Remembering Pranab-da, a rare personality
Remembering Pranab-da, a rare personality
প্রদীপদার সঙ্গে আমার আলাপ ৮৪/৮৫ সালে, যাদবপুর এল্যামনি এসোশিয়েসনের সূত্রে। তখন অনেক সিনিয়ার দাদারা সি আর পার্ক অঞ্চলে থাকতেন। এল্যামনির মিটিং হত সাধারনত সিনিয়ার মেম্বারদের বাড়ী ঘুরিয়ে ফিরিয়ে। ভাল স্ন্যকসের লোভে মিটিংএর এটেনডেন্স ভালই হত। বছরে একটা নাটক হত। সেটা সাধারনত হত মান্ডীহাউসস্থিত হিমাচল ভবনে। নাটকের কুশীলব এবং এরেন্জমেন্টের দায়িত্ব ছিল আমাদের মত ইয়াং ব্রিগেডের হাতে।
কয়েকজন সিনিয়ার দাদা এল্যামনির কাজে কর্মে ওতোপ্রোত ভাবে জড়িয়ে থাকতেন। এদের মধ্যে ছিলেন রজতদা (দাশগুপ্ত), শংকরদা, নির্মলদা, প্রদীপদা, অমলেন্দুদা, সুবীরদা, অজিতদা প্রমুখ। প্রদীপদার দাদার নাম ছিল প্রনব মুখোপধ্যায়। উনিও আমাদের কলেজের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার পাস আউট। শান্ত প্রকৃতির মানুষ। প্রদীপদা যেমন গল্পবাজ, উনার দাদা আবার একদম উল্টো। চুপচাপ থাকতে ভালবাসতেন। এল্যামনি এসোশিয়েশন থেকে প্রত্যেক বছর সেমিনার আয়োজন করা হত। বেশ বড় মাপের সেমিনার, সাধারনত এক্যাডেমিক লাইনের কোন টপিক বাছা হত। তখনকারদিনে মিনিস্টার বা সেক্রেটারী লেভেলের লোকেরা ইনেগুরেট করতে আসতেন। পত্রপত্রিকা থেকেও কভার করা হত এবং কাগজেও সেমিনারের খবর ছাপা হত। প্রনবদা সেমিনার সংক্রান্ত সব মিটিংএ থাকতেন। কিন্তু এল্যামনির অন্য কোন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তাকে পাওয়া যেত না। তাই প্রনবদার নাম এল্যামনির গ্রুপে প্রথমসারিতে থাকত না।
সমাজে কিছু কিছু ব্যাতিক্রমী ব্যাক্তিত্ব থাকেন যাদের চিন্তাধারা ও কর্মজীবনের দর্শন, সেই শ্রেনীর জনগনকে এক বিরল প্রজাতির মনুষ্যকুলের মধ্যে চিহ্নিত করে। এই ধরণের মানুষ ক্রমবর্ধমান ভোগবাদী সমাজের এক ক্ষয়িষ্ণু গোষ্ঠীর প্রতিভূ এবং প্রনবদা সেই গোষ্ঠীরই এক উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি ছিলেন। শুনেছিলাম প্রনবদা ব্যস্ত মানুষ। ঐ সময়ে প্রনবদা ছিলেন আইওসির ডাইরেক্টর আর এ্যন্ড ডি। ৮০র দশকের শেষের দিকে একটা সেমিনার হয়েছিল এল্যামনি এসোশিয়েশনের উদ্যোগে। সে সময়ে ফি বছরই সেমিনার হত। প্রনবদা ছিলেন প্রধান বক্তা। পেট্রল/ডিজেলের অক্টেন ভ্যালুর সঙ্গে গাড়ীর ইঞ্জিনের কি সম্পর্ক এটাই ছিল তার টপিক। একটা দুরুহ টপিককে কি ভাবে সাধারন করে বোঝান যায়, সেটা ছিল প্রনবদার ইউএসপি।
কিছুদিন আগে প্রনবদার ভাই প্রদীপদার সঙ্গে ফোনে গল্প চলছিল। সেইসূত্রে নিজের দাদার জীবনের বেশ কিছু ঘটনাবলী সম্বন্ধে জানা গেল। এইসব ইনসিডেন্ট প্রনবদার নির্লোভী, সৎ ও আদ্যোপান্ত এক্যাডেমিক জীবনদর্শনের দিকটির দিকে পাঠকের এক সম্যক ধারনা গড়ে তুলবে বলে আশা রাখি।
এই ঘটনাটা ৮৯ কি ৯০ সালের। প্রনবদা তখন আইওসির ডাইরেক্টর(আর এ্যন্ড ডি)। সে সময়ের মিনিস্টার অফ লেবার এ্যন্ড ওয়েলফেয়াররাম বিলাস পাসেয়ানের অফিসে ডাক পড়েছে মিটিংএর জন্য। এটা সবারই জানা পাবলিক সেক্টরের কর্তাব্যাক্তিরা সাধারণভাবে সরকারের ধামাধরা হয়ে থাকেন। কোম্পানির সব শেয়ারের মালিক সরকার। “বাবু যত বলে পারিষদ দল বলে তার শতগুন” এই নীতিতে আধা সরকারী বাবুরা বিশ্বাসী। পাসোয়ান সাহেবের প্রথম মিনিস্টারের চেয়ারে বসা। গদীতে বসার সেই ট্রাডিশন তিনি বজায় রেখেছিলেন আমৃত্যু, সুযোগমত দলবদল করে। যাক সদ্য মন্ত্রী হয়ে মাইনরিটিদের সুবিধা করার প্রবল ইচ্ছে। এ ব্যাপারে বলির পাঠা চিরকালই