সাহিত্যসভা ও আমি
সাহিত্যসভা ও আমি
প্যারীচরণবাবুর সাথে আলাপ সপ্তাহ খানেক আগে। পৌষমেলা চলছে দিল্লীর বঙ্গসংস্কৃতির পীঠস্থান সিআর পার্কের মেলা গ্রাউন্ডে।
পাশের মার্কেটে পিঠে-পুলি চেখে দেখব আর মেলায় সংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চাক্ষুষ করব এরকমই ইচ্ছে। একটা ইনভাইটেশনও ছিল।
“নো ইওর সিটি দিল্লি” নামে একটি প্যানেল ডিসকাশন, যেটাতে পার্টিসিপ্যান্টদের মধ্যে একজন আমার পরিচিত । দিল্লিতে আসার পর ৪০ বছর কেটে গিয়েছে, প্রথম কয়েক বছর কলকাতা যাওয়ার জন্য মন ছটফট করত, এতবছরের বাসের পর দিল্লি মনে হয় নিজের শহর, এই শহরের আনাচে কানাচে লুকিয়ে অনেক ইতিহাস - স্লেভ ডাইনেস্টি কি মুঘল পিরিয়ড থেকে ইম্পিরিয়াল পাওয়ারের নিদর্শন সবই মজুদ।
মেলা গ্রাউন্ডে ঢুকে মনে পড়ল, ব্যাচেলর লাইফে সি আর পার্কে থাকার সুবাদে রোজই পৌষমেলায় ঢুঁ মারতাম। তখন মনটা ছিল উড়ু উড়ু, বসন্ত সমাগমের প্রাক্কালে মনে থাকত রঙীন কল্পনার মায়াজাল। আলোকিত মঞ্চের
পিছনদিক ছিল ডার্ক ওয়েব, তিন পাত্তি ও জুয়ার আসর, সেখানে লাক ট্রাই একটা অবশ্যকর্তব্য ছিল।
যুগের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে প্রোগ্রামে বৈচিত্র্য এসেছে। ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট বাংলা সিনেমার বদলে মঞ্চে চলছে ফ্যাশন শো। থিম হল ব্রাইডাল ড্রেস। দর্শকদের জন্য সারপ্রাইজ প্রশ্ন ছিল যে বৌ যত গয়না পরেছে সেগুলি সব মনে করে লিখতে হবে এবং খালি হার লিখলে হবে না, কি টাইপের হার সীতাহার না সাতনরী না পুষ্পহার না রতনচূড়, সব নাম লিখতে হবে। এরজন্য কনে বৌ সাজা মডেল মেয়েটি মঞ্চ থেকে দর্শকদের মাঝে নেমে এল। ফ্যাশান শো শেষ হতেই ভিআইপি লেখা দর্শক গ্যালারি খালি। এগিয়ে এসে বসলাম। নিজেকে ভিআইপি লাগছিল। কারণ আশপাশ খালি। পরের প্রোগ্রাম “নো ইয়োর দিল্লি”। ঘোষিকা নাম এনাউন্স করে প্যানেলিস্টদের ডাকছেন। মঞ্চে চেয়ার নেই, লাইটও জ্বলছে না। ভৌতিক ব্যাপার মনে হল। শূন্য স্টেজে সঞ্চালিকা মনোহরণী গলায় উপক্রমনিকা দিয়ে “অমুক”বাবুর সুচিন্তিত অভিমত জানতে চাইলেন। একটা চোখে ছানি আছে জানি, তার জন্য এরকম ভূতের হাতছানি হওয়ার কথা নয়। সন্দেহ একটু হচ্ছিল, মাথা ঘুরিয়ে দেখলাম-ও হরি , বিশাল বড় প্যান্ডালের ডানদিকে আরেকটি ছোট মঞ্চ। সেখানেই চলছে প্রোগ্রাম। যদিও অনুষ্ঠানের নামকরণ অনুযায়ী ধারণা ছিল দিল্লির ইতিহাস ও দ্রষ্টব্যবস্তু নিয়ে কথাবার্তা হবে, শুরুর একটু পর থেকে বিষয় বস্তু হয়ে উঠল “দিল্লির বাঙালী”।
