বিয়েবাড়ী
বিয়েবাড়ী
শীতকালে মাসে খানদুয়েক বিয়েবাড়ীর নেমন্তন্ন পাই। আজকাল হোটেলের ব্যাংকেয়েট হলেই বিয়ের কি বৌভাতের অনুষ্ঠান হয়। হোটেলে ছাদনাতলা কি করে পাওয়া যায় কে জানে। বিয়েটা খোলা আকাশের তলায় হওয়ার কথা। অবশ্য লন থাকলে অসুবিধা নেই। যাই হোক আমার নিমন্তন্ন বৌভাতের। এখন অবশ্য বৌভাত বলা হয় না, ইংরাজী নামকরণ রিসেপশন বাংলা হল প্রীতিভোজ। ভোজটাই আসল। বাঙালীর অনুষ্ঠান। সুতরাং ভেজ ভোজ নয় এ ব্যাপারে নিশ্চিন্ত। আজকাল ই-কার্ডেই নেমন্তন্ন। কার্ড ও গুগল ম্যাপের লিংক হোয়াটস্ এ্যপে চলে এল। হোটেলের নাম দেখলাম ডাবল ট্রি হিলটন।
হিলটন নামের মধ্যে বেশ অমেরিকা অমেরিকা গন্ধ আছে। তা এনসিআরের গুরগাঁও এর স্কাই লাইনে অমেরিকার আভাস পাওয়া যায়। তবে ডাবল ট্রি কেন তার মানে অনেক ভেবেও বোঝা গেল না। পরিবেশরক্ষা করতে আজকাল গাছ লাগানোর ধূম। তবে এইসব মাল্টি ন্যাশানাল ব্র্যান্ডের টাকার গাছই বেশী। আবার ডাবল ট্রি বেশ ক্যাচি ওয়ার্ড হিসাবেও রাখা হতে পারে। দেশী ব্র্যান্ড হোটেল চেন হল লেমন ট্রি। সিঙ্গল ট্রি-কে ল্যাং মারতে ডবল ট্রি নাম রাখা হয়েছে।তবে নামে কি বা আসে যায়। নয়ডা থেকে গুগল ম্যাপে দেখাচ্ছে ৫০ কিমি। তার মানে দেড় থেকে দুই ঘন্টা। গুগল ম্যাপকে ফলো করাই শ্রেয়। দুদিন আগে পার্কে হাঁটতে গিয়ে পরিচিত একজনের মুখে গুগল ম্যাপ অনুসরন করে বোকা বনার গল্প শুনলাম। নূতন এল্যকাজার গাড়ী (আমার অবশ্য নাম শুনলেই আল কায়দা মনে আসে) করে মিসেস কে নিয়ে নয়ডা থেকে বেরিয়ছে, ছেলেকে আই আই টি রুরকী থেকে নিয়ে আসবে। দুজনেরই গুগল ম্যাপ একই রাস্তা দেখাচ্ছে। মীরাটের পর টোল রোড থেকে ম্যাপ অনুযায়ী ছোট রাস্তায় ঢুকতে হল, তখন একটু সন্দেহ হয়েছিল। তবে দুজনের মোবাইল যখন একই দেখাচ্ছে তখন কনফিডেন্স লেভেল তুঙ্গে। ডেস্টিনেশনে পৌছে দেখা গেল জায়গাটা সাহারানপুর। ওই একই নামের কলেজ।
বিয়েবাড়ীতে সুবেশা রমণীকুল কি কোট টাই পরিহিত ভদ্রলোক সবাই ফটো শেসনে ব্যাস্ত হয়ে পড়েন। আজকাল আবার ইয়াং জেনারেশনের পছন্দ সেলফি। ডেকোরেটারের বিল অফ কোয়ান্টিটি বাড়াতে ‘সেলফি জোন’ নবতম সংযোজন। এখানে সেরকমটাই দেখা গেল। এখানে খোশগল্পের থেকে ফটো শেসনের আধিক্য দেখলাম। মঞ্চের উপর বর বৌ।
