ছানি


 ছানি

নয়ডা আই কেয়ার তল্লাটের নামকরা চোখের হাসপাতাল। ছানির জন্যহাতছানিদিয়ে ডাকছে।বাম চোখে ছানি কাটাতে হবে। হাতে কিছু হলে, ডান কি বাম, বেশ ম্যাটার করে, তবে দৃষ্টিশক্তির জন্য দুই চোখের একত্র কার্য্যকরিতা আবশ্যক। খালিশাস্ত্রে দুই চোখের  দুই রকম নিদান। বাঁ চোখ নাচলে  অশুভ ঘটার সম্ভাবনা, ডান চোখ নাচলে, লিঙ্গভেদে ভিন্ন ইন্টারপ্রিটেশন। মহিলাদের ক্ষেত্রে এটা অশুভ ইঙ্গিত ধরা হয়, তবে পুরুষদের ক্ষেত্রে এতে খুশীর বার্তা বয়ে আনার সম্ভবনা। নারীর নবজাগরণের ধ্বজাধারীরা, মনে হয় এই ধরণের প্রবাদ সম্বন্ধে অবহিত নন, তাই মোমবাতি মিছিল বার করেন নি। অবশ্য মামলার রায় জনগনের কোর্টে নয়, ভগবানের হস্তক্ষেপ লাগবে ভক্তবৃন্দকে লাইনে আনতে।

ছানির ব্যাপারটা অনেকটা আমের মত। পাকলে পরে আমের স্বাদ আর ছানি পাকলে (সবাই বলেন ম্যাচিওর) তবেই ডাক্তার ছানি কাটবেন। ছানি ব্যাপরটা আম জনতারআমরোগ বলা যায়। আম রোগ বলার কারণ এর জন্যঅপারেশনশব্দটি যদিও জড়িত, তবে নিতান্তই আলটপকা ধানিপটকা, চকলেট বোমা নয়। এরজন্য হাসপাতালের সুসজ্জিত ওটি দরকার নেই, ডাক্তারবাবুরা গ্রামে গ্রামে মোবাইল ভ্যানে গিয়ে ছানি অপারেশন করে সমাজসেবার অংশীদার হন। আর এর সুবিধা হল, ঝাঁকে কই এর মত, যে কোন জায়গায় গেলে ষাটোর্ধদের মধ্যে অর্ধেকের ছানি ধরা পড়বে। 

যাক গে, নিজের আলোচনায় ফিরে আসি।ডাক্তারের কাছে যাওয়ার আগে খোঁজখবর নেওয়ার জন্য, কলিগ ক্লাসমেট অসিতকে ফোন করলাম। কিছুদিন আগে এই হসপিটালে একই পথের পথিক হয়েছে।পূর্বসূরীদের জ্ঞানের আলোকপ্রাপ্তি আবশ্যক। অসিত একটু মাস্টারমশাই গোছের লোক। প্রশ্ন করলে খুশীমনে উত্তর দেয়, যতটা দরকার, তার দ্বিগুন খুঁটিনাটি সহকারে বুঝিয়ে ছাড়ে। আমাদের কোম্পানি অবসরপ্রাপ্তদের হসপিটালাইজেশন কেসে মানে ইনডোর পেশেন্টদের জন্য খরচা বহন করে। ধরেই নিয়েছিলাম, শুধু যদি হাসপাতালে রাত্রিবাস হয়, তবেই খরচার হাত থেকে রেহাই মিলবে। হাজতে রাত্রিবাস হলে , চাকরীতে সাসপেন্ড অবধারিত, কিন্তু হাসপাতালে এ্যাডমিশন নিয়ে রাত্রিবাস হল, টাকার সুরক্ষাবলয়। অসিত প্রথমেই সুখবর শোনাল, ক্যাটারাক্ট অপারেশন ডে কেয়ারে হবে এবং আমার পূর্বতন অফিস তা রিএমবার্স করবে, যদিও রাত্রিবাস নেই। যে ডাক্তারের কাছে করিয়েছে, তার নামও জেনে নিলাম, জ্যোতি বাটরা। সার্থক নাম- চক্ষুর জ্যোতিবর্ধন করছেন। অসিত বেশ ভালই ফিডব্যাক দিল ডাক্তার-ম্যাম সম্বন্ধে। হাসপাতালে গিয়েও দেখলাম ডাক্তার-বাবুর খরা, সবাই ডাক্তার-ম্যাম। 

