উত্তর কলকাতায় কিছুক্ষণ
উত্তর কলকাতায় কিছুক্ষণ
কলকাতায় এলাম ঠিক দুই বছর পর। চলমান জীবন তার ছন্দ বদলায় ধীর গতিতে। বেশ কিছু বছর পর যেমন কাউর সঙ্গে দেখা হলে শোনা যায় মধ্য-কলেবরের বৃদ্ধি বা বিরলকেশের আধিক্য, নিদেন পক্ষে ওজন বৃদ্ধি বা হ্রাস সম্বন্ধিত মন্তব্য, যা হয়ত চিরদিনের অর্ধাঙ্গিনীর চোখ এড়িয়ে গিয়েছে। কলকাতায় এসে এরকমই দুই একটি ঘটনা চোখকে “চৌক দিয়া”। দমদম মল রোড বাজারে পান খাওয়ার ইচ্ছে হল। মিষ্টি পান খাব এরকমই ইচ্ছে। প্রথম দোকানটাতে পেলাম না, যদিও সেটা প্রথাগত ভাবে পানের গুমটি টাইপের স্টল। এবার সতর্ক হয়ে “পান ভান্ডার” লেখা তিনটে দোকানে ঢুঁ মারলাম। পান পাওয়া গেল না। ধীরে ধীরে বাঙালীর জীবন থেকে তাম্বুল রাঙা ওষ্ঠের আবেদন সংকুচিত।
দমদম ক্যান্টনমেন্ট স্টেশন দিয়ে হেটে আসছি, লটারীর টিকিটের দোকানে ছয়লাপ।
কোথাও বড় হরফে লেখা -“এই স্টলে এক কোটি টাকার টিকিট বিক্রি হয়েছে।” মল রোডের বাজারেও সেই একই দৃশ্য। অনুব্রতের বহুলচর্চিত সম্পত্তির হিসেব নিকেশে লটারীর প্রাইজের বড় যোগদান, সিবিআই এর তদন্তে হদিশ পাওয়ার পর ছা-পোষা বাঙালী লটারীতে লাইন দিয়েছে।
এক পরিচিতার সঙ্গে কথা হচ্ছিল, সে থাকে মধ্যমগ্রামে। তার কাছে জানলাম আজকাল নাকি কন্ঠীধারীদের রমরমা। মধ্যমগ্রাম কি বারাসত অঞ্চলে হরিসংকীর্তনের রমরমা। মাছ তো দূরের কথা, অনেকেই আজকাল পেয়াজ রসুনও ত্যাগ করেছেন। ওরই পরিচিত একটি ছেলে মাছের ব্যাবসা ছেড়ে এখন ফলের ব্যাবসা করছে। আধ্যাত্মিক ‘ফল’ লাভের আশায় ফলের উপর ভক্তি যেন বিফলে না যায়। নীটফল, “ফলেন পরিচয়তে”!
গতবার করোনার সময় জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ী দেখতে এসে বিফল মনোরথ হতে হয়েছিল। এবারে ঠিক করছিলাম বাগবাজারে সিস্টার নিবেদিতার বাসস্থান, যা এখন একটি মিউজিয়ামে রূপান্তরিত, সেটা দেখব। কলেজ লাইফে সাউথ কলকাতাটাই চেনা ছিল, বাগবাজার কোনদিন আসি নি।
ক্লাস টু কি থ্রিতে পড়ার সময় বাবা সিস্টার নিবেদিতার লেখা “ক্র্যডেল টেলস অফ হিন্দুইজম” বইটা কিনে দিয়েছিল। বইটা ছিল ইংরেজীতে লেখা। কষ্ট করে একটু আধটু পড়েছিলাম। তখন খুব ছোট ছিলাম। একটু বড় হতে নিবেদিতার জীবনী পড়ে তার প্রতি শ্রদ্ধা বেড়ে যাবার বড় কারণটা ছিল এই বিদেশিনী আমৃত্যু শুধু যে ভারতের হতদরিদ্র, নিরন্ন জন সাধারণের সেবা করেছেন তাই নয়, নারী শিক্ষার প্রসারে তাঁর অবদান সর্বজনবিদিত, গুরু বিবেকানন্দের অনুপ্রেরণায় হিন্দু ধর্ম নিয়ে গভীর জ্ঞানার্জন করেছিলেন, বই লিখেছিলেন। এক উন্নত দেশ থেকে এসেও তিনি ক্ষয়িষ্ণু, পরাধীন ভারতবাসীর অন্তরে নিজের সেবাকর্মের দ্বারা এক বিশেষস্থান অধিকার করে আছেন।
