স্মৃতির অন্তরালে
স্মৃতির অন্তরালে
৬ই জুন ১৯১৯।জালিয়ানওয়ালা বাগের হত্যাকাণ্ডের নৃশংসতায় ব্যথিত রবীন্দ্রনাথ তার আগে ‘স্যার’ উপাধি ত্যাগ করেছেন। ব্রিটিশ শাসকের প্রতি প্রেরিত তাঁর প্রতিবাদ পত্র তাঁর মুখেই শুনতে চাইলেন এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু। বন্ধুটির মৃত্যু শয্যায় ছুটে গেলেন রবীন্দ্রনাথ। কিন্তু হায়, কবির পাঠ শুনতে শুনতে ঘুমের দেশে তলিয়ে গেলেন বন্ধু। বাড়ি ফিরে গেলেন কবি। পরে খবর পেলেন সেই সুন্দর ঘুম আর ভাঙেনি তাঁর বন্ধুর। এই অনুজপ্রতিম বন্ধুটি হলেন বঙ্গলক্ষ্মীর বরপুত্র রামেন্দ্র সুন্দর ত্রিবেদী (২০-০৮ – ১৮৬৪ — ০৬-০৬- ১৯১৯)।
রামেন্দ্র সুন্দর ত্রিবেদী, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক। কিন্তু তিনি বর্তমান প্রজন্মের বাঙ্গালির কাছে তেমন ভাবে পরিচিত নন। তার কর্মকান্ডের সমসাময়িক কালটি ছিল বাংলার রেনেসাঁস পিরিয়ড। এই সময়ে অনেক যুগপুরুষের কর্মক্ষেত্র বঙ্গ তথা ভারতে বিস্তৃত ছিল। দুইশত বৎসর আগে রামেন্দ্র সুন্দরের পূর্বপুরুষ মুর্শিদাবাদের কান্দিতে বসবাস শুরু করেন।অত্যন্ত মেধাবী রামেন্দ্র সুন্দর ছাত্রজীবনে বরাবর প্রথম হয়ে এসেছেন। ১৮৮৬তে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় প্রথম স্থান পেয়ে কলকাতায় আসেন কলেজে পড়তে। এরপর প্রেসিডেন্সীতে বি.এ ফিজিক্সে প্রথম শ্রেনীতে প্রথম ও পরে এমএতেও ফার্স্ট হন। প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ স্কালারের অধিকারী ছিলেন। এত মেধাবী হওয়া সত্বেও তিনি বাংলা ভাষা, বাংলা সংস্কৃতির উন্নয়নে জীবনের শেষদিনটি পর্যন্ত উৎসর্গ করে গিয়েছেন। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনে তার বিশেষ অবদান ছিল। বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদস্বরূপ তার কান্দির বাড়ীতে পাঁচশতের অধিক মহিলা একত্রিত হয়ে, তারই রচিত বঙ্গলক্ষীর ব্রতকথা পাঠ করে, অরন্ধন পালন করে, বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান। মনে রাখতে হবে সেই সময়কালে মহিলারা অন্তঃপুরবাসিনী থাকতেন, একত্রিত হয়ে রাজশক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ একটি দুর্লভ ঘটনা।
কান্দিতে রামেন্দ্র সুন্দরের জন্মভিটাআজীবন বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের হয়ে কাজ করে গিয়েছেন। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ ছিল বলেই সারা বাংলায় মাতৃভাষা চর্চাতে জোয়ার আসে। এই পরিষদের জন্য ভবন নির্মাণের স্বপ্নকেও সাকার করেছিলেন তিনি।পরিষদের দাবি ছিল বলে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তর প্রদানের ভাষা মাধ্যম হিসেবে যেন বাংলাভাষাও মনোনীত হয়।১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে দীক্ষান্ত ভাষণ পঠিত হল বাংলায়। কথক — ঠাকুর রবীন্দ্রনাথ ।
অনেকে বলেন বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদে ওতোপ্রোতভাবে যুক্ত থাকায় রামেন্দ্র সুন্দর ত্রিবেদীর সাহিত্যকর্ম সেই মাত্রায় পৌঁছায় নি, যা তার প্রখর বৈজ্ঞানিক সত্তায় বিরাজমান ছিল। সত্যেন্দ্র নাথ বসু লিখেছেন-“আমাদের দুঃখ হয় ‘বিদ্যার এতবড়ো জাহাজ’ কোন চিরস্থায়ী সম্পদ নামানো সম্ভব হল না। তার রচনাবলী বেশীরভাগ সাময়িকীতে প্রকাশিত প্রবন্ধে ভরা।”