পাবলিক সেক্টর। যেমন ধরুন কয়েক বছর আগে সরকারের নির্দেশে আমার ভূতপূর্ব কোম্পানি এনটিপিসির বড় বড় ইঞ্জিনিয়াররা পাওয়ার স্টেশনের ডিজাইন ছেড়ে স্বচ্ছ ভারত স্কিমে টয়লেট ডিজাইনে লেগে পড়লেন। পাসোয়ান সাহেব সেই মিটিংএ জিজ্ঞাসা করলেন, “আপকা কোম্পানিমে কিতনা প্রতিষক কর্মচারী এসসি-এসটি হ্যায়?” প্রণবদা জানালেন মোট সাত পার্সেন্ট হ্যায়। রাম বিলাস বল্লেন, “ হায় রাম, ইতনা কম মে নেহি চলেগা, মিনিমাম বিশ পার্সেন্ট করিয়ে। এক কাম কিজিয়ে পেপার মে এ্যড দে দিজিয়ে নয়া রিক্রুটমেন্ট কে লিয়ে। দো মাহিনা মে প্রসেস কমপ্লিট করিয়ে।” প্রনবদা বল্লেন “এখন তো কোন স্যাংশনড ভ্যাকেন্সি নেই। ফিলহাল কোন রিক্রুটমেন্ট করা যাবে না” রামবিলাস তো চটে ফায়ার-“হাম মিনিস্টার বোল রহে হ্যায়, আপ তো এক এমপ্লয়ি হ্যায়।হামারা বাত শুননা পড়েগা”। রাম বিলাস ভাবেন নি যে “ইয়েস স্যার” ব্যাতীতও কিছু মেরুদন্ডওয়ালা লোক পৃথিবীতে আছেন। প্রনবদা ইংরাজিতে উত্তর দিলেন “ ওয়েল স্যার, আপনারা এপয়েন্টমেন্ট দিয়েছেন, চাইলে আপনারা আমাকে স্যাক করতে পারেন। কিন্তু আই এ্যম সরি, এ ধরনের অনুরোধ রাখা সম্ভব নয়। আমার মনে হয় আমার এই মিটিংএ থাকার কোন প্রয়োজনীয়তা নেই। আমার জিএম (এইচ আর) এখানে আছেন। ম্যানপাওয়ার সংক্রান্ত কোন জিজ্ঞাস্য থাকলে ওকেই জিজ্ঞাসা করবেন”। এই বলে প্রনবদা টাটা বাই বাই করে মিটিং ছেড়ে চলে গেলেন।
প্রনবদা তখন সদ্য ডাইরেক্টর হয়েছেন। পাবলিক সেক্টরের ডাইরেক্টরদের এশিয়াড ভিলেজে বাংলো দেওয়া হয়। জায়গাটা সাউথ দিল্লির এক পশ লোকালিটি। প্রনবদা কোয়ার্টারে শিফ্ট করেছেন। অফিসের গাড়ীতে ফেরার সময় দেখলেন বাংলোর দরজা খুলছে একটি লোক। গেটের পাশে একটা ছোট কাঠের গুমটি। প্রনবদা গাড়ী থেকে নামতেই সে এক বড়সড় সেলাম ঠুকল। প্রনবদার জিজ্ঞাসু মুখের দিকে তাকিয়ে বল্ল “হাম সিকিউরিটি গার্ড হ্যায় সাব। জিএম সাব নে ভেজা। ১২ঘন্টা মেরা ডিউটি, রাত ন বাজে মে দুসরা গার্ড আয়েগা আগলা বার ঘন্টাকে লিয়ে।” পরের দিন সকালে অফিসে পৌঁছে প্রনবদা জিএম আহুজাকে তলব করে কৈফয়ত চাইলেন “মেরা ঘরকা সামনে কিউ সিকিউরিটি গার্ড লাগায়া? আহুজা তো অবাক হয়ে জানাল “স্যার আপকা এনটাইটেলমেন্ট হ্যায় সিকিউরিটি গার্ড মিলনেকা”। প্রনবদার বক্তব্য “তুমি তো আমাকে জিজ্ঞাসা কর নি আমার সিকিউরিটি গার্ড চাই কিনা। বিকালে ফিরে যেন আমি দেখি গার্ড বিদায় হয়েছে।” বেচারা অহুজা কি আর করে, একবার আমতা আমতা করে বল্ল “সাব সচ মে আপকো নেহি চাহিয়ে, কোই কোই সাব তো গার্ড কা সাথ এক নোকর ভি মাঙতা হ্যায়! আপকো নেহি চাহিয়ে তো হটা দেঙ্গে।” পরে একদিন ভাই প্রদীপদাকে জানালেন “খালি একটা দরজা খোলার জন্য একটা লোক সারাদিন ওই গুমটির মধ্যে দাড়িয়ে থাকবে? ইনহিউম্যান ব্যাপার। দরজা তো আমার ড্রাইভার খুলতে পারে। সে রকম হলে আমি নিজেই খুলব। আর আমার সিকিউরিটির কোন দরকার নেই।” প্রদীপদা দাদাকে বল্লেন, “সে নয় লজিকটা বুঝলাম, কিন্তু একটা গরীব লোকের চাকরি চলে গেল। বেচারা খাবে কি?” প্রনবদা পরে এইচআর কে বলে লোকটার অন্য বন্দোবস্তো করে দিলেন। কয়েকদিন পর প্রদীপদা গিয়েছেন স্কুটার নিয়ে দাদার বাংলোতে। দেখলেন পাশের বাংলোর সিকিইরিটি গার্ড তড়িঘড়ি বেরিয়ে এসে প্রনবদার বাংলোর গেট খুলে দিল। প্রদীপদা একটু অবাক। পরে জানা গেল, বৌদি রোজ দুবেলা ওকে চা পাঠান।
