স্টিমারে হুলারহাট
বাংলাদেশে স্টিমার যাত্রা
২০১৩ সালের ২৬শে অক্টোবর আমার বাংলাদেশে পদার্পণ। সদ্য বর্ষার জলে পুষ্ট শ্যামলিমামন্ডিত বাংলাদেশ দেখে প্রথম দর্শনেই আমি মোহিত।
কিন্তু গোলাপের কাঁটার মত এই সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশে নিকটবর্তী ইলেকশনকে কেন্দ্র করে দুই পার্টি, আওয়ামী লীগ (তখন ক্ষমতাসীন) আর বিএনপি (প্রধান বিরোধী) র মধ্যে সহিংস রেষারেষি। কারণটা হল ইলেকশনের তিনমাস আগে সব পার্টি মিলে একটা ইন্টারিম গভর্নমেন্ট তৈরীর কথা, কিন্তু দুই পার্টির মতভেদে সেটা সম্ভব হয় নি। বিএনপি ইলেকশন বয়কট করেছে এবং ইলেকশন বানচাল করার চেষ্টায় হিংসার আশ্রয় নিয়েছে। রাস্তায় চলাফেরা মুশকিল। চারিদিকে আতংক। কখন কি হয় এই ভেবে সাধারন মানুষ উৎকন্ঠিত। নিয়মমত দুটো পার্টি না হলে ইলেকশন হয় না। ইরশাদের জাতীয় পার্টি বলে তৃতীয় একটি রাজনৈতিক দল, যারা আওয়ামী লীগকে সমর্থন করে সরকার গঠনে অংশগ্রহন করেছিল, তাঁরাই ২০১৪র ইলেকশনে অপোজিশন হয়ে নাম কা ওয়াস্তে নির্বাচন হল। আওয়ামী লীগ প্রায় সব সিট জিতে আবার ক্ষমতায় ফিরল।
সময়টা ২০১৪র গোড়ার দিকের কথা। দিল্লী থেকে ঢাকা এসেছি। ইলেকশন শেষ হলে কি হবে চারিদিকে তখনো রাজনৈতিক অস্থিরতা। সবচেয়ে বড় সমস্যা ঢাকার বাইরে যাওয়া। কারন বাস চলছে অনিয়মিত। চারিদিকে রোড ব্লক চলছে, পেট্রল বোমা যখন তখন পড়তে পারে।পেট্রল বোমাটা একটা ক্রুড ধরনের বোমা, সুতলি দিয়ে বারুদ বাঁধার কারবার নেই, কোল্ড ড্রিংকসের বোতলে পেট্রল ভরে, মুখে একটা পাতলা দড়িতে আগুন লাগিয়ে বাসের মধ্যে ছুড়ে দাও, নিমেষে নিরীহ লোকের গায়ে আগুন লেগে মারাত্মক ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।
আমার যাওয়ার কথা মংলা। বাংলাদেশের পোর্ট বলতে সবাই চিটাগাও বা চট্টগ্রাম পোর্টকেই জানে, দ্বিতীয় পোর্ট হল মংলা, বাগেরহাট জেলায় পশুর নদীর পাশে অবস্থিত। কলকাতা পোর্টের মতই সমুদ্রের মোহনা থেকে ১৩০-৪০ কিমি দূরে। ঢাকা থেকে মংলা, সাধারণভাবে যাওয়ার রাস্তা হল গাড়ীতে ঘন্টাখানেকের রাস্তায় মাওয়াঘাট, সেখান থেকে লঞ্চ বা স্পীডবোটে ঘন্টা দেড়েকের পথ পাড়ি দিয়ে শরীয়তপুর গিয়ে ওখান থেকে সড়ক পথে আরো ঘন্টা তিনেকের রাস্তা মংলা।রাজধানী থেকে সাউথ বাংলাদেশ যেতে গেল পদ্মা নদী পেরোতে হবে সোজাসুজি সড়ক পথে যাওয়া যায় না, কোন সেতু নেই। এখন যা অবস্থা, বাস অনিয়মিত, আন্দোলনকারীরা রাস্তা বন্ধ করে দিচ্ছে অনেক সময়, তো যাই কি করে। অফিসের এক বাংলাদেশী কলিগ সমাদ্দারবাবু বুদ্ধি দিলেন, দাদা অপনি লঞ্চ সার্ভিস নিন, জলপথে কোন ভয় নেই। চাঁদপুর, বরিশাল, ঝালোকাঠি হয়ে পিরোজপুর যাবে, ওখানে আপনি অফিসের গাড়ী ডেকে নেবেন। পিরোজপুর থেকে মংলা ৫০-৬০ কিমি। অফিসের গাড়ীটাও পাজেরো স্পোর্টস.
