলেছে। উনার বাড়ীর কয়েকটা বাড়ী পরে কবি যতীন্দ্র নাথ বাগচীর বাড়ীটাতে টিনটিন থিম দিয়ে
একটা রেস্টুরেন্টে আমি একবার খেয়েছি। পামেলা ম্যামের ডিপার্টমেন্ট নিয়ে কথা হল। যাদবপুরে কমপারেটিভ লিটারেচার ডিপার্টমেন্ট তৈরী করেছিলেন বুদ্ধদেব বসু। খ্যাতনামা লেখক। যদিও পরে তার সুযোগ্য সহধর্মিনী সুলেখিকা প্রতিভা বসু কমার্শিয়ালি তাকে ছাপিয়ে যান।
বুদ্ধদেব ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে বাংলা সাহিত্যে রেকর্ড নম্বর নিয় পাশ করেছিলেন। প্রতিভা বসুর প্রথম জীবনে নাম ছিল রাণু সোম। সুগায়িকা ছিলেন।এইচএমভি তার গানের রেকর্ডও করেছিল। তাদের ছেলে শুদ্ধশীল বসুও পামেলাদের পড়িয়েছেন। অগাধ পান্ডিত্ব্য। তবে নেশার দাস ছিলেন। অপরিণত বয়সে মারা যান।
গল্পের সময় শেষ। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে হাজিরার ডাক পড়েছে।
মিহির বসু ও তার ওয়াইফ গাইবে। দিল্লির বাংলা গানের অনুষ্ঠানের পরিচিত মুখ। পাঁচমেশালী গানের অনুষ্ঠান। এধরনের অনুষ্ঠানে ফোক, বাউল টাইপের গানে আসর জমে।ওরা সেটাই করলেন।
আমির খসরুর “ পাজি প্রেম কি ম্যায় তো… বলে গজল (?) গাইলেন। প্রেম কি করে পাজি হয় কে জানে! আজকাল পার্টিসিপেটিভ ম্যানেজমেন্টের যুগ। শ্রোতাদের সুর মেলাবার জন্য গায়ক-গায়িকার বিশেষ আগ্রহ দেখা গেল। অসমীয়া বিহু গানে, একটা লাইনের পর সবাইকে নাকি ‘হয়’ বলতে হবে। আমার আবার ওখানেই ‘ভয়’! ক্লাস টু/থ্রিতে পড়ার সময় একবার দিদিমনি কোরাস গানের লাইন থেকে বার করে দিয়েছিলেন। আমি গর্ধভরাগিনী স্পেশালিস্ট। তাই মুখে কুলুপ এটে বসে রইলাম। এরপরে মিহিরবাবু একটা সহজ টাস্ক দিলেন। গানের সঙ্গে সঙ্গে মোবাইল টর্চের আলো জ্বেলে হাত নাড়াতে হবে। এটা আজকাল নূতন আমদানী হয়েছে। পাড়ার পুজোর ফাংশান কলকাতার আর্টিস্টরাও এরকম করতে বলছিলেন। এই কাজটা সহজেই করে ফেল্লাম! মিহিরবাবু একটা বেশ সাদা বেসের উপর লাল ডিজাইনের ফতুয়া পড়েছেন। লম্বা নয় বলে পাঞ্জাবী বলা গেল না। চায়ে পে চর্চাতে জিজ্ঞাসা করেছিলাম- কি, কলকাতা থেকে আমদানী নাকি? মিহিরবাবু বল্লেন - দিল্লিতে আজকাল সব পাওয়া যায়। মিহিরবাবুর সহধর্মিনীও ম্যাচিং ড্রেস দিয়েছেন। উপরের কাপ্তান গোছের ড্রেসটা মনে হল বিজয়াদশমীর লালপাড় শাড়ী কেটে বানানো! আজকাল মহিলারা একশাড়ী