প্রনবদা ছিলেন বেসিক্যালি এ্যকাডেমিশিয়ান। যাদবপুর থেকে ৫৫সালে কেম্যিকাল ডিপার্টমেন্ট থেকে প্রথম স্থান লাভ করে স্নাতক হন।প্রত্যেক ইয়ারের পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর পেতেন। প্রদীপদার কাছে জানতে পারলাম ফাইনাল পরীক্ষার আগে টাইফয়েড হওয়ার জন্য একমাস কলেজ যেতে পারেন নি। ফাইনাল পরীক্ষা দিয়েছ্লেন সিকবেড থেকে।প্রথমে ভেবেছিলেন একবছর ড্রপ করবেন। বন্ধুরা এসে নোট পড়ে শোনাত। সেই অল্প প্রিপারেশন নিয়েও প্রথম স্থান অধিকার করা আটকায় নি। মস্কো থেকে পিএইচডি করে এসে আইআইটি দিল্লিতে কেম্যিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াতেন।
সব সাবজেক্টেই তাঁর ইনটারেস্ট ছিল।
একবার প্রদীপদা দাদার কাছে গিয়েছেন আইআইটির কোয়ার্টারে। প্রনবদা বল্লেন “চল আমার সঙ্গে, আজ ডক্টর ভট্টাচার্য অংকের ক্লাস নেবে এম-টেকের ছাত্রদের। আমি যাচ্ছি ক্লাস এটেন্ড করতে, তুইও চল।” প্রদীপদার তো ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচির অবস্থা। কোনমতে কাটালেন দাদাকে। প্রনবদা পড়াশুনার ব্যাপারে এরকমই সিরিয়াস, নিজে এইচওডি হয়ে ছুটলেন ছাত্রদের সঙ্গে বসে অঙ্ক ক্লাস করতে। শেখার ব্যাপারে তার কোন ইগো ছিল না।
অন্য আরেকটি ঘটনা। প্রনবদা একদিন এসেছেন প্রদীপদার বাড়ী। প্রনবদা তখন আইওসির অফিসিয়েটিং চেয়ারম্যান। ব্যাস্ত লোক। প্রদীপদার মেয়ে তখন সদ্য কলেজে ভর্তি হয়েছে ম্যাথস অনার্স নিয়ে। প্রনবদা ভাইঝিকে জিজ্ঞাসা করলেন “কিরে অঙ্ক সব করতে পারছিস তো? বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না তো?” ভাইঝি জানাল কিছু অঙ্কে প্রবলেম হচ্ছে। প্রনবদা বল্লেন “বাবাকে জিজ্ঞাসা করেছিস?” ভাইঝি ঘাড় হেলিয়ে বল্ল “হ্যাঁ নিয়ে গিয়েছিলাম। বাবা কিছু করতে পারেনি।” প্রনবদা বকুনি লাগালেন ভাইকে “তুই কি আমার আগে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেছিস, এত তাড়াতাড়ি অঙ্ক ভুলে গিয়েছিস কেন?” প্রনবদা নিজেই লেগে পড়লেন অঙ্ক সলভ করতে। একটু পরেই প্রদীপদার ল্যান্ড লাইনে ফোন এল (মোবাইল জমানার আগে), প্রনবদার জন্য, ডাইরেক্টর মার্কেটিং ফোন করেছেন। তখন ইরান-ইরাক যুদ্ধ চলছিল। তেলের ক্রাইসিস। ক্রুড অয়েল এসেছে মিডলইস্ট থেকে। বম্বে পোর্টে বার্দিং করা যাচ্ছে না। দেরী হলে ডেমারেজ দিতে হবে। ইনটারেস্টিং অঙ্ক ছেড়ে লজিস্টিক সাপোর্টের এ্যডভাইস। প্রনবদার ঠিক পছন্দ নয়। ডাইরেক্টরকে বল্লেন, “এর জন্য আমায় কেন ফোন করছ? নিজে ডিসিশন নাও। বম্বে না হলে গুজরাটের কান্ডলা কি নীচে কোচি পোর্টে ডাইভার্ট কর।” তাড়াতাড়ি বক্তব্য শেষ করে আবার অঙ্ক নিয়ে পড়লেন।
পাবলিক সেক্টরের অলিখিত নিয়ম অনুযায়ী বড়সাহেবরা পার্সোনাল কোন কাজে অন্য শহরে গেলে, কিছু না কিছু কাজ দেখিয়ে ট্যুর বানিয়ে নেন। কে আর নিজের গাঁটের পয়সা খরচা করে যেতে চায়! প্রনবদা এ ব্যাপারে কক্ষনো কমপ্রোমাইজ করতেন না। ছুটি নিয়ে নিজে টিকিট কেটে যেতেন। অন্য শহরে গেলে, সেই শহরের অফিস থেকে প্রনবদার জন্য গাড়ী পাঠিয়ে দিত। প্রনবদা লগবুকে সাইন করে, “পার্সোনাল ইউজ” লিখে, বলে দিতেন যে বিলটা যেন দিল্লির হেড অফিসে পাঠিয়ে দেওয়া হয়, যাতে তিনি পেমেন্ট করে দিতে পারেন। নিজে অনেকদিন অব্দি বাড়ী করেন নি। ইন্ডিয়ান অয়েলের আগে ছিলেন ইআইএলএ। তখন ইআইএলএর এক হাউজিং সোসাইটির ফ্ল্যাট হচ্ছিল বিকাশপুরীতে। প্রদীপদা একবার দাদাকে জিজ্ঞাসা করলেন “তোমাদের সোসাইটির ফ্ল্যাট হচ্ছে। এপ্লাই কর। প্রনবদা কটমট করে তাকিয় বল্লেন-“আমার অত বাড়ীর দরকার নেই।