এক ঝলকে - ট্রেড ফেয়ার ২০২৩



এক ঝলকে - ট্রেড ফেয়ার ২০২৩

দিল্লির প্রগতি ময়দানের খোল-নলচে বদলে কিছুদিন আগে জি২০ সম্মেলন হয়ে গেল। আমার কাছে জায়গাটা প্রিয় তার কারণ প্রতি বছর এখানে ট্রেড ফেয়ার দেখতে আসি। শীতের শুরুর দিকে (১৪-২৭ই নভেম্বর) অনুষ্ঠিত এই মেলায় দিল্লিবাসীরা সপরিবারে রকমারী শীতবস্ত্রের পোষাকে সজ্জিত হয়ে আসে, ভারতের সমস্ত প্রদেশের ঐতিহ্য, হ্যান্ডিক্র্যফটস এবং প্রদেশের বিভিন্ন খাবার স্টলের আকর্ষণে। আশি কি নব্বই-এর দশকে অন্য আরেকটা আকর্ষণ ছিল, সেটা হল শকুন্তলম নামে প্রগতি ময়দানের ভিতরের সিনেমা হল। দুই টাকা টিকিট কেটে এসি হলে প্রায়ই সিনেমা দেখতে যেতাম।


আইটিপিও থেকে ফ্রিতে প্রতি মাসের সিনেমার লিস্টসহ কার্ড আসত। 

করোনার জন্য মাঝে বছর দুয়েক মেলা হয় নি। যদিও গত তিনবছর ধরে মেলাতে নিয়ম করে যাচ্ছি, তবে পুরানো দিনের অনুভূতি আসছে না। কারণটা হল বর্তমানে প্রগতি ময়দান কংক্রীটের একটি বিশাল বড় জঙ্গল।


প্রগতির নমুনা বটে! একই ধরণের দেশলাই বাক্সের মত বড় বড় হল, দৃষ্টিনন্দনিকতার অভাব। যন্ত্রসভ্যতার বহিঃপ্রকাশটাই বেশী চোখে পড়ে। বিশাল সাইজের পরপর লিফ্ট। কাঁচের মধ্যে দিয়ে মোটর গীয়ারবক্সের ঝলকানির মধ্যে দিয়ে, স্টীলের স্পাইরাল তার, যেন ফাঁসির দড়ি। আগে প্রত্যেকটি রাজ্যের আলাদা আলাদা বিল্ডিং ছিল।

সবই দোতলা তিনতলা। প্রগতি ময়দানের /৯টা গেটের সবগুলি দিয়ে মেলাপ্রাঙ্গনে ঢোকা যেত।

এখন খালি ভৈরো মার্গের গেট মেট্রোর সামনে দশ নম্বর গেট খোলা। প্রগতি ময়দানের বেশ কিছুটা অংশ এখন সুপ্রীম কোর্টের দখলে। আগে এইখানটাতে আপ্পুঘর ছিল।


বাচ্চাদের এনটারটেনমেন্টের সুন্দর ব্যবস্থা ছিল। বাচ্চারা যখন ছোট ছিল প্রতিবছর গিয়েছি। নানা ররম রাইড, ওয়াটার স্পোর্টস এর বন্দোবস্ত ছিল। একবার তো টিকিটের সঙ্গে চারজন চারটে ছাতা ফ্রি পেলাম। এখন সব ইতিহাস। সুপ্রীম কোর্টের সুউচ্চ বিল্ডিংএর পাশে,

মথুরা রোডের উল্টোদিকে পুরানো সুপ্রীম কোর্টের আইকনিক স্থাপত্য নিদর্শন,

যা কর্তৃপক্ষের চোখে কলোনিয়াল ঔদ্ধত্যের প্রতীক, কেমন যেন ম্যাড়মেড়ে ঠেকছে। 

আগে প্রগতি ময়দানের ভিতর কেয়ারি করা রাস্তার পাশে সুন্দর সুন্দর গাছের পাশ দিয়ে বিভিন্ন স্টেট হল গুলো, যারা বিশেষভাবে সেজে উঠত আঞ্চলিক সংস্কৃতিক-কলার ছোঁয়ায়- তার ভিতরে ঢুকে প্রথমে সেই প্রদেশের বিভিন্ন প্রকল্প, দর্শনীয় স্থানের পরিচিতির পর, কেনাকাটির অনেক স্টল থাকত, বেরনোর আগে প্রদেশের বিশিষ্ট সব খাবার স্টল চেখে দেখার উৎসাহ থাকত। পনের-বিশ বছর আগের শীতের হাল্কা আমেজের সঙ্গে রৌদ্রকরোজ্জ্বল দিনগুলিতে


খোলা রাস্তায় হেঁটে বিভিন্ন রাজ্যের প্রদর্শনীতে ঢোকার স্মৃতির সঙ্গে, হালফিলের জমানায় ৪০০ লেভেলের পিএম২ দাপটে গ্লুমি ওয়েদারের মধ্যে দিয়ে বিশাল ছাঁদের তলায় খুপরি জায়গা নিয়ে মিনিয়েচার সাইজের স্টেট প্যাভিলিয়ানে ঢোকার অনুভূতি, ডিপ্রেসড ওয়েদারের সঙ্গে মানানসই। 