প্যারীচরণ বাবু বলছিলেন দিল্লির বাঙালির সাহিত্য চর্চা নিয়ে। কথায় কথায় জানালেন উনি উদ্যোগ নিয়ে একটা লিটল ম্যাগাজিন চালু করেন, প্রথম সংখ্যায় লেখক পাওয়া যায় নি, উনি নিজেই আঠারোটা লেখা লিখেছিলেন। গর্বের সঙ্গে জানালেন তার পরিচালনায় প্রকাশিত ম্যাগাজিনে হাত পাকিয়ে কয়েকজনের লেখা কলকাতার এলিট ম্যাগাজিন দেশ, আনন্দবাজার, প্রসাদ ইত্যাদিতে গল্প/কবিতা ছাপার সৌভাগ্য হয়েছে। অনেকটা ডিস্ট্রিক্ট লেভেলে খেলার পর ময়দানের মাঠে চান্স পাওয়ার মত ব্যাপার। প্যারীচরণ বাবুর সভাপতিত্বে সাহিত্যসভাও হয়।
বছর তিনেক হল টুকটাক লেখা শুরু করেছি। রম্যরচনা, ভ্রমণ, ইতিহাস - সব মিলিয়ে হরেকরেকমবা, জ্যাক অফ অল ট্রেডস।
হাতের কাছে জলজ্যান্ত এক লেখক কাম অর্গানাইজার কে পাওয়া গেল। সাহিত্যের সোপানে উঠতে গেলে চেনা পরিচিতি দরকার। খালি কলম চালালে হবে না, কল্কে পেতে গেলে দুয়ারে সরকারের মত নিজের ঢক্কানিনাদ, নিজেকেই জনসমক্ষে আনতে হবে।
টার্গেট করে রইলাম, অনুষ্ঠান শেষ হতেই প্যারীচরণ বাবুকে বিনয় সহকারে নমস্কার করে পরিচয় দিলাম। ফোন নম্বর নিলাম। অনুষ্ঠান শেষে প্যানেলিস্টদের দক্ষিণহস্তের ব্যাপার ছিল। কাবাবে হাড্ডি হয়ে লাভ কি? তার তাড়া দেখে, তাকে তাড়াতাড়ি বিদায় করে রওয়ানা দিলাম মেট্রো স্টেশনের উদ্দেশে।
এম্যেচার লেখকের সবচেয়ে বড় সমস্যা, লেখার উৎকর্ষতা বোঝা। হিন্দিতে একটা কথা আছে ‘আপ রুচি খানা, পররুচি পরনা’। কোন ড্রেসে বেশী মানাচ্ছে জানতে যেমন অন্য কাউর অভিমতকে প্রাধান্য দিতে হয়, তেমনি লেখার বিচার হয়, পাঠকের ভাল লাগার উপর। প্যারীচরণ বাবুর হোয়াটস্ এ্যপে আমার ব্লগের একটা লেখা শেয়ার করলাম। কিছুক্ষণের মধ্যে রিপ্লাই এল, তবে সেটা আমার লেখার উপর কোন টিপ্পনি নয়, উনি নিজের খান কয়েক লেখা পাঠিয়েছেন, যে গুলো কোন কোন পত্রিকায় ছাপা হয়েছে তার বিবরণ দিয়ে। বুঝলাম আমার মত অজ্ঞাতকুলশীলই শুধু নয়, স্বনামধন্যরাও পাঠক পরিমন্ডলী বাড়াতে চান। কিছু হাততালির ইমোজি সহ আমার ভিডিও ব্লগ শেয়ার করলাম। প্যারীচরণবাবু উত্তরে শীর্ষেন্দুর দ্বারা তার নিজের বই প্রকাশের ছবি পাঠালেন। মাস্টার স্ট্রোক। এরপর হার স্বীকার করা ছাড়া উপায় নেই।
