এল্যামনি ও অশ্বডিম্ব
এল্যামনি ও অশ্বডিম্ব
আজকে গিয়েছিলাম এল্যামনির বিজয়া সম্মিলনীতে। সিনিয়ার মেম্বার অমলেন্দুদা সনির্বন্ধ অনুরোধ এড়ানর উপায় নেই। সংখ্যাগুরুদের বাসস্থানের কাছে বিপিন পাল অডিটোরিয়াম। সংখ্যালঘুদের জন্য লঘুপাপে গুরুদন্ড। সিআর পার্ক আমার যৌবনের উপবন, বার্ধক্যের বারানসী নয়ডা থেকে যেতে ভালই লাগবে, স্মৃতি ঝালিয়ে নেওয়া যাবে। তার জন্য মেট্রোতে একটু ঝিলতে হবে, তা সই। লাস্ট লেগ কানেক্টিভিটির জন্য ১১নম্বর অর্থাৎ দুই লেগের সাহায্যে হাঁটিহাঁটি পা পা করে পৌঁছান গেল। একটু লেট, চা বিস্কুট মিস। হতাশ হওয়ার কিছু নেই, কাউন্টার সামলাচ্ছেন প্রদীপদা। জানা গেল প্রোগ্রামের পর বিরিয়ানীর প্যাকেট পাওয়া যাবে। সব ভাল যার শেষ ভাল।
খুব কমপ্যাক্ট প্রোগ্রাম। গান হল, নীলাদ্রিদার শ্রুতি নাটক হল। একটা “বসে” নাটক হল। বসে নাটক ব্যাপারটা জানা ছিল না। বসে আঁকোটা জানি। পুজো প্যান্ডালে এই কম্পিটিশনে পেপার ডিস্ট্রিবিউট করার সুবাদে পরিচিত অনুষ্ঠান। বেলাদির মহিলামহলের মত কুশীলবেরা মহিলা। পঞ্চপান্ডবের বদলে পঞ্চকন্যা।ছোটবেলায় নিয়ম করে শুক্র ও রবিবারের নাটক শুনতাম। সেই স্মৃতিটাই উস্কে দিল “বসে” নাটক। এক সিনিয়ার দাদার মিসেস নজরুলগীতি গাইলেন। তৈরী গলা। বাচ্চাদের কুইজ হল। ফানি টপিকের উপর বেশ এক্সটেম্পোর হল। গানের কুইজ হল। অন্তরা টা গেয়ে শোনান হবে। স্থায়ীটা গাইতে হবে। আমার জন্য বাউন্সার। চাকরীতে স্থায়ী- অস্থায়ী শুনেছি। গানে স্থায়ী কি জিনিষ আবার? বিলম্বিত লয় জানি, এরকম হয়ত স্থায়ী লয় হবে। দিদি নং ওয়ান প্রোগ্রামটা রোজই দেখি। সেখানে গানের রাউন্ডে, গায়ক অন্তরা শোনান, পার্টিসিপেন্টদের মুখরা গেয়ে শোনাতে হয়। এসব ক্ষেত্রে মুখে কুলুপ এটে বসে থাকাটাই শ্রেয়। সামনে একটি কাপল ছিল, চিনি না, পরে ফানি এক্সটেম্পোরে উইনার হওয়ায় নাম জানলাম অনন্যা। গানেও অনন্য। গানের কুইজেও দুটো প্রাইজ তার দখলে। সামনে থাকলে চোখ যাবেই। খুশী খুশী মুখে সদ্যঅর্জিত প্রাইজ যা ব্রাউন পেপার মোড়া, সেটার ফটো তুলে কাউকে হোয়াটস্ এ্যপ করছে। মিনমিনে গলায় বল্লাম -“প্যাকেটগুলো চিচিংফাঁক করে ফটো নিলে ভাল হত। যাক শুনতে পায় নি, ভালই হয়েছে।
বাইরে বেরিয়েছি। কল্লোলদা ও চিন্ময় হেঁসেল সামলাচ্ছে, মানে বিরিয়ানী ডিস্ট্রিবিউশনের ভার। কথার মাঝে নজরুলবৌদি (সুব্রতদার ওয়াইফ) এলেন। দারুণ সুন্দর গান করে তিনি ক্ষুধার্ত।বিরিয়ানীর প্যাকেট নিয়ে বসে খুব খোঁজাখুজি করছেন।
বেরোল অশ্বডিম্ব। আরে-এই টপিকটাই তো ছিল এক্সটেম্পোরে। হাতে নাতে প্রমান। মুরগীর ঠ্যাং-এর বদলে অশ্বডিম্ব। মুরগীর ঠ্যাংএর বদলে পাওয়া গেল আধখানা মুরগীর ডিম। একেই বলে মুরগী হওয়া। কনসোলেশন প্রাইজ বলা যায়। বৌদির দুঃখ প্রশমিত করতে টুকটাক গল্প জুড়লাম। দিল্লি, কলকাতা, বম্বে তিনজায়গাতেই গানের তালিম নিয়েছেন। আকাশবাণীর গ্রেড এ আর্টিস্ট। কিছুটা হলেও বৌদির মনোসংযোগ ঘুরিয়ে দিতে পেরেছি, মন্দের ভাল। তবে নিজের মনে ভয় ধরে গেল। বাড়ীতে গিয়ে জমিয়ে বিরিয়ানী খাব এরকমটাই ভেবিছিলাম। আমার প্যাকেটেও যদি ঠ্যাং মিসিং হয়। বেশ ভাল করে গিঁট মারা প্যাকেট। খুলে নিয়ে চেকিং করা যেতে পারে, তবে সেটা লোক হাসানো হয়ে যাবে।