চিরসখা


 চিরসখা

বাড়ীর কাছের মল হল ইন্দিরাপুরমের শিপ্রা মল। ১৫-১৬ বছর আগে মল খোলা ইস্তক আমাদের শপিং কি সিনেমা দেখা ওই মলেই হয়ে আসছে। সম্প্রতি মালিকানা হাতবদল হয়ে নাম হয়েছে নর্থ ইন্ডিয়া মল। একতলায় সারি দিয়ে অনেকগুলো সোনার দোকান কলকাতার সেনকো থেকে শুরু করে তানিষ্ক, রিলায়েন্স জুয়েলারী, ক্যারাট লেন, ব্লু স্টোন, অরা, এরকম ব্রান্ডেড জুয়েলারীর দোকান। সব দোকানই ঝকঝকে তকতকে, ঢোকার সময় বন্দুকধারী সিকিউরিটি গার্ড সেলাম ঠোকে, স্যালুটের ধাক্কায় সম্প্রতি বেঙ্গলে দুটো দোকানে লুঠ হয়ে গেল, কারণ সিকিউরিটি-স্যালুটে বেশী মনযোগ দেওয়াতে  বন্দুক তাক করতে ভুলে গিয়েছে। ভিতরে সুবেশা তরুণী সেলসম্যান। পারতপক্ষে সোনার দোকান এড়িয়ে চলি, কারণ সোনাকে মনে হয় নন-পারফরমিং এ্যসেট, লকারে লক হয়ে বসে থাকে। আজকাল বিয়েবাড়ীতে জাঙ্ক জুয়েলারী বেশী চলে। তবুও দোকানগুলো বেশ রমরমা করে চলে। ইন্ডিয়ান ট্রাডিশনে বিয়েতে সোনা দেওয়ার নিয়ম। তবে নব্য ধনী ইয়াং ব্রিগেড, সোনার গয়নাতে না হলেও, ‘গোল্ড বন্ড’ ট্রেডিং করে দু-পয়সা মুনাফা করছে। যাই হোক আজকে সেনকো দোকানটাতে ঢুকতে হল, কারণ গিন্নি ইনস্টলমেন্টে টাকা দিচ্ছে, কোন একটা স্কিমে, মেয়াদ শেষ হলে জমা টাকা দিয়ে গয়না কেনা যাবে।