এর পরেই প্যারীচরণবাবু মারফত খবর পাওয়া গেল দক্ষিণ দিল্লি কালীবাড়ীতে সাহিত্যসভা হবে, আমিও আমন্ত্রিত।
ইউটিউবে জয়পুর কি কলকাতা লিটারেচর ফেস্ট্যিভালে সেলিব্রেটি অথারদের মনোজ্ঞ আলোচনা শুনেছি। তার ধারে কাছে না হলেও ক্যাপিটাল সিটির বঙ্গ সাহিত্যের অনুষ্ঠান। মনটা বেশ পুলকিত।
নির্দিষ্ট দিনে লাঞ্চ করে বেরোলাম। দুপুরের ভাতঘুমটা মাঠে মারা গেল। এটুকু কষ্ট স্বীকার হাসিমুখে মেনে নেওয়া যায়, কারণ হাঁটি হাঁটি পা পা করে লেখক গোষ্ঠীর বৃত্তে ঢুকে পরার সুবর্ণ সুযোগ কি হাতছাড়া করা যায়।
সোসাইটির লনে বেশ কিছু পরিচিত মুখ। মধ্যাহ্নভোজনের পর ধূপ সেঁকছে। ডাকাডাকি করছে- “রায় সাব আইয়ে, চায়ে পিজিয়ে”। অন্যসময় হলে সানন্দে ঢুকে পড়তাম। পাঁচ বছর পর সামনের মাসে সোসাইটি ম্যানেজমেন্টের ইলেকশন। তারই “চায়ে পে চর্চা চলছে। কাছে গিয়ে বল্লাম-“মাফ কিজিয়ে, দিল্লি যা রহা হু, সাহিত্যসভা মে”। হই হই রব উঠল, “আরে রায় সাব, আপ ইন্জিনিয়ার সে পত্রকার কব বন গিয়া”? বল্লাম “ম্যায় রিটায়ার্ড ইন্জিনিয়ার সে এপ্রেনটিশ রাইটার হু”।
মেট্রোতে ওঠার আগে টুপি খুলে নিলাম। সাদা চুল দেখলে সিনিয়ার সিটিজেনের সিট এমনিতেই তরুণ প্রজন্ম ছেড়ে দেয়, অনুরোধ করতে হয় না। বসন্ত বিহার মেট্রো স্টেশন থেকে দক্ষিণ দিল্লি কালীবাড়ী ভেবেছিলাম হেঁটেই মেরে দেব। পড়ন্ত শীতের বিকালের মিঠে কড়া রোদ্দুরে দিল্লির পশ এরিয়া বসন্তবিহারের আলিশান বাংলো দেখতে দেখতে পৌঁছে যাওয়া যাবে। মেট্রো থেকে নেমে দেখি অলরেডি লেট। প্রথম সাক্ষাতে লেটলতিফের তকমা পেতে মন চাইল না। অটো ধরে গন্তব্যে পৌঁছান গেল। পাটকিলে রংএর মন্দির ও তৎসন্নিহিত বিল্ডিং। মা কালীর গাড় কৃষ্ণবর্ণের সঙ্গে মানানসই। তবে একটু টেরাকোটার কাজ থাকলে আরো দৃষ্টিনন্দন হত।
কোথায় প্রোগ্রাম হচ্ছে কে জানে। আশা ছিল ভীড় ঠেলে ঢুকতে হবে। কিন্তু এতো জনমানবশূন্য। সিকিউরিটি গার্ডের সাহায্যে পৌঁছান গেল ভেন্যুতে। সাহিত সভা অলরেডি স্টার্টেড। লম্বা হলঘরে আয়তকারে টেবিল পাতা। প্যারীচরণবাবু সহ জনাকুড়ি লোক। মহিলাও আছেন বেশ কয়েকজন।
