হোস্টেলের কথা
১৯৮০ সালে তোলা
হোস্টেলের কথা
সালটা ৭৭। ধরতে গেলে সময়টা পয়তাল্লিশ বছরেরও বেশী। কত যে মজার মজার ঘটনা জড়িয়ে আছে হোস্টেল লাইফের। এতদিন পরে ছোট ছোট অনেক ঘটনাই ভুলে গিয়েছি। তবে কিছু বেশ মজার ঘটনা এখনও স্মৃতিতে উ্জ্জ্বল।তখন হোস্টেলে চট করে জায়গা পাওয়াটা দুস্কর ছিল। থাকি কাকার বাড়ী বেহালাতে।ক্লাস করে ফেরার পথে যাদবপুর থানায় নেমে হোস্টেল সুপার জি কে বি র কাছে খবর নিই, সিট কবে খালি হবে। কয়েকমাস ধৈর্য ধরার পর সীট পেলাম ডি ব্লকের ২০ নম্বর রুম। ৪ সিটার রুম।
(ডি২০ র তিন রুমমেট তাপস, পার্থ, আমি মাঝে, হোস্টেলের গেটের সামনে)সবার জন্য একটা করে খাট, চেয়ার-টেবিল আর একটা আলমারী। দেখি আমার আলমারির হাতল ভাঙা। আমার রুমমেট মান্নাদা, মেদিনীপুরের ছেলে, ইলেকট্রনিক্স পড়ে। আমার বাড়ীও ঝাড়গ্রাম, একই জেলা তাই বেশ ভাব হয়ে গেল। থানার উল্টোদিকে প্রকাশের দোকান, ফুটপাথেই ইটের উপর কাঠের পাটাতন পেতে বসার ব্যবস্থা। আমাদের সময়ে যাদবপুর থানার মোড়টা ছিল টি জয়েন্ট, বাইপাস যাওয়ার রাস্তা তখনও ছিল না। প্রকাশের দোকানে ব্রেড-অমলেট সবচেয়ে বেশী চলে। প্রায়ই মান্নাদা নিয়ে যায়, আর বেশীরভাগ সময়ই স্বতপ্রবৃত্ব হয়ে আমার পয়সাটাও দিয়ে দেয়।
(সেই আমি! 😀)আমদের দু এক ব্যাচ আগের দাদা রা ক্যালকুলেশন করত স্লাইড রুল দিয়ে। আমাদের সময় সদ্য ক্যালকুলেটর এসেছে। জাপানি মাল। তখন মনে আছে ক্যাসিয়ো কোম্পানির ক্যালকুলেটার এফ এক্স ২৯ মডেল, দাম ছিল ৪৩০/-। তখন হোস্টেলে সারামাসে খরচা ছিল ১২০/-। সুতরাং সেই অনুপাতে ক্যালকুলেটর বেশ মহার্ঘ বস্তু। বন্ধুদের কাছে খবর পেলাম, ওটা কোন দোকানে পাওয়া যায় না, লালবাজারের পিছনে চোরাবাজারে বিক্রি হয়। লোক নিয়ে দাড়িয়ে থাকে, চুপিচুপি টাকা দিয়ে কাজ সারতে হবে। কারন এসব চোরাচালানের জিনিষ কেনা দন্ডনীয় অপরাধ। ভাবুন খোদ কলকাতা পুলিসের হেড কোয়ার্টার লালবাজারের পিছনেই রমরমিয়ে অবৈধ কারবার। একেই বলে প্রদীপের তলায় অন্ধকার।বাড়ী থেকে টাকা নিয়ে এলাম ক্যালকুলেটার কিনব বলে। আমার আলমারিটা তো ভাঙা, তাই টাকাটা মান্নাদার আলমারীতে রাখলাম। মান্নাদা আবার আমাকে একটা চাবিও দিয়ে দিল, যাতে মান্নাদা না থাকলেও আমার অসুবিধা না হয়। কয়েকদিন পরে এক ক্লাসের বন্ধুকে ফিট করলাম আমার সংগে যাওয়ার জন্য। কিন্তু টাকা নিতে এসে দেখি সেটা নেই। মান্নাদা ফিরে এলে জিজ্ঞাসা করলাম টাকা কোথায় গেল। খুব ক্যাজুয়াল উত্তর পেলাম, আরে তোমার টাকাটা দিয়ে ফিস দিলাম, বাড়ী থেকে ফিরে দিয়ে দেব। মান্নাদার বাড়ী যাওয়া আসা বেশ কয়েকবার হয়ে গেল, কিন্তু প্রতিবার শুনি সামনের বার দিয়ে দেব। অন্য সময় খুব অমায়িক, বেশ হাসিঠাট্টা চলছে। বেশ কিছুদিন গেল, বুঝলাম মান্নাদার কাছথেকে টাকা পাওয়া যাবে না। কি আর করি। তখন আমার হাতঘড়ি ছিল না । মান্নাদার ঘড়িটা একদিন টেবিল থেকে তুলে নিয় পরলাম আর মান্নাদাকে জানালাম আজ থেকে ঘড়িটা আমার, যদি কখনো টাকা ফেরত দাও তবে পাবে। কিছুটা শান্তি হল। নাকের বদলে নরুন তো পাওয়া গেল।
(আমি হোস্টেলের ছাদে)ক্যালকুল্টারের বদলে ঘড়ি।
এরপরে যার কথা মনে পড়ছে, সে হল অমিতদা। হোস্টেলে, আমাদের ব্লকে থাকত অমিতদা। জিয়োলজী পড়ত। অমিতদার নাম হয়ে গিয়েছিল টুপি। দারুন মিস্টি করে ডাকত- এই যে ভাই দেবদত্ত, কেমন আছ? কয়েকটা ঘটনা বলি। অমিতদা এক সকালে রুমে এসে বল্ল- ‘ভাইটি, বাইরে না এক মহিলা এসেছে বাচ্চাসহ, খুবই দুর্দশাগ্রস্থ,সদ্য বাংলাদেশ থেকে এসেছে, সাহায্য করতে হবে, একটা টাকা দাও। আরো সব রুম থেকেও নিচ্ছি।’ দিলাম একটাকা। পরে শুনলাম পুরোটাই ঢপ।একবার দেখি মেন হোস্টেলের সামনে অমিতদা ট্যাক্সি থেকে নামছে। তখনকার দিনে ট্যাক্সি করে আসা মানে, অনেক মালপত্র সহকারে স্টেশন থেকে আসছে ধরে নেওয়া যেত। অমিতদার হাত খালি। জিজ্ঞাসা করতে বল্ল - ভাইটি, এই একটু চুল ছেঁটে এলাম। এবার আমার অবাক হওয়ার পালা। পরে জানা গেল, অমিতদা সেই মাসের মেস ম্যানেজার!