ডিফারেন্ট অনুষ্ঠানে পড়েন না। শাড়ী নবতম রূপে আবির্ভূত! যাইহোক এরা বেশ সুন্দর সব গান শোনালেন। এ্যলামনির ট্রেডমার্ক গান “পুরানো সেই দিনের কথা”ও সমেবত কন্ঠে হল। একজন শ্রোতা “গরুড় গাড়ী” গানটা শুনতে চাইলেন। মিহিরবাবু বেশ খুশী। কমন প্রশ্নের মধ্যে একটা। আমি অবশ্য “কুমোর পাড়ার গরুর গাড়ী… ভাগ্নে মদন… ইত্যাদির সাথে পরিচিত। এটা রবি ঠাকুরের কবিতা বলে জানতাম, কি জানি, আজকাল বিশ্বভারতীর স্বত্ব উঠে যাবার পর নানারকম এক্সপিরিমেন্ট হচ্ছে। হতে পারে কবিতাকে এবার গানের সুর দেওয়া হচ্ছে। তবে ভুল ভাঙল- মিহিরবাবু এক্সপ্লেন করলেন এটা নাকি ভাওয়াইয়া গান। নর্থ বেঙ্গলে চলে। ঈশান কোণের মেঘ দেখে গরুর গাড়ী চালক, বৃষ্টির আশঙ্কাতে তাড়াতাড়ি ঘর ফিরছে। মিহির দর্শকদের জিকের টেস্ট নিলেন। তাই থেকে জানা গেল প্রথম বাংলা ব্যান্ডের নাম মহীনের ঘোড়াগুলি। পাশে বসে কবিতা বিশারদ শুভাশিস দে। উনি আধুনিক কবিতা-টবিতা থেকে কোটেশন দেন, টুকটাক আবৃত্তির সুযোগ বুঝে করেন। আমি অবশ্য এই বৃত্তের বাইরে। আমকে জানাল ব্যান্ডের এই নামটা জীবনানন্দের একটা কবিতা থেকে নেওয়া - “মহীনের ঘোড়াগুলো ঘাস খায় কার্তিকের জ্যোৎস্নার প্রান্তরে….”। ব্যান্ডের গান শুরু হল , ‘ভেবে দেখেছে কি, তারারাও যত আলোক বর্ষ দূরে… । সত্যিই তো ভেবে দেখার মতই ব্যাপার। আমার মাথার পোকাটা কিলবিল করে উঠল। কার্তিকের জ্যোৎস্না-টোৎস্না গুলো জীবনাননন্দের ট্রেডমার্ক রূপসী বাংলার সঙ্গে মিলছে, তবে ‘ঘোড়া’ কোথা থেকে এল? গরু হলে তাও হত। ছোটবেলায় গরু রচনাতে অনেকবার লিখেছি - ‘গরু নদী পারে ঘাস খাইতেছে।’ ঘোড়া বাংলাদেশে দুর্লভ। পেটরোগা বাঙ্গালী ঘাস খাওয়া গরুর দুধ খেয়ে বড় হয়েছে, ঘোড়া ছিল না বলে বেশীরভাগ যুদ্ধে হেরে যেত, সুদূর মারাঠা থেকে আসা বর্গী হানায় আমরা জুজু হয়ে থাকতাম। জীবনানন্দের জীবনী জানা ছিল, উনি এক সময় দিল্লির রামজশ কলেজে পড়াতেন। ওই কলেজ থেকে বেশী দূরে নয় পুরাতন দিল্লি স্টেশন। নির্ঘাত ওখানে ঘোড়ার গাড়ী দেখেছিলেন। আমি ১৯৭৩ সালে দিল্লিতে ঘোড়ায় টানা এক্কা গাড়ী দেখেছি,
তবে নিশ্চয়ই ১৯২৯ সালে ঘোড়া অবশ্যই ছিল দিল্লিতে। সেই থেকে কবিতায় ঘোড়ার আমদানী। নিজের বুদ্ধিতে নিজেই খুশ। বাংলা নিয়ে পড়লে এই আবিস্কার নিয়ে ডক্টরেট পাওয়া যেত নিঃসন্দেহে!