তার পঞ্চাশ বছরে, রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন - “ তোমার হৃদয় সুন্দর, তোমার বাক্য সুন্দর, তোমার হাস্য সুন্দর, হে রামেন্দ্রসুন্দর, আমি তোমায় সাদর অভিনন্দন করিতেছি”।
তৎকালে, পোস্ট বঙ্কিম সাহিত্যে, বিংশ শতাব্দীর শুরুর থেকে বাংলা গদ্যে সাধুরীতির পরিবর্তে চলতি রীতি শুরু হয়েছে। অক্ষয় কুমার দত্ত, রাজেন্দ্র লাল বসু, ভূদেব মুখোপধ্যায় ও বঙ্কিম স্বয়ং, বিজ্ঞান ও দর্শনের উপর লেখা, ভাষারীতি ও গাম্ভীর্যের দ্যুতিতে তখনও সাধুভাষা সমৃদ্ধ।
গুরুগম্ভীর তথ্যপূর্ণ, জটিল ভাষাকে দরবারি ছাঁচ থেকে, সরস বৈঠকী ধাঁচে পরিবেশন শুরু করেন রামেন্দ্র সুন্দর ত্রিবেদী। এক বিশিষ্ট সমালোচক লিখেছিলেন “বাক বৈভব রমেন্দ্র গদ্যরীতিতে নেই, আছে প্রান্জলতা ও প্রসাদগুণ। এই গদ্যরীতিতে এমন একটা অনায়াস স্বাচ্ছন্দ্য ও সাবলীলতা আছে, যাহা মূহুর্তের মধ্যেই পাঠকচিত্তকে প্রসন্ন করে তোলে”। বিজ্ঞানবিষয়ক রচনাদির মাধ্যমে তার সাহিত্যচর্চা শুরু হলেও, পরবর্তীতে দর্শন, ইতিহাস, সাহিত্য, বেদ ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ের উপর লিখেছেন।
দার্শনিক তত্বকে তিনি সরল ভাষায় লিখেছেন। যেমন- “বেদান্ত যাহাতে ব্রহ্ম বলেন, তিনি আর কেহ নহেন, তিনি আমি সোহম … অহং… ব্রহ্মামি।….আত্মা অর্থে আমি, ইংরাজিতে যাহাকে ইগো বা সেল্ফ বলে আমি তাহাই… এবং আমার অপর নাম ব্রহ্ম”।
কর্মক্ষেত্রের বেশীরভাগ সময় রিপন কলেজের অধ্যক্ষ হয়ে নির্বাহিত করেন। তাকে আশুতোষ স্বয়ং, সাইন্স কলেজের প্রধানের ভার দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কোন অজানা কারণে তিনি তা গ্রহণ করেন নি। ধুতি-পাঞ্জাবী আর খদ্দরের চাদর শোভিত উন্নতশির বাঙালী এই বিজ্ঞানী মাতৃভাষায় বক্তৃতা করা যাবে না বলে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণ পর পর ফিরিয়ে দিয়েছেন। তৃতীয় বারে সফল হন। তিনিই প্রথম বাঙালী যিনি ,বাংলা ভাষায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম প্রবন্ধ পাঠ করে ইতিহাস সৃষ্টি করেন। সে সময় ক্লাসে এবং ক্লাসের বাইরে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে দেশীয় অধ্যাপকরা মাতৃভাষা বাংলা ব্যবহার করতেন না। শুধু শিক্ষাক্ষেত্র নয়, সরকারী কাজকর্ম এমনকি দেশী মনীষীগন ও রাজনীতিবিদরা মাতৃভাষা অপেক্ষা ইংরাজীতে বক্তৃতাতে বেশী স্বচ্ছন্দ ছিলেন।
মহোমপধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, রামেন্দ্র সুন্দর সম্বন্ধে বলেছেন-
“যৌবনের প্রারম্ভেই তুমি যেরূপ বিদ্যাবত্তা ও গুণবত্তা প্রকাশ করিয়াছিলে, তুমি যে পথেই যাইতে, তাহাতেই প্রভূত ধন-সম্পদ ও যশঃ উপার্জন করিতে পারিতে, কিন্তু তুমি সে সকল পদই ত্যাগ করিয়া দারিদ্র্যমণ্ডিত অধ্যাপনা ও মাতৃভাষার সেবাই জীবনের ব্রত করিয়াছ এবং আত্মত্যাগ ও আদর্শ চরিত্রের পরমোজ্জ্বল ও মহিমময় দৃষ্টান্ত দেখাইয়াছ। তুমি বিজ্ঞানকে স্বর্গ হইতে মর্ত্ত্যে নামাইয়া আনিয়াছ এবং যাঁহারা বিজ্ঞানজ্যোতিঃ বিকীর্ণ করিয়া দেশের অশেষ কল্যাণ সাধন করিয়াছেন, তাঁহাদের একজন অগ্রণী হইয়াছ।”
দেবদত্ত
০২/০৩/২৩




Comments
Post a Comment