প্যারীচরণবাবু সভাপতি, টেবিলের একপ্রান্তে তিনি। পিছনের দিকে একটা চেয়ার খালি। সভাপতিকে নমস্কার জানিয়ে পিছনের এক চেয়ারে বসা গেল। স্কুল, কলেজেও ব্যাক বেঞ্চার ছিলাম। তকমাটা পরিণত বয়সেও বিদ্যমান।
প্যারীচরণবাবু তখন নবাগতদের একেএকে আলাপ করিয়ে দিচ্ছেন। তাঁরা নিজেদের পরিচয় দিয়ে স্বরচিত কবিতা অথবা গল্প পড়ে শোনাচ্ছেন। পাবলিক স্পিকিংএ আমি আবার নড়বড়ে। ভাষণ আমার কাছে বিভীষিকা। গলাটা কিরকম শুকনো শুকনো লাগছে। সময়মত জলের গ্লাস হাজির। ঈষৎদুষ্ণ জল মনে করিয়ে দিল, খাঁটি বাঙ্গালী অনুষ্ঠানে আছি। ঠান্ডা জলে বাঙ্গালীদের ভয়, এই না গলা খুশখুশ করে। কবি তো লিখেই গিয়েছেন-‘হাঁচি কাশি, মশা মাছি, এই নিয়ে বেঁচে আছি।
পর পর নূতনদের পরিচিতি চলেছে। কবিতা, গল্প পড়া চলছে, শুনছি অথচ বুঝছি না, মনে টেনশন। ঘড়িতে দেখি পিক পিক করে এলার্ম বাজছে। ক্রুশিয়াল মোমেন্টে আবার কি মেসেজ এল! দেখলাম লেখা আছে “তোমার হার্ট রেট কন্টিনিউয়াসলি ১২০ এর উপর চলছে, যদিও তুমি লাস্ট দশ মিনিট একই জায়গায় বসে আছ।” সঙ্গে একটা গ্রাফ প্রতি মিনিটের হার্ট রেট সহ। যৌবনে পরীক্ষার হলে কি সুন্দরী তরুণী দেখলে হার্ট রেট বেড়ে যেত। চাকরিজীবনে কখনো এটা হয় নি, কারণ বসকে বিশেষ পাত্তা দিই নি। এক কলিগের সঙ্গে বছর দশেক পরে দেখা হওয়াতে প্রথম কথা বলেছিল-‘স্যার আপ কো মাননা পড়েগা, আপ য্যায়সা একই আদমী দেখা যো খুদই, খুদকা বস হো।
যাই হোক ঘড়ির আর্টিফিশিয়াল ইনটালিজেন্স দেখে পুলকিত হলাম। এ্যপেল, সিরিজ সেভেন, স্টিভ জোবসকে মনে মনে স্যালুট করলাম। আজকাল শুনছি আর্টিফিশিয়াল ইনটালিজেন্সের যুগ।
আমার এক বন্ধু ইংল্যান্ডে থাকে, টেসলা গাড়ী কিনেছে। ম্যাপে ডেস্টিনেশন সেট করে দিয়ে পিছনের সীটে ঘুমিয়ে পড়া যায়। গাড়ী বিনা ড্রাইভারেই পৌঁছে দেবে গন্তব্যস্থলে। এখন আবার ইঞ্জিন না থাকায় বনেটে অনেক জায়গা। বন্ধু তার ব্যাটারি অপারেটেড সাইকেল নিয়ে কাছের নটিংহামের জঙ্গলে গাড়ী পার্ক করে সাইকেল চড়ে জঙ্গলে ঘোরে। এই জংগলেই হাজার বছর আগে রবিনহুড হরিণ শিকার করত। আর্টিফিশিয়াল ইনটালিজেন্স ওয়ালা গাড়ী লিজেন্ডারি জঙ্গল, অতীত ও নূতনের মেলবন্ধন। রেডিও, এ্যন্টেনা ওয়ালা টিভি, কেবল টিভি, ডিশ টিভি, হালফিলের ফাইভার অপটিক টিভি- তবুও সভ্যতার শীর্ষশিখর অধরা। এআই নাকি দৈনন্দিন জীবনে ধীরে ধীরে