কোন কারণে অন লাইন পেমেন্ট হচ্ছিল না, তাই দোকানে এসে দেওয়া। সুমিতা কাউন্টারে ফরম্যালিটি করছে, বড় শোরুম, মাঝে সোফাসেট আছে। আরাম করে সোফাতে বসেছি। একটা জলের বোতল দিয়ে গেল। উল্টোদিকের সোফায় আমারই বয়সী এক ভদ্রলোক বসে আছেন। প্রথমে ভেবেছিলাম উনার বাড়ীর লোকজন হয়ত গয়না কিনতে এসেছেন,কারণ উনি সোফায় বসে রিল্যাক্স করছেন মনে হল। কিন্তু ভুল ভাঙ্গল দুই একটি কথা শুনে। একটু পরেই দেখলামপাশ দিয়ে যাচ্ছিল, এক সেলসম্যানকে জিজ্ঞাসা করলেন, “সোনিয়া আজ আয়ি নেহি কেয়া?” লোকটি বল্ল - না, এসেছে, আমি ডেকে দিচ্ছি। একটু পরে একটি মেয়ে এল, বুঝলাম এই সোনিয়া হবে, পোষাক দেখে বুঝলাম এও সেলসপারসন। কিছুক্ষণ কথা বলে সে বিদায় নিল। ভদ্রলোক এদিক ওদিক তাকিয়ে কাস্টমারদের নিরীক্ষণ করছেন। হাতের ঘড়িটা বেশ মোটাসোটা দামী মনে হল। বুঝতে পারলাম মালিকের তরফের কেউ বা সেনকোর কোন উচ্চপদস্থ কর্মচারী। চেহারাটাও বাঙালীসুলভ। দুই-একবার চোখাচোখি হওয়ার পর উনি হিন্দিতেই জিজ্ঞাসা করলেন চা/কফি কিছু খাব কিনা। ধন্যবাদ জানিয়ে না বলে, বাংলায় জিজ্ঞাসা করলাম, “আপনি কি ওনারের তরফের কেউ, না সেনকোতে চাকরী করেন?” আমার বাংলা শুনে উনিও বেশ খুশী হয়ে উত্তর দিলেনআমি সেনকোর রিটেল সেলসের হেড, এই লাইনেই হয়ে গেল ৪৫ বছর।ভদ্রলোক বেশ গপ্পে। সুমিতা কাউন্টারে ব্যস্ত, হাতে সময়ও অঢেল, ভাবলাম গোল্ড সম্বন্ধে একটু জ্ঞানলাভ করা যাক। উনি বল্লেনজানেন, আমি একটু কাজ পাগল আছি, এই তল্লাটে এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত সবাই আমাকে চেনে। কেরিয়ার শুরু করেছিলাম মেহেরসনস জুয়েলার্সে, ২৩ বছর ছিলাম, তারপর হজুরীলাল জুয়েলার্সে  বছর, তারপর ছিলাম তনিষ্কে ৮ বছর, সেখান থেকে সেনকোতে আছি প্রায় দুই বছর, অল ইন্ডিয়া রিটেল সেলসটা আমি দেখি।” 
মেহেরসনস জুয়েলার্স নামটা জানি, সাউথ এক্সে এদের বিশাল শোরুম, খাস দিল্লির লোকেরা বিয়ে শাদীতে এদের দোকানে ঢুঁ মারেন। হজুরীলাল নামকরা জুয়েলারী দোকান, দিল্লিবেসড। এদের ক্লায়েন্টেল আবার আলট্রা রিচ। কুন্দন টাইপের মোটাসোটা সোনার গয়নার স্পেশালিস্ট। ততক্ষণে উনি ভিসিটিং কার্ড দিয়েছেন, উনার বয়সটাও জেনে ফেলেছি, পয়ষট্টি রানিং, নাম অলক সেন।

বল্লাম আজকাল দেখি মালাবার গোল্ড দিল্লিতে অনেক ব্রাঞ্চ খুলেছে। অলকবাবু বল্লেন এর ওনার কেরালাইট মুসলিম। এদের গয়না সব মেশিনমেড, তাই মেকিংচার্জ কম। ইন্ডিয়ার নম্বার ওয়ান ব্রান্ড হল তানিষ্ক, নামেও এবং সেল্স ভল্যুউমেও। অলোকবাবু বল্লেন উনি তানিষ্কের সাউথএক্স ব্রাঞ্চে ছিলেন। পাঁচবছর আগে যখন ছেড়ে আসেন, তখন বিক্রি ছিল বছরে ১৭৫ কোটি টাকার, এবার নাকি সেটা বেড়ে সাতশ কোটি হয়েছে।

একটা আউটলেটে দিনে প্রায় দুকোটি টাকার সেল, ভাবাই যায় না। সোনার দাম বাড়লেও ভারতীয়দের সোনার প্রতি আকর্ষণ কমে নি এতটুকুও। অলোকবাবু জানালেন তনিষ্কের পর দুই নম্বরে এখন সেনকো। সারা ভারতে ১৫০টা আউটলেট, দিল্লিতেই দশখানা। আমার বিয়ের সময় বা তারপরও অনেক বছর পিসিচন্দ্র সর্বাধিক পরিচিত ব্রান্ড ছিল। 