তবে ‘মহীনের ঘোড়াগুলো’র লোগো দেখলাম। এগুলো সি হর্স।
দুলালদার সঙ্গে দেখা। গতবছর দুলালদার ‘ফল’ নিয়ে ‘পরেশদা পড়ে গেলেন’ লেখার পর থেকে ফললাভ এটাই হয়েছে যে সখ্যতা বেড়েছে। দুলালদাকে অনেকদিন থেকেই চিনি। ইষৎ ভারী চেহারার জন্য রাশভারী লোক ভেবে সমীহ করতাম। পরে দেখলাম খুব মাই ডিয়ার লোক। লম্বা চাকরি জীবনে বিভিন্ন জায়গাতে ঘুরেছেন। সিআর পার্কে সত্তর/আশির দশকে চন্দ্রলোক বলে একটা সিনেমা হল ছিল জি ব্লকে। জেনট্রি একটু লোয়ার গ্রুপের থাকায় আমি কোনদিন যাই নি। দুলালদা নাইট শো দেখতেন। রাত দশটায়, পনের মিনিটের ইন্টারভ্যালে বাড়ীতে এসে ডিনার করে যেতেন। এখানে নাকি কোন সিট নম্বর ছিল না। বল্লাম কলকাতায় আমরা নিউ এম্পায়ারে ব্যালকনিতে ৭০ পয়সায় ছাত্রজীবনে অনেক সিনেমা দেখেছি। সিট নম্বর ছিল না আবার ফাউএর মত হলে ধূম্রপানও চলত। দুলালদা ওই হলের কাছে কলকাতা কর্পোরেশনেও চাকরী করেছেন। দুলালদা আমার লেখার আর্ডেন্ট ফ্যান।
মনে মনে পুলকিত হই। গেয়ো যোগীও ভিখ পায়! দুলালদার ঝুলিতেও বিস্তর গল্প। ঠিক হল একদিন আমার বাড়ীতে ‘চায়ে পে চর্চা’ হবে।
অনুপ হলের ভিতর ঘোরাঘুরি করছে। ও জেএনইউতে আছে। এ্যালামনি ছাড়াও নানা অনুষ্ঠানে ওকে দেখতে পাই। বাংলা বইমেলা কি এএসআই এর পুরাতত্ব সম্বন্ধিত সেমিনারেও। ঝোলা ব্যাগের লেখাটার দিকে নজর গেল। সর্বনাশ করছে। অনুপের থেকে “বাঁচকে রহনা রে বাবা…”! লেখা “ প্ল্যাগারিসম ডিটেকশন সিস্টেম”।
এক-আধটু লিখি বটে, ‘বাঁশ বনে শেয়াল রাজা’! আমাকে বাঁশ দেবার ছক করছে না তো! আমি অবশ্য প্ল্যাগারিজম বলতে কবিগুরুর কবিতা কি গানের উদ্ধৃতি দিই মাঝে মাঝে, তবে এটা তো সব বাঙ্গালীরা করে থাকে। সিনেমা কি সিরিজে বেডসিনে রবি ঠাকুরের গান চালিয়ে দিলেই একটা বেশ পবিত্র ভাব এসে যায়। যাই হোক এসব ব্যাপারে সন্দেহ নিরসন করে নেওয়াই ভাল। অনুপকে সিট থেকে ডেকে ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞাসা করি। ও বরাভয় দিয়ে বল্ল-ব্যাগটা কোন সেমিনারে পেয়েছিল। যাক বাঁচা গেল!
একটি পরিবার প্রায়ই আসেন। বাবা-মা এবং প্রাপ্ত বয়স্ক ছেলে। নামটা মনে পড়ছে না। আমাদের সিধু জ্যাঠা মানে প্রদীপদাকে জিজ্ঞাসা করলেই নাম পাওয়া যাবে। প্রদীপদার হার্ড কপিতে হাঁড়ির খবর না থাকলেও গয়ার পান্ডার মত সবার ঠিকুজি-কুষ্টি লেখা।ভদ্রলোককে দেখলাম কানে চাদরমুড়ি দিয়ে দুইহাত কানে চেপে বসে আছেন।
মনে হল মিহিরের গানের গুতোকে “গ্রীষ্মকালে গান ধরেছেন ভীষ্মলোচন শর্মা, আওয়াজ খানা…” ঠাউরে কানচাপা দিয়েছেন। পাশে বৌদি ঘোমটা মাথায়। একদম মানিকজোড়!
