চল ছাই(য়া).. ছাই((য়া)…
ছাই
পন্ডিত মশাই এসেছিলেন গতকাল, একটি অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যে বৃদ্ধিশ্রাদ্ধ বা নান্দীমুখ বা অভ্যুদায়িক অনুষ্ঠান করাতে। উনার কাছে জানলাম “বৃদ্ধিশ্রাদ্ধ” কথাটার অর্থ। ধরুন জামাই আসবে বাড়ীতে, ফ্যামিলিতে একজন জুড়ল, মানে পরিবার বৃদ্ধি হল। এই উপলক্ষ্যে পিতৃপুরুষের পুজো করা নিয়ম। নূতন বাড়ী করলেও তাই কিংবা পরিবারে কাউর জন্ম হলেও “বৃদ্ধি” ঘটল। ভারতে অবশ্য বৃদ্ধির হার তুলনামূলক ভাবে বেশী, রবিঠাকুরের তেত্রিশ কোটি ভারতবাসী আজ একশ চল্লিশ কোটিতে পৌঁছে চীনকে পিছনে ফেলে দিয়েছে। জাগতিক এ্যসেটেও কিছু কম যাচ্ছি না আমরা। সোনা-দানা, বাড়ী-গাড়ীর চাহিদা তুঙ্গে। সংখ্যাতত্ব বলছে “ইন্ডিয়ানস লিভ পুওর, ডাই রিচ!” এসব তাত্বিক আলোচনা সরিয়ে আজকের বিষয়বস্তুতে আসা যাক। পুরুতমশাইএর কাছে খবর পাওয়া গেল, অনলাইন প্ল্যটফর্ম অ্যামাজনে নাকি “ছাই” বিক্রি হচ্ছে।
এটা মোটেই “দূর ছাই” করার মত ব্যাপার নয়। ছাই যে আজকের যুগে হেলাফেলার ব্যাপার নয়, তারই প্রমাণ পাওয়া গেল। কোন জাগতিক জিনিষের অভাব হল, সেই বস্তুটিকে বানিজ্যিক উপায়ে ক্রেতার কাছে তুলে ধরার। এটা অবশ্য কাঠের ও গোবরের ছাই।ছাইএর ইউটিলিটি বলতে মনে পড়ল, ছাই দিয়ে কাঁসার বাসন পরিষ্কার করার কথা। সাবানে কখনোই কাঁসার চাকচিক্য ফিরবে না, যতক্ষণ না ছাই দিয়ে মাজা হচ্ছে। এছাড়া আরেকটা কাজে বাড়ীতে ছাইএর উপযোগিতা দেখেছি। সেটা হল বঁটি দিয়ে জীওল মাছ কাটার সময় যাতে মাছ হাত থেকে পিছলে বেরিয়ে না যায়, তার জন্য হাতে ছাই মেখে নিতে হয়।
ছোটবেলায় বাড়ীতে কয়লার উনুন জ্বলত। বাড়ীতে মাসে একবার কয়লার ডিপো থেকে, ভারী বাঁকে করে এনে কয়লা দিয়ে যত। এইট-নাইনে পড়ার সময় থেকে নিজেই সাইকেলের ক্যারিয়ারে কুড়ি কিলো করে কয়লা এনে, বাবার কাছ থেকে হাতখরচ যোগাড় করতাম। রোজ বিকালে উনুন পরিষ্কার করে ছাইএর গাদায় ছাই ফেলা হত।
এর মধ্যেই খাওয়ার উচ্ছিষ্টও ফেলা হত। এর পোষাকী নাম হল আঁস্তাকুড়ে। কাকের অতি প্রিয় জায়গা। ফেভারিট ইটিং জয়েন্ট বলা যায়। মনে হয় ছাই এর গাদায় বেশী সময় কাটানোর জন্য কাকের কৃষ্ণবর্ন খোলতাই হয়ে পালকের জায়গাটা ছাইবর্ণ হয়েছে!
