পরেশদা পড়ে গেলেন


 পরেশদা পড়ে গেলেন

পরেশদাকুমড়োপটাশ যত সহজে লিখলাম, ঘটনাটা অত সহজে হল না। জটিল ঘটনাসমূহের সমাহারে লেখাটা সহজ হল। ঘটনাস্থল দিল্লির এলটিজি হল।


বাংলা নাটকের কম্পিটিশন চলছে। রাজধানী শহরে চলছে, তাই নামঅল ইন্ডিয়া বাংলা নাটক প্রতিযোগিতা”।  দিনে তিনটে করে নাটক। রোজই আসি।


বেঁচে থাক দিল্লির মেট্রো। ঘরের কাছ থেকে উঠলে এক ঝটকায় মান্ডি হাউস। একসঙ্গে গুচ্ছ নাটকের গুরুভার সামলে হলের বাইরে যাচ্ছিলাম চা খেতে। রিয়েল নাটকের শুরু সেখানেই। গেল গেল রব। আজকে যাদবপুর প্রাক্তনীদের সাদর নিমন্ত্রন। আমাদের এক প্রাক্তনী, নাম সুভাষ, তারই লেখা ডাইরেক্ট করা নাটক মঞ্চস্থ হবে। পরেশদা এসেছেন নাটক দেখতে। এর আগের নাটকটা হল মনোলগে একটি মেয়ের জীবনকাহিনী, বিংশশতাব্দীর আন্তঃপুরবাসীনী পুরুষশাসিত সমাজে, ক্ষরিত হৃদয়ে অব্যক্ত বেদনার প্রতিফলন। নাটক যে অত্যন্ত উচ্চমানের হয়েছে, তা বোঝা গেল মুহুর্মুহু করতালির মাধ্যমে। মূল নারী চরিত্রের স্বতঃস্ফুর্ত অভিনয়, বাচনভঙ্গী, চলনবলনের পেলব কমনীয়তা ঈর্ষণীয়। অনেকেই এসেছেন গ্রীনরুমে অভিনেত্রীর সঙ্গে আলাপ করতে। বিষ্ময়ের আরো বাকী ছিল জানা গেল, নারীচরিত্রটি রূপায়ণ করেছেন ধ্রুপদ ঘোষ নামে একটি পুরুষ অভিনেতা। একবারের জন্যও (যারা আগে থেকে জানতেন না) নাটক চলাকালীন মনে হয় নি যে একটি পুরুষ নারীর পার্ট করছে। 

গ্রীনরুমে প্রথম দর্শনে ধ্রুপদকে না পেয়ে, বাইরে এসে হঠাৎ দেখা পরেশদা সাথে। দাঁড়িয়ে আছেন হলের বাইরে এক থাম ধরে। পরেশদা হাসিখুশী মানুষ, তবে দেখা হতে মনে হল কি রকম ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে রয়েছেন। একটু কাষ্ঠহাসি দিয়ে হাত মেলালেন। পাশে দাঁড়িয়ে বৌদি। বৌদি জানালেন একটু আগে পরেশদা পড়ে গিয়েছিলেন। আমি যুগপত বিষ্মিত উৎকন্ঠিত। বল্লাম-‘তাই নাকি, কোথায় পড়ে গেলেন?’ পরেশদা বল্লেনসেটাই তো মনে করার চেষ্টা করছি তার মানে একটু আগে যে গেল গেল রব উঠেছিল সেটা তাহালে পরেশদা ঘিরে। দেখলাম সঙ্গে আরেকটি অল্পবয়সী ছেলে আছে। পরেশদা বল্লামকিছু হেল্প লাগবে?’ পরেশদা ভাবলেশহীন মুখ দেখে মনে হল গভীর চিন্তামগ্ন। আমি ততক্ষণে সটকেছি ধ্রুপদের সঙ্গে আলাপ করতে। মিনিট পাঁচেক পরে ফিরতি পথে দেখি পরেশদা এদিক ওদিক তাকাচ্ছেন। জিজ্ঞাসা করলাম-কি ব্যাপার। পরেশ বৌদি উত্তর দিলেন এখনও খুঁজে বেড়াচ্ছে কোথায় পড়ে গিয়েছিল। সেকী! কাহিনী তো গোয়েন্দা গল্পের দিকে এগোচ্ছে।সিকেয়েন্স অফ ইভেন্টস রিকনস্ট্রাকশন পরেশদা দেখলেআলালের ঘরের দুলালমনে হয়। খাতে পিতে ঘরকা আদমী। বেশ বড়সড় চেহারা। মনশ্চক্ষে ভাবছি পরেশদা পতন ইন্দ্রপতনের সমান। গেল গেল রব কি আর সাধে উঠেছিল। ভূমিকম্পের আফটারশকের মত পরেশদা দুলতে দুলতে পতনের নাট্যমঞ্চ খুঁজে চলেছেন। যেন ড্রেস রিহার্সলের পর ফাইনাল শোতে যাওয়ার আগের মহড়া

