রস-কথা
রস
রসিকতা কথাটার মধ্যে রস শব্দটা আছে। আখের রস হল ফিজিক্যাল ফর্মে রস। তবে বাংলা সাহিত্যে রসের নানা প্রকারভেদ। একটা হল জিহ্বার রসাস্বাদন। মানুষের পঞ্চইন্দ্রিয়গুলি হল চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা, ত্বক। পেটুকের বাঙ্গালীরা জিহ্বার রসস্বাদনকে প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। এই রসের লিমিটেশন হল এর অনুভব ধরা-ছোঁয়া ছাড়া সম্ভব নয়। মাটনটা আপনাকে খেয়েই বুঝতে হবে তার টেস্ট কেমন। তবে মিষ্টির বেলায় রসাস্বাদন করতে, খালি রস খেলে কিছু হবে না, আসল মিষ্টি খেয়ে অমৃতের স্বাদের অনুভূতি নিতে হবে। মিষ্টির রস কে রস বলা হলেও, এটা রসিকতা ছাড়া কিছু নয়। রসনাসিক্ত করতে এ রস অপরাগ। এবারে আসা যাক চক্ষুর রসের ব্যাপারে। প্রথমে ধরে নেওয়া যাক রস হল আনন্দের অনুভূতি। এক্ষেত্রে উচ্ছের রসটাকে বাদ দিতে হবে। ধরা যাক আপনি একটা সুন্দর ফুল দেখলেন। ফুল দেখে, চোখে ষর্ষেফুল দেখবেন না ধরে নিচ্ছি, যদিও সমষ্টিগত ভাবে সর্ষেফুল রমনীয়।ফুলের সৌন্দর্য যদি আপনি দৃষ্টি দিয়ে অনুভব করলেন, নাসিকা দিয়ে সুঘ্রাণ নিলেন তবে সেটা হল স্বর্গীয় অনুভূতি, আর যদি ফুল দেখে ওটাকে ছিঁড়ে দয়িতাকে উপহারের কথা ভাবলেন তবে আপনি ঘোরতর বাস্তববাদী।
প্রেমরস নিয়ে আমি সন্দিহান। শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভু কৃষ্ণের প্রেমরসে জারিত ছিলেন। সাধারণভাবে “নর-নারীর প্রেম” কথাটার সঙ্গে আমরা পরিচিত। ঈশ্বর প্রেম তাহালে কি। ইংরাজীতে একটাই শব্দ, সেটা হল “লাভ”, কিন্তু বাংলাভাষাতে প্রেম, ভালবাসা দুটোই আছে। নর-নারীর প্রেমকাহিনী নিয়ে অজস্র কবিতা, উপন্যাস। হায়ার ডিগ্রি অফ ভালবাসা হল প্রেম। নর-নারীর ভালবাসাতে হৃদয়ের মিলন যতটা থাকে, দৈহিক আকর্ষণ ততটাই প্রাধান্য পায়। ভালবাসাটা রিসিপ্রোকেটিং হয়, যদি একজন পারষ্পরিক মেলবন্ধনের টানের তীব্রতা কমিয়ে আনেন, তবে অন্যপক্ষের থেকেও সেই টান কমবে, ভালবাসার ভিতে ফাটল ধরবে। প্রেম হল ভালবাসার উপরের স্তর। এটা লিঙ্গভেদহীন। যদি সত্যিকারের প্রেম অনুভূতি হয়, তখন প্রেমের বহিঃপ্রকাশ থাকে চাওয়া-পাওয়ার উর্ধে। সেটা একটা ঐশ্বরিক অনুভূতি। যারা সত্যিকারের ঈশ্বর প্রেম করেন, তাদের মনন সাধারনের থেকে অনেক উর্ধ স্তরে থাকে। রামকৃষ্ণ, বুদ্ধদেব, বিবেকানন্দ তারা ঐ স্তরে উন্নীত