সত্তর-আশির দশকে সিগারেটের স্বর্ণযুগ, বিশেষত ওয়েস্ট বেঙ্গলে। সিগারেটে সুখটান দিয়ে, ছাইটাকে চুটকি দিয়ে ঝাড়া একটা বিশেষ আর্ট ছিল। বাসে-ট্রামে সন্তর্পনে ছাই ঝাড়তে হত সিগারেট থেকে। তখনও পাবলিক প্লেসে সিগারেট খাওয়া ব্যান হয় নি। মধ্যবিত্ত বাড়ীতে ড্রইংরুমের টেবিলে অবধারিতভাবে একটা এ্যসট্রে রাখা থাকত।
বিবেকানন্দ, ছোটবেলায় যার নাম ছিল বিলে, খুব দুরন্ত ছিলেন, সময় পেলেই আঁস্তাকুড়েতে বসে থাকতেন। মা শিব-শিব করে ডাক দিলে শান্ত হয়ে বেরিয়ে আসতেন। আর আমাদের পুরাণে তো আছেই শিব ঠাকুর সারা গায়ে ছাই-ভষ্ম মেখে বসে থাকেন। বুদ্ধদেবের জ্ঞানলাভ যদি বোধিবৃক্ষের তলায় বসে হয়ে থাকে, তবে বিলের থেকে বিবেকানন্দের ভক্তিমার্গে উন্নীত হতে- ভারতমাতার তাৎপর্য উপলব্ধিতে আঁস্তাকুড়ের বিশেষ যোগদান আছে বলেই মনে হয়। জানি না এই নিয়ে বিবেকানন্দ জীবনীকাররা গবেষণা করেছেন কিনা!
হরিদ্বারে দেখেছি কিছু সাধু ছাই মেখে বসে থাকেন। ধর্মীয় উচ্চমার্গের সন্ধান কতটা প্রশস্ত হয় জানা নেই, তবে ইনাদের ভিক্ষার ঝুলি বাকী সাধুদের তুলনায় ভারী হয়!
আমাদের নিজেদের জীবনে ছাইয়ের এক বিশেষ তাৎপর্য আছে। অবশ্য ইহলৌকিক নয়, নিজে চাক্ষুষ করার সুযোগ নেই। আত্মা এই জীর্ন শরীর ছেড়ে যাবার পর, পার্থিব জগতে রয়ে যাবে একমুঠো ছাই। সেই ছাই গঙ্গায় বিসর্জন দিয়ে আপনার অক্ষয় স্বর্গবাসের পথ প্রশস্ত করা হবে।
যে কোন জিনিষের আধিক্য আবার চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। পূর্ণিমা-অমাবস্যার মত “ছাই” জিনিষটা কখনও “বাড়ন্ত” আবার কখনো পাহাড়প্রমাণ বোঝা। “ছাই” এর ঠ্যালা চাকরীজীবনে ভালই সামলাতে হয়েছে। হ্যাঁ… বেশ ভাল সময় ধরেই একে ধরে রেখেছি, “দূরছাই” বলে সরিয়ে রাখা যায় নি। কারণ ছাই ম্যানেজমেন্ট ছিল আমার কাজ। ব্যাপারটা খোলসা করা যাক। তাপ-বিদ্যুৎ কেন্দ্রে কয়লা হল গিয়ে মেন জ্বালানী। এই কয়লাকে বয়লারে জ্বালিয়ে জল গরম করে স্টীম বানিয়ে টারবাইন ঘোরান হয়। বেশী টেকন্যিকাল করে ফেললে পাঠকের ধৈর্যচ্যুতি ঘটার সম্ভাবনা। যাই হোক কয়লা জ্বালালে শেষে পড়ে থাকে ছাই, “উনুন টেকনোলজি” ধরে নিন! ভারতীয় কয়লাতে আবার কম-বেশী চল্লিশ ভাগ ছাই। এই পাহাড় প্রমাণ ছাইকে সংগ্রহ করা হয় এক বিশাল যন্ত্রের মাধ্যমে, যার পোশাকী নাম “ইলেক্ট্রোস্টাটিক প্রেসিপিটেটর”।
বার হাত কাকুড়ের, তের হাত বিচী” র মত টারবাইন কি বয়লারের তুলনায় তার বিশালাকৃতি। এই পাহাড়প্রমাণ ছাই কে ডিসপোজ করা এক কঠিন কাজ। ছাইকে জল মিশিয়ে পাওয়ার প্ল্যান্টের বাইরে “এ্যশ পন্ডে” ডাম্প করা হত। ক্রমে এমন দাঁড়াল যে ছাই ফেলার জায়গার অভাবে বিদ্যুৎ কেন্দ্র লাটে ওঠার জোগাড়। “ছাই ফেলতে ভাঙা কুলো” বলে একটা প্রবাদ আছে। মানে দাঁড়ায় ছাই এর মত সমান্য মূল্যহীন জিনিষকে হেলাফেলায় বিদায় করা যায়। তবে বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ছাই ফেলা নিয়ে নাভিশ্বাস ওঠার যোগাড়!