অলক বাবু বল্লেনআসুন, ভিতরে গিয়ে বসি। শোরুমের একপাশে একটা কামরা। সেখানেই সোফায় বসে কথাবার্তা চলতে লাগল। বল্লাম আমরা আপনাদের নয়ডা১৮ মার্কেটের শোরুম থেকে গয়না কিনেছিলাম গতবছর। একটি বাঙ্গালী মেয়ে ছিল, সে সোনার দাম কমলে বা কোন স্কিম বা সেল লাগলে ফোন করে জানাত, এখন কলকাতায় বদলী হয়েছে। নামটা প্রথমে মনে পড়ছিল না। উনি নাম বল্লেন মুনমুন। ঠিক, মনে পড়ে গেল। বুঝলাম অলকবাবু সবার খবর রাখেন। উনি বল্লেন সোনার সূক্ষ কাজে বাঙ্গালী কারিগরের জুড়ি মেলা ভার। অনেক আগে কলকাতায় দেখেছি, বড় দোকানেও, শিল্পীদের সোনা দিয়ে দেওয়া হত, ওরা বাড়ীতে বানিয়ে দোকানে ডেলিভারী দিয়ে যেতেন আর মজুরী নিয়ে যেতেন। অলকবাবু বল্লেন এখন হাওড়ার অঙ্কুরহাটিতে বিশাল জুয়েলারি ম্যানুফ্যাকচারিং হাব। সব বড় ব্রান্ডের কারখানা আছে। এক একটা ফ্যাক্টারিতে বছরে চার-পাঁচ টন সোনা এবং ডায়মন্ড সেটিং গয়না তৈরী হয়। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, “কলকাতায় গেলে কি কারখানা ভিসিট করা যাবে?” অলোকবাবু বল্লেন - “নিশ্চয়ই, যাবার আগে জানাবেন, সব ব্যবস্থা করে দেব।মনে মনে ভাবলাম -ভালই হল, নূতন অভিজ্ঞতা হবে। অলকবাবু আরো জানালেন সোনা এবং হীরের কারিগর ভিন্ন। দুটোতে ডিফারেন্ট স্কিলসেট লাগে। 

ইতিমধ্যে সুমিতাও এসে পড়েছে। আলাপ করিয়ে দিলাম। আরেকটু ঘরোয়া পরিবেশ। সুমিতাকে বল্লাম উনি সারাজীবন সোনার লাইনে কাটিয়েছেন। অলকবাবু বল্লেনপুরোটা নয়, ক্যারিয়ারের শুরুতে একটা হোঁচট খেয়েছিলাম। বল্লাম তাই নাকিযদি না আপনার তাড়া থাকে, ঘটনাটা শোনা যাক অলক বাবু শুরু করলেন - ৭৮ সালে বিএসসি করে সদ্য মেহেরসনসে চাকরী করি। আমার মাসী অনেকদিন ধরে ইংল্যান্ডে সেটেলড। তা, মায়ের কাছে একদিন ফোন এল মেশো নূতন দুটো রেস্টুরেন্ট খুলেছেন বার্লিনে। ম্যানেজার লাগবে। আমাকে আর এক কাজিন ব্রাদারকে বল্লেন চলে আসতে। যাতায়তের খরচা, মাইনে সবই আছে-মন্দ কি। বিদেশ বিশেষত ইউরোপ তখন তরুন মনে অজানা স্বপ্নের হাতছানি। টাকা দিয়ে শেফের সার্টিফিকেট যোগাড় করে ভিসা হল। দুই ভাই এক শীতের রাত্রে পোল্যান্ডের ওয়ারশ হয়ে বার্লিন পৌঁছালাম। ঠান্ডাতে জমে যাবার যোগাড়। জুতোর তলা দিয়ে বরফ ঢুকে পড়ে। আত্মীয় পরিচয়ের খেসারত দিতে হল। কোথায় কি ম্যানেজার! ওয়েটারের কাজ। কাস্টমারদের খাবার দিই, মপিং করতে হয়। ঘুপচি ঘরে থাকি। একবেলা রেস্টুরেন্টে খাই, রান্না জানি না, রাতে ব্রেডে জ্যাম মাখিয়ে খাই। মাইনে নেই। মেশো জানালেন -আমাদের আনতে অনেক খরচা হয়েছে। এখন টাকাকড়ি দেওয়া যাবেনা। মাস দুয়েক পরে মেশো জানালেন রেস্টুরেন্ট বন্ধ করে দিচ্ছেন। একমাসের ভাড়া দেওয়া আছে বাসস্থানের। এরপর নিজেরটা বুঝে নাও। মাথায় হাত। দুই একজন ইন্ডিয়ান পরিচিত বল্ল এখানে থাকার দুটো উপায় আছে। সবচেয়ে ভালো - কোন জার্মান মহিলাকে বিয়ে করে নাও, তাহালে অটোম্যাটিক সিটিজেনশিপ। আরেকটা হল এখানে শরণার্থী হয়ে সিটিজেনশিপের জন্য আবেদন কর। শরণার্থী হওয়ার জন্য কিছু একটা কারণ দেখাতে হবে, যেমন ধরুন আপনাকে নিজের দেশে ফান্ডামেন্টাল রাইট বিঘ্নিত হচ্ছে, উদাহরণস্বরূপ আপনাকে মাছ/মাংস খেতে বাধা দেওয়া হচ্ছে, এরকম কিছু একটা নগন্য কারণ দেখিয়ে দরখাস্ত দিতে হবে।