মৌলিকে অনেক্ষণ ধরে টার্গেট করে আছি। ও আমাদের সব ফাংশনের এ্যঙ্কর। দুই একবার চোখাচোখিও হল। তবে শুভ বিজয়া জানানোর সুযোগ পাওয়া গেল না। প্রোগ্রাম শেষে ধরেছি-“এই যে সঞ্চালিকা, পালিয়ে বেড়াচ্ছ যে,
মাইকে এত শুভ বিজয়া শোনালে, তোমাকে শুভ বিজয়া জানানোর জন্য শুরু থেকে অপেক্ষা করছি, পাত্তা পাচ্ছি না তো। মৌলি বল্ল- দাদা আপনাকে আমি অনেক আগেই শুভ বিজয়া বলেছিলাম, আপনি অন্য কাউর উপর মনোযোগী ছিলেন। তাই তো ভারী অন্যায় হয়ে গেল। এখানে অনেক দুঃস্প্রাপ্য প্রজাপতি, তাই অমনোযোগী হওয়াটা স্বাভাবিক।যাক গে, তুমি সঞ্চালিকা, তা তোমার চালক- সৌমিত্র কোথায়? আমাকে দেখে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। এ্যন্টিক মূর্তির ভ্যালুয়েশন নিয়ে এএসআই এর এক্সপার্টের সঙ্গে কথা বলিয়ে দেবে বলেছিল। সেটা এখনও হয় নি। মৌলিকে বল্লাম সঞ্চালিকা নামটাই আমার পছন্দ, ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে এ্যঙ্কর শুনলে কেমন নাট-বল্টুর কথা মনে পড়ে, ব্রীজের যেমন এঙ্কারিং হয়। সঞ্চারী, পাঞ্চালী, সঞ্চালিকা এই নামগুলো পছন্দ। ঞ-চয়ে একটা দুর্বলতা আছে!
মিহিরের পরে (মিহির যদিও প্রাক্তনী, তবে এখন প্রফেশনাল) ইন-হাউসের বিস্তর ট্যালেন্টের ঝাঁপি খুলল। কিছুটা সময় বাইরে গুলতানি মেরে এলাম। রনজিতের মেয়ে হলে সমানতালে দৌড়ে বেরিয়ে এখন ক্লান্ত। ওকে ধরে নাম জিজ্ঞাসা করলাম।
নাম ঈশিতা, ক্লাস ফাইভে পড়ে। নামের মানে বল্ল ‘গুড গার্ল’। বল্লাম তুমি এত দৌড়াদৌড়ি করলে গুড গার্ল কি করে হবে!
হলে ঢুকে দেখি দুই বাচিক শিল্পী হাজির জয়িতা এবং জয়দীপ। এখন আমি ফেলুদার মত ইনভেস্টিগেটর। পাশে বসা বিজনকে বল্লাম-বুঝলি তো, আমার সিক্থ সেন্স বলছে। নামে নামে মিল মানে, খাপে খাপে হয়েছে, নাম থেকে যুগলবন্দীর সূত্রপাত। দুজনেই সুন্দর আবৃত্তি করলেন। জয়দীপ মাল্টিট্যালেন্টেড।
ভ্রমনের কবিতায় দার্জিলিং টয়ট্রেনে জয়িতার পাঠের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কুঝিকঝিক করে গেল। কবিতার মাঝে দুকলি গানও গেয়ে দিল। প্যাকেট নেওয়ার সময় দেখা হতে সন্দেহ নিরসন করে নিলাম। সত্যি দুজনের নাম দিয়েই প্রেমের সূত্রপাত। জিও ফেলুদা।
এরপরের শিল্পী ইন্দ্রাণী ম্যাডাম(?)। মঞ্চে উঠেই জানিয়ে দিলেন তারও বসন্তের ফুল যাদবপুরেই ফুটেছিল।