বৌদি চিন্তিত মুখে দাঁড়িয়ে। উদ্গত হাসি সামলে, গম্ভীর হয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টায় আমি সফল। মনে হল রিটায়ারমেন্টের পর নাটকের অভিনয় করলে কাজচলা গোছের উতরে যাব। বল্লামদেখি, দেখি কোথায় চোট লেগেছে।মাথার পিছনে হাত দিয়ে দেখি আলুর মত ফুলে আছে। বল্লামআরে পরেশদা, কোথায় পড়ে গিয়েছিলেন সেটা সেকেন্ডারী, আগে ডাক্তার দেখানো জরুরী। বৌদি বল্লেনআমিও তো সেটাই বলছি, সঙ্গে ড্রাইভারও আছে। পরেশদা তখনও নাছোড়বান্দা। বল্লেনহল থেকে বেরোবার কটা রাস্তা আছে? সব গুলিয়ে যাচ্ছে বল্লামআছে অনেকগুলো, লক্ষৌর ভুলভুলাইয়া গোছের, ভুলে যান, ডাক্তার কি আর আপনার অধঃপতনের জায়গা দেখে ঔষধ দেবে, আপনাকেই চেক আপ করে মেডিসিন দেবে।পরেশদা মনে হল নিমরাজী। তবে তখনও লাঠি ঠুকে ঠুকে এদিক ওদিক খুঁজছেন। পুলিশ যেমন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে কিছুটা সেইরকম।এমন সময় তড়িঘড়ি হাজিরনাট্য ব্যাক্তিত্বসুভাষ। আজকাল অভিনেতা, নাট্যকার, নির্দেশক- এরকম আলাদা আলাদা কম্পার্টমেন্টালাইজড পদমর্যাদায় লোকজনের অনীহা। সব কিছু একসঙ্গে প্যাকেজিং করে নাট্যব্যাক্তিত্ব আখ্যা দেওয়া হচ্ছে। এল্যামনির প্রেসিডেন্ট হিসাবে এরকম সিচুয়েশনে তারও কিছু দায়িত্ব রয়েছে। এধরনের সংকটকালে সুভাষের উভয়সংকট। ধর্মসংকটও বলা যায়। একটু পরে নাটক শুরু হবে। সুভাষ এতক্ষণ মঞ্চসজ্জায় নিমজ্জিত ছিল। লাইটের ফোকাস, মঞ্চে সঠিক জায়গায় আনার প্রচেষ্টার মধ্যেই “লাইটনিং স্ট্রাইক”।