একদিন সকালে কুন্জদার ক্যানটিনে বসে ব্রেকফাস্ট করছি, অমিতদা পাশে এসে বসল। বলল, মজা দ্যাখ, আজকে খেয়ে কুন্জকে পয়সা দেব না। নিয়ম ছিল, আমরা খেয়ে নিয়ে কুন্জদার কাছে গিয়ে বলতাম, এই এই খেয়েছি। কুন্জদা হিসাব করে পয়সা নিত। আমি আর অমিতদা খেয়েদেয়ে গেলাম কুন্জদার কাছে আমি পয়সা দিয়ে দাঁড়িয়ে আছি দেখার জন্য, অমিতদা কি করে।কুন্জদা খাওয়ার লিস্ট শুনে বল্ল ‘এত হয়েছে। অমিতদা মিস্টি গলায় বল্ল- কুন্জদা, পরশু খেয়ে তোমায় পাঁচ টাকা দিয়েছিলাম, খুচরা ছিল না বলে সেদিন তুমি দাও নি। আজকের টাকাটা ওটা থেকে বাদ দিলে, তিরিশ পয়সা আমি পাব। কুন্জদা কি আর করে, একটু মাথা চুলকে, ফেরত দিল তিরিশ পয়সা। অমিতদা বেরিয়ে এসে আমাকে বল্ল- ‘ চল ভাইটি, এইটা দিয়ে সিগারেট খেয়ে আসি।মাঝে শুনলাম, অমিতদা সামনের পুলিশ কোয়ার্টারের কোন মেয়ের সঙ্গে প্রেম করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে, তাকে ইমপ্রেস করার জন্য বলেছে-‘আমি জিওলজিকাল ইন্জিনিয়ারিং পড়ি।”
৭৯ সালের কথা। আমাদের পরের ব্যাচের ছেলেরা সদ্য হোস্টেলে এসেছে। আমাদের ফ্লোরেই থাকত তরুণদা। বেঁটেখাটো যুবক, সবসময় শীত কি গ্রীষ্মে কালো হাফপ্যান্ট ওর ট্রেডমার্ক ছিল। তরুণদা ছিল যাত্রা পালাকার ব্রজেন দের ছেলে। যিনি কিনা তখনকার দিনের সব নামকরা যাত্রা, নটী বিনোদিনী, আমি লেনিন বলছি, হিটলার- এই সবের মত বই লিখে বিখ্যাত ছিলেন। তবে তরুণদার খ্যাতি ছিল অন্যকারণে। ভেন্ট্রিকুলজিম বলে একরকম বিদ্যা আছে, যেটাতে কেউ কথা বল্লে মনে হবে, দূর থেকে কথা ভেসে আসছে। তরুণদার এই বিদ্যাটা ছিল,তার উপর গলা দিয়ে রকমারী আওয়াজও বার করত, তার মধ্যে একটা ছিল রামকৃষ্ণের ফ্যাশফেসে গলার আওয়াজ। রামকৃষ্ণদেবের গলায় ক্যান্সার হওয়ার পর উনার গলার আওয়াজটা খসখসে হয়ে গিয়েছিল। আমাদের ডি ব্লকের নূতন ছেলেদের ragging করার একটা অভিনভ উপায় ছিল। তার মধ্যমণি তরুণদা। আমরা ছিলাম তার চ্যালা চামুন্ডা।ঘটনাটা যেটা ঘটত, সেটা প্লানচেটের নাম করে, ফ্রেসারদের ল্যাজে গোবরে করে বুদ্ধু বানান। বলা হত তরুণদা একজন সিদ্ধহস্ত মিডিয়াম। প্ল্যানচেটের আসরে পুরাণ আত্মা এসে ভর করে তরুণদার উপর এবং তাকে প্রশ্ন করলে, ভূত, ভবিষ্যত, অতীতের কথা জানা যায়। মন্ত্রগুপ্তি থাকত আমাদের মধ্যে যে টার্গেট যেন কোনমতেই টের না পেয়ে আগে থেকে। বছর কয়েক আগে সত্যজিত রায়ের ‘সোনার কেল্লা রিলিজ হয়েছে। আমাদের জেনারেশনের লোকজন, ওই সিনেমার কল্যাণে প্রায় সবাই, প্যারাসাইকোলজি ও প্যানচেটের ব্যাপারে অল্পস্বল্প অবহিত। এরকম একটা ঘটনা বলি।
ধরা যাক সদ্য হোস্টেলে আসা ছেলেটির নাম শিশির।সেই প্লানচেট, সেই রামকৃষ্ণ, এবার এক মুসলমানের আত্মা। তরুণদার কথা অনুযায়ী আমরা বেশ কয়েকবার প্ল্যানচেটে বসার আগে শিশির এর সামনে খুব ক্যাসুয়ালি আলাপ করতে লাগলাম-‘জানিস তো, সামনের রাস্তাটার নাম আনোয়ার শা রোড কি করে হল? অযোধ্যার নবাব মেটিয়াবুরুজে আসার পর, তার অন্যতম সেনাপতি আনোয়ার শার নেতৃত্বে, ইংরেজদের সঙ্গে যুদ্ধ হয়। তাতে মুঘলবাহিনী কচুকাটা হয়ে যায়, সেটা তালতলার যুদ্ধ নামে খ্যাত। - তাই নাকি? সেটা কোন জায়গা?