পতিদেব সামনের সীটেই অধিষ্ঠান করছেন। একটু কুন্ঠার সঙ্গে জানালেন সুরসম্রাট মিহিরভোজ ও বিশাখা দেবীর সামনে গান করতে দ্বিধা হচ্ছে। উনি একটাই গান করলেন। সুরেলা সাধা গলা। পিছনে বসা পিনাকীর কাছ থেকেও কনফার্ম করে নিলাম যে সত্যি ভাল গাইছেন। পরে হলের বাইরে জিজ্ঞাসা করলাম “বেশ সুন্দর হচ্ছিল, আরো দুই-একটা গাইতেন”। হাসিমুখে জানলেন ভেবেছিলাম, কিন্তু হলের লোক বল্ল লাইট অফ করে দেবে। সত্যি তাহালে এক বিতিকিচ্ছিরি ব্যাপার হত। মাঝে দিল্লির বাংলার নাট্যগোষ্ঠীর দল এই ব্যাপারটা নিয়ে বেশ আলোচনা করেছিল। এই হলটাকে বয়কট করবে বলেছিল। তবে ভাড়া তুলনামূলকভাবে শস্তা। তাই প্রস্তাব ধোপে টেকে নি।
ইন্দ্রানী ম্যাডাম যাদবপুরে ফিল্মস্টাডিজ নিয়ে পড়াশুনা করেছেন। যাদবপুরে যে এরকম একটা ডিপার্টমেন্ট আছে, জানা ছিল না, যদিও কলেজে পড়ার সময় গান্ধী মেমোরিয়ালে সত্যজিৎ, ঋত্বিক রেট্রোস্পেকটিভ দেখেছি খুব শস্তায়। উনার পতিদেব (নাম জানলে পাঠক একটু জানাবেন) শুনলাম যেন ফুটও্যয়ার ইনস্টিটিউটে পড়ান।
ওটা আমার ভূতপূর্ব অফিসের কাছে। আলাপ করতে গিয়ে হোঁচট খেলাম। উনি ম্যাথমেটিক্সের ডক্টরেট, পড়ান হচ্ছে ন্যাশানাল ইনস্টিটিউট অফ ফুড টেকনোলজিতে। ফুডের সঙ্গে অঙ্কের কি সম্বন্ধ মাথায় ঢুকল না। রেস্টুরেন্ট খুললে আইটেমের প্রাইসিং কি এমপ্লয়ি কস্টের হিসাব রাখতে একজন এ্যকাউন্টেন্ট দরকার, ম্যাথসের ডক্টরেট নিশ্চয়ই আরো কিছু পড়ান। সবার জন্য ফুড ফর থট। ভেবে দেখুন।
কেমেস্ট্রির এক ডক্টরেট ম্যাডাম এসেছিলেন। হনসরাজ কলেজে কেমেস্ট্রি পড়ান। আমি একবার কিরোরীমলের টিচার্স রুমে গিয়েছিলাম। আশ্চর্য লেগেছিল চেয়ার-টেবিলগুলো নার্সারির বাচ্চাদের সাইজের। সেই শুনে পাশের পতিদেব বল্লেন- হ্যাঁ, ডিইউর টিচারদের বেশ দুরবস্থা! কথা হচ্ছিল শৈলেনদাকে নিয়ে।
অনেককাল আগে নিয়মিত আসতেন। ট্রেডমার্ক ছিল সেমিনারে ধুতি-পাঞ্জাবি আর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে স্যুট-টাই। আজকাল ফেসবুকে দেখলাম দাড়ি নিয়ে সাইডফেসে পুরো টেগোর। পতিদেব ও অধ্যাপিকা পত্নী দুজনেই রামকৃষ্ণ চরণাশ্রিত, আমাদের অমলেন্দুদার মত। তবে পতিদেবের (নাম ভুলে গিয়েছি)
বেশ আধ্যাত্বিক শক্তিসম্পন্ন মনে হল, আমার দৌড় অবশ্য ক্লাস সিক্সের রাপিড রিডারে পড়া রামকৃষ্ণের গল্পচ্ছলে বলা চমৎকার উপদেশ বাণী অব্দি, পতিদেব আজকাল স্বপ্নে রামকৃষ্ণকে দেখছেন স্যুট-টাই পরণে। খেয়েছে! মাইকেলের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেন নি তো! দুজনেরই দাড়ি আছে। মনে মনে ছবি আকার চেষ্টা করলাম রামকৃষ্ণকে স্যুটে কেমন সুট করবে আর মাইকেলকে ঠাকুরের তেলচিটে গামছা আর ধুতি পরালে কেমন লাগবে। হালে পানি পেলাম না। আমি সুখী লোক। উর্বশী, রম্ভা বেঁচে থাক। ওদেরই আমি স্বপ্নে দেখি।
