China’s dark secret

 


China’s dark secret:

শিনজিয়াং চায়নার উত্তর পশ্চিমের সীমান্তবর্তী রাজ্য। সাইজে প্রায় তিনটে ফ্রান্সের সমান হলেও এখানের জনসংখ্যা মেনল্যান্ড চায়নার থেকে কম, মাত্র ১১ মিলিয়ন। বেজিং থেকে দূরত্ব চারহাজার কিলোমিটার, অর্থাৎ কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারীর দূরত্বের থেকেও বেশী। সিনজিয়াং এর দক্ষিনদিকে টিবেট, আকসাই চিন, উত্তরে মঙ্গোলিয়া পশ্চিমে কাজাকস্তান, কিরগিজিস্তান তুর্কমেনিকস্তান মত সেন্ট্রাল এশিয়ার দেশসমূহ, যারা ১৯৯১ অব্দি কম্যুনিস্ট রাশিয়ার অধীনে ছিল। এউ প্রদেশেই কাশগড় শহর, যা প্রাচীন সিল্করুটের পশ্চিমপ্রান্তের গেটওয়ে ছিল। ২০১১ সালে চায়না রেভেলিইশনের সময় এই প্রদেশকে ইস্টার্ন তুর্কমেনিস্তান বলা হত। 

চায়নার পূর্বপ্রান্তে যারা থাকে, তারা মূলত হান ডাইনাস্টি থেকে উদ্ভুত।



শিনজিয়াং এর বাসিন্দাদের উগের (Uyghur) সম্প্রদায়ের। এরা আলতাই পর্বতমালার যাযাবর জাতি।

প্রায় সাড়ে ছয়শত বছর (১২১০-১৭৬০) মোঙ্গলদের অধীনে থাকার পর, চাইনিজ রাজত্বের অধীনে আসে, তারপর ১৯১০ সাল থেকে কমিউনিস্ট চায়নার আন্ডারে। 

কিছুকাল আগেও শিনজিয়াং স্টেটেউগের কমিউনিটির সঙ্গে কাজাক, উজবেক, টার্করাও অল্প পরিমানে ছিল। এরা সবাই মুসলিম ধর্মাবলম্বী এবং এদের কালচার, ফুড হ্যাবিট , ভাষা সবই সেন্ট্রাল এশিয়ার দেশগুলির জনজাতির মত। এদের ভাষা টার্কিক। 

উপরের উপক্রমনিকা দেওয়ার কারণ হল, চায়নার কমিউনিস্ট রেজিমে সেই দেশের অভ্যন্তরীন ঘটনাবলী বিদেশীদের কাছে ধোঁয়াশাবৃত। কমিউনিজমের জাঁতাকলে কিভাবে শিনজিয়াং স্টেটের উগের দের এথেনিক ক্লিনসিং করা হচ্ছে সেটা নিজে তো জানতামই না তো বটেই, এবং সাধারন ভারতীয়রাও বেশীরভাগের কোন ধারনা নেই। 

রাশিয়া যখন USSR ছিল, সেই কমিউনিস্ট শাসনকালে, সেন্ট্রাল এশিয়ার দেশগুলির এথেনিক রিলিজিয়াস আইডেনন্টিটিকে মান্যতা দেওয়া হয়েছিল, হয়ত ধর্মীয় ব্যাপারে পুরো স্বাধীনতা ছিল না। ১৯৯১ স্বাধীনতার পর , উজবেকিস্তানে পুরানো সভ্যতার স্মারকচিহ্নগুলিকে নূতন করে নির্মান করা হয়েছে। ১৯৪৯শে পিপলস রিপাবলিক অফ চায়না হওয়ার পরে মাও জেদুং এর কমিউনিস্ট সেন্ট্রাল লিডারশিপ কিছুটা রাশিয়ান কম্যুনিজমের ভাবধারায় চলত। ওই সময়ে সিনজিয়াং স্বায়ত্বশাসিত রাজ্য ছিল। কিন্তু (১৯৬৬-৭৬) মাও জেদুং এর কালচারাল রেভেলিউশনের সময় ধার্মিক স্থান, কালচারাল আইডেন্টিটির উপর আক্রমন চলে, ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশনের নাম করে লোকেদের মেশিনের মত ব্যাবহার শুরু হয়। এরপর দেং জিয়াও পিং এর আমলে, অবস্থার কিছু চেঞ্জ হয়, উল্লেখযোগ্য যে বর্তমান চায়নার ডিক্টেটর শেন জিয়াও পিং এর বাবা, কমিউনিস্ট পার্টির বড় নেতা ছিলেন এবং এথেনিক উগেরদের প্রতি সহানুভূতি সম্পন্ন ছিলেন। তখন ধর্মীয়, অনুষ্ঠান, নামাজ পড়া ইত্যাদিতে কড়াকড়ি ছিল না।