- আরে, আমাদের থানার পরের স্টপেজটাই তো তালতলা।’ শিশির বেশ মনোযোগ দিয়ে, আমাদের নবনির্মিত ইতিহাস শুনছিল। মাঝে একটু সন্দেহ প্রকাশ করেছিল- পানিপথ, পলাশী, বক্সার যুদ্ধের কথা শুনেছে, কিন্তু তালতলা যুদ্ধ শোনে নি। বলা হল, ‘সব ছোটখাট যুদ্ধ কি আর ইতিহাস বইতে থাকে? জানো তো আমাদের এই হোস্টেলটা কিন্তু সেই সব মৃত সৈনিকদের কবরখানার উপর তৈরী হয়েছে।’ এই কথোপকথন, কিছুটা ওয়ার্ম আপ সেশন বলা যায়। হোস্টেলের গেটে একটা কমন লেটার বক্স ছিল। বাড়ী থেকে আসা শিশিরের চিঠি খুলে জানা গেল শিশিরের বাবা ডাক্তার।শিশিরকে একদিন বলা হল, তরুণদা প্লানচেট করে আত্মা নিয়ে আসতে পারে, আজ সন্ধ্যেবেলা আমরা বসব তরুণদার সঙ্গে, তুমিও চলে এস। শিশির রাজী হয়ে গেল। আমাদের ছিল ফোর সীটার রুম। করিডোরের সব শেষ রুম ছিল ডি-২৪। তরুণদা সেই রুমেই থাকত।সন্ধ্যে হতেই আমরা রুমের মাঝে চেয়ার, টেবিল নিয়ে রেডী। একটা মায়াবী পরিবেশ তৈরীর জন্য রুমের লাইট বন্ধ, ধূপদানিতে কয়েকটা ধূপকাঠি। আমরা সাত-আটজন, সবাই টেবিলের চারিপাশে গোল হয়ে বসে। তারমধ্যে শিশিরও আছে।তরুণদাই শুরু করল- দেখ ভাইরা সব,- প্লানচেট কিন্তু ছেলেখেলা নয়, আত্মার আবির্ভাব হবে, যদি কেউ, হিন্দু ধর্মেমতে, পারলৌকিক ক্রিয়াকর্মে বিশ্বাস না কর কিংবা মৃত্যুর পর আত্মার অস্তিত্বে সন্দিহান থাক তবে এই খেলায় বিরত থাক, শুরু করার আগে এখনও সময় আছে, যেতে পার। আমরা সবাই সমস্বরে জানালাম, না না তরুণদা, আমরা সবাই বিশ্বাস করি প্ল্যনচেটে। ‘বেশ’- বলে তরুণদা শুরু করল- দেখ সবাই আমরা বসেছি, মৃত কোন ব্যাক্তির আত্মাকে প্ল্যানচেটের মাধ্যমে নামিয়ে আনার, তারজন্য উপস্থিত সবাইকে একমনে ধ্যান করতে হবে, সেই মৃতব্যাক্তির মুখচ্ছবি চোখবুজে একাগ্রতার সঙ্গে মনেমনে চিন্তা করতে হবে। ‘কাকে ডাকা হবে’ - আমরা নিজেদের মধ্যেই পূর্ব নির্ধারিত হিসাবে আলাপ করতে লাগলাম।তরুণদা রামকৃষ্ণের গলাটা ভাল নকল করত, তাই বেশীরভাগ সময় আমাদের ঐক্যমত পরমহংসে এসেই স্থির হত।ততক্ষনে আমরা শিশিরকেও জিজ্ঞাসা করে নিয়েছি- রামকৃষ্ণের মুখটা মনে আছে তো! তা তো থাকবেই, মধ্যবিত্ত বাঙ্গালী বাড়ীতে আর কিছু টাঙানো থাকুক কি না থাকুক, একপিস রবীন্দ্রনাথ, রামকৃষ্ণের কল্পতরু ছবির তলায়, বিবেকানন্দ-মা সারদা, আর একপিস নেতাজীর ছবি থাকত। যাক এবার তরুণদা সবাইকে জানাল, এই অন্ধকার ঘরে, সামনে টেবিলে রাখা জ্বলন্ত ধূপের দিকে তাকিয়ে একমনে রামকৃষ্ণের মুখটা মনে কর। আমরা চোখটাকে আধবোজা করে, চোখের কোন দিয়ে নজর রাখছি শিশিরের দিকে। চারিদিক নিস্তব্ধ। একটু পরে, হঠাৎ, ধূপকাঠিটে একটু নড়ে উঠল, খসখসে গলায় তরুণদার মুখের আওয়াজ, যেন দূর থেকে ভেসে আসছে, -“তোঁরা আমাকে স্মরণ কঁরেছিস কেঁন?” গোটা কয়েক প্রশ্ন, তরুণদা আমাদের আগে থেকে শিখিয়ে রাখত। সেই অনুযায়ী প্রথম প্রশ্ন-‘প্রভু আপনি রামকৃষ্ণ’? উত্তর- ‘হ্যা, বৎস’। প্রশ্ন- ‘প্রভু আপনি কোথায় থাকেন?’