প্রথম সাইট পোস্টিং ছিল দিল্লীর বদরপুরে। সালটা ১৯৯২। তখন ধারণাটা এরকম ছিল যে চিমনী দিয়ে বেশী ধূঁয়া বার হওয়া মানে ভালমত বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে।
পরিবেশদূষণ নিয়ে কারো মাথা ব্যাথা ছিল না। প্ল্যান্টে ডিউটিতে আসার সময় দূর থেকে চিমনির ধূঁয়া দেখে বুঝতাম কটা ইউনিট চলছে। অফিসে পৌঁছে প্রথম কাজ ছিল ঝাড়ন দিয়ে চেয়ার-টেবিল পরিষ্কার করা। বিদ্যুতকেন্দ্রের কয়লার ছাই আবার পাউডারের মত গুঁড়ো।
টেবিল থেকে ছাই-গুঁড়ো সরাতে সরাতে ভাবতাম কি কুক্ষণে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়েছিলাম! আমরা যারা ইএসপি (ইলেকট্রোস্ট্যাটিক প্রেসিপিটেটরে) কাজ করতাম, তাদের জন্য মাসে এক কিলো করে গুড় বরাদ্দ ছিল। কোম্পানি ভালবেসে মিষ্টির বদলে গুড় দিচ্ছে ( কিছুটা নাকের বদলে নরুণ) তেমন কিছু নয়। এটা স্বাস্থ্যবিধি নির্দেশিকা অনুযায়ী সাইটে যাওয়া আগে একটু খেয়ে নিতে হয়। তাহালে শ্বাসনালীতে একটা লেয়ার পড়ে। তারজন্য নিঃশ্বাসের সঙ্গে ইনহেল করা সূক্ষ ছাইগুড়ো লাংসে ঢোকা থেকে ব্যহত হয়। আমি অবশ্য সেই গুড় কোনদিন খাই নি। বাড়ীর কাজের লোককে দিয়ে দিতাম। শীতকালে তো আমার বাসস্থান সি আর পার্কের ব্যালকনি প্ল্যান্ট থেকে নয় কিমি) ঝাড়ু দিলে একমুঠো ছাই জড়ো হত। বদরপুরের প্ল্যান্ট বছর ছয়/সাত হল বন্ধ হয়ে দিয়েছে পরিবেশ দূষণের কারণে। এখন কৃতকর্মের পাপক্ষয়ের জন্য সেখানে বিশাল পার্ক তৈরী হচ্ছে!