মঞ্চে উঠে গিফ্ট দিয়ে ফটো তোলা হচ্ছে। ফরম্যালিটির ব্যাপারটা বৌয়ের হাতে বাই ডিফল্ট। আমি মুক্তকচ্ছ। দুঘন্টা ড্রাইভ করে এসেছি । প্রথমে হাল্কা হয়ে এলাম। ভাগ্যক্রমে দুই ব্যাচমেটকে পাওয়া গেল। একজনের সঙ্গে গতবার গুরগাঁও তেই এক ক্লাসমেটের বিয়েতে দেখা হয়েছিল। এরা অবশ্য ইলেকট্রনিক্স ডিপার্টমেন্টের, বিশ্ববিদ্যালয়ের মেরিট অর্ডার অনুযায়ী ব্রাহ্মণ শ্রেণী গোত্রীয়, আমার ইলেকট্রিক্যাল সেই তুলনায় কুলীন কায়স্থ বলা যায়। সরি দুইজন নয় তিনজন, একজন অর্ধাঙ্গিনী, ক্লাসমেটকেই লাইফমেট করেছে।
ঠান্ডাটা জাঁকিয়ে পড়েছে। হলের ভিতরে মঞ্চ, ছড়িয়ে ছিটিয়ে লোকজন গল্পে মশগুল।
বাইরের ছোট হলে খাওয়া দাওয়ার বন্দোবস্তো। ঢোকার সময় বাঁমদিকে কাউন্টারে গ্লাসের ঠোকাঠুকির আওয়াজ পেয়েছিলাম। বিপিনবাবুর কারণসুধা প্রাপ্তির আশায় মন পুলকিত। স্ন্যাকস ছেড়ে ওদিকেই ধাবমান হলাম। বার টেন্ডার আইস টাইস দিয়ে কি সব বানাচ্ছে। ককটেল হবে বোধহয়। কাউন্টারের উপর মোজিটো লেখা। স্বল্পজ্ঞানে ভাবলাম ব্ল্যাডি মেরি, মার্গারিটা, ম্যানহাট্টান এর মত মোজিটো একরকম ককটেল হবে। কাউন্টারের ভিতর উঁকি মেরে দেখার চেষ্টা করলাম চোলি কে পিছে কেয়া হ্যায়! মূর্তিমান রসভঙ্গ। রসে-বশে রেখো মা, এ যাত্রায় আর হল না। কপালে নেই কো ঘি (কারণবারি), ঠকঠকালে হবে কি!
আরে পাশে আরেকটা কাউন্টার দেখা যাচ্ছে। আশার আলো প্রজ্জ্বলিত-দীপ জ্বেলে যাই। খাবারে যেমন ভেজ নন-ভেজের আলাদা কাউন্টার হয়, এখানেও নিশ্চয়ই মকটেল ককটেলের আলাদা কাউন্টার হবে। গুটিগুটি পায়ে এগোলাম। সামনে একজন পথরোধ করে দাঁড়িয়ে। ডানদিক বামদিক ডজ করে যতই বেরোতে যাই, মূর্তিমান আমার সামনে একইতালে এদিক ওদিক হচ্ছে। যেন আর্জেন্টিনার ডিফেন্ডার মার্টিনেজ। বাঁ চোখে ছানি পড়েছে। ডান চোখটা কচলে নিয়ে ভাল করে দেখলাম। আমারই মত দেখতে একজন। দাঁত কিড়মিড় করতে গিয়ে বুঝলাম, এ তো মূর্তিমান আমি। ও হরি, তার মানে সামনে ওটা আয়না। যাচ্চলে ককটেল নেই, এ টেল অফ হরিবোল। হতাশ আমি স্ন্যাকসের দিকে ধাবিত হলাম। বন্ধু গৌতম দেব এর সঙ্গে দেখা। আমাকে কানে কানে জিজ্ঞাসা করল ‘কিরে হার্ড ড্রিংক্স আছে কি। বাইরে হলে গ্লাস টাস দেখছিলাম।’ বল্লাম ‘চক্ষুকর্ণের বিবাদ ভঞ্জন করে এসেছি বন্ধু -হার্ড লাক, এখানে সফ্টের কারবার চলছে।