- ‘দেবলোকে’। আড়চোখে দেখছি, শিশির গোল্লা গোল্লা চোখ করে দেখছে তরুণদাকে আর জোড়হাতে নমস্কার করছে। বোঝা গেল ঔষুধে কাজ ধরেছে। এবার তরুণদার দ্বিতীয় অধ্যায় শুরু হবে। কয়েকটা মামুলী প্রশ্নের পর, হঠাৎ, রামকৃষ্ণ রুপী তরুণদা মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল, মুখ দিয়ে কিরকম গাঁজলা বের করতে করতে, গলাটা একদম বদলিয়ে, নাকীসুরে ‘ডিলা গ্রান্ডি মেফেস্টোফিলিশ’ জাতীয় কিছু বলতে শুরু করল। একটু পরে সূচীদা, যার ভালনাম, শূচীব্রত চৌধুরী, ইন্সট্রুমেন্টেশন পড়ত, হঠাৎ চিৎপটাং হয়ে রুমের ধূলো জর্জরিত মেঝেতে গড়াগড়ি খেতে লাগল। সূচীদা এমনিতেই বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে পরিচিত ছিল, নোংরাশূচী নামে, ধূলাবালি অথবা নোংরা শার্ট প্যান্টে, শূচীদার কোন এল্যার্জি ছিল না। দুই একজন তো কেঁদেই ফেলল। অবশ্য পুরো ঘটনার মাঝেই, শিশিরের দিকে কড়া নজর রাখা হচ্ছে।তরুণদা হঠাৎ কিছু বলে উঠল। প্রিন্সদা বল্ল-‘আরে এতো পর্তুগীজ ভাষা, আমি একটু একটু জানি, দাঁড়া - ভাল করে শুনি কি বলছে। একটু শোনার ভান করে প্রিন্সদা বল্ল- বিশাল বিপদ, এক পর্তুগীজ জলদস্যু, তরুণদার উপর ভর করেছে। ব্যাটা বলছে এখানে অপঘাতে মরেছিল।ওই আত্মা এখন ভূত হয়ে ঘুরছে। মুক্তি চাইছে। প্রেতাত্বা তো তরুণদাকে সহজে ছাড়বে না। বেশ একটা ক্যাওস তৈরী হল। আমরা সবাই হাসি চেপে রেখে জমিয়ে অভিনয় করে যাচ্ছি।আমাদের দেখাদেখি শিশিরের মুখও ছলছল। হঠাৎ তরুণদা ঘড়ঘড়গলায় কিছু বল্ল।প্রিন্সদা জানাল - প্রেতাত্মা বলছে, ও গতজন্মে এক পর্তুগীজ জলদস্যু ছিল।এক মুসলিম নবাবের সঙ্গে যুদ্ধ করতে গিয়ে মারা যায়।সেই দুষ্ট আত্মা ভর করেছে তরুণদাকে। আরো বলছে-‘এখানে ভিষকাচার্যের ছেলে কে আছে। আমরা ভয়ে ভয়ে এ ওকে জিজ্ঞাসা করছি- ‘ভিষকাচার্য মানে কি।’ আমাদের মধ্যে কেউ একজন জানাল-‘আরে ওর মানে হচ্ছে ডাক্তার’ তাড়াতাড়ি বল, আমাদের মধ্যে কার বাবা ডাক্তার’? শিশির মিনমিন করে জানাল-‘আমার বাবা ডাক্তার’। আমরা সমস্বরে চেঁচিয়ে উঠলাম-‘তুই নিশ্চয়ই মনোযোগ নিয়ে ‘রামকৃষ্ণ শরণং’ করিস নি। কি আর হবে নিশ্চয়ই তরুনদাকে ছেড়ে মুসলিম প্রেতাত্বা তোকে ভর করেছে।”
তরুনদা তখন রামকৃষ্ণের ক্ল্যাসিকাল পোজের একটা হাত উপরে নৃত্যের মুদ্রায় করে, মুখটাকে ঝুকিয়ে নিমলীত চোখে চেয়ে আছে। মিডিয়াম জানাল, এই পাপের কারণে শিশির আজ থেকে মুসলমান হয়ে গেল। ওর নূতন নাম হল ‘শের খা’। শিশির তো হাঁউমাউ করে উঠল- না না, এ কিছুতেই হতে পারে না, বাড়ী থেকে তাড়িয়ে দেবে, আমি কিছুতেই মুসলমান হব না’ কিন্তু মিডিয়াম মানে তরুণদা কর্কশ গলায় বলে চলেছে- ‘আমি এই কবর থেকে উঠে এসেছি, তোকে মুসলমান বানালে আমার মুক্তি।’ আমরা কয়েকজন করুন স্বরে জানাতে লাগলাম-‘জনাব শের খা, বেচারাকে ছেড়ে দিন, আর কখনো এরকম গর্হিত কাজ করবে না’ ফাইনালি রফা হল, একটা উপায় আছে কাটানের, আমাদের ক্যান্টিন যে চালাত, সেই কুন্জদাকে দিয়ে একটি মন্ত্রপূত পাথর পূজা করিয়ে, সেই পাথর, হোস্টেল সুপারের ঘরে রেখে আসতে হবে। সুপারের ঘরে যাওয়ার আগে স্নান করে খালি গামছা পরে যেতে হবে।শিশির বেচারা খুবই আনন্দের সংগে রাজী হয়ে গেল, আমাদের অনেক ধন্যবাদ দিল যে আমাদের প্রচেষ্টায় ফাইনালি ওকে আর মুসলমান হতে হবে না।