ঐ রকম গাড়ী থাকে একমাত্র ডি সি এবং এস পি সাহেবের। সাধারন লোকেরা ওই কালো বড় গাড়ীটাকে বেশ সমীহ করে চলে। মনে আছে একবার গোপালগঞ্জ শহরে মিষ্টি কিনছিলাম। দোকানের সামনের রাস্তাটা ছোট। গাড়ী রাস্তার পাশে, ছোটখাট একটা ট্রাফিক জ্যাম। একটুপরে দেখি, একজন ট্রাফিক পুলিস এসে আমাকে খুব বিনয়ের সঙ্গে বলছে- স্যার , কিছু মনে করবেন না, গাড়ীটা একটু এগিয়ে রাখব, নইলে জ্যাম লেগে যাচ্ছে। নিশ্চিত গাড়ী দেখে ভেবেছে কোন বড় সরকারী অফিসার।
ভেবে দেখলাম এটাই সবচেয়ে সেফ উপায়, সাইট যাওয়ার। আমি আদার ব্যাপারী, কপালগুণে জাহাজের খোঁজ নেওয়ার দরকার পড়ল! খোঁজখবর নিয়ে জানলাম, বেসরকারী লঞ্চ ছাড়া সরকারী স্টিমারও আছে, রাতের বেলা ছাড়বে। এটা সাধারণ প্রাইভেট লঞ্চ নয়, ব্রিটিশ আমলের স্টিমার, গালভরা নাম ‘ রকেট সার্ভিস’। চারটে মোট স্টিমার আছে, সবগুলো ১০০ বছরেরও বেশী পুরানো। ১৯৬০ সালের আগে কয়লার ইঞ্Bজিনে চলত, পরে ডিজেল ইঞ্জিনে পরিবর্তন করা হয়। বিআইডাব্লুটিসি ( bangladesh inland water transport corporation).
টিকিট কাটতে গেলাম পল্টন বাজার এলাকাতে, জায়গাটা পূরাতন ঢাকাতে। গিয়ে শুনি সব টিকিট ফুল, তবে দুটো ভিআইপি কোটার টিকিট আছে, আর দুঘন্টার মধ্য যদি কোন ভিআইপি বুক না করেন, তবে আমি জেনারেল কোটাতে ঐ কেবিন পেতে পারি। আরো একজন ভদ্রলোক টিকিটের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। ঢাকা কোর্টের উকিল, ছোটখাট চেহারা। তার পারিবারিক বাসস্থান ঝালেকাঠি। বিদেশ থেকে তার বোন-ভগ্নীপতি এসেছে, তাদের জন্য টিকিট দরকার। স্থলপথে যাতায়ত কার্যত বিপদসঙ্কুল, তাই জলপথের টিকিটের চাহিদা তুঙ্গে। যাক, ওয়েট করে সুফল পাওয়া গেল। টিকিট পেলাম, সিঙ্গল কেবিন।
লঞ্চ ছাড়বে সন্ধ্যাবেলাতে, বুড়ীগঙ্গার পাড়ে ঢাকার বিখ্যাত সদরঘাট থেকে। কতরকম দোতলা, তিনতলা লঞ্চ, স্টীমার। গোয়ালন্দ, বরিশাল, পিরোজপুরের যাত্রী বেশী।
এছাড়া আরো যাচ্ছে ভোলা, পটুয়াখালী, চরফ্যাশন ইত্যাদি সবই দক্ষিণবঙ্গে। রাতে লঞ্চে উঠলে, ভোরবেলা বরিশাল শহর, তারপর পড়বে ঝালোকাঠি, ওটাও বরিশাল জেলার অন্তর্গত।
