মশা


মশা

মশা নিয়ে সমান্য দু-চার কথা লিখছি। বঙ্গসন্তানদের সঙ্গে মশার সম্পর্ক আদি-অনন্ত কালের। কবির লেখাতেই পাওয়া গেছেহাঁচি-কাশি, মশা-মাছি/ এই নিয়ে বেঁচে আছি!” মশার ভবলীলা চটপোঘাতে সহজেই সাঙ্গ হয়, তবে মাছির ব্যাপরটাকানামাছি ভোঁ ভোঁ”- যতবারই হাত চালানো যায়, কানের পাশ দিয়ে বেরিয়ে যায়। তবে যে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কেরাণী তৈরী করেছিল, তারা মাছি দমনে পোক্ত ছিল।মাছি মারা কেরাণী”, সব কেরাণী দের কেরামতির ফল!

তবে মশা নিয়ে কিন্তু মশকরা চলবে না ওরা ভীষণ সিরিয়াস সব ব‍্যাপারে। দেবতারা যেমন যত্রতত্র বিরাজমান, মশাও তেমনি। ইংরেজদের বহু আগে থেকে মশা এদেশে রাজ করছে।ইংরেজদের মতই ওরা শোষক আমরা শাসিত। আজকাল যে রেটে সরকার ভক্তিমার্গের পথ দেখাচ্ছেন তাতে, সর্পদংশন থেকে বাঁচতে যেমন মনসা পুজো, তেমনি ডেঙ্গি পূজো শুরু হবে।


মশা মারতে কামান দাগাবলে একটা কথা আছে।  আজকাল মাঝে মাঝেই মশা নিধন যজ্ঞে সোসাইটিতে পৌরসভার গাড়ী ঢুকে পড়ে। গাড়ীর পিছন দিকে কামান সাইজের একটা নল থেকে মশক বিনাশে সাদা ধূয়া বেরোয়।


এই মশকদমনের পদ্ধতির নামফগিং সাদা ধূয়া মনে হয় যেন পুলিশের কাঁদানে গ্যাস। ছোট্টবেলায় ঘর থেকে মশা তাড়াতে ফ্লিট বলে একটা স্প্রে ব্যাবহার করতাম। প্রথম যখন দিল্লি আসি তখন গ্রীষ্মকালে সি আর পার্কের বাড়ীর ছাদে শুতাম। মশার কামড়ে ঘুমে ডিসটার্বেন্স হত। খাটিয়াতে মশারী টাঙাবার উপায় ছিল না। প্রথম দুই-একদিন খাটে ফ্লিট স্প্রে করে দেখি সুবিধা হচ্ছে না।

মাঝরাতে মশার কামড়ে ঘুম ভেঙে যাচ্ছে। ভেবে চিন্তে বুদ্ধি বার করলাম। ফ্লিট-টা নিজের হাতে পায়ে স্প্রে করে শুয় পড়লাম। নিশ্চিন্ত। কোয়ান্টিটিও কম লাগল, রাতে ঘুমটাও বেশ ভাল হল। খালি একটাই প্রবলেম হল। অফিসে গিয়ে সরল মনে নিজের নবলব্ধ নলেজ ব্যাক্ত করলাম। এই  জ্ঞানপ্রাপ্তি, সজ্ঞানে, অজ্ঞান পাবলিককে বিতরন করে বাহবা তো পেলাম না, উপরন্তু অফিসে বস এবং তার বসও জেনে গেল। বেশ হাসাহাসিও হল। তবে আমি অবিচল। মশা নিধনে এরকম মস্করা আশা করি নি। যাক কি আর করা যাবে। 

আজকাল পাড়ার পার্কে হাঁটতে যাই। মাঝে একবার বেঞ্চে বসে হোয়াটস্ এ্যপস চেক করি। পার্কে অনেক মশা।


