বারোগ স্টেশনের ইতিকথা


 বারোগ স্টেশনের ইতিকথা

কাল এসেছি পাঁচকুলাতে। জায়গাটা হরিয়ানা স্টেটের মধ্যে। দিল্লি থেকে এলে প্রথমে পড়বে পাঁচকুলা তারপর চন্ডীগড় তারপর মোহালি। মোহালি পড়ছে পাঞ্জাবে। অনেকটা এনসিআর-এর মত। নয়ডা পড়ছে ইউপিতে, তারপর দিল্লি হয়ে  হরিয়ানাস্থিত গুরগাঁও। আমরা যেখানে আছি উত্তরপূর্বে তাকালে মোরনি হিলস আর উত্তর পশ্চিমে কাসোলি হিলস। 

আজকের ইটিনারির প্রথম পর্বে ছিল কসৌলি ভ্রমন, সেখান থেকে লাঞ্চ করে বেরোতে বেরোতে দেখলাম সূর্য হেলে পড়েছে। ঠিক হল যাওয়া হবে বারোগ রেল স্টেশনে। 

 ৯৬ কিমি দৈর্ঘের কালকা-সিমলা রেললাইনের মধ্যবর্তী স্টেশন হল বারোগ। কালকা থেকে সিমলা টয়ট্রেন যাত্রায় ১৮টি স্টেশন আছে। আমার সঙ্গে আছেন মিস্টার গুলাটি। বাকী সব স্টেশনের মধ্যে বারোগ-কে বেছে নেওয়ার কারণ জানতে চেয়ে যে তথ্য পাওয়া গেল তা সত্যিই চমকপ্রদ, তবে সেটা ক্রমশ প্রকাশ্য। সিমলার মোটর রাস্তা বেশ চওড়া। 


আসা যাওয়ার আলাদা লেন। ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ। সন্ধ্যে নেমেছে তাড়াতাড়ি। গন্তব্যস্থলে যাওয়ার পথে  বারদুয়েক রেললাইনকে ক্রিস-ক্রস করলাম। সাধারণ ধারণার বশবর্তী ছিলাম যে স্টেশনের বাইরে রাস্তা তার পাশে পার্কিং লট থাকবে। প্লেনসের লোক, প্লেন থিংকিং! বাস্তবে দেখলাম, নির্জন রাস্তার ধারে গুলাটি জুনিয়ার গাড়ী দাঁড় করাল। আশেপাশে স্টেশনের চিহ্নমাত্র নেই। মেন রাস্তার পাশ দিয়ে একটা তীব্র ঢালু পাকদন্ডী। অন্ধকার চারিদিক। স্টেশন দেখতে যে এরকম কসরত করতে হবে তা ভাবি নি। শুনলাম তিন-চারশত মিটার নীচে নামতে হবে। মোবাইল টর্চ জ্বেলে পায়ের তালু এঙ্গেল করে, নইলে পিছলে যাবার চান্স, নামা শুরু হল। রিটায়ারমেন্টের আগে পাহাড়ী শহরে পোস্টিংএর সুবাদে চড়াই-উৎরাই করতে হত, সেই পুরানো অভ্যাস কাজে এল। ভাবছি নেমে তো যাচ্ছি, ওঠার সময় পারব কিনা কে জানে। দূর থেকে ট্রেনের হুইসিলের আওয়াজ এল।

জুনিয়ার গুলাটি সবসময় পজিটিভ মাইন্ডেড। আমাকে অভয় দিয়ে বল্ল-‘ আঙ্কেল, যো ট্রেন নীচে খাড়ি হ্যায়, আভি কালকা যায়গা, আপ উসিমে চড় যানা। আপকো কালকা সে পিক কর লেঙ্গে।মনে বেশ বল পেলাম। বেশ কিছুটা এসেছি, একটা বাঁক ঘুরতে নীচে আলোকিত স্টেশন ট্রেন দুই- দেখা গেল। কিন্তু বিধি বাম। প্ল্যটফর্মে পৌঁছানর আগেই কু-ঝিকঝিক করে ট্রেন বেরিয়ে গেল। 

প্ল্যটফর্মে পা দিয়ে চোখ জুড়িয়ে গেল। ছবির মত সুন্দর স্টেশন। এর পরে ট্রেন আসবে রাত নটায়। এখন বাজে সাতটা। সুতরাং চড়াই ভাঙা কপালে লেখা আছে। প্ল্যাটফর্মের একপ্রান্তে একটা টানেল দেখা যাচ্ছে। নম্বর লেখা ৩৩।



বেশ কিছু ফটো তোলা হল। প্ল্যাটফর্মের শেষে স্টেশন মাস্টারের কামরা। এই স্টেশন থেকে কদাচ টিকিট বিক্রি হয়। রাস্তা থেকে এত নীচে মালপত্র নিয়ে কে আর ট্রেনে উঠবে। আলাদা করে টিকিট বিক্রেতা নেই। স্টেশন মাস্টার মাল্টিটাস্কিং করছেন। 

একটু ইতিহাসের পাতা উল্টানো যাক। ১৮৬৪ সালে সিমলাকে ভারতের উইন্টার ক্যাপিটাল ঘোষণা করা হয়। সেইসময় কলকাতা ছিল ভারতের রাজধানী। উইন্টার সামার ক্যাপিটাল আলাদা হওয়ায় বছরে দুইবার মালপত্র, সরকারী দস্তাবেজ সমেত সব কর্মচারীকে যাওয়া আসা করতে হত। ১৮৯১ সালে দিল্লি-কালকা ব্রডগেজ লাইন চালু হলে, কালকা-সিমলা রেললাইন নির্মান গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা শুরু হয়। এই সময় সবাইকে ঘোড়া বা গরুরগাড়ী করে লম্বা রাস্তা পাড়ি দিতে হত। যাত্রীদের বিশেষত শ্বেতাঙ্গ মহিলাদের দীর্ঘ ঘোরান রাস্তাতে মাথা ঘুরত। ১৮৯৮ তে রেলপথের নির্মান শুরু হয়ে ১৯০৩ সালে প্রথম রেলযাত্রা শুরু হয়। ভাবতে অবাক লাগে মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যে ১০৩টি টানেল



