কেলোর কীর্তি

 


কেলোর কীর্তি

আজকের কাগজে একটা মজার খবর পড়লাম। মদ্যপান সম্বন্ধিত জোকগুলি বেশ আনন্দদায়ক। তারাপদ রায় এই নিয়ে বিস্তর লিখেছেন। তবে সেগুলো শুধুই গল্প নাকি সত্যি ঘটনা এই নিয়ে সন্দেহের অবকাশ আছে। আমি যে ঘটন লিখতে যাচ্ছি তা একদম খাঁটি, নির্ভেজাল টাটকা। 

এক মধ্যবয়সী সফ্টওয়ার ইঞ্জিনিয়ার গুরগাঁওতে চাকরী করে। দিল্লির জিকে তে থাকে। সে গত শনিবার বিকালে পুলিশের কাছে এফআইআর করে যে শুক্রবার রাতে সে একজন অপরিচিতকে গাড়ীতে লিফ্ট দিয়েছিল। ওই লোকটি তাকে মাঝ রাস্তায় ফেলে দিয়ে গাড়ী নিয়ে উধাও হয়ে গিয়েছে। গাড়ীতে তার ল্যাপটপ পার্সও ছিল। সিরিয়াস কেস। পুলিশ তদন্ত শুরু করে এবং ঘটনাস্থলে গিয়ে গাড়ীটা ইনট্যাক্ট পার্স, ল্যাপটপ উদ্ধার করেলোকটি যে লোকেশনে ওর ছিনতাইএর কথা বলেছিল তার থেকে কয়েকমিটার দূরেই গাড়ীটি পাওয়া যায়। পুলিশের তদন্ত থেকে যা উঠে আসছে সেটাই বলি।


ধরা যাক তার নাম সমীর। পাঠকদের মধ্যে কেউ সমীর থাকলে নিজগুণে ক্ষমা করে দেবেন। শুক্রবার উইকএন্ড। সেলিব্রেশন তো বনতা হ্যায়! সমীর অফিসের পর ঠিক করে ফেলে, আজ জমিয়ে দারু খেতে হবে। সমীর আপাতত একা। মনস্থির করেছে অফিস ছুটি হওয়ার পর। কলিগরা সব বাড়ী সটকেছে। কি আর করা যাবে। উঠল বাই তো কটক যাই। একা থেকে দোকা হতে আর কতক্ষণ। বাড়ীতে বৌকে জানিয়ে দিল অফিস পার্টি হচ্ছে ফিরতে দেরী হবে। লাইন ক্লিয়ার গ্রীন সিগন্যাল। সমীর তখনো জানে না ওর ভবিতব্য করমন্ডল এক্সপ্রেসের মত গ্রীন সিগন্যাল পেয়ে লুপ লাইনে ঢুকে কেলেংকারি হয়ে যাবে। এটা সবাই জানে গুরগাঁওতে দারু শস্তা। বোতল কিনে গাড়ীতে বসে খেলে, পাবের থেকে শস্তা পড়ে। সমীর দোকান থেকে দুই বোতল হুইস্কি সোডা  কিনে  গাড়ীতে জমিয়ে বসল।বেশ কিছুটা খাওয়ার পর যখন নেশা জমেছে সমীর একটা দোকানে গিয়ে কেনাকাটি করল। নেশার ঘোরে পেটিএম- দুইহাজারের জায়গায় বিশহাজার পেমেন্ট করে ফেলল। মদের নেশায় সমীর বুঝতেই পাল না যে সে দশগুন টাকা পে করে ফেলেছে! সেই দোকান অবশ্য তাকে বাকী টাকাটা ক্যাশে পে করে দেয়। এরপর সমীরের মনে হয় নেশাটা আরো জোরদার করতে হবে। একা একা দারু খেতে কি আর ভাল লাগে। কেউ সঙ্গে থাকলে মনের সুখদুঃখের গল্প হয়। ইয়ারের সঙ্গে মেহেফিল জমে ভাল। সমীর একা। কি আর করে। নেশা ভালোমত হয়েই আছে। তুরীয়ান্দ অবস্থা থেকে কিঞ্চিত দূরে। একা একা আর জমছে না। সমীর গাড়ী থেকে  নেমে রাস্তা থেকে এক অপিরিচিতক টার্গেট করে ভাব জমাল। তারপর তাকে ইনভাইটেশন করল মদ্যপানের সঙ্গী হতে। বিনা পয়সায় লোকে বিষ খেয়ে ফেলে আর তো মহার্ঘ হুইস্কি। লোকটি তো হাতে চাঁদ পেল। এরপর তাকে গাড়ীতে বসিয়ে দুজনে মিলে বেশ ভালমত মদ্যপান করল। তখন রাত দুটো। অপরিচিত  লোকটিও দিল্লি থাকে। সে লিফ্ট চাইল অন দি ওয়ে দিল্লিতে কোথাও নামিয়ে দেওয়ার জন্য। 