জায়গা করে নেবে। সুফলের সঙ্গে সঙ্গে কুফলেরও হাতে নাতে প্রমাণ পাচ্ছি। কাগজ বলছে মাইক্রোসফ্ট ১২০০০ কর্মচারী ছাঁটাই করবে। ফেসবুকে যাদবপুরের প্রাক্তন ভিসির পোস্ট পড়ছিলাম, উনি সত্তরের দশকে যখন সাহা ইনস্টিটিউট অফ নিউক্লিয়ার ফিজিক্স পড়ছিলেন- গভর্নমেন্টের গ্রান্টে কেনা কম্পিউটার বসান যায় নি, কারণ কর্মচারীদের তীব্র প্রতিবাদ ছিল যে, এর ফলে চাকরি কমে যাবে।
এবার আসি সাহিত্যসভায়। বেশীরভাগই কবিতা লেখেন। একজন কমবয়সী মহিলা জানালেন তিনি হালিশহরে থাকেন, লাইব্রেরি সায়েন্স নিয়ে পড়াশুনা। সভাপতির পাশে বসা এক পুরানো সদস্য অরূপবাবু জানালেন তিনি নৈহাটিতে বড় হয়েছেন। বঙ্কিম ও সমরেশ মজুমদারের জায়গা। পরিবেশ গুনে লেখালেখির সহজাত ইন্সটিঙ্কট তৈরী হয়। অরূপবাবু আবার মোবাইলে ফটোও তুলছিলেন। আমার একপিস টাকমাথার ফটোও উঠল।
একটু পরে প্যারীচরণবাবু আমার নাম ঘোষণা করলেন। পরিচয় দিলাম, জানালাম নয়ডা থেকে আসছি। রিটায়ারমেন্টের পর “ঘরের খেয়ে-বনের মোষ তাড়ান” র জন্য লেখালেখি দিয়ে টাইম কিলিংএর চেষ্টা। সাহিত্য সভায় অপচেষ্টা বলা যাবে না, তাহালে লেখককুল রুষ্ট হতে পারেন! প্যারীচরণবাবুর কাছ থেকে হার্টি ওয়েলকাম পেয়েছি, সেই সুবাদে ধন্যবাদ জানিয়ে হার্ট রেটের বৃদ্ধির কথাও জানালাম। সবার হাসিতে পরিবেশ একটু লঘু হল। মোবাইলেই লিখি, তাই সব লেখা মোবাইলেই স্টোর থাকে, সেখান থেকেই একটা পড়ে শোনালাম। বাকীদের মত একপ্রস্থ হাততালিও পেলাম। হাঁফ ছেড়ে বাঁচতেই এসে গেল চা, মিষ্টি, বিস্কুট। প্রাণটা অনেকক্ষণ চা-চা করছিল।গুরুভার নেমে গিয়েছে, নিশ্চিন্ত মনে চায়ে চুমুক দিলাম।
এরপর পালা সিজনড লেখককুলের। দুই একজন জানালেন- “আজ থাক, পরের বার”। একজন কবি কাম আবৃত্তিকারকে পাওয়া গেল। ইনাদের আজকাল বাচিক শিল্পী বলা হয়, যেমন কিনা হস্তশিল্পী, চিত্রশিল্পী। তবে গায়ক/গায়িকাকে গীতশিল্পী বলার রেওয়াজ এখনও হয় নি। উনি সাঁওতালী-বাঙ্গলা ভাষার মিক্সচারে সুন্দর আবৃত্তি করলেন। আজকাল প্রথিতযশা বাচিক শিল্পীরা এই ভাষায় কিছু না কিছু আবৃত্তি করে থাকেন। থিম অনেক সময়ই উইমেন লিব সংক্রান্ত। “বাহামণি” বলে একটা টেলি সিরিয়ালের ক্যারেক্টার এই ভাষায় কথা বলে খুব জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।