আগে হল নম্বর , , ছিল লম্বা টানা বিল্ডিং। তার পাশে সুন্দর ফোয়ারাযুক্ত আয়তাকারে বিশাল ঝিল ছিল।


এখন দৃষ্টিনন্দন ওয়াটারবডির জায়গাটা তে ফুডস্টল। তবে অনেকস্টলই খালি মনে হল। ভাড়া নিশ্চয়ই বেশী। খাবারের ভ্যারাইটি নেই, ছোলে-বাটোরে বা নুডলস অথবা থালি, এসবের প্রাধান্য। গুনগত মানও তেমন নয়। কমার্শিয়ালাইজেশনটাই মেন মোটো। 

যে জায়গাটা কনভেনশন সেন্টার,


সেটা ট্রেড ফেয়ারের ধরাছোঁয়ার বাইরে। উপমহাদেশীয় রীতি মেনে সেটা ভিআইপি কালচারের অঙ্গীভূত, আম আদমীর অধিকারের বাইরে। 

আগে ভৈরো মার্গ সাইডে ১১ ১২ নম্বর হল ছিল মৌচাকের খোপের জ্যামিতিক শেপে খাঁজকাটা,


আকারে পিরামিডের মিনিয়েচার সংস্করণ। হলের প্রতিকৃতি সাধারণ ভাবে প্রগতি ময়দানের সিম্বলিক ছবি ছিল।

সিনিয়ার সিটিজেনদের ট্রেন টিকিটের কনশেসন তুলে দিলেও, ট্রেডফেয়ারে এনট্রির জন্য কর্তৃপক্ষ দরাজহস্ত। পুরো দুইসপ্তাহই এনট্রি ফ্রি এমনকি প্রথম পাঁচদিনও, যখন টিকিটের দাম ৫০০/- 

পুরানো অভ্যাস ছাড়া যায় না। এবারেও একদিন গেলাম। মেট্রোতেই সুবিধা। স্টেশন থেকে নেমে বেশ কিছুটা হেঁটে এনট্রি। ভিতরে সিনিয়ার সিটিজেনদের জন্য সরকারী স্টল দেখা গেল।


এরা চা-কফির বন্দোবস্ত রেখেছেন। ব্যাটারি গাড়ীতে মেলা প্রাঙ্গনের কাছাকাছি পৌঁছে দিলেন। সবটাই ফ্রি। আমাদের মত মধ্যবিত্তরা সরকারী ওয়েলফেয়ার স্কিমের সাথে বিশেষ পরিচিত নই, তাই বেশ ভাল লাগল। 


আজকাল দেশীয় কর্মপদ্ধতির উপর বিশেষ সরকারী মনযোগ। তাই আয়ূষ মন্ত্রনালয়ের বিশাল স্টল। আয়ুর্বেদিক ঔষুধের অনেক দোকান। পোটেনশিয়াল কাস্টমারের দিকে পাখির চোখ। একজন আমাকে পাকড়াও করে মুখের আঁচিলের দেশীয় পদ্ধতিতে মিলিয়ে দেবার মলম কিনতে জোরাজুরি করতে লাগল। ইনকাম ট্যাক্সের স্টল দেখে এগিয়ে গেলাম। এখনও ব্যাটারা ট্যাক্স নিচ্ছে। রাগ তো আছেই! গিয়ে ফিডব্যাক রেজিস্টার চাইলাম। অনেক খোঁজাখুজির পর রেজিস্টারে লিখলামযেহেতু সরকারী সোশাল ওয়েলফেয়ার স্কিম বৃদ্ধদের জন্য প্রায় শূন্য, সুতরাং -সিনিয়ার সিটিজেনদের কাছ থেকে কোন ট্যাক্স নেওয়া চলবে না!” 

চল্লিশ-পয়তাল্লিশ বছর আগে প্রচার চলেছিল, হার্টের জন্য সর্ষের তেল বিষবত, হার্টের চিহ্নযুক্ত বাদাম তেল হল হাইজিনিক। ডাক্তাররাও এই প্রচারযন্ত্রের সামিল ছিলেন। এখন অবশ্য সরষের তেল স্বমহিমায় ফিরে এসেছে। এবারের মেলায় দেখলাম কোল্ড প্রেসড তেলের প্রচার চলছে। হাতে তৈরী যন্ত্রের সাহায্যে তেল বার করা হচ্ছে। এতে নাকি তেলের আসল গুণগত মান বজায় থাকছে। অনেক আগে ঘানিতে যে ভাবে তেল পেষা হত, আজকাল সেরকমটাই হচ্ছে। তিনগুন দাম কেন, এর উত্তরে এক স্টলমালিক, মীরাটের কাছে কোন গ্রামে থাকেন,


