মান্ডুর বাওবাব গাছ
মান্ডুর বাওবাব গাছ
ছোটবেলায় ‘চাঁদের পাহাড়’ আমার অন্যতম প্রিয় গল্পের বই ছিল। আফ্রিকার পটভূমিতে লেখা উপন্যাসে, বিভূতিভূষণ ওখানের প্রকৃতি ও জীবজন্তুর যে বর্ণনা দিয়েছেন, এবং গল্পের প্রতিটি পাতায় যে রোমাঞ্চকর পরিস্থিতি উদ্ভুত হয়েছিল, তাতে ভাবতেও অবাক লাগে আফ্রিকাতে না গিয়েও কি সাবলীল ছিল তাঁর দৃশ্যপটের নিরীক্ষণ। পটভূমি ছিল কেনিয়ার পোর্ট সিটি মোম্বাসা থেকে নাইরোবি রেললাইন বিছানোর কাজ। লাইনটি যে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে গিয়েছিল, তার এখনের নাম জাভো (zavo) ন্যাশানাল পার্ক।ওই বইতে প্রথম শুনি আফ্রিকার তৃণভূমির মাঝে বিশাল আকৃতির ‘বাওবাব’ গাছের কথা।
চাঁদের পাহাড় বইয়ে বাওবাব গাছের ছবিএই গাছের বিশেষত্ব হল, এর মোটা কান্ড। গ্রীষ্মপ্রধান দেশে বর্ষাকালে এই গাছ তার কান্ডের মধ্যে জল ধরে রাখে, গরমকালে সেই সঞ্চিত জলের মাধ্যমে জীবনধারণ করে। এই গাছের আরেক বিশেষত্ব এর দীর্ঘজীবন। ১১০০ থেকে ২৫০০ বছর হল বাওবাব গাছের আয়ু।
মাস দুয়েক আগে এই বাওবাব গাছ নিয়ে আমাদের দেশে এক ধুন্ধুমার কান্ড ঘটে গেল। ঘটনাটা খুলেই বলা যাক।মধ্যপ্রদেশের পশ্চিম প্রান্তে ধার ডিস্ট্রিক্ট আদিবাসী অধ্যূষিত এলাকা। বিখ্যাত পর্যটনস্থল মান্ডু এই জেলাতেই পড়ে। রাণী রূপমতী ও বাজবাহাদুরের প্রেমকাহিনী ছড়িয়ে আছে মান্ডুর দ্রষ্টব্যস্থানগুলিতে।
এই মান্ডু অঞ্চলে প্রায় একহাজার বাওবাব গাছ আছে। বেশীরভাগ বাওবাব গাছ কয়েকশত বছরের পুরানো। আদিবাসীরা এই গাছের নাম দিয়েছে “মান্ডু কা ইমলি” বা “খোরসানি ইমলি”। এই নাম আসার কারণ আরব ট্রেডাররা এই গাছ ইরানের খোরসান থেকে ৬০০ বছর আগে আনা হয়েছিল। হিন্দুধর্মে আবার এই গাছের নাম কল্পবৃক্ষ, যা কিনা সমুদ্রমন্থনে উঠে এসেছিল। পুরাণে যাই থাকুক, আরেক ভার্সান অনুযায়ী মালোয়া সুলতানেটের রাজত্বকালে (১৩৯২-১৫৬২) এই গাছ আমদানী করে আফ্রিকা থেকে ভাড়া করে আনা সৈন্যবাহিনী। কথিত আছে বাওবাব গাছে সাধারণ লেবুর থেকে ছয়গুণ বেশী ভিটামিন সি আছে। নাবিকরা এই কারণে বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধের কারণে এই গাছ যাত্রাপথে নেওয়া ছাড়াও, যে সব জায়গায় নোঙর করত, সেইখানে রোপন করত। এই গাছের ব্যাবহারেও আয়ুর্বেদেও আছে। অনেক্ষণ উপক্রমণিকা চলছে, এবারে ঘটনাটা বলা যাক। গতবছর অর্থাৎ ২০২২ সালের জুন মাসের প্রথমদিকের ঘটনা। মধ্যপ্রদেশের ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের অনুমতি নিয়ে (অবশ্যই ফি জমা করে) এগারটি বাওবাব গাছ শিকড়শুদ্ধ উঠিয়ে তেলেঙ্গানা নিয়ে যাচ্ছিলেন, রামদেব রাও নামে হায়দ্রাবাদের এক ব্যাবসায়ী,
সেখানে এক বোটানিক্যাল পার্কে রোপণের জন্য। আদিবাসীরা গাছ কাটার বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে। যে ট্রাকে করে বাওবাব গাছ নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, আদিবাসীরা সেইসব ট্রাক আটকে দেয়। শেষমেশ পুলিস এসে বিক্ষোভকারীদের হটিয়ে দেয়। মান্ডু অঞ্চল ভীল আদিবাসী অধ্যূষিত। এদের লাইভলিহুডের কিছুটা বাওবাব গাছের উপর নির্ভরশীল। এর ফল বিক্রি হয় ৫০/- থেকে ২০০/- টাকা, সাইজ অনুযায়ী। এছাড়া মান্ডুতে আসা টুরিস্টরা গাছের বীজ ও পাল্প কিনে নিয়ে যান ঔষুধ হিসাবে ব্যাবহারের জন্য।