৯৫০ এর উপর ব্রীজ ৯০০ কার্ভ তৈরী হয়েছিল মাত্র পাঁচ বছরে. কোন অধুনিক যন্ত্র ছাড়া। আমার রিটায়ারমেন্টের আগের পোস্টিং, যোশীমঠে ১৩কিমি লম্বা টানেল অত্যাধুনিক যন্ত্রের সাহায্যে, ১৬ বছরেও কমপ্লিট হয় নি।স্লো বাট স্টেডি উইনস দি রেস’, কথাটা সর্বৈব সত্য।

এবারে আসি বারোগ স্টেশনের বিশেষত্বর ব্যাপারে। নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক ইতিহাস, যা আমার অজানা ছিল। স্টেশনের নাম হয়েছে যে ইন্জিনিয়ার কালকা-সিমলা লাইনের কনস্ট্রাকশনের দায়িত্বে ছিলেন, সেই বারোগ সাহেবের নামে। নামকরণের পিছনে জড়িত ঘটনাটি অবশ্য করুণ রসে জারিত। 

এই ৩৩ নম্বর বারোগ টানেল, যার দৈর্ঘ্য এক কিলোমিটার, টয়ট্রেনের সবচেয়ে দীর্ঘতম টানেল। ১৯০০ সালে ড্রিল এন্ড ব্লাস্ট মেথডে এর নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার সময়, বারোগ সাহেব পাহাড়ের দুইদিক থেকে খোদাই কাজ শুরু করেন, যাতে কম সময়ে টানেলের কাজ শেষ হয়। বারোগ সাহেবের এলাইনমেন্টের ক্যালকুলেশনে ভুল ছিল।

       Colonel Barog and his team
আনফরচুনেটলি তখনকার সময় জিপিএস কি স্যাটেলাইট ছিল না। দীর্ঘদিন কাজ চলার পরেও যখন দুদিক থেকে খোদাই করা টানেল একজায়গায় মিলল না, তখন রেল কর্তৃপক্ষ কাজে গাফিলতির জন্য কর্নেল বারোগ কে দায়ী করলেন এবং ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ থেকে একটাকা ফাইন করা হল। কথিত এই যে, ঘটনাটির পর বারোগ সাহেব ডিপ্রেসড হয়ে পড়েন। একদিন বিকালে প্রিয় পোষ্য কুকুরটি নিয়ে বেরিয়ে কর্নেল বরোগ বর্তমান টানেল থেকে এককিলোমিটার দূরে সুইসাইড করেন। তারই স্মৃতিতে স্টেশনের নাম হয় বারোগ।

এরপর মিস্টার হ্যারিংটনের নেতৃত্বে টানেল তৈরী শুরু হয়। কিন্তু হ্যারিংটনও টানেলের সঠিক এলাইনমেন্ট নিয়ে ধন্দে ছিলেন। এমনসময় ভগবানপ্রেরিত দূতের মত হাজির হয় এক নিরক্ষর মেষপালক। নাম তার ভালকুরাম।
সমান্য মেষপালক হলেও ভালকুরামের একটা চমকপ্রদ ক্ষমতা ছিল। এটাকে সিক্সথ সেন্সও বলা যায়। গরুচরানোর মোটা কাঠের ডান্ডা পাহাড়ের গায়ে ঠুকে তার শব্দ শুনে ভালকুরাম পাহাড়ের গায়ে টানেল এলাইনমেন্টের মার্কিং করত। ভালকুরামের চিহ্নিত এলাইনমেন্ট ধরে সফলভাবে টানেলের কাজ সম্পন্ন হয় ১৯০২ সালে পূর্বনির্ধারিত সময়ের মধ্যে। টয়ট্রেন নির্মান তার এই পরিসেবার কথা স্মরণ করে ব্রিটিশ ভাইসরয়, ভলকুরামকে মানপত্র টারবান প্রদান করেন। তার সন্মানে সিমলা স্টেশনে টয়ট্রেনের উপর একটি মিউজিয়াম আছে -যার নামবাবা ভালকুরাম রেল মিউজিয়াম 


এবারে খাড়াই পাহাড় বেয়ে ওঠা। ফেরার সময় যা সময় কষ্ট লাগবে ভেবেছিলাম, ততটা মনে হল না। তবে অন্ধকার রাস্তায় উঠতে ভয় একটু করছিল, কারণ স্টেশনের সিগন্যাল ম্যান বলছিল কর্নেল বারোগের অভিশপ্ত আত্মা এখনও এই অঞ্চলে ঘুরে বেড়ায়। সেরকমটা অবশ্য কিছু ঘটে নি।  গাড়ীতে ফেরার সময় কালকার বেশ কিছুটা আগে, সেই ট্রেন, যেটা বারোগ স্টেশনে একটুর জন্য মিস করেছিলাম, তাকে পিছনে ফেলে এগিয়ে এলাম। বারোগ স্টেশন তার ইতিহাস এই ছোট্ট ট্রিপের এক দুর্দান্ত অভিজ্ঞতা।

দেবদত্ত 

২০/০১/২৩

Comments

Popular posts from this blog

ত্রিবেনী তীর্থপথে ও আরো টিটবিট

রবিঠাকুর ও কিছু হাসি মশকরা

A walk to explore Delhi’s lesser known monuments