ফ্রেঞ্চ কানেকশন

 


ফ্রেঞ্চ কানেকশন

নারীর মোহিনীরূপ, যুগে যুগে পুরুষকে মুগ্ধ করেছে। এই নিয়ে কত কবিতা কত উপন্যাস। কথায় আছে “সাজিলে গুজিলে নারী, লেপিলে পুছিলে বাড়ী”।  

রূপচর্চা আজকাল মহিলামহলে খালি ফ্যাশান নয়, মুখশ্রী ত্বক পরিচর্যা ডে টু ডে লাইফের সঙ্গে ওতোপ্রোত ভাবে জড়িত। আজকের দিনে অলিতে গলিতে বিউটি পার্লারের ছড়াছড়ি। তাই মেয়েরা আজকাল কুড়িতেই বুড়ী নন। নিয়মিত রূপটানে তারা পুরুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে থাকেন যৌবনের প্রান্তসীমায় পৌঁছেও।ছোটবেলায় আমার চোখে সবচেয়ে গ্রেসফুল সুন্দরী মহিলা ছিলেন তদানীন্তন পিএম শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী।


তার সিগনেচার স্ট্রিক অফ গ্রে হেয়ার তাকে আভিজাত্যের অনন্য মাত্রা দিয়েছিল। শুনেছি তিনি ত্বকের ঔজ্জ্বল্য বজায় রাখতে নারকেল তেল মাখতেন। পিওর দেশী জিনিস। কোস্টাল বেল্টের সব জায়গায় নারকেল গাছের ছড়াছড়ি। তবে পঞ্চাশের দশকে প্রসাধনী সামগ্রীর চাহিদা থাকলেও, সে রকম ভাবে নামকরা কোন দেশী কোম্পানি ছিল না। ইন্দিরা গান্ধীর ফেসক্রিম আসত ফ্রান্স থেকে। তখনকার দিনে অনেক অভিজাত মহিলারা, একপ্রকার বাধ্য হয়েই বিদেশী ক্রিম, পাউডার ব্যাবহার করতেন। তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু। স্বাধীনোত্তর দেশে তখন হেভি ইন্ডাস্ট্রি, ম্যানুফাকচারিং, কৃষি উন্নতি, এইসব ব্যাপার সরকারের প্রায়োরিটি লিস্টে।অন্ন, বস্ত্র বাসস্থানএই বেসিক জিনিষের জোগানে গভর্নমেন্ট ব্যাস্ত। মেয়েদের প্রসাধনী সামগ্রী দেশজ করার মত সময় বা মাইন্ডসেট, কোনটাই সরকারের নেই।

তবে অত্যন্ত আদরের কন্যাটির উপর নেহেরুর কড়া নজর। মেয়ের বিদেশী ক্রিম মাখাটা তার নজর এড়ায় নি। ইন্দিরার কাছে শুনলেন তার মেয়ের পরিচিত সব বান্ধবীরাই বিদেশী ক্রিম ব্যাবহার করেন। একেই বিদেশী মুদ্রার ঘাটতি। তার উপর এইসব মহার্ঘ প্রসাধনসামগ্রী কিনতে সরকারী কোষাগার থেকে ডলার বেরিয়ে যাচ্ছে। সেই সময়ে অত্যাবশকীয় নন-অত্যাবশকীয় পণ্যের লিস্ট তৈরী হল। নন এসেনশিয়াল আইটেম ইমপোর্ট করা যাবে না। এই তালিকায় বিভিন্ন বিউটি প্রোডাক্ট, যেমন ক্রিম, ফেস পাউডার, পারফিউমও ছিল। 

টাটা গোষ্ঠীর সঙ্গে সরকারের সুসম্পর্ক। জে আর ডি টাটা পন্ডিত নেহেরুর ব্যাক্তিগত বন্ধু। নেহেরু জরুরী ফোন করে টাটার কাছে আর্জি জানালেন, ভারতীয় মহিলাদের প্রসাধন সামগ্রীর ফ্যাক্টরি লাগানোর জন্য। আজকালকারআত্মনির্ভর ভারতএর প্রথম সোপানটি নেহেরুর হাত ধরেই শুরু হয়েছিল। স্বাধীন ভারতের সর্বপ্রথম মেকআপ ব্র্যান্ডল্যাকমে আত্মপ্রকাশ ১৯৫২ সালে।