এবারে কলকাতায় এসেছি দিল্লি থেকে ভায়া ডুয়ার্স-দার্জিলিং হয়ে। গ্রুপে ছিল কলেজের বেশ কিছু ক্লাসমেট। তাদের মধ্যে দুজন স্বতন্ত্র ও নিজস্ব চিন্তাধারায় বিপরীত মেরুপন্থী। একজন “মেরা দেশ মহান” চিন্তাধারার সমর্থক, তবে সেটা মোটেই পলিটিকাল এঙ্গেলে নয়, সে ভালবাসে এদেশের সংস্কৃতিকে, খুঁজে বেড়ায় নগন্য ব্যাক্তির চিন্তাধারায় উজ্জ্বল মানসিকতার, ধূলি ধূসরিত পথও তার চোখে রাজপথ। বন্ধুটি সিস্টার নিবেদিতাকে নিয়ে একটি বইও লিখেছে, কবিতাচ্ছলে, যা পাঠকমহলে দারুনভাবে সমাদৃত। অন্য বন্ধুটি পশ্চিমি সভ্যতায় আলোকপ্রাপ্ত, সমুদ্র সৈকতের ফেনিল জলরাশির ধারে তার বাস, জীবনের পেয়ালা তার কাণায় কাণায় পূর্ণ, এদেশের সঙ্গে তার ‘লাভ এ্যন্ড হেট’ রিলেশনশিপ। নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে দেখা তার সাথে, সেইদিনই সে এসেছে সুদূর বার্সিলোনা থেকে। দেখা ইস্তক সে আমায় শোনাতে থাকল নোংরা স্টেশন চত্বরের আবর্জনা, যত্রতত্র প্লাস্টিকের ডাঁই, খোয়া বেড়িয়ে পড়া রাস্তার বেহাল অবস্থা- তার চোখকে কি রকম পীড়া দিচ্ছে। এই নিয়ে পরবর্তী একসপ্তাহ এক বিদেশী ভাবধারায় অভ্যস্ত ও আরেক স্বদেশীয়ানার পূজারীর মধ্যে তুমুল তর্ক চল্ল, তরল গরলের প্রভাবে তা বাকী বন্ধুদের কাছে আরো চিত্তাকর্ষক হল। এক বিদেশিনী ধর্মপ্রাণা মহিলা, তার ভোগবাদী পাশ্চাত্য সভ্যতার শিকল ছিঁড়ে এই দেশকে নাড়ী ছেঁড়া ধনের মত সযত্নে লালিত করেছেন আর আমার বন্ধু এদেশের সব কিছুতেই নাক সিটকোচ্ছে, তাকে আমি দোষ দিতে পারি নে কারণ পরিচ্ছন্নতা, সুন্দরভাবে বেঁচে থাকা জীবনের এক অঙ্গ। যারা এই পরিচিত গন্ডীর বাইরে বেরিয়ে সমাজসেবী হন, তারা বরেণ্য।
নেট ঘেটে দেখা গেল সপ্তাহে মাত্র তিনদিন-শুক্র, শনি,রবি দুপুর সাড়ে বারটা থেকে পাঁচটা পর্যন্ত খোলা থাকে এই ১৬ নম্বর বোসপাড়া লেনের বাড়ীটি। গুগল ম্যাপ থেকে দেখলাম, শ্যামবাজার থেকে এক কিলোমিটার হাঁটা পথ। নাগেরবাজার থেকে বাস পেলাম দুপুর দেড়টা নাগাদ, ভাগ্যক্রমে সেটা যাচ্ছে বাগবাজার হয়ে। নামলাম মণীন্দ্র চন্দ্র কলেজ।
ওখান থেকে হাঁটা পথে পড়বে হাফ কিমি। উত্তর কলকাতার গলি এই প্রথম দেখেছি,
রাস্তায়, শ্যাম পার্ক পড়ল, একটু এগিয়ে যতীন্দ্র মোহন এভিনিউর চওড়া রাস্তা। ওই রাস্তা থেকে বাদিকে একটু এগোতেই দেখলাম মেন রাস্তাটা দুইভাগ হয়ে একটা দোতলা বাড়ীকে মধ্যমণি করে এগিয়েছে। বাড়ীর সামনের ছোট্ট বাগানে নাট্যকার গিরিশ ঘোষের মর্মর মূর্তি।