কোম্পানি তো এইচআরএ দিচ্ছে। তোর দেখছি আজকাল বেশ নিজস্ব বাড়ীর দিকে ঝোঁক হয়েছে। যা টাকা জমিয়েছিস তাই দিয়ে এমবিএ করে ফ্যাল। তাছাড়া ওই সোসাইটির এ্যপ্লিকেশনের ডেট ওভার হয়ে গিয়েছে।” প্রদীপদাও নাছোড়বান্দা লোক। দাদার জন্য সুপারিশ করতে গেলেন হাউজিং এসোশিয়েশনের সেক্রেটারিকে। তিনি সব শুনে বল্লেন,” এপ্ল্যিকেশনের ডেট তো ওভার, তবে স্যার হচ্ছেন সবচাইতে নন-কনট্রোভার্সিয়াল লোক। কাউর কোন অপত্তি হবে না। দাদাকে বলুন একটা ফর্ম ভরে দিতে।” প্রদীপদাই শেষমেষ ফর্ম ভরে দাদাকে দিয়ে সই করিয়ে জমা দিলেন। সেই বিকাশপুরীর ফ্ল্যাটেই প্রনবদা ছিলেন আমৃত্যু।
দাদার কথা মেনে এমবিএ করে অবশ্য প্রদীপদার আখেরে লাভ হয়েছে। সরস্বতী লাভের সঙ্গে সঙ্গে কলেজে পড়িয়ে, আশি ছুঁইছুই বয়সে, কিঞ্চিৎ কাঞ্চনমূল্য লাভ করছেন।
তাঁর যাদবপুরের প্রাক্তন সহপাঠী ও ইআইএলের কলিগ হৃষীকেশ রায়ের লেখা থেকে জানতে পারলাম ১৯৬৬ সালের মার্চ মাসে আইআইটির অধ্যাপনা ছেড়ে, ইআইএল-এ যোগদান করেন। ঐ কোম্পানিতে তার কর্মক্ষমতার ভিত্তিতে সদ্য গঠিত আর এ্যন্ড ডি তে জিএম পদে উন্নীত হন। তিনি প্রধানত কাজ করতেন এনার্জি সেভিং ও হিট ট্রান্সফারের উপর। মূলত তার উদ্যোগে ইআইএল এ প্রসেস ইন্জিনিয়ারিং এ একটা শক্ত বেস তৈরি করা হয়েছিল। তার ফলস্বরূপ লাইসেন্সড টেকনোলজি বাদ দিয়ে সব ওপেন আর্ট রিফাইনারি সংক্রান্ত ব্যাপারে ইআইএল অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পেরেছিল। মাল্টিকম্পোনেন্ট ডিস্টিলেশন, সলভেন্ট এক্সট্রাকশন, হিট এক্সচেঞ্জার নেটওয়ার্ক সিনথিসিস ও অপটিমাইজেশন, রিএ্যাক্টর স প্রণবদা এই প্রচেষ্টার পুরোধায় ছিলেন। ইআইএল ভারতের একটি প্রেস্টিজিয়াস কন্সাল্টিঙ ইন্জিনিয়ারিং কোম্পানি হতে পেরেছিল।
তবে আমি প্রণবদার কর্মক্ষেত্র তার এ্যকাডেমিক স্কিল নিয়ে বিশদ আলোচনায় যেতে চাই না। তাঁর চরিত্রের বিশেষ দিকগুলি যা তাকে এক অনন্য মর্যাদার আসনে বসিয়েছে, জীবনের বিভিন্ন ইনসিডেন্টের মাধ্যমে, সেটাই পাঠকের সামনে তুলে ধরতে চাই।
এল্যামনির আরেক বরিষ্ঠ সদস্য অমলেন্দু দত্তদা সত্তর সালে আইআইটি খড়্গপুরের পড়ানোর চাকরী ছেড়ে দিয়ে ইআইএল কোম্পানিতে প্রণবদার ডিপার্টমেন্টে জয়েন করেন। অমলেন্দুদা জানালেন তখন বাক্স বাক্স পাঞ্চ কার্ড নিয়ে দিল্লী ইউনিভার্সিটির কম্পিউটারে প্রোগ্রাম রান করাতে যেতে। আরো দুই একজন কলিগও ঐ কাজে যেতেন, তবে সবাই বিভিন্ন সময়ে সুবিধা মত আলাদাভাবে ট্যাক্সিতে যেতেন। প্রণবদা একদিন ট্যাক্সি বিল এপ্রুভ করতে গিয়ে অমলেন্দুদাকে বল্লেন “তোমরা যখন একই জায়গাতে যাচ্ছ, তখন আলাদা ট্যাক্সিতে কেন যাও? একসঙ্গে যাও, তাহালে গভর্নমেন্টের টাকা বাঁচবে।” এর কিছুদিন পরে অমলেন্দুদাকে ধরে আবার বল্লেন, “ট্যাক্সিতে যাওয়ার কি দরকার, অটোতে গেলেই তো পার!” প্রণবদা যে শুধু জুনিয়ারদের উপদেশ দিতেন তা নয়,”আপনি আচরি ধর্ম পরেরে শিখায়” এর মত নিজেও প্লেনের বদলে ট্রেনেও যেতেন, যখন ওভারনাইট জার্নি থাকত, তাতে অফিসিয়াল সময় নষ্ট হত না।
তখন প্রনবদা ইআইএলে পোস্টেড। তার তিন বছরের টার্ম শেষ হওয়ার মুখে। আইআইটি দিল্লির ডাইরেক্টরের পোস্টের জন্য বিজ্ঞাপন বেরিয়েছে। লাস্ট ডেট অফ এ্যপ্লিকেশনের ডেটও ওভার। প্রনবদার কাছে হঠাৎ একদিন ফোন এল রিক্রুটমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যানের, “তুমি এপ্লাই কর নি কেন? আমার পছন্দের তালিকায় তুমি নম্বর ওয়ান। আগে তুমি আইআইটিতে পড়িয়েছ, একসেলেন্ট প্রফেসার ছিলে। এখন তুমি ফরচুন ফাইভ হানড্রেড কোম্পানির উঁচু পোস্টে আছ, এনাফ এডমিনিস্ট্রেটিভ এক্সপিরিয়েন্স, তুমি ফিটেস্ট ক্যান্ডিডেট। ডেট ওভার হয়ে গিয়েছে, সেটা অবশ্য ব্যাপার নয়, তুমি হ্যাঁ করলে আমি এপ্লিকেশন ডেট এক্সটেন্ড করে দেব।” প্রনবদা সবিনয়ে জানালেন, “না স্যার, আমি আইআইটির ডিরেক্টর হতে চাই না। ওইসব এডমিনিস্ট্রেটিভ কাজকর্ম ইজ নট মাই কাপ অফ টি। আমি রিসার্চ লাইনেই ঠিক আছি।”