আগে থেকেই একটা পাথর, ভাল করে আফটার শেভ লাগিয়ে, ছাদের জলের ট্যাঙ্কের তলায় লুকোন ছিল। আমরা বেশ কিছুক্ষণ ভাণ করলাম খোঁজাখুজি করার। পরে আমাদেরই একজন, শিশিরকে ট্যাঙ্কের কাছে নিত গিয়ে বল্ল খুঁজতে। শিশিরের আনন্দ কে দেখে যখন সেই পাথর পাওয়া গেল। ‘এরপরের প্রক্রিয়াটা পুরো দিন তিনেকের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ালো এবং পুরোটা সময় শিশির সবার হাসির খোরাক হয়ে থাকল। আমরা যে কি কষ্টে পুরো সময়টা হাসি চেপে ছিলাম। কুন্জদার ব্যাপারে, আমরা শিশিরকে বল্লাম-‘জানো তো এখন এখানে ক্যান্টিন চালালে কি হবে কুন্জদা খুব বড় তন্ত্রসাধক, হিমালয়ে থাকত- দেখেছ তো গলায় কত বড় মাদুলী ঝুলছে, তবে কেউই ব্যাপারটা জানে না, তুমি কিন্তু কুন্জদাকে খুব আস্তে আস্তে ‘প্রভু’ বলে ডেকে সব ঘটনা খুলে বলবে, তোমার এখন মরন-বাঁচন সমস্যা, দরকার হলে কুন্জদার পায়ে হাত দিয়ে রিকোয়েস্ট করবে। পরের দিন সকালে শিশির গেল কুন্জদার কাছে। কুন্জদার কাছে গেল, পিছন পিছন আমরা মজা দেখতে গেলাম। কুঞ্জদা তখন কাউন্টারে ব্যাস্ত হিসাব করে খাওয়ার পয়সা নিতে। জোড়হাত করে শিশির বলে উঠল -“ কুন্জদা একটু শুনুন, আমার বড় বিপদ, প্রভু আপনি আমায় রক্ষা করুন, আমি মুসলমান হয়ে গিয়েছি, আমার নাম এখন শের খা, পূজা করিয়ে আমাকে মুসলমান থেকে আবার হিন্দু করে দিন, আমি জানি আপনি বড় তান্ত্রিক।’ কুন্জদাকে আগে থেকে ট্রেনিং দেওয়া ছিল। কুঞ্জদা মিচকে হেসে বল্ল “হ্যাঁ, তোমার ব্যাপারটা আমি যোগবলে জানতে পেরেছি। হিমালয় ছেড়ে এলে কি হবে, ব্রহ্মতেজ এখনও অবশিষ্ট আছে। চিন্তা কোর না। পুজো একটা করতে হবে। তবে ব্যাপার হল এরজন্য যারা তোমার প্ল্যানচেটে উপস্থিত ছিল, সবার থুতু যোগাড় করতে হবে। এই গ্লাসটা নিয়ে আজ মধ্যরাত্রে ভূতচতুর্দশীর লগ্নে তুমি থুতু যোগাড় করবে, যারা সবাই প্ল্যানচেটে উপস্থিত ছিল।” এই বলে কুঞ্জদা একটা গ্লাস ধরিয়ে দিল শিশিরকে। শিশির ঢিপ করে কুঞ্জদাকে একটা প্রণাম করে নিল। আমরা একটু দূরে দাঁড়িয়ে মজা দেখছি।
পরের দিন ডি ব্লকের ছাদে পূজা হল। কুন্জদার ক্যান্টিনের অবশিষ্ট লাড্ডু দিয়ে প্রসাদ বানান হয়েছে। খালি বেচারা শিশিরকে সবার কাছ থেকে একটা গ্লাসে থুতু যোগাড় করতে হল। ছাদটা ছিল কাঁকর বিছোনো টারফেল্টের। খালি গায়ে সেখানে, শিশিরকে একশ আটবার সষ্টাঙ্গ প্রণাম করতে হল, দুব্বোঘাস দিয়ে, অং বং চং মন্ত্রপাঠ করে, থুতু ছেটানো হল কয়েকবার। আমরা সব পূজার পর লাড্ডু খেলাম। পরের দিন ক্লাইম্যাক্স। সেদিন ও গামছা পরে হোস্টেল সুপারের বাড়ী যাবে সুগন্ধি পাথর দিতে। তখন আমাদের সুপার ছিলেন জি কে বিশ্বাস, কেমিকাল পড়াতেন সপরিবারে থাকতেন, কোয়ার্টারটা ছিল, সি আর ডি ব্লকের মাঝে। শিশির চল্ল সুগন্ধি পাথর নিয়ে। পিছন পিছন পঙ্গপালের মত আমরা। হাসির চোটে পেটা ফেটে যাচ্ছে, কিন্তু খেল খতম না হওয়া পর্যন্ত হাসা যাবে না। জি কে স্যার প্ল্যানচেটের ব্যাপারে মোটামুটি অবহিত ছিলেন। যাক, বেল বাজার পর দরজা স্যারের বাচ্চা মেয়ে খুল্ল। শিশিরের গামছা পরা রূপ দেখে ফিক করে হেসে ফেলল। শিশির একটু অপ্রস্তুত। কি আর করে, নাচার। হাজার হোক মুসলিম থেকে নিজের ধর্মে ফিরতে গেলে, এটুকু কষ্টতো সইতেই হবে।