এরপরের ঘটনাটা যেটা প্রথমে বলেছি। যাই হোক আসল ঘটনা হল সমীর তখন ডেড ড্রাঙ্ক। গাড়ীর স্টিয়ারিং কন্ট্রোল নেই। অপরিচিত দারুর ক্ষণকালের পার্টনার ভয় পেয়ে যায় এই বুঝি সমীর এ্যকসিডেন্ট করবে। লোকটি জয়পুর-গুরগাঁও হাইওয়েতে গাড়ী দাঁড় করিয়ে নেমে যায়। সমীর নেমেছিল প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে। নেশার ঘোরে সে তখন তুন্দ। ফুটপাথে শুয়ে পড়ে। ঘন্টাদুয়েক পরে উঠে গাড়ী না খুঁজে পেয়ে হাত দেখিয়ে পাসিং গাড়ীগুলো থেকে লিফ্ট চায়। শেষমেশ একটি অটোওয়ালা ওকে হুডা সিটি সেন্টার মেট্রো স্টেশনে নামিয়ে দেয়। দিল্লির অটোওয়ালাদের চিরকালই দুর্নাম। কিন্তু এই অটোড্রাইভারদৈত্যকুলে প্রহ্লাদ তার ফোন থেকে সমীর বাড়ীতে ফোন করে সব জানায়। এমনকি অটোওয়ালা ওকে দুইশ টাকা ধার দেয় মেট্রো টিকিটের জন্য। বাড়ী ফিরে ফ্রেশ হয়ে আবার গুরগাঁও যায় এফআইআর করতে। তখনো তার ধারণা তার গাড়ী ছিনতাই হয়েছে

এব্যাপারে নিজস্ব উপলব্ধির কথা শোনানোর লোভ সম্বরণ করা দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে

আমার আবার বিশেষ ক্যালি। না খেয়েই এরকম ঘটনা ঘটিয়েছি। অঘটন-ঘটনপটিয়সীও বলতে পারেন।  ঠিক এরকমটা না হলেও, গাড়ী চুরি নিয়েই ঘটনা। সদ্য যোশীমঠে পোস্টিং পেয়েছি। শুনেছি ঠান্ডা। অক্টোবরের শেষে যাচ্ছি। কাছেই জেপি ইনস্টিটিউটের এক্সপো সেন্টারে উইন্টার গারমেন্টের সেল চলছে। সেখানে শাল কিনতে গিয়ে শালের (গাছ) গোত্তা খাব সেটা অনুধাবন করতে পারি নি। গাড়ী রাস্তায় পার্ক করে মিয়া বিবি ঢুকলাম কোম্পানির দেওয়া সাইট স্পেসিফিক উইন্টার গারমেন্ট এলাউন্সের ৫০০০/ টাকার সদ্ব্যবহার করতে। যেই হোক কেনাকাটা সেরে ফিরে এসে চক্ষু চড়ক গাছ। যথাস্থানে গাড়ী নেই। এদিক ওদিক চোখ বুলিয়েও আমার সাদা রং এর টাটা মাঞ্জার হদিশ করতে পারলাম না। গাড়ী চুরি এতদিন কাগজেই পড়েছি। শেষে আমার কপালেও এটাই লেখা ছিল। এদিকে শিপ্রা মলে সিনেমার টিকিট কাটা বুক মাই শো থেকে। যোশীমঠে গেলে পাহাড় আর বরফের চূড়া দেখে সময় কাটবে, সিনেমা দূর অস্ত। সেই মূহুর্তে ঠাহর করতে পারলাম না সিনেমা মিসে বেশী দুঃখ নাকি গাড়ী মিসিংএ বেশী কষ্ট। আশেপাশের দু-একটা অটোকে জিজ্ঞাসা করে সদুত্তর পাওয়া গেল না। সাধারণ পেটরোগা বাঙ্গালীর মত পুলিশের ছত্রছায়া থেকে দূরে থাকি। তার উপর ইউপির পুলিশ নটোরিয়াস। ১০০ নম্বরটা জানা ছিল। সেখানেই ফোন করে বল্লাম -ম্যাডাম, মেরা গাড়ী চুরি হো গিয়ে। নাম, লোকেশন ইত্যাদি নিয়ে তিনি জানালেন কাছের পুলিশ পোস্টে যেতে। সেখানে পিসিআর ভ্যান আসবে। তখন জানতাম কল সোজা লক্ষৌ হেডকোয়ার্টারে যায়। সেখান থেকে নিয়ারেস্ট পিসিআরকে খবর দেয়। পুলিশ পোস্টটা কাছেই। কিঞ্চিতধিক এক কিলোমিটার। একটা অটো নিলাম। গাড়ীতে আরেক মুশ্কিল। পুলিশকে তো গাড়ীর নম্বর জানাতে হবে। কিছুতেই গাড়ীর নম্বর মনে পড়ল না। সুমিতা আমারও এককাঠি উপরে। বল্ল গাড়ীটাতো টাটা মাঞ্জা, তাই না! আমি তখন প্রাণপন চেষ্টায় গাড়ীর নম্বর ভেবে চলেছি। ইউরেকা। লাস্টের চার ডিজিট মনে পড়ল। ৭৯৯৩। কিন্তু তার আগেরটা মনে পড়ল না। ছেলের যদি মনে থেকে। সে বছর দুয়েক ধরে বাইরে। ওকেই ফোন লাগালাম। সূর্যর আবার গাড়ীর নম্বরটা বাদ দিয়ে আগের পোরশানটা মনে ছিল- ইউপি ১৬ এএ। যাক বাঁচোয়া। দুয়ে দুয়ে চার হয়ে গেল। গাড়ীর নম্বর না বলতে পারলে-পুলিশ বিশ্বাসই করবে না যে গাড়ী চুরি হয়েছে। পাগলখানায় পাঠিয়ে দেওয়া অসম্ভব নয়। একটু পরেই পুলিশের ইনোভা সাইরেন বাজিয়ে উপস্থিত। আমি চমৎকৃত। এই প্রথম মনে হল সরকারকে ট্যাক্স দেওয়াটা সার্থক। যাক পুলিশের ভ্যানের পিছনে চড়ে বসলাম। আকুস্থলে গিয়ে পুলিশ সাহেব (তখন আমার চোখে সাহেব তো বটেই), জিজ্ঞাসা করলেন আপকা গাড়ী কাঁহা থা? এবারে আমাকে সেকেন্ড টাইম চোখ কচলাতে হল। আরে আমার গাড়ীতো যথাস্থানে বর্তমান। ভাল করে কাছে গিয়ে নম্বর মেলালাম। সেটাও সেম। এই সেরেছে! এবার পুলিশকে কি জবাবদিহি করি। একগাল হেসে বল্লাম- স্যার গাড়ী তো এখানেই খাড়ি দেখতে পাচ্ছি। পুলিশ স্যার এবার আমার আপাত মস্তক জরিপ করে বল্লেনআপ তো বোল রহে থে আপকা গাড়ী চোরি হো গিয়া! এর উত্তর জানা নেই। এক্ষেত্রে বৌ এর আঁচলের তলায় লুকিয়ে পড়াই বুদ্ধিমান কাজ। সুমিতাকে সামনে ঠেলে দিয়ে আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলাম। বিপদে ওর বুদ্ধি ভালই খোলে। সুমিতা বল্ল -“আমাদের মনে হচ্ছে গাড়ীটা জয় রাইডের জন্য চুরি করে আবার এখানেই ফেরত রেখে গিয়েছে। থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ স্যার, আপ কে লিয়েই গাড়ী ওয়াপস মিল গিয়া! পুলিশ স্যারও তাতে খুশী হয়ে জানালেনকোই বাত নেহি, আপকো গাড়ী মিল গিয়া। বড়িয়া হুয়া। যাইয়ে ঘর। আমি তখন ঘড়ি দেখছি , সিনেমার শো শুরু হতে কত দেরী। একটা কমেডি শো শেষ করেই অন্য শো এর ডাক। হলে মোটামুটি ঠিক সময়ে ঢুকলাম। নিশ্চিন্তে বসে সিনেমা দেখছি। ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল। ফোন বাজছে পিক পিক করে। তুললাম। সেক্টর২৪ থানা থেকে ফোন। বল্ল আপকা গাড়ী চোরি হুয়া থা না। মিল ভি গিয়া। একবার পুলিশ স্টেশন আনা পড়েগা। বল্লাম -আভি পিকচারকা আনন্দ নে রহা হু। বাদ মে আয়েঙ্গে! পরে আর যাই নি। যদি পুলিশকে হেনস্থা করার অপরাধে লকআপে পুরে দেয়। ঘটনাটা ২০১৭র।