আর একটু এগিয়ে বাঁহাতি গলির ভিতর পড়ল নিবেদিতা মিউজিয়াম।
বাইরে থেকে বাড়ীটার কিছু ছবি নিলাম। ভিতরে মোবাইল নিষিদ্ধ। পঞ্চাশ টাকার টিকিট কেটে জুতো, মোবাইল জমা রেখে ১৬ নম্বর বোসপাড়া লেনের পূণ্যতীর্থে ঢোকা গেল।
১৮৯৮ সালের জানুয়ারীতে প্রথম ভারতে আসেন সিস্টার নিবেদিতা আর ১৯১১ সালে তাঁর তিরোধান। এই দীর্ঘ ১৪ বছরে তিনবার মিলিয়ে পাঁচ বছর ভারতের বাইরে ছিলেন। বাকী নয় বছরের মধ্যে প্রথম কিছুদিন বাদ দিয়ে তিনি প্রথম সাতমাস ছিলেন ১৬ নম্বর বোসপাড়া লেনের এই বাড়ীটিতে, পরের সময়টি অতিবাহিত হয় সতের নম্বর বোসপাড়া লেনে।
তবে ১৬ নম্বরের এই বাড়ীটি ভাড়া নেওয়াই ছিল। স্ত্রী শিক্ষা প্রসারে তার কর্মকান্ড সর্বজনবিদিত। এই বাড়ীতেই তিনি নারীশিক্ষার উদ্দেশে স্কুল খোলেন ১৯৯৮ সালে। সেই বিদ্যালয়ের উদ্বোধন হয়েছিল বিবেকানন্দের হাতে।
প্রবেশদ্বারের পরে একটি চত্বর। কয়েকটি তরুণী রয়েছেন দেখভালের দায়িত্বে। মিউজিয়ামটি এখনও বহুল প্রচারিত নয়, তাই লোকসমাগম লিমিটেড। সেটা একদিক দিয়ে ভাল, শান্তিতে দেখা যায়। তরুণী গাইডের কাছে পাওয়া গেল ইয়ার ফোন যুক্ত মোবাইল। বেশ হাইটেক অডিও-ভিস্যুয়াল ইন্টারাক্টিভ মিউজিয়াম দর্শন। বাড়ীটিতে বারান্দা নেই। প্রবেশদ্বারের পর একতলার মধ্যবর্তী অঙ্গনের পাশে রাস্তার দিকে মুখ করে একটি ঘর। এটি নিবেদিতার বৈঠকখানা ঘর। উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দুই বছর উনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে, বাংলার নবজাগরণের শিখর পর্যায়ে বহু মনীষীর পদধূলিতে ধন্য হয়েছে ঘরটি।
এদের মধ্যে আছেন স্বয়ং স্বামীজি, শ্রী সারদা মা, কবিগুরু, মহেন্দ্রলাল সরকার, জগদীশ বোস, লেডি অবলা বোস প্রভৃতি। বৈঠকখানাতে হলোগ্রামের মাধ্যমে নিবেদিতাকে দেখানো হয়েছে তিনি স্টাডি টেবিলে বসে লিখছেন ও সই করছেন, সামনে রাখা পেপার ওয়েট যা তাকে গিফ্ট করেছিলেন জগদীশচন্দ্র। মোবাইলে দেওয়ালে অঙ্কিত কিউআর কোড স্ক্যান করে নিলেই প্রত্যেকটি দর্শনস্থলের দ্রষ্টব্য ধারাবিবরণীর মাধ্যমে জানা যাবে। চত্বরের ডানদিকে ঠাকুরদালান, যার মধ্যে ১৩ নভেম্বর, ১৮৯৮এর পুণ্যতিথিতে বিবেকানন্দ, ব্রহ্মানন্দ, সারদানন্দের উপস্থিততিতে, শ্রীমা তার দুই সঙ্গীনী, গোলাপ মা ও যোগীন মাকে নিয়ে পূজা পাঠের পর অনুষ্ঠানিক ভাবে মেয়েদের স্কুলটির উদ্বোধন করেন। তখনকার দিনে রক্ষণশীল সমাজ, নারীশিক্ষার বিরোধী ছিল, পুরুষতান্ত্রিক সমাজে গৃহকাজের গন্ডীর মধ্যে আবদ্ধ ছিল নারী জীবন, সেই পরিবেশে, তাও এক ম্লেচ্ছ রমণীর স্কুলে মেয়েদের অধ্যায়নে পাঠাতে কেউই আগ্রহী ছিলেন না। অতি কষ্টে তিনি তিরিশ-চল্লিশটি মেয়েকে নিয়ে স্কুল শুরু করেন। (ভিতরের ছবি, নেট থেকে পাওয়া)