“আরেকবার সাধিলেই খাইব”র মত, দ্বিতীয়বার সাধাসাধির পর সবাই কবিতা/গল্প পড়লেন। একজন মহিলা জিকে ওয়ানে থাকেন, তিনি লকডাউনের সময় অন লাইন পত্রিকা চালাচ্ছেন। উনি আবার বুক রিভিউ করতে ভালবাসেন। প্যারীচরণবাবু প্রস্তাব রেখেছিলেন, কোন বই পড়ে যদি ভাল লাগে তবে সেটা সবাইকে জানালে, তারা পড়ে দেখতে পারেন। আমিও একমত। নিজের লেখার শ্রীবৃদ্ধি করতে ভাল লেখা পড়া খুব জরুরী।
একজন লেখক (পরে জানলাম বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলেন), পৃথিবীর দিকে আগত গ্রীন কমেট নিয়ে আলোকপাত করলেন। এটা আবার আসবে পঞ্চাশ হাজার বছর পর। খালি চোখে কৃষ্ণপক্ষে উত্তর আকাশে দেখা মিলবে। দোসরা ফেব্রুয়ারী পৃথিবীর সবচেয়ে কাছাকাছি থাকবে। ধুমকেতুর একটা সুন্দর নাম হলে ভাল হত, কিন্তু এর খটমট নাম C/2022 E3 (ZTF), শুনে উৎসাহ চলে গেল। উনি জানালেন নভোমন্ডলে এক লাখ কোটি ধুমকেতু আছে। সত্যিই তো এই অনন্ত ব্রহ্মান্ড কত বড়। সবচেয়ে ফ্রিকোয়েন্ট ভিসিটর হ্যালির ধুমকেতু আসে ৭৬ বছরে একবার। সৌভাগ্যবানেরা সারা জীবনে মাত্র দুবার দেখতে পান। উনি জানালেন এর গতিপথ প্যারাবোলিক। পাশে বসা অরূপবাবু ফিজিক্সের ছাত্র, চাকরীজীবনে সাইন্টিস্ট ছিলেন। তিনি অবশ্য সন্দিহান প্রকাশ করে বল্লেন “ইলিপটিক্যাল গতিপথ হলে তবেই সেটা দ্বিতীয়বার দেখা যাবে, প্যারাবলিকে সেটা হবে না।” আলোচনা জ্যামিতির দিকে ঘুরে গেল।ঘন্টাদুয়েক পর সভার সমাপ্তি। এই সময়টাই অন্যদের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত পরিচিতির সময়। পরিচিতিতে জানলাম এই সভার নিয়মিত সদস্যদের মধ্যে চারজন সাইন্টিস্ট আছেন। চারুকলা, শিল্পকলার মত সাহিত্যও একটি কলা। আর্টস ডিপার্টমেন্টকে বাংলাতে কলা বিভাগ বলে। যদিও কেউ বলে না, তবে আমার মতে সাইন্স হল আপেল বিভাগ, কারণ নিউটনের আপেল বিদ্যার হাত ধরে সাইন্সের অগ্রগতি। ওই আপেলের কিছুটা গলাঃধাকরণ করে এ্যাপেল কোম্পানি মোবাইল/ল্যাপটপের শীর্ষবিক্রেতা।
একজন মহিলাকে পেলাম যিনি একমোবদ্বীতিয়ম। উনি পিওর পাঠিকা। বই পড়তে ভালবাসেন। আমাদের মত নভিশদের জন্য আইডিয়াল টার্গেট। উনাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বল্লাম-“আপনার মত পাঠিকার জন্যই আমরা লিখতে উৎসাহ পাই”। সেই ট্রাডিশন সমানে চলছে। আজ থেকে পয়ত্রিশ-ছত্রিশ বছর আগে সি আর পার্কে আমাদের তৈরী “সংস্কৃতিকী” নামের ক্লাবের পক্ষ থেকে মহা উৎসাহে নাটকের মহড়া দিয়ে, স্টেজ শোয়ের দিন, গ্যাঁটের কড়ি খরচা করে দর্শকদের বাসে করে গান্ধী মেমোরিয়াল হলে নিয়ে যেতে হয়েছিল।