১৯৯১ রাশিয়ান ডিসইনট্রিগ্রেশনের সময় চায়নার সেন্ট্রাল লিডারশিপের মনে ভয় ঢোকে যে সেন্ট্রাল এশিয়ার দেশগুলি নিজেদের এথেনিক আইডেন্টিটি অনুযায়ী স্বাধীন দেশ (তুর্কমেনিস্তান, কাজাকস্তান, কিরগিজিস্তান, আফগানিস্তান, তাজিকস্তানহয়েছে, সেইরকমভাবে পৃথক উগেরস্তানের দাবী জোরাল হবে, কারণ শিনজিয়াং এর অধিবাসীরা রিলিজিয়াস কালচারাল ওয়েতে মূল চায়নার হান বংশীয়দের থেকে সেন্ট্রাল এশিয়ার জনজাতির অনেক কাছের। এছাড়া   চায়নার সেন্ট্রাল লিডারশিপের কাছে ইকনমিক কনসিডারেশনটাও একটা বড় কারণ ছিল। চায়নার ছয় ভাগের একভাগ জুড়ে এই বিস্তৃত ভূখন্ডের সঞ্চিত খনিজ তেল এবং এবং পৃথিবীর ২০% তুলোর চাষ হওয়া এই অঞ্চল, অর্থনৈতিক কারণে চায়নার অঙ্গীভূত নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা ছিল।

২০০৯ সালে কিছু এথেনিক ভায়োলেন্সের পর উগেরদের উপর চাইনিজ ক্র্যাকডাউন শুরু হয়। খুব সিক্রেটলি বহির্বিশ্বের চক্ষুর অন্তরালে এই এথেনিক ক্লিনসিং চলতে থাকে। এই ক্লিনসিং এর মূল উদ্দেশ্য ছিল শিনজিয়াং উগেরদের এথেনিক মাইনরিটিতে কনভার্ট করা। কমিউনিস্ট একনায়কতন্ত্র ২০১৩-১৪ থেকে এই সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টা চালাচ্ছে এবং হিউম্যান রাইটস ভায়োলেশন বলে বারবার UN বিভিন্ন দেশ প্রতিবাদ জানাচ্ছে।

কয়েকদিন আগে ইউটিউবে এক ইন্ডিয়ান ব্লগারের ভিডিও দেখছিলাম। সিনজিয়াংয় এর বিভিন্ন শহরের যেমন কাশগড়, আকশু, ওরেংকি ইত্যাদি শহরের ইনফ্রাস্ট্যাকচার যে কোন ওয়েস্টার্ন ওয়ার্ল্ডের উন্নত শহরকে হার মানাবে। তবে যেটা একটু অড লাগছিল সেটা হল, ট্র্যাফিক লাইটের পোস্ট থেকে ফুটপাথ, দোকান সবকিছুর সামনে অসংখ্য সিসিটিভি ক্যামেরা লাগান। আজকে ইউটিউবে DW একটা ডকুমেন্টরি দেখে ক্লিয়ার হল।


শহরের প্রতিটি লোকের এ্যক্টিভিটি মনিটর করা হচ্ছে। ফেস রেকগনিশন টেকনিক দিয়ে সন্দেহভাজন ব্যাক্তিদের চলাফেরা মনিটর করা হচ্ছে।