এই বায়োস্কোপ দিয়ে ১৭ নম্বর বাড়ীতে বসবাসকালীন ছাত্রীদের প্রতি নজর রাখতেন
তিনি ছিলেন একমাত্র শিক্ষক। তেতুলবিঁচী ছিল সংখ্যাগণনার উপাদান, কাদামাটি দিয়ে ক্লে মডেলিং শেখাতেন, জ্যামিতি, ভাষাশিক্ষা সবই চলছে সমান্য উপকরণের মাধ্যমে। নিবেদিতা পুঁথিগত শিক্ষার থেকে হাতে কলমে শিক্ষায় বেশী বিশ্বাসী ছিলেন। জগদীশচন্দ্রের কাছ থেকে মাইক্রোস্কোপ এনে ছাত্রীদের রক্ত কণিকা দেখিয়েছিলেন। গরুকে সামনে দাঁড় করিয়ে তার বর্ণনা করতে বলতেন। নিজের কোমরের দড়ি খুলে স্কিপিং শেখাতেন। কখনো ছাত্রীদের নিয়ে পাড়ার বিভিন্ন গলিপথ ঘুরে, রাস্তার নকশা বানাতে বলতেন। স্কুল চালাতে যে পর্যাপ্ত টাকা কড়ির দরকার তার সম্বল সিস্টারের ছিল না। অর্থ সংগ্রহে তিনি তিনবার বিদেশ ভ্রমন করেন। সমসাময়য়িক ঘটনাবলীর বিবরণ ও বিখ্যাত ব্যাক্তিত্বের চরিত্রচিত্রণ, সুনীল গাঙ্গুলির প্রথম আলো ও সেই সময় বইটিতে আছে। আমিও প্রথম ১৬ নম্বর বোসপাড়া লেনের বাড়ীটির কথা জানতে পারি শ্রদ্ধেয় সুনীল গাঙ্গুলির লেখা মারফত। তখন থেকেই এই বাড়ীটি দেখার এক সুপ্ত ইচ্ছে ছিল। আজ সে স্বপ্ন সার্থক হল।
(ভিতরের ছবি, নেট থেকে পাওয়া)একতলার আরেকটি ঘরে শ্রীমা ও ভগিনী নিবেদিতার সমাজ কল্যাণে দুজনের সম্মিলিত প্রচেষ্টার কাহিনী বিবৃত হয়েছে একটি কিয়স্কে ইন্টারাক্টিভ টাচস্ক্রীন ডিসপ্লের মাধ্যমে।সুন্দর পালিশ করা দোতলায় ওঠার সিঁড়ি দিয়ে এসে পড়বে নিবেদিতার শোবার ঘর। সেখানের জানলা দিয়ে তিনি খোলা আকাশের তারা দেখতেন।
একদিকে ছিল একটি বৃহৎ নিমগাছ। সেই গাছে নানারকম পাখির আনাগোনা দেখতে নিবেদিতার খুব ভাল লাগত। তিনতলার সিঁড়িতে তারজালি দিয়ে কৃত্তিম নিমগাছের পাতাসহ ডাল লাগানো হয়েছে। আরেকটি ঘরে নিবেদিতার লেখা বই রাখা আছে। যে কোন বই তুলে একটি চতুষ্কোণ বিশিষ্ট জায়গাতে রাখলে স্ক্রীনে বইটির সংক্ষিপ্ত বিবরণ পাওয়া যাবে।
সিস্টার স্বামীজীর অনুরোধে গভীর মনেনিবেশের সাথে হিন্দুধর্মের অধ্যয়ন করেছিলেন। তার প্রগাঢ় জ্ঞানের পরিচয় পাওয়া যায় তার লেখা এগারখানি বইগুলি থেকে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য- কালী দ্য মাদার, ফুটফলস অফ ইন্ডিয়ান হিস্ট্রি, রিলিজিয়ান এ্যন্ড ধর্ম, দ্য ওয়েব অফ ইন্ডিয়ান লাইফ, ইন্ডিয়ান স্টাডি অফ লাভ এ্যন্ড ডেথ ইত্যাদি। দশ বছরের প্রচেষ্টাতে বিবেকানন্দের উপর বই লেখেন - “দ্য মাস্টার এ্যজ আই স হিম”।