আমি নিজেও কিছুদিন আগে পর্যন্ত ভাবতাম ভারতের অনেক মাল্টি ন্যাশানাল কোম্পানির মত ল্যাকমে- একটা ফরেন ব্র্যান্ড। এই ধারনা জোরদার হওয়ার একটা কারণ নামের মধ্যে একটা বিদেশী টাচ আছে এছাড়া ইংরাজি বানানেএর মাথায় একটা হসন্ত আছে। ফ্রেঞ্চ ওয়ার্ড ইংরাজিতে লিখলে অনেক সময় এটা দেখেছি, যদিও কারণ জানি না। আত্মপ্রকাশের সময় ল্যাকমে ছিল টাটা অয়েল মিল (টমকো) সাবসিডিয়ারি। টমকোর মূল কাজ ছিল নারকেল তেল এক্সট্রাক্ট করে এক্সপোর্ট করা। শুরু থেকেই প্রিমিয়াম ব্রান্ড হিসাবে ল্যাকমের পরিচয়। ভারতীয় ত্বক ট্রপিকাল আবহাওয়ার জন্য উপযুক্ত ক্রিমের রিসার্চ শুরু হল। যেমনটা আগে বলছিলাম, নামের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে ফ্রেঞ্চ কানেকশন ছিল ল্যাকমে ব্রান্ডের। জে আর ডি টাটার ওয়াইফ ছিলেন ফ্রেঞ্চ। জে আর ডি মূলত মহিলা ক্লায়েন্টদের চাহিদার কথা মাথায় রেখে নিজের স্ত্রী সিমোনে টাটাকে এমডি পোস্টে নিযুক্ত করেন। সিমোনে টাটা রিসার্চের জন্য কোলাবরেশন করলেন তখনকার দুই নামকরা ফ্রেঞ্চ বিউটি প্রোডাক্ট কোম্পানিরবার্ট পেগুয়েট’ (Robert Piguate) রেনোয়ার’ (Renoir) এর সঙ্গে। 

তবে ল্যাকমে নামকরণের ইতিহাসটা সত্যিই চমকপ্রদ।তখনো কোম্পানির নামকরণ হয় নি।


ফ্রেঞ্চ কোলাবরেশনের পর টাটা কিছু ভারতীয় কর্মচারীকে ফ্রান্সে পাঠালেন টেকনোলজি ট্রান্সফারের কাজে। কাজের ফাঁকে একদিন সবাই গেলেন বিখ্যাত ফ্রেঞ্চ অপেরাল্যাকমেদেখতে। সেখানেই জানা গেল এই অপেরার পরিচালক লিও ডেলিবেস ভারতীয় দেবী লক্ষীর ভক্ত। লক্ষী ঠাকুরের নামেই অপেরার নামল্যাকমে ফরাসীরালক্ষীউচ্চারণ করতে পারে না, তাইলক্ষীঅপভ্রংশ হয়ে ফরাসী উচ্চারণে নূতন অবতারল্যাকমে

নামটার মধ্যে ফরাসী টাচ আর ইন্ডিয়ান ফ্লেভারের সংমিশ্রন। একেবারে রাজযোটক। জে আর ডি কে আর বেশি নাম খোঁজার দরকার পড়ল না। ল্যাকমে নামটাতেই মনস্থির করলেন। সেই থেকে ল্যাকমের জয়যাত্রা। নামও সার্থক, ল্যাকমে শুরুর দিন থেকেই লক্ষীর বরপুত্র। ইন্ডিয়ান ভার্জিন বিউটি প্রোডাক্ট মার্কেট দখল করতে ল্যাকমের বেশীদিন লাগে নি। টাটা কোম্পানি চিরকাল কাস্টমারদের নিকটে পৌঁছানোর চেষ্টা করে। ল্যাকমে কোম্পানিতেও তার অন্যথা নেই। ১৯৮০ তে প্রথম ল্যাকমে স্যালুন (salon) খোলা হয়।

সাথে সাথে বিউটিশিয়ান দের ট্রেনিং এর স্কুলও খোলা হয়। ল্যাকমে ফ্যাশান উইক প্রতিবছর অনুষ্ঠিত হয়, যাতে গ্ল্যামার দুনিয়ার মডেল, ফিল্মস্টাররা অংশগ্রহন করেন। 

তবে ল্যাকমের হাতবদল হয় ১৯৯৬ সালে। নূতন মালিক হিন্দুস্তান ইউনিলিভার ২০০ 

কোটি টাকা দিয়ে ল্যাকমে কিনে নেয়। ল্যাকমের জয়যাত্রা আজও অব্যাহত। ভারতীয় বিউটি প্রোডাক্ট মার্কেটের পয়তিরিশ শতাংশ দখল করে রেখেছে ল্যাকমে।

দেবদত্ত

১৩/০৬/২৩

 

Comments

  1. খুব ভালো লাগলো

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

ত্রিবেনী তীর্থপথে ও আরো টিটবিট

রবিঠাকুর ও কিছু হাসি মশকরা

A walk to explore Delhi’s lesser known monuments