কি অজ্ঞাত কারণে জানি না মশা-রা আমাকে কামড়ায় না। সুমিতা থাকলে, আমার সঙ্গে দুই-একবার বসার চেষ্টা করেছে। মশা ওকে ছেকে ধরে। হাফপ্যান্ট পরিহিত আমার কাছে ঘুরঘুর করে, তবে কোন অজ্ঞাত কারণে কামড়ায় না। কামড়ালেও খুব একটা ফিলিং হয় না। বলে তোমারকোর্স-টাংএর মত কোর্স স্কিন। কোর্স-টাং মানে তীক্ষ্ণ বাক্যবাণ নয়, রসনাতে রসকষহীন। যা পাই তাই খাই। সবই ভাল লাগে। উদাহরণস্বরূপ লক্ষৌ বিরিয়ানি কি হায়দ্রাবাদ বিরিয়ানির ভিন্ন স্বাদ বুঝতে আমি অক্ষম। মাংসের পিসটা কতবড় সেটাই আমার প্রধান বিবেচ্য থাকে। গানে গর্ধভ রাগিনী কি পিলু-খাম্বাজ, সবই এক লাগে। আজকাল দেশে নূতন শ্লোগানওয়ান নেশন -ওয়ান আর্থএর মত সবই এক। সুমিতা আবার মশার ব্যাপারে আলট্রা সেন্সেটিভ। দুর্গাপুজার ফাংশন দেখতে যাওয়ার সময় পার্সে ওডোমস নিয়ে যায়। 

মশার ব্যাপারে জ্ঞানলাভ করতে গিয়ে জানলাম, ফিমেল মশারাই মানুষের রক্ত চোষে।মেল মশা একদিন বাঁচে আর মেয়ে মশা সাত-আটদিন। মানুষের রক্ত অমৃতস্বরূপ এটাই বোঝা গেল। প্রগতিশীল নারীরা স্ত্রী মশার রমরমা দেখে ভবিষ্যৎ নারীমুক্তির পক্ষে জোরালো সওয়াল করতে পারেন!

ছোটবেলায় বেহালা আর দমদম ছিল মশার জন্য বিখ্যাত। দাদুর বাড়ী ছিল বেহালাতে। সন্ধ্যে বেলা থেকে মশক বাহিনীর উৎপাতে মশারী খাটিয়ে ঢুকে পড়তে হত। খাটে ওঠার সময় খুব ক্ষিপ্রতায় উঠতে হত। প্রায়ই দুই একটা মশা ফাঁক-ফোকর গলে ঢুকে পড়ত, এবং মশারীর দুরূহ কোণে স্থান নিত চটেপাঘাত থেকে বাঁচতে। এটা যদি লাইট নিবিয়ে শোয়ার সময় হত তবে শব্দভেদী বানের মত পিন-পিন আওয়াজের শব্দে মশা নিধন যজ্ঞ চলত। ছোটপিসি আর আমার মধ্যে কম্পিটিশন চলত সন্ধ্যের পর থেকে, কে কটা মশা মারতে পারে। কখনো কখনো সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে ফেলতাম। 

মশার কামড়ে আজকাল ডেঙ্গু বা ডেঙ্গি হচ্ছে। ছোটবেলায় স্বাস্থ্য বইতে পড়েছিলাম ডেঙ্গু রোগটা নির্মূল হয়ে গিয়েছে। কালচক্রে আবার ডেঙ্গি নামে ফিরে এসেছে। স্ত্রীলিঙ্গ হয়ে যাওয়ার পর আরো ডেডলি রূপ! বাঁশ নিয়েও জনসাধারণ ভীত থাকেন। কথাতেই আছে-“অমুকজন তমুককে বাঁশ দিয়েছে!” মশা আর বাঁশের কম্বিনেশন যে আরো মারাত্মক, সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। সম্প্রতি বাংলা পেপারের কল্যাণে জানলাম কলকাতা পৌরসভাদুর্গাপুজোর কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন, প্যান্ডেলের ডগায় বাঁশের মধ্যে জল জমে যাতে মশার বৃদ্ধি না হয়, তাই বাঁশের ডগায়  বালি ভরে দিতে হবে। পৌরসভার কর্তারা বাঁশের ডগায় উঠে কি ভাবে চেক করবেন যে বালি ভরা হয়েছে কিনা, সে ব্যাপারে খোলসা করা হয় নি। মনে হচ্ছে নিজেরাই নিজেদের বাঁশের বন্দোবস্তে করেছেন। 

মশা থেকে বাঁচার উপায় হল মশারী। সন্ধি-বিচ্ছেদ করলে দাঁড়ায় মশা+অরি। অরি মানে হল শত্রু। তার মানে মশারী হল গিয়ে মশার শত্রু।