প্রথম রুটের জলজ্যান্ত উদাহরণ হাতের সামনেই ছিল। অলকবাবুর কাজিন ব্রাদার, যার সঙ্গে জার্মানি এসেছিলেন, সে প্লেনেই এক সহযাত্রীনী ১৬/১৭ বছরের বড় জার্মান মহিলার সঙ্গে আলাপ জমিয়ে কিছুদিনের মধ্যে তাকে বিয়ে করে নেয়। শুনেছিলাম দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পুরুষের সংখ্যা কমে যাওয়ায়, অনেক মহিলা বিদেশি ছেলে বিয়ে করতেন। তবে অলকবাবুমায়ের দেওয়া মোটা কাপড় মাথায় করে নে”, এই ভাবধারায় বিশ্বাসী। দ্বিতীয় উপায়টাতে মিথ্যার আশ্রয় নিতে হত, সেটা অলকবাবু চান নি। উনি এদেশে ভিসা নিয়ে এসে চাকরী হারিয়েছেন, এই সত্যের উপর ভিত্তি করে যদি কিছু উপায় আছে কিনা দেখা যায়। একজন বল্লেন তৃতীয় উপায় হল চার্চে গিয়ে ফাদারকে সব খুলে জানালে, চার্চ কর্তৃপক্ষ যদি তাতে মেরিট খুঁজে পান, তবে কোর্টের ম্যাজিস্ট্রেটকে চিঠি দেবেন। এই তৃতীয় পন্থায় কাজ হল। জার্মানিতে থাকার পারমিশন পাওয়া গেল। তবে সেই ওয়েটারের কাজ জুটল। সারাদিন পরিশ্রম করতে হয়। খাবার সার্ভ, ডিশ ধোয়া, মপিং কিছুই বাদ নেই। রান্নাটা অলকবাবু শিখে উঠতে পারেন নি। ফলে একবেলা খেয়ে স্বাস্থ্য ভেঙে গেল, ঠান্ডাতে মদ্যপানের অভ্যাস বেড়ে গেল। দুইবছর পর দেশে এলে পরে অলকবাবুর মা আর যেতে দিলেন না। ভাগ্য ঠিকই ছিল।যার টিকি যেখানে বাঁধা। মেহেরসনস এর পুরানো চাকরি আরো বর্ধিত মাইনেতে জয়েন করলেন। 