তারপর আসবে পিরোজপুর শহরের হুলারহাট লঞ্চঘাট। দু একটা লঞ্চ আরো দূরে কচা নদী দিয়ে খুলনা পর্যন্ত যায়।
ঢাকা আসার পর একদিন এমনি ঘুরতে গিয়েছিলাম সদরঘাট। ৫টাকা টিকিট কেটে ভেতরে ঢুকলাম। আমার বিদ্যুত ভবনের সহকর্মী দিনেশ মিস্ত্রি বলেছিল ছেটবড় মিলিয়ে ৩০০ লঞ্চ, স্টিমার রোজ ছাড়ে, ৩০-৩৫ হাজার লোকের রোজ যাতায়ত। সেটা ছিল দিনের বেলা।
মেলা লোকজন। সবাই ব্যস্তসমস্ত, পোটলাপুটলী নিয়ে ছোট্ট কাঠের পাটাতনের উপর দিয়ে তরতর করে লঞ্চে উঠে পড়ছে। তলায় তাকিয়ে দেখি বুড়ীগঙ্গার কালো জল। ঘোলাজলের গন্ধটাও সুবিধার নয়। ওই গানটা মনে পড়ে গেল -“কালো জলে কুচলা তলে ডুবল সনাতন…”। নদীর দিকে তাকিয়ে দেখি স্থির জল, বহতা নদী নয়, পরে জানলাম বুড়ীগঙ্গা নদীর অস্তিত্ব সংকটময়, কারণ ঢাকার বর্জ পদার্থ এই নদীতে জমা হচ্ছে এছাড়া জনসংখ্যার বৃদ্ধির ফলে নদী বুজিয়ে নূতন বসতি গড়ে উঠছে। ঢাকার পশ্চিমদিক ও দক্ষিণদিক ঘিরে আছে বুড়ীগঙ্গা। বূড়ীগঙ্গার উত্তর পার্টটার নাম তুরাগ নদী, ওটার সংগে এসে মিলেছে শীতলাক্ষ্যা নদী। এই নদীগুলো ধলেশ্বরী নদীর ট্রিবিউটারি। তলার দিকে নারায়নগন্জ পেরিয়ে, siltation এর জন্য নদী মজে গিয়েছে, ফলস্বরূপ আজ বুড়ীগঙ্গা আর বহমান নদী নয় স্থবির লোলচর্মহীন বৃদ্ধার সঙ্গে তুলনীয়। পরিবেশবাদীরা বুড়ীগঙ্গার ব্যাপারে খুব সোচ্চার, কিন্তু বিশেষ কোন উদ্যোগ নেই সরকারের তরফ থেকে। নদীর নামটাও ‘বুড়ী’ আক্ষরিক অর্থে এসেছে গঙ্গা প্রবাহর শেষ অংশটি, জীবনের শেষ অংশের সঙ্গে তুলনা টেনে।
যাবার দিন অফিসের গাড়ী ঘাটের কাছাকাছি ছেড়ে দিল। ছোটরাস্তায় যা ভীড়, গাড়ী ঢোকে কার সাধ্যি। স্টীমারে ঢুকে টিকিট দেখিয়ে কেবিনে ঢুকে মনটা বেশ খুশী লাগল।
দুদিকে দুটো বেড, মাঝখানে ওয়াশবেসিন, কাঠের টেবিল ইত্যাদি। পুরো কেবিনটা কাঠের প্যানেলিং করা। মনে হচ্ছিল বেশ একটা হেরিটেজ ভ্রমনে যাচ্ছি। রাতের ডিনার টিকিটেই সঙ্গেই ধরা আছে. খেয়েদেয়ে ডেকে এসে বসলাম। স্টীমার বেশ জল কেটে এগোচ্ছে। সামনের জোরাল সার্চলাইটটা বৃত্তাকারে ঘুরছে। মাঝে মাঝে সাইরেনের আওয়াজ, সামনে থাকা ছোট লঞ্চ অথবা নৌকাকে সাবধান করতে। স্টীমারের