তবে এর প্রবলেম হল, জালের মধ্যে দিয়ে হাওয়া কম ঢোকে। সেটা এক সমস্যা। এরপর এল নাইলনের নেটের মশারী। এর জালিগুলো অপেক্ষাকৃত বড়। তাই হাওয়া ভালই ঢোকে। কিন্তু মশারীর বড় সমস্যা হল রাতে সেটাকে খাটানো। কে টাঙাবে সেই নিয়ে গৃহযুদ্ধ হয়ে থাকে। আগেকার সময় খাটের চারকোনে ডান্ডা থাকত, উপর দিয়ে লম্বা চৌকো কাঠের ডান্ডা দিয়ে জোড়া। ডান্ডাগুলো আলনার কাজেও ব্যাবহৃত হত। চারকোনে মশারীর খুঁট গুজে দিলে মশারী খাটানো হত। এটা হল প্রথম স্টেপ। পরের স্টেপ হল মশারী গোঁজা। তিনটে দিক তোষকের তলায় গুজে দিয়ে একটা দিক ফাঁকা রাখতে হত, যাতে খাটে উঠতে সুবিধা হয়। বেশ বোরিং জব। তবে সাম্প্রতিক কালে ম্যাজিক মশারী এসে গিয়েছে। তবে এতে  ম্যাজিকের কিছু নেই। কষ্ট করে টাঙাতে হবে না।  ফোল্ড করা যায়।

ইগলুতে যেমন ঘরে ঢোকার দরজা হয়, তেমনি ফোল্ডিং মশারীতেও সেটা থাকে। চেন একটু খুলে খাটে উঠে আবার চেন বন্ধ করে দিন। তোষকের তলায় গুঁজবার কোন দরকার নেই। আজকাল নাকি হটকেকের মত বিক্রি হচ্ছে, বিশেষত ডেঙ্গুর সীজনে।

টিভিতে বিজ্ঞাপন দেখিএগিয়ে থাকে, এগিয়ে রাখে বেঙ্গল অনেককিছুতে পিছিয়ে পড়লেও, “দেওয়াল লিখনটাবামফ্রন্ট অমল থেকেশিল্পএর পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছে। এখন অবশ্য পট-পরিবর্তনে চপশিল্পের কথা শোনা যাচ্ছে। নিউ ব্যারাকপুর পৌরসভা ডেঙ্গু ( নাকি ডেঙ্গি) প্রতিরোধে জনগনকে সচেতন করতে দেওয়ালে নানারকম কার্টুন আঁকা শুরু করেছেন। 



তবে সবাই যে মশারঅরিতেমনটা কিন্তু নয়। সেরকমই একটা ঘটনা ফেসবুক থেকে জানা গেল। ঢাকার জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে মশা মারার প্রতিবাদে এক সভার আয়োজন করা হয়েছে।


হল গিয়েমেরেছি কলসীর কানা তাই বলে কি প্রেম দেব না।হোস্টেলে মশার কামড় থেকে বাঁচতে দিনের বেলা মশারী টাঙিয়ে ঘুমাতে হয়। উদ্যোক্তাদের বক্তব্য মশার কামড়ের সিলভার লাইনিং হল, তাদের কামড়ে ছাত্রদের পড়াশুনার টাইম বাড়ে। অযথা ঘুমে ঢুলে পড়লে মশক দংশনে নিদ্রাহরণ হয়। উদ্যোক্তারা মশা নিধন রোধে একটা মশারি মিছিল নিয়ে রেজিস্ট্রারের অফিসে ধর্না দেন। মশারীর চার মাথা ধরে ছিল চারজন, অনেকটা শবের খাটিয়া নেওয়ার মত করে। মিছিল শেষেমশাকে বাঁচতে দিনশীর্ষক সেমিনারের আয়োজন হয়েছিল। সর্বশেষ মশাবান্ধব কয়েল প্রদর্শনী, মশাকে নিয়ে গান কবিতা আবৃত্তির মাধ্যমে মেলার সমাপ্তি হয়।

দেবদত্ত 

০৮/১০/২৩

Comments

  1. বেশ লাগলো। কোথায় যেন পড়েছিলাম কোন এক বিশেষ blood group এর মানুষদের মশা বেশি কামড়ায়

    ReplyDelete
  2. ভালোই লিখেছো মশার গপ্প..👍

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

ত্রিবেনী তীর্থপথে ও আরো টিটবিট

রবিঠাকুর ও কিছু হাসি মশকরা

A walk to explore Delhi’s lesser known monuments