নিজের পরিচয় দিয়ে উনার কথা জিজ্ঞাসা করলাম। বল্লেন উনি প্রবাসী বাঙ্গালী। ওরা থাকতেন লক্ষৌতে। পরে ৭১ সালে দিল্লিতে চলে আসেন। দিল্লিতেই স্কুল, কলেজ, চাকরী।  পরিষ্কার বাঙলা শুনে বিষ্ময় প্রকাশ করাতে বল্লেন, শুধু কথাবার্তা নয় বাঙলা উপন্যাসও পড়েন। পরিবারের কথা জিজ্ঞাসা করলাম। বল্লেন এক ছেলে, এক মেয়ে। মেয়ে বিয়ের পর কলকাতায় থাকে, ছেলে সস্ত্রীক লন্ডনে। ওয়াইফের কথা জিজ্ঞাসা করলাম। হাসিখুশী মুখ থেকে উজ্জ্বলভাবটা কমে এল। একটু চুপ করে থেকে বল্লেন - গত একবছরে আমার জীবনের উপর দিয়ে এক ঝড় বয়ে গিয়েছে। গত বছরে আমার মাকে হারিয়েছি, এই বছর মার্চে আমার স্ত্রী হঠাৎ করে চলে গেলেন। আমার জীবনটা কেমন বেসুরো হয়ে গিয়েছে। অলকবাবুকে বেশ বিচলিত মনে হল। সদ্য চেনা, বল্লাম ‘সো সরি টু হিয়ার ইয়োর লস।’ উনার বয়স ৬৫, ওয়াইফের নিশ্চয়ই আরো কম চলে যাবার বয়স তো নয়। জিজ্ঞাসা করলাম - কি হয়েছিল? বল্লেন - “জানেন, আমি আমার স্ত্রী খুব ফিটনেস ফ্রিক ছিলাম। আমি রোজ জিমে যাই, রোজ যোগ-প্রাণায়াম করত। খুব রেগুলেটেড লাইফ কাটাতাম।খাওয়া-দাওয়াও সাদামাটা, বাড়ীর খাবার। সোসাইটির সবাই দেখা হলে বলে, এখনো বিশ্বাস হয় না এত এক্টিভ ভাবীজি, আজ আর নেই। জানেন, আমরা দুজনেই রামকৃষ্ণ মিশনে দীক্ষা নিয়েছিলাম। মাঝে মাঝে যেত মিশনে কথকথা শুনতে। আমি সবসময়ে কাজ নিয়ে পড়ে থাকতাম, অনুযোগ করলে বলতাম, আর কিছুদিন পর রিটায়ারমেন্ট নিয়ে দুইজনে মিশনের কাজে ফুলটাইম মন দেব। কিছুই আর হল না।অলকবাবু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপ করে রইলেন। তারপর ধরা গলায় বলতে শুরু করলেন গত বছর শেষের দিকে একদিন ট্যুর থেকে ফিরেছি, বল্ল আগের দিন ডাক্তারের কাছে গিয়েছিল, জানেন তো ওকে আমি বৌ বলে ডাকতাম…. রাগ করে বল্লাম, একদিন তো ওয়েট করতে পারতি, আমি তো আজই ফিরব জানতি। বল্ল ঘাড়ের কাছে খুব ব্যাথা করছিল। পরের দিন আবার এক ডাক্তারের কাছে গেলাম। সে রুটিন ইসিজি করে বল্ল - “ আপনার তো ম্যাসিভ হার্ট এ্যটাক হয়ে গিয়েছে।অলকবাবুর মাথায় তখন আকাশ ভেঙে পড়েছে। অলকবাবু বলে চলেছেনআরো পরীক্ষায় জানা গেল, লাঙসে ফাইব্রোসিস হয়েছে। মাত্র তিরিশ পার্সেন্ট কাজ করছে। ডাক্তার স্টেরয়েড ঔষুধ দিয়েছিলেন। তাতে যেটা হল মেরুদন্ডের তিন-চার জায়গায় হাড় ক্র্যাক হয়ে গেল। বাড়ীতে অক্সিজেন কনসেনট্রেটর, নেবুলাইজার। শ্বাসের কষ্ট দেখে মেদান্ত হসপিটালে ভর্তি করতে হল। মেয়ে সব ফেলে রেখে কলকাতা থেকে চলে এল। মেয়ের কথায় ছেলেকেও ডেকে পাঠালাম। তিনমাস ওরা এখানেই ছিল। কিন্তু শেষরক্ষা হল না। ডাক্তার গুলেরিয়া (নামকরা পালমনোলজিস্ট) জবাব দিয়ে দিলেন। ওরা জিজ্ঞাসা করছিলেন ভেন্টিলেটারে দেব কিনা। আমরাই মানা করলাম, মৃত্যুকে হয়ত কিছুটা বিলম্বিত করা যেত, কিন্তু ঠেকানো যেত না।অলকবাবু বল্লেন আমরা দুজনেই অনেক আগে চোখ বডি দান করে দিয়েছিলাম। আই ব্যাঙ্কের লেকেরা চোখ নিয়ে গেল। বডি নিয়ে গেল রাজস্থানের একটা মেড্যিকাল কলেজে। পরে দুই জায়গা থেকেই সুন্দর করে বাঁধান সার্টিফিকেট দিয়েছে। 