এরকমই আরেকটা টাটকা ঘটনা। ঘ্রানেন অর্ধ ভোজনং। এক্ষেত্রে চুমুক দেওয়ার আগে গন্ধে নেশাও বলা যায়! পার্টি ছিল গুরগাওয়ের এক ক্লাবে। বৃষ্টির মরশুম। মিলিয়নেয়াম সিটির দুর্নাম আছে বর্ষার জলে ভেসে যাওয়ার জন্য। তাই গাড়ী নিয়ে যাবার প্ল্যান বাতিল করে মেট্রোর শরনাপন্ন হলাম। মেট্রো, অটো ইত্যাদি নিয়ে কাঠখড় পুড়িয়ে যেতে যেতে বৃষ্টি শুরু।ক্লাবের ভিতরের জানলা দিয়ে বাইরের সবুজ লন আর বৃষ্টি দেখতে দেখতে তুমুল আড্ডা। নানারকম ননভেজ ডিশ সঙ্গে রঙীন পানীয়। সিঙ্গল মল্ট গ্লেনফিডিক দিয়ে গিয়েছে। মহার্ঘ বস্তুটা সামনে রেখে মেহেফিলে মুড এনচ্যান্সমেন্টের প্রচেষ্টা চালাচ্ছি। সোডা, জল, হাফ-হাফ মিশিয়ে পানীয় রেডি। বেয়ারা দেখলাম একটা স্ট্র ঢুকিয়ে গেল।ব্যাপারটা ঠিক বুঝলাম না। কোল্ডড্রিংক্স কি কোল্ড কফি খেতে স্ট্র লাগে জানতাম। হার্ড ড্রিংক্সে স্ট্র! হতে পারে মিলিয়েনিয়াম সিটির অভিজাত ক্লাবের রুলবুকে আছে। কলকাতার বড় ক্লাবে শুনেছি ড্রেস কোডের কড়াকড়ি আছে। যাক মদ্যপানের আগে মগজকে ভারাক্রান্ত করলে নেশা চটকে যাওয়ার সম্ভাবনা। জম্পেশ করে গ্লাসটাকে নিয়ে স্ট্র-তে চুমুক দিয়েছি।কিছুই তো  গলা দিয়ে নামল বলে মনে হল না। কুছ পরেয়া নেহি। আরেকবার বেশ জোরে হুঁশ করে টান মারলাম। কিছু হেরফের হল বলে মনে হল না। লোকমুখে শোনা সিঙ্গল মল্ট নাকি খুব স্মুদ। তাহালে কি পুরোটাই মেরে দিয়েছি একচুমুকে! চক্ষুকর্নের বিবাদভঞ্জনের জন্য গ্লাসটাকে উঁচু করে পর্যবেক্ষণ করলাম। না সোনালী তরল হাতছানি দিয়ে ডাকছে। তাহালে এই থেকেই প্রবাদবাক্য এসেছে, ‘দেওয়ার ইজ মেনি এ স্লিপ বিটুইন কাপ এ্যন্ড লিপ’। এবার স্ট্রটাকে তুলে নিয়ে শূণ্যে ফুঁ দিলাম। হতে পারে কিছু আটকে আছে। ফুঁ টাকে ঢোক গিলে ফেলতে হল, কারণ হাওয়া পাস হচ্ছে না। ক্লাবের ভিতর এ্যমবিয়েন্স ক্রিয়েট করার জন্য আলো-আঁধারী পরিবেশ। এরপর সত্য উদ্ধার হল। লম্বা কাঠিটা হচ্ছে স্টারার! চা কফিতে দুধ চিনি আলাদা দিলে স্টারার দরকার পরে মিশাতে। হুইস্কিতে জল আর সোডা এমনিতেই মিশে যাবে। যাই হোক বুঝলাম চুমুকের আগে নেশাটা মন্দ হয় নি! 

দেবদত্ত 

০১/০৬/২৩


Comments

Popular posts from this blog

ত্রিবেনী তীর্থপথে ও আরো টিটবিট

রবিঠাকুর ও কিছু হাসি মশকরা

A walk to explore Delhi’s lesser known monuments