এই ঘটনাটা ঘটেছিল যখন প্রনবদা আইআইটি, দিল্লিতে পড়াতেন। প্রনবদার এক অতিপরিচিত কলিগ তখন রাচীতে থাকেন। তিনি সস্ত্রীক আমেরিকা থেকে ফেরার পথে প্রনবদার বাড়ীতে ট্র্যানজিট প্যাসেঞ্জার হিসাবে এসেছেন। প্রনবদার তখন আইআইটির ক্যাম্পাসে ডুপ্লেক্স কোয়ার্টার। উপরে প্রণবদা সস্ত্রীক থাকেন, নীচের তলায় অতিথিরা আছেন। ব্যালকনিতে বসে প্রভাতী চায়ের পেয়ালা হাতে নিয়ে দাদার সঙ্গে গল্প করছেন প্রদীপদা। হঠাৎ প্রনবদার মিসেসেএর ঝটিতি প্রবেশ। রাগত স্বরে বৌদি বল্লেন, “কিরকম অভদ্র লোককে কোয়ার্টারে এনে তুলেছ?” প্রনবদার জিজ্ঞাসু মুখের দিকে তাকিয়ে বৌদি বল্লেন- “তোমার বন্ধুর ওয়াউফ কিছুক্ষণ আগে আমার কাছে এসে বলছেন, তার একটা ছোট ব্যাগ হারিয়ে গিয়েছে। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও পাচ্ছেন না।” ওই মহিলা এবার অম্লানবদনে বৌদির বেডরুমের ওয়ার্ডরোব খুলে দেখতে চাইছেন-প্যাকেটটা উনার রুমে বাইচান্স এসেছে কিনা। প্রনবদার মুখে কোন কথা নেই। এতে বৌদি আরো সুর চড়িয়ে বল্লেন,”উনি কি ভেবেছেন? আমি কি উনার জিনিস চুরি করেছি? প্যাকেটের কি পাখা আছে নীচে থেকে ফড়ফড়িয়ে উড়ে এসে আমার ওয়ার্ডরোবে সিঁধোবে! এরকম অভদ্র গেস্টের জন্য আমি লুচি ভাজতে পারব না। ওদের তাড়াতাড়ি বিদায় কর।” প্রনবদার মুখ ভাবলেশহীন। চায়ে একচুমুক দিয়ে বৌদিকে বল্লেন”আরে, এত রাগারাগি করছ কেন? তুমি তো কিছু নাও নি। ও তোমার ওয়ার্ডরোব দেখতে চাইছে। দেখিয়ে দাও। ওরও শান্তি হবে।হাজার হোক, আমাদের অতিথি।” বৌদি আরো রেগে দুপদাপ পা ফেলে বেরিয়ে গেলেন। প্রনবদার খুব একটা ভাবান্তর নেই। ভাইকে জিজ্ঞাসা করলেন,”তুই হলে কি করতিস?” প্রদীপদার গোটা ঘটনায় বেশ রাগ হয়েছিল। প্রদীপদা বল্লেন, আমি বলতাম, “দেখে নাও ওয়ার্ডরোব। সার্চ করার পর বলতাম-পত্রপাঠ বিদায় হও।” প্রনবদা প্রসঙ্গান্তরে চলে গেলেন। ঝুটঝামেলা তার পছন্দের তালিকায় নেই। একটু বেশী রকম ভালমানুষ। রাতে ডিনারের সময় সেই গেস্ট মহিলা খুব এপোলজেটিক ওয়েতে জানালেন, সেই ছোট প্যাকেট, একটা বড় প্যাকেটের মধ্যে লুকিয়ে ছিল। প্রনবদার আচরণে খুব একটা ভাবান্তর দেখা গেল না। এমনই ছিলেন প্রনবদা, তুচ্ছ জাগতিক ঘটনার উর্ধে।
আরেকবারের ঘটনা জানাই। এটা অবশ্য হালফিলে জানলাম প্রদীপদার কাছে, ফোনে নয়, প্রদীপদার বসন্তকুন্জের ডিডিএ ফ্ল্যাটে। প্রদীপদা সদ্য নেদারল্যান্ড থেকে ফিরেছেন। বৌদির আসতে কয়েকদিন দেরী। ডিউটি ফ্রী ফরাসী শ্যাম্পেন ও খালি বাড়ীর অবাধ স্বাধীনতার হাতছানি উপেক্ষা করার মত মনোবল কোনদিনই আমার ছিল না। সকাল দশটা নাগাদ বেরিয়েছি। মীরাট এক্সপ্রেসওয়েতে ওঠার আগেই প্রদীপদার ফোন- তুমি কোথায়? বল্লাম ‘প্রদীপদা, আপনাকে লাইভ লোকেশন শেয়ার করেছি। হোয়াটস্ এ্যপ খুলুন।” প্রদীপদা লাইভ লোকেশন ব্যাপারটা জানতেন না। আমাকে হোল্ড করিয়ে হোয়াটস্ এ্যপ খুলে সব দেখে থ্রিলড। বল্লেন “বাঃ.. এই তো তোমায় দেখা যাচ্ছে। কি রকম নেচে নেচে এগোচ্ছ। বল্লাম “কোন নাচ লাগছে, ভারতনাট্যম না কথ্থক? প্রদীপদার জবাব “ না হে, খাঁটি বাঙালীর রবীন্দ্রনৃত্য!”