১৬ নম্বর বোসপাড়া লেনের বাড়ীটি হেরিটেজ বিল্ডিংএর তকমা পায় ২০০৫ সালে।
সরকারী তৎপরতায় সারদা মিশনের হাতে আসে ২০১৩ সালে। বাড়ীটি সংরক্ষণের প্রক্রিয়ায় যাতে এর মূল আদিরূপটি বজায় থাকে তার যথাসাধ্য চেষ্টা করা হয়েছে। বিশেষ সাইজের ইট আনা হয়েছিল বহরমপুর ও বাঁকুড়া র শালতোড়া থেকে। গাথুনীর মশলা হিসাবে চুন- সুরকী ও পরিমাণমত মেথি, খয়ের, গুঁড় ব্যাবহৃত হয়েছিল।
ছাদ ও মেঝের সমস্ত কাঠ নূতন করে লাগান হয়েছে। বাড়ীটির বিশেষত্ব হল এর জানালায় কোন কাচের ব্যাবহার ছিল না। জরাজীর্ণ বাড়ীটিকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে রিনোভেশন করা হয়। যার জন্য ২০১৪ তে নির্মাণ কাজ শুরু হয়ে শেষ হয় ২০১৭ সালে।
কমবেশী দেড়ঘন্টা সময় লাগল মিউজিয়ামটি দেখতে। পুরো ব্যাপারটি ইন্টারাক্টিভ হওয়াতে দর্শক আনায়াসে ইতিহাসের পাতায় ঢুকে পড়তে পারেন। মিউজিয়ামের পরিবেশটি একটি মন্দিরের ভাব-গম্ভীর পরিবেশের সঙ্গে মানান সই, কিন্তু মন্দিরের হট্টগোল বর্জিত।
বেরিয়ে এলাম মনে এক প্রশান্তি নিয়ে, ইতিহাসের একটুকরো অধ্যায়কে ক্ষণিক সময়কে একান্ত করে অবগাহন করতে পেরেছি। মহীয়সী নারীকে অন্তরের শ্রদ্ধাটুকু জানিয়ে যাত্রা শুরু নূতন গন্তব্যে।
হাঁটা পথেই গিরিশ ঘোষের বাড়ীর কাছে বলরাম বোসের ঠাকুরবাড়ী।
এটি বলরাম মন্দির হিসাবে বেশী পরিচিত। বলরাম বসুনছিলেন রামকৃষ্ণের অন্যতম গৃহীভক্ত। ঠাকুর অনেকবার এখানে রাত্রি অতিবাহিত করেছেন। দোতলায় তার শয়নকক্ষটি দেখলাম।
শ্রীমা ঠাকুরের মৃত্যুর পর এখানে বহুবার ছিলেন। এখান থেকেই ১৮৮৬ সালে শ্রীমা বৃন্দাবন যাত্রা করেন, ফিরেও আসেন এইখানে। শ্রীমায়ের ঘরখানিও দেখলাম। ইতিহাসকে প্রত্যক্ষ করলাম।
এবারের গন্তব্য মায়ের বাড়ী।
যে রাস্তায় এসেছিলাম, সেই যতীন্দ্র মোহন এভিনিউ ধরে বাগবাজার ঘাটের রাস্তা বাদিকে রেখে কয়েক কদম গেলে পাওয়া যাবে মায়ের বাড়ী। উনিশ শতকের শেষভাগে বিবেকানন্দর চেষ্টায় রামকৃষ্ণ মিশনের কার্যাবলী জনসাধারণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য ‘উদ্বোধন’ পত্রিকা ও প্রেসের কাজ শুরু হয়। প্রথমদিকে এর কার্যালয় ছিল বলরাম বোসের বাড়ীতে। পরে কিছু টাকার সংস্থান করে বাগবাজারে এই বাড়ীটি বানান হয়। ওই সময়ে শ্রীমা প্রায়ই কলকাতায় আসতেন। থাকার পার্মানেন্ট জায়গা না থাকায় অসুবিধা হত। প্রেসের উপরে গুরুভাইরা মিলে ঘর তুলে শ্রীমায়ের থাকার বন্দোবস্তো করেন। ঘটনাটি ১৯০৮/০৯ সালের। পরে বাড়ীটির নামই হয়ে যায় মায়ের বাড়ী। ১৮৯৮ সালের ১৭ই মার্চ নিবেদিতার প্রথম সাক্ষাত হয় শ্রীমায়ের সঙ্গে এই বাড়ীর কাছে ১০/২ বোসপাড়া লেনে। গ্রাম বাংলার রক্ষণশীল পরিবারের, প্রায় নিরক্ষর রমণী তাঁর অসীম মাতৃস্নেহে আপন করে নিলেন এক বিদেশীনিকে।