দুইসাইডে দুটো বড় চাকা জল কেটে তরতর করে চলেছে। আগে ঠিক এরকম জলভ্রমনের অভিজ্ঞতা ছিল না। একবার অবশ্য জাহাজে করে লাক্ষাদ্বীপ গিয়েছিলাম। কিন্তু সেটা ছিল সমুদ্র। আর অশান্ত সমুদ্রের জন্য খুব সি-সিকনেস হয়েছিল। তাই সেটা উপভোগ করতে পারি নি। এখানে দারুন লাগছিল। বসেই রইলাম ডেকে। রাত বারটাতে এল চাঁদপুর ঘাট। শুনেছি নদী অনেক চওড়া এখানে। দুইকূল দেখা যায় না। এখানে পদ্মা আর ব্রহ্মপুত্রের সম্মিলিত ধারা এসে মিলেছে মেঘনার সংগে। কিন্তু রাত বলে বুঝতে পারলাম না। ইলিশের জন্য চাঁদপুর বিখ্যাত। একটা ঘাটই আছে যার নাম ইলিশ ঘাট।চারিদিকে বেশ হুড়োহুড়ি। ঘাটে লাগার পর, স্টীমার থেকে কাঠের পাটাতন লাগাতে হয় যাত্রী ওঠানামার জন্য। কিছু লোক সেটার অপেক্ষা না করে স্টীমারের বিশাল চাকার,
ঢাকা কভারের উপর দিয়ে লাফিয়ে নামল।
চাঁদপুরের মত নদীর আপস্ট্রীমে এ আরো একটা ঘাট পড়ে। নাম নিশ্চয়ই শুনে থাকবেন, গোয়ালন্দ ঘাট। দেশভাগের আগে কলকাতা থেকে ঢাকা যেতে গেলে, এখানে নেমে, স্টীমার ধরে যেতে হত নারায়নগন্জ। সেখান থেকে ঢাকা পর্যন্ত আবার ট্রেন। নারায়নগন্জ অবশ্য ঢাকা শহরের খুব কাছে। গোয়ালন্দে পদ্মার সংগে এসে মিশেছে ব্রহ্মপুত্র।
পদ্মা নদী ছেড়ে স্টিমার এসে পড়ল কীর্তনখোলা নদীতে। এই নদীর উপর ভোর পাঁচটাতে এল জীবনানন্দ আর চারণ কবি মুকুন্দ দাসের দক্ষিণবঙ্গের অন্যতম বড় শহর বরিশাল। শীতকাল, তখনো অন্ধকার। এখন আমাদের স্টিমার বিশখালী নদীতে। সকালে শান্ত নদীর জল দেখলাম কি পরিষ্কার। সাড়ে সাতটা নাগাদ স্টিমার নোঙর করল ঝালোকাঠিতে। শীতের সকালের কুয়াশাস্নাত দুই পাড়ের ঘন সবুজ গাছপালা আর ছোট্ট ছোট্ট ছবির মত গ্রাম দেখতে দেখতে চলছি। আমার কাজের জায়গা মংলার পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে পশুর নদী। আমাদের পশুর নদীর জল বেশ ঘোলা। নদীর পাড়ের গ্রামের ঘরবাড়ী, গাছপালা,
নদীতে বালির ট্রলার, দেখে মনে হল এইজন্যই বাংলাদেশের নাম হয়েছে নদীমাতৃক দেশ।
হেরিটেজ জার্নি শেষ হল। পরে নেটে দেখেছি, অনেকেই বেড়াতে এলে এই ট্রিপটা নেন।
দেবদত্ত
১০/১১/২১














Comments
Post a Comment