যাই হোক ফোন করে এপয়ন্টমেন্ট নিয়ে নির্দিষ্ট দিনে হাজির হওয়া গেল। হাসপাতালের কাজকর্মে বেশ সিস্টেমেটিক এপ্রোচ। আজকাল সিনিয়ার ডাক্তারবৃন্দ-রাও উকিলের এপ্রোচ নিয়েছেন। বড় লইয়াররা কোন কেসের আগে যেমন জুনিয়ারদের থেকে ব্রিফিং নেন, এখানেও সেই একইরকম ব্যাপার। টিকিট কেটে জানা গেল প্রথমে যেতে হবে নার্সিং স্টেশনে।ইকোশব্দটা যেমন খালি ইকোলজির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই সব ধরণের ব্যাপারেইকোসিস্টেমআজকাল বহুল ব্যাবহৃত, তেমনি ‘স্টেশন’ বল্লে খালি রেলস্টেশন ভাবলে ভুল হবে- নার্সিং, রেডিও, সবেতেই ‘স্টেশন’ ঢুকে পড়েছে। 

প্রথমে নার্স এসে চোখে ড্রপ দিয়ে গেল। পাওয়ার চেক হল, একটু পর অপথ্যালমোলজিস্টের ঘরে ডাক পড়ল। এরা ডাক্তার নন, টেনিশিয়ান বলেই পরিচিত আজকাল ডিজিটাল জমানা। বছর দেড়েক আগে একবার এসেছিলাম। মোবাইল নম্বর দিয়ে পুরানো রেকর্ড চলে এল। টেকনিশিয়ান জানালেনআপ কো তো কালা কালা ডট দিখতা হ্যায়, পিছলে বার ইস লিয়ে আয়ে থে। আপ কো কালা মোতি মানে গ্লুকোমা কা খতরা হ্যায়।বল্লামনেহি স্যার- হাম তো আঁখোকা পাওয়ার চেক করানে আয়া থা।বুঝলাম, গতবারে কি কুক্ষণে পেশেন্ট হিস্ট্রিতে লিখেছিলাম আমার ঠাকুমার পঁচাশি বছর বয়েসে গ্লুকোমা হয়ে দৃষ্টিশক্তি লোপ পেয়েছিল। ডাক্তার ম্যাম (সেবার অন্য কেউ ছিলেন), আমাকে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখে, খসখস করে বেশ কয়েকটা টেস্ট লিখে দিলেন। হাজার তিনেক টাকা খসে গেল, টেস্টের রেজাল্ট যদিও নেগেটিভ এল। নিজের মনকে প্রবোধ দিলাম যে নেগেটিভ রিপোর্টে মনের সন্দেহের কাঁটাটা তো দূরীভূত হল।

এরপর আসল ডাক্তারের সঙ্গে সাক্ষাতকার। ডাক্তারনী- বেশ সুন্দর চেহারা। লম্বা, ফরসা, দৃষ্টিনন্দন। সফ্ট স্পোকেন। তবে বেশী নজর দেওয়া গেল না! সঙ্গে অর্ধাঙ্গিনী বিদ্যমান। একটা মেশিনের সামনে বসিয়ে লেন্সের মধ্যে দিয়ে একটা লাল স্পটকে নিশানা করতে বল্লেন। অনেক আগে, চাকরীতে থাকাকালীন হেল্থচেক আপে যেতে হত এসকর্ট হার্ট ইনস্টিটিউটে। তখন এত যন্ত্রপাতি ছিল না। চোখের রুটিন চেকআপ করতেন এক সুন্দরী মহিলা ডাক্তার। তার হাতে থাকত পেনসিল আকারের টর্চ। ওটা দিয়ে চোখে ফোকাস করে তার চাঁদবদন খানি আমার মুখের ইঞ্চি খানেক দূরত্বে এনে দৃষ্টি নিরীক্ষণ করতেন। সুবাসিত চূর্ণকুন্তলগুচ্ছের মাদকতা আর অতকাছে তার মুখ, সব মিলে রোমান্টিক পরিবেশ। আজকাল দেখছি যন্ত্রসভ্যতার দৌরাত্ব্যে ‘ফ্রিনজ’ বেনিফিটগুলো মিসিং