ছিলেন। বিবেকানন্দ মা কালীর কাছে ধন-সম্পত্তি চাইতে পারেন নি, চেয়েছিলেন জ্ঞান ও ভক্তি। প্রেমরস নিয়ে কিছু কথা হল। এবার আসি ভক্তিরসের কথায়। ভক্তি কথাটা একটু খোলসা করলে দাঁড়ায় ভয় মিশ্রিত শ্রদ্ধা। দেবতাদের আমরা ভক্তি করি। কয়েকদিন আগে দুর্গাপুজার অঞ্জলি দিতে গিয়ে বলতে হল “যশো দেহি, পুত্রান দেহি, ধনং দেহি…. হর পাপং, হর ক্লেশং, হর রোগং ইত্যাদি। অর্থাৎ চাওয়াটাই মোক্ষ, সেই থেকে ঠাকুরে ভক্তি। এই থেকেই বোধহয় “অতিভক্তি চোরের লক্ষণ” প্রবাদ এসেছে। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে আবার শুরুতে আদিরস ও প্রেমরস, জীবন তরণী সঙ্কুল দরিয়া পাড়ি দিতে দিতে সেই রস শুকিয়ে রসিকতার পর্যায়ে যায়। রস ঘেঁটে গিয়ে উল্টোটা, মানে সর আর চাছি তৈরী হয়! সাউথ ইন্ডিয়ানদের দেখেছি তারা প্রধানত দুই ভাগে বিভক্ত। বৈষ্ণবাইটস অথবা শিবাইটস। আমাদের মধ্যেও শাক্ত ও বৈষ্ণব ধর্মীয় আছেন। বৈষ্ণবরা হলেন রসের কান্ডারী।কৃষ্ণ-রাধার প্রেম কাহিনী। কার্তিকের জ্যোৎস্নাস্নাত, কুহক মেশানো, অপার্থিব রাতে রাধা-কৃষ্ণের যুলমিলন প্রেমরসের এপিটোম। সেই মধুর রসের উৎসবের নাম রাস। গান হয় — “কাঞ্চন মনিগণ, জনু নিরমাওল, রমণীমণ্ডল সাজ। মাঝহি মাঝ, মহামরকত সম, শ্যামর নটবর রাজ। ধনি ধনি অপরূপ রাসবিহার। থির বিজুরি সঞে, চঞ্চল জলধর, রস বরিখয়ে অনিবার।”
এদিকে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ বলে গিয়েছেন “রসে বশে রেখো মা…। তার মানে কি জীবনভর রসমাধুরীর কান্ডারী হয়ে কাটাতে হবে? তা বোধহয় নয়। রস-কে বশে রাখো। ব্যালান্সিং এ্যক্ট। এটাই জীবনযুদ্ধে টিঁকে থাকার উপায়। যে রস আমাদের আনন্দ দেয়, গন্ডুষ ভরে পান করতে দ্বিধা নেই, কিন্তু যেমন অমৃতের উল্টোপিঠে গরল আছে, সেটাও অতিক্রম করতে হবে, রবি ঠাকুরের ভাষায় “বিপদে মোরে রক্ষা কর, এ নহে মোর প্রার্থনা/বিপদে আমি যেন না করি ভয়”।
রসিকতা দিয়ে শুরু করে তত্বকথায় এসে গেলাম। তবে অন্তরে আমি রসিক। পূর্ণিমার চাঁদকে “ঝলসানো রুটি” দেখতে মন চায় না, চাঁদের কলঙ্কে চোখ পড়ে না, পূর্ণিমার চাঁদের বিচ্ছুরিত স্নিগ্ধ কিরণ প্রেমের বার্তা বয়ে আনে মনের কোণে।
দেবদত্ত
০৪/১১/২৩

দাদা খুব সুন্দর লিখা, এরকম লিখা পড়ে অনেক আনন্দ পাওয়া যায়। ধন্যবাদ ।
ReplyDeleteখুব ভালো,আপাতত কোন মার্গে বিচরণ করছিস ?
ReplyDelete