পরেশদাপপাত মমার শুনে তড়িঘড়ি দৌড়ে এসেছে।সিঁড়িতে আরেকটু হলে পা ফস্কে ভূপতিত হওয়া সামলে নিয়ে ঘটনাস্থলে হাজির। আমি তখন পরেশদা মাথার পিছনের গাবআলুর কাছে মোবাইল লাগিয়ে দেখার প্রচেষ্টায়, রক্তপাত হয়েছে কিনা। এরপর আমি, সুহান বৌদি মিলে পরেশদাকে ডাক্তারের কাছে চেকআপের জন্য তক্ষুনি বেড়িয়ে পড়তে জোরাজুরি করতে লাগলাম। পরেশদা তখনো ঘটনাস্থল পরিদর্শন করতে ইচ্ছুক। সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। চাকরি জীবনে   রেবল ছিলেন। পিএসইউর সেফ চাকরী এক কথায় রিজাইন করেছিলেন কোম্পানি এ্যকমোডেশন যোগাড় করে দেয় নি বলে।  মনে হল সেফটি এসপেক্টের খুঁত বার করে, হল ম্যানেজমেন্টকে একহাত নেবেন। পরেশদার যাওয়ার খুব একটা ইচ্ছে নেই। একমাস আগে থেকে নাটক দেখার প্ল্যান করা আছে।যাই হোক পরেশদাকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে, বৌদি আর ড্রাইভারের হাতে পরেশদাকে সঁপে দিয়ে সুভাষের নাটক দেখতে হলে ঢুকে পড়লাম। 

তবে ঘটনাটা এখানেই শেষ হল না। পরের দিন নাটক দেখতে গিয়ে ঘটনাটা মনে করে একটু গিল্টি ফিলিং হল। এরকম দুর্ঘটনার পর নিয়ম হচ্ছে কাস্টমারি কল করে খোঁজখবর নেওয়া। ঘটনার পর চব্বিশ ঘন্টা হতে চল্ল। তখন নাটকের মধ্যে সেট সাজানোর বিরতি। হোয়াটস্ এ্যপ দিল্লি এ্যলামনির গ্রুপ থেকে নম্বর বার করে রিং করে চেক করছি। হোয়াটস্ এ্যপ কল। রিং হতেই পরেশদার ছবি স্ক্রিনে দেখে বুঝলাম এটাই পরেশদার নম্বর। সঙ্গে সঙ্গে কেটে দিয়েছি, কারণ হলের লাইট নিভে গিয়ে ড্রপ সিন উঠে গিয়েছে। দর্শকমহলে পিনড্রপ সাইলেন্স। প্যাঁ-পো করে আমার মোবাইল বেজে উঠেছে। নাটকের হলে আজকাল আগেভাগে বলে দেওয়া হয় মোবাইল সাইলেন্টে রাখতে। পরেশদার ফোন। এর আগে এল্যামনির হোয়াটস্ এ্যপ গ্রুপ চেক করেছি, পরেশদার ভূমিশয্যার কোন খবর নেই। এরকম ক্ষেত্রে হোয়াটস্ এ্যপ কি ফেসবুকে আপডেট দিয়ে, তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে ওঠার কামনা করাই নিয়ম। সেটা আমি করি নি। শুভার্থীদের কলের প্রত্যাশা করছেন নিশ্চয়ই পরেশদা। এমত অবস্থায় কলটা রিসিভ করা অবশ্য কর্তব্য বলে মনে হল। পাশের দর্শকের ভ্রুকুটি অগ্রাহ্য করে কল রিসিভ করে পরেশদার শরীরের আপডেট নিলাম। পরেশদা জানালেন জেনারেল ফিজিশিয়ান কলসাল্টেশন, সিটি স্ক্যান, নিউরলজিস্ট কনসাল্টেশন সবই করা হয়েছে। তবে কিছু পাওয়া যায় নি। শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল জেনে আশ্বস্ত হলাম। পাশের দর্শক হাতলে ট্যাপ করে ইঙ্গিত দিচ্ছেন কল বন্ধ করার। পরেশদাকে বল্লামনাটক চলছে- এখন ছাড়ি দায়িত্ববান মোবাইল ইউজার হিসাবে আশুকর্তব্য নিউজটামার্কেটেপেশ করার। পরেশদা পড়ে গিয়েছিলেন, ঠিক কথা, কিন্তু চেক আপ করিয়ে জানা গিয়েছেঅল ইজ ওয়েল”, খালি বিশ্রামের প্রয়োজন। হোয়াটস্ এ্যপে এরকমনির্ভয়খবর আদর্শ। স্বল্প পরিচিতরা হোয়াটস্ এ্যপে আরোগ্যকামনা করে জোড়হাতের ইমোজি পাঠাবেন, বেশী পরিচিতরা ফোন করে উদ্বিগ্ন স্বরে কুশল-মঙ্গল জানাবেন। 