অকালে সাথী হারার বেদনা ফুটে উঠল অলকবাবুর কথায়। বল্লেন -“জানেন ফাঁকা বাড়ীতে যেতে মন চায় না। বাড়ী ফিরে ওর ফটোর সামনে কথা বলে যাই। ২২ বছর বয়সে বৌ হয়ে এসেছিল। সুখে-দুঃখে দুজনে দুজনের হাত ধরে সময় কাটিয়েছি। আমার ঘুরে ঘুরে কাজের মধ্যেও সময় পেলেই ফোন করতাম। হয়ত কোন শোরুম থেকে অন্য শোরুমে যাচ্ছি। বলতাম - বৌ, বৃষ্টি পড়ছে, আজ দেরী হবে আসতে, জ্যাম লাগবে রাস্তায়, বলত- বাবুতুই সাবধানে আসিস, হোক দেরী। এখন যে আমি কি করে সময় কাটাইবলতে বলতে উনার দু চোখে অশ্রুর বন্যা। সুমিতা উনার হাত ধরে স্বান্তনা দিচ্ছে। রবি ঠাকুরের গানের কলি মনে পড়ে গেলসে  চলে গেল, বলে গেল না-সে কোথায় গেল ফিরে এল না, সে যেতে যেতে চেয়ে গেল - কী যেন গেয়ে গেল

আমি বল্লামঅলোকবাবু, আপনি বরঞ্চ ছুটি নিয়ে মেয়ের কাছে ঘুরে আসনঅলোকবাবু চশমা নামিয়ে চোখ মুছে বল্লেনভেবেছিলাম একবার, কিন্তু ছেলে-মেয়ের কাছে গেলেও স্মৃতি আরো ঘিরে ধরে। তার থেকে কাজের মধ্যে থাকা ভাল। সেনকোর মালিক, আমার বস শুভঙ্কর সেনও বলেছেন-আপনি আরো দায়িত্ব নিয়ে কাজ করুন, ট্যুরে যান। সময় কাটবে। জানেন এই বয়েসে দাম্পত্যের থেকে সখা ভাবটাই বেশী ছিল। তুই করেই তো পরস্পরকে ডাকতামবৌ ছিল ভরসার স্থল। হোয়াটস্ এ্যপে স্বামীস্ত্রী সম্বন্ধিত জোকস আসে, পবিত্র সম্পর্কটাকে নিয়ে কত হাসি-মস্করাআমি সহ্য করতে পারি নাআমাদের সম্বন্ধটা এত মধুর ছিলকখনো দিনগত পাপক্ষয় মনে হয় নি।আবার ধরা গল, চোখের কোনে মুক্তবিন্দু। মনে মনে ভাবি- আজকেই তো আলাপ, স্বল্প পরিচয়ে মনের গভীরে থাকা ব্যাক্তিগত অনুভূতিগুলো অকপটে আমাদের সঙ্গে শেয়ার করলেন। অনুভূতি এটাই হল যে, মানুষের অবচেতন মন জীবনের সেটব্যাকের পর কতটা ইনসিকিওর থাকে, দুঃখ-বেদনা অন্যের সঙ্গে শেয়ার করতে পারলে মনের বোঝটা অনেক হাল্কা হয়। এতেই বুঝি মানুষ সমাজবদ্ধ জীব, ফিলিংস প্রকাশ করার জন্য কাউর সাহচর্য দরকার। 