জানালেন যে সরষের তেলে পাম অয়েল মেশানো হয় তাই ভাল ব্রান্ডের তেলও শস্তায় দিচ্ছে। স্বাস্থ্য দীর্ঘ আয়ু জনসাধারণের কাছে ভালনারেবল পয়েন্ট। অনেকেই ঠান্ডা মাথায়, কোল্ড প্রেসড অয়েলের গুনগান শুনে তেল কিনছেন। জয়পুরের এক বাঙ্গালী কাপল চাররকম তেল বিক্রি করছেন। তার সহধর্মিনী ইউরোপ-অমেরিকায় চাকরী করে, বিদেশী মেশিন এদেশে লাগিয়ে দেশী পদ্ধতিতে খাঁটি তেল বানাচ্ছেন। বিদেশী মেশিন শুনলে আমরা নতজানু হয়ে পড়ি। বন্ধুটিও কালোজিরের তেল, মাথায় চারদিন মাখলে , তার সল্ট-পেপার চুল মিশমিশে কালো হবে, এই প্রতিশ্রুতিতে কড়কড়ে চারশ টাকা খরচা করে ৫০মিলি তেলের শিশি কিনলেন।



বন্ধুটি আবার মেলাতে তিহার জেল খুঁজতে লাগলেন। জেলের প্রতি এরকম আকর্ষণ- বেশ আশ্চর্য হলাম। তবে এখানেও কনজিউমারিজের প্রতিফলন। কয়েদীদের তৈরী জিনিষ শস্তায় বিক্রি হচ্ছে। 

ইউপি স্টলে চিত্তাকর্ষক জিনিষ দেখা গেল। লাইভ হস্তশিল্পের ডেমনস্ট্রেশন।পার্শিয়ান আর্ট-ওয়ার্ক, জরি-জরদোজি (jor মানে গোল্ড dozi  মানে ওয়ার্ক) মুঘল আমলে এদেশে আসে সেন্ট্রাল এশিয়া থেকে।


আগেকার দিনে গোল্ড বা সিলভার থ্রেড দিয়ে এমব্রয়ডারির কাজ হোত। নবাব-বাদশাহদের ঝকমকে পোষাক হত জরি-জরদোজি ডিজাইনে। উত্তর প্রদেশের উনাও, বেরিলি থেকে ক্র্যাফটসম্যানরা এসেছেন। আগ্রার পাথরের কাজের হস্তশিল্প দেখা গেল। এটা পচ্চিকারি (pachhikari) নামে পরিচিত।


মারবেলের উপর সেমিপ্রেশাস স্টোন যেমন- ল্যাপিজ লাজুলি, টারকয়েস, অনিক্স ইত্যাদি হ্যান্ড গ্রাইন্ডারে শেপ সাইজ এনে মার্বেলের উপর বসিয়ে নানা ধরনের প্লেট, ফুলদানি তৈরী হচ্ছে। মইনপুর জেলার তারকাশি হস্তশিল্পের নমুনাও দেখা গেল।



প্রথমে ড্রইংকে কাগজে এঁকে কাঠের মধ্যে গ্রুভ বানান হয়, তারপর তারকে ঠুকে ঠুকে কাঠে লাগিয়ে ডিজাইন করা হয়। 
তবে কনজিউমারিমের যুগে এই ধরণের নানাবিধ হস্তশিল্প মার খাচ্ছে ডিজিটালি ডিজাইনডঅপেক্ষাকৃত শস্তা জিনিষের প্রচুর সহজলভ্যতার জন্য। ক্ষয়িষ্ণু কিছু গ্রাহক, যারা সূক্ষ চোখের অধিকারী   শিল্পকলার সমঝদার,  এই হস্তশিল্পের মর্ম  পরিশ্রম উপলব্ধি করে যোগ্য মূল্য দিতে দ্বিধা করেন না। 
পুরানো ট্রেড ফেয়ারের সেই চার্ম ও কৌলীন্য যে, অধুনাকালের নিউ লুক ট্রেড ফেয়ার দর্শনে জনজোয়ার আনতে পারে নি, তার প্রমাণ হল মেলাপ্রাঙ্গনে ফুটফলের অভাব। আমি গিয়েছিলাম বিজনেস ডে-র দিন, যখন টিকিটের দাম বেশী থাকে, লোক যায় কম। পরে অন্য প্রত্যক্ষদর্শীর কাছে শুনলাম, পরের দিনগুলোতেও ময়দান ফাঁকা যাচ্ছে। 


দেবদত্ত

২৬/১১/২৩ 

Comments

  1. খুব ভাল লাগলো খুব ভালো তুলনা ও মতামত। অভিজ্ঞ লোকের অভিজ্ঞ চোখের দেখার পর চমৎকার লেখায় সব ফুটে উঠেছে।

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

ত্রিবেনী তীর্থপথে ও আরো টিটবিট

রবিঠাকুর ও কিছু হাসি মশকরা

A walk to explore Delhi’s lesser known monuments