দোতলায় উঠে শ্রীমায়ের ঘরখানি দেখলাম। তলায় ভোগ বিতরণ হচ্ছিল। ভোগ খেয়ে বেরিয়ে এলাম। এর কাছেই গঙ্গার পাড়ে আছে একটি ঘাট, যা সারদা ঘাট নামে পরিচিত।
শ্রীমা প্রায়শই এই ঘাটে গঙ্গা স্নানে আসতেন। খুবই কাছে। হেঁটে হেঁটে চলে এলাম ঘাটে। পাশেই চক্র রেলের লাইন। বাগবাজার স্টেশন। বসলাম গিয়ে ঘাটের পাশে। গঙ্গাদর্শন সঙ্গে গঙ্গার শীতল সমীর সেবন। সব মিলিয়ে পরিতৃপ্ত মন। সাঙ্গ হয়েছে আজকের ঘোরা। ফেরার পালা। ভেবেছিলাম শ্যামবাজার হয়ে ফিরব। মত বদল করলাম। চক্ররেলে চড়ার সাধ হল।
টিকিট কাউন্টারে দমদমের টিকিট চাইলাম। টাকা দিতে গিয়ে বলেই ফেল্লাম মাত্র পাঁচটাকায় এতদূর যাওয়া যাবে। কাউন্টারের ভদ্রলোক রসিক বল্লেন “এর থেকেও দূরে যেতে পারেন পাঁচ টাকায়”। বল্লাম তাহালে দমদম ক্যান্টনমেন্টের টি কিট দিন। উনি বল্লেন “আপনি পাঁচটাকায় হৃদয়পুর অব্দি যেতে পারেন। আপনাকে হৃদয়পুরের টিকিট দিচ্ছি।” আমি বল্লাম “দাদা হৃদয়পুরে হৃদয়হরণের বয়েস আর নেই।” একটু হেসে “চেষ্টা করতে দোষ কি” বলে হৃদয়পুরের টিকিট গছিয়ে দিলেন।
অফিস টাইমের সময়। বেশ ভীড়। ভীড় ঠেলে এক দম্পতি উঠেছে। বেশভূষায় দীনতার ছাপ। সঙ্গে লটবহরের আধিক্য। দুই একটা আমার ঘাড়ে হাঁটুতে পড়ল। কন্ঠীধারী। বৃন্দাবনে তীর্থ করে ফিরছেন। বারাসত ছাড়িয়ে কোন গ্রামে থাকেন। প্রশ্নত্তোরে জানলাম একমাস ছিলেন, কৃষ্ণের লীলাক্ষেত্র, তারই লীলায় দানসত্রে খাবার কোন অভাব হয় নি। দিনরাত হরিসংকীর্তন করে কাটিয়েছেন। তীর্থ যাত্রার ক্লান্তি চোখে মুখে সুস্পষ্ট, কিন্তু অন্তরে বিরাজ করছে এক প্রশান্তি। এই তো শাশ্বত ভারতের চিরপরিচিত চিত্র।
দেবদত্ত
১৯/১১/২২






























লেখার হাত ক্রমশই দানা বেঁধে উঠছে।
ReplyDeleteখুবই তথ্যসমৃদ্ধ লেখা। কলম চালিয়ে যা। আরও চাই।
ReplyDeleteঅসম্ভব সুন্দর হয়েছে লেখাটা রে !
ReplyDeleteIn fact grateful to read and see. Since long wish to visit but so far unsuccessful. Your article almost took me there !
ReplyDeleteKhub Valo laaglo . Dumdum Clive house-e bauRo hoyechhi ....tokhon ei sob dekha hoy ni . Aaj 45 bauchhor Delhi-gurgaon-er basinda .
ReplyDeleteAapnar lekha-ti pore aagroho jonmalo . Er pore Kolkata-te gele , nischoi jabo ekbaar .
Khub bhalo laglo , U.K Dasgupta
ReplyDeleteThank you 🙏🏼
Delete