যাক আবার প্রণবদার কথায় ফিরি। প্রণবদার পিএস (পার্সোনাল সেক্রেটারি) একদিন স্যারকে ইমপ্রেস করার জন্য জানাল “স্যার, আমি কয়েকদিন আগে পেট্রোলিয়াম মিনিস্টারের সাথে দেখা করে এসেছি। আমার দেশোয়ালি, কাছের লোক। স্যার, আপনি দেখা করতে চাইলে আপনার সঙ্গে এ্যপয়ন্টমেন্ট করিয়ে দিতে পারি।” বেচারা সেক্রেটারি, সদ্য পিএস হয়ে এসেছে, সে তো আর প্রণবদার কথা জানে না। ইমপ্রেশন জমানোর বদলে উল্টোটাই হল। প্রণবদা বল্লেন “ইউ কান্ট অফিসিয়ালি মিট হিম উইদাউট মাই পারমিশন। তো তুমি নিশ্চয়ই পার্সোনাল ক্যাপাসিটিতে দেখা করতে গিয়েছিলে। সো ইউ ক্যান্ট আননেসেসারিলি ওয়েস্ট মাই অফিসিয়াল টাইম উইথ ইয়োর পার্সোনাল স্টোরি। বেচারা পিএস এর মুখ চুণ। তখনকার দিনের দস্তুর অনুযায়ী “ঘোড়া ডিঙিয়ে ঘাস খাওয়া”র এরকম সুবর্ণসুযোগ পিএসইউর বড়কর্তারা হাতছাড়া করতেন না। প্রণবদা অবশ্য অন্য ধাতুতে গড়া।
এবারের ঘটনা সমূহ প্রণবদার এক জুনিয়ার কলিগের লেখা থেকে পাওয়া। বস অর্থাৎ প্রণবদার সঙ্গে মিশ্রাজী ফরেন ট্যুরে গিয়েছেন জার্মানির স্টুটগার্ট শহরে। আসার পরই সেই রাত্রে দুইজনে বেরিয়েছেন। বাইরে তখন তুষারপাত। বসের পূর্বঅভিজ্ঞতা অনুযায়ী, মিশ্রাজী যাত্রার আগেই শীতের পর্যাপ্ত পোষাক সঙ্গে নিয়ে এসেছেন। দুইজনের পরনেই ওভারকোট, টুপি, মাফলার, দস্তানা ইত্যাদি। হঠাৎ বস অর্থাৎ প্রণবদার পায়ে খুব বেশীরকম ঠান্ডা ফিল হচ্ছে। মিশ্রাজি নীচু হয়ে কারণ খুঁজে পেলেন, মেরামত করা চামড়ার জুতোর সেলাই খুলে, তার মধ্যে দিয়ে বরফ ঢুকে বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা। অগত্যা প্রণবদাকে তখনই মার্কেটের জুতোর দোকান থেকে জুতো কিনতে হল। সবচেয়ে সস্তারটাই কিনলেন, তবে সেটা বরফপাত থেকে রক্ষার উপযুক্ত। পুরানো জুতো জোড়া অবশ্য ফিরতি রাস্তাতেও সঙ্গে ছিল, ইন্ডিয়াতে আবার সারিয়ে ব্যাবহার করবেন বলে। তখনকারদিনে ফরেন ট্যুরে গেলে সবাই মিনিমাম লাগেজ নিত, কারণ ফেরার সময় সুটকেস বোঝাই করে লোকজন “ফরেন গুড” যেমন ভিসিআর, চকলেট, পারফিউম নিয়ে আসত। সতর্ক থাকতে হত যাতে ওয়েট না এক্সিট করে যায়। প্রণবদার বিদেশী জিনিষের প্রতি লোভ ছিল না। তাই ওজন কমাবার জন্য জুতোজোড়া ফেলে আসার কথা ভাবেন নি। ১৬দিনের ট্রিপ ছিল, অফিসের কাজ, কনফারেন্স সব মিলিয়ে। মিশ্রাজি লক্ষ করছেন, প্রণবদা খুব টিপে টিপে খরচা করছেন। এর কারণটা হল, প্রণবদা মোট ২৬ দিন থাকবেন, শেষ দশদিন নিজে ছুটি নিয়ে জার্মানির গবেষণাগারগুলি ঘুরে দেখবেন, সেখান থেকে আইডিয়া জেনারেট করে সদ্যপ্রতিষ্ঠ আইওসির আর এন্ড ডি তে কাজে লাগাবেন। নিজের পয়সা ও ছুটি খরচা করে কোম্পানির কাজ করা, বিশেষত পাবলিক সেক্টর এনভায়রনমেন্টে এক বিরল ঘটনা। এই প্রসঙ্গে নিজের কর্মজীবনের প্রথমদিকের একটি ঘটনা মনে পড়ল। সদ্য ট্রেনিংএর পর ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টে পোস্টিং হয়েছে। কাজ পেয়েছি ফরাক্কা প্রোজেক্টের স্কিমেটিক ড্রইং বানানোর। মহা উৎসাহে পরেরদিন লাজপতনগর মার্কেট থেকে পেন্সিল, স্কেল, ইরেজার কিনে এনেছি-ড্রইং বানাব। আমি গ্যাঁটের কড়ি খরচা করে কিনেছি শুনে বাকী সিনিয়ার কলিগদের সে কি হাসাহাসি। এসবকিছুই স্টোরে পাওয়া যায়। বসকে দিয়ে সাইন করিয়ে রিকুইজিশন দিতে হবে। শুরুতেই বিড়ালের লেজ কাটা জানা হয়ে গেল। দ্বিতীয়বার আর এ ভুল করি নি।
প্রণবদার কথায় ফিরি। ১৯৮৯ সালে প্রণবদা ফ্রান্সে গিয়েছেন ট্যুরে। ঐ সময়ে বিদেশে গেলে প্রতিদিনের খরচা হিসাবে, যে কয়দিন ট্যুর হবে সেই হিসাবে ডলার পাওয়া যেত। ফিরে এসে সবাই ট্যুর বিলে সার্টিফাই করে লিখে দিত পুরো টাকা খরচা করে এসেছে। কখনও শুনি নি কেউ ফরেন ট্যুর করে এসে এ্যকচুয়াল খরচা হিসাব করে ডলার ফেরত দিয়েছে। কিন্তু আমাদের প্রণবদা অন্য ধরণের মানুষ। খরচার বাইরের অতিরিক্ত জলার হিসাব দেখিয়ে কোম্পানিতে জমা করে দিলেন।