মনটাকে ডাইভার্ট করার জন্য বল্লাম সোনার ব্যাপারে শোনা যাক। সোনার দোকানগুলির চাকচিক্য দেখে বুঝি বেশ লুক্রাটিভ ট্রেড। অলকবাবু বল্লেন- “জানেন তো হজুরীলালে যখন ছিলাম, বাংলাদেশ থেকে বড় বড় বিজনেসম্যান আসতেন, ফিলদি রিচ, সকালের ফ্লাইটে বম্বে গিয়ে সব্যসাচীর ডিজাইনের লেহঙ্গা কিনে, বিকালে ফিরে এসে ম্যাচিং গয়ন কিনতেন, এক-দুই কোটি টাকার।” আমার বাংলাদেশে কাজ করার অভিজ্ঞতাসূত্রে জানি যে, এক শ্রেনীর বাংলাদেশী ব্যবসায়ীরা খুব ধনী। আমার প্রোজেক্টের কনট্রাক্টর সাইট ভিসিটে ঢাকা থেকে আসত হেলিকপ্টারে। অলকবাবু বল্লেন ‘প্রফেশনালিজম বলুন কি কাস্টমার কেয়ার, সবই শিখেছি তানিষ্কে। টাটা কোম্পানির আদবকায়দাই আলাদা, শর্টকাটে বিশ্বাস করে না। প্রোডাক্টেও নূতনত্ব, সবচেয়ে ভাল ডিজাইনার রাখে। এই ট্রেডে ক্লায়েন্টের বিশ্বাস অর্জনটাই বিজনেসে টিঁকে থাকার মূলমন্ত্র। আমরা সবসময় কাস্টমারদের পার্সোনাল টাচ দেওয়ার চেষ্টা করি। আজকালতো যে কোন ব্রান্ডেড সোনার দোকানেহলমার্কথাকে, তাই সোনার কোয়ালিটি নিয়ে চিন্তা করতে হয় না।’

আসার সময় অলক সেনকে আমার ফোন নম্বর, ঠিকানা দিয়ে বাড়ীতে গল্প করতে আসার জন্য আমন্ত্রণ জানালাম। আমার বাসস্থান ৬২ সেক্টরের মাছের বাজারে অলকবাবু তার পরলোকগতা স্ত্রী মাছ কিনতে আসতেন, দুর্গাপুজোতে আসতেন। চেনা জায়গা, কিন্তু ওই এলেই স্মৃতি ভীড় করে মনে। পারতপক্ষে চেনা এরিয়াতে যেতে চান 

এবার বিদায়ের পালা। আমার হাত ধরে ধন্যবাদ জানালেন। বেরিয়ে এলাম, তবে অলকবাবুর সঙ্গে আলাপ, তার স্ত্রী বিয়োগের ঘটনা তাদের পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালবাসা সর্বপরিসখাভাব কৃষ্ণ-দ্রৌপদীর কথা মনে করিয়ে দিল। জীবনসায়াহ্নে স্বামীস্ত্রী একে অপরের পরিপূরক হয়ে সখা ভাবে থাকা এক পরম ভরসার আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠে। দুর্ভাগ্য অলকবাবুর জীবনের শেষ ল্যাপে সেটা হয়ে উঠল না। বিদায়ের আগে অবশ্য অলকবাবুর অনুমতি নিয়ে এলাম উনার সঙ্গে আলাপচারিতাটুকু যাতে লিপিবদ্ধ করতে পারি।

দেবদত্ত 

০৩/০৯/২৩


Comments

  1. খুব সুন্দর লেখা। খুব ভাল লাগল।👍👍

    ReplyDelete
  2. Sanjukta Sengupta7 September 2023 at 13:58

    খুব ভাল লাগল আবার মনখারাপ হয়ে গেল।

    ReplyDelete
  3. সুন্দর লেখা।

    ReplyDelete
  4. খুব ভালো লাগলো পড়ে

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

ত্রিবেনী তীর্থপথে ও আরো টিটবিট

রবিঠাকুর ও কিছু হাসি মশকরা

A walk to explore Delhi’s lesser known monuments