কত অজানারে

 কত অজানারে

কয়েকদিন আগে প্রভাতী চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে সংবাদপত্রের একটা খবরে চোখ আটকে গেল। দিল্লী মেট্রোতে এক স্বল্পবসনা সুন্দরীর ভিডিও সোশাল মিডিয়াতে ভাইরাল হয়ে ঘুরছে। 


টিন-এজারের শেষধাপে উত্তীর্ণ মেয়েটির নাম রিদম চানানা। আমার হার্টের রিদম বাড়িয়ে মনটা বেশ আনচান করে উঠল। এরকম একটা ব্যাপার ইনভেস্টিগেশন করে দেখতে সাধ হয়।


পুরাকালের কাঁচুলি আজকের দিনে মেয়েদের অন্তর্বাস ব্রেসিয়ার হিসাবে পরিচিত। ‘ব্রা’ আধুনিক যুগে ব্রাত্য সাবজেক্ট নয়। আনহুকিং দ্যা হুক পুরুষদের এ্যড্রোনিলের চাপ বৃদ্ধি করে। সেইরকমই এক অন্তর্বাসকে বহির্বাস করে, রিদম নাকি বিগত তিন-চারমাস এইভাবেই দিল্লির রাস্তায় ঘুরে বেরিয়েছে। একটু চমক লাগল। এটা এপ্রিলের শুরু। তার মানে দিল্লির হাঁড়কাপানো ঠান্ডায়। স্বল্পবসনা, ঠান্ডায় ইমিউন মনে হয়, যদিও ভয়ারিস্টদের ঠান্ডা কমানোর উত্তম দাওয়াই।  

নিষিদ্ধ ফল ভক্ষণের মজাই আলাদা। যুগে যুগে প্রেমিক কবি সাহিত্যিকেরা মেয়েদের বক্ষসৌন্দর্য নিয়ে বিস্তর লিখে গিয়েছেন। পুরাণকালেক্ষীণকটি-পীনপয়োধরা থেকে শুরু করে আধুনাকালে কবুতরের নরম-পেলব বুকের সঙ্গে তুলনা করেছেন। নারী বক্ষের সৌন্দর্য বর্ধনে নারী বাহিনী যথেষ্ট সচেতন। শিথিল কবরী, নারীর সৌন্দর্যবন্ধনে সহায়ক, কিন্তু শিথিল বক্ষ বিপরীত দিশা দেখায়। বক্ষসৌন্দর্য আটুট রাখতে ব্রেসিয়ারের অবদান যারপরনাই।  


ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাচ্ছে মেরী জেন ফেল্প নাম্নী উনিশ বর্ষীয়া মেয়ে ব্রেসিয়ারের আবিষ্কর্তা। মেয়েটি নিজের পরিধানের জন্য দুইটি রুমাল, কিছু পিঙ্ক রিবনের সাহায্যে নো-ফ্রিল ব্রেসিয়ার বানিয়ে ফেলে। এটি হল ব্রায়ের আদিপুরুষ। মেয়েদের এক্সক্লুসিভ ডোমেনে, ‘আদিপুরুষমানানসই হচ্ছে না, কিন্তুআদিনারীশব্দ এখনও বাজারে আসে নি। কিছুদিন পর থেকেই মেরীর কাছে আশপাশের মেয়েদের ডিমান্ড আসতে থাকে। বুদ্ধিমতী মেরী ১৯১৪ সালে এর পেটেন্ট নিয়ে নেয়। তবে ওয়ার্নার ব্রাদারস কিছুদিন পর মেরীর কাছ থেকে পেটেন্ট কিনে নেয়। মেরী- মেরি-মেকিং হল না, কারণ তখনও মেরী বুঝে উঠতে পারে নিএটা বিগিনিং অফফিউচার অফ পোটেনশিয়াল মাল্টি বিলিয়ন ডলার ইন্ডাস্ট্রি   