তখনকার দিনে পিএসইউতে আজকালকার তুলনায় কম মাইনে ছিল। ফরেন ট্যুর খুব লুক্রেটিভ হত, কারণ ডলারের এলাউন্স বেশ ভাল পাওয়া যেত। সবাই চেষ্টা করতেন কি ভাবে ফরেন এ্যসাইনমেন্ট বাগানে যায়। নির্লোভী প্রণবদা ফরেন ট্যুর পারতপক্ষে এড়িয়ে চলতেন। অধিকাংশ জায়গাতে অধীনস্ত কর্মচারীদের পাঠাতেন। তাদের কর্মক্ষেত্রে যথাযথ ডেভেলপমেন্টের জন্য প্রণবদার প্রখর নজর ছিল।
তাঁর বন্ধু ও সহপাঠী হৃষীকেশ বাবু তাকে একবার জিজ্ঞাসা করেছিলেন, কেন প্রণবদা রিটায়ারমেন্ট অব্দি ইন্ডিয়ান অয়েলের চেয়ারম্যান থাকলেন না। প্রণবদার উত্তর ছিল, তিনি রিসার্চ লাইনটা মিস করছিলেন, তাছাড়া চেয়ারম্যান থাকলে পল্যিটিকাল লিডার, মন্ত্রীদের আনডিউ ফেভার করতে হয়, অনেক রকম এ্যডমিনিস্ট্রেটিভ কাজকর্ম সামলাতে হয়, এসব প্রণবদার পছন্দ নয়। উচ্চপদের মোহ তাঁর কোনদিন ছিল না।
মিশ্রাজি লিখছেন - তখন প্রণবদা আইওসির অফিসিয়েটিং চেয়ারম্যান। ফরিদাবাদের অফিস থেকে দিল্লি এসেছেন চেয়ারম্যান সাহেবের সাথে মিটিংএ। মিটিং শেষে জানালেন তিনি কি মিশ্রাজিদের গাড়ীতে লিফ্ট নিতে পারেন বাড়ী যাওয়ার জন্য, কারণ তার কাছে গাড়ী নেই। চেয়ারম্যানসাহেব যাবেন তাদের সঙ্গে, পরম সৌভাগ্য। ড্রাইভার পিছনের সীট পরিষ্কার করছে, বড়সাহেব বসবেন। মিটিং শেষে প্রণবদা নিজেই তার অফিসের ভারী ব্যাগ তুলে গাড়ীতে এসে সামনের সীটে বসে গেলেন, যাতে বাকীদের সুবিধা হয়। সিনিয়ার গাড়ীতে পিছনে বসবেন এরকমই অলিখিত নিয়ম। তবে প্রণবদা এইসব তুচ্ছ প্রটোকলের ধার ধারতেন না। বাড়ীতে এসে মিশ্রাজী সহ আরো দুই কলিগ কে চা খেতে ডাকলেন। সঙ্গে ড্রাইভারও এল। পাশাপাশি চেয়ারে তাকেও বসালেন।
প্রণবদার রিটায়েরমেন্টের দিন। আগেরদিন রাত অব্দি অফিসের কাজ করেছেন। সকাল থেকে তার সঞ্চিত বিভিন্ন টেকনিক্যাল পেপার, বই, ম্যাগাজিন গুছাচ্ছেন আর লিস্ট বানাচ্ছেন। লাঞ্চের পর আর এন্ড ডির সব অফিসারকে ডেকে যা তিনি পরম যত্নে সঞ্চিত করেছিলেন সব বিলিয়ে দিলেন। আমাদের মনে রাখতে হবে সে সময় নেট, গুগল, মোবাইল তো দূরের কথা পিসি- সবেমাত্র মার্কেটে এসেছে। বিদেশী জার্নাল বা পেপারে প্রকাশিত গবেষণা ও নূতন টেকনোলজি সংক্রান্ত খবর নলেজ বর্ধনের একমাত্র সহায়ক ছিল। আর আর এন্ড ডি তে তার চাহিদা বেশী হবে এটাই স্বভাবিক। মিশ্রাজি অবাক হয়ে প্রণবদাকে বল্লেন “স্যার , আপনি এত মূল্যবান নিজস্ব সংগ্রহ নিজে না নিয়ে কেন দিয়ে যাচ্ছেন? যে পাচ্ছে সে তো এর যথার্থ ব্যাবহার না-ই করতে পারে!” প্রণবদা মিশ্রাজিকে বোঝালেন “দেখ, এগুলো কোনটাই আমার নিজস্ব নয়, অফিসিয়াল ক্যাপাসিটিতে থাকাকালীন পেয়েছি, তাই আমার পরেও যারা এই ডিপার্টমেন্টে থাকবে, তাদেরকেই তো দিয়ে যাব। তাদের মধ্যে একজনও যদি কাজের সূত্রে এইসব ডকুমেন্টের সাহায্য নেয় তবেই আমার এই কাজ সার্থক। আর আমার ভবিষ্যতের প্রয়োজনে যদি লাগে, তার জন্য আমি যে লিস্ট বানিয়েছি, তাতে যাকে যেটা দিয়েছি লেখা আছে। লিস্টের একটা কপি আমার কাছে রাখলাম।
এই প্রসঙ্গে নিজের অভিজ্ঞতা বলি। আমিও এক পিএসইউ তে চাকরী করেছি। যে সব ইকুইপমেন্ট বা প্যাকেজ এওয়ার্ড হত, স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী ১২ কপি ম্যানুয়াল পাওয়া যেত। সবই হার্ড কপি। তখন সফ্ট কপির জমানা আসে নি। দুই কপি হেড অফিসে আর দশ কপি সাইটে। সব কপি বসেরা নিজেদের আলমারীতে লুকিয়ে রাখতেন। নলেজ ডোমেন এক্সক্লুসিভ নিজের কুক্ষিগত করে রাখার চেষ্টা।
প্রণবদা তখন রিটায়ার হয়ে গিয়েছেন। মিশ্রাজি একদিন প্রণবদার পুরানো ড্রাইভারকে ডেকে জিজ্ঞাসা করেছেন -“সাহেব কেমন লোক ছিলেন?” ড্রাইভার বল্ল, “সাব, হামনে বহুত সাব কা গাড়ী চালায়া, লেকিন মুখার্জী সাব য্যায়সা সজ্জন আউর ইমানদার আদমি নেহি দেখা। অফিস কা কাম কা এলাবা কভি গাড়ী ইউস নেহি করতে থে। কভি পার্সোনাল কাম মে যাতে থে তো, মিটার রিডিং নোট করকে, উসি হিসাব সে রুল কি মোতাবেক পয়সা অফিস মে জমা করতে থে।” তখনকার দিনে এরকমটা ভাবাই যেত না। আশির দশক কি নব্বই দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত খুব কম লোকের নিজস্ব গাড়ী থাকত। অফিসের গাড়ী বড়সাহেবরা নিজের কাজে যথেচ্ছ ব্যাবহার করতেন। অলিখিত নিয়মের মত।