সভাপতি জানালেন এইবার কার্যনির্বাহী কমিটির মিটিং। আমাদের মত গ্রীন হর্ণদের বিদায় জানানো হল। গ্রীনহর্ণ থেকে কবে ব্রাউনহর্ণে উত্তীর্ণ হতে পারব তারই অপেক্ষায় রইলাম।
পরিশিষ্ঠ ~ “আশার ছলনে ভুলি কি ফল লভিনু হায়!” ব্রাউনহর্নে উন্নিত হওয়া এ যাত্রায় হল না বলেই মনে হচ্ছে। লেখার লিংকটা খোদ প্যারীচরণ বাবুকে পাঠিয়ে তাঁর ‘সুচিন্তিত অভিমত’ চাইলাম। উত্তর এল “ফেসবুক পোস্ট” এর মত লিখেছেন। সরলমনে লিখলাম-‘একটু হেয়ালী লাগছে!’ প্রতুত্তরে জানালেন “সাহিত্য হয় নি, ছ্যাবলামি হয়েছে। আগে আর আমায় বিরক্ত করবেন না।
সব আশা-ভরসার জলাঞ্জলি। ঐ যে বলে ‘না স্বভাব যায় না মলে!’ অফিসে থাকাকালীন বস একবার জিজ্ঞাসা করেছিলেন- ‘লেট কিউ আয়া?’ অম্লানবদনে সরল সত্যি বলেছিলাম ‘ব্রেকফাস্ট করনে কা বাদ নিদ আ গিয়া থা।’ বলাবাহুল্য বসের মনোভাব এন্যুয়াল রিপোর্ট কার্ডে কম মার্কস পেয়ে বুঝেছিলাম। প্ল্যান্টে থাকাকালীন এরকম একটি ঘটনা। মেনটেনেন্সে চাকরী করি। ছুটির দিন অর্থ্যাৎ রবিবারে টাউনশিপ থেকে বেরোতে পারমিশন নিতে হত বসের কাছ থেকে। এক রবিবারে বসকে বল্লাম সিনেমা দেখতে দিল্লি যাব। ও প্রান্তে হুঙ্কার “চিমনী সে জাদা ধূয়া নিকাল রহা হ্যায়। পহলে প্ল্যান্ট যাকে কনট্রোলার টিউন করকে ফির যাইয়ে”। বলাবাহুল্য সেবার সিনেমা ক্যানসেল। হোমফ্রন্টের বস নরম-সরম, তাই ওদিকের রিপোর্ট কার্ডে ঝামেলা হয় নি। পরে শুনলাম এক্ষেত্রে স্ট্যন্ডার্ড রিপ্লাই হচ্ছে, “বাচ্চোকে লিয়ে কাপড়া খরিদনা হ্যায়”, অথবা “ আঙ্কল বিমার, হসপিটাল যানা হ্যায়” - এই জাতীয় কিছু বলতে হবে।
তবে এটুকু বুঝেছি প্যারীচরণ বাবু আমারই মত গ্রীন হর্ণ, স্ট্রাগলিং লেখক, লিটল ম্যাগাজিনের কবি বা সাহিত্যকারের মত, বাইরের পাঠক নেই, একে অন্যর লেখার পাঠক। একে অন্যের লেখার প্রশংসায় পঞ্চমুখ থাকেন, যাতে নিজের লেখায় দরাজ কমেন্ট পাওয়া যায়
এবার ভরসা আমার ক্লাসমেট কাম লেখক ধূর্জটি। কলকাতা বইমেলায় তার স্টলও থাকে।
দেবদত্ত
২৭/০১/২৩














Enjoyed
ReplyDelete