যাই হোক ডাক্তার জানালেন ছানি ‘ম্যাচিওর’ হয়েছে, কিন্তু চোখে নাকি ড্যানড্রাফ আছে। ছাত্রাবস্থায় চুলে খুব খুস্কি হত, জামার কলার শীতকালে সাদা হয়ে যেত। চোখে খুস্কি! ব্যাপরটা বেশ এনিগম্যাটিক আমার কাছে! আমার আবার এট্যেনশন ডেফিসিয়েন্সি সিনড্রোম আছে। সব কথা মন দিয়ে শুনি না। তা ছাড়া কথার ফাঁকে তাকে তখন জানাচ্ছিলাম, আমার বন্ধু অসিত আপনার কাছেই ক্যাটারাক্ট অপারেশন করিয়েছিল। তার ছানিটা ওভার ম্যাচিওর হয়ে গিয়েছিল বলে আপনি বকাবকি করেছিলেন। উনি বল্লেনযাদা তো ডাটা নেহি হোঙ্গে!” একটু তরলিত পরিবেশ!  একটা মলম আর আইড্রপ লিখে দশদিন পরে আসতে বল্লেন। সঙ্গে গিন্নী ছিল। পরে ফোনে, কোন বন্ধুকে বলছিলাম চোখে খুস্কি, সুমিতা ওভারহিয়ার করে বল্লতোমার কাছা খোলা স্বভাব যাবে না। ডাক্তারের সঙ্গে খেজুরে আলাপ করলে যা হয় তাই হয়েছিল, আসল কাজটা - যে ডাক্তার কি বল্ল, সেটা মন দিয়ে শোন নি। ডাক্তার বলেছে ‘আই-ল্যাশে’ ড্যানড্রাফ আছে। মলমটা চোখে নয়, আই ল্যাশে লাগাতে বলেছে।এরকম জ্ঞানপ্রাপ্তি মাঝে মাঝেই ঘটে থাকে! দিন দশেক পরে আবার হাসপাতালে উপস্থিত হলাম। বিলিং কাউন্টারের ঝামেলাতে না গিয়ে সোজা হলঘরে চলে গেলাম, যেখানে সারি সারি রুমে ডাক্তারদের চেম্বার। হলের একপাশে ওয়ার্কস্টেশনে এক সিস্টারকে বল্লামএই আমার প্রেসক্রিপশন। ডাক্তার বলেছে দশদিন পরে আসতে। এখন দেখাতে গেলে নূতন করে বিলিং করাতে হবে কি?” প্রশ্নটা করতেই হল, কারণ এটা সিলেবাসের বাইরে ছিল। অসিত সব পই পই করে বুঝিয়ে দিঁযেছিল, কিন্তু ওর এরকম দশদিন পর আসার দরকার পড়ে নি। সিস্টার জানাল ওয়েট করতে, সময়মত ডেকে নেবে। শুরু হল চাতকের পরীক্ষা। বসে বসে দুই বন্ধুর সঙ্গে ফোনালাপও হয়ে গেল। কিন্তু ডাক আর আসে না। মাঝে গিয়ে সিস্টারকে তাগাদা দিয়ে এলাম। ভবী ভোলার নয়।জ্যোতি বাটরালেখা রুমের দিকে জুলুজুলু মুখে তাকিয়ে আছি। মনে হল দরজা খুলে ডাক্তার বেরিয়ে যাচ্ছেন। মুখে মাস্ক। হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে বল্লাম-“ম্যাম একঘন্টা সে ইন্তেজার চল রহা হ্যায়, দশদিন বাদ বোলা থা চেক করেঙ্গে ড্যানড্রাফ হ্যায় কেয়া নেহি, ফির অপারেশন কা ডেট দেঙ্গে।উনি প্রেশক্রিপশন নিয়ে দেখেশুনে বল্লেনআপ মেরা পেশেন্ট নেহি হ্যায়।বলে কি! ভৌতিক ব্যাপার মনে হচ্ছে! মাস্কে ঢাকা মুখ ঠিক করে দেখতেও পাচ্ছি না। বল্লামবাহার বোর্ড মে জ্যোতি বাটরা লিখা হ্যায়, আপ ফির কোন হ্যায়?” ডাক্তারনি বল্লেনমেরা নাম ভি জ্যোতি বাটরা হ্যায়, লেকিন লাস্ট মে এক্সট্রাওহরিহ্যায়।