ড্রাইভার জানাল বড়সাহেব সবাইকে, সে জিএম হোক কি চাপরাশী কি ড্রাইভার সবাইএর সঙ্গে মার্জিত ব্যাবহার করতেন। প্রত্যেক দেওয়ালীতে ড্রাইভার ও তার বৌকে গরম জামাকাপড় উপহার দিতেন। মিশ্রাজি বল্লেন “সাহেব কি নিজের টাকা থেকে দিতেন, নাকি দেওয়ালী গিফ্ট পাওয়া জিনিষ দিতেন?” ড্রাইভার বল্ল উনাকে কোনদিন কোন দেওয়ালি গিফ্ট বাড়ীতে নিয়ে যেতে দেখে নি। নিজের টাকা থেকেই ড্রাইভারকে জামা-কাপড় কিনে দিতেন।
মিশ্রাজির রিটায়ারমেন্টের আগে প্রণবদার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ ছিল। কথাবার্তা সাধারনত টেকিনিক্যাল ব্যাপারেই সীমাবদ্ধ থাকত। অনেক আগে পেট্রল, ডিজেলে লেড মেশান হত। পরিবেশবাদীরা তখন লেড পয়জনিং নিয়ে তখন খুব শোরগোল করত। প্রণবদার মেন কাজ ছিল ভেহিকুলার পলিউশন কি ভাবে কম করা যায় তারই বিভিন্ন উপায়ের সন্ধানে। কোন নূতন তথ্য পেলেই প্রণবদা তাই নিয়ে মহা উৎসাহে ডিসকাশনে মত্ত হয়ে যেতেন।
কালের নিয়মে মিশ্রাজিও রিটায়ার হয়ে গেলেন। কথাবার্তা কমে গেল। একদিন প্রণবদার ফোন এল। পরিণত বয়েসে যা হয়, শরীর-স্বাস্থ্য নিয়ে কথাবার্তা হল। কথায় কথায় প্রণবদা জানালেন - পেনশনের টাকায় সংসার চালানো দুরূহ হয়ে পড়েছে। উনি মাত্র ৯৭৯/- পেনশন পান। সে কি কথা। মিশ্রাজি অবাক। সালটা নব্বই দশকের শেষভাগে। মিশ্রাজি বিষ্ময় প্রকাশ করে জিজ্ঞাসা করলেন,’স্যার- এত অল্প টাকায় সংসার চলছে কি করে? প্রণবদা একটু চুপ করে বল্লেন “তোমার ভাবিজী এই বয়সে স্কুলে পড়াচ্ছেন। এছাড়া সরকার থেকে ছোটখাট রিপোর্ট বানানোর জন্য মাঝে মাঝে কিছু টাকা পাই। তবে আমার জীবনধারণের ডিমান্ড কম, তাই চলে যাচ্ছে।” মিশ্রাজি ফোন রেখে ভাবুক হয়ে পড়েছেন। আদ্যোপান্ত এই ভাল মানুষটি, নিষ্ঠাভরে কর্মজীবন কাটিয়েছেন, দেশের উন্নতি প্রকল্পে তার সরাসরি অবদান রয়েছে, কিন্তু নিজের আখেরটা গুছিয়ে নেওয়ার মত মানসিকতা ছিল না, আজ তাই তাকে এই দুর্দিন সইতে হচ্ছে। বিদেশ হলে এরকম ট্যালেন্টকে মাথায় করে রাখত।
মিশ্রাজি যদিও বেশ কিছু পরে রিটায়ার করেছেন, তবে প্রণবদার থেকে অনেক তলার পোস্টে, মিশ্রাজির পেনশন ৬০০০/- টাকা। প্রণবদা যদিও দীর্ঘ পয়ত্রিশ বছর চাকরী করেছেন, ভারত সরকারের অধীনে, কিন্তু ইন্ডিয়ান অয়েলে ছিলেন নয় বছর। আগের সার্ভিস কাউন্ট না হওয়াতে পেনশন ছিল কম। এখন কম্পিউটারের জমানায়, পিএফ, সার্ভিস রেকর্ড সবই অটোমেটিক আপডেট হয়। আগেকার কালে নিজেদেরকেই তদ্বির তদারক করে নিজের সার্ভিস বুক ঠিক রাখতে হত। বিশেষত অর্গানাইজেশন চেঞ্জ হলে, ক্ল্যারিক্যাল কোন মিস্টেক, দেন এ্যন্ড দেয়ার, ঠিক না করলে ভবিষ্যতে দুর্ভোগ থাকত। যে প্রণবদা অর্থকরী বিষয় থেকে অনেকটাই দূরে থাকতেন (অনেকটা রামকৃষ্ণের “টাকা মাটি, মাটি টাকার মত), তাই তাকে বৃদ্ধ বয়েসে নিরুপায় হয়ে এভিডেভিট বানিয়ে উচ্চ পেনসনের আবেদন করতে হল। পেনশন বেড়ে তিনহাজার টাকা হয়েছিল।
মিশ্রাজি নিজের স্মৃতি চারণে লিখেছেন -“ এক এক সময় ভাবি স্যারের সঙ্গে অফিসিয়াল সম্বন্ধ ছিল, উনার কাছে কাজের সূত্রে অনেক জেনেছি, কিন্তু সত্যি কথা বলতে কোনদিন আমায় কোন পার্সোনাল ফেভার করেন নি, তবে কেন আমার সঙ্গে যোগাযোগ শেষ সময় পর্যন্ত ছিল। অনেক ভেবে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি, স্যারের চরিত্রের সন্তভাব, তাঁর প্রগাড় পান্ডিত্য, নির্লোভ মন, মানবিক মূল্যবোধ, ডাউন টু আর্থ মনোভাব, এইসব গুণ আমায় বাধ্য করেছে, তাকে এক শ্রদ্ধার আসনে বসিয়ে রাখতে।”
আমার নিজস্ব উপলব্ধিতে বলি, অতীত কর্মজীবনে যখন উঁকি দিই, তখন অসংখ্য সিনিয়ারদের মধ্যে মাত্র দুই একজনকেই মনে আছে তাদের চরিত্রমাধুর্যের জন্য।
প্রণবদাকে ভারতীয় সরকারের পক্ষ থেকে অয়েল ফিল্ডে রিসার্চ এ্যন্ড ডেভেলপমেন্টের কাজের জন্য “লাইফ টাইম এচ্যিভমেন্ট” পুরষ্কার গ্রহন করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং এর হাত থেকে।
এই দিকপাল, কর্মযোগী, প্রচারবিমুখ মানুষটির দেহত্যাগ ঘটে ২০০৯ সালে। তাকে আমার সশ্রদ্ধ প্রণাম।
দেবদত্ত
০৮/০৩/২৩




Comments
Post a Comment