বল্ল-‘স্যারকে ডেকে দাও।’ আমরা সব সিঁড়ির মুখে জটলা করে দাড়িয়ে। একটু পরে নাটকের যবনিকাপাত। যাক স্যার বেরিয়ে এলেন।শিশির কাঁদোকাঁদো মুখে জানাল। ‘স্যার, এই মন্ত্রপূত পাথর আপনার ঘরে রাখতে হবে, কাল একটা ঘটনার পর, আমি মুসলমান হয়ে গিয়েছি। স্যার বল্লেন-‘তাই নাকি, তোমার কি মনে হচ্ছে তুমি সত্যি মুসলমান?’- ‘হ্যা সার, অপনি আমাত উদ্ধার করুন। বাড়ীতে মুখ দেখাতে পারব না।’ এদিকে স্যারের পিছনে দুই মেয়ে, তখন বোধহয় একজন ওয়ানে আর একজন থ্রিতে পড়ত, ফিক ফিক করে হাসছে। স্যার হেসে বল্লেন-‘দাও তোমার পাথর, এই নিয়ে আমার কালেকশনে ছয়টা পাথর হবে।’ শিশির হাসিহাসি মুখে পিছনে ফিরতেই, পিনড্রপ সাইলেন্স ভেঙে আমাদের বাঁধভাঙ্গা হাসি। শিশির একটু থতমত খেয়ে জিজ্ঞাসা করল-‘কি ব্যাপার, সবাই হাসছে কেন?’ বলা হোল সব খুলে যে ওকে বিশাল বুদ্ধু বানান হয়েছে। শিশির তো প্রথমে বিশ্বাসই করতে চায় না। অনেক পরে কনভিন্সড হল। এমনই ছিল তরুণদার নিখুঁত প্ল্যানচেট।
একবার তো এক ভিক্টিমকে বলা হল, শিবু হচ্ছে ‘র’ এর এজেন্ট। এটা কেউ জানে না, তাকে গিয়ে শিবুকে চড় মেরে বলতে হবে, তুমি ‘র’ এর এজেন্ট। শিবু ছিল হোস্টেলের ফাই-ফরমাশ খাটার ছেলে। লম্বা, রোগা লিকপিকে চেহারা। দেখলে মনে হত ফুঁ দিলে উড়ে যাবে। সত্যিসত্যি, সে গিয়ে শিবুকে আলতো করে চড় মেরে বল্ল-‘কিছু মনে করবেন না, আমাকে আদেশ করছে যে আপনাকে চড় মেরে বলতে হবে, আপনি ‘র’ এর এজেন্ট। শিবু গোবেচারা লোক, সে রীতিমত থতমত খেয়ে কি বলবে বুঝে উঠতে পারল না!
আমি যখন থার্ড ইয়ারে, তখন হোস্টেলে সাধনদা এল। উনি নাকি অনেকদিন ধরে ইন্সট্রুমেনটেশন পড়ছেন। বি এস সি ও যাদবপুর থেকেই। ক্লাসে যেতে দেখি না। বেশ টেনিদা টাইপের বিজ্ঞ বিজ্ঞ ব্যাপার। সব ব্যাপারেই সাধনদার কিছু না কিছু বলার থাকত। আমাদের সব সিনিয়ারদের কাছেও উনি সাধনদা। অনেকে আবার আড়ালে, আবডালে ‘এইসা ধন’ বলে ডাকত। একবার ইউনিভার্সিটিতে এক্সিবিশান ম্যাচ, প্রেসেন্ট ভার্সেস পাস্ট স্টুডেন্টদের মধ্যে। সাধনদাও নামবে প্রেসেন্ট স্টুডেন্টদের টিমে।তখনও ড্রেস আপ হয় নি। দেখি কয়েকজন প্রাক্তন ছাত্র টিমের ছেলে এসে সাধনদাকে ঘিরে ধরে বলছে-‘ভালই হল সাধন, তুই এসে গিয়েছিস, আমাদের টিমটা জোরদার হবে। বেচারা সাধনদার মুখটা দেখি চুপষে গিয়েছে। আশেপাশে আমি ও হেস্টেলের কয়কজন মুচকি হাসছি। সাধনদাও কম ফিচেল নয়। বল্ল-‘এই যে কয়েকদিন হল পি এইচ ডি জয়েন করেছি। তাই এখন প্রেসেন্টদের টিমে।
একবার সরস্বতী পূজার ভাসানের কথা মনে আছে। পূজো হল আমাদের মেন হোস্টেলে। সন্ধ্যেবেলা ভাসানের জন্য ৩০-৪০ জনের গ্যাং বেড়লো। সঙ্গে টাটা ৪০৭ এ ঠাকুর। যাওয়া হবে বাবুঘাটে। মাইক বাজছে। সঙ্গে সঙ্গে আমাদের নাচ। সবে এক আধটু বিয়ার খেতে শিখেছি। অল্পতেই নেশা। গড়িয়াহাটের মোড়ে প্রবল নৃত্যের চোটে জ্যাম লাগার যোগাড়।