বাইরে বেরিয়ে দেখলাম সত্যিই তো বাইরে নাম লেখা জ্যোতি বাটরা ওহরি, তার পাশের রুমে ওনলি জ্যোতি বাটরা। বেশ বোকা বনলাম তো! এর আগের দিন যে রুমে জ্যোতি বাটরা ছিলেন, সেই রুমে আজ অন্যজন বসেছেন। সুতরাং ভুল হওয়াটা অস্বভাবিক নয়। যাই হোক একটু পরে জ্যোতি বাটরার ঘরে ডাক পড়ল। সব দেখে টেখে বল্লেন, এখন আর খুস্কি নেই, তবে ডান চোখে একটা আর্লি স্টেজ অফ ‘ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি’ মনে হচ্ছে। অতএব সন্দেহ নিরসনের জন্য একটা রেটিনা টেস্ট লিখে দিলেন। তিন হাজার আরো খসে গেল। এই জন্যই প্রবাদ আছে ডাক্তার, উকীল আর পুলিশ এদের কাছে যত কম যাওয়া যায় ততই ভাল নইলেবাঘে ছুঁলে আঠার ঘাঅবশ্যম্ভাবী। টেস্টের জন্য একটা রুমে যেতে হল। সারি সারি তিন চার রকম মেশিন। ভেবেছিলাম তিনহাজারি টেস্ট, সবগুলো মেশিনেই বসতে হবে। আমাকে একটা ছোট মেশিনে বসিয়ে একটা লেন্সের মধ্যে চোখ লাগিয়ে দেখতে বল্ল। ১৫-২০ সেকেন্ডের মধ্যে টেস্ট কমপ্লিট। টেকনিশিয়ান জানাল বাইরে অপেক্ষা করতে, পাঁচ মিনিটের মধ্যে রিপোর্ট পাওয়া যাবে। একটু হতাশ হয়ে বল্লাম- “তিন হাজারের টেস্ট এত তাড়াতাড়ি হয়ে গেল? বাকী মেশিনগুলোতে বসতে হবে না? এতো তিনশ টাকার টেস্ট মনে হল”। টেকনিশিয়ান বল্ল মেশিনের কস্ট, ইউটিলাইজেশন কস্ট সব মিলিয়ে টেস্টের দাম ঠিক হয়। আড়চোখে দেখে নিলাম, জার্মান মেক মেশিন। ‘জিএমবিএইচ’ লেখা আছে মেশিনের গায়ে, তার মানে জার্মান মেক। মনটা একটু খুঁতখুঁত করলেও, কি আর করা যাবে! একটু পরে টেস্টের রেজাল্ট চলে এল। রেডিওলজিস্ট রিপোর্টে সব নরমাল বলে লিখেছেন। তলায় সই দেখলাম এক বাঙালী মহিলা ডাক্তারের বাঙালী দেখে সাহস সঞ্চয় করে ঢুকে পড়লাম তার রুমে। উনি বরাভয় দিয়ে বল্লেন রিপোর্ট একদম ঠিক। যাক নিশ্চিন্ত। এর পরের গন্তব্য কাউন্সিলার। কাউন্সিলার এক মহিলা। হাসিমুখ এবং এফিসিয়েন্ট।  চার/পাঁচ রকম প্রসিডিওরে ছানি কাটানো যাবে। এক একটির এক একরকম দক্ষিণা। এটাকেফেকোইমালসিফিকেসনবলে। আলট্রাসাউন্ড দিয়ে ছানিওয়ালা “ক্লাউডি” লেন্সটাকে টুকরো টুকরো করে ভ্যাকাম সাকশন করে  নূতন লেন্স বসিয়ে দেওয়া হবে।  আমার কোম্পানি সবচেয়ে শস্তার একধাপ উপরের প্যাকেজটা রিএমবার্স করবে। পুরো প্যাকেজে দুটো পোস্ট অপারেটিভ ফলোআপ এবং নূতন চশমার পাওয়ার ইনক্লুডেড। উপরে উঠলে নিজের পকেট থেকে ডিফারেন্সটা যাবে। ৫০০০/- বেশী দিলে লেসার গাইডেড অপারেশন হবে। আমি বল্লাম ডাক্তারের খাটনি তো কমে গেল, তাহালে দাম তো কম হওয়া উচিত! ওই আবার মেশিনের হিডন কস্ট শুনলাম। অপারেশনের ডেট পাওয়া গেল ফোর্থ মে। আজকাল দিনের বেশ কিছুটা সময় কাটছে, দিনে তিন/চারবার দুই তিন রকমের আইড্রপ লাগিয়ে। প্রত্যেক ড্রপের মাঝে আবার দশ মিনিটের বিরতি। চাষের বীজ বপণের আগে জমি উর্বরের মত, চোখকে অপারেশনের জন্য তৈরী করা হচ্ছে। 

দেবদত্ত 

২৮/০৪/২৩


Comments

  1. দারুণ লাগল!চালিয়ে যাও!

    ReplyDelete
  2. Lekhata khub upobhogyo.,

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

ত্রিবেনী তীর্থপথে ও আরো টিটবিট

রবিঠাকুর ও কিছু হাসি মশকরা

A walk to explore Delhi’s lesser known monuments