দুই বেচারা চল্লাম স্ন্যাকসের দিকে। মুরগীর ঠ্যাংএ কসে কামড় দেব এরকমই ইচ্ছে। ঠ্যাং এও লেঙ্গি! দুই এক পিস শক্ত তন্দুর চিকেন পাওয়া গেল। ফিশ ফিঙ্গারটাও ফিশি। বাসা ফিসের প্রতি ভালবাসা জন্মালো না। রেভিলিউশনারি আইডিয়া বার করলাম। গৌতমকে বল্লাম -‘চল মেন কোর্স থেকে মাটন নিয়ে স্ন্যাকস খাই। মাটন একটা ট্রেতে আছে বটে। কিমা মাটন কারি। মাটনের মানিকজোড়।খড়ের গাদায় ছুঁচের মত খুঁজে পেতে দুই তিন পিস মাটন পাওয়া গেল। স্ন্যাকস ফিনিশ করে একটু বিশ্রাম। সুন্দরী রমণীকুল ভুবনমোহিনী হাসি নিয়ে ফটো সেসনে ব্যাস্ত। পেটে সুখ না হোক দৃষ্টিসুখ হোক না একটু। দূর থেকে মঞ্চে দেখা গেল বরের বাবাকে। বেশ প্রফেসর শঙ্কু টাইপের লাগছে টাক সহ। বর ও বরের ভাই দু জনেরই কেশরাজি বাড়ন্ত। গৌতমকে চুপিচুপি বল্লাম, টাক থাকলে টাকা হয়’- এই আপ্ত বাক্য অনুযায়ী এক বাড়ীতে তিন স্বর্ণখনি।
বেশ কিছু পরে মেন কোর্স নিয়ে বসা গেল। নর্থ সাইডে অনেক সময় ভেজ ডিশ বেশ ভাল হয়। ডাল মাখ্খনির বদলে ইয়েলো ডাল, খেতে ডাল (dull), অর্ডিনারি পালক পনির, বাড়ীর মত টেস্ট। চাইনিজ চাখলাম চিকেন চাউমিন ও মাঞ্চুরিয়ান, খেতে ঠিকঠাক। মাটনের ট্রেতে খালি কিমা ভাসমান, চিকেন ছিল, তবে বিয়েবাড়ীতে আমার না পসন্দ ডিশ। ‘মধুরেণ সমাপেয়ত’ কথাটার মান রাখতে সুইট ডিশের দিকে ধাবিত হলাম। রাবড়ি আর রসমালাই নিয়ে বসা গেল। পরে সুইটহার্টের কাছে জানলাম চালে ভুল করেছি, রাবড়ি আর মালপোয়ার যুগলবন্দী ভাল জমে, আর রসমালাই একাই একশো। সুগার আছে, তবে বিয়েবাড়ীতে ‘আঁতুড়ে নিয়ম নাস্তি’। মালপোয়ার মধ্যে রস ঢোকে নি ঠিকমত, তবে আমি রসময় রসিক, তাই খেতে অসুবিধা হল না।
এখানে আবার হোটেল ম্যানেজমেন্টের সূক্ষ চাল দেখা গেল। খেতে খেতে টুপি খুলে ফেলতে হল। বাইরে জমিয়ে ঠান্ডা, মাথায় গরমের চোটে স্বেদবিন্দু। এসি টা মনে হল ২৬-২৭ ডিগ্রিতে সেট। খানায় তাড়াতাড়ি ক্ষ্যামা দাও। যাক বিদায়ের পালা। বরের বাবার সঙ্গে একপ্রস্থ ফটো শেসন করে বেরোন গেল। বেরনোর আগে সেই মোজিটো সেবন করে বেরোলাম। দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানো আর কি। কথায় আছে ‘ধারে কাটে না, ভারে কাটে’। হিলটন নামেই বেশ ভার, বিদেশী গন্ধ, নেটিভের সঙ্গে মিলে দো-আঁশলা, ভোতা অস্ত্রেই বাজিমাত।




Comments
Post a Comment