আমাদের পিছনেই ছিল আরেকটা কসবা থেকে আসা ভাসান পার্টি। তাদের সঙ্গে বাচ্চা, মহিলারাও ছিল। ওরা আমাদের অনুরোধ করল-‘দাদা আমাদের আগিয়ে যেতে দিন, তারপর আপনারা রাস্তা জুড়ে যেত খুশী নাচানাচি করুন।’ জীবনে প্রথমবার গড়িয়াহাটে রাস্তায় দাড়িয়ে নাচছি, আশেপাশের লোকেরা দাড়িয়ে দেখছে, নিজেদের বেশ হিরো হিরো লাগছে, অল্প বিয়ারও পেটে পড়েছে। সুতরাং কে শোনে কার কথা। ‘ হাম তো আগেই যায়েঙ্গে জী, আপকো তো পিছেই আনা পড়েগা’। মিনিট খানেক যেতে না যেতেই, কসবার ছেলেগুলো নিজেদের মধ্যে কিছু আলোচনা করল, তারপরই হঠাৎ করে ওরা, সংখ্যায় আমাদের এক চতুর্থাংশ হবে, রে রে করে আমাদের দিকে তেড়ে এল। কথা ভেসে এল ‘মার শালাদের- মেরে পাট করে দে, চাকু চালিয়ে দে’। আমাদের বীরপুঙ্গবের দল নিমেষে ছত্রখান, যে যার মত চো চা দৌড়। য পলায়তি, স জীবতি।চাকু ওদের কাছে ছিল না, কিন্তু একটা হাত এমনভাবে জামার তলায় রাখা, আমাদের সবার ধারনা ছিল, পাক্কা ওদের সবার কাছে চাকু আছে। তখনকার সময়। কসবা জয়গাটা তখনকারদিনে বেশ নটোরিয়াস ছিল।আমরা অনেকেই হোস্টেলে ফিরে এলাম।খালি জনাকয়েক ঠাকুর নিয়ে গেল ভাসান দিতে। ফিরে এসেছি, মনমরা, তার উপর ট্রাকের মাথায় বড় করে যাদবপুর ইউনিভার্সিটির ব্যানার ছিল- ঈশ, যারা দেখল তারা কি ভাবল। ঘটনার ঘনঘটায় আমরা ম্রিয়মাণ। মিটিং ডাকা হল। একটু নেতা এবং মারকুটে গোছের দুই একজন এসে গেল। একজনের আবার কসবাতে কেউ চেনা ছিল, ক্লাবের নাম দিয়ে জায়গাটার হদিশ পাওয়া গেল। দুই একজন সিনিয়ার জানাল তাদের ঝুলিতে কোন কোন মাস্তান দাদাদের নাম আছে। কোন মাস্তান কোথায় কাকে কেলিয়েছে অথবা কোন ডেয়ারিং এনকাউন্টারে ছিল, পেটো কোথা থেকে যোগাড় হবে, ইত্যাদি নিয়ে বেশ সরগরম আলোচনা সভা হল। প্রতিশোধ কি ভাবে নেওয়া হবে সেই নিয়ে নানা মুনির নানা মত। কেউ বল্ল নাটের গুরুগুলোকে তুলে আনা যাক, এখানে এনে কেলান হবে। কিন্তু সেই প্রস্তাব রিজেক্ট হয়ে গেল কারণ জানা নেই, ঠিক কারা ছিল। সর্বসম্মতিক্রমে ঠিক হল, রাতের বেলায় চুপিচুপি পাড়ায় ঢুকে পেটো চালিয়ে দিয়ে আসতে হবে। আলোচনার শেষে সবাই বেশ খুশী মনে ঘুমাতে গেলাম। ঠিক ছিল পরের রাতে এনকাউন্টার হবে। কিন্তু পরের রাত কেন, কোন রাতেই আর এই ব্যাপারে বিশেষ উৎসাহ দেখা গেল না। সদ্য মার খেয়ে ফিরে আসার পর সবার রক্ত গরম ছিল, প্ল্যানিং স্টেজটাও বেশ সাকসেসফুল, তাই আর জিনিষটাকে এক্সিকিউশন স্টেজ পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার উদ্যমের অভাব দেখা গেল। সবাই আবার ক্লাসটেস্ট, সেসেনাল, সেমিস্টারের জাতাকলে ব্যস্ত হয়ে পরলাম।
একটা মজার ঘটনা মনে পড়ছে।৮০ কি ৮১ সাল হবে। ভিসি কে ঘেরাও করে ছাত্রবিক্ষোভ চলছে। কারণ কি ছিল আজ আর মনে নেই। ‘ওরা আমাদের গান গাইতে দেয় না... কিংবা - চল চল চল , উর্ধ গগনে বাজে মাদল…’ ইত্যাদি ইমোশনাল গান চলছে অরবিন্দ ভবনের সিঁড়িতে বসে। দিন গড়িয়ে রাত। আমি প্যাসিভ সাপোর্টার। হোস্টেলে গিয়ে একবার ডিনার করে এলাম। ইন্জিনিয়ারিংএর পড়ুয়ারা বেশী। রাতজাগার ব্যাপারে কখনই আমার সুখ্যাতি ছিল না। ফিরে এলাম হোস্টেলে, ঘুমাতে। সকালে খবর পাওয়া গেল, রাতে পুলিশ এসেছিল। লাঠি চার্জও হয়েছে। পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে ছেলেপুলেরা মাঠ ক্রস করে লেডিস হোস্টেলের ভিতর ঢুকে পড়েছে। কয়েকজনের হাত-টাতও ভেঙেছে। এই বেনোজলে মাছ ধরতে নাকি কয়েকজন সুযোগসন্ধানী ছেলে, যাদের গায়ে আঁচড়ও লাগে নি, তারাও হোস্টেলে ঢুকে ফ্লোরেন্সনাইটিংগেল রুপী প্রমীলাবাহিনীর কাছ থেকে ব্যান্ডেজ ইত্যাদি করিয়েছে।