২০২৩ সালের গোড়ার দিক থেকে বিভিন্ন সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমে এই এজিটেশনের কথা লেখা হয়। এই বছর মে মাসে মধ্যপ্রদেশ সরকার নড়েচড়ে বসে। মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টও খবরের কাগজের ভিত্তিতে সুয়োমোটো মামলা শুরু করে সরকার ও ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের কাছে শোকজ নোটিশ পাঠায়।
এই মুহূর্তে বাওবাব গাছ প্রিজারভেশনের জন্য আলাদা করে কোন রুল নেই। যে কোন হরিত বৃক্ষ কাটতে যে ধরনের পারমিশন দরকার, বাওবাব গাছ কাটতে সেটাই লাগে। লোকাল আদিবাসীরা ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের কাছে কৈফেয়ৎ চাইছে যে বাওবাব গাছের নার্শারী থাকা সত্বেও কেন বড় বড় বাওবাব গাছ কাটার অনুমতি দেওয়া হল। তাই সরকারের থিঙ্কট্যাঙ্করা এক অভিনভ উপায় বাতলেছেন। মধ্যপ্রদেশ সরকার থেকে এখন ভাবনা চিন্তা চলছে বাওবাব গাছের জন্য জিআই ট্যাগের আবেদন করার। মধ্যপ্রদেশে চান্দেরি শাড়ী, বাগ প্রিন্ট, বেল মেটাল অফ দাতিয়া, ঝাবুআ কাদাকান্ট (kadakant) ব্ল্যাক চিকেন ইত্যাদির জিআই ট্যাগ আছে।
পাঠকদের নিশ্চয়ই মনে আছে রসগোল্লার জিআই ট্যাগ নিয়ে কয়েকবছর আগে ওয়েস্ট বেঙ্গল ও উড়িষ্যার মধ্যে টাগ অফ ওয়ারের ঘটনা। তবে বাওবাব গাছ নিয়ে জিআই ট্যাগ পাওয়া কঠিন। কারণ ভারতে মহারাষ্ট্র ও এলাহাবাদেও বাওবাব গাছ পাওয়া যায়। মান্ডুর সরকারী রুরাল হর্টিকালচার অফিসার, লোকাল আদিবাসী, যাদের নিজস্ব জমিতে বাওবাব গাছ আছে তাদের নিয়ে একটি সমিতি গঠন করেছেন। এই সমিতি গঠনের মূল কারণ হল যে কোন জিনিষের জিএই ট্যাগ পেতে গেলে এটা প্রমাণ করতে হবে যে সেই অঞ্চলের লোকের জীবিকার সঙ্গে সেই বস্তু অথবা প্রাণীর অবদান রয়েছে এবং অবশ্যই লোকাল লোকেরা বাওবাব গাছ থেকে বিশেষ প্রণালীতে কিছু তৈরী করছে, যেটা একধরণের স্কিলসেট স্পেসিফিক টু দ্যাট কমিউনিটি।পরবর্তী পদক্ষেপে সমিতি থেকে জিআই ট্যাগের জন্য আবেদন করা হবে। তবে কয়েক বছর যাবত কিছু প্রাইভেট ল্যান্ডের গাছ কাটা হচ্ছে চাষের জমি বাড়াতে। যেহেতু বাওবাবের জন্য কোন আলাদা রুল নেই, তাই সরকার নিজের জমিতে গাছ কাটা নিষিদ্ধ করতে পারছে না। সরকারী কাজে যা হয়ে থাকে, এখন বাওবাব গাছকাটা আইনসিদ্ধ কিনা সেটা জানার জন্য ট্রাইবাল ওয়েলফেয়ার ডিপার্টমেন্ট, এমপি ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট, ধার ডিস্ট্রিক্ট এডমিনিস্ট্রেশন সবাইকে রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে। হাইকোর্টে সুয়োমোটো পিটিশনের দ্বিতীয় শুনানি হবে আগত জুলাই মাসে। আপাতত এই হল বাওবাব গাছের চমকপ্রদ কাহানী।
দেবদত্ত
২৭/০৬/২৩






খুবই দুঃখজনক এমন প্রাচীন দুর্লভ্য গাছ নিয়ে রাজনীতি।
ReplyDeleteএরকম দুর্লভ গাছ কেটে ফেলা দন্ডনীয় অপরাধ হওয়া উচিত!
ReplyDeleteVery interesting information about the tree.
ReplyDelete