পাশে পিনাকী ছিল। বেচারা সিঙ্গারা, বিস্কুট খেতে পারে নি। গমের রুটি না খেয়ে, মনে হিন্দির “গম”! মানে গম থেকে তৈরী কিছু খেলে এ্যলার্জি, এর পোষাকী নাম “গ্লুটন ইনটলারেন্স। ডক্টরেট দিদিমনি খোলসা করলেন -একটা বয়সের পর কাউর এরকম হতে পারে কোন বিশেষ এনজাইম বন্ধ হয়ে। মিলেট চলতে পারে। আজকাল বাজারে খুব চলছে, স্বাস্থ্য সচেতন লোকেরা প্রভূত দাম দিয়ে খাচ্ছেন। দুই জেনারেশন আগে ওটস খেত ঘোড়া আর জোয়ার বাজরা খেত গরীব লোক। একেই বলে ঘোর কলি! ডাইনামিক ওয়ার্লড।
আমলেন্দুদাকে অনেকক্ষণ পর দেখতে পেলাম। পিছনের চুলটা বেশ লম্বা।
সাইড থেকে বেশ প্রোফেসর শঙ্কুর মত লাগছে। অমলেন্দুদা প্রথম জীবনে আইআইটিতে পড়াতেন। তাই মনে হয় চেহারায় ঐ ভাবটা আছে। নিজের গ্রাম টাকির কাছে সাঁইপালা নিয়ে বইও লিখেছেন।
দুয়ারীদাও এসেছেন নয়ডা থেকে। ছাব্বিশ সেক্টরের নয়ডা কালিবাড়ীর অনেক দায়িত্ব সামলান। আমরা দুজনে একই পথের পথিক। দুজনেরই রক্তে চিনির আধিক্য। দুয়ারীদাকে দেখে বল পাই। এই বয়সেও দেখি কালীবাড়ীর ভোগের লাইনে ইয়া বড় লুচি ভর্তি গামলা একাই বয়ে নিয়ে আসেন। দুয়ারীদা আমার থেকে পাক্কা দশ বছরের বড়। আরেকটু গল্প করার ইচ্ছে ত্যাগ করতে হল বিজনের তাড়াতে। ভাবলাম বিজন চিন্তা করছে প্যাকেট না তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যায়। বল্লাম চিন্তা করিস না, ইনসাইড ইনফরমেশন পেয়েছি, আটাত্তর জন লোক, প্যাকেট কম পড়বে না। তবে বিজনকে শোফারের ঘন্টাপ্রতি খেসারত যাতে না বাড়ে, তাই বাকীদের টা-টা করে বেরিয়ে এলাম। গতবার বিরিয়ানীর চিকেন খুঁজতে গলদঘর্ম হতে হয়েছিল। সে প্রায় ‘খ্যাপা খুঁজে ফেরে পরশপাথরের’ অবস্থা! ফিলো (ফার্স্ট ইন লাস্ট আউট) সিস্টেমে ঢোকানো চিকেনের ঠ্যাং হাঁড়ির তলা থেকে মুখ হাঁড়ি হওয়ার আগে উদ্ধার হয়েছিল। এবারে থালি সিস্টেম। ট্রান্সপারেন্ট কভারের মধ্যে দিয়ে সব দৃশ্যমান!
পিনাকী ও শুভাশিস দে ফিরবে মেট্রো করে। তবে সমস্যা হল ক্যারি ব্যাগ নেই। খুঁজে পেতে বিশাল সাইজের এক ব্যাগ যোগাড় হল। দু-প্যাকেট তার মধ্যে ফুরুৎ করে গলে গেল।
পাশ থেকে আমি ধূয়া তুল্লাম,-“ভর দো, ভর দো মেরি ঝোলি….!”
দেবদত্ত
০৬/১১/২৩





























Comments
Post a Comment