আলাপ করার এরকম সুবর্ণ সুযোগের পূর্ণ সদ্বব্যাবহার কি হারানো যায়! এরমধ্যে দুই একজন চেনা বন্ধুও ছিল। নিজের ভাগ্যকে দোষ দিলাম, কেন রাতে চলে এলাম। পরে আবার মনে হল, আরে সত্যিসত্যি যদি কেলানি খেতাম। পুলিশের লাঠির বাড়ি নাকি বেশ জবরদস্ত হয়। যাক, ভালই হয়েছে না গিয়ে।
কত দিন হয়ে গিয়েছে, হোস্টেল লাইফ ছেড়ে এসেছি।উপরের মজার ঘটনাগুলো মনে আছে, তাই লিখতে পারলাম। আরো কত কিছু ছোট খাটো ঘটনা প্রায়ই হত, সে সব লিখতে গেলে মহাভারত হয়ে যাবে।
আমার এক জ্ঞাতি কাকার কথা না বল্লেই নয়। প্রিন্টিং টেকনোলজি পড়ত। শিলং এর ছেলে। থাকত গল্ফগ্রীনে। মাঝে মাঝে আমার কাছে গল্প করতে আসত। কাকার হাইট সাড়ে চারফুট। বেঁটে কাকা নামে বেশী পরিচিত ছিল। হাঁটুসমান ঝুলের একটা কোট, পনিটেল করা কাকু আমার রুমে আসত। কাকা এলে সবাই ফ্লোরের সবাই আমার রুমে চলে আসত মজা নিতে। একে দর্শনীয় চেহারা, তার উপর সিলেটি টান যুক্ত কথাবার্তায় ঘনাদার ঝলক পাওয়া যেত। অনেক হাসির গল্পের মধ্যে দুই-একটা মনে আছে। কাকু একদিন জানালেন “তোমরা কি জান, সুভাষচন্দ্র কেন আইসিএসএ অকৃতকার্য হয়েছিলেন? আমরা বল্লাম “শুনেছি উনি নাকি ঘোড়ায় চড়াতে ফেল করেছিলেন।” কাকু বল্ল না সুভাষ ইন্টারভিউতে “ডিভাইড এ্যান্ড রুল” স্বপক্ষে জোরদার সওয়াল করেছিলেন তাই উনাকে সিভিল সার্ভিসে নেওয়া হয় নি। আমরা থতমত খেয়ে বল্লাম -“আমরা শুনেছি ওই রুলটা তো ব্রিটিশদের করা। কাকু ততক্ষনে একটা সিগারেট আমার কাছ থেকে জক মেরে বেশ ধোঁয়া ছেড়ে সুখটান দিচ্ছেন, চোখটা আকাশের দিকে আর থুতনিতে হাত বোলাচ্ছেন, কানে কোন কথা যাচ্ছে না!
আমরা একবার ঠিক করলাম যে কাকুকে বোকা বানাব। তখন ওয়েস্ট বেঙ্গলে প্রচন্ড লোডশেডিং এর জমানা। বামফ্রন্টের আমল। খবরের কাগজের হেডলাইনে রোজই থাকে সাঁওতালডিহির ইউনিটের বয়লারের টিউব লিকেজ, অমুক নম্বর ইউনিট বন্ধ। দেওয়ালে লিখন “রক্ত দিয়ে বক্রেশ্বর গড়ব।”
ছাত্রদের পড়াশুনার ব্যাঘাত হচ্ছে দেখে কর্তৃপক্ষ সদ্য জেনারেটর লাগিয়েছেন। বেঁটে কাকাকে মধ্যমনি করে গল্প চলছে। লোডশেডিং এর মধ্যে ঘটঘট করে জেনারেটর চালু হল। কাকুকে বলা হল - জান তো, আমাদের ইলেকট্রিক্যাল ডিপার্টমেন্ট এই জেনারেটর বানিয়েছে। এটা জলে চলে। এখন এক্সপিরিমেন্টাল স্টেজে এখানে লাগান হয়েছে। আর কিছুদিন পরে পেটেন্ট নিয়ে সারা বিশ্বে চালানো হবে। যুগান্তকারী আবিস্কার। কাকু বল্ল “ধ্যেত.. তাই আবার হয় নাকি?” আমরা বল্লাম “বিশ্বাস হচ্ছে না, ডিব্লকের তিনতলা থেকে, নীচে এব্লকের পাশে জেনারেটার রুমের এক্সস্ট পাইপটা দেখালাম।
পুকুরের দিকে নামান।(উপরের ছবিতে ডানদিকে জেনারেটর রুম দেখা যাচ্ছে) আমরা বল্লাম, “ঐ যে, আমাদের ঝিলের জল টানছে।” কাকু কনভিন্সড হয়ে পরের দিন কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে হাজির এই রেভেলিউশনারি টেকনোলজি দেখাবার জন্য।
(কলেজ লাইফের শেষ পর্যায়ে)
দেবদত্ত
১৫/১১/২১












Comments
Post a Comment