তো গেল বাইরের কর্মকান্ডের তত্বাবধান, ঘরের চারদেওয়ালের মাঝে কি ঘটছে সেটা কি করে বোঝা যাবে? বাচ্চাকে বাবা-মা উগের ট্রাডিশনাল পদ্ধতিতে আচার ব্যবহার শেখাচ্ছে না কমিউনিস্ট চায়নার আদর্শে শিক্ষিত করছে-কি ভাবে বোঝা যাবেতারজন্য মাসকয়েক পরপর হান বংশীয় লোকেরা উগের বাড়ীতে কয়েকদিনের আতিথ্য গ্রহণ করেন পারিবারিক ভাবধারা সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল হয়ে সরকারকে অবগত করেন। আরও ডার্ক সিক্রেট আছে। পার্টির নির্দেশ সম্বলিত এক পুস্তিকার গোপন কপি থেকে জানা যাচ্ছে গ্রামাঞ্চলে বা সাউথ সিনজিয়াংয় যেখানে উগের এখনও এথেনিক মেজরিটি, সেখানে লাখখানেক মেয়েকে স্টেরিলাইজেশন করতে হবে। লক্ষ হচ্ছে যাতে উগের পপুলেশন গ্রোথ রেট শূন্য থাকে। বিভিন্ন মাল্টিন্যাশানাল কোম্পানিতে চাকরীর নাম করে চাইনিজ রেড আর্মি উগের কমিউনিটির লোকেদের, বিশেষত তরুনী বিবাহযোগ্যা মেয়েদের হান অধ্যূষিত এলাকায় নিয়ে যাচ্ছে। এরফলে কোন একসময় এইসব মেয়েদের অনেকেই হান বংশীয় ছেলে বিয়ে করবে। তাদের সন্তানরা উগের কালচার ভুলে যাবে। সিল্করুটের উগের খাগানেট এর যেসব পুরানো সভ্যতার নিদর্শন ছিল, সে গুলোর অনেক কিছুই কালচারাল রেভেলিউশনের সময় গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, বাকীগুলোকে সাম্প্রতিক দশ পনের বছরে শহরের উন্নতির নাম করে (মস্ক, বারিয়াল প্লেস, মাদ্রাসা) ধ্বংস করে পার্ক, মার্কেট/অফিস কমপ্লেক্স বানান হয়েছে। 

২০১১-১৪ সালে কমিউনিস্ট জুন্টা উগের প্রভিন্সে অনেকটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসী বাহিনীর কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের  আদলে ১০ মিটার উঁচু পাঁচিল ওয়ালা ১০-১৫ হাজার লোক থাকতে পারে এরকম বিভিন্ন সাবার্বান এরিয়াতে ব্যারাক তৈরী করে সন্দেহভাজন কয়েক লক্ষ উগের কে আটক করে রাখে।


সিক্রেটলি তোলা ফটোতে টর্চার চেম্বারের ফটো দেখা গেল। ডান্ডার মধ্যে লোককে বেধে জমির সমান্তরাল ভাবে কয়েকফিট উঁচুতে ধীরে ধীরে ঘুরিয়ে ডান্ডা প্রয়োগের ছবিও দেখলাম। একজন ভুক্তভোগীর জবানবন্দীতে শুনলাম তাদের শীতের রাতে খালি আন্ডার গারমেন্ট পরিয়ে অথবা গ্রীষ্মে অবস্থায় বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখা হত। হাজার হাজার কয়েদী আন্ডারগারমেন্টে মাথায় হাত দিয়ে ব্যাপারে যাচ্ছে, সেই ভিডিও দেখলাম। এক মহিলার ইন্টারভিউ দেখলাম। তিনি হান বংশীয় হাজব্যান্ড উগের। তাকে নিয়ে গিয়ে কয়েদীদের চাইনিজ মান্দারিন শেখানো এবং হান আদবকায়দা শেখানোর ভার দেওয়া হয়েছিল। 

শিনজিয়াং প্রভিন্সে আগে কলকারখানা কম ছিল। উন্নতির নাম করে অনেক শিল্পের জন্য কারখানা খুলে মেনল্যান্ড চায়না থেকে লোক নিয়ে আসা হয়েছে। আজকের দিনে বেশীরভাগ শহরেই উগের পপুলেশন, (যারা অঞ্চলের অদিবাসী বলে ক্লেম করে) তারা আর সংখ্যাগরিষ্ঠ নয়। শহরগুলো কিছুটা ইজরায়েল এর গাজা স্ট্রিপের মত দুটো কমিউনিটি শহরের বিভিন্ন পকেটে আইসোলেটেড ওয়েতে থাকে।  সিস্টেমেটিক এথেনিক ক্লিনজিং এর পর নূতন প্রজন্ম নব্যধারায় দীক্ষিত হয়ে উগের অস্তিত্ব ভুলতে বসেছে, এরকমটাই ভিডিও ব্লগ দেখে মনে হল।

দেবদত্ত 

০৩/০৮/২৩

Comments

Popular posts from this blog

ত্রিবেনী তীর্থপথে ও আরো টিটবিট

রবিঠাকুর ও কিছু হাসি মশকরা

A walk to explore Delhi’s lesser known monuments