চোলি কি পিছে কেয়া হ্যায়দেখার জন্য কম-বেশী সব পুরুষই উদগ্রীব থাকেন। এটা অনেকটাযতক্ষণ শ্বাস, ততক্ষণ আশগোত্রের, অর্ধ-উন্মুক্ত বক্ষ অবলোকনে মনের কল্পনাশক্তি উচ্চ-কোটিতে উত্তীর্ণ হয়, নগ্ন বক্ষযুগল মানে কল্পনার সলিল সমাধি। যাই হোক ভারতের কথা ধরলে চোলা রাজত্বের সময় এই চোলির উৎপত্তি বলে ইতিহাসবিদরা জানাচ্ছেন।


খ্রিষ্টাব্দ ১৩০০ সাল নাগাদ, বিজয়নগর রাজত্বে চোলি বানাবার বিশেষ কারিগর থাকতেন। তাদের বলা হতচিপ্পিগা বুকের সঙ্গে চিপে থাকবে তাই হয়ত এই নাম, এটা অধমের অনুমান। 

বক্ষবন্ধনী ব্যাবহারের অধিকারও বৈদিক শ্রেনীবর্ণের সঙ্গে যুক্ত ছিল। উনিশ শতকে ট্রাভাঙ্কোরে নিম্নবর্নের মহিলাদের চোলি ব্যাবহারের জন্য আলাদা ট্যাক্স দিতে হত। এর থেকে আরও দুঃখজনক ঘটনা হল বুকের গঠন, সাইজ ইত্যাদির বিচারে ট্যাক্সের তারতম্য হত।

আজ থেকে তিরিশ চল্লিশ বছর আগে বঙ্গললনারা শাড়ীর ব্যাবহার বেশী করতেন। ব্লাইজের তলায় থাকত ব্রেসিয়ার। খোলা পিঠ দেখানোতে যৌনআবেদন মামুলী। তাই ব্লাইজের পিছনে পিঠের কাপড় ছোট হতে হতে তার নাম হয়ে গেল ব্রাউজ। 


বক্ষবিভাজিকা যার ইংরাজী নাম ক্লিভেজ, সেটাও স্তনের লাস্যময়ী আবেদনের মাধ্যম।


বিভাজিকার বিমোহন থেকে সন্ন্যাসীও চোখ ফেরাতে পারে কি না সন্দেহ। সত্যি কথা বলতে, পূর্ণ প্রকাশিত যুবতী-স্তনের আবেদনের থেকে অনেক বেশি টান ক্লিভেজের প্রতিশ্রুতি, সংকেত এবং আভাসে। কিন্তু সম্পূর্ণ উন্মোচিত স্তনের কোনও লুকনো নিশানা নেই।দুটি স্তন যেন গভীর বুকের কোনও এক শুভলগ্নে মন কষাকষি করে দুদিকে চলে গেল। আর রেখে গেল পুরুষের জন্য সেই স্তনসংকট বিভাজনের আশ্চর্য আলো সেক্স অ্যাপিল। 

মহিলারা একইসঙ্গে কমফর্ট, সেক্সি, সেনসুয়াল, ব্রেসিয়ারের পক্ষপাতী। এরকম ডিজাইন করতে বিজ্ঞান প্রযুক্তির সাহায্য অবশ্যম্ভাবী। ফিজিক্সের সঙ্গে ফাইন আর্টের একটা মাখো মাখো সম্পর্ক আছে। আইনস্টাইন ভালে বেহালা বাজাতেন। ব্রেসিয়ার ডিজাইনে স্তনযুগলের মুভমেন্ট মনিটরিং জরুরী। অসিলেটিং মুভমেন্ট স্টাডি করতে ট্রেডমিলে বিভিন্ন শেপ সাইজের মহিলাদের উন্মুক্তবক্ষে জগিং করতে বলা হয়। ব্রেস্টের মুভমেন্ট তার ভরকেন্দ্র অনুযায়ী সাপোর্ট সিস্টেম বানানো হয়। বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন মাস বা ভরকে যদি এ্যকসিলারেসন দিয়ে গুন করি তবে পাওয়া যাবে ফোর্স। এই ফোর্স-টাই, ফোর্সিং দ্যা ডিজাইনার টু  ডিজাইন ব্রেসিয়ার সাপোর্ট সিস্টেম। প্যাডেড, ননপ্যাডেড, ওয়্যার সাপোর্ট, নন-ওয়্যার সাপোর্ট মূলত এই চার ধরনের ব্রেসিয়ার আগে তৈরী হত। পুশআপ, স্ট্রাপলেস ইত্যাদিও ব্রায়ের রকমফের।