আশির দশকে আমাদের দাদরী (দিল্লির কাছে ওয়েস্টার্ন ইউপিতে) পাওয়ার স্টেশনে ভারতে প্রথম, ছাইকে জল না মিশিয়ে, শুকনো অবস্থায় ট্রান্সপোর্ট করে প্ল্যান্টের কাছেই এক “এ্যশ-মাউন্ড” বানানো হল। ছাই ফেলতে ফেলতে আর ছাই-গাদা রইল না, ছোট-খাট পাহাড় হয়ে গেল। এরপর গাছ-টাছ লাগিয়ে ফার্স্টক্লাস জঙ্গল তৈরী হয়ে গেল।
দিল্লির হেড অফিসে ফরেন ডিগনিটরি বা কোন ভিআইপি এলে, তাদেরকে দাদরীর “এ্যশ-মাউন্ড দেখানো অবশ্য কর্তব্য ছিল। সেই “ছাইগাদায়” আমরা পিকনিকও করেছি।
ক্রমশ ছাই এর আধিক্যের টেনশনে “এ্যশ ম্যানেজমেন্ট গ্রুপ” তৈরী হল। এদের মূলমন্ত্র হল “হান্ড্রেড পারসেন্ট এ্যশ ইউটিলাইজেশন।” সিমেন্ট তৈরীতে ছাই লাগে। প্রথমদিকে ফ্রীতে দেওয়া হত। বিনি পয়সার জিনিষ হেলাফেলার বস্তু হয়। আজকাল ছাই বিক্রি করে পাওয়ার স্টেশন টু-পাইস কামাচ্ছে। বাংলাদেশে পোস্টিং এ সময় মংলাতে থাকতাম। পাশেই পশুর নদী। তারই ধারে সারি দিয়ে সিমেন্ট প্ল্যান্ট ছিল।
বাংলাদেশে কয়লাখনি নেই বললেই চলে। ছাই আসত পশ্চিমবঙ্গের বজবজ ও ফরাক্কা তাপবিদ্যুত কেন্দ্র থেকে। কিছু আসত জলপথে, কিছু আসত ট্রাকে বস্তায় করে। এই বস্তা আবার বেনাপোল বর্ডারে ইন্ডিয়ান ট্রাক থেকে বাংলাদেশী ট্রাকে ট্রান্সফার করা হত কুলী দিয়ে। ছাই এর মত তুচ্ছ জিনিষের ভিআইপি ট্রিটমেন্ট। সেই ছাই ২০১৪ সালে ৩০০০/- বাংলাদেশী টাকা, প্রতি টন বিক্রি হত।
“যেখানে দেখিবে ছাই, উড়াইয়া দেখ তাই, পাইলেও পাইতে পার অমূল্যরতন”, এই প্রবাদবাক্যের কিঞ্চিত প্রমাণ, এই অধম হাতে নাতে পেয়েছে। বদরপুরে থাকতে পাশেই ছিল “পাওয়ার ইঞ্জিনিয়ার্স ট্রেনিং সোসাইটি।” সেখানে মাঝে মাঝে “ছাই” সম্পর্কিত লেকচার দিয়ে টু-পাইস অনারিয়াম পাওয়া যেত। বাংলাদেশে পোস্টিংএর প্রথমদিকে কাজ ছিল মাটি ফেলে জলাভূমি ভরানো। প্ল্যান্ট চালু হলে সব ছাই আশেপাশের সিমেন্ট প্ল্যান্টে দেওয়া যাবে, তাদের কত ছাই লাগবে, ইত্যাদি টপিক কভার করে বাংলাদেশের ম্যাগাজিনে ছাপিয়ে পরিচিতি লাভ করা গেল। প্রস্তাবিত বিদ্যুতকেন্দ্রের কাছেই সুন্দরবন শুরু। পরিবেশবাদীদের আন্দোলন শুরু হয়ে গেল যে চিমনি থেকে ছাই বেরিয়ে সুন্দরবন ধ্বংস হয়ে যাবে। প্রায়ই পরিবেশবাদী এবং পত্রকাররা ভীড় জমাতেন আমার কাছে ছাইএর কবল থেকে কি করে সুন্দরবন বাঁচানো যায়। তাদেরকে বলতাম সব ছাই আমরা সিমেন্ট প্ল্যান্টে পাঠিয়ে দেব। পরিবেশ রক্ষায় শুরু থেকেই আটোসাটো ব্যাবস্থা। এক পরিবেশরক্ষা সংক্রান্ত কোম্পানিকে দায়িত্ব দেওয়া হল (বিদ্যুত কেন্দ্র আসতে তখনও পাঁচ-ছয় বছর লাগবে) প্রতি তিনমাসে সুন্দরবনের প্রত্যন্ত জায়গায় বিভিন্ন গাছের গুঁড়ির পরিধি, পাতার মাপ নেওয়া, প্রস্তাবিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে ৩০ কিমি দূরে রূপসা নদীর উপর খানজাহান আলী ব্রীজে নয়েজ লেভেল মেজার করা, ফাঁকা সদ্য জমি ভরাট করা সাইটে এয়ার কোয়ালিটির পরিমাপ, ইত্যাদি কাজের মাধ্যমে। জমনামসে এমনটাই ধারণা হল যে আমরা পরিবেশরক্ষায় অত্যন্ত সচেতন!
দেবদত্ত
১৬/১০/২৩











Comments
Post a Comment