নাটক দেখতে দেখতে মোবাইলে টাইপ করতে অসুবিধা নেই। ঘটনাটা হোয়াটস্ এ্যপে লিখে দিলাম। এটাও জুড়ে দিলাম যে আমার সঙ্গে কথা হয়েছে, পরেশদা ভাল আছেন। আমি যে কেস ফলোআপ করছি এতেগুড বয়ইমেজটা মেনটেন হবে।

এর পরের নাটকের মাঝামাঝিতে আবার মোবাইলের ঝংকার। মঞ্চে তখন নাটকের সিরিয়াস সিন। রিংটোনে আমি যুগপত সিরিয়াস শঙ্কিত। তাড়াতাড়ি মোবাইল বন্ধ করার প্রচেষ্টায় রত হয়ে দুইহাত দিয়ে দুদিকের বাটন প্রেস করছি। কথায় আছেবিপদকালে বুদ্ধিবিনাশহয়। ফোন বন্ধ হচ্ছে না। উল্টে পটপট স্ক্রিনশট ওঠার আওয়াজ। মনে পড়ল খালি ডানদিকের বাটনটা প্রেস করলে ফোন কাটে। তবে ডিলেড রেসপন্স। আশপাশের বিরক্তিজনিত উঃ-আঃ শুনে সেটা বোঝা গেল। 

হলের বাইরে বেরিয়ে এলাম। এক ক্লাসমেট দিল্লিতে থাকে তারই ফোন ছিল। রিং ব্যাক করতেই অন্যদিক থেকে বিশুর উদ্বিগ্ন গলাআরে তুই পড়ে গিয়েছিস লিখেছিস, কেমন আছিস, কী করে হল, আমি কি আসব?, কোন কাজ থাকলে বলিস। এক নিশ্বাসে ব্যারেজ অফ কোশ্চেন শোনার পর আমি বল্লাম -আমি না, পরেশদা পড়ে গিয়েছিল। বিশু দুঃখপ্রকাশ করে বল্ল- “ মা, সরি-সরি, আমি ভুল দেখেছি, আমি ভাবলাম তুই পড়ে গিয়েছিস। এক মধ্যে আমি তো আরো কয়েকজনকে জানালাম। আমার গিন্নী তোর গিন্নীকে ফোন করেছে।বুঝলাম পুরো কেস খেয়ে গিয়েছি। বিশু ধনুক থেকে তীর ছুঁড়ে দিয়েছে। ঠ্যালা সামলাতে হবে আমাকে। 

এর পরের ফোন অর্ধাঙ্গিনীর। কে অবশ্য কালকে বলেছিলাম পরেশদা ধরাশায়ী হওয়ার কথা। উদ্বিগ্ন স্বরে প্রথমেই বল্ল-“শেষে তুমিও, দেখ চলতে পার না।মনে হল সিজারের শেষ উক্তিদাউ ব্রুটাস”! গিন্নিকে আশ্বস্ত করলামআরে না না, আমি পড়ে যাই নি, বিশু পড়তে ভুল করেছে।এরপর মেট্রোতে আসতে আসতে বেশ কিছু ফোন এল বন্ধুদের। মন্দ না। অনেকের সঙ্গেই বেশ কিছুদিন ফোনে কথা হয় নি। মেট্রো সফর বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডাতে নিমেষে কেটে গেল।

দেবদত্ত 

০৯/০২/২২


Comments

Post a Comment

Popular posts from this blog

ত্রিবেনী তীর্থপথে ও আরো টিটবিট

রবিঠাকুর ও কিছু হাসি মশকরা

A walk to explore Delhi’s lesser known monuments