অতঃ কিম। এরকম ক্ষেত্রে ব্যাকআপ রাখা জরুরী। প্রদীপদা আমায় ভাল করেই চেনেন। সুমিতা আসে নি। দুটো কুপনের ঢপ দেওয়ার ভরসা পেলাম না। তাছাড়া প্রদীপদা অন্যায়রকমভাবে নীতিবাদী মানুষ। কিছুদিন আগে প্রদীপদার খেয়াল হল জলের বিল আসছে না। গুটিগুটি পায়ে গেলেন দিল্লি জলবোর্ডের অফিসে। বিলিং ডিপার্টমেন্ট জানাল- দিল্লি গভর্নমেন্ট আজকাল দিল্লিবাসীদের ফ্রিতে জল খাওয়াচ্ছেন। আগে বিজলী বিলেও বড় অঙ্কের ছুট ছিল, এবারে জলেও “আপ” কল্পতরু। এ হল ডাবল ধামাকা।এক্ষেত্রে আমি হলে আনন্দে ধেই ধেই করতে করতে বাড়ী ফিরতাম। কিন্তু প্রদীপদা অন্য ধাতুতে তৈরী। প্রদীপদা উর্ধতন কর্তৃপক্ষকে গিয়ে জানালেন- “ইয়ে বিলকুল না ইনসাফি হ্যায়, যারা দিতে পারে তাদের কেন বিল মাপ হবে?” এর পরেরবার ভোট যে এএপিকে দেবেন না সেটাও জানিয়ে এলেন।
যাই হোক আমার মাথায় ঘুরছে, যদি বিরিয়ানীতে চিকেন না থাকে। ছোটবেলায় বলতাম “যদির কথা নদীর ধারে”, এখন আর সে বয়েস নেই। মুশকিলআসান নিজেই বার করে ফেল্লাম। মার্কেট থ্রি-টা কাছেই। ওখানে একটা দোকানে মাছ, মোচা, চিকেন, মাটন এর ফ্রাই, রোল সব পাওয়া যায়। বেশ সস্তা। ফিস ফ্রাই পনের টাকা। খেলামও আবার বিরিয়ানীর ব্যাকআপে চিকেন ফ্রাই করিয়ে তবে শান্তি। হইচইতে বোধন সিরিয়াল জমিয়ে দেখা যাবে
আবার হলে এসে ঢুকলাম। বেশ নাচ হচ্ছে। নটা বাজে। চুপিচুপি ভাগলবার তালে আছি। বেরিয়ে প্যাকেট নেওয়ার সময় কল্লোলদা আশ্বস্ত করলেন, আমার প্যাকেটে চিকেন অশ্বডিম্ব হবে না।
ঘোড়ার ডিম যখন টপিক ছিল, ওই ব্যাপারে একটু আলোক পাত করা যাক। “গরীবের ঘোড়ারোগ” কথাটা নিশ্চয়ই শুনেছেন। ঘোড়া এমনকিছু আহামরি জন্তু নয়, সোনা, রূপো রোগ কি নিদেন পক্ষে হাতীরোগ হতে পারত। এর উত্তর খুঁজতে গেলে একটু ইতিহাসের পাতা ওল্টাতে হবে। আজ থেকে পাঁচশ-হাজার বছর আগে ঘোড়া ছিল পরিবহন ও যুদ্ধের প্রধান হাতিয়ার। সেন্ট্রাল এশিয়ার টার্ক বা মঙ্গোলিয়ার মোঙ্গলরা বিস্তীর্ণ ঘাসজমি (steppe) এ ঘোড়া ছিল তাদের সর্বক্ষণের সঙ্গী। পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষভাগে যখন কলম্বাস গেলেন আমেরিকা আর ভাস্কো ডা গামা এলেন কালিকটে, সেই সময়টা থেকে আরবী ও সেন্ট্রাল এশিয়ার ঘোড়ার কদর বেড়ে গেল ভারতে। ভারত থেকে যেত মশালা, কটন, নাটস, বদলে বেশী আসত ঘোড়া। সাউথ অমেরিকার বলিভিয়ায় ছিল সিলভারের খনি। সেই সিলভার আসত ইউরোপে আর সিলভার কয়েন দিয়ে ইউরোপিয়ানরা স্পাইস কিনত ভারত ও মালয় থেকে। এতে ইন্ডিয়ান রাজাদের বেশ টুপাইস হল। আজকাল যেমন বিএমডব্লিউ র ওনারকে লোকে সম্ভ্রমের দৃষ্টিতে দেখে, নিদেনপক্ষে ক্রেটা হলেও আপনি কেউকেটা, তেমনি তখনকার দিনে কার স্টেবলে ওয়েলার ঘোড়া বা কার কাছে আরবী কি পারস্যের ঘোড়া, তাই দিয়ে জাত বিচার হত। ঘোড়া নামক মহার্ঘ বস্তুটি গরীবের ধরা ছোঁয়ার বাইরে , সেই থেকেই গরীবের ঘোড়ারোগ কথাটা এসেছে। গরীবের ডোমেস্টিকেটেড পছন্দের প্রাণী হল গোমাতা। আজকাল তাদের অনেকেই রাজপথে বিচরণ করেন। গোমাতার আশীর্বাদ গোবরপ্রসাদ এড়িয়ে নয়ডার ফুটপাথে হাঁটা দায়।
(Malice towards one and all নয় , towards none. নিছক রম্যরচনা)
দেবদত্ত
১৬/১০/২২


Comments
Post a Comment