 আজকাল ইয়াং মেয়েরা নাকি বেশী পছন্দ করছে স্পোর্টস ব্রা। আধুনিক প্রমীলাবাহিনী, পুরুষের মনলুব্ধ চাহনির হাতছানি উপেক্ষা করে নিজস্ব স্বাচ্ছন্দ্যে বেশী মনোযোগী।

অমেরিকানরা অবশ্য সব পণ্যকেই বিজনেস মডেলে ফেলে পণ্যের বিক্রি বাড়ানোতে সিদ্ধহস্ত। ওখানে নামকরা ব্র্যান্ডরা  কেউ টিন এজারদের ব্রা, কেউবা, মধ্যবয়সনী অথবা বিগতযৌবনার ব্রেসিয়ারে স্পেশালাইজড।

ফিরে আসি রিদম চানানার কথায়। যেটা পরে জনসমক্ষে ঘোরাঘুরি করছে সেটার পোশাকী নাম ব্রালেট্ট্যে (bralette). নিজের স্বল্পবুদ্ধিতে প্রথমে ভাবলামরিভার” “রিভিউলেট” -এর মত ব্যাপার। ছোট সাইজের ব্রা হল ব্রালেট্যে, পরে চিন্তা করে ওটাকে বাদ দিতে হল কারণ ব্রা নিজেই সংক্ষিপ্ত জিনিষ, ওর ছোট সংস্করণ কি করে হবে! শব্দটার মধ্যে একটু ফরাসী ফরাসী গন্ধ আছে, আর ফ্রেঞ্চরা প্রেমিক বলে বাজারে সুনাম আছে। তবে গুগল করে যা বুঝলাম তা হল এটা অনেকটা ক্যাসুয়াল ওয়্যারের মত, অত ফিজিক্সের কারবার নেই, অনেকটা হল বক্ষযুগলকে- “আমাকে আমার মত থাকতে দাওটাইপের অধিকার প্রদান। তবে সাধারনভাবে ডিজাইনটা হলকাপএর উপরের কাপড় ট্রাঙ্গুলার শেপের। লাস্যময়ী করার জন্য স্ট্রাপে ইলাস্টিকের কারবার নেই। সত্যম, শিবম, সুন্দরমের মত ব্রা-এর তিন মূলমন্ত্র শেপ, সাপোর্ট লিফ্টে-কে তুড়ি মেরে নিজের কমফর্টকে বেশী প্রাধান্য দেওয়া। ব্রা সাধারণভাবে মহিলারা আন্ডার গারমেন্ট হিসাবে ব্যাবহার করেন। রিদমের মত সাহসী নূতন প্রজন্ম ব্রালেট্যে কে বহির্বাস হিসাবে ব্যাবহার করছে।  নিজের সৃষ্টিসুখের উল্লাস অবশ্যই কারো কারো কাছে দৃষ্টিসুখের উল্লাসে পরিগনিত হচ্ছে।

দেবদত্ত

১৪/০৪/২৩

Comments

  1. একটা অন্যরকম টপিক নিয়ে এত সুন্দর বিশ্লেষণ! এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেললাম।

    ReplyDelete
  2. ভালই লাগল।

    ReplyDelete
  3. La জবাব. Recharging the oldies.

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

ত্রিবেনী তীর্থপথে ও আরো টিটবিট

রবিঠাকুর ও কিছু হাসি মশকরা

A walk to explore Delhi’s lesser known monuments